১১৬. ছেলেকে নিয়ে খেলা
সেদিন থেকেই যোগেন তার শরীর থেকে ঘুম আর পলায়ণ ঝেড়ে ফেলে খাড়া হল আর নিজের ছেলেকে বুকেপিঠে তুলে আদর করতে লাগল। ছেলেটার শরীর ভালো হয়েছে। মনে হয়, হাড়গোড় শক্ত হবে। আর ছেলেও যেন বাপকে চিনে ফেলেছে, তাকে আর ১১৬ ছাড়তে চায় না। ছেলের হাসিতে, য্যান বিলের উপর বকের ঝাঁকের উড়ালের আওয়াজ। যোগেন তাকে কাঁধে তুলে, নিজের ঘাড়ের দু-দিক দিয়ে খোকার দুই পা নামিয়ে দেয়, তারপর দুয়ার জুড়ে দৌড়তে থাকে, ছোট-ছোট পায়ে। খোকা যোগেনের মাথার ঘন, কালো, কোঁকড়া বাবরি চুল দুই হাতে টানে। টানার পরে মুঠো আলগা হয়ে গেলে, আবার টানে। কিন্তু দুই পাক ঘুরতে-না- ঘুরতেই এ-খেলা খোকার ভাল লাগে না। সে নেমে আসার জন্য কান্না জুড়ে দেয়—একেবারে চিৎকার করে কান্না, যেন কেউ তাকে মেরেছে। যোগেন তাকে কাঁধ থেকে নামাতে-নামাতে বলে ওঠে, ‘আরে, দেইখছ নি, ক্যামন মিছা চিক্কুর দিয়্যা আটাশ খায় বজ্জাত’। ছেলেকে বুকে নামাতেই সে বাপের নাকের ভিতর আঙুল ঢুকিয়ে হাসে। ‘দেহো, দেহো, চক্ষে এক্কেরে জল আইন্যা ফেইলছে আবার ফোগলা মুখে বিশ্বরূপ দেখায়।
এইসব হট্টরোলে বাড়ির হাওয়াটা বদলে যায়। শেষ রাতে জামাই যদি জল থিক্যা উইঠ্যা আস্যা দুই রাত্তির অজাগর ঘুমায়, তালি বাড়ি তো গুমট হইবই।
কী বৃত্তান্ত কেউ জানল না। জামাই খাওয়ার সময়ও যেন ঘুমায়। কমলার বাবা নিচু স্বরে বাড়ির সবাইকে শাসন করে দেন, যোগেন যে এসেছে তা কাউকে না বলতে। উনি হাটে কোন্ মাস্টারকে বলতে শুনেছেন কলকাতায় নাকী পার্টির গোলমাল হতে পারে। সেই গোলমালেই নাকী অন্য কোনো কারণে যোগেন এমন এসেছে কী না সেটা যোগেনের মুখ থেকে না-জেনে কাউকে বলার দরকার নাই। শুনলেই তো সব এসে ঘিরে ধরবে। আগে যোগেন পুরা ঘুম ঘুমাইয়্যা গা-হাত-পা ঝেড়ে উঠুক, তারপর ও যা বলে তাই হবে।
যোগেন আর তার ছেলে মিলে একসঙ্গে হেসে ও খেলে সবাইকে জানান দিল।
ছেলে-বৌ নিয়ে খাগবাড়ি থেকে যোগেন মৈস্তারকান্দি এল পরের সকালেই—শ্বশুরমশাইয়ের কাছে গোপনে ৩০ টাকা ধার চেয়ে। একটু অবাক হয়েই বলে প্রহ্লাদ, ‘তোমার হইলডা কী? কোনো দুর্ঘটনা না তো?’ প্রহ্লাদের প্রশ্নে যোগেন যে তার স্বাভাবিক হাসিতে মুখটা ভরে তুলল, তাতেই প্রহ্লাদ আশ্বস্ত হয়ে গেল—যোগেনকে মুখে কিছু বলতে হল না। প্রহ্লাদ তার ঘরের চৌকির পাটাতন থেকে ড্রয়ারের মত ছোট একটা বাক্স থেকে কিছু টাকা বের করে ঠোটে আঙুল ভিজিয়ে গুনতে শুরু করতেই ‘বাইরের লোকের সামনে গুপ্তস্থান দেখাইয়্যা দিলেন। এরপর ডাকাইতি হইলে তো জামাইরে ধইরা সদরে চালান দিবে। পাবনা-ফরিদপুরে জামাইবাড়ি ডাকাতি করার নিয়ম আছে না?’
‘হ। এডা তো ঠিক কথাই। উচিত হয় নাই। তবে, পাবনা-ফরিদপুরের কথা তুলল্যা ক্যা? এই হনে তো জামাইয়ের ডাকাতি শ্বশুরবাড়িতে—আমাগ বরিশালি নিয়ম। তুমি ৫০ টাকাই রাখো। পকেট একেবারে খালি রাইখ্যা কইলকাতায় নামা ঠিক না।’
‘শোধ দিব্যার টাইম কত?’
‘ও। আসাযাওয়ায় পাঠ্যায়ো সুবিধামত—’
‘তাও মুখ খুইল্যা কইব্যরে পাইরলেন না—ছি, ছি, এই কয়ডা টাহা কি জামাইয়ের কাছ থিক্যা উশুল নেয়া যায়?’
‘তোমাগ বংশবৃত্তি তো নৌকা বানান্ আর নৌকা সারা?’
‘তাই জাইন্যাই তো মাইয়্যা দিছিলেন?
‘সে কথা থাউক। নৌকার গলুইয়ের কামের লগে একডা বেঁকা করাত, পুরাপুরি বেঁকা না, ধরো পূর্ণিমার চাঁদরে বঁটিতে আধাআধি করলে যেমন বেঁকা যাহে, তেমন—?’
‘মতলব কী? নৌকা—সাপ্লাইয়ের বরাত পাইছেন নি? জামাইরে মিস্তিরি রাইখবেন?’
‘জামাইয়ের একডা প্যাটের লাইগ্যা প্রহ্লাদ বারইবে নারকোইলের আধা-খোল হাতে হাটে ঘুরব্যার লাগব না। জামাই তো আমার। ন্যাতা তো দেশের? তোমার কথা ঐ গলুই করাতের নাগান, দুইদিকেই কাটে।
‘মোটে দুইদিক? আমি ভাইবল্যাম, আপনার বরাত বুঝি তিনদিক কাটার?’
‘যদি কুনো গলুয়ের তিনডা দিক আছে, দেহ, তাইলে আমার লগে কাইট্যা আইনো বাপ। তুমি তো কইল্যা পাবনা-ফরিদপুরের বামুন-ডাকাইতগ কথা। ক্যা? না—ওনারা জামাইরে ডাকাইতি করত। সেই কথার ভাব তো আসলে ঢাকা-বরিশালের মুসলমান শুদ্দুর ডাকাইতরা শ্বশুরবাড়িতে ডাকাতি করে।’
‘দ্যাহেন বাবা, ডাকাইতির মতন উঁচা কাজ নিজেগ নিজেগ মইধ্যে হওয়াই তো নিরাপদ—ক্ষতি-লাভ দুইভাই নিজেগ মধ্যেই থাইকল। কারোরই লস হইল না কিছু।
খাগবাড়ি থেকে মৈস্তারকান্দি যাওয়া কি কোনো খাওয়া না কী? মাঘ মাসের মাঝামাঝি। খেতে জল নেই, তাই তাও একটু যাওয়া (বানানো)—না-হলে তো এ-ঘাট থেকে ঠেলে দিলে ওঘাটে গিয়ে ঠেকে। খাগবাড়ির ঘাট থেকে খাল বেয়ে আগৈলঝরা হয়ে হেঁটে গেলেই-বা কতক্ষণ? কিন্তু খাল থাকতে হাঁটা কেন?
ছোট নৌকাটায় উঠতে-উঠতে যোগেন হঠাৎ মাঝ-পাড়ে পেছন ফিরে বলে ওঠে, ‘আরে, এইডা শকুন্তলার পতিগৃহে যাত্রা? কোনো বাদ্যি নাই, সানাই নাই, কান্দাকাটি নাই, টিনের বাক্স নাই। ‘ পাড় থেকে মেয়েগলায় কেউ আধা গেয়ে ওঠে, ‘আয় লো বর ধরি গিয়া সে বড় লম্পট কপটিয়া’।
ছেলে ছিল কমলার কোলে। যোগেন নৌকায় উঠে দুই হাত বাড়ায়। খালের জলে উলটো ছায়া ফেলে ছেলে বাপের কোলে যায়। ঘাটের পাড় থেকে আবার সেই মেয়েগলা ওঠে, ‘দেখো হেরায়, ছাওয়াল না গড়ায়।’ ঘাটে লগি লাগিয়ে মাটি ঠেলা দিয়ে নৌকা সরায়। অতটা জলবিস্তারে অতটা আলোতে অতটা আকাশের তলে কমলা আর যোগেন সবকিছু ভুলে ছেলেকে দেখতেই থাকে, অপলকে। কমলা তার শাড়ির আঁচল দিয়ে রোদ আড়াল করে। একটু পরেই যোগেন বলে ওঠে, ‘বাতাস আটকাও ক্যান? দ্যাহো দেহি গলা ঘামায়।’
‘গলা ঘামায় তো হাত নাইড়্যা আরাম দ্যান, খালের বাতাসে ঠান্ডা লাইগব।’
‘ও কি বিলাতে জন্মাইছে? এই জল-হাওয়ার ছাওয়াল আর এই বাতাসে ঠান্ডা লাইগব।’
‘দ্যান, আপনারে নিব্যার লাগব না। আমারে দ্যান। ঠান্ডায় জ্বরজারি লাইগলে অর বাপরে পাব কই?’
যোগেন ছেলেকে কমলার কাছে দেয় না। ছেলেকে কোলে নিয়ে একটু নড়াচড়া করে নিজের কোঁচাটা টেনে বের করে খোলে। যোগেন একেবারে হে-হে করে ওঠে যখন হাওয়ায় তার খোলা কোঁচা উড়ে পালের মত হয়ে যায়। যোগেন ‘আরে আরে’ বলে ওঠে বটে কিন্তু ছেলে কোলে সে কিছু করতে পারে না আর কমলা হাততালি দিয়ে ওঠে, ‘এ কেমন বাপ, ছেলেরে কোলে নিতেই কাপড় খুইল্যা যায়’। কমলা ওড়া ধুতি সামলে যোগেনের হাতে এনে দিলে যোগেন সেটাকে ছাতার মত ধরে। এক কোনা থাকে যোগেনের হাতে; আর-এক কোনা দেয় কমলার হাতে। কমলা দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে আলগা করে ধরে থাকে।
যোগেন জিগগেস করে, ‘কী য্যান কইল্যা, ছাওয়ালের জ্বরজারি হইলে বাপরে পাবা কুথায়? কইল্যা না?’
‘এডা কি একডা কওয়ায় কথা? তাই বইল্যা কি আপনারে এইহানে থাকতে কইছি কাজকাম ছাইড়্যা? আপনার বাপ-খুড়া, আমার বাপ-খুড়ার মতো তো আপনার কাম না।’
‘সে তো হইল। কিন্তু আশু স্যার তো আছেন?’
‘হ্যাঁ তো। তেনার কথা ক্যান?’
‘আশু স্যারের কাছে তো আমার কইলকাতার ঠিকানা আছে,’ যোগেন বোঝে কমলা তার কথার ইঙ্গিত পাচ্ছে না, সে যোগ করল, ‘ওর জন্ম সংবাদ দিয়্যা স্যার লাটশাহেবরে টেলিগ্রাম দিছিলেন না?’
কমলা বলে, ‘তহন তো শুইনছিল্যাম। আপনে য্যান কোথায় ছিলেন। সেইখান থিক্যা লাটশাহেব আপনারে বাড়ি আইন্যা দিছিল। শুনছিলাম। বুঝি নাই। হইছিলডা কী?’
যোগেনকে একটু চুপ করে থাকতে হয় ঠিক করতে—কমলার প্রশ্নের জবাব দেবে আগে, না কী তার কথাটা বলে নেবে? সে বলে, ‘না। কইতেছিল্যাম, জ্বরজারি হইলে আশুস্যাররে কইয়ো। লাটশাহেবরে টেলিগ্রাম কইরা দিবে।’ যোগেন নিজেই হেসে ওঠে, ‘তোমার ছাওয়াল তো লাটের লাট। জগতের সবাইর উপরে। জগদীশ। যোগেনের ছাওয়াল জগদীশ।’
মাঘ মাসের খাল তো—মাঝি হয়তো কোথাও ডাইনে ঘুরতে বাঁয়ে ঘুরেছে—দেখে, খাল আর খাল নেই, বাঁধে গিয়ে ঠেকেছে। শীতকালে এদিকে একটা ছড়ান্—আমন চাষ হয়। জল না আটকালে তো বিছন ভেসে যাবে। তাই জল আটকে চাষ হয়। মাঝিটা কমবয়েসি। যদি কোনো আওয়াজ না-করে নৌকোর মুখ ঘুরিয়ে নিত, তাহলে নৌকোর দুই প্যাসেঞ্জার টের নাও পেতে পারত—ছেলে নিয়ে তারা এতই মশগুল। সে একেবারে আলবাঁধে নৌকার মাথা ধাক্কা লাগানোর পর বলে ওঠে, ‘দেখছ নি হোগামারার কাম!’ খালের মুখ জুইড়া বান্ধ।’
যোগেন হো হো হেসে উঠতে পারে, ‘আরে বড়ভাই, এইডা কী কইরলেন? মাঘ মাসের ডোঙ্গায় খাগবাড়ি থিক্যা পথ হারাইয়্যা ফ্যালেন মৈস্তারকান্দির? এ-কথা দুইকান হইলেও তো সারাডা গৌরনদীতে আপনার নামডাক ছড়াইয়্যা পইড়বে—রায়চৌধূরিগ সতী হওয়ার নাগাল। লোকজন কইব্যার ধইরবে—দেহিস আবার জুড়ান শ্যাখের নাগাল জলাভোলায় য্যান না ধরে।’ যোগেনের কথা থামে বটে কিন্তু সে আবার তার সেই শীতকালের বজ্রধ্বনির মত হাসিতে আকাশ-বাতাস ভরিয়ে দেয়, ‘আ রে, জলাভোলা জুড়ান শ্যাখ, তুমি খাগবাড়ি থিক্যা মৈস্তারকান্দির খাল হারাইল্যা’, যোগেনের হাসি যেন আর থামে না।
মাঝি, জুড়ানশ্যাখ, ততক্ষণে নৌকোর মুখ ঘুরিয়ে ফেলেছে। সে যোগেনের হাসিতে বিরক্ত হয় আর কথা শুনে রেগেও যায়। ‘মানষের জিভা তো লকলকায়। আগুনের মতন। এই কথাডা যদি হাটের মইধ্যে ফাটে তাইলি তো তারে নাম বদলাইব্যার লগেব বা মাঝিগিরি ছাইড়্যা অন্য কাজ কারবার ধরা লাগে। তাতেও তো মুশকিল। অ্যাহন তার নাম জানে বড়জোর দশজন। নাম বদলাইলে তো জানব একশ জন। সে যোগেনকে ধমকে ওঠে, ‘দ্যাহো ভাইগন্যা, অত বন্দুকের আওয়াজ দিয়া হাইসোনা, দাঁত ছুইড্যা কপাল ফুইড্যা কইরা দিবে।’
জুড়ান ভয় পেয়েছে বুঝে যোগেন তাড়াতাড়ি বলে ওঠে। ‘জুড়ান শ্যাখরে সবাই তো জানে যোগেন মণ্ডলের মামা বইল্যা। ভাইগ্যার মুখে মামার গোপন কথা শুইন্যা বিশ্বাস কইরব কোন্ বলদায়? কিন্তু সেই ভয়ে কি আমি মামার কলঙ্ক রটনা দিব না?’ যোগেন গুনগুনিয়ে গায়। ‘তোমার লাগিয়া কলঙ্কের হার গলায় পরিয়া সুখ—’
জুড়ানশ্যাখ সুরটা শেষ করতে দিয়ে সেই, জলের একটু আওয়াজ ও বাতাসের সামান্য ধ্বনির স্কেলে নিজের গলা বেঁধে বলে, ‘হার কার? কলঙ্কই-বা কার?’
এরমধ্যেই ওরা মৈস্তারকান্দির যে-খাত দিয়ে যোগেনদের ঘাটে লাগানো যায়, সেই খাতে ঢুকে পড়ে।
যোগেনের আসার খবর তো মৈস্তারকান্দিতে আসেনি। বৌ নিয়ে, ছেলে কোলে যোগেন চেঁচায়, ‘যোগামা কই গেলা?’
‘কেডারে?’ বলল একজন। আর ঐটুকু বাড়ির তিন ভিটের তিন ঘর থেকে বেরল পাঁচ-ছয়জন। যোগেনের মেজকাকি দৌড়ে এসে যোগেনের কোল থেকে ছেলেকে নিজের কোলে নেয়, ছেলে কোনো কান্নাকাটি করে বা হাত-পা ছুঁড়ে কোনো আপত্তি জানায় না। ঘরের ভিতর থেকে কফে আটকানো গলায় যোগেনের বাবা চিৎকার করে, ‘আরে, আইল কেডা? অ বৌমা, আইল কেডা’। তারপরই কাশতে শুরু করে এত জোরে জোরে যে দুয়োরে দাঁড়িয়ে মনে হয়, এ-কাশি একেবারে দম টেনে থেমে যাবে। বাড়ির যারা তারা শুনতে-শুনতে আর শুনতে পায় না। যোগেন একটু জোর পায়ে বাপের ঘরের দিকে যায়, ‘বাবা, আমি, আমি আইছি।’
যোগেনের বাবা জিজ্ঞাসা করে, ‘কেডা আইছে? কেডা?’
যোগেন ততক্ষণে তার পাশে বসে তার বুক দলে দিতে-দিতে বলে, ‘আমি যোগা আইছি—’
‘কহন আইলি? আমারে তো কেউ কয় নাই—’
যোগেন বাবাকে আরাম দেয়ার চেষ্টা করতে-করতে বলে, ‘আরে, এই তো আইল্যাম, কইব কেডা?’
যোগেনের বাবা জিগগেস করে, ‘থাকবি তো?’
‘ঐ যেমন থাকি, দুই-চারদিন। তোমার নাতিরে নিয়্যা আইল্যাম’।
‘নাতি? নাতি তো এইহানেই?’
‘তোমার তো বিশ্বজোড়া নাতি। সবড়া কি এই বাড়িতে আঁটে। ওইডাই শ্যাষ কী না, তাও তো জানি না। অ যোগামা, বাবারে নাতি দেখাও’।
যার কোলে ছেলে ছিল, যোগেনের মাইঝ্যান কাকিই নিয়ে ঘরে ঢোকে। যোগেনের বাবা ভুরু কুঁচকে, চোখ নিশ্চল কলে দেখার চেষ্টা করে। তারপর বলে, ‘ওরা তোর লগে আইল ক্যামনে? এইহানেই ছিল?’
‘না। ওরা তো ঐ বাড়িতেই আছে। আমি ঐ বাড়ি হইয়া অগ নিয়্যা অ্যালাম।’
‘যোগা, আইস্যাই যহন পড়ছিস, কবরাজ মশাইয়ের লগে এডডু যাবি। যদি একডা বাসক পাতার পাচন বানাইয়্যা দ্যান, তালি বুঝি কাশিটা উইঠ্যা আইসব। না?’
যোগেনের মুখ দিয়ে বেরিয়ে এসেছিল, ‘বইল্যা কাম কী?’ বাকিটা, ‘কবরাজ মশাইরে নিয়্যা আসি ডাইক্যা’ বলার আগেই তার বাবা বলে ওঠে, ‘তাইলে বাদ দে। হয়। সরষ্যার ত্যাল ভাল কইরা মাইখলেই বিষব্যথা সাইরা যাইব। না?’
যোগেন তখন কথাটা ঘুরিয়ে বলতে পেরে বেঁচে যায়, যেন কথার কথা বলছে এমন ভাব করে বলে, ‘যাই-ন্যা। দেখাটাও হবে নে। আর তেন-পাঁচন যাই দ্যান—’
একটু চুপ করে থেকে যোগেনের বাবা অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে বলে, ‘দ্যাখ ভাইব্যা—’
যোগেন উঠে বাইরে যায়।
হঠাৎ করে বাবাকে দেখে যোগেনের মনে হয়ে গিয়েছে, বাবার কষ্ট হচ্ছে, হাসপাতালে চিকিৎসা করালে হয় তো! এটা একেবারে রোজকার অভ্যাসের কাজের মত, একটুও না-ভেবেচিন্তে করে ফেলেছে। বাপের জন্য এটুকু করা এখন যোগেনের ক্ষমতার মধ্যে পড়ে। কলকাতাতেও করতে হয়। কলকাতাতে যাদের জন্য করতে হয়, তারাই যোগেনের ক্ষমতাটা ব্যবহার করে। এখানে, মৈস্তারকান্দিতেও তো এমন কিছু কঠিন না। হাসপাতাল তো এক বরিশালে। যোগেন যদি সিবিল সার্জেনকে একটা চিঠি লিখে কাউকে দিয়ে পাঠিয়ে দেয় আর বাড়ির ঘাট থেকেই বাবাকে নিয়ে একটা নৌকায় রওনা দেয়, তাহলেই তো হয়। যাতায়াতটাই সমস্যা—খালের সুবাদে সেটা এখানে নেই। এক নৌকোতেই বরিশালে যাওয়া যায়।
যাওয়া গেলেই কি আর যাওয়া যায়? বাবাকে এ কথা বললেই বাবার শ্বাসকষ্ট হয়ে যাবে—হা স পা তা ল? ক্যানে আমারে শ্মশানে নিয়্যা যাওয়ার চাইরডা শুদ্দুরের কাঁধ কি পাওয়া যাবে না? আমারে মাইরা ফেইলতে চাস, বাড়িতেই মার্।
তারপর, বাড়িতে কাকা-কাকিদের আপত্তি উঠবে। সে-আপত্তির প্রধান প্রশ্নই হবে—যোগেন ক-দিন থাকবে?
যোগেন যদি বলতে পারত—আমি নিয়্যা যাচ্ছি, সারাইয়্যা ফিরত দিয়া যাব; তাহলেও বাড়ির লোক রাজি হত না। রাজি না-হওয়ার কত কারণই যে আছে আর তার সবগুলো কারণই এত জোরালো যে একটা কারণেরও কাটান দেয়া যাবে না। না-জানা কারণ যে কত আছে।
মৈস্তারকান্দির কথা না-হয় বাদই দেয়া যায়, এই গৌরনদী থানায় কেউ কল্পনা করতে পারে যে মাঘ-ফাল্গুনের কাশি সারাতে এই বুড়োকে বরিশালের হাসপাতালে নেয়া হচ্ছে।
এমন চরম জায়গা থেকে শুরু করায় যোগেন উলটো কথাও ভেবে ফেলে। গৈলা, কিংবা মাহিলাড়ায়, কি বাটাজোড়ে শিক্ষিত জমিদারপ্রধান জায়গায় হয়ত অনেকেই পক্ষে দাঁড়াত কিন্তু তারা তো নিয়ে যেত কলকাতায়। তাও নিত কী না, সন্দেহ যোগেনের।
ঐ গৈলা-মাহিলাড়া-বাটাজোড়ের বাবুরা কিন্তু যোগেনের বাবাকে নিয়ে যাওয়ার পক্ষে মত দিত না। বামুন-কায়েতরা নিচু জাতের বিরুদ্ধে কোনো ভাবনা চেপেচুপে রাখতে পারে না। তারা প্রকাশ্যেই বলে বেড়াত ছোটলোকদের কী বাড় বেড়েছে। আর যদি-বা দু-একজন চুপ করে থাকত, তারাও বিমূঢ় হয়ে ভাবত, যোগেন তার বাপের শ্লেষ্মা সারাতে বরিশাল শহরে নিয়ে যেতে পারে যে-ক্ষমতায়, সে-ক্ষমতা যদি কোথাও থাকেও, তা কী করে বামুন-কায়েত-বৈদ্যদের আয়ত্তে না-থাকতে পারে?
ফলে, সেখান থেকে এমন পালটা রাজনীতিও শুরু হতে পারে যে খোলা সিটে তপশিলি প্রার্থী দাঁড়ানো চলবে না। শেষ পর্যন্ত কিছু না-হলেও ওটাই তো যোগেনের সবচেয়ে জোরে জায়গা। সেখানে ঘোঁট বেঁধে যাবে।
