১১২. কলকাতা এআইসিসি ৩৯
কিন্তু কিছুতেই কিছু বদলাল না।
অথচ এ-আই-সি-সি যথাসময়ে হচ্ছে।
বরং এই চিঠিপত্রের সুযোগে গান্ধীজি তাঁকে আরো তুচ্ছ করতে পারলেন। প্রায় প্রত্যেকটি চিঠিতেই গান্ধীজি লিখছিলেন—তোমার কাজ-করার টিম কোথায়, তুমি কী করতে চাও বলো, প্রমাণ দেখাও যে দেশ আমার চাইতে তোমার ওপর বেশি ভরসা করে। তোমার যদি টিম না থাকে, কী করবে ঠিক না থাকে ও তোমার প্রতি সমর্থনও এমন খুচরো হলে পথ ছেড়ে দাও, আমার লোকদের আমার কাজ করতে দাও।
এআইসিসির অধিবেশন ডাকা ছিল ২৯ এপ্রিল, কলকাতায়। ডাকা তো ছিল, গেল বছর থেকেই, সুভাষের অভিষেক উপলক্ষে শরৎ বোসের দাওয়াতের জবাবে। তখন তো জানা ছিল না, অভিষেকের উৎসব অভিষেক আর বাড়াতে চায় না। অথচ নিমন্ত্রণ তো আর শরৎ বোস ফিরিয়ে নিতে পারেন না। কংগ্রেসও এই বিশেষ অবস্থায় বলতে পারে না—যাব না। আগে নেহরু ও সুভাষের কথা হয়, নেহরু গান্ধীকে পরিষ্কার জানালেন, ‘অসংখ্য দোষ থাকলেও সুভাষ বন্ধুত্বের বশ। আমি জানি, আপনি চাইলেই সেটা হতে পারে। …তাকে ঠেলে বাইরে ফেলে দেয়া আমার কাছে নিষ্ঠুর ও সম্পূর্ণ ভুল কাজ মনে হয়েছে।’
২৯ এপ্রিলের অধিবেশনের শুরুতেই সুভাষ জানান, ত্রিপুরীর প্রস্তাব অনুযায়ী মহাত্মাজির পরামর্শ নিয়ে তিনি কোনো ওয়ার্কিং কমিটি তৈরি করতে পারেন নি। সেই কারণে তিনি পদত্যাগ করছেন।
নেহরু পদত্যাগের বিরোধিতা করেন ও বলেন, পুরনো ওয়ার্কিং কমিটি বহাল থাক, দু-জন সদস্য শিগগিরই শারীরিক কারণে পদত্যাগ করবেন, সেই দুটি পদে কংগ্রেস-রাষ্ট্রপতি তাঁর মনোনীত দু-জনকে আনুন, সুভাষ তাঁর পদত্যাগ পত্র প্রত্যাহার করুন।
রফি আহম্মদ কিদোয়াই ও জয়প্রকাশ নারায়ণ নেহরুকে সমর্থন করলেন। সেদিনের মতো সভা শেষ হল বলা যায় না, ভণ্ডুল হল।
সভা থেকে বাইরে বেরবার এই একটিই পথ—বেশ সাজানো-গোছানো, উঁচু। দু-পাশে পাকা বাঁশ বেঁধে বেড়া, যাতে ভিড়ে নেতাদের যাতায়াতের পথে কোনো বাধা না পড়ে। বাইরের গেট সামলাচ্ছিলেন, বাইরে থেকে আনা লোকরাই, তাদের মাথায় টুপিও ছিল না, কাঁধে ব্যাজও ছিল না।
বড় গেট পার হওয়ার পর সব কংগ্রেস সেবাদলের ভলান্টিয়ার—শাদা ঢোলা হাফ প্যান্ট, শাদা মোটা হাফশার্ট, মাথায় গান্ধী ক্যাপ, কারো কারো বগলে এক হাতি ছোট লাঠি, সেগুলোকে এখন নাকী নেহরু-ব্যাটন বলে। এদের টুপিও আছে, ব্যাজও আছে। যোগেন খুব আবছা মনে করতে পারে, যেন শুনেছিল, ১৯২৮-এর কংগ্রেস অধিবেশনে সুভাষ ছিলেন স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর প্রধান, তাঁকে বলা হত ‘জেনারেল অফিসার ইন কম্যান্ড’-এর সংক্ষেপনে ‘গক’ বলে। এতই আনমনে শোনা যোগেনের এই গল্প যে সে আজও জানে না। ‘গক’ কি ছিল কংগ্রেসের অফিসিয়্যাল নাম, নাকী, কাগজের বানানো নাম। ছড়াও বেরিয়েছিল অনেক। পরে শুনেছে যোগেন, মনে রাখেনি। গান্ধীজি নাকী ঠাট্টা করেছিলেন, ‘সুভাষবাবুজ টিনড্রাম সোলজার্স’। একটু অপছন্দই ছিল অহিংস কংগ্রেসের আধা-সামরিক ইউনিফর্ম। অন্যদিকে, সুভাষ বাবু নাকী সব সময়ই চাইতেন, কংগ্রেসের স্বেচ্ছাসেবকরা ইউনিফর্ম পরবে, লাইন দিয়ে হাঁটবে, মার্চ করবে—মানে, দল হিশেবে কংগ্রেসের সাংগঠনিক দৃঢ়তা, শৃঙ্খলা, তৎপরতা আলাদা করে যেন চোখে পড়ে। ইতালিতে মুসোলিনির ‘ব্ল্যাক শার্ট’দের দেখেই নাকী সুভাষবাবুর এই শখ হয়েছিল-এও শুনেছে যোগেন।
অধিবেশন তো হচ্ছে উডবার্ন পার্কে, শরৎ বোসের বাড়ির মাঠে, যোগেনের অফিসঘরের জানলার সামনে। যদি চাইত তা হলে যোগেন তো তার চেয়ারে হেলে, টেবিলে পা তুলেই অধিবেশন দেখতে-শুনতে পারত। ‘রিসেপশন কমিটি’র পক্ষ থেকে রান্নার লোকজন, মিস্ত্রিরা, ইলেকট্রিকের লোকরা, এমন কী, যে-মেয়েরা স্বেচ্ছাসেবিকার কাজ করবে, তারা, তাদের মধ্যে এই বাড়ির মেয়েরাও আছেন, শরৎবাবুর মেয়ে গীতাই তো ওয়ার্কিং কমিটির মেম্বারদের দায়িত্বে—সকলকে তো যোগেনই ঢুকবার অনুমতি সূচক ব্যাজ দিয়েছে। ‘অভ্যর্থনা সমিতি, নিখিল ভারত কংগ্রেস কমিটি, ১৯৩৯, কলিকাতা।
যোগেন যে-অধিবেশনে থাকতে পারছে না, সেটা ধরা পড়ল প্রথম দিনই, উদ্বোধন হয়ে যাওয়ার পর, পতাকা উত্তোলনের পর। সিদ্দিকিশাহেব, তার সঙ্গে যোগেন ঢুকছে না দেখে বলেন, ‘কী হল? আসেন।’
‘আপনে বসেন গিয়্যা। আমার কাম আছে।’
‘কাম আছে? এর চাইতে বড় কাজ? কংগ্রেসের এই অধিবেশন না শুনলে রাজনীতি করবেন কী করে। দিস ইজ দি পিপলস পার্লামেন্ট।’
‘খাড়ান। আমি কাইলই সারওয়ার্দিশাহেবকে জানাইব—আপনে কী বলছেন।’
‘জানাবেনই যখন, ভিতরে চলেন, আরো অনেক কথা বলব। আপনার চার্জশিটটা তাহলে জমকালো হবে। তবে খাজাকে দিলে ভালো হয় না, চার্জশিটটা? চলেন তো। আমরা তো সব দর্শক-আসনে বসব। আপনাকে বাইরে রেখে কি ভিতরে যাওয়া যায়? চলেন।’ সিদ্দিকিশাহেবের সঙ্গে যোগেন ঢুকল।
আজ ৩০ এপ্রিল (৩৯) যোগেনকে তো কংগ্রেস-অফিসের কাজে আসতেই হত। কিন্তু সে আজ প্যানডেলের ভিতরে ঢুকবে না। কাল যে-ভাবে মিটিং শেষ হল, তার ভালো লাগে নি। সুভাষবাবু নিজেই যে পদত্যাগ করতে পারেন, এ-কথা তার জানা ছিল না। গান্ধীজি মিটিঙে এলেন না, অথচ এই বাড়িতেই আছেন। কালী পুজোয় বলির লাইনের পাঁঠা যেমন ইতিপূর্বে বলি-দেয়া পাঁঠার রক্তের গন্ধে ভয়ে, ত্রাসে, নীরবে কেঁপে-কেঁপে ওঠে, যোগেন তেমনি কেঁপে-কেঁপে উঠছিল। গান্ধীজি নিজেই সাংবাদিক সম্মিলনে বলেছেন, দেশের স্বার্থের কথা ভেবেই তিনি বল্লভভাইকে অধিবেশনে আসতে নিষেধ করেছেন। অথচ তিনি ত্রিপুরীতে ছিলেন না। সেখানে পন্থ-প্রস্তাবে, জয়ী রাষ্ট্রপতি সুভাষকে শিকল পরানো হল যে গান্ধীজির ইচ্ছা ছাড়া নতুন ওয়ার্কিং কমিটি তৈরি করা যাবে না। এ-কথাও রটেছিল ত্রিপুরীতে যে পন্থ-প্রস্তাবে গান্ধীজির অনুমোদন আছে। সুভাষ বাবু ওঁদের খড়্গাঘাত ঠেকাতে, ওঁরা তাঁকে তাড়িয়ে দেয়ার আগে নিজেই নিজেকে তাড়ালেন। কেন? তাতে ওদের পরিকল্পনা ভেস্তে যেতে পারে, এই আশায়? পাল্টা চাল? নাকী, দুদিন ধরে গান্ধীজির সঙ্গে কথা বলে বুঝলেন, তাঁর কোনো পরিত্রাণ নেই, এই হতাশায়? আত্মসমর্পণ? কাল অধিবেশন শেষ হওয়ার আগেই প্রতিনিধিদের মধ্যে গালাগালি হাতাহাতি শুরু হয়ে যায়। তখন অধিবেশন মুলতুবি ঘোষণা করে দেয়া হয়। প্রতিনিধিরা হুড়মুড়িয়ে পথ আটকে দেয়। রাজেন্দ্রপ্রসাদ যখন বেরচ্ছিলেন, পেছন থেকে কেউ তাঁকে ধাক্কা মারে এত জোরে যে তিনি হুমড়ি খেয়ে মাটিতে পড়ে যান যদিও দু-হাত মাটিতে ফেলে সামলান। নেহরুকে বাঁ-দিক থেকে একটা ভিড়ের তোড় এসে হঠাৎ ডানদিকে ঠেলে দেয়। নেহরু তাঁর আগে রাজেন্দ্রপ্রসাদের দুরবস্থা দেখে অনুমান করতে পারেন, তাঁকেও ওরকমই কিছু করা হবে। তিনি ওখানেই একা দাঁড়িয়ে থাকলেন। ততক্ষণে কংগ্রেস সেবাদলের স্বেচ্ছাসেবকরা লাইন বেঁধে হাতে হাত ধরে একটা প্যাসেজ তৈরি করে ফেলেছে।
কাল থেকে সুভাষের সঙ্গে যোগেনের দেখা হয়নি।
যোগেনের ভিতরে কি কোনো অনিশ্চয়তা আছে—আজ কী হবে? নইলে সে দেখতে-শুনতে চায় কেন? অথচ, সে কালকের মতো আজ ভিতরে যাবে না কেন? বাইরের যে-দিনমজুরদের ডিউটি দেয়া হয়েছে ও আরো কিছু অনাহুত-রবাহুতের ভিড়ের পেছনে লুকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে কেন? সেই মজুরদের ঠিকেদার যোগেনকে চিনতে পেরে টিনের একটা চেয়ার এনে দিলে, সেটাকে বেড়ার কাছে ঠেলে নিয়ে ভালো করে লুকতে পারে যোগেন
৩০ এপ্রিল (৩৯) দ্বিতীয় অধিবেশনের শুরুতেই নেহরু বললেন—গতকাল আমার প্রস্তাব নিয়ে কোনো-কোনো বক্তার আলোচনা থেকে আমার মনে হয়েছে যে নেহরু বুঝি সুভাষের ওপর একটা ওয়ার্কিং কমিটি চাপিয়ে দিচ্ছেন। এটা একেবারেই সত্য নয়। তার ওপর, এখন তাঁর মনে হচ্ছে, সুভাষ বোস যদি এই প্রস্তাব মেনে না নেন, তা হলে কথা বলা নিরর্থক। নেহরু সুভাষকে অনুরোধ করেন— নেহরুর প্রস্তাব তিনি অনুমোদন করেন কি, আর, তিনি তাঁর পদত্যাগ প্রত্যাহার করতে রাজি কি।
উত্তরে সুভাষ বলেন, ‘যে-প্রস্তাবটি নিয়ে এখানে আলোচনা চলছে, তার সঙ্গে আমার জীবন-মরণ জড়িত। এই প্রস্তাব নিয়ে আমি কী ভাবছি তা জানাতে পারলে এই প্রস্তাব নিয়ে আলোচনার কিছু সুবিধে হতে পারে। পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু আমাকে পদত্যাগ প্রত্যাহারের অনুরোধ করেছেন—এটা তো আমার ভাগ্যের ব্যাপার। কিন্তু আমি তো কোনো লঘুচিত্ততার ভঙ্গিতে পদত্যাগ করিনি, তাহলে কোনো চরম সিদ্ধান্ত জানাতে হলেও আমাকে গভীরতার সঙ্গে ভাবতে হবে।’
যোগেনের মনে খেলে যায়—সুভাষবাবু কি চাইছেন তাঁর সম্পর্কে সিদ্ধান্ত যেন এখুনি নেয়া না হয়। মনে হতেই তার ভয় হয়, সুভাষবাবু কি হেরে গেছেন?
‘মহাত্মা গান্ধী ও পুরনো ওয়ার্কিং কমিটির কেউ-কেউ ব্যক্তিগত কথাবার্তায় যে-পরামর্শ তাঁকে ইতিপূর্বে দিয়েছেন, তার সঙ্গে এ প্রস্তাবের ফলত হুবহু মিল আছে।’
যোগেন এই যুক্তিটাতে খুশি হয়।
‘মহাত্মা গান্ধী যখন দুর্ভাগ্যত ওয়ার্কিং কমিটি তৈরি করতে সাহায্য দিতে পারছেন না, তা হলে অগত্যা আমাদের কি উচিত নয় কংগ্রেস সংবিধান এ নিয়ে কী বলছে, সেটা একবার দেখা?’
সম্ভবত হাততালির অপেক্ষায় সুভাষবাবু একটু থেমেই বলে উঠলেন, ‘এই প্রশ্নের উত্তর কী হতে পারে, সেটা বিবেচনার দায় আমি আপনাদের ওপর ছেড়ে দিলাম।’
এটা তো সবচেয়ে শক্ত যুক্তি—গান্ধীজি আর কংগ্রেস সংবিধান কি বিকল্প না পরিপূরক। যোগেনের সন্দেহ যে এতটা অভিযোগ তোলার জন্য কি সুভাষবাবু যথেষ্ট সময় নিয়েছিলেন? এর পরেই সুভাষবাবু স্পষ্ট স্বরে বলে ফেললেন, ‘ভারতের মতো বিশাল বৈচিত্র্যের দেশে কংগ্রেস কয়েকজন মাত্র ব্যক্তির গোপন সম্পত্তি হয়ে থাকতে পারে না।’
যোগেনের ভালো লাগে না যে এর পরই কী করে এই গোপন সম্পত্তি সকলের সম্পত্তি হতে পারে, তার উদাহরণ দিতে সুভাষবাবু ব্রিটেন, ফ্রান্স আর অন্যান্য ইয়োরোপীয় দেশের তুলনা টানলেন? তুলনা শুধু টানলেনই না, তর্কটাকে বা উদাহরণটাকে আরো জোরদার করতে বলে বসলেন, ‘আমরা কি ওদের চাইতে কম দেশপ্রেমিক। সে-কথা আমি মানি না। ভারতের সমস্ত জনমতের প্রতিনিধি কেন রাষ্ট্রপতির মন্ত্রিসভায় আসবে না?’
সুভাষবাবু আড়টুকুও রাখলেন না। সত্যি-সত্যি ‘ক্যাবিনেট’ বললেন? সত্যি-সত্যি বললেন, ওরা যদি জাতীয় বিপদের সময় পার্টি বিভেদ ভুলে একটা সরকার তৈরি করতে পারে, আমরা কেন পারব না?
সুভাষবাবু নিজেদের স্বাধীন দেশ ধরে নিয়ে কথা বলছেন? যাকে উনি বলছেন, বহুবিধ শক্তির সমাবেশ, কংগ্রেসে, তা থেকে কি বাদ থাকবে কংগ্রেস-ছাড়া অন্য সব দল? ‘১৯২১-এর পর কংগ্রেস অনেক বদলে গেছে। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোটাভুটিটাও মনে রাখবেন।’
আঃ। আঃ। এটাই তো মোক্ষম কথা। এটাকে আরো ভিতরে ঢুকিয়ে দিতে হবে। বলতে হবে—’আমি কংগ্রেসের সবচেয়ে বড় সংগঠনের নির্বাচিত সভাপতি। আমার বিরোধিতা যাঁরা করছেন তাঁরা কংগ্রেসের বিরোধিতা করছেন, তাঁরা কংগ্রেসকে ভাঙছেন।’ কিন্তু সুভাষবাবু সে-দিকেই গেলেন না, তিনি যে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি, তাও বললেন না, আরো একবার। বরং বললেন ‘এআইসিসি থাকতে বললে থাকবেন, যেতে বললে চলে যাবেন।’
সরোজিনী নাইডু বলে ওঠেন, ‘আমাদের তো মিটিংটা চালাতে হবে। আমরা এখন আপনার পদত্যাগ নিয়ে কোন জায়গায় আছি। আমার অনুরোধ, নেহরুজির প্রস্তাব অনুযায়ী আপনি ওয়ার্কিং কমিটি তৈরি করে ফেলুন। এআইসিসি শুরু হয়েছে আপনার পদত্যাগ দিয়ে। এ-বিষয়ে আপনার শেষ কথাটা বলুন।’
ঠিকেদারের লোহার চেয়ারে বসে টিনের বেড়ায় হেলান দিয়ে ঘাড় না তুলে তার আত্মগোপনতায় শিউরে ওঠে, সুভাষবাবু এই ফাঁদে পা দিয়ে ফেলতে পারেন—হ্যাঁ, না, না
নেহরুর গলা শোনা গেল—’আমি সবার সঙ্গে কথা বলেই প্রস্তাবটা দিয়েছি। কিন্তু সে-বিষয়ে যদি উৎসাহ না থাকে, তাহলে আমি প্রস্তাবটা ফিরিয়ে নেব। সুভাষ যদি হ্যাঁ-না কিছু একটা বলে তার চরম কথা জানিয়ে দেয়, তা হলে সুবিধে হয়’।
যোগেন সোজা হয়ে বসে, ওরা কি ভয় দেখিয়ে কবুল করাতে চায় সুভাষকে? সুভাষবাবুকে দেখলে কিন্তু সকলেরই প্রথমে মনে হতে পারে—সুভাষকে কবুল করানোটা খুব কিছু কঠিন নয়। যোগেনের ধারণা—গান্ধীজি ও সুভাষ আগেই সব দিক ভেবে দেখে নিজের কথা সাব্যস্ত করে আসেন। তাঁরা এমন কোনো শেষ মুহূর্তের নাটক করেন না। যোগেন একেবারেই জানে না, শোনেওনি কিছু এ-ব্যাপারে, এম-এন রায়কে দেখেওছে মাত্র দু-একবার, তবু বোধহয় ‘ইনডিপেনডেন্ট ইনডিয়া’তে ওঁর লেখা থেকেই মনে হয়েছে—আসল কথায় মিল থাকলে ছোট কথায় আটকান না।
সুভাষবাবু কি যা বলেছেন, তার বেশি কিছু বলতে চান না? নাকী কোনো শলাপরামর্শ হচ্ছে। সুভাষবাবু যেন কিছু না বলেন, যখন ভেবেছে যোগেন, ঠিক তখনই সুভাষের গলা শোনা গেল, ‘আমার যা বলার আমি বলেছি। সভানেত্রী আদেশ করেছেন, একখুনি আমাকে হ্যাঁ বা না বলে আমার পদত্যাগের ব্যাপারটি চুকিয়ে দিতে হবে। আমি এই টুকুই শুধু বলতে পারি, এআইসিসি কী রকম করে প্রস্তাব নেয়, তার ওপর আমার শেষকথা নির্ভর করে। যেহেতু এআইসিসি কী প্রস্তাব নেবে তার বিন্দুবিসর্গও আমার জানা নেই, সেটা না জেনে আমার পক্ষে কোনো শেষ কথা বলা সম্ভব নয়।’
সুভাষবাবু কি হঠাৎ থেমে গেলেন?
ভিতরে তো কোনো গুঞ্জন উঠল না? ওরা পেয়ে গেল নাকী সেই শেষ-কথা, যা ওরা চাইছিল? রাষ্ট্রপতি এআইসিসিকে কি জানিয়ে দিলেন, এআইসিসি যদি সমমনা ওয়ার্কিং কমিটি চায়, সুভাষ নেই, আর যদি বহুমনা ওয়ার্কিং কমিটি চায়—সুভাষ আছে। যোগেন স্থির থাকতে না-পেরে, দাঁড়িয়ে পড়ে টিনের একটা ফুটো খোঁজে। সেই ঠিকেদার দৌড়ে এসে যোগেনকে ডাকে, ‘ইধার বাবুজি’। দু-পা বাঁয়ে সরিয়ে এনে ঠিকেদার তার বাবুজিকে টিনের একটা বড় ফুটোর সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়। একচোখেই দেখতে হয়।
সরোজিনী নাইডু বারবার এর ওর দিকে তাকাচ্ছেন। যেন সুভাষের কথা বুঝতে পারলেন না। নেহরু তাঁর প্রস্তাব সম্পর্কে অধিবেশনের সাড়া খুব পরিষ্কার নয় বুঝে, তাঁর প্রস্তাব প্রত্যাহার করলেন শোনা গেল। সভানেত্রী তখন প্রতিনিধিদের তাড়া দিলেন, হাত নেড়ে, নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের জন্য। নীহারেন্দু দত্ত-মজুমদার ও কে-এফ নরিম্যান পর পর উঠে আপত্তি করলেন। যোগেন বুঝতে পারে নাইডু তাঁদের আপত্তি নাকচ করে দিলেন। এআইসিসি বর্তমান রাষ্ট্রপতির বাকি কর্মকালের জন্য রাজেন্দ্রপ্রসাদকে নির্বাচন করলেন।
কী যে হল, তা বোঝার আগেই যা হওয়ার তা হয়ে গেল। যেন, কিছুই হয়নি। সুভাষবাবু পদত্যাগ করেছিলেন, তাই বাকি ক-মাসের জন্য রাজেন্দ্রপ্রসাদকে রাষ্ট্রপতি করা হল।
এঁদের ভিতর থেকেই এইসব প্রশ্ন উঠেছিল, কারো কাছে নয়, তাঁদের নিজেদেরই মনে উঠেছিল—সুভাষবাবু যে-উত্তর দিলেন তাতে তিনি বলেছেন বটে পদত্যাগপত্র প্রত্যাহার করছি না। কিন্তু তিনি তো এও বলেছেন তিনি পদত্যাগ করতে চান না। হ্যাঁ, একটা শর্ত ছিল সমমনোভাবাপন্ন ওয়ার্কিং কমিটি। নেহরুর পদত্যাগবিরোধী প্রস্তাব উঠল আগের দিন অথচ সিদ্ধান্ত হল পরদিন। নেহরু-প্রস্তাবের ওপর ভোট হল না কেন? ভোট হলে পরিষ্কার হয়ে যেত—সুভাষ পদত্যাগ করতে চান কী চান না? সেটা পরিষ্কার হওয়ার আগেই সভানেত্রী নতুন রাষ্ট্রপতির নাম চাইলেন কেন? কোনো কি পূর্বব্যবস্থা ছিল—সুভাষকে সরানোর? সুভাষ পদত্যাগ করবেন, এটা কি সুভাষও জানতেন? পদত্যাগ করে তিনি কি প্রতিপক্ষকে অপ্রস্তুত করতে চেয়েছিলেন? ওরা অপ্রস্তুত হওয়ার বদলে সুযোগ নিলেন? কী হত যদি সুভাষ নিজের মতো একটা ওয়ার্কিং কমিটি ঘোষণা করে দিতেন? গান্ধীজি তাঁকে তেমনই করতে বলেছেন বলে? সুভাষই তা হলে শহিদ?
সেই ফুটো দিয়ে যোগেন সুভাষ বোসকে এক পলক দেখতে চেষ্টা করল। একবার মনে হল, দেখেওছে। কিন্তু সকলেরই ধুতি, পাঞ্জাবি, গান্ধীটুপি—সবাইকেই সবাই মনে হয়।
যোগেন এসে তার লোহার চেয়ারটাতে আবার নিচু হয়ে বসে, ঘাড়টা কুঁজো করে, অজ্ঞাতবাসে বসে। নিজেকে সে এটুকু পর্যন্ত বোঝাতে চায় যে কংগ্রেসের কী হল না হল, তা নিয়ে তার কোনো চিন্তাভাবনা থাকার কথাই না। সে যদি করতেও চায়, চিন্তাভাবনা, কেউ সে কথা জানতে চাওয়ার মত নেই।
সুভাষবাবুই তাকে তাঁর কাজে ডেকে নিয়েছিলেন।
সেই ডাকের সুতো ধরেই, যোগেন এই মানুষটিকে তাঁর রোজকার জীবনে দেখে। ফলে মানুষের জীবন নিয়েই একটা এমন ধারণায় সে পৌঁছয়—যেমন ধারণা তৈরি করার উপাদান তারই ভিতর আছে সে জানত না। এই লোকটি বড়লোকের ছেলে ও ভাই। বিলেতে গিয়েছিল, আইসিএস পড়তে। কেন? এই বাড়ির পক্ষে একটা আইসিএস খুব দরকার ছিল, ভারতে কুলীন হতে। বাবা কটকের বড় উকিল। কাউন্সিলার ছিলেন। এক ভাই ব্যারিস্টার। এক ভাই এনজিনিয়ার। এক ভাই ডাক্তার। সকলেই বিলেত ফেরৎ। একটা বিলেত-ফেরতের ভ্যাকান্সি ছিল আইসিএস হয়ে আসার জন্য। সেটা হতেই সুভাষ গিয়েছিলেন। হয়েও ছিলেন। প্রবেশনে যাওয়ার পূর্বমুহূর্তে যেন তিনি সেই অনন্ত অসীম কাল গর্তটা দেখতে পান, যার ভিতর তিনি এক-পা দিয়ে ফেলেছেন। আর-এক পা এগুলেই ব্রিটিশ ব্যুরোক্রেসির গহ্বরে তিনি হারিয়ে যাবেন চিরকালের জন্য। প্রবেশনে না গিয়ে তিনি ছুটলেন, ভারতে। স্বদেশীয় লোকদের শাসন করতে ও শাস্তি দিতে যিনি বিশেষ করে বিদ্যে শিখতে এসেছিলেন, তিনি দেশে ফিরে নিজেই চলে গেলেন জেলে। প্রায় আট-দশ বছর জেলখাটার পর যখন তিনি কংগ্রেসকে নতুন নেতৃত্ব দিতে চাইলেন, তখন তাঁকে জানানো হল, নেতৃত্ব দেয়ার জন্য কংগ্রেস ও দেশে একজনই মানুষ আছেন। মহাত্মা গান্ধী।
যোগেনের কাছে ঐ মুহূর্তে এটাই প্রধান হয়ে উঠল—সুভাষকে একটা আইন দেখিয়ে বলা হল, এই আইন কংগ্রেসের আইন, দেশের আইন, সকলের পক্ষেই সমান প্রযোজ্য। সে-কথা সত্য মেনে সুভাষ ভোটে জিতে এলেন। তখন, তাঁকে বলা হল—জাল মেম্বারদের ভোটে জিতেছেন, আমরা আপনার মন্ত্রী হব না।
যোগেন সত্যিই আঁতকাল। বামুনরা বিধান পাল্টাচ্ছে। ওদের পাঁজি আছে পঞ্চাশ রকম সে পাঁজিতে দোষ আছে হাজার রকম। প্রায়শ্চিত্তের বিধান আছে পঞ্চাশ হাজার রকম। সুভাষের, যে পরিত্রাণ নেই, সেটা সুভাষবাবু কি জেনেছেন? সুভাষবাবুর কপালে পুরোহিত তেল-আলতা এঁকে দিয়েছেন। এবার তাঁকে হাঁড়ি কাঠে ফেলা হবে।
সুভাষবাবু ভোটে জেতার দু-দিন পর গান্ধীজির বিবৃতি পড়ার নিভৃতিতে যন্ত্রণায় এলগিন রোডের বারান্দায় যোগেনের ক্ষীণতর মনে এসেছিল—সুভাষবাবুকে গান্ধীজিরা শূদ্র করে দিলেন। এমন কথা মনে হয়েছিল বা এসে গিয়েছিল, কত হাজার বছরের শূদ্রস্মৃতি থেকে, যে-স্মৃতি মরে না, শুকোয় না।
আজ, টিনের ফুটো দিয়ে সুভাষবাবুর শাস্তি দেখে, যোগেন আবার সেই স্মৃতিতে ফিরে যায় কোনো প্রতিবর্তক্রিয়ায়। না। সে কেন সুভাষকে এক ঝলক দেখতে চাইছে? কী দেখবে? নাগরাজের ‘বরে’, পোড়ামুখ, বিকৃত অঙ্গ, পায়ে গোদ, চোখে পিচুটি, অসম নাসারন্ধ্র এক অধস্তন গোত্রের মানুষ হয়ে আরো পালাতে, আরো আরো পালাতে, আরো আরো আরো পালাতে, আরো আরো অপরিচয়ের দূরত্বে আত্মগোপন করতে না-চেনা পথ, বনজঙ্গল ও পাহাড়-পর্বত ডিঙিয়ে একটা কোনো দেশের দিকে নলরাজার ছুটে যাওয়া যার নামটুকুমাত্র তার সেই নাগরাজের কাছেই প্রথম ও একবারই শোনা—নলরাজা সেই দূরত্বে লুপ্ত হয়ে যেতে চায়, এই পৃথিবীতে দময়ন্তীর কাছ থেকে যতটা দূরত্ব তৈরি করে তোলা যায় পচা, গলা, চিহ্নলুপ্ত আট-দশ দিনের এক বাসি মড়ার মত, শনাক্তের অতীত।
তার উপমাটা যে তাকে এতটাই মথিত ও উন্মার্গী করে দেবে, তার জন্য একেবারেই প্রস্তুত ছিল না যোগেন। এমএলএ গিরি ও নেতাগিরি করতে-করতে যোগেন কি ভুলে গিয়েছিল, বা মাঝে-মাঝে তার এমন অপস্মার ঘটছিলই, যে তার চন্ডালসত্তা কতটাই স্বার্থপর, পলায়নপর ও আত্মরক্ষাপর হয়ে উঠতে পারে?
চন্ডাল শুধু শরীরটা নিয়ে বাঁচতে জানে। তার, যোগেনের তো কোনো চাওয়া থাকতে পারে না, তার শুধু থাকতে পারে বেঁচে যাওয়া। বাঁচতে না-পারলে মরে যাওয়া। সে সুভাষকে কেন দেখবে?
কী দেখবে? মাটির তলা থেকে উদ্ভিন্ন কোনো বিদ্যুদাঘাতে যোগেন কেঁপে কেঁপে উঠছিল।
সে পালাতে চায়, এখনই, একবারও সুভাষবাবুকে সে দেখতে চায় না।
যোগেন বরিশালে যাবে, মৈস্তারকান্দিতে, কেরল ভৌগোলিক কারণেই যে-দুর্গমে রাজা বা বামুন কেউ পৌঁছুতে পারে না।
যোগেন শেয়ালদা স্টেশনের দিকে ছুটল।
সুভাষ কল্পনাও করতে পারেন নি, এ-রকম কিছু হতে পারে। সুভাষ একেবারেই চাননি কংগ্রেস ভাঙতে। তিনি মনে প্রাণে চাইছিলেন— …গ্রসের নেতৃত্বে গণ্য হতে। সেটা আন্দাজ করতে পেরেই কংগ্রেসের সর্বোচ্চ কর্তারা ৩৮-এ তাঁকে রাষ্ট্রপতি বলে মেনে নেন। সেই সর্বোচ্চ কর্তাদের কারো মনেও আসেনি, কংগ্রেসের নেতা হিশেবে এর চাইতে বড় কী স্বীকৃতি সুভাষ আশা করছিলেন? সুভাষ রাষ্ট্রপতি আবার হতে চাইবেন—এটা কারো হিশেবে ছিল না। আর, সুভাষের হিশেব ছিল ইংরেজকে একটা সময় ধরে আলটিমেটাম দেয়া। আর, সেই তারিখের মধ্যে ভারত স্বাধীন না-হলে, সারা দেশে আন্দোলনের প্রলয় তৈরি করা হবে। সে-আন্দোলন, নীতিগতভাবে অহিংসই হবে বটে কিন্তু অহিংসা সে-আন্দোলনের একমাত্র সীমা-নির্ণায়ক হবে না।
কলকাতা অধিবেশনের কয়েকদিন পর বৃন্দাবনে এক সভায় গান্ধীজি বলেছিলেন, এই আলটিমেটামের ভূত সুভাষের ঘাড়ে চেপেছে ১৯২৫-এ জলপাইগুড়িতে অনুষ্ঠিত রাজনৈতিক সম্মিলন থেকে। সেখানেও সুভাষ আলটিমেটামের জিদ ধরেছিল। তার পরের চোদ্দ-পনের বছরে সুভাষের কাঁধ থেকে আলটিমেটামের ভূত নামেনি, সুভাষকেও বদলাতে দেয়নি। কাকে আলটিমেটাম? সেই শক্তিমান কি আমাদের ছেড়ে দেবে? আমাদের দেশের কোটি-কোটি মানুষকে কতবিধ অত্যাচারই না করা হবে। প্রস্তুত থাকলে এই মানুষই সে-সব অত্যাচার প্রতিহত করতে পারে। আমাদের দেশের মানুষকে কি অতটা প্রস্তুত আমরা রাখতে পেরেছি?
গান্ধীজি বৃন্দাবনের সভাতে ও কারো কাছে কোনো চিঠিপত্রেও যে-কথা উল্লেখ করেননি সম্ভবত সেটাই ছিল তাঁর সুভাষ সম্পর্কে অনড় অবস্থানের প্রধান কারণ। যে-কোনো দিন যুদ্ধ বাধতে পারে। জার্মানি, ইংল্যান্ড, ইয়োরোপের অন্যান্য দেশ, সোভিয়েত ইউনিয়ন, ইতালি—এই সব দেশের মধ্যে সুভাষের আনুগত্য কার প্রতি? এই সময়ই, বা হয়তো এর কিছুদিন আগে, কংগ্রেসের সর্বোচ্চ নেতারা নিজেদের মধ্যে কথা বলছিলেন, ভারতের ভবিষ্যতের পক্ষে কোন দেশকে বা শক্তিকে সমর্থন করা উচিত। গান্ধীজি নিশ্চিত স্বরে জবাব দিয়েছিলেন, ইংরেজ শাসনের অধীনতার মধ্যেও বেঁচে থাকার যে সুবিধে আছে, তেমনটি অন্য কোনো দেশের অধীনতায় নেই।
