১১৮. দুর্যোগ শুরু
বাড়ি পৌঁছুতে-পৌঁছুতে যোগেন বুঝে ফেলে ব্যাপারটা এই-একটু বাতাস উঠল গোছের চাইতে একটু অন্যরকম। বৃষ্টি থাকলে অন্যরকম হত না। শুধু হাওয়া—যা হোক রাত কাটলে হয়ত আন্দাজ পাবে। ধুতিটা মালকোঁচা দিয়ে নিয়েছিল বলে একহাতে বোতল নিয়েও বাঁশের সাঁকোটা পেরতে অসুবিধে হল না। বোতলটা কোনো দড়ি দিয়ে ঝোলানো হয়নি। সেটাকে একহাতে তো লেপটে রাখতে হয়। বৃষ্টি ছিল না বলে সাঁকোর বাঁশ বা ধরানি পিছন ছিল না। তাদের এই টিলাটায় এতগুলো বাড়ি যে কোনো সময়ই সম্পূর্ণ জনহীন হয় না। গভীর রাতেও না। অনেকে বাইরে শোয়।
এটা একটা সাপের প্যাচের পথ। দুই পা ফেললেই বাঁক। ডাইনে ঘর, বাঁয়ে ঘর। ঠিক সীমানাটা বাড়ি নয়। যোগেন এগতে-এগতে হাঁকে, ‘কী রে রত্না, রাইতের মোতা সুইত্যা শুইছিসনি?’ কোনো ঘরের দরজা খোলা নেই, কোথাও কোনো আলোও নেই। থাকার কথাও না। যোগেনের বাড়িতে ল্যাম্ফ জ্বলে, যোগেন এলে। নইলে, সন্ধের পর আলো দরকার হয় না।
যোগেন আর-একটা হাঁক দেয়, ‘সাবি খুড়ি, খিচুড়িতে দুই কো রসুন দিয়ো।’
সাবি খুড়ি ঘরের ভিতর থেকে চৌকিদারি গলায় হেঁকে ওঠে, ‘তুই তো সিঁদকাঠি নিয়্যা বারালি, রসুন পালি না?’ সাবি খুড়ি তার গলা চিনতে পারেনি। পারবেই-বা কেন। সাবি খুড়ি কি জানে যোগেন এসেছে। সাবি খুড়ির ঘর পার হয়ে গিয়েছিল যোগেন, যেতে-যেতেই ঘাড় ঘুরিয়ে জবাব দেয়, ‘ওয় যে খুড়া কইল, থো তোর রসুন, সিঁদু কাইয্যা রসুন চুরি? চুরিরও তো মানমর্যাদা আছে।’ সাবি খুড়ি কোনো জবাব দিল না। হয় শুনতে পায়নি, নয় চিনতে পেরেছে— কথার ধাঁচে। নারকেল গাছটাকে বাঁহাতে রেখে যোগেন ডানহাতে নিজেদের দুয়ারে ঢুকে ডাকে, ‘যোগামা, অ যোগা মা, তোমরা কি নিশুত গেলা?’
তখন যদিও একটা ঝাঁপ ঠেলে যোগেন ঢুকে পড়তে পারে, একটা ঘরে, কিন্তু ঢুকেই বোঝে- বাতাসের কারণে সব একেবারে বিপর্যস্ত। তাকে বুঝে নিতে হয়, সে কাউকে জিজ্ঞাসা করে না। সন্ধ্যার মুখে, এই টাইমে রাত্রির ভাত নেমে যাওয়ার কথা। কিন্তু বাড়িতে কোথাও ভাতসেদ্ধর গন্ধ নেই। তখন তার মনে পড়ে, পাড়াতেও পায়নি। অথচ তখন খেয়াল হয়নি যে ভাতের গন্ধ পাচ্ছে না। এই বেলায় যদি এই হাওয়া ওঠে আর এতক্ষণ ধরে চলে, তাহলে আখা জ্বলবে কী করে? এমন অকাল হাওয়ার জন্য তো কেউ তৈরি ছিল না—ঘরের ভিতর একটা আখা খুঁড়ে রাখত। সেই আখাটাই এখন খোঁড়া হচ্ছে। ছোটখুড়া খোঁড়ে। কুপি জ্বালানো হয়নি। যোগেন হিশেবটা জানে—আখা খুঁড়ছে আগুনের জন্য, সে-আগুন তো আলোও দেবে, তাহলে এখন কেন কুপি জ্বেলে কেরসিন আর আলো দুটোই নষ্ট করবে?
যোগেন চাপা গলায় বলে, ‘ছোড়খুড়্যা, আমারে দ্যাও’।
‘হইয়া গিছে রে যোগা। তুই বরং বাইরে থিক্যা খটখটা নারকেলের পাতা-ডাল পাস কী না দ্যাখ।’
‘সেসব তো গুছান্ আছে। ছাওয়ালডা আইল আইজ অরে না-খাটাইয়্যা তোমার শান্তি নাই’, ছোট খুড়ির গলা। ঝাঁপটা ঠেলে যোগেন বেরিয়ে যায়। ছোট খুড়্যার ইশারা সে বুঝতে পেরেছে। দুয়ারের যে উত্তর মাথায় নৌকা-তৈরি-মেরামতির কাজ হয়, সেখানে শুকনো ডালপালা, কাঠছাঁটা, গোটা খড়িও পড়ে থাকতে পারে। বেশি খুড়ি দিয়ে আগুনটা বড় করে জ্বালালে ভাতটা তাড়াতাড়ি নামানো যাবে। কিন্তু কাঁচা আখা জ্বলবে তো?
বাইরের বা ঘরের ভিতরের অন্ধকারে যোগেনের আটকায়নি। কিন্তু এখন, শুকনো পাতা, কাঠের টুকরো কুড়োতে এসে সে উত্তর ভিটেয় ফাঁপরে পড়ে—খুঁজবে কী করে? যদিও প্রায় সঙ্গে-সঙ্গেই যোগেনের মনে আসে–ট্রেন থেকে নেমেই শিয়ালদা মার্কেট থেকে তিন ব্যাটারির একটা টর্চলাইট কিনবে, বরিশালে আসার সময় সঙ্গে রাখতে।
তবে এবার তো বটেই, এর আগেও, যেমন করে সে একটা ঘোরের মধ্যে বরিশালে আসে, তাতে আর টর্চটা আনা হবে কী করে? শ্বশুরের কাছে ধার করতে হল?
হাওয়ার বেগে ঠিক তখনই একটা মোচড়ানোর আওয়াজ উঠল 1
পাশের বাড়ির নারকেলগাছের একটা ডাল ভেঙে পড়ছে। কিন্তু ভেঙে পড়ছে এমন ছ্যাঁচড়ানো আওয়াজটা পেল না। তাহলে হয় পড়েনি। না-হয় হাওয়ার বেগে খালে গিয়ে পড়েছে। এখানকার কোনো মেয়ে-পুরুষ কোনো সময়ই এ-আওয়াজ ভুল করবে না। এখন এই সান্ধ্য ঝড়ে তো কিছুতেই না। হতে পারে, পড়ার আওয়াজটা ওঠেনি বলে কেউ ছুটে আসেনি, নারকেলগাছের মালিকও না। যোগেন সেই সুযোগ নিতে খালের দিক থেকে গাছতলায় পৌঁছে যাওয়ার আগেই খালের ঢালে ডালটা পেয়ে গেল। ঢালে পড়েছে বলেই আওয়াজ ওঠেনি।
যোগেনকে হাত দিয়ে আন্দাজ করতে হয়— ডালের গোড়া কোনদিকে। গোড়া ধরে টেনে নিয়ে যাওয়ার সুবিধে। কিন্তু গোড়াটা ঢালের আরো নীচের দিকে গড়িয়ে গেছে। ঢাল বেয়ে এতটা নামতে ভরসা পেল না যোগেন। তাই সে আগার পাতাগুলো একসঙ্গে জাপটে ডালটা টেনে নিতে শুরু করে বাড়ির দুয়ারে। দুয়ার তো এটাও, যোগেন একেবারে ঐ ঘরের মধ্যে বা ঝাঁপের সামনে নিয়ে ফেলতে চায়। ডালটা বেশ সরসরিয়েই আসে। যোগেন ভাবছিল, গোড়াটা তো মোটা, সেটা মাটির কোনো বাধায়, এমন কী গর্তেও ঠেকে যেতে পারে।
ছোট খুড়া তাকে কাষ্ঠসন্ধানে পাঠালে যেগেনের তিলমাত্র বিশ্বাস ছিল না যে আখার পক্ষে যথেষ্ট পরিমাণের কাঠ সেই অন্ধকারে সে খুঁজে পাবে। নিশ্চিত ব্যর্থতা সত্ত্বেও সে খুঁজছিল মন দিয়েই—যদি কাঠের চাঁই বা টুকরো পেয়ে যায়, এতগুলো মানুষের রান্না, অন্তত একহাঁড়ি ভাত তো সারা যাবে বা নামানো যাবে। হাওয়াটা এত আচমকা উঠল, অথচ আচমকা হাওয়ার যতটুকু সঞ্চয়ের মধ্যে পড়ে যাওয়ার কথা তা পড়ল না, আর সন্ধ্যা পড়ে গেল যে মানুষজন তৈরি হওয়ার সময়ই পায়নি। এখন আর কেউ আশা করছে না, বাতাস কমবে কখন। এসব এখানকার সবারই জানা—হাওয়া-জলের মর্জি একটু আন্দাজ করা যায় মাত্র, সে-একটুও মর্জির সিকিভাগ না।
যোগেন আরো-একটা কারণে তাড়াতাড়ি করছিল। এ-ডালটা নারকেলগাছের মালিকের প্রাপ্য। আর-কেউ সুযোগমত সেটা নিয়ে নিলে, সেটা চুরি। যোগেনের তেমন চুরি করা মানায় না।
সেই নীতিজ্ঞান ও সমাজবিধির প্রতি মান্যতা বশত যোগেন মণ্ডল বিএ, বিএল, এমএলএ একটু তাড়াতাড়ি করতে পারে মাত্র কিন্তু সমুদ্রের ভিতরের একটা চরকে, বরিশাল জিলা, বাখরগঞ্জ জিলা, চন্দ্রদ্বীপ এইসব নাম দিলেই তো নয়দিকের সমুদ্র শুকিয়ে যায় না, জিলা-মহকুমা-থানা যেমন খটখটা থাকার কথা তেমন খটখটা হয় না, আর, সমুদ্রের দশম দিকে, জলের তলায় কুম্ভকর্ণের নাকডাকাও থামে না। একজনের কাত-ফেরায় যদি তার নাকের হাওয়ায় সন্ধ্যার ভাত নামানো না-হয়, তাইলে ঘরের মইধ্যের কাঁচা মাটিতে আখা খোঁড়া ছাড়া য্যাখন উপায় নাই কোনো, তেমনি নারকেলগাছের শুকনা ডাল হাতের নাগালে পাইলে চুরি-করা ছাড়া ব্যবস্থা নাই কুনো। আইনে যারে চুরি-ডাকাতি-খুন কয়, বরিশালে তারে তা কয় না।
নারকেলের একটা আস্ত শুকনো ডাল নিয়ে আঁপ ঠেলে যোগেন ঢুকলে খুব যে বিস্ময়জ্ঞাপক আওয়াজ ওঠে, তা না, যোগেন গিয়ে ছোটখুড়োর ঘাড় ধইর্যা কয়, ‘উঠো তো। আমারে করব্যার দ্যাও’। ছোট খুড়ো সরে যায়। যোগামা চাপা স্বরে বলে, ‘পালি কই?’ যোগেন বলে, ‘যেহালে গাছের ডাল গজায়। চাইল হাঁড়িতে তো?’ যোগামা বলে, ‘সে তো গাছের মাথায়। তুই সেহানে উঠলি ক্যামনে?’
‘ক্যা? নারকেলগাছের যেমন কইর্যা বাইয়্যা উঠে। দে। গোড়ার খানিকটা দে। পাতা ছিঁড়া কাঠি আলাদা কর্।’ যোগেন যাদের বলছে, তারা আছে বলে ধরে নিয়েছে, ছেলেপিলেরা। একটা প্রযুক্তির সমস্যা মেটাচ্ছিল যোগেন। কাঁচা মাটি খুঁড়ে গর্ত করলেই তো আর সে-মাটির ওপরে আগুন জ্বালানো যাবে না। কিন্তু ডালের মোটা গোড়া আর গোড়ার মোটা পাতা বিছিয়ে দিলে আগুন জ্বলে উঠতে পারে। যোগেন তেমন একটা ব্যবস্থা করছিল।
আঁচটা যোগামা-রাই ভাল দিতে পারবে।
যোগেন দাঁড়িয়ে উঠে বলে, ‘যোগামা, আঁচ দ্যাও। ভগুর থিক্যা। যোগামা আমার একডা বৌ নিয়্যা অ্যাসছিলাম, শ্যায় আছে না গিছে’।
‘ক্যা? ছিল্যাম তো নারকেলগাছড়ায় পা ঝুলাইয়্যা। নাইলে ডাল পাইতেন ক্যামনে?’ কমলা খুব চাপা স্বরে বলে।
কখন একসময় বোঝা গেল, হাওয়াটা অন্যরকম?
যেন, প্রথম থেকে হাওয়াটার চেহারা-তরিবৎ সকলেরই চেনাজেনা ছিল, একসময় তারা তাদের জানাটা ঠিক না এটা বুঝে গেল। মানে, সেই আগের আন্দাজটা ভুল ছিল, এখন আবার নতুন আন্দাজ তৈরি হবে—হাওয়াটা যখন রাত পেরয়।
থাকবে বরিশালে, আর জল-হাওয়া থাকবে চেনাজানা, কলকাতার ট্রামগাড়ির মত—এটা কি সম্ভব?
এই হাওয়ার মুখে রাতে তো আর কেউ দুয়ারে শুতে পারে না। বৃষ্টি হলে না-হয় ভেজার ভয় থাকে, হাওয়ায় অসুবিধে কী?
হাওয়ার অসুবিধেটা একটু বিপদের। এমন হাওয়া কখন-যে ডবল বেড়ে যায়, ঘুমের মধ্যে কেউ বুঝতে পারে? জেগে হাওয়ার মধ্যে বসে থাকলেই বোঝা যায় না, তার ওপর ঘুমের মধ্যে? সেই হাওয়ায় বাড়ির কোনো ঘর ভেঙে গিয়ে তোমাকে কবর দিতে পারে। সেই হাওয়ায় কোনো জায়গা থেকে একটা কাটা টিন উড়ে এসে সুদর্শন চক্রের মত তোমার গলাটা কেটে তুলে নিয়ে যেতে পারে। সেই হাওয়া তার সবটা জোর দিয়ে তোমার দম আটকে মেরে ফেলতে পারে। মরাটাকে ভয় পেয়ে, তো বাঁচা যায় না। কিন্তু বাঁচতে হলে মরণ যতটা এড়ানো যায়।
কমলা আর তার ছেলেকে কোনো একটা নিরাপদ জায়গায় যোগামা ঠেসে দিয়েছে। যোগেন, ছোটখুড়ো, গোটা কয়েক ছাওয়াল-পাওয়াল আর যোগেনের খুড়ার বেটাভাইদের মধ্যে যে-বড়—তারা ছিল সব এই ঘরে।
শুয়েই যোগেন নাক ডাকতে শুরু করে।
ছোটখুড়ো রাতের অন্ধকারকে বলে, ‘এরে কয় সিদ্ধ পুরুষ। ঘুমের জইন্য শোয়াও দরকার নাই’।
কিন্তু রাতের কোনো একটা সময় খুড়ার বেটা ডেকে ওঠে, ‘যোগাদাদা, আওয়াজ কীসের? তোমার? না, হাওয়ার?’
যোগেন তড়াক করে উঠে বসে বলে, ‘আওয়াজ কীসের রে? হাওয়ার না কী?’
যোগেন ঝাঁপ খুলে বাইরে যায়।
কাঁচা একটা মানুষ পেয়ে হাওয়া যেন উপোসী বাঘের মত কিড়মিড় করে উঠে যোগেনকে কামড়াতে আসে। যোগেন যেন হাওয়াটাকেই জিজ্ঞাসা করে, ‘আরে, সাইকোলন না কী রে?’
ভিতর থেকে খুড়ার বেটা জিজ্ঞাসা করে, ‘তোমার কী যে সুবিধা সেডা আগে ঠিক করো। তারপর জিগ্যাও কলোন, নাকী হাউড্যা, না কী, টারমল, নাকী ডিপেরেশন, নাকী উইন্ডফোর্স?’ এসব হল স্টিমার আর লঞ্চের। খালাশিদের কাছে শেখা—কোন্ হাওয়াকে কী বলে, সাইক্লোন, টারময়েল, ডিপ্রেশন, হাই উইন্ড নাকী উইন্ডফোর্স। কোম্পানিগুলি কিছুতেই স্টর্ম বলতে চায় না। স্টর্ম বললে ও তারপর স্টিমার-লঞ্চ ডুবলে কোম্পানিকে ক্ষতিপূরণ দিতে হয়। খুলনা- নোয়াখালি-চট্টগ্রামের জোড় লাগানো যে-সমুদ্র, সেই পুরোটা জুড়ে উথালপাথাল না হলে স্টর্ম হয় না।
যোগেন হাওয়াটাকে মুখোমুখি নিতে পারে না। সে ঘরের বেড়ায় বুক দিয়ে পেছন ফিরে দাঁড়িয়ে বলে, ‘উইঠ্যা আয় তো—দ্যাখ তো ঘর মচমচায় না কী!
‘কও কী দাদা, এতক্ষণ তো ভাইবছি তোমার নাকডাকে না ঘর মচমাচায়, ঝাঁপ ঠেলে খুড়ার বেটা দুয়ারে নেমেই হুমড়ি খায়, যেন ঠোকর খেল। যত ফুটো বেড়াই হোক, তবু তো বেড়াই— হাওয়ার আওয়াজে সে বুঝেছিল হাওয়াটা যেন উঠছে আরো। কিন্তু হাওয়ার বেগ আর ধাক্কাটা তো সে আন্দাজ করতে পারেনি। ঘরের বাইরে পা দিতেই সে হাওয়ার ধাক্কায় হুমড়ি খেল।
যোগেন যেমন বুক সেঁটে ছিল বেড়ায়, সেই ভঙ্গিতে বসে পড়ে সে দুয়োরের দিকে ঘুরে এক দৌড়ে সামনের ঘরটায় বেড়া ধরে দাঁড়ায়। এখানে হাওয়ার ধাক্কা যেন একটু কম। আবার সেই মড়মড় আওয়াজ ওঠে।
যোগেন তার ভাইকে জিজ্ঞাসা করে, ‘শুনলিনি?’
হাওয়ার বেগে আর আওয়াজে কথা উড়ে যায় এই আট দশ হাত দূরত্বে। ভাই চিৎকার করে, ‘কী কও?’
যোগেন আবার চেঁচায়, ‘শুনলিনি মড়মড়ানি?
‘হ্যাঁ। শুইনল্যাম তো!’
‘ডালের না চালের?’
এই হাওয়ার ধাক্কায় কোনো বড় গাছের ডাল মোচড়াচ্ছে ভেঙে পড়ার আগে, নাকি মোচড়ানোর জায়গা আছে তাই মোচড়ায়—ভাঙার মোচড় না, নাকি কোনো ঘরের কোনো আড়াচালের দড়ি ছেঁড়ার আগে মোচড়ায়।
এই বেগের হাওয়ায় ও এই আওয়াজে এমন দিগভ্রম ঘটেছে যে আওয়াজ শুনে আওয়াজের অর্থ নির্ণয় প্রায় অসম্ভব। অথচ, যদি ঘরের চালের আড়ার দড়ির আওয়াজ হয়, তাহলে তো সেই ঘরে যারা আছে, তাদের এখনই বের করে আনতে হবে—না-জেনেই যে বের করে এনে কোথায় তারা নিরাপদ হবে। অথচ, এত না-জানার কারণে তো একঘর মানুষের ঘর চাপা দেখা চলে না।
ভাইয়ের গলা শোনা যায়—’চুপ কইর্যা যাহো, আর-একবার শুনি, কান খাড়া রাইখো।’
ঠিক তখনই দক্ষিণের ঘরের ঝাঁপ খুলে বেরয় যোগেনের ছোট খুড়ি। সে বোধহয় ঠোঁটের আগায় কোনো কথা নিয়েই বেরিয়েছিল। হাওয়ার ধাক্কায় পড়ে যায় ঘরের বাইরের দাওয়ায়। বাইরে যে যোগেন আর তার ভাই আছে সেটা সে দেখে থাকবে হয়ত। চিনের মত চিৎকার করে ওঠে, ‘ঘরের চালা তো মড়মড়ায়—’ চিৎকারের স্বরে সে কেঁদেও ওঠে।
‘আরে, কাইন্দো পরে, মানুষগুলকে তো বাইর করবা?’
যোগেনের ভাই মাটি ঘেষে নিচু হয়ে সেই ঘরের ভিতর ঢুকে পড়ে। তার গায়ে-গায়ে যোগেনও। ‘এই উইঠ্যা পড়, উইঠ্যা পড়। বাতাসে যে-ঘর ভাঙে।’
মুহূর্তে সেই অন্ধকারে ও সেই গর্জনের মধ্যে মানুষের নানা স্বরের চিৎকার আর ভঙ্গি যেন কুম্ভীপাক হয়ে ওঠে। কোলে-কাঁখে-পিঠে বাচ্চাদের নিয়ে যোগেন আর তার ভাই বেরিয়ে, যে-ঘর থেকে যোগেনরা বেরল, সেই ঘরের ঝাঁপ ঠেলে, বাচ্চাদেরও অন্ধকারে গুঁজে দিয়ে আবার সেই ঘরের দিকে দৌড়য়। ঐ ঘরে আর যারা বড় ছিল, তারা বাচ্চাদের নিয়ে এই ঘরটার দিকেই ছুটে আসে। অন্ধকারে তাদের এই আন্দাজটুকু মাত্র ছিল যে কয়েক পা ছুটে যেতে হবে। এটা তাদের সে-আন্দাজে ছিল না যে উলটোদিক থেকে কোনো ধাক্কা আসতে পারে। যোগেন আর তার ভাইয়ের ধাক্কায় কেউ-কেউ মাটিতে পড়ে গিয়ে চেঁচিয়ে কেঁদে ওঠে। কেউ তাদের কান্না যেন শুনলই না। তখন তারা বুঝতে পারে—তারা এই হাওয়ার সঙ্গে জড়ানো কোনো অপ্রাকৃতের—প্লাবন বা ভৌতিক—ধাক্কা খায়নি। তারা কান্না থামিয়ে ঘরের দিকে ছোটে।
ততক্ষণে বাড়ির সমর্থ লোকজন ছাড়া ঘরের ভিতরে এসে দাঁড়িয়ে চালের দিকে তাকিয়ে থাকে। একফোঁটা আলো নেই, সেই হাওয়ার তীব্রতর হয়ে ওঠারও কোনো বিরাম নেই। সেই আওয়াজটা আর শোনা যাচ্ছে না। কিন্তু শোনাটা এত জরুরি বলেই সবাই এই ঘরে এসে পড়েছে। এখনই যদি কোন্ আড়াদড়িটা মড়মড় করছে ঠিক করতে পারলে হয়তো সকাল পর্যন্ত ঘরটাকে খাড়া রাখা যাবে। আর এই হাওয়ায় ঘর যদি একবার ভেঙে পড়ে, তাহলে আবার ঘর তোলার খরচা জোগাড় হবে কোত্থেকে, নিজেরা খেটে তুললেও।
খুব ঠান্ডা গলায় মাইঝ্যান দাদা প্রেমানন্দ বলে, ‘ঠিক শুনছিলি তো তোরা?’
যোগেনের খুড়ার ব্যাটা বলে ওঠে, ‘আমি আর ছোড়দাদা না-হয় ভুলই শুনল্যাম, মা যে এই ঘর থিক্যা ঐ আওয়াজ শুইন্যা ভয় পাইয়া ঘর থিক্যা বারাল?’
এ-কথাটার কোনো উত্তর কেউ দিল না। প্রত্যেকেই নিজেদের সারা জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে এই গর্জমান হাওয়াতে শ্রুত মড়মড়-আওয়াজের কোনো সংক্ষিপ্ত অথচ নির্ভুল ইঙ্গিত পাওয়ার চেষ্টায় ছিল।
যোগেনের মাইঝ্যান দাদা প্রেমানন্দ খুব ঠান্ডা মাথার লোক বলে খাতির আছে—বাড়িতে, পাড়ায়, গ্রামেও একটু কিন্তু সেই খাতিরের কারণটা খুব পরিষ্কার নয়। খ্যাতিটা সে-ও অনেক কাল হল জানে ও তার যোগ্য থাকার চেষ্টাতেই সে চোখ নামিয়ে শোনে আর শ্রোতার কানের দিকে তাকিয়ে কথা বলে। ঘরটাতে একচিলতে আলোও ছিল না। তার সেই ব্যক্তিত্ব দেখাও যাচ্ছিল না।
কিন্তু সে এই অন্ধকারে তার ব্যক্তিত্ব হারাল না। নিম্নস্বরেই সে বলে, ‘কানাই, আন্দাজমত পারবি বেড়া ধইড়্যা আড়ে উইঠব্যার?’ কানাই মানে যোগেনের সেই খুড়োর বেটা-বাড়ির সমর্থ মানুষদের মধ্যে সবচেয়ে ছোট। আড়ে উঠতে হলে তাকেই উঠতে হবে। কিন্তু মাইঝ্যান দাদার ওপর তার খুব একটা বিশ্বাস ছিল না। সেই বিশ্বাস-অবিশ্বাস অস্থায়ী এখন ইতিকর্তব্য স্থির করা যায় না।
‘তুমি কোন্ আড়ে আন্দাজ পাইল্যা?’
‘য্যান মনে হইল দক্ষিণপশ্চিমে।’
এই উত্তরটাতেই কানাই নিশ্চিত হয় যে মাইঝ্যানদাদা কোনো আন্দাজ পায়নি, মিছিমিছি তাকে আড়ে ওঠাচ্ছে। কানাই বলে, ‘দক্ষিণ পশ্চিম? সেটা আবার কোন্ দিক?’
কানাইয়ের বাবা, যোগেনের ছোট খুড়া বলে, ‘ঐ বেণুগ ঘরের দিকে কোণটা?’
‘তুমিও শুনছ?’ কানাই জিজ্ঞাসা করে।
‘না। আমি শুনি নাই। দিকটা জিগাইলি। তাই কইল্যাম।’
তখনই চালটা মড়মড়িয়ে উঠল। আর মনে হল যে বেণুগ ঘরের দিকের কোণটাই। কেউ সেটা বলে না আর এই অন্ধকারে বাঁশের বেড়ার গাঁটগুলো পায়ের আঙুল দিয়ে খুঁজে খুঁজে আড়কাঠে না-ওঠার পক্ষে কোনো যুক্তিই থাকে না। সে উঠতে ভয় পাচ্ছিল। যেন এর চাইতে সহজতর কোনো উপায় আছে, ঘরটা বাঁচানোর, সেটা জানার মত লায়েক সে হয়নি। কিন্তু তার তখন মনে এসে গেছে, সে-ও উঠল আর চালটাও উড়ল, তাহলে ঐ উঁচুতে হাওয়া তো এক তাকেই পাবে, তখন তাকেই হয়ত উড়িয়ে নেবে। তারপক্ষে আপত্তি করা সম্ভব না—জীবনমৃত্যুর মাঝখানে খুব সরু ও কোথাও-বা অস্পষ্টও, যে-আলপথ দিয়ে কোনো কৌমকে বংশানুক্রমিক জীবন চালাতে হয় তারা হয়ত এমন চরম অবস্থায় ভয় পেতে-পেতেই প্রত্যুৎপন্ন হয়ে ওঠে বা মরে যায়। কানাই বলে, ‘দড়িগাছড়া আছে তো। ধরাইয়্যা দিয়ো।’
কিন্তু তার কথা শেষ না-হতেই তার বাপ ‘তুই দড়িগাছড়া নিয়্যা আয়’ বলে এক লাফে ঘরের একটা আড় ধরে, নিজের শরীরটা দুলিয়ে দুই হাতের ওপর জোর দিয়ে এক পা চড়িয়ে দিতে যায় আড়কাঠে, ও পড়ে যায়। কেউ তাকে ধরতেও যায় না, কিছু জিজ্ঞেসাও করে না। সে আবার উঠে আড়কাঠের দিকে দুই হাত উঁচু করতেই, যোগেনের মাইঝ্যান বৌদিদি বলে ওঠে, ‘ছোট খুড়্যা, এন্ড্রু ঝাঁকাইয়া দ্যাহেন, শক্ত তো, না, ভাইঙ্গ্যা পইড়বে।
অভিজ্ঞতা কোনো সিন্দুকে রাখা টাকাপয়সা নয়, দরকারে যা কাজে আসে। দরকার আসার আগেই ডাকাত পড়ে। প্রত্যেকটা দিনের বেঁচে থাকার জন্য প্রতি মুহূর্তে আত্মরক্ষার একমাত্র উপায় বের করার সামর্থ্যই অভিজ্ঞতা।
রাজকৃষ্ণ মাইক্যান বৌমার কথাটা শোনে। একবার দোল খেয়ে বলে, ‘ঠিক আছে’। এবার সে পারে তার ডান পা আড়ার ওপর শুইয়ে নিজের শরীরটাকে ছেঁচড়ে কানছিতে নিয়ে গিয়ে পা ঝুলিয়ে বসতে। তার ছেলে, কানাই লাফিয়ে দড়ির গাছা তার পায়ে জড়িয়ে দেয়। রাজকৃষ্ণ তখন হাতটা দিয়ে খোঁজে কানছিতে আড়ের দড়ির বাঁধনটা।
‘বা ব্বা, হাওয়া য্যান হাতের পাঞ্জাখান কাইট্যা ন্যায়’, বলতে-বলতে সে পায়ে জড়ানো দড়িগাছি থেকে একটা গাছি বের করে নিয়ে আড়ার সঙ্গে কানছির পুরনো বাঁধনের ওপরই বাঁধন দেয়। দিয়েই সে দুই হাত বাড়িয়ে বেদের বাড়ির দিকের আড়টা ধরে, সেই আড়ের ওপরে উঠে পায়ে জড়ানো দড়িগাছ থেকে একটা গুছি বের করে। দড়িগাছটা সে পায়ে আরো এক পাক জড়িয়ে নিয়েছিল, নইলে এ-আড়া ও-আড়া করতে গিয়ে দড়িগাছ পড়ে যেত। কিন্তু সেই দুইপ্যাঁচি দড়িগাছ খুলে একগুছি বের করে, আবার দড়িগাছটা দুই পায়ে জড়াতে সামান্য সময় লাগল। সময়ের এমন কৃপণ ব্যবহার সম্ভব এমন চরম অবস্থাতেও নিকষ অন্ধকারে হাওয়ার গর্জন ডুবিয়ে দিচ্ছে যখন, আর নিজের ঘরটা বাঁচাতে এতগুলো মানুষ তাদের বুদ্ধি ও শ্রম মেলাচ্ছে সংক্ষিপ্ততম যে সময়ে।
অভিজ্ঞতা কোনো কায়দাকৌশল নয়। অভিজ্ঞতা হল মরে না গিয়ে বেঁচেথাকার প্রত্যুৎপন্ন ক্ৰিয়া।
