নৈশ অপেরা – ৯

তখন স্ত্রীলোকটা এলিয়কে কহিল, হে ঈশ্বরের লোক, আপনার সহিত আমার বিষয় কি? আপনি আমার অপরাধ স্মরণ করাইতে ও আমার পুত্রকে মারিয়া ফেলিতে আমার এখানে আসিয়াছেন।

-1 Kings 17:1

.

‘অনেকটা সময় কথা বলে গেলাম কিন্তু আপনি কিছুই জানালেন না। এটাও বললেন না কেন আমার থেকে গল্পটা শুনতে চাইছেন।’

অক্ষয় হাসলেন। ‘হতেও তো পারে আপনি সন্দেহভাজনদের একজন।’

‘কিন্তু, সেটা আপনি মনে করছেন না। আমিও বহুদিন ক্রাইম বিট করেছি. পুলিশের বডি ল্যাংগুয়েজ আমার জানা। এই কারণেই ধৈর্য ধরে এতক্ষণ কথা বলে যাচ্ছি কারণ আমি বুঝি, খুঁটিনাটি সমস্ত কিছু পুলিশ জানতে চায় নিজেদের সুবিধের জন্য। কিন্তু, শুধু আমিই কথা বলে যাব আর আপনারা স্পিকটি নট থাকবেন, তা তো হয় না।’ অন্ধকার ঘন হয়েছে বাইরে। আমার মুখ বিস্বাদ, সিগারেটে তেতো আমেজ।

সোমেন কর্মকার বললেন, ‘যদি এমন হয় যে, আপনার সাহায্য চাইতে ঝাড়খণ্ড সিআইডি এতদূর এসেছে?’

‘আমি কীভাবে সাহায্য করব? বার বার সবাইকে যেটা বুঝিয়ে আমি পারি না, রহস্যের সমাধান আমার পেশা নয়। নেশাও নয়। আমিও বোকা, এত কিছু বলে তারপর নিজেই জড়িয়ে যাই।’

‘কিন্তু আপনি যতই অস্বীকার করুন, দার্জিলিং-এর কেসটা অদ্ভুত সমাধান করেছিলেন।” ‘কী কুক্ষণে করেছিলাম! সেই থেকে গোটা পৃথিবী পেছনে পড়ে আছে আমার আর আমিও,’ সিগারেট ধরাতে গিয়ে বিরক্ত লাগল, লাইটার জ্বলছে না, ‘ধ্যাত’ বলে ঠোঁট থেকে সিগারেট নামিয়ে বললাম, ‘আমিও তাদের কথায় নাচছি। শুনুন, বারবারা, ক্রিস, অবিনাশ, কাউকে নিয়ে আমার লেনাদেনা নেই। আমি ব্যর্থ হয়েছি। এখন ভুলে গেছি ওদের।’ সিগারেটটা দুমড়ে দিলাম। আমার অসাফল্যে সবার এত ইন্টারেস্ট কেন?

‘এই ছবিগুলো দেখেও আপনার ইন্টারেস্টিং লাগছে না?’

‘লাগলেও-বা কী করতে পারি বলুন? আমার তো ফেরার কারণ নেই। আমি পুলিশ না, রহস্যভেদীও নই। কোন ক্যাপাসিটিতে ফিরব?’

‘আপনাকে জড়াতে হবে না। আমরা গল্পটা শুনে নিয়ে আপনাকে ছেড়ে দেব। বিদায় নেবার আগে অবশ্যই খুলে বলব, কেন এসেছি এখানে। কিন্তু, আপনার কথা শেষ হবার আগে নয়। তার কারণ, আমাকে নিশ্চিত হতে হবে সত্যিই যে কারণে এতদূর এলাম, সেটা হাওয়ায় ভাসানো ছিল না। মিস ভট্টাচার্য, আমি একটা অ্যাজাম্পশন থেকে চলছি, যার সূত্র আমাকে দিয়েছিল অ্যারন। যদি আমার অ্যাজাম্পশন ঠিক হয়, তাহলে অবশ্যই তিন বছর আগে আপনি যা তদন্ত করেছিলেন তার সঙ্গে আজকের ঘটনার সম্পর্ক আছে। কিন্তু, ঠিক না হলে আমার আসা পণ্ডশ্রম ধরে নিতে হবে।’

চাপান-উতোর বিরক্ত লাগছিল। হাল ছেড়ে সোফায় হেলান দিলাম।

এখানে হেমন্ত আসে রিক্ত সন্ন্যাসীর আগমনবার্তার মতো, যখন ভোরের রং লাল হয় আর গাছেরা পাতা ঝরিয়ে কঙ্কাল অবয়ব আকাশের বুকে মেলে। ডেগাডেগি নদীর ওপর ছোট্ট ব্রিজে বসে তুমি তখন দেখবে শেষ দুপুরে ছায়া ঘনায়, মাঠ ফেরত মোষেদের দল গম্ভীর পায়ে এগিয়ে যায়। কোথায় জানি না। তাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে যায় এক আদিবাসী ছেলে। কুচকুচে কালো রং। মুখে হাসি নেই। কথাও বলে না সে। গলা দিয়ে কঠোর হুম হুম আওয়াজ করে। তার তালবাদ্যে মোষেরা বুঝে নেয় অভ্রান্ত পথ। আমি রোজ বিকেল বেলা ব্যালকনি থেকে দেখি ।

পরের দুইদিন আমি একটানা ভেবে গিয়েছিলাম, ক্রিস নয়, অ্যাগনেসের অন্তর্ধান রহস্য নিয়ে। টাউনের এর-ওর কাছে জানতেও চেয়েছি। তারপর মনে হয়েছে দেওয়ালে মাথা ঠুকি। কারণ, কেউ কিছু জানে না। তারা শুধু জানে যে, অ্যাগনেস বলে কেউ এককালে এখানে ছিল, এখন আছে তার ভূত। উদাসীন কাঁধ ঝাঁকিয়েছে তারা। কেউ কিছুই বলবে না, কারণ সবাই জানে এমন রহস্যদের কূলকিনারা এতদিন পরে পাওয়া অসম্ভব। তবু আমি কেন খুঁজছি? এমন বোকামিকে প্রশ্রয় দেবার মতো মেয়ে ছিলাম না, তাও আবার অফিস ছুটি নিয়ে। মহেশ মাঝে মাঝেই ফোন করে, এটা-ওটা কাজ দেয়। কাজ না-থাকলে আবোলতাবোল বকি দু-জনে, কলিগদের নিয়ে পিএনপিসি করি। ফোন রাখার আগে মহেশ বলে, ‘এবার ফেরো।” আমিও বুঝি, ছায়ার পেছনে ঘুরে লাভ নেই। সবার চোখে সন্দেহ, আমি কেন পুরোনো ঘটনা খুঁচিয়ে অশান্তি বাড়াচ্ছি। আমাকে শুনিয়ে টিকটিকি বলে বিদ্রূপ করেছে স্থানীয় মানুষ। খারাপ লাগলেও কিছু করার নেই। সত্যিই তো আমার কাজের পেছনে যুক্তি নেই। দু-দিন ধরে নিজের মতো গেছি এখানে-ওখানে। অ্যারনও আমার সঙ্গে ঘুরেছিল। আমরা হেঁটে হেঁটে চলে যেতাম, বেথেল মিশন চার্চ, অন্যদিকে দয়াপুর বা খালারি, কখনো পূর্বের পাহাড় পর্যন্ত। শুধুই একে-ওকে জিজ্ঞাসাবাদ নয়, আমি ঘুরতেই চাইছিলাম। অ্যারনের মনে কী ছিল আমি জানি না। আমরা অবিনাশের বাড়ি গেলাম পুরোনো ফাইলপত্র আবার দেখতে। তারপর বেরিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ঝাঁটিফুলের মাঠ, কারণ সেখান থেকে জঙ্গলের ভেতর দিয়ে একটা পথ গিয়ে উঠেছে স্যাংচুয়ারির পেছনের পোড়োমাঠে। তখন বিকেল। স্টেশনের বাইরে মিটমিটে চায়ের দোকান আলস্যের হাই তুলছে। দোকানিরা ব্যস্ত ক্যারাম খেলতে, কারণ খদ্দের নেই।। উনুনে আঁচ দিয়েছে কেউ। মলিন ধোঁয়া শীতের গঞ্জকে ঝাপসা বানিয়েছে। সেখান থেকে হেঁটে এলে র‍্যামসে সাহেবের বাংলো। আগাছায় ভরতি। শরীর ঢেকেছে লতাপাতা। জানালার ভাঙা কাচের ভেতর থেকে অন্ধকার উঁকি মারে। নিঃশব্দ কুয়াশা শিকারি বেড়ালের মতো গুঁড়ি মেরে তার ভেতর সেঁধিয়ে যায়। বাগানে একটা দোলনা, আশ্চর্য, এত বছর পরেও অক্ষত। একা একা দোল খাচ্ছে। তাকে ঘিরে এগিয়ে আসছে পিয়াল, সেগুন, ফলসা গাছের বাহিনী। কিছু দূরে একটা আদিবাসী বেকারি। তার সামনে ক্লান্ত মুখেদের সারি, হাওয়ার প্রাচীন সমাবেশ। হেমন্তের ঝাপসা গোধুলিতে ভূতুড়ে সাইরেন ভেসে আসছে দূর থেকে। সম্ভবত বন্ধ কারখানার পেটের ভেতর থেকে, যারা কোনোদিন এ পৃথিবীর বুকে দ্বিতীয়বার নেমে আসবে না। আকাশে ইটভাটার কালো ধোঁয়া এখান থেকে দেখা যায়। হিম চাতুর্যে প্রবাদ ও লোককথার দল আমাকে ঘেরে। বাঁ-দিকে হাঁটলে গঞ্জের থানা। সেখান থেকে আরও এগোলে গঞ্জের পশ্চিমে পাহাড়ের দিকে যাওয়ার রাস্তা। পথে আদিবাসী পল্লির মধ্যে পড়বে একহার্ট সাহেবের বাংলো, লতিফ সাহেবের বাংলো, যারা সবাই ভগ্নস্তূপ। সারাদিন পাতা ঝরে এখানে। দেওয়ালে ছায়া সরে সরে যায়। কার একলা মুখ ভেসে থাকে জানালায়। গঞ্জ মানে ছেড়ে যাবার শীতকাল।

‘এখানে স্বপ্নেরা তোমাকে রোগা করে দেবে।’ অ্যারনের কথায় আমি হাসলাম, কারণ দুঃস্বপ্নকে স্বপ্ন বলা যায় না। ‘আমাদের টাউন আর তার প্রতিটা লোক যারা এখনও ছেড়ে গেল না, তারা সবাই একটা লকড রুমের ভেতর আছে, আমিও। আমাদের স্মৃতি কাতরতা, অভিমান, আনন্দ, এমনকী একাকিত্ব পর্যন্ত, সেই ঘরের ভেতর ঘুরে ঘুরে আবর্তিত হয় যাকে আমরা নাম দিই স্বপ্ন।’

‘ঠিক আছে, নিটশে, এবার থামো।

‘তুমি কি দেখতে পারছ না যে, ক্রিসের নিরুদ্দেশ এবং তার তদন্ত সমান অ্যাবসার্ড? পিসি ক্রিসকে দেখতে পায় কেন? বেঁচে থাকলে তার বয়েস বাড়ার কথা। কিন্তু, আমাদের লকড রুমে সময় সরলরেখা নয়, বৃত্তাকার। তাই শিশু ক্রিস ফিরে আসে। তোমার আগেও এসেছে। তুমি যখন সাতদিন পরে চলে যাবে, তখনও আসবে অন্য কারোর সামনে।’ ‘সেজন্য তোমার মনে হয়নি কখনো, মন দিয়ে খুঁজে দেখি?”

‘এই খোঁজা তোমাকে হতাশ করবে, রাগিয়ে দেবে। গতকাল যেমন দিয়েছিল। কিন্তু, তুমি জানালে না কাল রাত্রে কোথায় ছিলে। কাল তুমি বলেছিলে আর তদন্ত চালাবে না। তার পরে কেন মত পালটালে, আমি বুঝিনি।’ ভুরু কোঁচকাল অ্যারনের।

‘তোমার মায়ের কি সত্যিই শরীর খারাপ হয়েছে?’

‘মাঝে মাঝেই হয়। সেদিন তোমার সঙ্গে কথা বলার পর থেকে জানালার ধারে একঠায় বসে, নয়তো বিছানায় শুয়ে। খাচ্ছে না। জোর করে খাওয়ালে বমি করছে। বলছে মাইগ্রেন। সেটা হতেও পারে। কিন্তু, চোখ লাল। কাঁদছে সম্ভবত।’

‘অ্যারন, আমি জানি না কী বলব। মানে, আমি যদি জানতাম-

‘এর জন্য তোমার নিজেকে দায়ী করার দরকার নেই। তুমি অন্য কিছু করতে পারতে না। শোনো, বাবা একসময়ে চাইত আমি যেন আর্মিতে ঢুকি। তারপর যখন দেখল সেসব হবে না, তাহলে যেন আইটি-তে যাই। সেটাও যখন হলনা, তখন চাইল নিদেনপক্ষে তার ব্যাবসায় আমি যেন ঢুকি। মা চাইত আমি যেন প্রফেসর হই। মায়ের ফ্যাসিনেশন ছিল কলেজের শিক্ষকদের প্রতি। আমি যেদিন বাড়িতে ঘোষণা করলাম যে, আমি শেফ হতে চাই, বাবা প্রথমে হা-হা করে হাসল। হাসতে হাসতে রেগে গেল। যথেচ্ছ গালাগালি দিল ইংরেজিতে। আমি কিছু না-বলে চুপচাপ বসে ছিলাম। বাবা তখন ভাবল আঁতে ঘা দিয়ে কথা বলবে। অপমান করল। আমার ইন্টেলেক্ট, পৌরুষ, যা পারে তাই নিয়ে। আমি তাতেও প্রতিক্রিয়া না-দেখানোয় “ড্যাম ইট” বলে বেরিয়ে গেল। মায়ের সেদিন থেকে আবার মাইগ্রেন। বমি করছে আর শুয়ে আছে ঘর অন্ধকার করে। আজকের মতোই অবস্থা। এগুলো ঘটবে আমি জানতাম। তাহলে কি আমার না-বলা উচিত ছিল? তোমার কী মনে হয়?’ আমি নীরব থাকলাম। ‘মায়ের কথা ছাড়ো। তুমি নিজে কি হতাশ হয়ে পড়ছ? বিশেষত কালকের ঘটনার পর?’

‘অনেকগুলো প্রশ্ন আছে, অ্যারন। তোমার বাবা কেন গতকাল রেগে গেলেন, কেন আমাকে ওভাবে আক্রমণ করলেন, সেটা কি শুধুই জেনিফারের খোঁচা? আমার কেন যেন মনে হচ্ছে, কেউ কেউ আরও বেশি কিছু জানে, যা তারা বলবে না। যেমন, রেভারেন্ড গরম্যান। গুড ওয়ার্কস –

‘অবশ্যই জানে। ধর্ম নিয়ে যার ব্যবসা-

‘ব্যবসা? আমি অত কঠিন শব্দ ব্যবহার করব না।’

‘ব্যবসা তো অবশ্যই, মানুষকে বোঝানো যে সে মহিমা ও গ্রেস নামক কিছু সান্ত্বনা পাবার যোগ্য। আমি নিশ্চিত যে ডোডো অনেক ঘটনাই জানে, কারণ মানুষ তার কাছে আসে নিজের অপরাধী মনকে খুলে ধরতে। অ্যাগনেস বা ক্রিস সংক্রান্ত ঘটনার অপরাধীরা আসেনি,

আমি বিশ্বাস করি না। প্রশ্ন হল, ডোডোকে মুখ খোলাবে কে? অথবা, মুখ খোলার মতো স্মৃতি কি তার অবশিষ্ট আছে?’

গতকাল রাত্রিবেলা আমরা টমাস অ্যাক্টায়ারের বাড়িতে ডিনারের নিমন্ত্রণ রক্ষায় গিয়েছিলাম, তবে মনীষা আসেননি। নতুনদের ভেতর দেখলাম টমাসের স্ত্রী মেরিল, আর ডন বসকো স্কুলের শিক্ষক আলফ্রেড হেমব্রমকে। টমাস ছোটোখাটো, কিন্তু মেরিল ছিপছিপে হবার কারণে লম্বা লাগে। চোখের কোনায় শ্বেতির আভাস, ঈষৎ বাদামি চুলের গোছা মুদ্রাদোষে পাক দেন অবিরত। ঢাকাই কটনটা মনে হয় অনেকদিন পর আলমারি থেকে বেরোল, পাটভাঙার চিহ্ন পরিষ্কার। আমার পরিচয় শুনে অবাক হলেন। এত কমবয়েসি বলে নাকি ধারণা করেননি। ‘কিন্তু কিন্তু’ করে জিজ্ঞাসা করেই ফেললেন একবার, ‘মানে, আপনাদের মনে হয় অনেক কানেকশন, না? আমরা সাধারণ মানুষ তো, ওই পেশায় গিয়ে দুম করে এত বড়ো ব্রেক পাব না!’ পেশাদারি হাসি ঝুলিয়ে নীরব থাকার কৌশল আমি শিখে গেছি।

টমাসের কটেজের একদিক ভাড়া দেওয়া হয় ডন বসকোর ছাত্রদের জন্য। অপেক্ষাকৃত প্রাচীন অন্যদিকটায় তাঁরা থাকেন। দেওয়ালে যিশুর ছবি, সেখানে মালা পরানো, সামনে জ্বলছে ধূপ। উঁচু কাঠের চেয়ারে বসলে পা মাটি থেকে উঠে যায়। ডাইনিং টেবিলে অজস্র ফাটল, কিন্তু আতিথেয়তায় কমতি ছিল না। সুস্বাদু কাবাব দিয়ে শুরু হল, তারপর নান, পনির, পোলাও, মাটন, পায়েস। সব নাকি মেরিল নিজের হাতে বানিয়েছেন।

খাবার টেবিলে আমার পাশে জেনিফার পিঠে খোঁচা দিলেন। ‘শুনলাম তুমি নাকি ক্রিসের ব্যাপারে খোঁজখবর নিচ্ছ?’ খাচ্ছেন না কিছুই প্রায়। একটা রুটি নিয়ে বসে আছেন। ‘তোমার কি মনে হয়, পারবে? আমি অনেক খুঁজেছি। আশপাশের গ্রামেও লোক লাগিয়েছিলাম। একটা পার্টি তো হলফ করে বলেছিল সোনাহাটুতে এক কিশোরের সন্ধান পেয়েছে। অবিকল ক্রিস। তা, সে ধরো কুড়ি বছর আগে তো হবেই। টাকাও নিল আমার থেকে বেশ কিছু। তারপর উধাও।’ দু-জনে নীচু তারে কথা বলছিলাম, অন্যেরা নিজেদের মধ্যে গল্পে মগ্ন বলে কান দেয়নি।

‘ফোন করেননি?’

‘ধরত না। ল্যান্ডলাইন নাকি ডিসকানেক্টেড।’

মায়া লাগল। মাথাপাগলা বুড়িকে যে যা পেরেছে বুঝিয়ে টুপি পরিয়েছে।

‘তোমাদের একটা খবর দেওয়া হয়নি। ধানবাদের ওই রিয়েল এস্টেটের লোক আমাদের কাছে এসেছিল গতকাল। ভালো দাম দেবে জানাল। এই জায়গাটা নাকি সানসেট ভিউয়ের জন্য আদর্শ। কে জানে বাবা, আমি তো কোনোদিন দেখতে পেলাম না।’ মেরিল বললেন।

‘কিন্তু আমি রাজি হইনি।’ টমাস বললেন। ‘এই বয়েসে যাব কোথায়!’ তারপর অনেক কথা বলে গেলেন টমাস, কেন লোভনীয় অফারকে প্রত্যাখ্যান করলেন। এই বাড়িতে অনেক স্মৃতি তাঁদের, মেরিল প্রথমে এসে ভূতের ভয়ে রাত্রে ঘুমোতে পারতেন না, তাঁদের মেয়ের হাত ভেঙেছিল ওই জামগাছের ডাল থেকে পড়ে, এসব গল্প। পিতৃভিটে বিক্রি করা পাপ, কথাচ্ছলে দুই-তিনবার বললেন টমাস। শেয়ালের গর্ত এবং আকাশের পাখিদের বাসার মতোই তিনি নাকি নিজস্ব কোটর বেছে নিয়েছেন। আমি দেখলাম শক্ত মুখে এডওয়ার্ড গ্লাসের পানীয়র দিকে তাকিয়ে। অন্যেরা টমাসের গল্প শুনলেও জেনিফার হাসিমুখে এডওয়ার্ডকে দেখছেন।

‘আশ্চর্য ব্যাপার, পরের পর প্রপার্টি কিনছে। টুরিস্ট স্পট করলে থাকা যাবে না অবশ্য। মালিক নাকি সরকারের কাছের লোক।’ অবিনাশ এর মধ্যে অনেকটা হুইস্কি খেয়ে ফেলেছেন, মুখ লাল এবং হাঁফাচ্ছেন অল্প। ‘অতীত রেকর্ড স্বচ্ছ নয় শুনেছি। প্রচুর গুন্ডাগর্দি করেছে, কাঠমাফিয়াদের সঙ্গে কানেকশন আছে। তাও ভালো, এখানে ভদ্রভাষায় কিনতে চাইছে। জোরজুলুম করছে না।’ মেরিল মালিকের নাম জিজ্ঞাসা করলেন। অবিনাশ চট করে বলতে পারলেন না, মুখ ফেরালেন এডওয়ার্ডের দিকে।

‘পবন সিং বা পবন কুমার। আমি দেখিনি। কোম্পানির উকিলের সঙ্গে সইসাবুদ হয়েছে।’ ‘কিন্তু মরতে এখানে কেন!’ বারবারা বিড়বিড় করল। ‘শান্তিতে আছি, সহ্য হয় না ব্লাডি—কী যে মধু আছে কে জানে। একটা ভূতুড়ে শহর, তাকে নাকি ঢেলে সাজাবে। সকালে উঠে দেখতে হবে পাশের বাগানে ন্যাংটো মেম শুয়ে আছে।’

জেনিফার গলা উঁচিয়ে বললেন, ‘অবশ্য কালো সাদা যাই হোক, ভালো দাম দিচ্ছে সেটাও পয়েন্ট। এডওয়ার্ডের খুশিই হবার কথা।’ এডওয়ার্ডের মনোযোগ টাল খেল না। তিনি আলোর সামনে গ্লাস ধরে হুইস্কির রং পরীক্ষা করছিলেন।

‘আমার কয়েকটা প্রশ্ন আছে। যেদিন ক্রিস হারিয়ে যায়, দোতলা থেকে কে চেঁচিয়েছিল? বারবারা হতে পারে না কারণ তাহলে তার স্মৃতিতে থাকত। পরের প্রশ্ন, অ্যাগনেস কেন ওরকম একটা চিঠি লিখতে গেল। তৃতীয় প্রশ্ন—’

‘এগুলো সবই ভালো। কিন্তু, একটাও আসল প্রশ্ন নয়।’ অ্যারন সিগারেট ধরাল।

‘আসল প্রশ্ন তাহলে কোনটা?”

“ক্রিস কেন হারিয়ে গেল, এটাই আসল। তনয়া, আমরা সবাই মাথার চুল ছিঁড়ি অপরাধ কীভাবে ঘটল আর কীভাবে অপরাধীকে ধরা হবে সেই নিয়ে। কিন্তু, কেন একটা অপরাধ ঘটল, তার ফলশ্রুতি কী হতে পারে, একটা খুন করার পরে মানুষ একইরকম থাকে কি না, সেগুলো বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আমি তোমাকে বলেছি, আমি মানুষের ক্ষয় নিয়ে ইন্টারেস্টেড। কেন একজন মানুষ এত নৈরাশ্যের মধ্যে ক্ষয়ে যেতে যেতেও নিজেকে গ্রেস পাবার সান্ত্বনায় ভোলায়। যদি ভোলায়-বা, সে তার পরে একটা অপরাধ কীভাবে করতে পারে? কীভাবে অপরাধী তৈরি হয়?’

‘শুধু ক্রিস নয়, অ্যাগনেস কেন হারিয়ে গেল? তুমি তো ভাবছ অ্যাগনেসকে নিয়েও, আমি জানি—’

‘আমার ভাবার কারণ তোমার থেকে আলাদা। তুমি যুক্তির আশ্রয় নিচ্ছ। কিন্তু, আমি দেখেছি যে, যুক্তি দিয়ে ক্রিসের রহস্যের সমাধান গত তিরিশ বছরে কেউ করতে পারেনি। তাই অ্যাবসার্ডিটিকে কাউন্টার করতে আমি অ্যাবসার্ডের সাহায্য নিচ্ছি। চিরুনিটা যেমন। এটাই রাস্তা বলব না, কিন্তু পরীক্ষা করা যেতে পারে। কিন্তু তুমি বললে না, কাল রাত্রে কোথায় ছিলে।’

‘স্যাংচুয়ারিতে ছিলাম না সেটাই-বা জানলে কী করে?’

‘আমি রাত্রে ঘুমোই না, তুমি জানো। তোমার দরজা খোলার আওয়াজ আমি পেতাম। তা ছাড়া, ভোরবেলা গিয়ে সে-ঘর তালাবন্ধ দেখেছি।’

অবিনাশকে দেখলাম আলফ্রেড হেমব্রমের দিকে ঝুঁকে কিছু বলছেন। একমাত্র এঁর সঙ্গেই প্রাথমিক ‘হ্যালো’ বাদে অন্য কথা হয়নি। মধ্যবয়স্ক গম্ভীর মানুষটার গায়ের রং কুচকুচে কালো এবং দড়িবাঁধা চশমা ঝুলছে বুকে। দেখে মনে হয় গির্জার ফাদার। সাদা জামা পরা, কাঁচা-পাকা দাড়িগোঁফ। তবে, সবার আগে চোখে পড়ে গভীর দুটো চোখ। মোটা ঠোঁট, কোঁকড়া চুল এবং চওড়া কাঁধ দেখে ভাবছিলাম, কোথায় দেখেছি আগে! তারপর বুঝলাম, ‘সেভেন’ সিনেমাটা মর্গান ফ্রিম্যানের বদলে এই লোকটাও করতে পারত। আমার কী মনে হল, আলফ্রেডকে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘আপনি ডন বসকোতে আছেন। ডলোরেস ও’ব্রায়েনকে চেনেন?’

ভুরু তুললেন আলফ্রেড। ‘অবশ্যই। আপনি চেনেন নাকি?’

আমি উত্তর দেবার আগে জেনিফার বললেন, ‘আলফ্রেডের বিশেষ বন্ধু তো ডলোরেস!” এবং, আলফ্রেডের ভুরু কুঁচকে গেল। ভালো বিপদ হয়েছে! এমন মানুষকে লোকসমাজে বার করাও ঝামেলার। তাড়াতাড়ি বললাম, ‘আপনাদের লাইব্রেরির অনেক নাম শুনেছি। একদিন দেখতে যাব?”

জেনিফারের থেকে চোখ সরিয়ে কোঁচকানো ভুরু সোজা হল। স্বাভাবিক স্বরে হাসলেন আলফ্রেড, ‘আসবেন। আগের দিন ফোন করে নেবেন একটা।’ এডওয়ার্ডের দিকে ফিরলেন, ‘কালেকশন আরও বাড়বে। রেভারেন্ড গরম্যান তাঁর ব্যক্তিগত লাইব্রেরি আমাদের লিখে দিচ্ছেন।’

.

‘সুস্থ মস্তিষ্কে দিচ্ছেন আশা করি!’ এডওয়ার্ডের মুখ বেঁকে গেল।

‘সে তো মৃত্যুর পর লাইব্রেরির ভাগ পাবে।’ খিকখিক হাসলেন জেনিফার। ‘এডওয়ার্ড মরতে দিলে তো।’

স্যালাড তুলছিলেন এডওয়ার্ড নিজের পাত্রে, হাত থেমে গেল। ‘মানে?

‘বেতলাতে পাঁচকাঠা জমি কিনে রেখেছিলেন তো। মিশনের নামে লিখে দেবেন বলেছিলেন। দানপত্রও প্রস্তুত। কিন্তু, একমাত্র মেয়ে থাকতে তা কি হয়? দানপত্র নাপালটানো পর্যন্ত—’ জেনিফার চোখের ইঙ্গিত করলেন। শক্ত হল এডওয়ার্ডের মুখ। গালের পেশি দপদপ করছিল তাঁর। মেরিল সুযোগ বুঝে অদৃশ্য হলেন কিচেনে ।

‘আপনাকে এগুলো কে বলল? আপনি জানেন কী বলছেন?’

জেনিফার নির্বিকার মুখে রুটির টুকরো চিবোলেন। ‘আহা, এতে তো দোষের কিছু নেই।

বাপের রক্ত-জল-করা প্রপার্টি কেনই-বা মিশনে যাবে, সন্তান যেখানে বেঁচে!

অবিনাশ গলা খাঁকড়ালেন, ‘থাক এসব কথা ।’

‘থাকবে না।’ এডওয়ার্ড তীব্রকণ্ঠে বললেন। ‘আপনি অনেকক্ষণ ধরে খুঁচিয়ে যাচ্ছেন, কারণ আমি বাবার বাড়ি বেচে দিয়েছি। আপনারা সবাই, আপনারাও সেটাই ভাবেন তো?” ‘ঠিকই ভাবে,’ অ্যারন বলল। এডওয়ার্ড আচমকা অ্যারনের কাঁধ খামচে হাত তুললেন, বারবারা বলে উঠল, ‘ও কী হচ্ছে!’ হাত নামালেন এডওয়ার্ড। দাঁত ঘষলেন।

‘ভাগ্যিস অনেক বড়ো হয়ে গেছিস, ইউ ড্যাম ফুল! বেতলার ওই জমির ব্যাপারে আগেও শুনেছি, কিন্তু আমার ইন্টারেস্ট ছিল না। তোর মা বরং কয়েক বার আমার কাছে বলেছে কারণ সে লোভী, আর আমি তাকে ধমকেছি—’ এডওয়ার্ডের চোখের কোনায় রক্তের ছিটে জমতে দেখছি।

‘অ্যাই, তুই থামবি?’ চেঁচাল বারবারা।

‘আমাকে জ্ঞানের বাণী শোনাস না। বাড়ি আমি একা বেচিনি, তুইও মত দিয়েছিস, কিন্তু আঙুল আমার দিকেই ওঠে। সেদিন তুইও গিয়ে বললি, বাবার বই, ঘড়ি, ফটো সব অকাতরে দিয়ে দিচ্ছি, তুই হলে নাকি পারতিস না? হ্যাঁ দিচ্ছি, কারণ আমি চাই না কিছু রাখতে।’ এডওয়ার্ডও চেঁচালেন। অবিনাশ মাথা নীচু করে বসে, টমাসের চোখ ছাদের সিলিং-এ। আলফ্রেড বুকে চিবুক ঠেকিয়ে চোখ বন্ধ করে আছেন। ‘এই সমস্ত স্মৃতি আমার কাছে জঞ্জাল, এরা আমাকে কিচ্ছু দেয়নি। সব কেড়ে নিয়েছে আমার থেকে।

‘কেউ তোর কাছে জবাবদিহি চায়নি। তুই নিজে গিল্ট থেকে এগুলো বলছিস। আর এই যে জেনিফার, এর আসল সমস্যা হল সেক্স পায়নি বহুকাল। ওকে আমি বলতাম গেট লেইড—’ বারবারা টলোমলো গলায় চিৎকার করল। ‘গেট লেইড বাবা!’ জেনিফার আমার দিকে ফিরে ফিসফিস করলেন, ‘পাগলামির ভান করছে, আসলে সেয়ানা।”

‘শাট আপ, ফালতু কথা বলিস না। আমার গিল্ট? একটা গোটা টাউন যে আমার ছেলের কথা ভুলে গিয়ে দিব্যি স্বাভাবিক জীবন কাটাচ্ছে আর পার্টি করছে আর এই যে,’ চায়না বোল তুলে ধরলেন এডওয়ার্ড, ‘সুপ খাচ্ছে, মদ খাচ্ছে হাসছে, তারা কেউ গিলটি নয়? রেভারেন্ডের ওই বেতলার জমিতে আমি থুতু ফেলি। ওদের সবার জন্য আমার ছেলে— আমার ছেলে—’ এডওয়ার্ড হাঁফিয়ে উঠেছিলেন, অনেকটা হুইস্কি গিলে মুখ মুছলেন, সবার দিকে তাকিয়ে বিকৃত মুখে হাসলেন এবার, আঙুল তুলে বললেন, “আমি জানি, আপনাদের ভেতরেই অপরাধী লুকিয়ে ছিল যারা আমার ছেলেকে অপহরণ করেছে। আমার হাতে ক্ষমতা থাকলে আপনাদের প্রত্যেককে ফায়ারিং স্কোয়াডে নিয়ে যেতাম। কে দোষী আর কে নির্দোষ তা দিয়ে আই উড গিভ আ ড্যাম!’ এবার ফিরলেন আমার দিকে, ‘এবং, আপনিও নিজের বুদ্ধিতে শান দেবার খাতিরে মনীষাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে তার অবসাদ বাড়িয়ে তুলেছেন, তাকে শয্যাশায়ী করেছেন, তারপর লেপাপোঁছা মুখে এখানে বসে মাটনের হাড় চিবোচ্ছেন। ভাগাড়ে কারা মাংসের হাড় খোঁজে জানেন তো?’

কান ঝাঁ-ঝাঁ করে উঠল কারণ আমার হাতে তখন একটা মাটনের টুকরো রুটিতে জড়ানো। রুটি ফেলে বললাম, ‘আপনিও প্রথমদিন চেয়েছিলেন আমি যেন শুনি, তাই না?’ এডওয়ার্ড চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। ‘আপনাদের সবার সঙ্গে আমার দেখা হবে। আই উইল মিট ইউ অল!’ তারপর দরজা খুলে বেরিয়ে গেলেন।

কয়েক মুহূর্ত নীরবতার পর টমাস জেনিফারকে ক্রুদ্ধ গলায় বললেন, ‘সব আপনার জন্য। বয়েস তো অনেক হল! লোককে খুঁচিয়ে কী আনন্দ পান আপনি?’

জেনিফার ওয়াইনে চুমুক দিলেন। কাঁধ ঝাঁকিয়ে মুখে আনলেন বালিকার সারল্য, ‘সরি।’

টমাস অন্যদের অনুরোধ করলেন, আমরা ডিনার যেন শেষ করি। শুকনো হাসি দিয়ে একে অপরকে আমরা ঘাড় নাড়লাম। আলফ্রেড জিজ্ঞাসা করলেন, আমি ডলোরেসকে চিনলাম কীভাবে।

‘ওর দিদি অ্যাগনেসের গল্প শুনলাম। যে হারিয়ে গিয়েছিল। তার সম্পর্কে খোঁজ নিচ্ছিলাম একটা বিশেষ দরকারে।’

আলফ্রেড শুষ্ককণ্ঠে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কেন?

‘ধরে নিন, এডওয়ার্ড যা বলে গেলেন, বুদ্ধিতে শান দেবার খাতিরে।’ তিক্তকণ্ঠে উত্তর দিলাম। ‘আপনি অ্যাগনেসকে চিনতেন? ‘

‘স্কুলে আমার দুই ব্যাচ সিনিয়র ছিল।’

‘আমি দুঃখিত, আপনাদের অনেক খুঁচিয়েছি। এসব প্রশ্ন যে অবাঞ্ছিত, বোঝা উচিত ছিল আমার।’

আলফ্রেড উত্তর না-দিয়ে বিশাল চোখে আমাকে দেখলেন। সে-দৃষ্টিতে বিষণ্ণতা, নাকি, হতাশা, জানি না। জেনিফারকে কেউ যেন দেখতেই পাচ্ছে না এবং তিনিও নির্বিকার। সিগারেট খাবার অছিলায় আমি ও অবিনাশ বাইরে এলাম। বাগানের হিম অন্ধকারে কাঁপুনি ধরছিল। জ্বর না-এলে বাঁচি। চোখে পড়ল দালান থেকে পা ঝুলিয়ে অ্যারন একলা বসে। কখন সবার অজান্তে বেরিয়েছে জানি না। অবিনাশ চাপাগলায় বললেন, ‘এডওয়ার্ড ভুল বলেনি। আমাদের সবার হাতে রক্ত লেগে।’

‘আমি বিশ্বাস করি না। আপনারা কে কী করতে পারতেন?’

‘অন্তত মনে রাখতে পারতাম। তিরিশ বছর ধরে টাউন ছানবিন করতে পারতাম। ভুলতে দিতাম না মানুষকে।’ যেন ফুঁপিয়ে উঠলেন অবিনাশ, ‘কিছুই করিনি আমি। শুধু বাগানের ধারে দাঁড়িয়ে আড়াল থেকে দেখে গেছি—’, কী দেখেছেন জিজ্ঞাসা করায় মাথা নাড়লেন। ‘আমি একা কী করতে পারতাম? অন্যেরা এই কেস হিমঘরে পাঠিয়ে দিল। ভোলাতে বাধ্য করল।’

অ্যারন উঠে দাঁড়াল। ঘর থেকে আলো এসে তার মুখের একপাশে পড়েছে, অন্যদিক অন্ধকার। ‘কেউ ভোলেনি। ক্রিসকে মনে রেখেছে, আমার বাবা, মা, পিসি, আপনি, সবাই। ক্রিস একটা অসহ্য স্মৃতির ভার হয়ে আপনাদের ওপর চেপে বসেছে। সেই কারণে ওকে আপনারা খুঁজে পাবেন না, কারণ বন্ধ ঘরের ভেতর দাঁড়িয়ে চাবির সন্ধান করতে নেই।’

‘তুমিও কি মনে করো আসল অপরাধী এই চেনাজানাদের মধ্যেই ছিল?’ অবিনাশ সিগারেটে টান দিলেন। তাঁর পা টলছে। ভ্যাবলা মুখে বিড়বিড় করলেন আবার, ‘আমি যদি খুঁজে পেতাম, কুকুরের মতো গুলি করে মারতাম। অথবা, পিটিয়ে থেঁতলে দিতাম। নাকি,

কী যে করতাম—’ কথা হারিয়ে গেলে অসংলগ্ন হাত নাড়ালেন, যেন ম্যালফাংশন করা রোবট। ভেতরের ঘর থেকে বারবারার গুনগুনিয়ে কান্না ভেসে এল। আবার নেশা হয়ে গেছে।

চোখে পড়ল আলফ্রেড অন্ধকারে এসে দাঁড়িয়েছেন। নীরবে তাকিয়ে আছেন আমাদের দিকে। কিছুক্ষণ আমরা চুপচাপ সিগারেট খেলাম। দূর থেকে ভেসে আসা ভজন স্তিমিত হল। আমার কানে এল শীতার্ত কুকুরের কান্না। আলফ্রেড বললেন, ‘শুকনো ঘা খুঁচিয়ে দগদগে করলে বেদনা ছাড়া কী আসে, মিস ভট্টাচার্য? কেন করছেন এমন? ‘

হয়তো শেষ প্রশ্নটার দরকার ছিল ট্রিগার হিসেবে। আমি পৃথিবীতে আগুন বা তরবারি, কিছুই দিতে আসিনি। ‘শুনুন মিস্টার হেমব্রম, আমি নিজে থেকে শুনতে চাইনি। আমাকে গল্পটা শোনানো হয়েছিল। বারবারা তার আগের রাত্রে আমাকে ঘর থেকে টেনে নিয়ে এসে বলেছিল আমি যেন এই কেস সমাধান করি। এখন শুনে ফেলার পরে সত্যিই যখন আমি চাইলাম, তখন আমাকে জবাবদিহি করতে হচ্ছে কেন আমি খোঁড়াখুঁড়ি চালাচ্ছি। দু-দিন বাদে সবাই আমাকেই দোষ দেবে যে, নতুন করে অশান্তি টেনে এনেছি।’ আমার আর ভালো লাগছে না এসব, এমনকী সামান্য ভদ্রতা করতেও মন চাইছে না। সিগারেটে জোরে টান দিয়ে বাগানে ছুড়লে কয়েকটা ফুলকি অন্ধকার ঝোপের মধ্যে ছড়িয়ে গেল।

‘আমি চাই তুমি এর সমাধান করো।’ বললেন অবিনাশ।

‘আপনারা সবাই কী চান সেটাই আমাকে শুনে যেতে হচ্ছে। কিন্তু আমি কী চাইছি, সেটা? কেন? আমার কী সম্পর্ক এসবের সঙ্গে? কিছু এসে যায় না, আমি দু-দিন বাদেই চলে যাব।’

‘তাহলে আমার বাড়ি এসে কেন অতগুলো কথা বলেছিলে?’ অবিনাশের ক্রুদ্ধস্বর আমার পিঠে আছড়ে পড়লে অবহেলায় গা থেকে ঝরিয়ে দিলাম। ‘বলেছিলে, আমার এতগুলো বছর নাকি একটা শেষ চেষ্টা ডিজার্ভ করে। আমাকে তুমিই রাজি করিয়েছিলে। এখন এডওয়ার্ডের কথায় সব ছেড়ে দিচ্ছ। এটাই তোমার রেজলিউশন?” হঠাৎ রেগে চেঁচিয়ে উঠলেন অবিনাশ, মুখ থেকে থুতু ছিটকে এল, ‘ক্রিসের অপরাধীকে খুঁজে পেলে ওর পেট চিরে আমি নাড়িভুঁড়ি বার করে আনব, টিনা! তোমাকে খুঁজতে হবে, বুঝলে? খুঁজতে হবে তোমাকে।’

“ফাক ইট অল! এর কোনো সমাধান নেই আমি বুঝে গেছি। সবাই সব জানে এবং কেউ কিচ্ছু জানে না। কেউ অ্যাগনেসের কথা জানে না। ক্রিসের কথা জানে না। ক্রিসের বাড়িতে কেন অ্যাগনেসের ছবি, তা জানে না। জানলেও বলবে না। বরং, গুমরে মরবে। এখানে কেউ বুঝবে না যে, নিজের বুকের রক্তের ভেতর শুয়ে থাকা অপরাধ, আর আমি, এই আমি কি হা-হা শূন্যতাকে শেষমেষ মুঠোতে পুরব? পারব না।’ ঘরে ঢুকলাম, কারোর দিকে দৃকপাত না-করে ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে গেলাম। অভদ্রতা হলে হবে। টমাস কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু হাতের ইশারায় বারণ করলেন আলফ্রেড।

মেঠো রাস্তা ধরে হনহন করে হাঁটছিলাম। আগামীকাল কলকাতা চলে যাব কি না ভাবছিলাম আমি, কারণ এডওয়ার্ড যেটা অকথিত রাখলেন, সেটাই মারাত্মক। কথাগুলো বলার সময়ে তিনি আমার ও জেনিফারের দিকে পর্যায়ক্রমে দৃষ্টি ঘোরাচ্ছিলেন। ভাবছিলেন আমার সঙ্গে জেনিফারের তফাত নেই ।

হঠাৎ চোখে পড়ল, মহুয়ার জঙ্গল থেকে বেরিয়ে আসছে প্রথমদিনের দেখা সেই মেয়েটা। জিপসিদের রাজকন্যা। একইরকম সাদা ড্রেস পরা, মাথায় খড়কাঠির মুকুট। তার পেছনে আদারং বেড়াল হেলতে-দুলতে হাঁটছে। মেয়েটা পাত্তাই দিল না আমাদের। সামনে দিয়ে হেঁটে গেল দুই হাতে ড্রেসটা একটু উঁচুতে তুলে। কাদায় মাখামাখি পোশাক, হাঁটুর নীচ থেকে। অ্যারনকে বললাম আমি, এই মেয়েটাই হয়তো অ্যাগনেসের ভূত। অ্যারন হাসল, ‘আমাদের টাউনে অনেকেই অ্যাগনেসের ভূত হতে চায় কারণ এই গল্প লোককথা হয়ে গেছে।’ মেয়েটা বেড়াল নিয়ে রাস্তার দিকে চলে গেল। ‘অথবা এই মেয়েটাও বাস্তবে নেই, হতেই পারে। পিসি একটা জিনিস ঠিক বলেছে। এখানে অনেক ফিসফিসানি তুমি শুনবে। দেওয়ালের ফোকর থেকে। চিমনির মুখ থেকে। স্যাংচুয়ারির সামনের কাঁঠাল গাছ থেকে যে ঝোলানো পুতুল দুটো দেখেছ তারাও অস্ফুটে কথা বলে।’

‘কে মেয়েটা? মাঝে মাঝেই দেখি।’

‘চিনি না। আমি রাঁচি থেকে কম আসি, জানাশোনা কমে গেছে। তবে, অ্যাগনেসের ব্যাপারে ছোটো থেকে শুনে আসছি। সরস্বতী ওরাওঁ বলে একজনকে চিনতাম। সে ওকে দেখেছে রাত্রিবেলা ডাফরিনপাড়ার কবরখানায় ঘুরতে। ঝাঁ-ঝাঁ রোদের দুপুর বেলা বেথেল মিশনের পেছনের লাগোয়া জঙ্গলে বসে চুল আঁচড়াতে দেখেছে স্টিফেন চৌবে। মা-ও দেখেছে। এখানে এক বাঙালিবাবুর বড়ো ডিপার্টমেন্টাল স্টোর ছিল। আমরা বলতাম ঘোষবাবুর মুদিখানা। ২০১০ সালে উঠে গেছে। সেখানে একদিন সন্ধেবেলা একা ঘোষবাবু বসে ঢুলছেন। তখন কিটি গোমসের মেয়ে, ওই স্টেশনের বাইরে যার চায়ের দোকান, সে ঢুকেছিল। হরলিক্সের শিশি তুলতে গিয়ে দেখে দুরের আইলে একটা ছায়া সরে গেল। অত খেয়াল করেনি, আনমনে আইলের শেষপ্রান্তে গিয়ে দেখে, অ্যাগনেস হেঁটে যাচ্ছে। পেছন থেকে দেখেছিল, কিন্তু ওই চেহারা আর লাল চুল— কিটির মেয়ে ভয়ে চেঁচিয়ে ওঠায় দ্রুতপদে ব্যাকইয়ার্ডের দরজা খুলে অ্যাগনেস বেরিয়ে যায়। জ্যোৎস্না ওঠা গ্রীষ্মের সন্ধেবেলা খুব হাওয়া দিলে মানুষের চোখে পড়েছে তিতিরকান্নার মাঠে সাদা গাউন পরে কাপাস গাছের নীচে বসে আছে অ্যাগনেস। চুল আঁচড়াচ্ছে বসে বসে, কানে গোঁজা শ্বেতপলাশ। দূর থেকে দেখেছে তারা, কাছে যাবার সাহস করেনি। সবথেকে বেশিবার তো ওকে দেখা গেছে জোহার হালে-তে। লোকে বলে ওখানে রাত হলে অতৃপ্ত আত্মারা ঘুরে বেড়ায়।’

‘এটাও তোমার প্রশ্নের লিস্টে ঢুকবে। অ্যাগনেসকে কেন মানুষ দেখে? ‘

‘কেন দেখে? কী মনে হয় আপনার?’ অক্ষয় আমাকে থামালেন।

‘দেখে, কারণ দেখতে চায়। অ্যারন প্রথমদিন যা বলেছিল, মানুষ তার রহস্যকে ভালোবাসে।’

‘অথবা, যদি সত্যিই অ্যাগনেস এখনও থাকে।

‘অ্যাগনেসকে নিয়ে জানতে চাইছেন কেন? সে তো ক্লোজড চ্যাপ্টার।’

‘আপনি তাই মনে করেন?’

‘আপনারা ক্রিসের প্রসঙ্গ জানতে চান, তার একটা কারণ অনুমান করছি যেহেতু ক্রিস এডওয়ার্ড-মনীষার সস্তান ছিল। কিন্তু, অ্যাগনেসের সঙ্গে তো কোনো যোগসূত্রই নেই বলে আমাকে বোঝানো হল তখন। আর আমিও মেনে নিয়ে চুপচাপ চলে এলাম। ক্রিসের ব্যাপারে যা ভুল করেছি সেগুলো শুনতে চাইলেও একটা কারণ বুঝি। কিন্তু, অ্যাগনেস কেন?”

অক্ষয় মাথা নাড়লেন, ‘আপনি ভুল করেননি।

“মানে?’

‘আমাদের কেসের সঙ্গে অ্যাগনেস জড়িয়ে।’

কতক্ষণ ফ্যালফ্যাল করে অক্ষয়ের দিকে তাকিয়ে ছিলাম জানি না। সিগারেটের গরম ছাই টুপ করে পায়ের পাতায় পড়লে চমকে সোজা হলাম।

চিন্তার ঘোর কাটল একসময়ে, কারণ বুঝছিলাম রাস্তার অন্য ধার দিয়ে কেউ হাঁটছে। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলাম, রকি চাপাস্বরে ডেকে উঠল আমার দিকে মুখ ফিরিয়ে। তার লেজ নড়ছে দ্রুত। পেছনে লিস হাতে রকির বাবা।

‘কেমন আছেন?’

সামান্য হেসে পা চালালাম দ্রুত। কিন্তু, ভবি ভোলবার নয়। পেছন থেকে ডাক দিলেন, ‘আপনি তো আসবেন বলেছিলেন আমার কটেজে। এলেন না কিন্তু।’

ঘুরে দাঁড়িয়ে কঠিন কিছু বলতে গেলাম, কারণ ততক্ষণে বিরক্তির চরমসীমায় গেছি। কিন্তু রকিকে দেখি, রাস্তায় উপুড় হয়ে শুয়ে দুই পা সামনে বাড়িয়েছে। চোখে করুণ দৃষ্টি। কুকুররা যে কী সাংঘাতিক ম্যানিপুলেটিভ হয়! রকির বাবা বললেন, ‘ও আপনাকে জিজ্ঞাসা করছে, রেগে আছেন কেন।’

হেসে ফেললাম না-চাইতেও। ‘কী দেখে মনে হল আপনার?”

‘আমার না, রকির মনে হয়েছে। ও অনুভূতির গন্ধ পায়।’

‘আজ মাথাটা ধরে আছে। পরে একদিন কথা বলি?”

‘হ্যাঁ, নিশ্চয়। তবে মাথা ধরলে তার অভ্রান্ত ওষুধ আছে আমার কাছে। একপ্রকার ক্বাথ বাসক পাতা, যষ্টিমধু, বাদামি চিনির দানা, তেজপাতা—’

ভদ্রলোকের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। ‘আপনি চাইছেনটা কী বলুন তো? সেদিন থেকে আমার পেছনে পড়েছেন। কটেজে নিয়ে যেতে চাইছেন বার বার, কেন? নাকি, একলা মেয়েকে দেখে ইন্টারেস্টিং মনে হচ্ছে?’ বলার পর কিন্তু খারাপ লাগল। রকির বাবার ভেতর সেরকম ইঙ্গিত পাইনি। এতদিন মানুষ চরিয়ে খেয়ে এগুলোর ভাইব আমার চেনা।

‘আমি খুবই দুঃখিত,’ রকির বাবা উত্তর দিলেন। ‘হয়তো সত্যিই আপনাকে বিরক্ত করা হচ্ছে, কিন্তু কোনো উদ্দেশ্য ছিল না। রকি আপনাকে পছন্দ করেছে খুব। তাই আমি একটু বাড়াবাড়ি করে ফেলেছি।’

কী মনে হল জানি না। হয়তো মাথা ঘেঁটে আছে বলে, অথবা, রকির বাবার গলায় কিছু ছিল, আমি বলে ফেললাম, ‘চলুন, আপনার কটেজে। মাথা ধরার কী আছে বলছিলেন—’ আশা করেননি এত সহজে রাজি হব। অনাবিল হাসিতে তাঁর মুখ ভরে গেল। আমরা হেঁটে চললাম জঙ্গলের ভেতর দিয়ে। রকি এত খুশি যে ছুটতে ছুটতে লিস ছাড়িয়ে নেয় আর কি! কয়েক বার ধমক দিয়ে ফল হল না ।

অনুমান করলাম জায়গাটা টাউনের শেষপ্রান্তে। চারপাশে জঙ্গল ঘেরা ছোট্ট একতলা বাড়ি। সামনে কাঠের বারান্দা। বাড়ির মাথায় ঝোঁকে এসেছে, অন্ধকারে বুঝলাম না কী গাছ। ভেতরে পা দিয়ে দেখলাম, অনাড়ম্বর ড্রয়িং রুম। দুটো সোফা, একটা কাঠের টেবিল। লাগোয়া ওপেন কিচেনে অল্প আঁচে একটা কড়াই বসানো। সেদ্ধ মাংসের গন্ধ বেরোচ্ছে। রকির জন্য নাকি ভেষজ মেশানো মাংস ঘণ্টাখানেক ধরে মৃদু আঁচে রান্না হয়। ও ভাত দিয়ে দু-বেলা খায়। আর সন্ধেবেলা ছানা। আমার পায়ের কাছে রকি বসল। ভেজা নাকে ঘষে দিল পায়ের পাতা। তারপর পায়ের ওপর মুখ রেখে চোখ বুজল। রকির বাবা জানালেন ওষুধটা বানাতে সময় লাগবে। তার মধ্যে চা, কফি কিছু নেব কি না। ইতস্তত করছিলাম কারণ সত্যিই তো মাথা ধরেনি। কড়া কিছু খেলে বরং ভালো হয়। মুখ দেখে যে কীভাবে বুঝলেন! কিচেনের শেলফ থেকে হোয়াইট ওয়াইনের একটা বোতল বার করে আনলেন রকির বাবা। ‘এটাই আছে। যদি ইচ্ছে হয়।’

ঠোঁটের কাছে গ্লাস এনে বললাম, ‘কেন চান, একটা কেস সমাধান করি? অন্যরা কিন্তু চায় না।’

‘যারা চায় না, তাদের হয়তো উদ্দেশ্য আছে।’

‘আর আপনার?’

আমার মুখোমুখি আরাম করে বসে একটা সিগারেট ধরালেন। এই ব্র্যান্ড আমি চিনি না। সম্ভবত ঝাড়খণ্ডের স্থানীয় সিগারেট। বেশ কড়া ধোঁয়া। ‘আমি এখানে নতুন। কেউ আমাকে চেনে না। আমিও কাউকে না। ফলত, আমার উদ্দেশ্য থাকার কিছু নেই।

.

‘কিন্তু, আপনি অ্যাগনেসকে চিনতেন। তাকে মেডুসা নামে ডেকেছিলেন কেন?’

রকির বাবা হাসলে ভারী চশমার কাচের ওপারে তাঁর চোখ দুটো আবার ঝিকমিকিয়ে উঠল। ‘আপনি সন্ধান করেছিলেন?’

‘করেছিলাম, তবে আপনার কথায় নয়। অন্য একটা ঘটনার সঙ্গে যোগসূত্র অনুমান করে। কিন্তু, এখন হাত ঝেড়ে ফেলছি। আজকের পর থেকে এসবে আমি নেই।’

‘আর হয় না, মিস ভট্টাচার্য। যতক্ষণ আপনি এটার ভেতর ঢোকেননি, সে একরকম ঠিক ছিল। কিন্তু, একবার যখন ঢুকে পড়েছেন, আর বেরোনো সম্ভব নয়।’ সোফায় হেলান দিলেন রকির বাবা, অন্ধকার জানালায় চোখ রেখে বললেন, ‘আমি বাজি ফেলতে পারি, আপনিও এই রহস্য সমাধান করতে চান।’

‘আপনি বাজি ফেলার কে? আমি আপনার হাতের তাস হতে যাব কেন, আমার নিজের এজেন্সি নেই? আপনি আসলে কে আমাকে বলবেন? এরকম জোরাজুরিই-বা করছেন কেন?’ ‘আমি খুব চাইতাম কেউ একজন অ্যাগনেসকে নিয়ে মাথা ঘামাক। সবাই ভুলেই গেছে তাকে।’

‘আপনি কীভাবে চেনেন তাকে? এই তো বললেন এখানে আপনি নতুন।’ অল্প ওয়াইনেই আমার নেশা হয়েছে। ঝিম লাগছে মাথার ভেতর। সোফায় পা গুটিয়ে বসলাম। রকি মৃদু প্রতিবাদ করে লাফিয়ে উঠে এল সোফায়। আমার কোল ঘেঁষে আবার চোখ বুজল। রকির বাবা ঝুঁকে পড়লে তাঁর জ্বলজ্বলে চোখ দেখে সম্মোহনের মতো লাগল আমার,

‘কেন ব্রাউনদের বাড়িতে অ্যাগনেসের ছবি, আপনার অদ্ভুত মনে হল না?’

‘বাদ দিন এসব। আমার ভালো লাগছে না। ওরা নিজেরাই চাইছে না যেখানে— যার বিয়ে তার হুঁশ নেই, পাড়াপড়শির ঘুম নেই।’ বিরক্তিতে একচুমুকে ওয়াইন শেষ করে গ্লাস বাড়ালাম। রকির বাবা বিনা বাক্যব্যয়ে ওয়াইন ঢেলে দিচ্ছেন যখন, আমার মনে হল এঁকে বলা যায়। ‘আপনি জানেন, কেন অ্যাগনেস আমাকে আকর্ষণ করেছিল? ব্রাউনদেরই অন্য একটা ঘটনা নিয়ে।’ আমি ক্রিসের গল্প করে গেলাম তারপর। বুঝছিলাম জেঁকে ঘুম আসছে। রকি আরও কোল ঘেঁষে এসেছে আমার ।

‘এত বড়ো রহস্য আপনি ছেড়ে দেবেন, তনয়া?’ এই প্রথম নাম ধরে ডাকল আমাকে লোকটা। কিন্তু, ওর নাম কী?

‘কী করব বলুন, আমি এদের সবার মাথাব্যথার কারণ হয়েছি। মনীষাকে ডিপ্রেশনে পাঠিয়েছি—’ ছাড়া ছাড়া স্বরে উত্তর দিলাম ।

না।’ ‘অন্যদের কী হবে তা ভাবলে দার্জিলিং-এর ঘটনার সমাধান আপনি করতে পারতেন

‘দার্জিলিং?’ স্মৃতির অতলে তলিয়ে যাওয়া নাম ভাসিয়ে তুলতে সময় নিলাম। “ওহ্, হ্যাঁ। সে হয়ে গেছে কবে! ওই ভূত কাঁধে চেপে আমি ঘুরি না।

‘আর অ্যাগনেসের ভূত? সে কি আপনার মনোযোগ পাবার যোগ্য নয়? একবারও ভাববেন না, একটা ষোলো-সতেরো বছরের মেয়ের কী ঘটেছিল?’ ‘সে পালিয়ে গেছে। যাক।’

আমার যেটুকু এর পরে মনে ছিল, মুখের কাছে মুখ নিয়ে এসে জ্বলজ্বলে চোখে রকির

বাবা বলছেন, ‘পালায়নি। অ্যাগনেস খুন হয়েছিল। আপনাকে খুঁজে বার করতে হবে, তনয়া।’ সোফার উষ্ণ ঘুম আমাকে পেয়ে বসল। এর বেশি মনে নেই। চোখ মেললাম যখন, আমার গায়ে কম্বল ফেলা। তখন ভোরের আলো ফুটেছে। রকি বা তার বাবা, কেউ নেই । ফাঁকা ঘরে টেবিলের ওপর একটা ফ্লাস্ক রাখা। খুলে দেখি, গরম কফি। পাশে কাপ। আমি কয়েক বার রকির নাম ধরে ডাকলাম। সাড়া পেলাম না। বাইরে শুনশান। দলা দলা কুয়াশায় অন্ধকারের অবশেষ বনাঞ্চলে। উত্তুরে হাওয়া এসে আমার পায়ে মাথা কুটছিল। এখানে একা আমি কী করছি, গতকাল স্বপ্ন দেখেছি কি না, বুঝিনি। তার পরেও অনেকবার এই রাত নিয়ে ভেবেছি, আবার দেখা হলে রকির বাবাকে প্রশ্ন করেছি শেষমেষ কী ঘটেছিল। তিনি হেসে জানিয়েছেন যে, আমি কথা বলতে বলতেই ঘুমিয়ে পড়ি। তিনি নাকি রকিকে হাঁটাতে গিয়েছিলেন। ফিরে এসে দেখেন, আমি চলে গেছি।

‘আশ্চর্য, কে ছিল লোকটা?’ বিড়বিড় করলেন অক্ষয়।

‘তার পর থেকে আমিও আর পরিচয় জানতে চাইনি। রকির বাবা হিসেবে চিনেছিলাম, সেটাই কমফর্টেবল লাগত। মনে হত, এটুকু অপরিচয় বেশ রোমাঞ্চের আবহ আনছে। তার পরেও আমি তাকে তদন্তের ব্যাপারে বলতাম। সে চুপচাপ শুনত। হয়তো টুকরোটাকরা মন্তব্য করত। তেমন বিশাল কিছু না কিন্তু, আমার বলতে পারলে স্বস্তি লাগত। যেন অচেনা একজন, বা, একটা দেওয়ালকে বলছি।’

‘পরদিন আপনার মনে হল নিজের তদন্ত থেকে সরে যাবেন না?’

‘মনে হল। রকির বাবা সম্ভবত কিছু বলেছিল যা আমার মত পরিবর্তন করায়। অথবা হয়তো, অ্যাগনেস খুন হয়েছিল যে, সেই কথাটা। পরদিন বাড়ি ফেরার সময়ে ওটাই মনে হয়েছিল— কই, দার্জিলিং-এর সময়েও তো সাহায্য করেনি কেউ। তাতে তো পিছিয়ে আসিনি !”

‘কিন্তু লোকটার কথা অন্যদের জানাননি তখনও?’

‘পরে জানিয়েছিলাম। বারবারা প্রথমে অবাক হয়েছিল, কারণ লোকটাকে তারা কেউ চিনত না। পরে তুচ্ছ ব্যাপার হিসেবে উড়িয়ে দেয়। অবিনাশও।

.

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *