১১
১২
১৩
১৪
১৫
3 of 4

১০৬. সুভাষ বোসের কাজে যোগেন

১০৬. সুভাষ বোসের কাজে যোগেন 

১৯৩৭-এর মন্ত্রিসভা তৈরি হওয়ার পর থেকে তপশিলিদের রাজনীতিটা ক্রমেই টলমলে হতে লাগল, বাংলায়। ১৯৩২-এর গোলটেবিলে বি. আর. আম্বেদকারের নাম প্রথম শোনা গিয়েছিল। তার আগে গান্ধীজি অন্তত শোনেননি। গোলটেবিলে আম্বেদকার হিন্দু মনুবাদী ধর্মকে তুলোধোনা করেন—একেবারে ঢাকিসহ বিসর্জন। হিন্দুধর্মের বিরুদ্ধে মুসলিমদের কথায় এত মর্মদাহ থাকে না—বরং নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব ও হিন্দুদের অত্যাচার এই সব কথাই বেশি থাকে। শুনতে শুনতেই বোঝা যায়, অভিযোগগুলো সবটা সমান সত্য নয়, আর যেগুলো আংশিক সত্য, সেগুলোও অনেক সময়ই কংগ্রেস-রাজনীতির অন্তর্গত নয়। কিন্তু দুটো-একটা এমনও ঘটনার উল্লেখ থাকে, যেগুলো খবরের কাগজ মারফৎ ও জনসভার বক্তৃতা মারফৎ বেশ কিছুটা প্রচারিত—বিভিন্ন রকম জোর দিয়ে ও নীরবতাসহ। কিন্তু আম্বেদকারের গোলটেবিলের ভাষণে যেন কবরের ভিতর থেকে মধ্যরাত্রির হাওয়া উঠে এসে, জ্যান্ত মানুষদের হাড়ের ভিতরে মজ্জা পর্যন্ত বিঁধছিল। গান্ধীজি একবার, দ্বিতীয় দিনের সকালের বৈঠকে, তাঁর পার্শ্ববর্তী কোনো সহকর্মীকে জিজ্ঞাসাও করলেন, ‘কে লোকটা?’ গান্ধীজির ধারণা ছিল বর্ণহিন্দু কেউ তপশিলিদের নেতা সাজছে। তাঁর জিজ্ঞাসার জবাবে তখন এটুকুই মাত্র শুনেছিলেন, ‘দলিত্। মহারাষ্ট্রের।’ সেদিনই অবিশ্যি আম্বেদকারের জীবনীটা তাঁর জানা হয়ে যায়। আর, আম্বেদকারের বক্তব্য নিয়ে তাঁর প্রতিক্রিয়ার ভাষাও বদলে যায়। 

তপশিলিদের মধ্যে যারা শিক্ষিত ও সম্পন্ন, তাঁদের ব্রিটিশ সরকারও খাতির দিতেন। নমশূদ্রদের মধ্যে মল্লিকভাইরা, রাজবংশীদের মধ্যে প্রসন্নদেব রায়কত ও উপেন্দ্রনাথ বর্মণ। ১৯৩৭-এর ভোটের পর তপশিলদের এই খাতির ক্ষিদে একটু বাড়ল ও ছড়াল। তাঁদের অনেকেই কংগ্রেসের দিকে ঝুঁকলেন। যদিও তখনো তাঁদের প্রাথমিক আনুগত্য নিজেদের জাত সমাজের দিকেই। 

যোগেন এ-বিষয়ে একটু স্পর্শকাতর দিল। 

তার সঙ্গে সব দলের সব নেতারই ছিল বিশ্বাস ও বন্ধুত্বের সম্পর্ক। কিন্তু তার কাছে প্রধানতম বিষয় ছিল নমশূদ্ররা। 

যতই সময় যাচ্ছিল ও যোগেন কলকাতার নানা পার্টির নানা নেতার সঙ্গে নানা সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ছিল, ততই বেশি করে সে ভাবছিল যে তপশিলিদের নিজস্ব পার্টি ছাড়া তাদের রাজনৈতিক ক্ষমতার ভাগ পাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। 

রাজনৈতিক ক্ষমতা বলতে যোগেনের কাছে ভারতের স্বাধীনতা খুব একটা প্রত্যক্ষ বিষয় হয়ে ওঠেনি। বা, এমন কী যে স্বাধীনতার কথা সে শুনছে এখানে, সে স্বাধীনতায় তপশিলি জনগোষ্ঠীর বিশেষ উপকার কী হবে—তাও তার কাছে পরিষ্কার ছিল না। সামাজিক যে অসম্মানের মধ্যে তপশিলিদের জীবনযাপন করতে হয়, তার জন্য সবচেয়ে বেশি দরকার শিক্ষিত হয়ে ওঠা। যোগেন তপশিলি এলাকায় নতুন স্কুল তৈরির জন্য, কলকাতায় তাদের থাকার ছাত্রাবাস তৈরির জন্য, কোনো কোনো বিষয়ে উচ্চ শিক্ষার বৃত্তির ব্যবস্থার জন্য, তপশিলি মেয়েদের অন্তত নিম্ন প্রাথমিক শিক্ষার জন্য ব্যবস্থা করতেই বেশি ব্যস্ত থাকে। আর এ-বিষয়ে যার কাছে কোনো সাহায্য চেয়েছে সরকারের বা সামাজিক-রাজনৈতিক নেতাদের, কেউ-ই কখনো তাকে ফেরায়নি বলে তার একটা সহজ সাফল্যবোধও এসে গিয়েছিল। সব ধর্মের সব পার্টির সবাই এই ধরণের যে সাহায্য দেয়,—তার কোনো কারণ সে খুঁজতে যায় না। বোধহয় এড়িয়েই চলে। 

শরৎবোসের জন্যই বোসবাড়ির সঙ্গে তার একটা ব্যক্তিগত সম্পর্ক তৈরি হয়ে গেছে ও সেই সুবাদে সুভাষের সঙ্গে তার বন্ধুত্বের ও নির্ভরতার একটা নিবিড়তা তৈরি হয়েছে। কিছু কিছু ব্যাপারে সুভাষ যোগেনের ওপর ভরসা যে-রকম প্রকাশ করে ফেলেছে, তাতে যোগেন একটু অবাকই হয়। 

সেটা অনেকগুণ বেড়ে একটা আকারই নিয়ে ফেলল—সুভাষ যখন ১৯৩৯-এ দ্বিতীয় বারের জন্য কংগ্রেসের রাষ্ট্রপতি হতে চাইলেন ও তাঁকে কিছুতেই হতে না-দেয়ার জন্য কংগ্রেসের প্রধান-প্রধান নেতারা, গান্ধীজিসহ, উঠে পড়ে লেগেছেন, এটা বোঝা গেল। সুভাষ যোগেনকে বললেন, ‘কংগ্রেসের যারা জিলা-মহকুমার নেতা, বা বড়-বড় নেতাও গত বিশ বছর ধরে গান্ধীজির এই সব অহিংসা, আইন-অমান্য, মাদকবর্জন, চরকাকাটা আর রামধুন গানে ক্লান্ত ও অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। সারাটা দেশ ইংরেজের সঙ্গে একটা সরাসরি লড়াইয়ের জন্য তৈরি। তারা শুধু অপেক্ষা করছে একজন নেতার। ওয়ার্কিং কমিটির নেতারা সেটা কিছুতেই হতে দেবে না। তাই আমাকে রাষ্ট্রপতি হিশেবে কিছুতেই মানবে না। কারণ, গান্ধীজি এতটা ব্যক্তিগত করে কংগ্রেসের একজন নেতার বিরুদ্ধে কখনো কোনো পজিশন নিয়েছেন বলে জানি না। এটা তাঁর অহিংসা-টহিংসার চাইতে আরো গভীরের ব্যাপার। গান্ধীজির একটা হিশেব থাকে। যে-কারণেই হোক, আমি ওঁর সেই হিশেবের সঙ্গে মিলছি না। তা হলে আমার সামনে দুটো পথ খোলা থাকে। গান্ধীজির ইচ্ছে মেনে সরে দাঁড়ানো। তাতে আমার নিজের ভাল। জওহরলাল এটাই চায়। তাতে হয়তো দেশেরও ভাল। কারণ, কংগ্রেসকে অখণ্ড রাখাটা দেশের লাভ। আর একটা পথ হল গান্ধীজিকে ও হাইকম্যান্ডকে অমান্য করে রাষ্ট্রপতির পদে প্রার্থী হওয়া। প্রতিনিধিদের ভোট চাওয়া। হারলে হারলাম, জিতলে জিতলাম। এতে আমার নিজের খারাপ। হারলে ওরা আর পাত্তাই দেবে না। বাংলাতেও কোণঠাসা হব। জিতলে তো এই প্রথম প্রমাণিত হবে, গান্ধীজিই শুধু কংগ্রেস নন, গান্ধীজির চেলারাই শুধু কংগ্রেস নন, দেশে গান্ধীবাদের বিপরীত যে-শক্তিগুলি ছড়িয়ে আছে, তারা কংগ্রেসে একটা নতুন ক্ষমতা হয়ে উঠবে। ব্রিটিশ-বিরোধী রাজনীতি একেবারে বদলে যাবে। আমি তো নিজের শরীরে টের পাচ্ছি, যোগেনবাবু, ভারতের আপামর মানুষ একটা নতুন লড়াই চায়। আমি যদি সেটা আমার শরীরের ভিতরে এমন করে টের পাই, তা হলে কি তা মিথ্যা হতে পারে? সমস্ত ভারত আজ সমবেতা যুযুৎসবঃ। কিন্তু তাদের কিছুতেই এমন নেতা দেয়া হবে না যে নেতা যুদ্ধ জেতাতে পারে। রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হয়ে যদি আমি হারি, তাতে আমার নিজের ক্ষতি, যাঁরা আমাকে চান তাঁদের ক্ষতি। তখন কী করা যায়, সেটা তখন ভাবতে হবে। কিন্তু কত বড় একটা সম্ভাবনা খুলে যাবে—বলুন। গান্ধীজিই কংগ্রেস নন। গান্ধীজিকেও অস্বীকার করা যায়। আমি হয়তো হারব। কিন্তু পরের বছর আর-একজনকে নিয়ে এ-লড়াই লড়া যাবে—নরেন্দ্র দেও, জয়প্রকাশ, অচ্যুত পট্টবর্ধন, পান্ধে। এ যুদ্ধ থেকে আমার পরিত্রাণ নেই। আপনার সাহায্য চাই—প্রতিদিন, প্রতিটি বিষয়ে। আমি শুধু এইটুকু বলতে পারি—যুদ্ধটা হয়তো লম্বা, কিন্তু জয় নিশ্চিত। হয়তো আমার মৃত্যুর পর সে-জয় আসবে। কিন্তু এমন সেনাপতি আমি নই যে সেই মরণোত্তর জয়ধ্বনি না শুনে আমি যুদ্ধে ঝাঁপ দেব। শুনতে তো পাচ্ছি। আপনারা আমার পাশে থাকুন।’ 

এমন কথার বা ডাকের তো কোনো জবাব হয় না। সুভাষ যে কত বড় নেতা ও কত দূর পর্যন্ত দেখতে পারে— সে-বিষয়ে যোগেনের একটা গোপন ধারণা ছিল। শূদ্র হয়ে জন্মেছে সে, তার বাঁচার একমাত্র অবলম্বন তো এই সব গোপন ধারণাগুলি। সুভাষকে নিয়ে যোগেনের গোপন ধারণা যা তৈরি হয়েছিল, তাতে তার পক্ষে সুভাষকে এমন কী এ-কথা বলারও সুযোগ নেই যে আমি তো কংগ্রেস নই, আমি তো কংগ্রেসবিরোধী। এমন কী, এটুকুও জানানোর উপায় নেই যে সুভাষের রাজনীতিতে শূদ্রদের নিয়ে কোনো চিন্তাভাবনা নেই। যোগেন যে জেনে গেছে—এই রুগ্ন, অত্যাচারিত, দুর্বলদেহ মানুষটির ভিতরের আগুনটাই একে পোড়ায়। সে-আগুন থেকে মানুষটি নিজেই নিজেকে বাঁচাতে পারে না, যোগেন তাকে বাঁচাবে কী করে? যোগেন তার কী কাজেই বা আসবে? যোগেন একটা হেঁচকা টানে নিজেকে চোখ ভিজে ওঠার কিনারা থেকে সরিয়ে আনে—’এত বড় যুদ্ধের সেনাপতির তো আহারবৃদ্ধি দরকার, সুনিদ্রা দরকার। যোগেনের চেষ্টা সত্ত্বেও কথাটায় যোগেনের মজা খেলল না। 

সারা ভারতে কিন্তু ছবি এইটাই তৈরি হচ্ছিল যে কংগ্রেস সুভাষকে একঘরে করে দিল।

আরো একটা ছবি এখন তৈরি করে তোলা যায়, কিন্তু তখন তৈরি করে তোলা হয়নি। কংগ্রেসের রাষ্ট্রপতিকেই একঘরে করে দিল ওয়ার্কিং কমিটির সদস্যরা। ওয়ার্কিং কমিটি কিন্তু তৈরি হয়েছিল কংগ্রেসের সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির মনোনয়নে। এখন ভাবা যায়—তা হলে তখন এমন একটা ছবিও তৈরি হতে পারত—সুভাষ রাষ্ট্রপতি হিশেবে থাকবেন কিন্তু তার নিজের ওয়ার্কিং কমিটি বাতিল করে নতুন ওয়ার্কিং কমিটি গড়ছেন। 

সুভাষ যে কংগ্রেসের নেতৃত্বে এতটা বিচ্ছিন্ন ও একা হয়েও রাষ্ট্রপতি পদে দাঁড়িয়েই থাকলেন—এই ঘটনাটি একজন মানুষের চারিত্রে প্রতিভা ও প্রতিপালনের স্তম্ভগুলির ভারবহনক্ষমতা ও সেই স্তম্ভগুলির চলমানতার মাপক হতে পারে। 

কংগ্রেস এর আগে ও পরে বহুবার ভেঙেছে। কিন্তু কখনোই এমন হয়নি, এমন হওয়া কংগ্রেসের সংবিধানে সম্ভবই নয় যে বর্তমান রাষ্ট্রপতিকে সম্পূর্ণ, স ম পূ র্ণ, একা করতে পুরো ওয়ার্কিং কমিটির বাকি সকলে একজোট। কংগ্রেস অধিবেশনের সমস্ত প্রতিনিধিরা রাষ্ট্রপতিকে নির্বাচন করেন। ওয়ার্কিং কমিটি নির্বাচিত হন রাষ্ট্রপতির মনোনয়নে। 

সুতরাং যুদ্ধটা ছিল কংগ্রেসের মালিকানা নিয়ে। কংগ্রেসের মালিক কি কংগ্রেসের সদস্য কর্মী ও সমর্থকরা? না কী, কংগ্রেস গান্ধী শরিকদের সম্পত্তি? 

এখান থেকে যুদ্ধের আরো একটা সম্প্রসারণ কল্পনা করা যায়। কংগ্রেস কি শুধুই গান্ধী-অনুশাসিত? নাকি ভারতীয় জনতা-আন্দোলিত মঞ্চ? 

বম্বে, গুজরাট, কর্ণাটক, পাঞ্জাব, আসাম, ত্রিবাঙ্কুর, ওড়িশায় তাঁর পরিচিত, বন্ধু, অনুগামীদের কাছে সুভাষ চিঠি লিখে-লিখে সব জানাচ্ছিলেন। সেই কাজের জন্যই যোগেনকে কখনো দু-বেলাই আসতে হচ্ছিল। যোগেনই বুদ্ধি দিল, ‘প্রত্যেককে একই কথা জানাইয়্যা চিঠি দিব্যার লাইগলে তো ছাপায়্যা নিলেই হয়।’ 

সুভাষ বললেন, ‘খবরের কাগজের মত?’ 

যোগেন বলে, ‘ঐ যা কন! শুধু জানাইয়্যা আপনার পক্ষ টাইন্যা।’ 

সুভাষ একটু চুপ থেকে ম্লান হেসে বললেন, ‘কিন্তু এঁরা তো সকলেই নিকটজন। আমার অবস্থা কাগজের ভাষায় জানতে ওঁদের কষ্ট হবে না?’ 

‘তাইলে একডা কাম কইরলে হয়। একডা ছোট আকারে আপনাগ সমস্যার কথা ছাপা হোক আর আপনে যাদের চিঠি দিবেন, যারে যেমন, সেইডা আলাদা দ্যান, প্রথম লাইনেই লিখ্যা দিলেন, সি দি অ্যাটাচমেন্ট অ্যান্ড আফটার রিডিং কাম ব্যাক টু দিস লেটার।’ 

সুভাষের ম্লান হাসিতে একটু কষ্ট মিশে থাকে। কিন্তু কোনো কারণে উদ্ভাসন ঘটলে ঐ হাসিটাই যেন বদলে যায় কৈশোরকে। 

‘আচ্ছা যোগেনবাবু, এই সামান্য বুদ্ধিটা আমার মাথায় খেলল না কেন?’ 

‘আপনে অসামান্য, বইল্যা। মগজের সাইজ দিয়া তো বুদ্ধির ওজন—’ 

যোগেন এই কাজটাই প্রধানত করছে এখন। সুভাষের কাছ থেকে ডিকটেশন নিচ্ছে, টাইপ করছে, পোস্টাফিসে গিয়ে ফেলে আসছে, আবার টাইপ, আবার ডিকটেশন। অ্যাসেম্বলি লাইব্রেরি থেকে নানা ক্লিপিং, বিলেতি ম্যাগাজিনের কোনো আর্টিকল, এমন কী গভর্নর জেনারেলদের এক্সকিউটিভ কাউন্সেলারদের পুরনো মিটিংগুলোর মিনিটসও টুকে আনতে হত যোগেনকে। ঐ যে বছর-সাতেকের ‘আসাম ও পূর্ববঙ্গ প্রদেশ’, তার কিছু মিনিটস ও মোমো 

যোগেনের একটা মহাগুণ তো তার দরকারি খবর সাজিয়ে ফেলা ও সেই সাজানো থেকে নতুন দরকার খুঁচিয়ে তোলা। এটা তার পেশার পক্ষে খুব দরকারি। কিন্তু এটা করতে গেলে, যেখান থেকে তথ্যটা আনতে হবে, সেটা হাতের কাছে থাকা দরকার। শরৎ বোসই একদিন শেখালেন, একেবারে সিনিয়ারের মত শেখালেন—’যোগেনবাবু, টেক ইট প্রফেশন্যালি। ধরুন, এমন তো নয় যে একটা পার্টিকুলার ডকুমেন্টই দরকার, বরং বেশির ভাগই একটা পার্টিকুলার বিষয় দরকার। আপনি প্রথমে আমার চেম্বারের ছেলেটিকে রিকিউজিশন শ্লিপ দিয়ে একদিন পর টেবিলে যান। ডু দি সেম উইথ বার লাইব্রেরি অ্যান্ড অ্যাসেম্বলি লাইব্রেরি। কিন্তু তার আগে আপনার দরকারটা দাগিয়ে নিন। দরকারের চাইতে খবর যদি কম পান—সেটা পূরণ করে নিতে পারবেন। বেশির ভাগ সময় বাজে খবরের পাঁজায় চাপা পড়তে হয়।’ 

সুভাষবাবুর সমর্থক ও অনুরাগীদের খোঁজখবর নিতে, তাদের কাছে চিঠি পাঠাতে, সুভাষবাবুর কাছ থেকে উদ্দিষ্ট ব্যক্তিদের পাঠানো চিঠির ডিকটেশন নিতে-নিতে যোগেন বুঝতে পারে, সুভাষবাবুর সঙ্গে এদের সম্পর্ক প্রধানত ব্যক্তিগত। হয়তো কারো সঙ্গে বার্লিনে ফ্রিডম লিগ করেছিলেন। অনেকেই তাঁর জেলসঙ্গী, তাদের প্রায় সবাই-ই সুভাষকে জেলের ভিতরে কোনো-না-কোনো অসুখে সেবা করেছে বা হোমিওপ্যাথি ওষুধ দিয়েছে বা রান্না করে খাইয়েছে। সুভাষবাবু যে কারো জন্য কিছু করেছেন তার বিন্দুমাত্র উল্লেখ নেই। এঁরা সকলেই রাজনীতির ভিতেরই এখনো আছেন, কংগ্রেসের সম্মিলনের প্রতিনিধি। যোগেনের যেন মনে হল, এঁরা অনেকেই সুভাষের চাইতে বয়সে একটু-আধটু বড়। এঁদের অনেকের নিজস্ব সব রাজনীতি ছিল—কেউ হয়তো গারো পাহাড়ের হাজংদের নিয়ে টঙ্ক আন্দোলন করেছেন। কেউ হয়তো মালাবারের জেলেদের নিয়ে ট্যাক্স বিরোধী মোর্চা করেছেন। একজন ছিলেন কোলার সোনার খণির অ্যাসিস্ট্যান্ট ইনজিনিয়ার। এঁরা তো সাজা খাটছেন। তাঁদের ঐ আন্দোলন ইত্যাদি মানেই পুলিশ তাদের কংগ্রেস-টেররিস্ট বলত। কিন্তু যোগেন অনুমান করতে পারে—এঁদের সঙ্গে গান্ধীজির কোথাও একটা বিচ্ছেদ ছিল, বা, এঁরা কোনোদিনই গান্ধী রাজনীতি করতেন না। বরং কেউ কেউ গান্ধীজির আইন অমান্য-টমান্য পছন্দ করতেন না। তাও আইন-অমান্য করে জেল খেটেছেন। গান্ধীর সঙ্গে মিল-অমিল কোনো বিষয় ছিল না তখন। রাজনীতি করা মানেই কংগ্রেস করা। কংগ্রেস করা মানেই গান্ধী করা। উত্তর প্রদেশের দু-তিনজন নেতা ছিলেন স্বরাজ্য দলে—দেশবন্ধু-মতিলালের সময়। সিন্ধু প্রদেশের এক নেতাকে সুভাষ তাঁর চিঠিতে লিখলেন, তুমি তো ওখানকার আইন সভায় একমাত্র কংগ্রেসি-মুসলমান, কংগ্রেসের রাজনীতিতে তোমার কথার গুরুত্ব থাকা দরকার। সুভাষ এঁকে আরো লিখলেন, কংগ্রেসি মুসলমানদের নিয়ে বিপদ হচ্ছে তাঁরা নিজেদের মুসলমান পরিচয়টাকে প্রকাশ্যে আনেন না। ফলে নিজের সর্বজাতীয় চরিত্রপ্রমাণের জন্য কংগ্রেস-হাইকম্যান্ডকে কিছু ‘হোলি কাউ’ রাখতে হয়েছে। অথচ, মুসলমানদের দাবিদাওয়া নিয়ে কংগ্রেস কোনো কথাই শুনতে চায় না। 

যোগেনের তো রাজনৈতিক আন্দোলনের ইতিহাস জানা নেই। সুভাষের সচিবতার সুযোগে যোগেন প্রথম বুঝতে পারে—গান্ধী বিরোধী একটা ধারা বহুকাল থেকেই কংগ্রেসের এক-একটি অংশে বেশ ভালই আছে। সুভাষের আন্দাজ ঠিক—তারা সুভাষকে ঘিরে দাঁড়াতে চাইছে, যেহেতু সুভাষ তার রাজনৈতিক অধিকার ব্যবহারের সাহস দেখিয়েছে। 

যোগেন বুঝতে পারে—কিছু-কিছু সংগঠনও আছে যারা সুভাষের নেতৃত্ব মানে বা নেতৃত্বের ওপর ভরসা রাখে। কীসের সংগঠন সব-যে বুঝতে পারে যোগেন, তা নয়। খাকসারদের একটা ছুট-অংশ, গারো-জয়ন্তিয়া খ্রিস্টানদের একটা প্রতিষ্ঠান, তাকে তো সুভাষ লিখলেন, স্কটিশচার্চ কলেজে তুমি আমাকে যে-সব বুদ্ধি দিতে তার কিছু-কিছু এখন আমার দরকার, পরে যোগেন সুভাষের কাছেই শুনেছে—নিকোলাস রায় ওঁর চাইতে এক বছরের ওপরে পড়তেন স্কটিশে, প্রগ্রেসিভ যাদব সঙ্ঘ—ইউ-পি। 

এ ছাড়া প্রতিদিনই তো কত নেতা আসছেন—যোগেনকে তাঁদের সঙ্গে কথা বলতে হত, সুভাষের সঙ্গে কথা বলাতে হত। 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *