১০২. ইন্টারভ্যালের পর
ম্যানেজারবাবু প্রায় দৌড়ে বেরিয়ে যায়। জল ছিল যার হাতের ট্রেতে, সে, ট্রেটা এগিয়ে ধরে। হকশাহেব তাকে বলে দেন, ‘না, না, জল খাইব না। টেস্ট ধুইয়্যা যাবে।’
হঠাৎ ক্রি-ই-ইং আওয়াজে বেল বেজে উঠল, পর পর এইটুকু বোঝাতে যে দুটো বেল একই সঙ্গে দিয়ে দেয়া হল। তারপরই লোকজনের তাড়াতাড়ি হলে ঢুকে বসে পড়ার নানারকম আওয়াজ ওঠে, বিড়ি-সিগারেটের গন্ধ ভাসে, হলের আলো নিবে যায় ও তৃতীয় বেল বেজে ওঠে। ড্রপ উঠলে দেখা যায়, পেছনে পাহাড়ের আর দুর্গের ছবি আঁকা মেবার, এটা আগেও ছিল, ইন্টারভ্যালের পর সেই আঁকা ছবির ভিতর থেকে ছলছলিয়ে ঝর্নার জল পড়ে, আর একটা ছোট সাঁকোর তলা দিয়ে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে, দেখা যায়। একজন প্রধান মেয়ের নির্দেশ মত আরো ছ-সাতটি মেয়ে গাইতে-গাইতে নাচছে।
দৃশ্যটা দেখে যোগেনের মনে পড়ে যায়, ইন্টারভ্যালে পর্দাটা পড়েছিল—সাঁকো আর ঝর্না বাদে—এই দৃশ্যটির সামনে সত্যবতী তার হারানো ছেলে অরুণকে খুঁজে পায় আর অরুণ-সত্যবতীর ধিক্কারে তাদের দাদা মশায় ও বাবা, সগর সিংহ মোগলদের প্রতি তার আনুগত্যবোধ ত্যাগ করে মেবারের দিকে চলে আসে।
‘জল খাইব্যার দিলেন না! মুখ শুকনা লাগে না?’
‘জিভে জল নাই? জিভের জলে ভিজাও গলা।’
‘জল না-খাইলে তো ঢেকুর ওঠে না। ঢেকুর না উইঠলে তো পেট ভরে না।’
‘অ্যাহন ঢেকুর তোলার কাম নাই। ঢেকুর কি পাইছে না কি?’
‘ঢেকুর কি পায় না কী? ঢেকুর তো উঠে
‘তোমার ঢেকুর কি উইঠবার নিছে। তালে দ্যাও তুইল্যা। না-হইলে বায়ু ঊর্দ্ধগামী হইব গা এডডু চাপাইয়্যা চুপাইয়্যা তুইল্যা দেও, বেশি আওয়াজ দিয়ো না। দুই-তিন বারে ভাইঙ্গা-ভাইঙ্গা তোলো। প্র্যাকটিস নাই?’
‘কীসের প্র্যাকটিস? ঢেকুর তোলার, না চাইপ্যা তোলার?’
‘অ্যাহন দ্যাও তুইল্যা, জয়বন্ধু বইল্যা।’
হকশাহেব যেন সত্যবতীর অভিনন্দনের জবাবে অমর সিং-এর বাঁকা কথায় মগ্ন হয়ে গেলেন, ‘যারা এ যুদ্ধ জিতেছে, তারা সব সমরক্ষেত্রে মৃত হয়ে পড়ে আছে। প্রকৃত যুদ্ধ জয় তারা করে না সত্যবতী, যারা নিশান উড়িয়ে ডঙ্কা বাজিয়ে জয়ধ্বনি করতে-করতে যুদ্ধ হতে ফেরে। আসল যুদ্ধ জয় করে তারা, যারা সেই যুদ্ধে মরে।’ অমর সিংহের কথায় ঘাড় হেলিয়ে সম্মতি জানিয়ে হকশাহেব যোগেনকে জিজ্ঞাসা করেন, ‘কী উইঠছে নি ঢেকুর?’
কিন্তু মঞ্চে তখন নানা রকম অদলবদল ঘটে যাচ্ছে—শুধু মুখের কথায়। একটা কথা যদি শোনা না হয়, তা হলে ঘটনাটাই বোঝা যাবে না। তা ছাড়া কথা যারা বলছে, তারা তো কথাটাই শুধু বলছে না—কথার সঙ্গে মিল রেখে শরীরের নানারকম ভঙ্গি করছে। অমর সিং বেশ সাহসী ও স্পষ্টবক্তা হয়ে যায়, ফলে তার চলাফেরা কথাবলা ভাল লেগে যায়। মহাবৎ খাঁ তার স্ত্রীকে ফেলে এসেছে, নিজে মুসলমান হওয়ার সময়। সে সেই কারণে অনুতপ্ত হয়ে একা-একা সারাটা স্টেজে ঘুরে-ঘুরে সেই অনুতাপ জানায়-লম্বা চেহারার মানুষটির লম্বা-লম্বা পা ফেলায় মনে হয়, জায়গাটা তার পক্ষে ছোট হয়ে গেছে, যেমন তার দুঃখ বইবার পক্ষে তার শরীরটা যেন একটা খাঁচা হয়ে আছে—’কল্যাণীর পিতার প্রতি ক্রোধে তার উন্মুখ প্রেমকে প্রত্যাখ্যান করেছিলাম। যদি এখন তার ক্ষমা চাইবার সুযোগ থাকত।’ মহবৎ খাঁ কিছুতেই মেবার যুদ্ধে সেনাপতি হতে রাজি নয় কারণ সে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করলেও মেবার তার জন্মভূমি। জন্মভূমি আর ধর্মের প্রতি কর্তব্যের নিষ্পত্তি হওয়ার আগেই তার বাবা সগর সিংহ ঢুকে জানায়, ‘এতদিন পরে স্নেহময়ী মায়ের ডাক শুনেছি, কী গভীর, কী করুণ, কী গদ্গদ। মহাবৎ, তুমি তা কল্পনাও করতে পারবে না। তুমি তোমার পাপের প্রায়শ্চিত্ত করো। তুমি ধর্ম পর্যন্ত ছেড়েছ। কোরান পড়েছ অবশ্য। সে অবশ্য অতি মহৎ ধর্ম। হিন্দু ধর্ম তাকে হিংসা করে না। তার সঙ্গে এর বিবাদ নেই। যে-ধর্মের মূলমন্ত্র প্রবৃত্তিকে দমন, আত্মজয়; যে-ধর্মের চরম কথা সর্বভূতে দয়া, সামান্য পিপীলিকাটি বধ করতে যে ধর্ম নিষেধ করে।
যোগেন বলে বসে, ‘সগর সিং কি বামুন ছিল?’
হকশাহেব একটু বিরক্ত হয়েই যেন ঘাড় ঘুরিয়ে বলেন, ‘সিং কি বামুন হয়? ক্ষত্রিয়। সেও তো উচ্চবর্ণ। কথাগুল্যা তো ভাল।’ ইতিমধ্যে সগর সিংহ বলে ফেলেছে, তার মেয়ে ও মহবতের স্ত্রী, কল্যাণীকে সে নির্বাসন দিয়েছে কারণ কল্যাণী তার বিধর্মী স্বামীর পূজা করে।
সঙ্গে-সঙ্গে মহাবৎ খাঁ ঘোষণা করে, ‘হ্যাঁ পিতা, আমি প্রায়শ্চিত্ত করব—কিন্তু তা মুসলমান হওয়ার জন্য নয়। একদিন যে হিন্দু ছিলাম, সেই পাপের প্রায়শ্চিত্ত করব।’
মহাবৎ খাঁ এমন অভিনয় করল, হাততালিতে হল ফেটে পড়ে, মহাবৎ বোধহয় হাততালি যে পড়বে তা জানত। সে হাততালির সময়টা জুড়ে স্টেজে তার জায়গা বদলাতে থাকে।
‘মহাবৎ কিন্তু দারুণ পার্ট করে’। হকশাহেব জানান, ‘মেবার পতনে মহাবতই তো হিরো, বড়বাবু তো মহবৎ করেন। ক্যান যে আইজ কইরলেন না!’
মহাবৎ তখন স্টেজে তার জায়গা থেকে গম্ভীর উঁচু গলার কম্পনে কেটে কেটে বলে, ‘আজ থেকে হিন্দুদের প্রতি অনুকম্পার শেষরেখা হৃদয় থেকে মুছে ফেলে দিলাম।’ তারপর কয়েক পা এগিয়ে স্টেজের মাঝখানে দাঁড়িয়ে দুই হাত ওপরে তুলে বলে, ‘আজ থেকে প্রতি শিরায়, মজ্জায়, স্নায়ুতে আমি মুসলমান’। সেই বীরত্বের ভঙ্গি থেকে মহবৎ হঠাৎ নমাজের ভঙ্গিতে হাঁটু গেড়ে ঊর্ধ্ব মুখে দুই হাতের আঁজলা এক করে আল্লার দোয়া চাইল। সারা হল হাততালিতে উত্তাল হয়ে থাকে যতক্ষণ না আল্লার উদ্দেশ্যে মাটিতে ললাট ছুঁয়ে থাকার ভঙ্গি থেকে মহব উঠে না দাঁড়ায়।
এর পরও যে মহবতের আরো কিছু বলার থাকতে পারে, তা মনে হয়নি। নমাজের আত্মমগ্নতা থেকে বেরিয়ে আসাটা শরীরের কিছু ভাঙচুরে আর হাঁটার গতিতে বুঝিয়ে দিয়ে মঞ্চের বাইরে চলে যাওয়ার সম্ভাবনায় থমকে দাঁড়িয়ে বলে, ‘এত বিদ্বেষ, এত আক্রোশ! এই এঁদের উদার, অত্যুদার হিন্দুধর্ম, সনাতন হিন্দু ধর্ম। মুসলমান ধর্ম যে-কোনো বিধর্মীকে আপনার করে নিতে পারে। আর একজন বিধর্মী শত তপস্যাতেও হিন্দু হতে পারে না। হিন্দু হয়ে জন্মাতে হয়। এত গর্ব, এত অহঙ্কার?’
এরপরও কিছু কিছু হৃদয় বদল ঘটল ও মহবৎ খাঁ ও অমর সিং দুই ভাই ভয়ঙ্কর আয়োজনের এক যুদ্ধে উদ্যত হল। সেই দৃশ্যে আলোর রং বদলাতে থাকল পেছনের একটা শাদা পর্দার ওপর। দুই ধর্মে বিচ্ছিন্ন একই জন্মভূমির দুই ভাই চরম শত্রুতায় এ ওকে সম্পূর্ণ হত্যা করার জন্য অস্ত্র ধরতেই মানসী তার চারণীদের নিয়ে এসে গান গেয়ে সে যুদ্ধ থামিয়ে দেয়,
ধর্ম যেথা সেথায় থাক, ঈশ্বরেরে মাথায় রাখ,
স্বজন দেশ ডুবিয়া যাক—আবার তোরা মানুষ হ।
সেই গানের মধ্যে আলাদা ধর্মের দুই ভাই ও এক কন্যা পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে। ড্রপ সিন নামতে থাকে।
কেউ-কেউ হয়তো জানত, এখানেই নাটক শেষ, তারা ঠেলাঠেলি এড়াতেই হয়তো লাফিয়ে দৌড়ে বেরিয়ে গেল। বেরিয়ে যাওয়া বা হলে ঢোকা দিয়ে অবিশ্যি বোঝার উপায় নেই—নাটকের আরম্ভ বা শেষ বা ইন্টারভ্যাল। দরজাগুলো সব সময় বন্ধও থাকে না। বাইরের মাঠের নানা ঘটনাও দেখা যায় হলের ভিতর বসে থেকেই।
গানটা শেষ হওয়ার আগেই দু-জন এসে হকশাহেব ও যোগেনের কাছে দাঁড়াল বটে কিন্তু কিছু বলল না। হকশাহেব নিজে দাঁড়িয়ে উঠে মণ্ডলকে বললেন, ‘গাত্রোত্থান করা হোক। ঢেকুর কি উঠ্যাইতে পারছিলা শ্যাষ পর্যন্ত? তবে এত যুদ্ধবাদ্যের ভিতর কোনো আওয়াজ তো পাই নাই।’
যোগেনও দাঁড়িয়ে পড়েছিল, ‘থিয়েটার দেইখতে-দেইখতে ঢেকুর ভুইল্যা গিছিলাম।’
হকশাহেব তাঁর অট্টহাসির মধ্যে পা বাড়ালে সেই দু-জনের একজন পথ দেখিয়ে বলে, ‘আপনারা একটু ভিতরে চলেন স্যার। বড়বাবু অপেক্ষা করছেন।’ দু-জন দু-দিক থেকে পথ দেখিয়ে তাঁদের সামনের দিকে নিয়ে চলল। আলো যথেষ্টই ছিল, তবু হকশাহেব পায়ের দিকে তাকিয়ে-তাকিয়ে চলছিলেন। হলের ভিতরেই একটা ছোট সিঁড়ি। সেটাই ভিতরে যাওয়ার দরজা। একজন লাফিয়ে উঠে দরজাটা ঠেলে খুলে দিল।
