১০৪. থিয়েটার থেকে ফেরা থিয়েটারে
গাড়িতে হেদো পর্যন্ত কেউ কোনো কথা বললেন না। দু-জনই একটু সময় নিলেন—এত আলাদা ধরনের একজন বড় মানুষের সঙ্গের স্মৃতিটা জারিয়ে নিতে।
‘নাইমব্যা?’
কেশব সেন স্ট্রিট পার হতে-হতেই হকশাহেব বলে উঠলেন, ‘এই যা, তোমার বাড়ি?’
‘সে তো এহানে নামলেই হয়।’
‘আপনার বডিগার্ড না লাইগলে নামা যায়।’
‘তোমার বাড়িতে দেরিটেরির ব্যাপার নাই তো?’
‘না। ঐ সব কি রাইখতে দেয়া যায়? তবে নাই।’
‘তাইলে তুমি আমার লগে আমার বাড়িতে চলো। তোমারে আমি কয়েকড়া কথা জিগ্যাইব।’
‘যদি কথা থাকে তাইলে যাইব না তো বলি নাই। আচ্ছা, হকশাহেব, ভাদুড়ীমশয় য্যান কইলেন এই পালাডা ১৯০৭-এ লেখা?’
‘হ্যা। এগুল্যা তো সব বঙ্গভঙ্গের হিন্দু প্রোডাক্ট।’
‘এইডা আমারে এডডু কইবেন? এগুল্যারে তো স্বদেশী নাটকও কয়? আপনিও কন?’
‘নামডারে এত মূল্য দিও না। এড্ডা নাম চালু আছে। সেই নামেই সবাই ডাকে।’
‘তাইলে ১৯০৭-এ যারে কয় স্বদেশী নাটক, তারেই কয় হিন্দু প্রোডাক্ট।’
‘তা কইব্যার পারো—রাফলি।’
‘আপনাগ তাইতে আপত্তিও ছিল না?’
‘সত্যি কথাডা হইল—অন্তত বেঙ্গলের ব্যাপারে ওডা, মানে হিন্দু আর স্বদেশীরে এক কইর্যা দেহাডা তহন ছিল পার্ট অব আওয়ার সেকুল্যার ট্র্যাডিশন। মানে, হইল, হিন্দুরা স্বদেশী করে, এডা হিন্দু-মুসলমান দুইয়েই মাইনত। অ্যাহন দেহি, মুসলমানদের মন নিয়্যা নানান লেখাপত্তরে লেখে—ইংরেজরা মুসলমানদের হাত থিক্যা নবাবি-সুলতানি দখল কইরছে বইল্যা না কী মুসলমানরা ইংরাজি শেখে নাই। এডা আমার ঠিক লাগে না। আমাগ এইসব বানান কথা। আরে লেখাপড়া শিখে নাই—এডারে তো একডা ন্যাশন্যালিস্ট প্রোগ্রাম কওয়া যায় না।’ হকশাহেব খুব একচোট হেসে উঠলেন। ‘মুসলমানগ ভিতরে যে-সব বাড়ির লেখাপড়ার অভ্যাস ছিল তারা ঠিকই পইড়ছে। তাগ বাড়ির মেয়েরাও পইড়ছে। আমার কি উপায় ছিল না পইড়্যা? আমার পয়লা বিবির গল্প শুইনছ না?’
‘কী য্যান, একডু-আধটু গোলমাইল্যা শুইনছি, তাও তো স্মরণ নাই।’
‘তাইলে আমার মুখ থিক্যাই শোনো। অন্যেরা তো অন্যের মুখ থিক্যা শুইনছে। আমি তো এইটটিন এইট্টি নাইন থিক্যা এইটটিন নাইনটি ফাইভ পর্যন্ত লাগাও প্রেসিডেন্সি কলেজে। আরো তিনবছর ওকালতি কলেজে। তাইলে ধরো, টানা নয়-দশ বছর কইলকাতায়, প্রেসিডেন্সিতে, হস্টেলে, একই ঘরে, একই রুমমেট দুইজনের সঙ্গে। এই বাকি দুইজন রুমমেটই ছিল নবাব সৈয়দ মহম্মদ আজমা খাঁর বেটা। উচ্চ শিক্ষিত বাড়ি। বাড়ি থিক্যা নিয়মিত চিঠিপত্তর আসে। দুই বেটা আমারে ধইর্যা জব লিখবার কয়। আমাগ টাইমে, অ্যাহনো, পত্রলিখনডা অ্যাড্ডা জরুরি কাম ছিল। মামুলি চিঠি। দিত্যাম লিখ্যা। একজনের চিঠি আইসত বেশ ঘন ঘন, অগ বড় বহিন, আপা খুরশিদ। তার হাতের লিখা এক্কেবারে স্বর্ণাক্ষর। ভাষাও খুব ভাল। তহন সেই ধরো আজ থিক্যা প্রায় চল্লিশ বছর আগে একডা ধর্মপ্রাণ গোঁড়া মুসলমানবাড়ির মেয়েরা পর্যন্ত এতডা শিক্ষিত ছিলেন। আমার যহন শাদির কথাবার্তা উইঠল, আমি কইয়্যা দিল্যাম—খুরশিদ আলম ছাড়া কাউরে আমি শাদি কইরব না। কম কথা—আট-দশ বছর ধইরা আমাগ ছদ্মনামে পত্রালাপ। বোঝো, শুধু হস্তলিপি দেইখ্যা প্রেম। সে-শাদি ভাইঙ্গ্যা গেল কিন্তু আমার তো দুই-দুইডা বেটি হইল ঐ বিবি থিক্যা! তোমারে এই কথাডা কইল্যাম শুধু এইডা জানাইবার লগে যে ইংরাজি না-শিখাটা কোনো মুসলিম ন্যাশন্যালিজমের প্রোগ্রাম না। কত মুসলমান বাড়ির নাম কইরতে কও। ধরো, হুগলির আলি ফ্যামিলি-আরে অক্সফোর্ড-কেমব্রিজের নীচে কোনো কথা নাই, পাঁচনৌয়ের মির্জা ফ্যামিলি—তাঁরে তো কয় রামমোহনের আগে বিলাত ফেরৎ। টাঙ্গাইলের চাঁদ মিয়া, রেজা আলি ডাক্তার, আহমদ ফজলুর রহমান। কত কব? দুইডা ঘটনা গুল্যাইয়া ‘মুসলিম ন্যাশন্যালিজম’ নামে একখান নতুন জিনিশ খাড়া কইরছে য্যান, অশিক্ষিত থাকাটার মধ্যে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ছিল। কই? হিন্দু ছোটলোকদের বেলায় তো ত্যামন কথা কওয়া হয় না। তোমাগ জাইতে কি খুব পড়াশুনার চল হইছে? হবারই পারে না। তোমাগ নাগাল মুসলমান—শূদ্ররাও তো পড়াশুনা শিখে নাই।’
‘তাইলে, ধরেন ১৯০৭-এর সময় এইসব থিয়েটারে মুসলমানরা আপত্তি করে নাই? এহনো তো করে না?’
‘ব্যাপারডা এডডু কঠিন কইর্যা ভাবব্যার লাগব, মণ্ডল। আপত্তিডা যে হয় নাই সেডা থিয়েটার বইল্যা, ডি-এল রায় বইল্যা, শিক্ষার প্রভাবেও–শেক্সপিয়ার যে মার্চেন্ট অব ভেনিসে সাইলক লিখছেন বা ‘ওথেলো’রে যে কালা মুর বানাইছেন, তার কারণে কি তাঁরে ইহুদি বা কালা বিদ্বেষী বলা চলে? এই সবে আপত্তি করতে হইলে একডু বাইগটারি লাগে। তোমার ঢাকার নবাব আর তার ভাইয়ের বেটা বাংলা ভাষাড়াই কয় না আর বাইগট হব? তোমার নো-কনফিডেন্সের বক্তৃতাডা আমার খুব ভালো লাগছিল। তুমি কইল্যা-না, যেহানে রায়টের নামও শুনে নাই, সেইহানে রিলিফ নিয়্যা গিছে। ক্যা? না রায়টের কথাডা শুনাইতে। হিন্দু কথাডা আলাদা কইরা শুনাইতে। তুমি য্যান কী কইল্যা? মোটিভেশন্যাল কমিউন্যাল ক্যাম্পেন বাই অ্যান ইয়েট আননোন কনসেপ্ট অব রায়ট।’
‘আপনার মনে আছে?’
‘মনে-রাখার মত কথা হইলে মনে থাকব না? তোমারে কইয়্যা দিচ্ছি—বেঙ্গলের এই লিগওয়ালারা এই রাজনীতি ভাইবব্যারও পারব না। আবার বাইগট হওয়ারও সাহস নাই। তয়? রায়ট বাধাইবে হিন্দুরা আর দোষে পড়ব মুসলমানরা। তুমি-যে সেদিন কয়্যা দিল্যা-নমশূদ্দুররা আর হিন্দু হইয়া মুসলমানগ লগে রায়ট কইরব না, সে-কথায় কংগ্রেস তো নাকে কাঠি দিয়াও হাঁচে নাই। হিন্দুসভা কী কয়?’
‘হিন্দুসভা তো হুইনল্যাম নদীয়ায় একডা মিটিঙে আর ফুলবাড়ি হাটে একডা মিটিঙে কলকাতার লিডাররা যায়্যা কইছে—তপশিলভাইদের হিন্দু সমাজ থিক্যা আলাদা কইরব্যার ষড়যন্ত্র হইছে। আপনারা এই চক্রান্ত সম্বন্ধে সাবধান থাকবেন।
ওঁরা হকশাহেবের নিউ পার্ক স্ট্রিটের বাড়িতে পৌঁছে গিয়েছিলেন। হকশাহেব যোগেনকে নিয়ে একতলার বসার ঘরেই বসলেন, ‘আশা করি, এত রাত্তিরে আমারে জরুরি কথা জানাইবার কর্তব্যবোধে কেউ আইসব না?’ উনি উঁচু গলায় কাউকে ডাকলেন। সে দরজায় এনে বললেন, ‘কাউরে আইসতে দিবি না, বাইরের প্যাসেজ দিয়া একতলা-দোতলাও করব্যার দিবি না।’ সে চলে গেলে হকশাহেব যোগেনকে বলেন, ‘বসো, মণ্ডল, গাও অ্যালাইয়্যা বসো।’
‘আমি তো বইসছি। কিন্তু এই রাত্তিরে যদি কোনো অতিথ্ আপনার দর্শন মানসে আসে, ঐ দারোয়ান কি তারে ঠেকাইতে পারব? এডা তো সবাই জানে, হকশাহেবের কাছে আর্জি জানানোর দিনরাত নাই—’
‘এইডা যে কে রটাইল? কথাডায় এডডু যে ঠেস দেয়ার ভাব আছে সেটাতে য্যান ব্যারিস্টারি হিন্দু গন্ধ। আর মুসলমানদের মইধ্যে এক পারে ইস্পাহানি। ও এডডু রগড় কইর্যা কথা কয় না?
‘আমার তো আর-একজনের কথা মনে আসে। সে-ই রটাইছে।’
‘কেডা? তুমি ক্যামনে জাইনল্যা?’
‘এ কে ফজলুল হক।
হকশাহেব একটু থমকে গিয়ে হো হো হেসে উঠেই তাড়াতাড়ি মুখে হাতচাপা দেন। হাসিটা বন্ধ হওয়ার পর হাতটা নামিয়ে যোগেনকে বলেন, ‘দুষ্ট। নড়াইলের ফাজিল হওয়ার চাও?’
