১২৩. দুর্যোগের মাঝবন্দর ভাসানচর
যোগেনরা বরিশাল সদরে ফিরে এল এক রাত পরে। ওরা ভোলায় যেতে পারেনি, যাওয়া অসম্ভব বলে। হালে ছিল শানু শেখ। দাঁড়ে ছিল ছোটমাঝি আর তার সঙ্গী।
যে-ঘুপচিটাতে ওরা নৌকো ভিড়িয়েছিল সেখান থেকে বেরনোর কোনো পথ নেই, তিন দিকেই আড়িয়াল খাঁর পাক। কিন্তু সে-আড়িয়াল খাঁয় বাতাস থাকলেও জলস্রোতের আলোড়ন কিছু ছিল না। এ পর্যন্ত কেউ বলেনি, জানেও না এখনো, তেঁতুলিয়া আর শাহাবাজপুর মিল কোথায়। আড়িয়াল খাঁ যদি পেরতেই হয়, পেরনো ছাড়া কোনো গতি নেই, তাহলে, ওরা যে-ঘুপচিটাতে ছিল, সেটা দিয়ে সোজা পুবে পার হওয়াই সুবিধের। শানু শেখ হুকুমের সুরে বলে, ‘আড়িয়াল খাঁর পেঁচাপেঁচিতে ঐ খানডা মাজার নাগাল সরু আর তার তলাতেই পাছার মত চ্যাবরা। কোমর দিয়্যা পার হও। এই ছোটমাঝিরা, হাতে বৈঠা থাইকলেই বাইতে লাগে? বৈঠা উঠ্যাও—সোত দেখো না।’
শানুর এই কথাতে যোগেন জলের স্রোতের দিকে তাকিয়ে দেখে শানু যেটাকে আড়িয়াল খাঁর মাজা বলল, তাতে তো কোনো বন্যা নাই, জোয়ারের। এটা কী করে হয়। বাতাসে সমুদ্রের জল যদি দোনা দিয়ে ঢোকে, তাহলে মাজা সরু থাকে কেমন করে। দেখে তো মনে হয়, দিন -তিনেকের মধ্যে জোয়ারের জল অন্তত মাজায় ঢোকেনি। তাহলে তলা থেকে বান আসেনি।
কেউই তো জানে না। বান এলেই সমুদ্রের বান। আর দৌলতখান-ভোলা শুনলেই, যেহেতু দৌলতখান, ভোলার দক্ষিণে, তাহলে, বানের পক্ষে সোজা রাস্তা তো দৌলতখান দিয়ে ঢুকে ভোলা দিয়ে বেরনো। শাহাবাজপুর নদী দিয়ে নোয়াখালির স্টিমার লঞ্চের বড় লাইন বলে—একটা ধারণা তৈরি হয়ে গেছে বড় নদীকে যদি বানের জল নিয়ে ঢুকতে হয় তাহলে ছোট নদী, দোনা আর খাল চাই।
যোগেন জিগগেস করে, ‘এই শানু শেখ, মাজা দিয়া বারায়্যা ঢুকব্যানে কুথায়। আড়িয়াল খাঁ কিন্তু প্যাঁচাল নদী। তুমি ভাবল্যা পার হইছি, শ্যাষে দেইখলা যেহান থিক্যা শুরু করছিল্যা সেহানেই আস্যা শ্যাষ। বারাব্যা কোথা দিয়া হে?’
‘মাজা ভাইঙ্গ্যা তো একটাই যাওয়ার বন্দর। চিরির বন্দর। আল্লার কী যাদু, দুই খ্যান ঠ্যাঙের মইধ্যে দিয়্যা রাইখছ এড্ডা ফোটা মধু—
শানু যখন রওনা দেয়, তখন তো তার সবটাই অচেনা ও আজানা। লঞ্চ সার্ভিস বন্ধ মানেই তো বড় বিপদ। তার ওপর এই হাওয়া। নৌকা ছাড়ার পর আড়িয়াল খাঁকে যখন শানু দেখল স্বাভাবিক আর হাওয়াও নেই আর জলের স্রোতও সিধা, নৌকা একেবারে ময়ূরপঙ্খী, সে বেশ স্বস্তি পায়। তাছাড়া, যোগেন তাকে বলে দিয়েছে, যেখানে তার মনে হবে, ব্যাপার কুবিধা, সঙ্গে-সঙ্গে নৌকো ভিড়িয়ে দেবে। তেমনটা করা যায় যদি এক পাড় ধইর্যা খাড়াখাড়ি যাওয়া যায়। কিন্তু নদী যেখানে আড়া পেরতে হয় না। সেহানে ভিড়াইবে কনে, জলে গিঁঠ দিবে? যোগেন ঠিক আন্দাজ করতে পারে না, আড়িয়াল খাঁর বেড কী করে ভাঙবে? নাকি ভাঙবে না? নাকি ওর জানা নেই?
‘ছোটমাঝি, তোমার তো গোসা হইল। তোমার গোসারই জয় হইল। কিন্তু তুমি কি এই নদীর পথ চিনত্যা?’ যোগেন জিজ্ঞাসা করে।
‘কুনোদিন না আইলে তো কুনোদিনই চিনব না—’
‘ভাল কইর্যা চিনো। পরের বার কিন্তু শানু আইব না।’
যোগেন একটু চিন্তায় পড়ে। কাল রাতের হাওয়া তো সারা রাত ধরেই খেয়েছে। ঐ হাওয়া সমুদ্রের ধাক্কা ছাড়া হতে পারে না। যখন মৈস্তারকান্দি থেকে রওনা দিল তখনো হাওয়া বাড়ছিলই তো। কিন্তু পুরো আড়িয়াল খাঁ পার হল, মনে হল, অন্যদিনের চাইতে কম হাওয়া। সেটা ভুলও হতে পারে। সারা রাত সারা সকাল অত হাওয়ার মধ্যে থেকে শরীরের ভুল হতেও পারে। সারা রাত সারাসকাল অত হাওয়ার মধ্যে থেকে শরীরের ভুলও হতে পারে। বানার হাওয়া কি বসে গেছে? যেতে পারে। এমন শুশুকের ঘাই দেয়ার মতন করে কি ঐ হাওয়া পড়তে পারে? যোগেন নিজের মনে না-হেসে পারে না।
‘গিছিলা কই?’
‘দরিয়ায়’।
‘দেইখল্যা কী’?
‘দেইখবড়া কী? আমি তো হোগা ঘুরাইয়া জলশৌচ করব্যার গিছিলাম।’
হাওয়াটার কারণ বুঝতে না-পেরে স্বস্তি পাচ্ছে না যোগেন। কী হয়েছে, কোথায় হয়েছে, কেন হয়েছে সে-সম্পর্কে কাটছাঁট করার মত একটা গুজবও না শুনে কী করে এগনো যায়। যোগেনের কি বুদ্ধিবিভ্রাট হল। সে এই দুই ঢ্যাংড়া-মাঝির কথায় কী করে রাজি হল যে ওরাই পারবে এমন প্রলয়কাণ্ড সামলাতে? যোগেনের স্বাভাবিক বিবেচনা কি এখন জব্দ থাকল?
নিজেকেই ধমকে ওঠে যোগেন, ‘হে–ই শানু, না-জাইন্যা নাও ভাইসাস না। না-চিনলে নৌকা ভিড়্যা। যেহানে হয় সেহানে।’
‘তাই যদি হয় ভিড়ানের কাম নাওই কয়েক। একডা ছোড় বাদাম আনার কাম ছিল। টাঙ্গাইলে দেইখতেন দুইদিনের পথ একদিনে পাড়াইতেন। এমন স্রোত আর এমন হাওয়া।’
‘তুই যাবি কোন্ দিয়্যা সেইডা ভাইঙ্গ্যা বল্।’
‘গোটা থাইকলে তো ভাইঙ্গব। পুরানা নদীগুল্যান তো নতুন হইয়্যা গেল গা? লঞ্চ কোম্পানির রুটের নাম বদলাইব্যার লাগব। পুরানা রুট নাই।’
যোগেন হঠাৎ ভেবে বসে, জলখ্যাপা খেইল নাকি শানু। এত বিপরীত জল দেখতে-দেখতে ভুল দেখতে শুরু করেছে—পুরনো নদীপথটাই ভুলে যাচ্ছে? তারা তো আড়িয়াল খাঁ এখনো পেরয়নি। এখনো তো বাঁ-পাড় ঘেঁষে যাচ্ছে। এখনো তো নৌকা বাঁ-পাড়ে ভিড়ানো যায়। যোগেন ধমকেই ওঠে, ‘শা—নু, আগে চক্ষু মুইদ্যা থাক, শানু, চক্ষু মুইদ্যা থাক।’
‘হাল ধইর্যা না ছাইড়্যা?’
‘হাল দে ছোটমাঝিরে’—ছোটমাঝি লাফিয়ে গলুইয়ে যায়। যোগেনের বগল থেকে হালটা নিজের বগলে টানে। দেখে, হালের হাতা তার মাথার ওপর। সে হাতটা নামিয়ে টেনে বগলে ভরে। দেখে, সামনে স্রোতের বিস্তার, জলের রং ছাই-ছাই, জলের ওপরে কোনো ছাদ নাই, জলের পাড়ে কোনো গাছপালা নাই। শুধু জল আর স্রোত আর ছোটমাঝি আর হাল। ছোটমাঝি নিজেকে আবিষ্কার করে—সেযেন জলের ঠাকুর, যেন জল তাকে পথ করে দিচ্ছে, কোথাও একটু উঁচুনিচু নেই।
শানু দু-পা এগিয়ে এসে চেঁচায়, ‘মালেক, আমি কি এইহানে চক্ষু মুইদ্যা খাড়াইয়্যা থাকুম?’
‘বইস্যা পড়। চক্ষু য্যান মুইদ্যান থাকে।’ শানু ধপ করে বসে পড়ে এমন যেন হোঁচট খেল।
‘শানু, চক্ষু মুইদ্যা এইবার ক তুই অ্যাহন নাও চালাস কোন্ জলে?’
গলুইয়ের তক্তা থেকে শানু চিৎকার করে, ‘আড়াইল খাঁর প্রথম ঘেরই তো প্যারাই নাই। চোখ বন্ধ করে কথা বলতে হচ্ছে বলে শানুর গলা চড়ে গেছে যেন চোখের অভাব সে গলা দিয়ে মেটাচ্ছে। শানু আর যোগেন বসে আছে একই দিকে মুখ করে—স্রোতের দিকে। তাদের কথা তাই একমুখেই ছোটে—স্রোতের মুখে। যোগেন চিৎকার করে উঠে, ‘আড়িয়াল খাঁত পইড়্যা কি পার দিব্যা মুল্যাদি সদরে?’
‘না—আ। আড়িয়ালের এই পাড় ধইরা উজানে যাইব কিনার ধইরা—ধইর্যা।’
‘ঐ হানে বাও বেশি নাই, জল বেশি নাই, ঢেউ বেশি নাই—জাইনল্যা কহন?
‘জানি না। নদী উথাল থাইকলে কিনারায় নৌকা ভিড়াইয়া রাইখব।’
‘রাইখলে কি তোমার নাওয়ে পাখা গজাইব?’
‘এইহানে ভাইস্যা ঐ নদীর কথা কহা যায়?’
‘সে তো যাইয়্যা যদি রসাতল দেহো, তো রসাতলেই যাইবা?’
‘নাও কয় কারে?’
‘ভাসান দিবার পারে।’
‘ভাসান দ্যায় কনে?’
‘জলে, জলে।’
‘জল যদি যায় রসাতল?’
‘ভাসানও যায় রসাতল?’
‘আর যদি দ্যাহো—হুলুস্থুল প্রলয়—’
‘তালি ছোটমাঝিক জিগ্যাব—যাবি কি যাবি না?’
‘ছোটমাঝি চাহে তো যাবা?’
‘তাইলে তো না-যাওয়ার উপায় নাই শানু শেখের।
‘বে-শ। আড়িয়াল খাঁ উজানে পার হইল্যা, তারপর?’
‘ঐ হানে তো একডা এক-পাইক্যা দড়ির নাগাল জোলা ছিল’।
‘সে জোলা অ্যাহনো থাকব, তার বিশ্বাস কী?’
‘জোলা না-হয় খালো হবে, শুখা তো হবে না।’
‘তার বাদে নয়াভাংগানি দিয়্যা নাইমব্যা?’
‘নয়াভাংগানি পুরানা থাইকলে নাইমব। নয়াভাংগানি আরো নয়া হইলে নাইমব না।’
‘নাইমবা না তো য্যাবা কই?’
‘অতডা যাইয়্যাও কি আপনার পাড়ে নামা লাইগব না? ঐটুকখান চলেন তো।’
‘চ―লো।’
‘তাইলে কি অ্যাহন খাড়াইব্যার পারি?’
‘খাড়াও।’
শানু শেখ দাঁড়ায়।
‘তাইলে কি চক্ষুডা খুইলব্যার পারি?’
‘খুলো।’
‘তাইলে কি হালডা বগলে পুরব্যার পারি?’
‘পোরো।’
যে-রুট এই কথোপকথন থেকে তৈরি হল, সেই রুটেই নৌকা চলল। খুব শান্ত জলের নদীতে ছোটমাঝিরা হাল ধরেছে, বৈঠাও টেনেছে। যোগেন কোথাও ঘুমিয়েছে, কোথাও বসে থেকেছে। যোগেন আর শানু শেখ দু-জনই একটা কৌশলই খাটাচ্ছিল মনে-মনে। এই প্রলয়ের ফলে কী কী বদল ঘটতে পারে, তার আন্দাজি হিশেব তারা কষেনি। পুরনো চেনা নদীপথ দিয়ে তারা দক্ষিণপুর দিয়ে নামাছিল। সেই নামার পথে একটু ঘুরান পড়লেও তারা এড়াচ্ছিল আড়িয়াল খাঁ ও লতানদীর মত বড় ও প্যাঁচ খাওয়া নদীপথ। বরিশালের নদী অন্যসব নদী থেকে আলাদা। গবর্মেন্টের এক মিটিঙের সুবাদে যোগেন দার্জিলিঙে যাওয়ার পথে আবিষ্কার করেছিল, পাহাড়ের ঝর্ণানদীগুলো বরিশালের নদীর মত, কে কার সঙ্গে মিলছে আর কার সঙ্গে ছুটছে তার কোনো হিশেব রাখা যায় না। বরিশালের কোন্ নদীর জল কোন্ নদী দিয়ে ঢুকছে তার কোনো মেইল লাইন নেই।
ঠিক কদ্দূর ও কোথায় যোগেন যেতে চাইছে, তাও তো তার কাছে পরিষ্কার ছিল না। কিছু শব্দ বাতাসে শোনা ছাড়া। দক্ষিণ শাহাবাজপুর তার তেঁতুলিয়া যদি দৌলতখানি আর ভোলার ওপর দিয়ে বয়ে গিয়ে থাকে, তাহলে মেহেন্দিগঞ্জের কাছাকাছি যেতে পারলেই হত। কিন্তু গয়াভাংগানি নদী পেরিয়ে লতানদীতে তারা ঢোকার সাহসই পেল না। যোগেন বলে, ‘শানু শেখ, এতডা রাস্তা যখন ভগবানের দোয়ায় পার হওয়্যা গেল, কোনো বিপদ যহন ঘটে নাই, তহন আর আগাই না। লতা পার হইয়ো না। তুমি ভাসানচরে নৌকা ভিড়াও।
আর এতেই যোগেনের চোখের সামনে আক্রান্ত জায়গাটির ছবি ভেসে উঠল। পুবে দক্ষিণ শাহাবাদপুর আর পশ্চিমে তেঁতুলিয়া নদী থেকে কিছু দোনা, কিছু নদী বা খাল দুদিকেই ছড়ানো ভোলার উত্তরে মেহেন্দিগঞ্জ। মেহেন্দিগঞ্জের গা ঘেঁষে গণেপুরা দোং। গণেশপুরা মেহেন্দিগঞ্জের আকাশ থেকে এই হাওয়া নীচে নেমে উত্তর-ভোলা থেকে দৌলত খাঁ উখড়িয়ে দিয়েছে, এবং সম্ভবত মেহেন্দিগঞ্জও খানিকটা খেয়েছে।
যোগেন যে সেই জায়গা পর্যন্ত পৌঁছুতে পেরেছে যে-জায়গা থেকে ঠিকঠাক আন্দাজটা অন্তত করা যায় এটাকে আজকের পক্ষে যথেষ্ট ধরা উচিত। এখন আর না-জেনে এগনো উচিত নয়।
ভাসানচর বড় জায়গা না। একটা বড় হাট বসে। সুপুরি হাট। থানা বা আউট পোস্টও একটা থাকার কথা। আবছা মনে পড়ছে—একটা যেন ডাকবাংলোও থাকার কথা। সে থাক-বা-না-থাক, নদী দিয়ে ঘেরা, প্রায় সব নদী দিয়েই লঞ্চ সার্ভিস আছে। ভাসানচরে এক রাত্রি মাথাগোঁজার জায়গা নিশ্চয়ই পাওয়া যাবে। কিন্তু পুরো ঘটনার একটা প্রামাণিক বিবরণ তৈরি করা যাবে।
ভাসানচরের লঞ্চঘাটাতে নৌকো ভেড়ানো হল।
লঞ্চঘাটের টিকিটঘরের পাশে লম্বা একটা বাঁধানো জায়গায় দু-একজন জলের দিকে তাকিয়ে বসেছিল। সম্ভবত ওখানে এই হাওয়া থেকে একটু আড়াল পাওয়া যাচ্ছিল। সুপুরি চাষ ও সুপুরি ব্যবসার খুব রমরমা। তাই লঞ্চ সার্ভিস বেশি আর অনেক জায়গাতেই লঞ্চঘাটায় বাঁধানো ও ঢাকা এমন একটা ফালি থাকে, যাতে আচমকা বৃষ্টিতে সুপুরি নষ্ট না-হয়। পরের লঞ্চে যা চালান যাবে—ঢাকা, নোয়াখালি, সিরাজগঞ্জ, খুলনা সবদিকেই—সবদিকেই সেগুলোই এই শেডে থাকে। যারা ঘাটে বসেছিল তাদের মধ্যে দু-জন যোগেনকে নৌকো থেকে নামতে দেখে এগিয়ে গিয়ে আদাব করে দাঁড়ায়। যোগেন মাঝিদের দেখিয়ে দেয়—ওদের জন্য কোনো ব্যবস্থার অনুরোধ করে।
পাড়ে উঠে যোগেন এদিকওদিক তাকায়। চেনাজানা কাউকে খোঁজে। এদিককার সুপুরির বড় ব্যবসায়ীর নাম দুদু মিঞা। ভোটে যোগেনের পক্ষে খুব খেটেছিলেন বলে শুনেছে যোগেন টাকাও খরচ করেছেন। যোগেন কিছুতেই মনে করতে পারে না, তাঁর বাড়ি ভাসানচরে নাকী চাঁদপুরে। চাঁদপুরেই যদি হয়, তাহলে এখন আর কিছু করার নেই। চাঁদপুর তো মেহেন্দিগঞ্জে, গণেশপুরা দোনের ওপরে। আছে না ভেসেছে কে জানে। কিন্তু ভাসানচরই-বা কয় বিঘে জায়গা যে যোগেন এসেছে দেখেও একজনও মাতবর এগিয়ে আসে না। কাউকে দেখাও তো যাচ্ছে না।
যে-লোকটিকে যোগেন ওদের তিনজনের ব্যবস্থা করতে বলল, সে তখনো বেশিদূর যায়নি। তাকে ডাকার জন্য মুখ খুলতেই দেখে শানু শেখ উঠে এল, ‘এ–ই শানু, শুন্।’
শানু দৌড়ে আসে।
‘ভাসানচরে দুদু মিয়ার বাড়ি না?’
‘কাছা-দেয়া, দাড়িমোচ কামান? সুপুরির বড় ব্যাপারী বাবু?’
‘কইল্যাম মিয়া আর কস বাবু!’
‘হ। মিয়াই তো। বাবুগ নাগান সাজে তো। ধুতি পরে। জবাকুসুম তৈল মাখে। পাতলা পাঞ্জাবি পরে। এদিকে নামাজ আদায়ের টাইম হইলে লঞ্চের সিঁড়ির মাঝখানে কাছা খুইল্যা হাঁটু গাইড়া পশ্চিম দিগ খোঁজে। আরে ত বাবুই ডাকে সবাই।’
‘তার তো এডডু তালাশ লাগাইতে হয়। সে কি এহানে থাহে না চাঁদপুরে?’
‘কী যে কন? আপনার নাগান বড় মানুষরা কি এক জায়গায় থাহে? আইজ একডা দিনের মইধ্যে আপনে কতগুল্যা জায়গায় থাগলেন? দুদু মিয়ারে পাওয়া যাব না? খাড়ান—’
শানু শেখ যোগেনকে একা করে দিয়ে টিকিটঘরের আড়ালের দিকে ছুটে যায়। ওদিকেই তাহলে বসতি, এদিকটা কী? শানু একেবারে দুদু মিয়াকে পেছন থেকে যেন ঠেলতে ঠেলতে নিয়ে আসে। দুদু মিয়ার পরনে লুঙ্গি আর ফতুয়া। দূর থেকেই আদাব করতে-করতে দুদু মিয়া খোলা হাসি হেসে বলে, ‘বহিনপতি কি দাওয়াত রাখার টাইম পাইলেন না—এই দুর্যোগ ছাড়া?’
‘আপনারা হাসি শুইন্যা তো মনে লয় না দুৰ্যোগ—’
‘হয় নাই তো দুর্যোগ। দুর্যোগ তো দেহা যায়। সেইসব কারবার নাই। এক্কেরে ধুয়ামুছ্যা দিছে বেবাক। খুঁইজ্যা যে কইবেন, এই হানে না মেহেন্দিগঞ্জ ছিল? যা ছিল, তার আর কিছু নাই। দৌলত খাঁর দক্ষিণে বোরহানউদ্দিন থিক্যা চরফ্যাসান পর্যন্ত কী ছিল আর কী ছিল না—কোনো সাবুদ নাই। আপনে এই বিপদের মইধ্যে কোথিক্যা?’
‘তাইলে আসি অ্যাহন। হাওয়া তো আমার গ্রামেরও চাল উড়াইছে। সেই হাওয়ার মুখেই শুইনলাম ভোলাদৌলতখান-দক্ষিণ সাহাবাজপুর-তেঁতুলিয়ার কথা। এডা তো আমার ভোটের আসনের মইধ্যে। এডা তো আমার কর্তব্য। দেইখল্যাম তো আপনাগ কুশল। তাইলে যাই—’
দুদু মিয়া জড়িয়ে ধরে যোগেনকে, একেবারে জড়িয়ে ধরে। দুদু মিয়া যোগেনের চাইতে মাথায় উঁচু—তাকে ঘাড় নোয়াতে হয়, যোগেনের ডান কাঁধের গর্তে নিজের মুখ ডোবাতে। যোগেনের ঠোঁট থেকে হাসি মুছে যায়। সে দুদু মিয়ার পিঠে হাত দিয়ে বলে, ‘মাতবর, এই বিপদের কালে আপনার চোখের জল দেইখলে অন্য মাজুক্ষণ বুকের বল কইম্যা যায়।’
দুদু মিয়া তার চোখের জলে ভেজা মুখ তুলে আরো কেঁদে ওঠে, জোরে, কান্নার বেগে তার গলা আরো চড়ে যায়। যারা জুটেছিল তাদের ঘিরে, তারাও একসঙ্গে কেঁদে ওঠে। এই দুর্যোগের হাওয়ার আওয়াজ আর স্রোতের ধ্বনির বিপরীতে মানুষের সমবেত কান্না ছড়িয়ে পড়ল।
দুদু মিয়া বুক চাপড়ে বলছিল—’কান্দি নাই তো মোড়ল, তিনদিন ধইর্যা কাঁদি নাই। তহন তো মাতবরি কইর্যা যে-কয়ডা মানুষরে আর বলদরে বাঁচান যায় তাই করছি। কিন্তু অ্যাহন তো আপনে আমার মণ্ডল আইস্যা খাড়াইলেন! এই দুর্যোগ মাথায় কইর্যা এই ছাওয়াল-পাওয়াল-মাঝিগ নিয়্যা এই সমুদ্দুর পাড়ি দিয়্যা আমাগ পাশে খাড়াইব্যার জন্য আইলেন। এও হয়? আপনার মত মানুষ আমাগ নেতা—কত জন্মের ভাগ্য আমাগ, কত জন্মের ভাগ্য।’
