১২০. দুর্যোগসহ সকাল
খালপাড়ে পৌঁছুতে-পৌঁছুতেই যোগেনের কানে যা খবর আসে তাতেই সে বুঝে যায়, সারা রাতের হাওয়া এমনি হয়নি, কিছু একটা ঘটেছে। কিন্তু খালে নামতে নামতেও আন্দাজ পায় না—কী হল, কদ্দুর হল। এটা জানাই সবচেয়ে দরকারি। বরিশালের দুর্যোগ কখনো ডোবার জলে কুমির ভেসে আসা কখনো এই ভূখণ্ডটারই একটু গড়ানো বা এগনো বা পেছনো।
কোনো বড় গাছ পড়ে রাস্তা বা খাল আটকে দিয়েছে বা ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছে কয়েকটা ঘর—এমন চোখে না পড়ায় যোগেনের সন্দেহ হয়, তাহলে ওপর দিয়েই যাচ্ছে হাওয়া, মাটিতে নামেনি? কিন্তু হাওয়ার পরিমাণ কত যে সারা রাতেও শেষ হয়নি, এখনো চলছে তো বটেই বরং বেশি জোরেই চলছে, কিন্তু দিনের আলো, মানুষজনের গলার স্বর আর কখনো-সখনো বাজকুড়ুল পাখির ডাকে হাওয়াটা খেয়ালে থাকছে না।
কীর্তনখোলা বেয়ে অর্ধেকটা ধান পাঁজা আর বাকি অর্ধেকটায় মানুষ পাঁজা হয়ে গোল নৌকাটাকে দেখেই ঘাটের মানুষজন একেবারে চুপ করে যায়। এতটা হাওয়া সত্ত্বেও এইসব মানুষের শ্বাসগ্রহণের আওয়াজ পাওয়া যেতে পারত। যতক্ষণ পেরেছে পাকা-আধপাকা-কাঁচা ধানগুলি কেটে নৌকায় পাঁজা করেই নৌকা ছেড়েছে। এতটা ধান একদিনে কাটা যায় না। মানে, ধানকাটা শুরু হয়েছিল, শেষ হল না। পাকা টসটসা ধান—কাটা গেল না। এর চাইতে কোনো সর্বনাশই বড় না। একজন ডুকরে কেঁদে ওঠে। কে, কেউ ঘাড় ঘুরিয়েও দেখে না, কে। এই সমষ্টির ভিতরেও গভীর এক ঈর্ষা বা আশা বাতাসের ধাক্কায় এলোমেলো হয়ে যাচ্ছিল—ঐ নৌকোটা তো এল নাজিবপুরের দিক থেকে, মানে, হতেও তো পারে যে হাওয়া-বানা যাই এসে থাক, এসেছে নাজিবপুরের মাথার বাঁধ ভেঙে। তাতে কারো কোনো বিশেষ সান্ত্বনা জোটার কথা নয়, এক এই অতি ক্ষণস্থায়ী সান্ত্বনা ছাড়া যে তার নাজিবপুরের পশ্চিম চরের জমির ধান রক্ষা পেয়ে গেছে। কিন্তু এ নৌকোটা মৈস্তারকান্দির দিকে ঘোরেই না—সোজা আরো উত্তরে চলে যায়। খালের ভিড় থেকে কেউ চেঁচান, ‘অ্যালেইন কোথথিক্যা?’ উত্তর এল, ‘আড়াল খার নগদ দিয়্যা—’
‘মাঝি হইছে, দিশ্যা দিব্যার শিখে নাই? নগদ দিয়্যা?’
‘অয় কি তোমার পোলার লগে মাইয়্যার সম্বন্ধ চায়? কথা জিগ্যাবার পার না নিজে। দোষ দ্যাও মাঝির। এ–ই যে মাঝিভাই, খাওয়ার মুখ কমে নাই তো? নয়া ভাঙ্গির হাটতল থিক্যা আইলেন তো?’
সেই নৌকো থেকে নতুন কোনো গলায় কেউ বলে ওঠে, ‘প্রাণহানি নাই। শস্যহানি। বেবাক। হয়, হাটতলের বাঁধ ভাইঙ্গ্যা নদী ঢুকছে।’
পাড়ের ভিড় থেকে কেউ নিজেদের মধ্যে বলে ওঠে, ‘হৈল তো জ্ঞাতিগুষ্ঠি হালসাকিন ঠিকঠিকানা! এইবার সম্বন্ধ করো।’
কিন্তু পাড়ের ভিড়ে তখন অন্য উদ্বেগ এসে গেছে, ‘হাওয়ায় কি বাঁধ ভাঙ্গে?’
‘অরা হাওয়ার কথা তো কয় নাই। কইছে, বাঁধ-ভাইঙ্গ্যা হাটতলে নদী ঢুইকছে। এর মইধ্যে হাওয়া প্যালি কই?’
‘আমরা তো কাইল থিক্যা হাওয়ায় কাইত। অগ ওহানে হাওয়া ঢুকে নাই?’
‘চুপ যা আহাম্মক। শুধু শুধু ঢোকাঢুকি, ঢোকাঢুকি। ওর যা খ্যামতা তাই ঢুক্যা—হাওয়া বা জল। তার বেশি তো আর মুরদ নাই—’
এইসব কথাবার্তার থেকে যোগেনের যা বোঝার বুঝে নেয়। এখানকার ভিড়টা শুধু জানতে চায় কাল সন্ধের মুখ থেকে যে-হাওয়া ক্রমেই উঠছে, তার সীমা কদ্দূর। কোথাও কি মানুষজন মারা গেছে। আরো কোনো বড় বিপর্যয়ের মুখে নাকি তারা, নাকি ল্যাজে? এটুকু আন্দাজ করলেই এদের চলে যাবে।
কিন্তু এখনো তো ঘটনাটিই জানা গেল না। এরপর আরো জানা যাবে না। হাওয়ার যা ধরণ, তাতে তো এ-বেলা কমবে মনে হচ্ছে না। যে-হাওয়ার সঙ্গে সমুদ্রের সম্বন্ধ, সে-হাওয়া তো সন্ধ্যার দিকে বাড়ে। এক, এখনি যদি বেরিয়ে যাওয়া যায় খালপথে। পৌঁছুনো নাও হতে পারে কিন্তু এগিয়ে গেলেই খবর জানা যাবে। বরিশালের প্রাকৃতিক দুর্যোগ পশ্চিমে দক্ষিণে শুরু হয় না, বিপদ আসে দক্ষিণ আর পুব থেকে।
মৈস্তারকান্দির ঘাটে বসে-বসে লোকজনের কথাবার্তা থেকে, সামনের খালের জল থেকে ও হাওয়ার শিস শুনে শুনে, যোগেনের একটু ঝিমও ধরে, সারারাতই তো জেগে কেটেছে।
সেই ঝিমের মধ্যে যোগেন একবার ভাবতে পারে—ঘরে গিয়া ঘুমাই।
সেই ঝিমের মধ্যে যোগেন যেন দেখতে পায়—তাদের কোনো ভিটেতে কোনো ঘর নেই, হাওয়ায় সব উড়ে গেছে। তবে যে কাল পুরোটা রাত জেগে দক্ষিণভিটার আড়কানছির দড়ি বদলাইল। ছোট খুড়ার দেহে এখনো ডাকাইতের শক্তি।
যোগেনের ঝিমুনি কেটে যায়। সে আবার চারদিকের মানুষজনের গলা, হাওয়ার শিস শুনতে পায় ও খালের জল দেখতে পায়।
কিন্তু আবার ঝিমিয়ে পড়ে।
যদি মৈস্তারকান্দিতে থাইক্যাই যায়, এই দুর্যোগটা, বা, না-হয় আইজ রাইতটা, তাইলে ও তো শুয়াবসার কোনো জায়গা মিলব না, যদি ঠিক অ্যাহনকার অবস্থা থাকে, তাও মিলব না, যদি বৃষ্টি ঝইরব্যার ধরে তাইলে গাছতলা-দুয়ার তো গেল, যদি ঘরের চাল উইড়া যায় বা মুখ থুবড়া পড়ে, তাইলে তো এই দুর্যোগে খসা বটপাতার মতন হাওয়ায় আর জলে পাক খাইতে হইব। আর, কুথাকারও কুনো খবর পাওয়া নাই। দ্বীপান্তর।
যোগেন আবার ঝিমুনি কাটিয়ে মাথা সোজা করে। মাথা খাড়া রেখেই সে ঝিমুনির সময় যা ভাবছিল, তার খেই ধরেই ভাবনা চলে যেন ভিতরের মাথার ঝিমুনি এখনো কাটেনি।
বাড়ির লোকগুল্যার তো সেই দুরবস্থাই হইব।
হইলে, অগর যা ব্যবস্থা অরাই কইরব। পাড়ায় যে দুডা-একডা ঘর খাড়া, সেইখানেই হয়ত সিদ্ধাবে। এদিকওদিকের শক্ত, পাকাঘরে যাইতে পারে। রায়মশায়ের একতলাখনে খুইল্যা দিব্যার পারে। যোগেনের থাকা-না-থাকায় সে-ব্যবস্থার কোনো উনিশ-বিশ ঘইটব না। কিন্তু যোগেনের তো নির্বাসন হইয়্যা যাইব গ্যা। কেউ জানেই না, সে কোথায়। সেও জানে না দ্যাশের হাল কী। এহানে বাড়ির মগলের লগে ভাগাভাগি কইরব্যার মত তো গোটা কিছুই নাই। বারাইতে হইলে তো অ্যাহনই বারাইবার লাগে।
আবারও যোগেন গা-ঝাড়া দিয়ে বসে। ঘাড়টা তার এতই নুয়ে গিয়েছিল, তার বুকের ওপর যে তারপরে গায়ে ঝাড়া একটা ওঠারই কথা। মাথার ঝিমুনি খোলসা হয় না। যোগেন যেন সামনের দিনগুলো দেখতে পায়—মৈস্তারকান্দিতে সব ঠিকঠাক, কুনো দুর্যোগও নাই, সুযোগও নাই, রৌদ্রও নাই, মেঘও নাই, বৃষ্টিও নাই। শুধু আছে—মৈস্তারকান্দির আকাশ দিয়া এক আলগা বাওয়ের স্রোত, ঢেউ তুলে, ঢেউ ভেঙে, আর বায়ুর মিনার গড়ে তুলে, সেটাকে ঝিরঝিরিয়ে মুছে দেয়া। কতকগুলি পাড়ার কতকগুলি বাড়িতে কোনো চালা বা বেড়া নেই। তাদের ঘর ও বাহিরের তাবত তফাত ভেঙে গেছে। গ্রামের রাস্তায় রাস্তায় এগ দেখা যায়—কোলকাঁখে ছেলেপুলে লৈয়া ঘুইরা বেড়ায়।
গা-ঝাড়া দিয়ে যোগেন দাঁড়ায়। যোগেন মৈস্তারকান্দি ছাইড়ব। অ্যাহনই ছাইড়ব। এরপর আর সময় পাওয়া যাবেনি। কিন্তু তার আগে তো মৈস্তারকান্দির একডা বেত্তস্থা কইরতে যোয়। যোগেন মৈস্তারকান্দির ঘাট থেকে, খালি গায়ে-খালি পায়ে মৈস্তারকান্দির ভদ্দরলোকের পাড়ার দিকে হাঁটা দেয়। পথের দুই ধারে ভক্তজনদের অনেক বাড়িঘর আছে, ইট দেয়ালের বাড়ি, বড়সড় বারান্দা। ছাদের বাড়ি, টিনের উঁচু চালার বাড়ি—কোনো বাড়ি ফাঁকা, লোক থাকে দুই-চারজন, কোনোবাড়িতে দেবদেবতা আছে। সকাল সন্ধে পুরুতের ঘণ্টা বাজে। বড়সড় বারান্দা—তাদের পুজো গাঁয়ের লোক এঁটে যাবে। এখানে মাথার ওপর ছাদ আর তারা পড়ে থাকবে খোলা। যোগেনের একবার মনে হয়েছিল, লোকজনকে সঙ্গে নিয়ে ঢুকিয়ে দিলেই হত। কিন্তু তেমন করতে তার মন চায় না। একবার ভাবে শেখশাহেবের মনদিলে যায়। উনি আপত্তি করবেন না। কিন্তু ওদের আবার পর্দাপর্দি মেলা। যে-কোনো বারান্দাতেই তাদের গ্রামের লোকজন এঁটে যায়। যোগেন এদের কথা ভেবে পথে নামে। সে সোজা ডাইনে মোড় নিয়ে জোলা পার হয়ে প্রায় দৌড়তে-দৌড়তেই রায়বাড়ির দিকে ছোটে আর পাশের সেই খিড়কি দিয়ে ‘সম্নমামি’, ‘সন্নমামি’, বলে এগিয়ে সিঁড়ির গোড়ায় দাঁড়িয়ে পড়ে।
ওপর থেকে সন্নমামির পাতলা, উঁচু, মিষ্টিগলা শোনা যায়, ‘কার গলা রে? আসি, খাড়াও নিমাই।’
সন্নমামি রেলিং দিয়ে তাকিয়ে বলে ওঠে, ‘যোগা আইছ, খাড়া’–
যোগেন তার একহাত তুলে বলে, ‘খাড়ব না। তুমিও নাইম না। চারিদিকে ভীষণ। আমাগ পাড়ার বোবক ঘরের চাল উইড়্যা গিছে। সন্ধ্যার আগে বিপদ না কইমলে, তোমাগ বাইরের দাওয়ায় রাতডা কাডাইতে আইসব। আড়য়্যা দিয়ো না। শুধু বারান্দায়-
স্বপ্ন, সবটা কথা মন দিয়ে শুনে, ‘বাবা যোগা, এডডু খাড়া’, বলে বেলিং সরে গেল। মানে, সন্নমামি তার মুখে কিছু না ঢুকিয়ে ছাড়বে না, বা, পাড়ার খবর আরো খানিকটা শুনবে। যোগেন আবার চেঁচিয়ে ওঠে, ‘মামি—’। আর সিঁড়ির জালির ফাঁক দিয়ে দেখে সুন্দর একটা নক্সা গড়িয়ে নামছে।
নামল, বারান্দায়, হাতে কী সব পাঁজা করা। বারান্দার সিঁড়ি বেয়ে সন্নমামি যোগেনের সামনে এসে গামছা মত কিছু দিয়ে যোগার মাথা-গা মুছিয়ে দেয়।
‘আরে, আবার তো ভিজব, মুছ্যাও ক্যা?’
‘এগ বাড়ি আইলে জামা পইর্যা চুল আঁইচারায় বাবু সাজা আইসো যোগা। তুমি আমাগ একডা যোগা। তোর সম্মানে তো আমরা মান পাই’, বলতে-বলতে সনু একটু নতুন জামার গলা খুলে যোগার গলায় গলিয়ে দেয়, তারপর, যোগার হাতদুটো দুই হাতে ঢুকিয়ে দিয়ে ঝুলটা সামনেটা টেনেটুনে দিয়ে হেসে উঠে, ‘দ্যাহ তো আমার যোগারে কেমন জজ-ম্যাজিস্টেটের মত লাগে। সন্ন আবার সেই সুন্দর হাসি হাসে। ‘তাও তো পুরানা। বড় খোকার আলমারিতে ছিল। আর, বড় খোকাও তো কইল, গাঁয়ের মানুষ জলে ভাইসর আর তোমাগ বড় বড় এই সব ঘরে কি ঢপের কেওন হব? সবাইরে আইসতে কও। খাওয়াইতে তো পারবা না। রাঁধত কেডা। তো কইল্যাম—অরা নিজেরাই কইরব। অত কইব্য ভাবব্যার কাম নাই বড়খোকা। গ্রামের মানুষ। বিপদে পইড়্যা আশ্রয় নিছে—এর বেশি কিছু করার দরকার নাই। কত্তা তো নাই। বুঝলি তো কথাডা। তুই জান্যাইয়া দিস যোগা।’
যোগেন সামান্য একটু দাঁড়িয়ে একটু বুঝে নিয়ে বলে, ‘শুনো, সন্নমামি, আমারে তো পাবা না। আমি আজই ঢইল্যা যামু। আমি দুই-একজন অতিবিশ্বাসীদের কয়্যা যাব—বিপদ যদি বুঝো বাঁচার অতীত, তয়, বেবাক নিয়া রায়বাড়ির বারান্দায় উঠো চুপেচাপে। রাইতে তুমিও য্যান স্বজনবন্দনা ধইরো না। সগালে অবস্থা বুঝ্যা যা করার কইরো। বড় খোকাবাবুরে দিয়্যা করাইয়া নিয়ো। কর্তা থাইকলে তুমিই যথেষ্ট। মালকিন। সন্নামা ভুল কইরো না—মালকিনের চাকরি কদ্দিন। মালিক রাখে যতদিন। তোমারে নিয়্যাও তো আমাগ গর্ব একডা। সেইড্যা য্যান ভাঙ্গা মাটির ভাঁড় না হয়।’ যত বড় বামনই হও, শুদ্দুরনির চরণামৃতও লাগে, উদ্ধারের জন্য।’
‘ছি ছি রে বাপ, আমি তো শুদ্দুরেরও শুদ্দুর। আমার পাপ য্যান আমার জাইতের গায়ে না লাগে। আমারে ছোঁয়ার পাপও যেন কর্তার গায়ে না লাগে।
রায়বাড়ি থেকে বেরতে-বেরতেই যেন স্থির হয়ে যায়—যোগেন বরিশালের দিকে এখনই বেরবে, যদ্দুর যাওয়া যায়, কিন্তু মৈস্তারকান্দিতে আটকে পড়ে যাওয়া ভুল হবে।
গ্রামের লোক, দরকারে, রায়বাড়ির বারবাড়ি। ব্যবস্থা হয়ে আছে। কথাটা বলে যাবে যোগামাকে, আর সাইফুলকে। কানাইকেও। ওকে একটু পরীক্ষাও করতে হয়। হঠাৎ যোগেনের মাথায় খেলে তার ছোট বোন শাদির কথা। শাদিদের এখনই কোনো বেশি বিপদ না হওয়ার কথা। কোথা দিয়ে যে কী হচ্ছে বোঝা যাচ্ছে না তো। যোগেন ঘুরে গিয়ে উলটোপথে হাঁটতে থাকে। ভাল কথা মনে পড়েছে। শদি আর জামাইকে দায়দায়িত্ব দিলে সবদিক ঠিক থাকব। সন্নমামির দিকটাই। বাবাকেও দেখতে পারবে।
ঝামেলা বাড়িয়ে কাজ কী। বিপৎকালে? সে যখন এখনই বেরুচ্ছে—তার সঙ্গে নিয়ে বৌ-ছেলেকে শ্বশুরবাড়িতে জমা করে যাবে। বাবাকেও বাবার যে একটু দেখাশোনা, তা ধৌই করতে পারবে। তাহলে এদিককার ঝামেলাও হালকা হবে।
শারদি তো দাদাকে দেখে এমন নেচে ওঠে যেন বাড়িতে উৎসব লাগল। শারদি দাদার জামায় হাত দিয়ে বলে, ‘দাদার দর কতটা বাইরছে?’
যোগেন দাওয়াতেই বসে পড়ে বলল, ‘সন্নমামি পর্যায়্যা দিল।’
‘সন্নমামির কাছে এই বিপদে, সাতকালে?’
‘তোর তো দেইখ্যা ঠাহর হয়, আর-একবার বিয়্যা বইসব্যার নাচন ধরছিস। শুন। সন্নমামির কাছে গিছিলাম এই ব্যবস্থার লগে আইজ সন্ধ্যার মুখে যদি বিপদ আরো বাড়ে, গাছ পড়ে, বন্যা আসে, ঘরের চাল উইড়্যা-পইড়া যায়—তাইলে গ্রামের লোক গিয়্যা রায়বাড়ির বারবাড়িতে উইঠব। সন্নমামি বড়খোকাবাবুর অনুমতি নিয়্যা কইছে, হ্যাঁ।’
শারদি প্রশ্ন করে, ‘ক্যা?’ কত্তা কই?’
‘কত্তা এহন এই হানে নাই। তাই বড়খোকাবাবুর লগে মামি জিগ্যাইয়া রাইখল—’
শারদি ঠোঁট মুচড়ে বলে, ‘গোবধে খুড়া কত্তা।’
যোগেন রেগে ওঠে, ‘এইডা তোর খারাপ স্বভাব বড় শারদি কবে কার কী কথা। তহন অ্যামন হইত। আমাগ জাইতের একডা মাইয়া অত বড় ঘরের একডা বাঘা বামুনের ঘর যে জিইত্য লইল, তাতে তোর গর্ব হয় না। রায়কর্তার পোলারা তো সন্নমামিরে সন্নমা ডাকে।’
‘ডাউক গ্যা। শুনুক গ্যা। দাদা, অসতীরে কুনো মাইয়া মানুষ কুনোদিন ক্ষমা দিব্যার পারে না।’
যোগেন একটু চুপ করে থেকে বলে, ‘তরে আজ একডা দায়িত্বর কাম দিব্যার আসছি। কথার ভাবে বুঝি, ঘটনাডা যদি অ্যামন হয় যে সইন্ধ্যা কিংবা রাইতে বাড়িঘর উড়া যায়, গাছপালায় রাস্তা আটকা দেইখ্যা যদি নিজেগ থিক্যা গিয়া রায়বাড়ির বারান্দায় গিয়া ওঠে, তাইলে হয়ত বড়খোকাবাবু কী মামির সুবিদা। লোকে আইস্যা উঠছে—এক কথা। আমি কইছি উইঠব্যার-এ আর-এক কথা। আর আমাগ দুর্দশা তো জানিস। অ্যাহন যদি কই, তেমন বিপদে রায়বাড়ির বারান্দায় উইঠো, তালি তো অ্যাহন থিক্যা চট বিছাইয়া জায়গা দখল শুরু হবে নে।’
‘তুমি থাইকব্যা না? আইল্যা কবে? আজ যাবা ক্যামনে?’
‘তোর তো দেহি শারদি, ভাল বামনাই ধইরছে। অম্বুবাচীর সময় চার-কুড়ি সধবা বুড়ির দুঃখ উথল্যায়া ওঠে—আমি কেন বিধ্বা হইল্যাম না, তালি কত আম-কাঁঠাল খাইব্যার পার ত্যাম। কথা তুলছি কামের। অ্যাহন কাইন্দব্যার ধরছিস, দাদা আইজ যারা ক্যামনে? কামের কথা শোন্। পারবি কী না ক। তুই আইজ দুপরের পর মাস্তারকাইন্দ্যা চইল্যা যা, জামাইডারে নিয়্যা। গিয়্যা এগ কী দুর্দশা সেডা ক। কয়্যা থাক। বইস্যা থাক। জামাই এডডু বাইরে ঘুরাফিরা আরো কী সব শুইনল সেই কথা বিস্তারে বইলল। তুই এই কথাডা প্রথম ক—ঘরে থাইক্যা তো মইরব্যার পারি না, মাথার আগড় আর গায়ের বেড়া তো লাগে। প্রথমে কইস না কোথায় যাবি। পরে কইস। গিয়া রায়কর্তার বারান্দায় বস। তোর কথা বেবাক শুনব। মানব। সন্নমানি তোরে খুব ভালবাসে। স্যায় যদি রাত্তিরে নামে, কী সকালে নামে, তোরে পাইলে খোলামেলা হইবার পারব। খাওয়ানোর কথাও তুলছিল, যদি মাইয়্যারা রান্না কইর্যা নেয়। আমি ঐ সব কইরব্যার না করছি। তুই এইডা পাড়ি দে দিদি— জামাইয়ের বুদ্ধি নিস।’
সারদি সব কথা বুঝল, মেনে নিল ও দাদাকে আশ্বস্ত করল যে কাজটুকু সে যোগেনের ইচ্ছেমতই করতে পারবে। তবে, দুর্যোগ কী আকার নেয়, কী ব্যবস্থা নিতে হয়—এগুলো তো এখন থেকে ঠিক করে রাখা যায় না। দাদাকে নির্ভয় দিয়ে শারদি বলে, ‘তোমার মামিরে কুনো দায় চাপাইব না। নিজের সংসারের দায় যে নেয় না, তারে আর অ্যাহন শুদ্দুর-সংসারের দায় নিব্যার লাগব না। অন্য জায়গাতেও মাথার চাল জুইটবে। তুমি দাদা যাওয়ার সময় দেইখ্যা য্যাও, টুনি আছেনি। যদি থাহে তারে আমার লগে আইসতে কইরো।’
‘টুনি? এডা তো তুই জবর ভাবছিই। কিন্তু টুনির অ্যাহন এহানে থাহার তো কোনো সম্ভাবনা আছে বইল্যা পছন্দ হয় না। তুই এক কাজ কর। টুনির মতন আর-একজনের কথা ভাব, ভাব্ দেখবি প্যায়্যা যাবি নি। আমি যাই। আমারে তো রওনা দিব্যার লাইগব। অ্যাহন তাও কুনো মামি রাজি হইব্যারও পারে। এরপরে নাও পাব তো মাঝি পাব না—’
যোগেন উঠে দাঁড়ায় আর শারদি ভ্যাঁ করে কেঁদে ফেলে, চোখের জলও মোছে না, ঠোঁটও সোজা করে না। আবার ডুকারিয়েও ওঠে। যোগেন বলে ওঠে, ‘আরে, এতক্ষণ—না গিন্নিমার মত পা-ছড়াইয়া উপদেশ করলি আর অ্যাহন কাঁইদব্যার ধরলি?’ হইল-ডা কী তোর?’
ফোঁপানির মধ্যে শারদি তার কান্নার কারণ জানায়। ‘এই দুরুযোগ। আকাশও জানে না কহন কী হব। রাস্তাঘাট বেবাক বন্ধ। নৌকা-লঞ্চ বন্ধ। একডা পাখি উড়ে না, কুত্তা-বিড়ালও পথে বাহির হয় না আর দাদা বাইর্যায় ক্যা? বাইর্যাবার আগে সারা দুনিয়ার মানষির বিপদের ব্যবস্থা কইরা যায়। দাদা কি নিমাই সন্ন্যাস নিছে?
যোগেন ফাঁপরেই পড়ে। কী বোঝাবে শারাদিকে? সে কি বোঝার মন নিয়ে আছে? কিন্তু ‘নিমাই-সন্ন্যাস’ বলেই শিয়ালকে শারদি ভাঙা বেড়া দেখিয়ে ফেলল। যোগেন রাগ দেখায়, ‘তোর কাছে আসাডাই তো ভুল হইছে।’ দেখানো-রাগ থেকে যোগেন নিমাই-সন্ন্যাসের একটা গান ধরে, ‘আগে যদি জাইনত্যাম নিমাই—’।
শেষে আপোশ হয় যে যোগেন এখান থেকে খেয়ে যাবে।
