ত্রয়ী উপন্যাস -প্ৰথম পৰ্ব
ত্রয়ী উপন্যাস - দ্বিতীয় পৰ্ব
ত্রয়ী উপন্যাস - তৃতীয় পৰ্ব

কুলায় কালস্রোত – ৭

সাত

জামান ভারি স্বস্তি পেয়েছিল দুর্ঘটনার খবরটা শুনে। এমনিতেই তখন তার মেলা ঝামেলা। রাখী শান্তিনগর, সেখান থেকে যে কবে ফিরবে তার ঠিক নেই, ওদিকে আবার য়ুনিভার্সিটিতে গোলমাল পাকিয়ে উঠেছে, স্কলারশিপের ব্যাপারটা জট পাকিয়ে হোম ডিপার্টমেন্টের ফাইল-চাপা হয়ে আছে। এইরকম সময় দুর্ঘটনার খবর। সে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেছিল, যাক আপাতত একটা ঝামেলা থেকে বাঁচা গেল। তাছাড়া বাচ্চাকাচ্চা তার একদম সহ্য হয় না।

কিন্তু হাসপাতালের বিছানায় রাখীকে দেখে তার কেমন ভয় হয়েছিল- রাখী মরে যাবে না তো?

কিছুটা অপরাধবোধ, কিছুটা গ্লানি, কিছুটা আশঙ্কা— এইরকম মেশামেশি মানসিক প্রতিক্রিয়া নিয়ে সেদিন হাসপাতালের বারান্দায় পায়চারি করেছিল সে। আসলে তার কিছুই করার ছিল না। যা করবার রাখীর আব্বা নয়তো ওর বড়বোন করছিলেন, কিংবা অন্য কেউ করছিল। তার যে একটা অস্তিত্ব আছে রাখীর ব্যাপারে, সে নিজেও তা অনুভব করতে পারছিল না। সে কয়েকবার কাছাকাছি এগিয়েও গিয়েছে, কিন্তু কেউ তাকে ডাকেনি।

তারপর রাখীর অবস্থার কিছুটা উন্নতি হলে রাখীর কাছে গিয়ে তাকে আরো অস্বস্তিতে পড়তে হয়েছে। রাখী চুপচাপ থাকে। সে কথার পর কথা বলে যায়, কিন্তু রাখী বোজা চোখের পাতা খোলে না, দেয়ালের দিকে ফেরানো মুখ তার দিকে ফেরে না। এক অদ্ভুত অবস্থা। সে বুঝে উঠতে পারে না, এটা কি শারীরিক ক্লান্তি, নাকি তাকে এড়িয়ে যাবার জন্যে রাখীর ভান জামান য়ুনিভার্সিটি ক্লাবেও বসতে পারে না। পুরনো বন্ধুরা তার মুখের দিকে তাকায় না। অজয়ের সঙ্গে কথা বলতে গেলে তো, সে মুখের ওপর বলে বসল, বিট্রেইটারদের সঙ্গে আমরা কথা বলি না।

সুতরাং জামানকে কায়সারদের আড্ডায় আজকাল নিয়মিত যেতে হচ্ছে। সেখানে তার লম্বা সময়টা বেশ অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে। প্রথমদিককার মুখচোরা ভাবটা এখন আর নেই। নার্গিস, মাজহার আজকাল অন্তরঙ্গ ব্যবহার করে। নার্গিসের সঙ্গে টেবিলে বসেছিল বলে সেদিন কী ঠাট্টাই না করে বসল মাজহার। বলল, প্রফেসর, জান বাঁচিয়ে ভাই, নার্গিস দিনকে দিন বিপজ্জনক হয়ে উঠছে।

জামান আজকাল এসব ঠাট্টায় অসংকোচে যোগ দেয়। কায়সারকে আজকাল নিয়মিত পাওয়া যায় না। সে বাপের ব্যবসা বাড়াতে ব্যস্ত। হাসান সাহেবের সঙ্গে এদিক-ওদিকে ঘোরাঘুরি করে। হাসান, না সে, কে কাকে কব্জায় আনবে সেইটাই এখন দেখবার বিষয়। ইতিমধ্যে আবার রাজনীতিও ঢুকে পড়েছে এদের মধ্যে। মুসলিম লীগ, আওয়ামী লীগ, ন্যাপ নানান ধরনের লোক এসে যায় একেক দিন।

প্রথমদিন মিসেস জোহরা হাফিজকে দেখে তো জামান থ। ডাকসাইটে ডাক্তারের স্ত্রী নিজেও যুনিভার্সিটির সিনিয়র লেকচারার- দুতিনটি ছেলেমেয়ে আছে। জামানকে দেখে দিব্যি হাত বাড়িয়ে দিলেন, হলো। মহিলা কায়সারের সঙ্গে এসেছিলেন। চলে যাবার পর নার্গিস চোখ গোল গোল করে বলল, এঁর তো মিক্সড্ পার্টিতে থাকবার কথা নয়।

কায়সারকে জিজ্ঞেস করল, কোত্থেকে জোটালেন?

জুটে যায়, ভারি নির্বিকার জবাব কায়সারের। বলে, কার কপালে কী আছে কেউ বলতে পারে? য়ু মাস্ট অ্যাডমিট শি ইজ এ ম্যাগনিফিশেন্ট লেডি।

জামান স্বীকার করে, নিশ্চয়ই, একশোবার।

নার্গিস মন্তব্য করে, স্ট্রেঞ্জ।

স্ট্রেঞ্জ কেন? কায়সার অবাক হয়। বলে, ম্যানিলার হোটেল থেকে বেরুচ্ছি, দেখি লাউঞ্জে একাকী বসে আছেন। কী ব্যাপার, না ঢাকা থেকে এসেছেন সোশ্যাল ওয়েলফেয়ারের ওপর একটা সেমিনারে। সঙ্গীরা সবাই বেড়াতে বার হয়েছেন। শুধু তিনিই যাননি। সঙ্গীর অপেক্ষা করছেন- তাঁর কৌতূহল ভিন্নদিকে।

তারপর?

তারপর আবার কী। খুব সোজা, টোকিওতে দুজনে একসঙ্গে বেড়ানো- হংকং-এ দুজনে একসঙ্গে শপিং, ব্যাংককে স্টপ-ওভার- সেও ঐ একই সঙ্গে, শেষে এই ঢাকা— সুইট হোম।

কিন্তু …

কায়সারকে বলল না, কিন্তু জামানকে না-জানিয়ে পারল না। প্রথমটায় শুধাল, আপনি নিশ্চয়ই জানেন ওঁর সম্বন্ধে।

জামান কী জানবে? তার কোনো ধারণাই নেই ঐ মহিলা সম্পর্কে। সুতরাং কৌতূহলী হল সে। বলল, না তো, কিছুই জানা নেই আমার।

বাহ্ বিশ্বসুদ্ধ লোক জানে আর আপনি জানেন না? শোনেনি কখনো, মহিলা ঢাকা শহরের একজন বিখ্যাত লেসবিয়ান?

খবরটা শুনে জামান বেকুব বনে গেল একেবারে। কত খবরই যে জানে এরা। নিজেকে এদের কাছে শিশু মনে হয়। ঢাকা শহর তাহলে সত্যিই আর ঢাকা নয়। নাকি ঢাকা শহর সত্যি সত্যি ঢাকা। কথাটার দুরকমই অর্থ হতে পারে। জামান আপন মনে হাসে একটুখানি, তারপর প্রসঙ্গটা মন থেকেই বাদ দেয়। যার যা খুশি করুক। ওদিকে তাসের টেবিল থেকে ডাকাডাকি হচ্ছিল। তার বিশ্রী লাগছিল, ভাবল, উঠবে।

কিন্তু বাসায় ফেরার কথা মনে হতেই বেশ দমে গেল। বাড়িটা এত নিঃশব্দ লাগে আজকাল। মনে হয় হাঁ করে আছে সর্বক্ষণ, কাছে গেলেই একেবারে গিলে খাবে। সে উঠে দাঁড়িয়ে আবার বসে পড়ল। ওদিকে তখন তাসের টেবিল জমজমাট। দূরে সোফায় বসে আছে ইভা মরিস। ওদিকে কে একজন ওকে ডাকছে। করাচির অতিথিরা বেশ জমে গেছে কায়সারদের সঙ্গে। জামান ডাইনে বাঁয়ে তাকিয়ে উঠে দাঁড়িয়েছিল। না, আর এখানে নয়, তার এবার বেরুনো উচিত।

সে মনে-মনে যখন তৈরি হচ্ছে, ঠিক ঐসময় কাছে এসে দাঁড়াল ইভা। শুধাল, উঠছেন?

জামান ইভার দিকে তাকিয়ে দেখল। সাজ-পোশাক তেমনি নিখুঁত। শরীরের উচ্চকিত অংশগুলো খুব বেশি সোচ্চার। পুলোভারটা ঘাড়ের ওপর রাখা। বলল, চলুন এখুনি বেরিয়ে পড়া যাক, নইলে আবার কার পাল্লায় পড়ে যাব— তখন আরো রাত হবে, এমনিতে বড্ড খাটুনি গেছে আজ।

ইভা কথা বলবার সময় পেছনে তাকিয়ে দেখে একবার। মনে হল, সে কাউকে পাশ কাটাবার জন্যে এমনি করে উঠে এসেছে জামানের কাছে। জামান শুধাল, কাউকে খুঁজছেন?

হ্যাঁ, দ্যাট বাস্টার্ড, ঐ যে-

জামান দেখে, কালোমতো ভয়ানক গোঁফঅলা এক পাঞ্জাবি লাল লাল চোখ মেলে ইভার দিকে তাকিয়ে আছে।

ঐ বাস্টার্ড আমার পেছনে লেগেছে ক’দিন ধরে। আমাদের কোম্পানির মস্ত ক্লায়েন্ট— কিছু বলাও যায় না। ওকে যদি চটাই তাহলে আমার কোম্পানি আমাকে লিটেরালি লাথি মেরে বার করে দেবে। আর কায়সারটাও এমন, লোকটাকে ডেকে বুঝিয়ে বলে না একটু।

জামান লক্ষ করে, লোকটাও ওঠার আয়োজন করছে। ইভা জানাল, চলুন শিগগির, আর দেরি নয়।

পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে জামান ইভাকে দেখে। ইভার পোশাক, সুন্দর শরীর, দুচোখের ম্লান ক্লান্তি- সব মিলিয়ে কেমন একটা বিষাদময় সুদূরতা যেন ঘিরে আছে ইভাকে। ক্লাব থেকে বেরিয়ে নামল দুজনে বড় রাস্তায়। পেভমেন্টের ওপর দাঁড়িয়ে ইভা জিজ্ঞেস করে, কিসে যাবেন, রিকশ না স্কুটারে?

জামান প্রস্তাব করে, তার চাইতে বরং চলুন হাঁটা যাক কিছুটা।

ওদিকে শীতের বাতাস বয়ে আসছে উত্তর থেকে। রাস্তা প্রায় নির্জন হয়ে এসেছে। বোধহয় চাঁদ আছে আকাশে। ল্যাম্পপোস্টের আলো ঘিরে ধরেছে ধোঁয়াটে কুয়াশা। পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে ইভা একসময় বলল, সময় সময় কীরকম সব অদ্ভুত ঘটনা ঘটে, তাই না?

জামান ঠিক ধরতে পারে না, ইভা কোন্ প্রসঙ্গ আরম্ভ করতে চাইছে। শুধায়, কোন্ ব্যাপার বলছেন?

ব্যাপার আর কী, দেখছেন না, কীরকম সব বিচিত্র লোকের সঙ্গে আমার নিজেকে জড়াতে হচ্ছে? আমার ইচ্ছে করে না, তবুও। বলুন, এর কোনো মানে হয়?

বন্ধুত্ব কি খারাপ জিনিস? জামান সকৌতুকে জিজ্ঞেস করে।

মাই গুডনেস, লোকটাকে দেখার পরও ভাবছেন আমার সঙ্গে ওর বন্ধুত্বের সম্পর্ক? আমি ঐরকম উগ্র লোক পছন্দ করি না- ভদ্রলোক হবে, শান্ত হবে, সহৃদয় হবে, তবেই না বন্ধু!

নার্গিসের সঙ্গেও তো আপনার ভালো সম্পর্ক হয়েছে।

নার্গিস! ইভা হাসে, ও কি অন্তরঙ্গ হওয়া কাকে বলে বোঝে কখনো?

একটু থেমে আবার বলে ইভা, তাছাড়া দোষটা বোধহয় আমারই, কপালও বলতে পারেন- ঠিক লোকটির সঙ্গে অন্তরঙ্গতা আমার কস্মিনকালেও হয় না।

এ আপনার বাজে ধারণা।

কে জানে, ইভা শান্তস্বরে জানায়। তারপর কী ভেবে হঠাৎ বলে, আপনার সঙ্গে পরিচয় হয়েছে সে-ই কবে, কিন্তু একদিনও আলাপ করা হল না। কেন যে হল না আমি একেক সময় ভেবে পাই না। অথচ প্রায় রোজই তো দেখা হচ্ছে।

জামান তাকায় ইভার দিকে। ইভার চূর্ণ চুলে তখন আলোর আভা। বলে, হ্যাঁ আমারও কথাটা মনে হয়েছে— রোজই দেখা হচ্ছে কিন্তু আলাপ হচ্ছে না।

ব্যাপারটা এমনিতে কিছু না- কিন্তু ভাবুন তো!

আচ্ছা, হঠাৎ ইভা প্রসঙ্গ পাল্টায়, বলে, আপনি কি সোজা বাসায় যাবেন? হ্যাঁ, বাসায় ছাড়া আর কোথায় যাব?

ইভা ল্যাম্পপোস্টের নিচে দাঁড়িয়ে ঘড়ি দেখে। জামান নিজের ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে, দশটা। ইভা সম্ভবত লম্বা একাকী পথের কথা ভাবছে। বলল, আপনি তো সেগুনবাগান যাবেন, চলুন একসঙ্গেই যাই।

সো কাইন্ড অফ য়ু, ইভা কৃতজ্ঞ হয় যেন। কৃতজ্ঞ এবং নিশ্চিত। তারপর আবার বলে, হ্যাঁ, যে কথাটা আমার মনে হয়েছিল, জিজ্ঞেস করব? বাহ্, করুন। জামান ইভার মুখের দিকে তাকাতে চায়।

খুব পার্সোনাল কথা কিন্তু, ব্যাপারটা সত্যিই আমাকে খুব অবাক করে। কী ব্যাপার বলুন তো, জামান সজাগ হয়ে ওঠে।

ইভা খুব ইতস্তত করে। বলবে কি বলবে না ভাবে। শেষে বলেই ফেলে, দেখুন ভুল বুঝবেন না, আপনি বন্ধু বলে স্বীকার করছেন বলেই জিজ্ঞেস করছি।

আহা, এত ফর্মাল কেন আপনি?

আচ্ছা আপনি কেন এত রাত অবধি ক্লাবে থাকেন? ইফাই’ম নট রং য়ু হ্যাভ গট এ বিউটিফুল ওয়াইফ।

জামান হেসে ওঠে ইভার কথায়। তার মনে হয়, ইভা সত্যি তার সঙ্গে আন্তরিক হয়ে উঠতে চাইছে। বলে, এখন কিন্তু আমি একা।

মানে? ইভা দাঁড়িয়ে পড়ে।

একা মানে, বউ বাড়িতে নেই, বাপের বাড়ি গেছে।

ও, ইভা নিজের মনে হাসে। একটা প্রকাণ্ড গাছের নিচ দিয়ে হাঁটছে তখন, দুজনেই অন্ধকারে ঢাকা পড়েছে।

আচ্ছা, ইভা শুধায়, একটা কথা আমাকে বলবেন?

কী কথা বলুন?

মানুষ সংসার করে কি সুখী হয়?

ভারি বিষণ্ণ ইভার গলার স্বর। জামান কী বলবে ভেবে পায় না। তবু প্রশ্নের জবাবে বলে, সুখ বস্তুটাই তো রিলেটিভ, তাই না? আর গোটা ব্যাপারটাই মনের, কেউ যদি ভাবে সে সুখী – তাহলেই সুখী।

আপনি সুখী? হঠাৎ ইভা সোজাসুজি প্রশ্ন করে।

জামান ব্রিত হয় ঐরকম সোজাসুজি প্রশ্নে। কী বলবে ভেবে পায় না। শেষে ধীরে ধীরে বলে, জানি না ঠিক। একেক সময় মনে হয় আমি সুখী- আবার একেক সময় ভারি খারাপ লাগে। মুশকিল কী জানেন, কী হলে সে সুখী হতে পারা যায়, তা বোধহয় কেউ বলে দিতে পারে না।

আমি কিন্তু পারি, ইভা সহজ গলায় হেসে ওঠে। মনে হয় গম্ভীর আবহাওয়াটা ঝেড়ে ফেলতে চাইছে ও। বলে, আমি বলে দিতে পারি, কোন্ জিনিসে সুখ।

আপনি খুব লাকি, কেউ কেউ সারাজীবনের সাধনাতেও পারে না।

ও নো- খুব সোজা। এ আমি ছেলেবেলা থেকেই জানি- ইফ য়ু হ্যাভ এনাফ মানি, থিংস টু এন্‌জয়, ফ্রেন্ডস টু মিট, গ্লোসেস টু গো— তাহলেই আপনার সুখ।

জামানকে এবার হাসতে হয়, কী জানি, হবে হয়তো।

আপনার বিশ্বাস হচ্ছে না? আমাকে সুখী মানুষ বলে আপনার মনে হয় না, বলুন?

জামান এর পর আর কথা বলতে পারে না। মেয়েটা এত চালাক। সে হাঁটতে হাঁটতে ইভার মুখের দিকে তাকায়।

আমি খুব সুখী, ইভা জানায়, আই আর্ন এ লট, স্পেড এ লট, আই গো টু প্লেসেস, এন্‌জয় হোয়াটেভার আই লাইক-

এইটুকু বলে ইভা হঠাৎ থেমে যায়।

থামলেন যে? জামান প্রশ্ন না করে পারে না, ওতেই কি সব সুখ? আপনার নিঃসঙ্গতা নেই?

ইভা তখন চুপ। ভারি নির্জন পথ। ইভার জুতোর হিলের খুট-খুট শব্দ হচ্ছে শুধু।

একসময় হাঁটতে হাঁটতে ইভা মাথা নাড়ায়। যেন আপন মনে বলে, ইয়েস জামান, আই’ম টেরিলি লোনলি-এত ভীষণ একাকী আমি যখন ভবিষ্যতের কথা ভাবি, তখন রীতিমতো ভয় পেয়ে যাই। কে জানে, সুখ হয়তো এক বস্তু আর লোনলিনেস বোধহয় আরেক বস্তু। সুখের যেসব উপাদান আমার জানা- সেসবের একটাও আমি ছাড়তে পারব না। কিন্তু আপনি বলতে পারেন, এইসবই কি লোনলিনেস-এর কারণ?

জামান পরিবেশটাকে হালকা করার জন্য সহজ ভঙ্গিতে বলে, বাহ্, আপনি লোনলি হতে যাবেন কেন- এত বন্ধু আপনার, বাইরে কত কাজ করতে হয় আপনাকে

ইভা এবার জামানের মুখের দিকে তাকায়। বলে, আপনি কিন্তু কথা ঘোরাচ্ছেন। এই তো একটু আগে বললেন, সুখী হওয়া না-হওয়া ফিলিংসের ব্যাপার-ঐ যে বললেন রিলেটিভ-মনের দিকে থেকে কী অনুভব করছি সেটাই বড় কথা। জানেন, একেক দিন আমার ভীষণ খারাপ লাগে, দারুণ কষ্ট হয়— কিসের কষ্ট, নিজেই বুঝতে পারি না— শুধু কষ্ট হয়।

আপনি বিয়ে করে সংসারী হলে পারতেন, জামান প্রস্তাব করে।

ও নো, ইভা প্রতিবাদ করে ওঠে। বলে, আমার নিজের বোনকে তো দেখছি। তারপর মাজহারের সঙ্গে ব্যাপারটা ঘটে যাবার পর কাউকে আমি মন দিয়ে গ্রহণ করতে পারি না। আমার মনের ভেতর কোথায় যেন কী একটা বিষিয়ে রয়েছে।

একটা রিকশ থামিয়ে দুজনে উঠল। পাশাপাশি বসে জামানের অস্বস্তি লাগতে আরম্ভ করে। ইভার পোশাক থেকে মৃদু সেন্টের গন্ধ এসে নাকে লাগছে। ইভার বাহুর কোমল স্পর্শ এসে লাগছে তার বাহুতে। বাঁ হাতটা কোথায় রাখবে ভেবে পাচ্ছে না।

কী ছেলেমানুষ আপনি, বলে ইভা মৃদু হাসে। হেসে জামানের হাত মাথার ওপর দিয়ে তার ঘাড়ের পেছনে রাখে। ঐ অবস্থায় জামানের কাঁধের কাছে মাথা হেলিয়ে দিয়ে নিজেকে যেন স্বচ্ছন্দ করতে চায় সে। আসলে তখন সে বিষণ্ন হয়ে উঠেছে। বলল, এই নিঃসঙ্গতা এমনি খারাপ জিনিস যে মানুষকে একেক সময় পাগল করে দেয়। আর আমার এমনই কপাল দেখুন— আমার বন্ধু হবার জন্যে কেউ কেউ, হয় প্রেমিক, নয়তো শত্রু। বাহ্ প্রেমিক কি বন্ধু হয় না।

হয়, কিন্তু আমার বেলাতে হয়নি কখনো। কোনো মানুষের সঙ্গে টাকা ছাড়া আমার কোনো সম্পর্ক হয় না। একেক সময় নিজেকেই দারুণ অবাস্তব লাগে।

অনেকক্ষণ, জামানের মনে হয়, বোধহয় অনন্তকাল দুজনে রিকশয় বসে আছে, অন্ধকার শূন্যলোকে থেকে যেন গড়িয়ে নেমেছে দুজনে পাশাপাশি আর রিকশঅলাটা বোধহয় শয়তান। দুজনকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে নরকের দিকে।

আমার কিন্তু আপনার ওয়াইফের কাছে একটা ব্যাপারে ক্ষমা চাওয়া দরকার।

আমার ওয়াইফের কাছে, কেন? জামান ভয়ানক বিভ্রান্ত বোধ করে।

ভুলটা আমারই, শি ওয়াজ ইনোসেন্ট লাইক এ বেবি, কিন্তু আমি ভেবেছিলাম অন্যকিছু। আর সেও মাজহারের জন্য। সে বেচারা কিছুই জানত না, আর আমি রাগের বশে ওঁকে ভীষণ অপমান করি।

জামান খবরটা শুনল, কিন্তু যেন শুধু শুনলই। যেন ব্যাপারটা ঠিক এইরকমই ঘটেছিল তা সে জানত। সে কিছুই বলল না বেশ কিছুক্ষণ। শেষে কী যে হল, হঠাৎ যেন গা ঝাড়া দিয়ে জেগে উঠল সে। ঐ মুহূর্তে তার ভারি আপন লাগল ইভাকে। আস্তে করে ঘাড়ে হাত রেখে কাছে টানল। মসৃণ ঘাড়ে হাত ঘষে ঘষে আদর করল একটুখানি। মুখে কিছু বলল না। কী বলবে, ইভার সঙ্গে এমন অন্তরঙ্গ কথা হবে কোনোদিন, সে কখনো ভাবতেও পারেনি। ইভার নিশ্বাস, শরীরের গন্ধ, দেহের উষ্ণতা সব একসঙ্গে তার অনুভূতিতে গিয়ে মিশছে তখন। কী বলতে পারে সে?

শুধু একসময়ে বলল, ইভা, তুমি খুব ভালো মেয়ে।

ইভার বাসার সামনে রিকশ এসে থামতেই ইভা হাত ধরে টানল, নামুন একটুখানি।

না, আজ থাক। জামান হাত ছাড়াতে চেষ্টা করে।

বাহ্ আজ থাকবে কেন, বাসায় গিয়েও তো বসেই থাকবেন, শুধু এক কাপ কফি খেয়ে যাবেন, প্লিজ!

জামান ইভাকে আরেকবার দেখল, অতি সহজেই— তারপর সে ভুলে গেল পরের দিন তাকে ভাইস-চ্যান্সেলরের সঙ্গে দেখা করতে হবে, ভুলে গেল সকালবেলার দিকে একবার হাসপাতালে দিকে যাওয়া দরকার। এবং তার যে বাসায় ফেরা খুব দরকার- এ কথাটাও সে অনায়াসে ভুলে যেতে পারল।

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *