১১
১২
১৩
১৪
১৫
3 of 4

১০৫. দ্যাট ইট অয়্যার ডান কুইকলি

১০৫. দ্যাট ইট অয়্যার ডান কুইকলি 

হাসাহাসির পর হকশাহেবের মুখ দেখে যোগেন বোঝে, উনি যা বলতে চান, এবার সেটা বলবেন। যোগেনও তার মুখের পেশিতে একটু বদল ঘটিয়ে বোঝায় সে-ও শুনতে তৈরি। 

হকশাহেব খুব নিম্নস্বরে বলেন, ‘মণ্ডল, তুমি কি মন্ত্রী হইব্যার রাজি হইব্যা?’ জবাবটা যোগেনের মুখ থেকে বেরিয়ে আসে, ‘কেডা হইব না? রাজি? মন্ত্রী হইব্যার?’ জবাবটা বেরিয়ে যাওয়ার পর আসল জবাবটা যোগেনের মাথায় আসে—সিদ্দিকি শাহেবের সঙ্গে আপনার আলাপনের ভিড়ের পিছনে আমারে খাড়ানো দেইখ্যাই কি আপনার সব একলপ্তে মনে আইল–মেবারপতন, বড়বাবু, মন্ত্রিসভা? কিন্তু মাথার জবাবটা সে মুখে আনে না। 

ততক্ষণে হকশাহেব ধমকে উঠেছেন, ‘মণ্ডল, বরি-শ্যাইল্যা পাল্টাজিগানো ছাড়ো। এডা কাজকামের কথা। 

‘মানে, আপনে ইয়োরোপিয়ান ব্লকের আশ্রিত প্রধানমন্ত্রিত্বের খেলাপ থিক্যা বাঁইচবার লগে কিছু সমর্থন চান, আমাগ? সিডিউলগ?’ 

‘তুমি তো দেহি বরিশাইল্যা অব অল ভ্যারাইটিজ ইন ওয়ান। এহন কথা কও চন্দ্রদ্বীপের ‘ন্যায়তীর্থগ লাগান। কথাডা এতই সরল যে বুইঝব্যার লগে কোনো বিরলপ্রতিভার দরকার পড়ে না। তোমারে তো অতার হইব্যার ডাকি নাই। মিনিস্টার হইব্যার ডাইকছি। হইব্যা মিনিস্টার, লগে কুনো এম. এল. এ আইনব্যা না—এডা কি কোনো সওদা হয়?’ 

‘আমারে বাইছলেন ক্যা? আরো তো শিডিউল আছে।’ 

‘আছে। কিন্তু তাগ সবার লগেই পার্টির একডা ল্যাজ আছে অথবা তারা নিজেরাই এত বড় হইয়া গিছে যে পার্টিটাও তাগ ল্যাজ হইয়া গিছে। তা দিয়া তো আমার চলে না। তুমি ছাড়া আর কোনও শিডিউল আছে ফ্রি? সুভাষবাবুর সঙ্গেও আছ, বঙ্কিম মুখার্জির সঙ্গেও আছ, সারওয়ার্দির লগে আছ। আবার, আবুল হাসেমের সঙ্গেও, আছ, কিন্তু কেও কইব্যার পারব না যে মণ্ডল আমার লোক।’ 

‘তার লগে আমার পাছায় পোস্টাফিসের. সিল মাইরতে চান যে মণ্ডল হকশাহেবের সম্পত্তি?’

এই সোজা কথাটার মধ্যে একটা দীর্ঘ অট্টহাস্য নিহিত ছিল। কিন্তু কেউ হাসে না।

‘তোমার আক্কেলদাঁত উইঠছে? নাকি, সারা জীবন, ধইরাই উইঠতেছে? ওঠার আর শ্যাষ নাই কুনো দিন? তুমি যে একডা মৌলিক কথা শুনাইল্যা সেদিন অ্যাসেম্বলিতে কাট মোশনে কইল্যা-না, নমশুদ্ররা হিন্দু না, হিন্দুগ লাইঠ্যাল হইয়্যা নমশূদ্ররা আর মুসলমানগ মাইরব না। কইল্যা-না। 

‘হ্যাঁ। কইছি। আরো কব। এডাই তো কহার।’ 

তোমার কথা শুইন্যা আমারও তাই মনে হইছে। এইডাই নতুন কথা, এইডাই কওয়ার কথা, দাঙ্গা বন্ধ করার ন্যায্য কথা। নমশূদ্রগ না-পাইলে হিন্দুরা দাঙ্গা কইরব্যার সাহস পাবে না। নাইলে তো, অ্যান্টি-জমিদারি সব গোলমালই তো দাঙ্গা হইয়া যায়।’ 

‘তাইলে সিডিউলগ থিক্যা তিনচাইর জন মন্ত্রী নেন।’ 

‘মণ্ডল। একে বাপ মরছে, তার উপর বৃষোৎসর্গ শ্রাদ্ধের ফর্দ ধরাইয়ো না। রাতের কথা ছোট হয়। তোমার একার মন্ত্রী হওয়ার বিরুদ্ধে কারণটা কি জানা যায়?’ 

‘হকশাহেব! একা একা মন্ত্রী হইয়্যা গেলে আমিও তো মুকুন্দ মল্লিক হয়্যা যাব। শিডিউল-স্বার্থডা আর কেউ আমার থিক্যা বুইঝতে চাইব না। সেডাই আমার কাজ। যোগেন মণ্ডল হইয়্যা মন্ত্রী চাই না। শিডিউল হইয়্যা আরো শিডিউল মন্ত্রীর একজন হইয়্যা মন্ত্রী চাই।’

‘হ্যাঁ—আ। তা তো তুমি কইতেই পারো। তোমার কাম তো একডা পার্টি বানান্। কাগ পার্টি সেইডা তো ঠিকই আছে। আর, আমার কাম তো পার্টি ভাঙ্গা।’ 

‘আপনে তো যাগ বিরুদ্ধে প্রজা পার্টি বানাইলেন, ইলেকশন জিতলেন, জিইত্যা আইস্যা সেই শত্রু পার্টি মুসলিম লিগে জয়েন দিলেন। আপনার ফলোয়ার যারা লিগরে চায় না, তারা করবটা কী?’ 

‘যদি আমার ফলোয়ার হয় তাইলে আমার লগেই থাইকব। আমি তো আর ফলোয়ার না। আমি তো লিডার। আকাশ-লাথ্যানো কথা কইয়া এক দলের মধ্যে দশ দল বানা—য়। নৌসের আলি, সামসুদ্দিন। ফজলুল হক বিশ্বাসঘাতকতা কইরছে। আরে, আমারে ঢাকার নবাবের জ্ঞাতিগুষ্টি, জমিদার, ভাইগন্যা, ভাইয়ের ব্যাটা নিয়্যা, ভাইয়ের ব্যাটার বেগমরো নিয়্যা সরকার চালাইব্যার লাগে আর কৃষকের কাছে বন্ধক রাখা জবানের হেফাজতের জইন্য তো টাইম দিব্যার লাগে। হয়্যা তো গিছিল—শাহেবরা বাঁচাইল বইল্যা সরকার টিকল।’ 

‘আপনারে বাঁচাইব কেডা? আমারে মন্ত্রী হইতে কন? যত উলটা-পালটা কাম। তমিজউদ্দিন শাহেব আর সামসুদ্দিনরে মন্ত্রী করেন—দলও থাইকব, আপনার আস্থা ভোটও থাকব।’ 

যোগেন বুঝে ফেলে, হকশাহেব হঠাৎ গুটিয়ে নিলেন নিজেকে। চলে যাওয়ার ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে ওঠার মুদ্রা মণ্ডলের, ঠেকে গেল হকশাহেবের প্রায়-স্বগতোক্তিতে। ‘চাষির কাছে জবান? আইন দিলেও যে-সরকার নিজে খাড়াইতে পারে না, শাহেবগর ভোটে সরকার জিতলে যাগ মাথা হেঁট হয় না, মন্ত্রিসভার মিটিঙে যারা লাটশাহেবরে দিয়্যা ক্যাবিনেটে চেয়ার করায়, তাগ কোনো দ্যাশ আছে না আল্লা আছে? তাগ আছে শুধু শাহেব। আমারে এডডু গুছাইব্যার লাইগব। তার পরে মুসলিম লিগের এই গরাদটা ভাঙব। এক্কেরে জরাসন্ধ বধ কইর‍্যা ছাড়ব। আরে, আমি হইল্যাম ইনডিয়ার সবার থিক্যা বেশি পপুলেশনের মুসলিম লিডার! আর জিন্না হইব কায়েদ-ই-আজম? এমন সব আইন বানাব যে মুসলমানরা খোদার দোয়া চাইব্যানে দুনিয়ার সব সেরা মুসলমান ফজলুল হকের আয়ু বাড়াইতে।’ 

আরো কিছু রাতে পার্ক স্ট্রিটের মোড়ে একটা উটকো বাসের দোতলার ঝড়ো বাতাসের শিহরে যোগেনের মনে হল–হকশাহেব কি বড়বাবুর মত করে সলিলকি দিচ্ছিলেন, ‘ইফ ইট অয়্যার ডান, হোয়েন’ টিস ডান, দেন ইট ওয়্যার ওয়েল্ ইট অয়্যার ডান কুইকলি’। 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *