১১
১২
১৩
১৪
১৫
3 of 4

১১৩. ক্ষমতা দেখে যোগেনের আতঙ্ক

১১৩. ক্ষমতা দেখে যোগেনের আতঙ্ক 

সারা বিকাল, সন্ধ্যা, রাত জুড়ে জল, শুধু জলস্রোত, শুধু জলের সঙ্গে জলের আঘাত-স্বর, যোগেন বুঝতে পারে, তার মন ও মাথা শূন্য হয়ে গেছে, বা শূন্য সে রেখে দিতে পেরেছে। তাহলে তার শরীরের স্বভাবে তার ঘুমিয়ে পড়া উচিত ছিল। যোগেন মনে বা শরীরে শূন্যতার লালন জানে না। বরং তার শূদ্রদেহে কখনো শ্রমের কোনো অভাব ঘটে না, বিশ্রামেরও কোনো অভাব ঘটে না। 

ট্রেনে ওঠামাত্রই তার পালানো শেষ হয়ে যাবে—এমন একটা কোনো পরিত্রাণ কি তার মনে কোথাও আকাঙ্ক্ষিত ছিল? সে কোথা থেকে পালাচ্ছে, কোথায় যাচ্ছে, কেন ছুটছে—এমন কোনো কথা যে তার মন বা মাথার ত্রিসীমানায় নেই সেটা তো যোগেন বোঝে খুলনা এক্সপ্রেসের ফার্স্টক্লাশে একা বসে ও হাতভাঁজির ওপর মাথা রেখে, বেয়ারা চাদর-বালিশ নিয়ে এলে শুধু বালিশটা নিয়ে সে ঘাড়ের তলায় গুঁজে দেয়। এতই অভ্যস্ত ও নিশ্চিত ছিল যোগেন যে বুঝতে তার একটু সময়ই লাগে, অন্তত রানাঘাট পর্যন্ত যে ঘুমুতে পারছে না সে। কিন্তু একটা আচ্ছন্নতা ছিল—সে-আচ্ছন্নতায় চোখ খোলা যায় না, বন্ধও করা যায় না। 

তারও কিছু পরে, সম্ভবত একটুকরো ঘুমের পরে যোগেন শুনতে পায় জলরব, বিকেল বা সন্ধের আবছায়ায় কোনো স্রোতাময় বিস্তারের নিজস্ব অন্ধকারে ঢুকে পড়ার জলরব। সেই শুরু। তারপর, যে-জলধ্বনি আর তাকে ছাড়েনি। 

যোগেন জানে, ছাড়বে না। 

যোগেন জানে, জলপ্রাণীদের মতই জানে, জল কখন শরীরটাকে লেপটে নেয় একেবারে গতিবেগের সঙ্গে মিলিয়ে, গতি আর স্রোত যখন পৃথগর্থক নয়। জলপ্রাণীদের মতই জানে যোগেন, জল কখন শরীরটাকে লেপটে নেয় যে-সামান্য ঢেউ ওপরে উঠবার আগেই জলে ভেঙে যায় সেই ঢেউয়ের পরতে-পরতে। যোগেন জানে, জলপ্রাণীদের মতো নিশ্চয়তাতে জানে এই জল, এই জল তার দেশ, এই দেশে তার বাঁচা আর মরায় সময়ভেদ ঘটে না। যোগেন সেই জলবিলাসের মর্মরটুকু মাত্র শুনতে পায়, নিজের আসঙ্গের তৃপ্তির ঘনতায় জলপ্রাণীদের শরীরে যে-বিলাস ধ্বনিত হয়। যোগেন যে-জলে জেগে থাকতে পারে না। ঘুমিয়ে পড়তে পারে না। শুধু ভেসে যেতে পারে। 

জলধ্বনি আর হাওয়াবেগে কখন-যে যোগেনের মনে এসেছে, সে তার আত্মরক্ষার দুর্গে ঢুকে গেছে। সে এমন কিছু মনে আনতে চায়নি। সে কিছু ভেবে উডবার্ন পার্ক থেকে শেয়ালদায় দৌড়ে আসেনি। কিন্তু, দৌড়েই এসেছে। কোনো কিছু তাড়া না-করলে বা তাড়া করেছে না-ভাবলে দৌড় আসবে কেন ভঙ্গিতে? যোগেন ভুলে গিয়ে থাকতে পারে, তাড়াটা কী ছিল। ভুলে গিয়ে থাকতে পারে, সেই পলায়নে কী ভাবছিল সে, কিছু কি ভাবছিল। যেন ধরে নেয়া হয়, জেগে থাকলে ভাবতেই হবে। যোগেন মনের বা মাথার অভ্যাসে কিছু ভাবছিল কী না, সেটাই তার মনে নেই। গলা শুকিয়ে কাঁটা-কাঁটা লাগছিল, পায়েও একটু টান লাগছিল বাঁ-পায়ের বাটিতে। সেগুলোকে তখনো তার ভাবনাসংক্রান্ত কিছু মনে হয়নি। এই ট্রেনটা ছাড়ার সময় জানা ছিল না তার যে ট্রেনটা ধরতেই সে ছুটছে। যদি ট্রেন নাই থাকত, নাই ধরতে পারত, যোগেন কি তাহলে যে-ট্রেন পেত তাতেই চড়ে বসত ও সেটা যেখানে তাকে নিয়ে যেত সেখানেই যেত? না। না। যাওয়ার জায়গা ছিল অপরিবর্তনীয়। আত্মহত্যা করতে আসা মানুষের কি জায়গাবদল হয়? হয় যদি, তাহলে সেদিন তার আত্মহত্যা করা হয়ে ওঠে না। না। যোগেনের ছোটার মধ্যে কোনো আত্মহনন ছিল না। ছিল, যদি থেকে থাকে, বড়জোর হননের ভয় থেকে পলায়ন। কেন? যোগেনের দরকার পড়ছে পলায়নের কোনো কারণ? শুধু পালানোর জন্যই তো সে পালিয়ে থাকতে পারে। যোগেন তো দেশের এত বড় কোনো নেতা নয় যাকে তারই দলের লোকজন ধাক্কা দিয়ে মাটিতে ফেলে দিলেও তাকে হামাগুড়ি দিয়ে উঠে দাঁড়াতে হবে। বা, যাকে ধাক্কা দিয়ে ঠেলে সরিয়ে দিলেও তাকে বেরবার নিরাপদ সময়ের জন্য অপেক্ষা করতে হবে। পালানো ছাড়া যোগেনরা নিজেদের বাঁচাবে কী করে? ভয় থেকে পালাবে কী করে? যোগেনদের ভয় তো প্রমাণের অপেক্ষা করে না—এই কথা বা সত্য যোগেন কি ভুলে গিয়েছিল এই বছর-দেড়-দুই-এর এমএলএগিরিতে। উডবার্ন পার্কের কংগ্রেস মিটিঙের টিনের বেড়ার একটা ফুটোতে একটা চোখ রেখে যত ভয়ংকর ঘটনাই সে দেখে থাক ও ভয় পাক যোগেন যদি সেই ভয় থেকে সরে যেতে চায়, বা সেই দৃশ্যের গোপনদর্শীও না হতে চায়, তাহলে ফুটো থেকে চোখ সরিয়ে, ঘুরে দাঁড়িয়ে, দুই হাত টানটান মাথার ওপর তুলে আড় ভাঙতে-ভাঙতে একটা হাইতোলার জন্য হাঁ করে, হাঁ-বোজানোর আগেই, দুই পা ফেলে অপরিচয়ে হারিয়ে যেতে পারে। পালানোর জন্য বা নিজেকে হারানোর জন্য তাকে কীনা সেই উডবার্ন থেকে শেয়ালদা পর্যন্ত দৌড়তে হয়? তারপর দাঁড়িয়েথাকা ট্রেনের বেঞ্চির তলায় লুকোতে হয়? 

এখন যোগেন যে আতঙ্ক থেকে নিষ্ক্রান্ত হয়েছে, তা নয়। 

কিন্তু অনেকটা সময় তো তার কেটে গেল এমন নিথরতায়, ট্রেনে ও জলে, যার দুই পাড়ই এত দূরে ও গতিমান যে আতঙ্ক থেকে নিষ্ক্রান্ত না-হয়েও, যোগেন, ‘বেঁচে গেলাম’, এমন একটা স্বস্তি বানাতে পারে। 

সে কি পালাচ্ছিল? ভয়ে?, নাকী সে তার স্বদেশে পৌঁছুতে চাইছিল, যে-স্বদেশ ভারতের মত বিশাল নয়। নাকী সে তার নিজের হাওয়ায় শ্বাস টানতে চাইছিল যে-হাওয়া সমুদ্রের মতো অনন্ত থেকে বয়ে আসে? যোগেন অন্ধকারে জলকল্লোলের ওপর চোখ মেলে দেয়। কী আওয়াজ, জলের! কী বেগ, হাওয়ার! কী বিস্তার, স্রোতের। 

যোগেনের কথাবলার যে-ভঙ্গি বিখ্যাত হয়ে যাচ্ছে, নিজেকে নিয়ে তার ঠাট্টার যে-সরলতা চেনা হয়ে যাচ্ছে অনেকের, পাঁকালমাছের মতো তার যে-পিচ্ছিলতা ক্রমেই রাজনীতির হিশেবের বাইরে চলে যাচ্ছে—সেটা তো যোগেনকেও প্রভাবিত করেছে। সেই প্রভাবেই কি যোগেন নিজেকে একটু ঠাট্টা করতে চায়, নিজেকে নিয়ে তার নিজের ভাবনার এই মেরুবদলে? পালানো হয় পৌঁছুনো, ভয় হয়ে যায় অনিয়ন্ত্রিত প্যাশন, মেঘনা-কীর্তনখোলা হয়ে যায় স্বদেশ? 

যোগেনের আধুনিক অভ্যাসে মনে এসে গিয়েছিল–বাঃ, বেশ বামুনগ মতন ভাবা প্র্যাকটিস হইয়্যা গিছে কিন্তু সে কিছুতেই বাক্যটা শেষ করল না। সে তখনো তার ঘোরে। সে-ঘোরটা সে কাটাতে চায় না। শস্তা করে নিতেও চায় না। এইসব কুশলতা মিথ্যা। মিথ্যা। মিথ্যা। চতুর। কপট। নীতি। নীতি? নীতি!! ভোটে জিতলেই রাষ্ট্রপতি হওয়া যায়? তুমি কী করবে সেটা তুমিই ঠিক করবে? কোন্ সভায় আমি হাজির থাকব, কোন্ সভায় থাকব না আর কোন ঘোষিত সভায় তিন দিন আগে এসে বসে থাকব, যেমন এসেছি উডবার্ন পার্কে একবছরের পুরনো নেমন্তন্ন রাখতে. কিন্তু মিটিঙে যাব না—সেটা তো আমারই সিদ্ধান্ত, এক আমারই, আমার প্রতিপক্ষ অনুযায়ী আমার নীতি বদলাই। আমি যা করি সেটাই নৈতিক আর যে আমার বিরোধিতা করে সে-ই-ই অনৈতিক—এই বিশ্বাস আমাকে তিল-তিল করে গড়ে তুলে, তিল-তিল করে ছড়াতে হয়েছে একটা দেশের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে নৈতিকতম করে তুলতে। সে কি তোমার মতো একজন উটকো নেতাকে বিলিয়ে দিতে? তুমি তো জানই না, কখন তোমার কথা দুর্বোধ্য ঠেকবে এদের আর কখন তোমাকে শুধু ‘হ্যাঁ’ আর ‘না’-টুকু বলার অধিকার দেয়া হবে। আমার করুণাকে, মূর্খ, তুমি ভাবো পারিবারিক? বারবার বলো, আমি তোমার পিতার মত। তুমি কি জানো, সত্যি করেই আমার জ্যেষ্ঠ পুত্র আমাকে ত্যাগ করে, হারিয়ে গেছে? আমার বড় ছেলে–সে তো চাইতেই পারে একটু আলাদা আদর তার বাবার কাছ থেকে। ওকে আমি সে-গল্প বলিনি—বুদ্ধ তাঁর একমাত্র ছেলেকে বলেছিলেন ‘রাহুল’, বুদ্ধের শত্রু রাহু, বুদ্ধের অভিযানের বাধা। বলিনি—কারণ এই গল্পকে যুক্তি করে তোলা দুর্বলতা, আমার। হয়তো হরি নিজে সে-গল্প জানত। ও তো পড়াশুনো করত খুব। আর, আমার তো জীবন ছাড়া কোনো গ্রন্থ নেই। আমি কী করে আমার করুণার শক্তিকে ঘুষ হিশেবে আমার ছেলেকে দেব, বা, তার মাকে, বা, বাড়ির আর-কাউকে? যে-কুষ্ঠরোগীর ঘা আমি নিজের হাতে ধুয়ে দিচ্ছি তার নাম কেউ জানে? আমি জানি? সে-ছবির গল্প মানুষ কত শাস্ত্রে কত হাজার বছর ধরে পড়েছে কত ধর্মগ্রন্থে, কত শাস্ত্রে। কিন্তু কোনোদিন দেখেনি এই ছবি—তাদের চেনা একটা লোক এক কুষ্ঠরোগীর ঘা নিজের হাতে পরিষ্কার করে দিচ্ছে। আমাদের মহাজনরা কত উপদেশ দিয়ে গেছেন, একজনও ব্যবহার দেননি। আমি শুধু ব্যবহারটুকুই দেখাতে চাই। তুমি তো জানো, কতবার আমি অনশন করেছি। সবাইকে বলেকয়ে। যথেষ্ট সময় দিয়ে। একজন মানুষের না-খেয়ে নিজেকে মারার অধিকার আছে এইটুকু প্রমাণ করতে। কিন্তু তুমি তো জানো না, পাঁচ-ছদিন পর যখন তোমার শরীরের ব্যবস্থাগুলি ধসে যেতে শুরু করে তখন মৃত্যু মোহন হয়ে ওঠে! কিন্তু আমি তো বাঁচার জন্য অনশন করছি। জীবনের জন্য। তখন আবার নিজেকে গুছিয়ে নিতে হয়। যোগেনের মনে পড়ে, ইফ ইট ওয়্যার ডা…ন। 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *