১০৮. যাদুগোপাল
একদিন রাঁচি থেকে এলেন, যাদুগোপাল মুখুজ্যে–বিখ্যাত বিপ্লবী, কতবার যে জেল খেটেছেন। তিনি এখানেই উঠলেন ও এখানেই একরাত থাকলেন। তাঁর দেখাশোনা করার ভার ছিল যোগেনের ওপর। কিন্তু তিনি যোগেনকে খুব পাত্তা দিলেন না। যোগেন ভেবে নিয়েছিল, মণ্ডলের প্রতি মুখুজ্যে বামুনের যা ব্যবহার চলে আসছে, উনি তার বাইরে নন। কিন্তু উনি সময়ও পাচ্ছিলেন না—কত জন যে দেখা করতে এসেছে। আর, তারা প্রত্যেকেই বিপ্লবী—আন্দামান-খাটা বা লাইফার। একজন মাঝবয়েসি লোক এসে প্রণাম করে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আপনি কি আমাকে চিনতে পারছেন?’ উনি জবাব দিলেন, ‘চিনতে পারার কারণ না বললে চিনব কী করে?’ তখন জানা গেল, কোথায় একটা বিপ্লবী অ্যাকশনে ওঁর পেটে একটা গুলি বিঁধে পেটেই আটকে ছিল। কে যেন ওঁকে রাঁচি যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছিল। উনি রাঁচি গিয়ে ডাক্তার যাদুগোপালের কাছে পৌঁছন। যাদুগোপাল তাঁকে এক গোপন ডেরায় নিয়ে যান ও অপারেশন করে গুলি থেকে মুক্তি দিয়ে ফেরার ব্যবস্থা করে দেন। যাদুগোপাল বললেন, ‘তোমাকে চিনতে পেরেছি বললে মিথ্যে বলা হবে কিন্তু পেটে গুলি থাকার কথা বলায় মনে পড়েছে। আরো মনে পড়েছে তোমার একটা কথা।’ যাদুগোপাল চুপ করে গেলেন। আগন্তুক জিজ্ঞাসা করল, ‘কী কথা স্যার?’ ‘বলেছিলে, অ্যাকশনের আগে সবাই কত সাহস দিল, ধরা পড়লে কী করতে হবে সব একেবারে পাখি পড়ার মত করে পড়িয়ে দিল, কী করলে ধরা পড়ব না সে সব কত বুদ্ধি দিল, শুধু কেউ এই কথাটা বলে দিল না, গুলি খেলে যদি মরো তো বেঁচে গেলে কিন্তু গুলি যদি পেটে থাকে তা হলে যাবজ্জীবন নরক যন্ত্রণা।’
যাদুগোপাল সুভাষের সঙ্গে দু-বার কথা বলেছিলেন, সেই রাতে ও পরের সকালে। ঘরের সমস্ত দরজা-জানলা বন্ধ করে। সুভাষ একবার জিজ্ঞাসা করলেন, যোগেন ঘরে থাকতে পারে কী না। যাদুগোপাল জবাব দিলেন, ‘উনি ঘরে থাকলে আমাদের কোনো উপকারে আসবেন। সুভাষ বললেন, ‘আরো একজন শুনে রাখলেন আপনার কথাগুলো। দরকারে মনে করিয়ে দিতে পারবেন। উনি আমাদের বন্ধু। বরিশাল থেকে ভোটে জিতে অ্যাসেম্বলিতে এসেছেন।’ যাদুগোপাল বললেন, ‘কিন্তু তুমি ওঁর বিশ্বাসযোগ্যতা কী করে জানলে? আর, এটাই-বা কেন ভাবলে যে আমি তোমাকে কিছু ইনফর্মেশন দেব যা ভুলে গেলে বা গুলিয়ে ফেললে ক্ষতি হবে।’
যোগেন একটু লজ্জা পেয়েই বলে, ‘আমি বাইরে থাকছি দরকার হলে ডাকবেন।’
যাদগোপাল বললেন, ‘আপনি নিশ্চয়ই অনুমান করতে পারছেন, আমি যে-কাজে এসেছি তাতে লোক-লৌকিকতা করা যায় না। আপনি কিছু মনে করবেন না।
সে রাতে ঘণ্টা দুয়েক, পরের সকালেও ঘণ্টা দুয়েক। সুভাষ জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আপনাকে যোগেনবাবু তা হলে ট্রেনে ছেড়ে আসুন।’
‘আমি যখন তোমার কাছে এসেছি কেউ কি আমায় পৌঁছে দিয়েছে। ফেরার সময়ই-বা কেউ সঙ্গে থাকবে কেন?’
সুভাষ হেসে বললেন, আপনার তো বাংলা প্রদেশে ঢোকা নিষেধ। সে-নিষেধ কি বলবৎ আছে?’
‘হ্যাঁ। আর মাস তিনেক। কিন্তু যুদ্ধ বেধে গেলে অনির্দিষ্ট কাল।
‘তা হলে, যোগেনবাবু সঙ্গে থাকলে এটুকু অন্তত জানব যে হাওড়া পর্যন্ত ধরা পড়েননি।’
‘সুভাষ, তোমার একার ওপরে আজ সারা দেশের দায়িত্ব। কে কোথায় ধরা পড়ল কী পড়ল না, এ-সব খুঁটিনাটিতে আটকে যেও না। ধরা না পড়াটা তো আমার দায়িত্ব। সে ব্যবস্থা না-নিয়ে কি আমি তোমার সঙ্গে দেখা করতে আসতে পারি?’
তাঁর হাতে একটা চটের থলি ছিল। সেটা ঝুলিয়ে তিনি সিঁড়ি ভেঙে নেমে ছোট গেট দিয়ে বেরিয়ে গেলেন, একবারও পিছু ফিরে দেখলেন না।
দু-দিন কেটে গেল। তৃতীয় দিন সকালে একটু ফাঁকা ছিল। সুভাষ যোগেনকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘যোগেনবাবু সেদিন আপনি কিছু মনে করেন নি তো যাদুগোপালবাবুর ব্যবহারে?’
‘মনে করি নাই বললে মিথ্যা বলা হবে কিন্তু এখন সে-সব আর মনে নাই। উনি কোনো সময়ই আমার দিকে ভাল করে তাকানই নাই। তবে, এ-সব তো আমাদের জানা।’
‘আমাদের, মানে কাদের কথা বলছেন?’
‘আমাদের মানে পুরানো নাম শুদ্দুর, নতুন নাম সিডিউলড, নতুন আরো নাম হরিজন। উনি তো ব্রাহ্মণ।’
‘হ্যাঁ, কিন্তু উনি তো বিপ্লবী। শুধু বিপ্লবী নন, বিপ্লব নিয়ে চিন্তা করেন। বাঘা যতীনের শিষ্য। উনি চান বিপ্লবী ও সশস্ত্র দলগুলিকে একটা ছাতার তলায় আনতে। ৩৫ সালে মেদিনীপুর জেলে তেমন একটা কর্মসূচি সইও হয়েছিল। কিন্তু তেমন কিছু এগয়নি। এখন কংগ্রেস-রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে এঁরা আমাকে সমর্থন করে একমত হতে চাইছেন। উনি কিন্তু অস্পৃশ্যতা দোষে দোষী হতেই পারেন না।’
‘আপনি যখন বলছেন, তার উপরে তো কথা হয় না। তাইলে হয়তো আমার মনের সংস্কারেই ভাইব্যা নিছি। এমন সংস্কার আমাদের আছে তো।’
‘এই সব সংস্কার এতটাই গভীরে থাকে, রক্তের, যে একসঙ্গে বসবাস না করলে আন্দাজও করা যায় না। আমার বোধহয় উচিত হল না, এত জোর দিয়ে বলা যে আপনার ধারণা ভুল। তবে, উনি যে আপনার সামনে কথা বলতে রাজি হননি কেন—সেটা আমি বুঝতে পেরেছি। সে-কথাটা সত্যিই আর-কারো সামনে বলা যায় না।’
‘সেটা আগে বলে দিলেই তো হয়। তাইলে কাউকেই অপ্রস্তুত হতে লাগে না।’
‘সেটা অবিশ্যি ঠিক। কিন্তু সেটাও হয়তো ওঁদের বিপ্লবী গুপ্ত দলের নিয়ম। আপনি যদি আগেই জানেন যে উনি একা কথা বলবেন, তা হলে আপনি হয়তো কোনো ব্যবস্থা করে ফেলবেন যাতে আমাদের কথা আপনি শুনতে পারেন।’
‘মানে, আমি যে খারাপ লোক, পুলিশের গুপ্তচর, সেটা ওনার ধারণা না। সেডা ওনার বিশ্বাস।’
‘এটা গুপ্ত দল মাত্রেরই বীজমন্ত্র—কাউকে বিশ্বাস করবে না, যতক্ষণ না সে নিজেকে বিশ্বাসী প্রমাণ করছে।’
যোগেন একটু চুপ করে থাকে। সুভাষ বোঝেন তার ভিতরে কোনো ভাবনা চলছে।
‘কী হল? মনে হচ্ছে, কিছু ভাবছেন?’
‘ঐ কথাটা শুইন্যা এডডু ডর ধইরছে।’
‘আপনার ভয় পাওয়ার কী? গুপ্ত দলকে কত গোপনতা মেনে চলতে হয়। আমি কোনো দিন কোনো গুপ্ত দলে ছিলাম না। মনে হয়, এত গোপনতা রক্ষা করতে পারতাম না।’ সুভাষচন্দ্ৰ একটু হাসেন। তাতে যোগেন কথাটা আর না-চালাতেও পারত। কিন্তু যোগেন বলে বসে, ‘যতক্ষণ না একজন মানুষ নিজেকে বিশ্বাসী প্রমাণ করে, ততক্ষণ তাকে সন্দেহ করা—এটা কি আপনার ধাতে পোষাইত? এঁরা তো বিপ্লবী, দেশকে নিজের প্রাণের থিক্যা ভালবাসেন আবার একই সঙ্গে দেশের বেবাগ মানুষগ সন্দেহ করেন। এডা কি একডা সম্ভব কথা?’
‘সম্ভবপর কাজের জন্য কেউ কি আর গুপ্ত বিপ্লবী দলে যায়? এঁদের মধ্যেও নানা মত আছে, নানা নেতা আছে। একটা অ্যাকশনের পর, বা, অ্যাকশনও দরকার নেই, অ্যাকশন নিয়ে প্রথম ভাবনার পরই দলেরই কেউ পুলিশকে জানিয়ে দেয়। অ্যাকশন হলে, রাজসাক্ষী পাওয়াটাও সহজ। মাথা গুনলে হয়তো যাবজ্জীবন বন্দী বা ফাঁসির শহিদদের তুলনায় রাজসাক্ষীর সংখ্যা বেশিই দাঁড়াবে। সেই কারণে তো আর বিপ্লবী দলগুলির বিশ্বাস খাটো হয়ে যায় না। তাঁরা মনে করেন, সারা দেশের বড় বড় ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের পাশাপাশি যদি শাহেব খুনও না করা যায়, তা হলে শাহেবরা ভয় পাবে না। আর ভয় না পেলে শাহেবরা এ-দেশ ছেড়ে যাবে না।’
‘তাইলে তো খাড়ায় সুভাষবাবু, শাহেবগ ডর দেখাইতে দ্যাশের বেবাক লোককে অবিশ্বাস করো।’
সুভাষ হেসে বলে ফেলেন, ‘আপনি কি কোর্টে কোনো মামলায় হারেন? এ সব প্রশ্ন করতে পারে আর কেউ?
যোগেন ছাদের দিকে আঙুল তোলে। বোঝায় শরৎ বোসকে।
সুভাষ বলেন, ‘ঠিক আছে। আপনারা ওকালতি করুন। আমার কাছে সারা ভারত থেকেই নানা ধরনের মানুষ আসছেন। এতটা সমর্থন পাব—এটা প্রায় অবিশ্বাস্য। তাঁদের সবাইকে এক রকমের ভাববেন না। তাঁরা প্রত্যেকে আলাদা। প্রত্যেকে। আলাদা।’
