১১
১২
১৩
১৪
১৫
3 of 4

১১৭. ছোটকবরাজ

১১৭. ছোটকবরাজ 

বিকেলে একটু বেলা থাকতেই যোগেন কবরেজমশায়ের সঙ্গে দেখা করার জন্য বেরয়, যদি তৈরি না থাকে তাহলে যাতে বাটা-ছেঁচার সময় থাকে। অন্ধকার তো ঝপ করে নামে। কবরেজমশায়ের কাছে যেতে আর নৌকো খুলল না, এখন তো শুকনোই থাকে। তাদের পাড়ার দক্ষিণ-উত্তরে মৈস্তারকান্দির খালের বাঁকের উপর দিয়ে এক বাঁশের সাঁকোটা দিয়ে পার হলে ওপারের রাস্তাটা দিয়ে, একটু ঘুরে কবরেজমশায়ের ‘সঞ্জীবন’। 

এই ‘সঞ্জীবন’-এরও ইতিহাস আছে। কবরেজমশায়রা বৃত্তিতে বৈদ্য। ওঁর বাবাকে যোগেন দেখেছে বলেই মনে করে। বাল্যের সেই অস্পষ্ট স্মৃতির ভিড়ে কাকে যে সে কবরেজমশায়ের বাবা মনে করে রেখেছে। কথাবার্তা থেকে একটা আন্দাজের চেষ্টা করা যায়, যোগেন যখন জলিল মাস্টারমশায়ের পাঠশালা ছেড়েছে তখনো বুড়ো কবরেজেরই দাপট। বুড়ো কবরেজের কথা কোনোভাবেই যোগেনের জানা বা শোনার কথা না। তাদের অসুখবিসুখে কবরেজমশাইকে দেখানোর কথাই ওঠে না, অসুখবিসুখের কথাই ওঠে না, তার আবার কবরেজ। কবরেজমশায়ের বাড়ি যেমন মৈস্তারকান্দিতে, মৈস্তারকান্দিকেও তেমনি বলা হত কবরাজ গ্রাম। যোগেনদের বাড়ি যে জলের ভিতরে একটা ডাঙার টিলার ওপর, সেটাকে মৈস্তারকান্দি বলতে-বলতে মৈস্তারকান্দিই হয়ে গেছে। কিন্তু আসল মৈস্তারকান্দি হচ্ছে কবরেজমশায়দের বাড়িটাড়ি ঘিরে। এত খাল যে নাম দিয়ে কূল পাওয়া যায় না—এক নাম দিয়েই দশ খাল বোঝানো হয়ে যায়। মৈস্তারকান্দির খাল বলে ধনুকের বাতার যে বাঁকটা বোঝায়, তার এক সীমান্তে যোগেনদের জায়গা। আর ছিলাটা উঁচু জায়গা, রাস্তাঘাট আছে, ওটা হচ্ছে ভদ্দরলোকের মৈস্তারকান্দি। ফলে কার্যত ধনুকের বাতা দিয়ে যাদের গতায়াত, খালপথে, বা আজ যেমন যাচ্ছে যোগেন সাঁকো পার হয়ে এই রাস্তাটা দিয়ে, তাদের সঙ্গে ভদ্রলোকের মৈস্তারকান্দির কোনো সম্পর্ক তো কোনোকালে নেইই, এমন কী তাদের রাস্তাও আলাদা। বুড়ো কবরেজমশায়কে নিয়ে অনেক গল্প বোধহয় চালু ছিল। তারই কিছু হয়ত যোগেন শুনেছে যখন কলেজে পড়া হবে কী হবে না এই অনিশ্চয়তায় যোগেন চাঁদসীতে চিকিৎসাবিদ্যা শিখতে শুরু করে যখন, তখন চাঁদনীর মেজ-ডাক্তার পদ্মলোচন দাস খুব বলতেন বুড়া কবরেজের কথা। ওঁর কাছে কোনো রোগী যদি যেত, যার অসুখের চিকিৎসা চাঁদসী-পদ্ধতিতেই নিরাময় হওয়ার সম্ভাবনা বেশি, তাকে তিনি চাঁদসিতেই পাঠাতেন। অনেক সময়ই রোগীরাই আপত্তি করত, জাতপাতের কথা তুলে, শূদ্রের দেখা ওষুধ খাবেনই-বা কী করে, অস্পৃশ্যের চিকিৎসাই-বা নেবেন কী করে। বুড়ো কবরেজ নিজেও ছিলেন খুব নিষ্ঠাবান বৈদ্যব্রাহ্মণ। তিনি জাতপাত জানতেন, অস্পৃশ্যতাও পালন করতেন। কিন্তু রোগের চিকিৎসা করতে শূদ্র-চিকিৎসকের কাছে যেতে কেউ জাতিগত কারণে আপত্তি করলে তিনি নাকী খুব চটে গিয়ে বলতেন, ‘তাইলে তো আমার কাছেও তোমার চিকিৎসার জন্য আসা উচিত হয় না। আমি কোনোদিন কি কোনো রোগীর নামধাম জাতপাত জাইনতে চাই? না। আমি শুধু তার কষ্টের কথাটা শুধু জাইনতে চাই। তার সেই কষ্টটা দূর করা আমার ধর্ম। সেই ধর্মপালনকালে কোনো স্পর্শদোষ ঘইটতেই পারে না। তোমার যা ব্যাধি তার চিকিৎসা আমার কোনমতে চাঁদসিতে উত্তমোত্তম।’ 

মেজ-ডাক্তারের কাছেই রোগেন কিছু গল্পও শুনেছে। কবরেজবাড়ির একটা অংশ ভদ্রাসন, তাঁদের বসবাসের জায়গা। আর-একটা অংশ গাছপালা, বনবাদাড়, লতাপাতা, ডোবা-একটা ইত্যাদিতে ভরা জংলা জায়গা। আর-একটা অংশে, তৃতীয় অংশে, কবরেজমশায়দের চিকিৎসার জায়গা। মাঝখানের এই দ্বিতীয় অংশটি আসলে কবরেজমশায়দের লতাপাতা, চিকিৎসার জন্য দরকারি শিকড়, ফল ইত্যাদি রোপণ ও পালনের জায়গা। এই তিনটি অংশের আলাদা-আলাদা নামও ছিল— ভদ্রাসন, গুল্মবন আর সঞ্জীবন। সে তো যোগেনদের সময়ও ওরা জানত, সময় মানে যোগেনরা যখন মাথাচাড়া দিয়েছে। লোকে এত মনে রাখতে পারত না। তারা সবটাকে মিলিয়ে এক নামে ডাকত, ‘কুঞ্জবন’। এখনো তাই ডাকে নিশ্চয়। বদলাতে যাবে কেন? কিন্তু কেউ যদি ভুল করে ডাক্তারদের সামনে এ-কথা বলত, তবে তার ব্যাধির বিপদ থেকেও সমূহ হয়ে উঠত সম্মুখ বিপদ। বড় ডাক্তারজ্যাঠা খুব কিছু বলতেন না, কিন্তু ছোট বা মেজ সে-রোগীকে জীবস্মৃত করে ছাড়তেন, ‘তোমার শারীরিক দুঃখের কথা পরে কইয়ো— আগে তোমার নাকের চিকিৎসা করি।’ সে-মূর্খ যদি তখনো বুঝতে না পারত তার চুপ করে থাকাই ভাল, তাহলেই শুরু হত কবরাজ মশায়দের ক্ষুর শানানো। এক-একজন মানুষ বা এক-একডা জায়গা নিয়ে এতরকম গল্প তৈরি হতেই থাকে যার সাক্ষ্যপ্রমাণ দরকার হয় না। অথচ, এত নৌকায়, এত খালবিলনদীতে এত জোয়ার-ভাঁটায়, সেসব গল্প তো জলের ওপরের বা তলার দশবিশ দিকে ছাড়িয়ে যায়। যোগেন যখন চাঁদসী শিখতে যেত, তখন এমন অনেক গল্প শুনেছে মেজ-ডাক্তারের কাছে। 

একদিন নাকী এক রোগী মাইঝ্যান-কবরেজের ধমকে বলে উঠেছিল, ‘কন কী মাইঝ্যা নকত্তা! গু-রে যদি গু-ই কইতে পাইরত্যাম তাইলি তো ষোল আনা মানুষই হইয়া যাইতাম। তিন ডবল পয়সা কম বইল্যা বৌঠ্যারানের হাটে গামছায় ধরা পুঁটিমাছ বেইচত্যাম না।’ 

এটা খুব চালু গল্প। নানাভাবে চলে। কখনো রেগে উঠে, ‘গু-রে যদি গু-ই কইতে পারেত্যাম’ কখনো পীড়িত আত্মসম্মানে, ‘ষোল আনা থিক্যা তিন ডবল পয়সা কম মানুষ’ কখনো একটু উলটানো অর্থে, ‘আরে, আমার কথা ছাড়ান দ্যাও। আমি তো বৌঠাব্যানের পুকুর থিক্যা গামছায় পুঁটি মাছ ধইর‍্যা ঘাটের পাড়ের হাটে বেচি।’ 

কবরাজবাড়ি নিয়েই আর-একটা কথা চালু আছে। মনে আসতেই যোগেনের ঠোঁটে হাসি ফোটে। কে বলেছে, কী বলেছে, ঘটনা কী সেসব কোনো প্রসঙ্গ ছাড়াই সুযোগমত লোকে বলে দেয়—’পুরুতে মন্তর পড়ে, পাঁঠার অণ্ডকোষে শোনে।’ 

‘ক-মাস আগে হলেও কবরাজবাড়ি যাওয়ার পথে এসব মনে পড়লে যোগেন, বলুক- না-বলুক, ভাবত ও বেশ অভিমান নিয়েই ভাবত, বৈদ্যবামুন কবরাজের সাধ হইছে তার জলাজংলা খোলা জায়গাটার নাম দিব ‘গুল্মবন’ আর অমনি সারা জায়গার শুদ্দুর মানুষ, মুসলমান আর চুনারি-ঘুনারির দল ‘গুল্ম’–বলা শিখ্যা যাইব। তাও তো ‘গুল্মবন’ না-কইয়্যাই কুঞ্জবন কইছে। কথায় তো ভুল নাই। 

কিন্তু এখন যোগেন অতটা রেগে উঠতে পারল না। এমন সব গল্পরটনার মধ্যে যেন একটা সকলের সমস্ত অধিকারেই স্বীকৃত্তিও আছে, নিত্যকার গণতন্ত্র। তেমন একটা সমান বিনিময়ের কারণেই গল্পগুলো মনে থেকে যায়, যেন এই রোজকার জীবনের এই সমান-সমান সত্যটাই সত্য। জাতিভেদ বা ফসলভাগ, এইসব নিয়ে সেই সময় অনুভব যখন মার খায়, তখনই সন্দেহ তৈরি হতে পারে বড়লোক আর ছোটলোকদের’ মধ্যে। শুধু তাই নয়। সমান বড়লোকের মধ্যেও। সমান ছোটলোকেরও মধ্যে। গান্ধীজির মত বড় মানুষও তখন তাঁর পরিকল্পনার সবচেয়ে বড় বাধা মনে করেন সুভাষকে। আর সুভাষের মত বড় নেতাও মনে করেন গান্ধীজিই সবচেয়ে বড় বাধা। কিন্তু কেন মনে করেন— সেটা কখনোই সবটা খুলে বলেন না। যদি সত্যিই গান্ধীজি মনে করতেন— তিনি ওয়ার্কিং কমিটির ভিতরের দুই দলের মধ্যে থাকবেন না, তাহলে তিনি পন্থপ্রস্তাবে রাজি হতেন না। তিনি পন্থপ্রস্তাবে বিরক্তি বা রাগ জানিয়েছেন অথচ সেই প্রস্তাবে তাঁকে যে-ক্ষমতা দেয়া হয়েছে সেই ক্ষমতা ব্যবহার করেছেন। সুভাষ বস্তুত গান্ধীনেতৃত্ব থেকে কংগ্রেস ও দেশকে সরাতে চাইছিলেন অথচ গান্ধীকে বলছিলেন গান্ধীই কংগ্রেসের ও ভারতের একমাত্র নেতা। গান্ধীজি বরং বলেছেন, ‘তোমার-আমার কর্মসূচি আলাদা’। সুভাষ এই পর্যন্ত বলতে পারেননি, তিনি দোষী করেছেন ‘দক্ষিণ পন্থীদের।’ কোনো সময় এটা বলেননি, গান্ধীজি ‘দক্ষিণপন্থী’ কী না। নীহারেন্দুবাবু একদিন ‘শ্রেণী’ দিয়ে দু-জনের ভাগাভাগি বুঝিয়েছিলেন। যোগেন পালটা কিছু না-বললেও মনে করেছে—ওই শ্রেণী-ভাগাভাগি ঠিক না, আগেই ঠিক করা থাকছে কে বামুন, কে সৎশূদ্র, কে নবশাখ, কে শূদ্র, কে অতিশূদ্র। গান্ধীজি যে বলেন, বর্ণভেদ প্রত্যেকের সামাজিক কাজ বলে দেয়া আছে, সেটা খারাপ হবে কেন, উচ্চবর্ণের হিন্দুরা ওটাকে ব্যবহারে খারাপ করেছেন, যোগেন চেষ্টা করেও বুঝে উঠতে পারেনি গান্ধীজি এটা কী করে বলেন। মানে—রাজপুতানায় ক্ষত্রিয়দের সামাজিক কর্তব্য আছে আর বাংলায় নেই? মানে–চারই হোক আর পাঁচই হোক—দুটি মাত্র বর্ণের সামাজিক কর্তব্য সারা দেশে এক। একটি বর্ণ—ব্রাহ্মণ। সমাজের সবকিছুর অনুমোদক। সমাজের সব বর্ণের সমস্ত রকম কাজের ঔচিত্য-নির্ধারক। আগে বলা হত, সমাজের আধ্যাত্মি সামল নে বামুন। সে কখনো আধ্যাত্মিক আর ঐহিক এমন স্পষ্ট ভাগে ছিল কী না, যোগেন জানে না। 

ছোট-কবরাজ মশায় ছিলেন জলচৌকিতে বসে ডেস্কের সামনে। হাওয়াটা এত আচমকা উঠেছে আর প্রায় একই সঙ্গে যোগেন দৌড়ে এমন করে ঘরের ভিতর ঢুকেছে, ছোট-কবরাজ মশায় চমকে গিয়ে জোরেই বলে ওঠেন, ‘কেডা রে?’ 

যোগেন ভেজেনি, বাতাসের একটা ঝাপটা খেয়েছে। সে চুলটায় হাত বুলিয়ে, ধুতিটা ছেড়ে দিয়ে এগিয়ে ছোট-কবরাজ মশায়কে প্রণাম করে বলে, ‘আমি, ছোটকর্তা, যোগেন,—

‘তুমি তো যোগেন, তোমার বাপ কেডা?’ 

‘শ্রীরামদয়াল—’ 

‘দয়াল কি পদবী?’ তালি তো হওয়ার লাগে শ্রীরামচন্দ্র দয়াল। তুমি শ্রী কইল্যা, চন্দ্র তো কইল্যা না?’ 

ঘরে আরো দু-একজন ছিল, তাদেরই মধ্যে কেউ বলল, ‘ছোড কত্তামশায় ইনি তো আমাগ মেম্বার।’ 

‘তোমা গড়া কারা আর মেম্বারই-বা কীসের?’ 

যোগেন হাসিমুখে বলে, ‘আমি যোগেন। যোগেন মণ্ডল। উনি ভোটের কথা তুইলছেন, গেল ভোট।’ 

ছোট-কবরাজ মশায় ভুরু একটু কুঁচকে বলেন, ‘ভোট—স্যায় তো আই নাভার ভোট?’ যোগেন ঘাড় হেলিয়ে হাসে। 

‘আরে সেডা তো কইব্যার লাগে। আমি মেম্বার যোগেন। তা না কইয়্যা তুমি আইস্যাই বললা আমি যোগেন। দ্যাহ কাণ্ড। বসো, বসো। তুমি তো একডা মান্যগণ্য মানুষ। বসো। আমি অবিশ্যি তোমারে খুব বেশি দেখি নাই। খবর কী কও? তুমি হঠাৎ আজ আইল্যা ক্যান? 

‘কবরাজ মশায়, আমারে আপনে দেইখবেন ক্যামনে? আপনার তো এইখানে, জীবনদানের ফ্যাক্টরি আর আমাগ তো তার উলট্যা ফ্যাক্টরি– 

‘ক্যা? তোমার তো তেমন নিন্দা শুনি নাই। কও। কী কামে আইছ?’ 

‘কলকাতা থিক্যা আইস্যা দেহি— বাবার কাশি উঠে শ্বাসটানার মত আওয়াজ হয়, কইল, কবরাজ বাড়ি থিক্যা বাসক পাঁচন আইন্যা দিলেই আরাম হইত।’ 

‘তোমার বাপের কি কুনোদিন ইতিপূর্বে আমাগ ঘরের পাঁচন খাইয়্যা আরাম হইছিল—’

‘আপনাগ ঘরের পাঁচনে আরাম পাইতে কি খাওন লাগে?’ 

‘এদিন যদি স্মরণেই আরোগ্য হইয়্যা থাকে এবার ক্যান খাওনের দরকার পইড়ল। বাপের শ্লেষ্মার রং দেখছ?’ 

‘শ্লেষ্মা তো দেইখলাম। রং তো বুঝি নাই।’

‘তুমি কি দিনকানা?’ 

‘না। ঘরে তো অত আলো ঢোকে না—’ 

‘অ—। তাইলে তো মনে হয় হলদ্যা। শ্লেষ্মা পাকছে।’ 

‘কী কইর‍্যা বুইঝলেন ছোড কত্তা’। 

‘শাদা কফ হইলে তো তুমি আবছা ঘরেও দেইখতে পাইত্যা। তুমি কয়দিন থাইকব্যা?’

‘কয়দিন আর? দুই-এক দিন কী তারও কম।’ 

‘দুই দিনে তোমার বাপের তো আরাম হইত না। বাসকের পাঁচন খাওয়া দরকার ছিল মাস দুই আগে। আমি একডা অন্য ঔষধ দেই। এইডা দুইবেলা খাইব দুই মুখটি কইর‍্যা। বাড়িতে কে আছে খবর দিব্যার?’ 

‘আছে। আপনি কন। কবে খবর দিবে?’ 

‘এইডা ভাল কইর‍্যা স্মরণে রাইখো। আজ হইল মাঘের কৃষ্ণপক্ষের দ্বিতীয়। রাত্রি নয়ডায় তৃতীয়া ধইরবে। তাইলে ধরো, অমাবস্যা পইডব বারদিন বাদে। বার। ভাল দিনে আইছ রে মণ্ডল—তিথিপক্ষ দুইই মিলল। অমাবস্যার পরে দুইডা সূর্যোদয় কাইটলে আমারে আইস্যা য্যান খবর দেয় শ্লেষ্মার রং বদলাইছে কী না আর শ্বাসটা না কমছে কী না। এতগুল্যা খবর দেয়ার মতন মানুষ আছে তো?’ 

‘অত কইলে মনে রাইখবার পারব না। আমি কয়্যা যাই অমাবস্যার দিনডা বাদ দিয়া দুই রাইত কাইটার মাথায় আপনারে খবর দিবে। খবর দেয়ার আগে বাবারে শুধ্যায়া আইসবে কী কইব্যার লাগবে। যার শ্লেষ্মা আর যার শ্বাস, সে ছাড়া কেউ রং চিনবে না আওয়াজ চিনবে?’ 

‘যোগেন মণ্ডল, তোমার তো দেহি বুদ্ধি এক্কেরে চৌখোপা। বাঃ। আমাগ তো বেশি সময়ডাই ব্যয় হয় রোগী কী কইব্যার চায় সেইডা আন্দাজ কইরতে। জি–তে–ন’— 

জিতেন মানে যিনি ওষুধ দেবেন। তাঁকে বরং যোগেন একটু বেশি চেনে, হাটেবাজারে দেখেছে। জিতেন এসে যোগেনকে দেখে বলে, ‘কবে আইল্যা’। 

‘ফিরত যাওয়ার আগের দিন’, একটু হাসাহাসি হল। 

‘ওর বাবার শ্লেষ্মা বৃদ্ধি, শুইন্যা তো মনে নিল কাতর। নইলে ছাওয়ালরে কি আর কবর্যাজ বাড়ি পাঠায়। অ্যা সমাজে তো বৈদ্যং শূদ্রম্মন্যতে। যোগেন কইল্যাই বাপের কারণে এইবার আইসছে। ওরে আর বইলো না ওষুধ বান্যায়া রাখব, কাইল আইস্যা নিয়ে তোমার ভাণ্ডারে মুথা আছে তো নিশ্চয়ই। পুরানা তিস্তিরির পাতলা জলে মিশাইয়্যা এড্‌ডু না-হয় বর্বরত্বকও দ্যাও। বয়স হইছে তো। এক পক্ষকালে মত দিয়ো। 

জিতেন, ‘বও’ বলে ভিতরে চলে যায়। 

যোগেন বলে বসে, ‘ছোড কত্তা, আপনাগ এইহানে তো আমাগ আসা হয় না—’ 

‘আসায় তো কুনো নিষেধ নাই মণ্ডল। ঠিক কইর‍্যা কইলে কইতে হয়– বরং উৎসাহ আছে। 

কিন্তু সেডা তো কওয়া ঠিক না।’ 

‘ক্যান? বেঠিকড়া কী? এ তো খোলাখুলি কাম—’  

‘জি তে ন’ ছোটকর্তা জোরে ডাকেন ভিতরের দরজার দিকে মুখ করে, সেখানে জিতেন এসে দাঁড়ালে বলেন, ‘পরিমাণের থিক্যা কম এড্‌ডু দ্রাক্ষামধু মিশান যায় না?’ জিতেন চলে গেলে ছোট কর্তা পুরনো কথার খেই ধরেন, ‘চিকিৎসার লগে মানুষজনার উৎসাহ দিলে তো এইডাও বুঝায় আমি আমার আয়বৃদ্ধির উদ্দেশ্যেই উৎসাহ দেই।’ 

‘আমি সে-কথা ভাইব্যা কই নাই। আমাগ তো কুনো জায়গাতেই ঢোকার কোনো অধিকার বা অনুমতি নাই। শুদ্দুররাই তো ব্যাধির বাহক। না-যাইতে-যাইতে আমাগ কোথাও যাওয়ার ইচ্ছাড়াই মইর্যা গিছে গা। আপনাগ এইখানে বইস্যা মনে হয় তীর্থে আইছি। কত যত্নে আপনারা মানুষরে খাড়া রাহেন।’ 

‘যোগেন, আমরা তো বৃত্ত্যা বৈদ্যঃ। স্বইচ্ছায়। আমরা তো কাহারো দ্বারা নিযুক্ত নয়। বৃত্তি অর্থ তো স্বযুক্ত। যে-ব্যক্তি স্বযুক্ত হইয়া কোনো বৃত্তি দ্বারা জীবননির্বাহ করে, কোনো প্রাহককে তো অন্য কোনো কারণে প্রত্যাখ্যাত করতে পারে না। কইরলে সে বৃত্তিধর্ম থিক্যা পতিত হয়। কোনো ব্রাহ্মণ যদি শূদ্র যজমানের কার্য গ্রহণ না করে তাইলে তো ব্রাহ্মণের বৃত্তিই লঙ্ঘন করা হয়। ব্রাহ্মণের বৃত্তি কী? যজন, যাজন, অধ্যয়ন, অধ্যাপনা। যদি কোনো জাইল্যা আইস্যা কয় বামুনগ মাছ বেইচব না সেডা যেমন অন্যায়, শুদ্দুরগ কাম কইরব না বলা ব্রাহ্মণের পক্ষে ততোধিক অধর্ম। চতুর্বর্ণের স্পৃশ্য-অস্পৃশ্য বিভাজন কী কইর‍্যা বামুনঠাকুর বৃত্তির ক্ষেত্রে ব্যবহার করে? মণ্ডল, আমি হিন্দু, বৈদ্যবর্ণ, পরজন্ম মানি, পূর্বজন্ম মানি, স্পৃশ্য-অস্পৃশ্য মানি, ধর্মভেদ মানি। এগুলারে মান্য বইল্যাই মানি। কিন্তু এই সবগুলা মান্যেরে বাইন্ধ্যা রাইখছে কেডা? স্বধর্ম। স্বধর্ম, মানে, স্বযুক্ত বৃত্তি।’ 

‘আপনার সবড়া কথা মাথায় কইর‍্যা রাইখল্যাম। ললাটে আঘাতও কইরল্যাম— হায় রে, এমন সোজা কথাডা মাইনষে পালন করে না ক্যা? কিন্তু একডা দুষ্ট কথা কই। ক্ষমা দিবেন। 

‘আরে, কও-না বাপ। আমি তো তোমারে কিছু কইব্যার দিল্যাম না। নিজেই বকবকাইয়া গেলাম। কী কথা, কও।’ 

জিতেন একটা বেশ বড় আকারের বোতল এনে যোগেনকে ধরিয়ে দেয়, ‘সেবনবিধি, অজুপান, নিষেধ সব শোনা হইছে তো?’ 

‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, সে তো কব্যা দিচ্ছি, সকালে দুই মুখটি, রাইতে দুই মুখটি, শুক্লা তৃতীয়া পর্যন্ত।’

‘মুখটি? আমি তো ছিপি সাঁইট্যা দিছি।’ 

‘ক্যামনে দিল্যা?’ মাপব কী দিয়া?’ 

‘চামচ নাই? ছাওয়াল পাওয়ালগ দুধ-খাওয়ানোর ঝিনুক? 

‘চামচ? ঝিনুক? মানুষ দ্যাহা ছাইড়া দিছ?’ যে-পথ মাড়াইয়া হাঁটো সেইডায় কাদা না পাথর দ্যাহো না? আমার চৌদ্দ পুরুষের পুণ্যে আইজ এক শুদ্দুর আইছে আমার কাম আদায়ে। শুদ্দুরগ চোখে দেহো না? না? খাদ্য নাই, পরন নাই, বৃত্তি নাই। তাগ থাইকব চামচ আর ঝিনুক।’ 

‘দ্যাহেন, কী উলটা কাম! আমি আবার ভাইবল্যাম ভোটে জিতা মেম্বার। কইলকাতার। মুখটির মাপ কইলে আবার অপমান ঠেকবার পারে,’ জিতেন বোতলটা নিয়ে ভিতরে গিয়ে একটা বেশ বড় মুখটি বোতলের মুখে পেঁচাতে-পেঁচাতে ফিরে আসে। যোগেন দাঁড়িয়ে বোতলটা নিয়ে একটু চাপা স্বরে জিতেনকে জিজ্ঞাসা করে, ‘কত দিব্যার লাইগব, কাহা—’ 

‘একপয়সাও না’, ছোটকর্তা জলচৌকি থেকে নেমে খড়মের ওপর দাঁড়ান, যোগেনের পকেটে হাত, জিতেন চলে যায়, ‘যোগেন, দক্ষিণা ছাড়া বৈদ্যের চিকিৎসায় ফল হয় না। ব্যতিক্রম, মুমূর্ষু, রাজকুল ও আগত বিদেশী। 

বিনা দক্ষিণা বৈদ্যস্য চিকিৎসা ন ফলবতী। 
ব্যতিক্রম মুমূর্ষু যথা বিদেশী চ রাজকুলাদি।।’ 

যোগেন পকেট থেকে হাত বের না করে বলে, ‘আমারে এর কোন খোপে ফেইললেন ছোটকর্তা।’ 

‘সেডা কওয়া লাগব। তুমি তো এতলোকের ভোটে রাজসভায় তাগো প্রতিনিধি।’ 

‘আমি তো সেই পোস্টে আমি নাই। আমি তো আইছি বাপের ব্যাধির লাইগ্যা। আপনে দক্ষিণা না কেন, আমারে প্রণামীডা দিব্যার দ্যান।’ 

‘বাবা, তুমি ভোট না কইরলে কি আর বাপের কষ্ট দেইখ্যাও বৈদ্যবাড়ি আসতা? আসতা না।’ 

‘ছোটকত্তা, এরপর তো আমার আইসতে লজ্জা লাগব।’ 

‘অতডা দূর নিজেরে নিয়্যা যাইয়ো না। আইসো’। 

দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিলেন। 

রাস্তায় নেমেও যোগেন বোঝেনি, আকাশ এতটা নীচে, আর বাতাস যেন নারকেলের ডাঁটি ছেঁড়া। অ্যাঁ? এমন তো কথা ছিল না। যোগেন ধুতিটা মালকোচা মেরে নেয়—ওষুধের বোতলটা পথেই একটু নামিয়ে। তারপর, বোতলের গলা চেপে ধরে প্রায় ছুট লাগায়। কথাডা দিছিল কেডা যে ঝড়বৃষ্টি হবে না? 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *