ত্রয়ী উপন্যাস -প্ৰথম পৰ্ব
ত্রয়ী উপন্যাস - দ্বিতীয় পৰ্ব
ত্রয়ী উপন্যাস - তৃতীয় পৰ্ব

পূর্বরাত্রি পূর্বদিন – ১৩

তেরো

জানুয়ারির কুড়ি তারিখে সকালেই খবরটা পাওয়া গিয়েছিল। সুমিতা রাখীকে সঙ্গে নিয়ে গাইনির প্রফেসরের কামরায় ছিল। মাসিক চেকাপ সুমিতাই করায়। ডাক্তার সুমিতার সঙ্গে গল্প করছিলেন। ঠিক ঐসময় খবরটা এল, ছেলেরা মেডিকেল কলেজের পেছনদিকটাতে জড়ো হচ্ছে- ওদিকে পুরনো য়ুনিভার্সিটি গেটে রায়ট-কার এসেছে একখানা। আরেকজন খবর দিল মিছিলটা আগেই বেরিয়েছিল, পুলিশ মিছিলটা ভেঙে দেয়— ঐ মিছিলের লোকেরাই এখন ওদিক জড়ো হচ্ছে আর পুলিশের ওপর ঢিল ছুড়ছে। কখন কী হয় বলা যায় না।

বেরিয়ে এসে দেখে রাস্তায় বেরুবার উপায় নেই। গেটের কাছে ভীষণ ভিড়। রাস্তায় দুখানা ট্রাকভর্তি আর্মড পুলিশ। কয়েকটা বাচ্চাছেলে মুখ খিস্তি করে গালাগাল করছে আর ক্রমাগত ঢিল ছুড়ে যাচ্ছে।

রাখী বসবে কী! সে তখন মানুষ দেখছে, মানুষের উৎক্ষিপ্ত মুষ্টিবদ্ধ হাত দেখছে। গলা ফাটানো স্লোগান শুনছে। ডেকে বলল, সুমি আয় এখানে দাঁড়াই— এখান থেকে দেখা যাচ্ছে।

হ্যা, নারকেল গাছ, ভাঙা অ্যাম্বুলেন্স আর লোহার গরাদের ফাঁক দিয়ে দেখা যাচ্ছিল। সারবাঁধা পুলিশ- মাঝখানে রাস্তা, তার ওপারে জমাটবাঁধা একদল মানুষ। ফর্সামতো লম্বাপানা মুখ একটি ছেলে হাত ছুড়ে ছুড়ে বোধহয় বক্তৃতা করছে। পেছন থেকে বৃষ্টির মতো ইটের টুকরো উড়ছে হেলমেটে লাগার ঠন ঠন শব্দ পর্যন্ত কানে এল। ঐ দ্যাখো, কী যেন ছুড়ল, বোধহয় টিয়ার গ্যাস- ঐ যে আরেকটা ঐ আরেকটা— আবার একটা— পালাচ্ছে, দলা পাকানো মানুষগুলো চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল। ফেটে যাবার আগেই কে একজন শেলটা পুলিশের দিকেই ছুড়ে মারল। দ্যাখো, বাবাজিরা এবার নিজেরাই পিছু হটছে। ওটাই বোধহয় রায়ট-কার – গরম পানি ছিটাবে এবার।

ঐরকমই চলল অনেকক্ষণ ধরে। রাখী অনেককাল আগে এইরকম দৃশ্য দেখেছিল। কিন্তু ঠিক এমন নয়- এমন রাগী নয়, এমন তেজি নয়। বুকের ভেতরে তার ধক ধক করে উঠেছিল। এদিকে পা ধরে এসেছে তার- আর দাঁড়ানো যায় না। সে সুমিতার ঘাড়ে ভর করে দাঁড়াল। সুমি বলল, রাখী আর নয় চল্, বাতাসটা এদিকে বইলেই আর এখানে দাঁড়ানো যাবে না। রাখী বারবার জিজ্ঞেস করছে তখন, সুমি জানিস তুই, ওরা কি এইরকম অবস্থায় গুলি চালায়? এত লোক একসঙ্গে, যদি গুলি চালায়— ইশ্, অনেক লোক মারা যাবে। ওদের কেউ নিষেধ করে না কেন? বাচ্চা বাচ্চা ছেলেরা সব।

ঢাকা শহরের অন্যান্য এলাকায় মানুষ কিছুই টের পায়নি সেদিন। অফিস আদালত চলেছে, ইস্কুল-কলেজও বন্ধ ছিল না। রাস্তায় যথারীতি ভিড় ছিল। কেউ জানত না মেডিকেল কলেজের সামনের রাস্তায় কী ঘটতে যাচ্ছে। এমনকি রাখী আর সুমিতা-যারা পুলিশ আর মানুষের লড়াই দেখছিল-তারাও ধারণা করতে পারেনি একটু পরই কী ঘটবে।

সেদিন সুমিতা রাখীকে পেছনের গেট দিয়ে হাঁটিয়ে নিয়ে এসে নিজের বিছানায় শুইয়ে দেয়।

কিন্তু তারপরই ঘটেছিল ঘটনাটা। সুমিতা এমার্জেন্সিতে ছিল তখন। শুনে ছুটে বেরিয়েছিল গেটের কাছে— অন্যান্য ডাক্তাররাও বেরিয়ে এসেছিল। দূর থেকে দেখল ক্ষিপ্ত উন্মাদ মানুষ তখন তাড়া করছে পুলিশকে। আর পুলিশ পিছু হটছে, একেকজন দৌড়ে পালিয়ে ট্রাকে উঠছে। তারপরই মানুষ নেমে এল রাস্তায়। ক্ষিপ্ত উন্মাদ তরুণেরা সব লম্বা লম্বা বাঁশের মাথায় রক্তভেজা জামা ফেস্টুনের মতো বেঁধে নিয়েছে। তারপর ঐ ফেস্টুন তারা একবার ডাইনে একবার বাঁয়ে দোলাচ্ছে। সমস্ত রাস্তাটা যেন থেকে-থেকে গর্জন করে উঠতে লাগল দারুণ হিংস্র ক্রোধে।

খবরটা ছড়িয়ে গেল খুব দ্রুত। নতুন করে পুলিশ এসে মোড়ে মোড়ে দাঁড়িয়ে গেল— রাস্তা বন্ধ। ওদিকে ক্রোধ তখনো গজরাচ্ছে। পুরনো টায়ার জোগাড় করে রাস্তার ছেলেরা আগুন জ্বালিয়ে দিল রাস্তার মাঝখানে। দূর থেকে ঐ আগুনের ধোঁয়া দেখল বিকেলে ঘরফেরতা ঢাকার মানুষ। আগুনের ধোঁয়া আর স্লোগান— ক্ষিপ্ত, উন্মাদ আর জ্বালাময়।

ঢাকা শহর যেন তৈরি হতে লাগল।

বিছানায় শুয়ে-শুয়ে খবরটা রাখী পেয়েছিল সুলতানের মায়ের কাছে। শুনেই সে বেরুচ্ছিল, রাস্তায় নামতেই দেখল সুমিতা আসছে। রাখীকে দেখে বলল, কোথায় যাচ্ছিস— ওদিকে ভয়ানক কাণ্ড হয়ে গেছে, আসাদ নামে একটি ছেলে মারা গেছে— ভীষণ অবস্থা- এখন বেরোস না।

রাখী দেখল রিকশ চলছে তখনও, দূরে গাড়িও দেখল। সুমিতাকে বলল, না, আমি যাই। কারফিউ দিয়ে দিলে মুশকিল হয়ে যাবে না?

চল্‌, তাহলে এগিয়ে দিই তোকে- সুমিতা রাখীর পাশাপাশি হল।

রিশও একটা পাওয়া গেল। হোসেনি দালান ঘুরে, পুরনো ঢাকার গলি ধরে রিকশটা গুলিস্তান এসে পৌঁছলে সুমিতা নেমে পড়ল। বলল, পৌছেই ফোন করবি, আমি হাসপাতালে থাকব।

রাখীর রিকশ মতিঝিল হয়ে এগুল। কলোনির মধ্যে ছেলেদের জটলা। থেকে-থেকে স্লোগান হচ্ছে। বাচ্চা বাচ্চা ছেলেদের গলার স্বর। কিন্তু ভয়ানক তীব্র হয়ে কানে বাজল। গাড়ির শব্দ, মানুষের দৈনন্দিনতায় কথা, ডাকাডাকি— সবকিছু ছাপিয়ে উঠতে লাগল ঐ স্লোগান।

পরের দিন হরতাল। রিকশ, গাড়ি চলল না সকালের দিকে, কিন্তু দুপুরের পর থেকে আবার চলল। রাখী বেরুল না। থেকে-থেকে বারান্দায় এসে দাঁড়াল। আর ইতস্তত স্লোগানের শব্দ শুনল।

আর ঐদিনই সন্ধেবেলা সুমি এল- সঙ্গে সাদেক সাহেব। সুমি কাঁদতে কাঁদতে রিকশ থেকে নামছিল, সাদেক মুখ নিচু করেছিলেন। আর ঐ দেখেই রাখীর বুকের ভেতরটা হঠাৎ খালি হয়ে গেল। চিৎকার করে উঠল কোথায় যেন কে। সেজানের নাম শোনা গেল।

রাখী দেখল, সুমি গেট দিয়ে ঢুকতে চাইছে না। চিৎকার করে ডাকল সে, সুমি, আয়— ওপরে আয়- আসছিস না কেন?

ঐ চিৎকারটুকুই। তারপরই রাখী যেন স্থির হয়ে দাঁড়াল। কেউ কিছু বলেনি, কেউ কিছু জানায়নি। কিন্তু তবু রাখী যেন আপনা থেকে মনের ভেতরে খবরটা পেল। দুচোখে কান্না উথলে উঠেছে, হৃৎপিণ্ডটা ফেটে যাচ্ছে, গলায় আটকে গিয়েছে স্বর, তবু সে সোজা টানটান হয়ে দাঁড়িয়ে। সুমি যখন সেজানের নাম উচ্চারণ করে কান্নায় ভেঙে পড়ল তখন আর কিছু রাখী জানে না।

সাদেক সাহেব দাঁড়িয়েই ছিলেন, রাশেদ সাহেবও এসে দাঁড়ালেন, রাখী মেঝেতে পড়ে আর সুমিতা রাখীর মাথা কোলে নিয়ে বসে আছে।

কান্না হঠাৎ চুপ করে গেলে কী হয়? সমস্ত পৃথিবী থেমে যায় তখন। সুমি কাঁদছিল না, রাশেদ সাহেব না, সাদেক সাহেব না। ওদিকে কোলাহলময় সন্ধ্যা, তার শব্দ, আলো আর মানুষজন নিয়ে যেন থেমে রইল।

কিন্তু সেও অল্পক্ষণ মাত্র! ঐ থেমে থাকা শুধুমাত্র উদ্বেলিত হবার জন্যে। রাশেদ সাহেব একবার রাখীর অজ্ঞান মুখের দিকে তাকাচ্ছিলেন, একবার সাদেকের মুখের দিকে তাকাচ্ছিলেন। সুমিতা রাখীর মুখে পানির ঝাপটা দিচ্ছিল, আর বলছিল, রাখী, চোখ ম্যাল্- রাখী ঈ— রাক্ষুসি, কান পেতে শোন্, আমি তোর জন্যে কোন্ খবর নিয়ে এসেছি।

রাশেদ সাহেব একসময় এগিয়ে এসে মেয়েকে তুললেন— পারেন না, শরীর কাঁপে, তবু তুললেন। তাঁর শরীর প্রকাণ্ড দেখাল তখন, শাদা চুলে আলো, আর পিতা সন্তানকে তুলে নিয়ে দাঁড়িয়েছে। বিপর্যয়, ধ্বংস, কোলাহল, চিৎকার আর তাঁর মাঝখানে দুবাহুর ভাঁজের মধ্যে তুলে ধরা সন্তান নিয়ে মহাকালের যেন এক পুরুষ।

কিছু বলতে পারল না কেউ। রাখীকে শুইয়ে দিলেন ঘরের ভেতরে। তারপর ঝুঁকে পড়ে ডাকলেন, রাখী- রাখী চোখ ম্যাল্। রাখী, তোর ছেলের জন্য তুই শক্ত হ।

রাখী চোখ মেলল একটু পর- তখন বিভ্রান্ত। সুমিতাকে দেখে বলল, সুমি, সেজান মরে গেছে? একেবারে মরে গেছে?

তার কথার জবাব কে দেবে। সুমিতা শুধু তার মাথায় হাত বোলায়। আর কানের কাছে মুখ নিয়ে বলে— রাখী তোর ছেলে আছে, ছেলের জন্যে তুই অস্থির হোস না।

রাখীর তখন যেন মনে পড়ে। নিজের পেটে দুহাত রাখে। তারপর উঠে বসে। বলে, বল্ কেমন করে হল?

রাখী কাঁদে না। সুমিতার চোখের দিকে তাকিয়ে বলে, তুই ডাক্তার তবু তুই খবরটা নিসনি? ভালো ডাক্তার কিন্তু তুই।

রাখী তুই শান্ত হ, দোহাই লাগে তোর।

করুণ হাসে রাখী, আমি শান্তই থাকব রে, আর অজ্ঞান হব না দেখিস। খারাপ লাগে কেন জানিস? ও দূর থেকেই চলে গেল— কিন্তু জানিয়েছিল, জানুয়ারিতে আসছে। বল্, এই কি ওর আসা?

রাশেদ সাহেবকে দেখে বলে, আব্বা ঠিক মনি ভাইয়ের মতো, মনি ভাইয়ের মতো সেজান মরে গেল আব্বা।

রাখী একাকী থাকে না এখন। সুমিতা এখন রাখীদের বাড়িতে রয়েছে। কিন্তু রাখীকে যেন ছুঁতে পারে না। রাখী নিজের ভেতরে ডুবে থাকে। বাইরের দিকে তাকায় কখনো কখনো। সেই যেমন দেখত একসময় তার অসুস্থ হবার পর, তেমনি ডাল দোলানো য়ুক্যালিপটাস গাছ, পানির ট্যাঙ্ক, চিলের ওড়াউড়ি এইসব দেখে। কিংবা হয়তো দেখেও না, এমনিই তাকিয়ে থাকে।

কোনো সময় হয়তো বলে, আচ্ছা সুমি, যদি সেজানের সঙ্গে সেই প্ৰথমে বিয়ে হত আমার, তাহলে কী হত বল্ তো? আমার সংসার হত, সুখ হত, ছেলেমেয়ে হত- তাই না?

সুমিতা কিছু বলতে পারে না।

রাখীও চুপ করে থাকে কিছুক্ষণ। তারপর বলে, সব হত, কিন্তু একটা জিনিস হত না- কী জানিস?

না, সুমিতার জানতে সাহস হয় না।

কিন্তু জানায় রাখী। বলে, আমি তাহলে সেজানকে পেতাম না। সেজানদের কি সহজে পাওয়া যায়, বল্‌?

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *