নৈশ অপেরা – ৮

আর তাহাদের সহিত বিবাহসম্বন্ধ করিবে না ; তুমি তাহার পুত্রকে আপনার কন্যা দিবে না, ও আপন পুত্রের জন্য তাহার কন্যা গ্রহণ করিবে না।

– Deuteronomy। 7 : 3

.

গলার আওয়াজে এডওয়ার্ড পেছন ফিরল। উবু হয়ে বসে আছে ঝাঁটিফুলের মাঠে। এদিকে আমরা ওকে খুঁজে খুঁজে সারা।

-কী করছিস তুই এখানে, বাড়ি চল, মা আজ তোর পিঠে ছাতা ভাঙবে। কিন্তু এডওয়ার্ড হাতছানি দিয়ে ডাকল।

—এই দেখ, এর নাম রেখেছি জোজো। দেখ কেমন কুটকুট করে বাদাম খাচ্ছে। —একে নিয়ে বাড়ি ঢুকবি?

—লুকিয়ে রাখব, জুতোর বাক্সে। লেজটা দেখেছিস? এটা দিয়ে কানে সুড়সুড়ি দিলে কেমন আরাম বল?

আমিও বসলাম ওর পাশে।

—বাড়িতে যদি ওর খিদে পায়? বাবা কিন্তু দেখে ফেলবে।

-ওরা ফল খায় তো, আর বাদাম। অনেক খাইয়ে পেট ভরিয়ে তারপর নিয়ে যাব। -আর জল? সেটা খাওয়াবি কী করে? আচ্ছা তুই পোষ মানালি কী করে? ওরা তো পালিয়ে যায়।

—এখানে কয়েক দিন আমার কাছ থেকে খাবার নিয়ে পালাচ্ছিল। গতকাল থেকে সামনে বসে খাচ্ছে। ওর খুব দুঃখ রে বার্বি, সবাই ওকে ছেড়ে চলে গেছে।

আমার চোখে পড়ল এডওয়ার্ডের কবজির ফোসকার চামড়া উঠে গেছে। রস গড়াচ্ছে। —ইস! সেপটিক হয়ে যাবে কিন্তু। বাড়ি চল, ওষুধ লাগিয়ে ব্যান্ডেজ করে দেব। এডওয়ার্ড উত্তর দিল না। বাবা পরশু রাত্রে ওর কবজিতে আবার জ্বলন্ত সিগারেট—এডওয়ার্ড বাবার এয়ারগান ভেঙে দিয়েছিল। মা কাঁদছিল। সেদিকে তাকিয়ে বাবা বিড়বিড় করল, দ্যাট হোর অ্যান্ড হার বাস্টার্ড। কিন্তু, এডওয়ার্ডের মুখে ব্যথার চিহ্ন দেখলাম না। মন দিয়ে জোজোর সামনে একটার পর একটা বাদাম রাখছে।

বেথেল মিশন চার্চ জোহার হালে-তে। তার পেছন থেকে জঙ্গল শুরু হয়ে টিলার ওপর উঠে গেছে। সেন্ট জন্স-এর তুলনায় আকারে ছোটো, মূলত আদিবাসীরাই এখানে আসত। এখন ভেঙে পড়েছে কারণ রক্ষণাবেক্ষণের অভাব। সুসময়ে এখানে মেলা হত প্রতি বছর খ্রিস্ট উৎসবে। আদিবাসী নাচগান, সার্কাস, নাগরদোলা, নিজেদের আচার ও পাঁপড় বানিয়ে বিক্রি করা হত, প্রোটেস্টান্ট ক্যাথলিক হিন্দু মুসলিম নির্বিশেষে যোগ দিত মেলায়। আজকাল জঙ্গল ঢেকেছে চার্চের একাংশ। একটা কোয়ার্টারের ছাদ ধসে পড়েছে। বাইরের পাঁচিল ফাটিয়ে তরুণ কাঁঠালগাছের মোটা গুঁড়ি এঁকেবেঁকে আকাশে উঠতে চায়। শুকনো পাতা খসে উঠোনে গালিচা, তার ওপর নির্ভয়ে ঘুরে বেড়ায় বিষাক্ত সাপ। টাউনের যাবতীয় ভূতেদের আড্ডাস্থল, তাদের বুকে নিয়ে জেগে আছে চার্চ ও তার সেবায়েত। দুটো কোয়ার্টার এখনও অক্ষত, তার একটায় রেভারেন্ড থাকেন। অন্য আরেকজন মিনিস্টার আছেন, স্টিফেন মান্ডি। তিনি মূল ভবনের দেখাশোনা করেন। মাঝে মাঝে মাস হয়, যদিও লোক আসে হাতেগোনা রেভারেন্ড গরম্যান কোয়ার্টারে বসে ড্যাবড্যাব করে চেয়ে থাকেন। অথচ, বেথেল মিশন তাঁর প্রাণ ছিল। নিজের হাতে একটা করে ইট গেঁথে তৈরি করেছেন। আগে লক্ষ করিনি, বা, করলেও অর্থ বুঝিনি, আজ তনয়া দেখাল, অলটারের দুই পাশের দেওয়ালে বাহারি ক্যালিগ্রাফিতে লেখা ‘সোলা স্ক্রিপচুরা’, ‘সোলা গ্রাসিয়া’, ‘সোলা ফাইদ’, ‘সোলা ক্রিস্তাস’ আর ‘সলি দিও গ্লোরিয়া’। বটের চারা উঁকি দিচ্ছে দেওয়াল ফুঁড়ে। সিলিং-এ প্রাগৈতিহাসিক ঝুল জমে রাক্ষসের মুখের আকৃতি নিয়েছে। ‘এখানে লর্ডস সাপার হত দেখার মতো। ওই যে অলটার দেখছ, ওর পেছনের দেওয়াল, ওগুলো সব পরে বানানো। আগে অলটারের পেছনের সিঁড়ি বেয়ে বেসমেন্টে নামা যেত, যাবতীয় কাজের জিনিস থাকত সেখানে। আমি আর এডওয়ার্ড ছোটোবেলায় সেখানে বসে ক্রিসমাস উপলক্ষে চার্চ সাজাবার জন্য বাহারি কাগজের শিকলি বানিয়েছি কত! তারপর দেওয়াল বসে গেল এক ঝড়বৃষ্টির রাতে। তার মাটি নাকি ফোপরা হয়ে গিয়েছিল। সে-দেওয়াল ফেলে আবার নতুন করে সব বানানো হল । বাবা অনেক সাহায্য করেছিল তখন।’ ডায়াসের ওপর রাজ্যের জঞ্জাল স্তূপীকৃত। ভাঙা টেবিল চেয়ার, তাদের ভেতর দিয়ে মাতা মেরির মুখ টুকি মারছে। ডায়াসে রেভারেন্ড মান্ডি টুকটাক কাজ করছিলেন। এবার মুখ তুলে হাসলেন, ‘রেভারেন্ড গরম্যানের কাছে এসেছেন তো?’ বেঁটেখাটো বলিষ্ঠ চেহারার মধ্য-চল্লিশের হাসিখুশি মানুষটাকে আমার ভালো লাগে। কথায় কথায় রেভারেন্ড গরম্যানের মস্তিষ্কবিকৃতির আখ্যান শোনালেন। রাত্রে কোয়ার্টারে থাকতে চান না। বেসমেন্টে শুতে চলে যান। অনেকবার আটকানোর চেষ্টা করে লাভ হয়নি। বেসমেন্টে সাপখোপ থাকতে পারে, লতাপাতায় ঢাকা স্যাঁৎসেঁতে মেঝে, কিন্তু রেভারেন্ড কোনো কথাই শুনতে চান না। নিজের মনে বেরিয়ে যান এখানে-ওখানে, উদ্দেশ্যহীন হাঁটেন, চেনাশোনা লোক দেখতে পেলে টেনে নিয়ে আসেন।

অথচ, এডওয়ার্ড যা ভেবেছিল, হল না। কিছুতেই ধরা গেল না জোজোকে এডওয়ার্ড ভেবেছিল পকেটে রাখবে আর লেজটা বেরিয়ে থাকবে বাইরে। কিন্তু, জোজো বাদাম খেয়ে মুখ মুছে দৌড়।

রেভারেন্ডের ঘরে গিয়ে দেখলাম, অ্যারন সেখানে বসে। রেভারেন্ডের সামনে মাথা নীচু করে একটা মোড়ায়। রেভারেন্ড তার মাথায় হাত রেখে বিড়বিড় করে কিছু বলছেন। আমাদের দেখে অ্যারন জানালার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। তনয়া অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিল রেভারেন্ডের দিকে। আমাকে ফিসফিস করে জানাল, তাঁকে একদিন জঙ্গলের ভেতর দিয়ে হেঁটে যেতে দেখেছে।

ছোট্ট ঘরে ঠাসা বইপত্র, হলুদ কাগজের ভিড়। মেঝে থেকে জল উঠে আসছে। জানালার মুখ ঝোপে বোঝাই ছিল। টুকরো আকাশ ছাইরঙা। হলুদ ল্যাম্পের আলো ঘিরে পোকাদের ভিড় জমেছিল। রেভারেন্ডের মুখ আলো-অন্ধকারের কাটাকুটিতে লাগছিল প্রাচীন মমির মতো। তাঁর হাত কাঁপছিল সারাক্ষণ। তনয়া তাঁকে বাংলায় জিজ্ঞাসা করল কলকাতার বাড়ির কথা।

‘চাঁদনি। আছে এখনও।’

‘এখনও আছে?’

‘এখনও আছে। ওখান থেকে কলেজ যাই।’

‘আচ্ছা। আপনার বন্ধুরা তাহলে আছে ওখানে?’

‘বন্ধুরা আছে। মেল স্যামুয়েলস আছে। প্যাট্রিক ঘোষ আছে। ওদের মিউজিক ব্যান্ড আছে। ১৯৭৮ সালের প্রোগ্রাম আছে।’

কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে তনয়া বলল, ‘মেল মারা গেছে। প্যাট্রিক ঘোষও। তবে, ওদের একটা ব্যান্ড তৈরি হয়েছিল শেষের দিকে, সেটা এখন মেল-এর ছেলে সল চালায়। মেল স্যামুয়েল ব্লুজ ব্যান্ড।’

চোখ বুজলেন রেভারেন্ড। কী মনে হল, জিজ্ঞাসা করলাম, ‘আপনার বয়েস কত হল?’ ‘একুশ বছর চার মাস সতেরো দিন।’ একটা ক্লান্ত উত্তুরে হাওয়া জানালার ফাঁক দিয়ে ঢুকে পুরোনো কাগজপত্রের ওপর ফরফর করছিল। ‘কেননা ঈশ্বরের বাক্য জীবন্ত ও কার্যসাধক এবং সমস্ত দ্বিধার খড়্গ অপেক্ষা তীক্ষ্ণ এবং প্রাণ ও আত্মা, গ্রন্থি ও মজ্জা, এই সকলের বিভেদ পর্যন্ত মর্মভেদী এবং হৃদয়ের চিন্তা ও বিবেচনার সূক্ষ্ম বিচারক।’ আবার বললেন রেভারেন্ড। তনয়া আমার দিকে ফিরে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপর আসার উদ্দেশ্য জানাল রেভারেন্ডকে।

স্কুলে গিয়ে কিন্তু ভাব হয়ে গেল। আমি হিল্ডাকে বলিনি, কী হয়েছিল। আমার মনে ছিল না শেষের কথা, আমি কি অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলাম? জ্বর এসেছিল রাত্রিবেলা, তিনদিন পর কমেছে। অথবা, আমি হয়তো চিৎকার করেছিলাম, তখন গুদামঘরের দরজা খুলেছিল ওরা? কিন্তু, হিল্ডাকে বললে ও ভয় পাবে। ও ভীতু, কথায় কথায় কাঁদে। তবে, আমি ওকে বলেছি আর ওরকম করব না। হিল্ডা কথা দিল, নিয়ে যাবে আবার। ফিক করে হাসল তারপর, ওর গালে কোনো দাগ নেই।

‘ক্রিস নেই। কলকাতায় ক্রিস নেই।’ তনয়া তাঁকে মনে করাল তিনি এখন বেথেল মিশনে। রেভারেন্ড চোখ খুলে তাঁর অলটারের কথা জিজ্ঞাসা করলেন।

‘অলটার ভেঙে পড়েছে।’ জানালার ধার থেকে অ্যারন উত্তর দিল। তনয়া তীব্রচোখে তাকাল তার দিকে।

‘আর মুরগিগুলো?’

‘পালিয়ে গেছে।’

‘দুটো গোরু ছিল।’

‘মরে কঙ্কাল হয়ে গেছে।’ অ্যারনের মুখে বিকার ছিল না। আমার ইচ্ছে করছিল গিয়ে ওর গলা চেপে ধরি, চুপ কর হারামজাদা! কিন্তু রেভারেন্ড শূন্যচোখে তাকিয়ে ছিলেন।

‘ক্রিস নিখোঁজ হবার দিনে, তার পরেও, আপনি বলেছিলেন আপনার পাপে তিনটে জীবন নষ্ট হল। পাপ কেন? আপনি তো ঘুমিয়ে পড়েছিলেন মাত্র।’ উত্তর আসবে না জেনেও জিজ্ঞাসা করল তনয়া। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে আবার বলল, ‘সবে তো পুলিশ এসেছে তখন। তদন্তের আগেই আপনি ধরে নিলেন ওর সন্ধান পাওয়া যাবে না?’ রেভারেন্ড আমার দিকে ফিরলেন এবং দেখলাম তাঁর ঘোলাটে চোখ চকচক করছে।

‘আমার পাপ ছিল। আমি জানি। ছিল।’ স্পষ্ট গলায় এবার বললেন রেভারেন্ড, তনয়া আগ্রহভরে তাঁর দিকে ঝুঁকল। কী সেই পাপ? শুধুমাত্র ঘুমিয়ে পড়া?

‘সেজন্যই কি তুমি তিনজনের কথা বলেছিলে? বাবা, মা আর ক্রিস?’ অ্যারন প্রশ্ন করল, কিন্তু, তার ভুরুতে চিন্তার ভাঁজ, যেন বিশ্বাস করছে না। রেভারেন্ড উত্তর না-দিয়ে হাত বাড়ালে অ্যারন সে-হাত নিল নিজের মুঠোয়। তারপর উবু হয়ে রেভারেন্ডের সামনে বসে বলল, ‘তুমি যা বলছ সেটাই ঠিক, ডোডো। প্রত্যেককে নিজের ক্রুশকাঠ নিজেকে বইতে হয়। তুমি ঘুমিয়ে পড়েছিলে, সেটা তোমার পাপ ছিল। সেটার দায় তোমাকেই বইতে হবে।’

হিল্ডাকে জোজোর গল্প করায় হেসে লুটিয়ে পড়ল—তোর ভাইটা এগারো পুরল না? এখনও একদম বাচ্চা কিন্তু। ওরা পোষ মানে কখনো? উলটে কামড়ে দিলে কিন্তু চোদ্দোটা ইঞ্জেকশন।

—জোজো মনে হয় বুঝেছে ওকে ধরবে, তাই আর আসে না। এডওয়ার্ড পকেটে বাদাম নিয়ে বসে থাকে মাঠে, জানিস! তোর কাকা তো ভেট ডাক্তার। একটা ওরকম কাঠবেড়ালি এনে দিতে বল না! এডওয়ার্ডকে বলব জোজোকে ধরে এনেছি। পরশু ওর জন্মদিন।

রেভারেন্ড অবিশ্বাসের চোখে ‘কী’ বলে আর কিছু বলতে পারলেন না। অ্যারনের কাঁধে ধাক্কা দিয়ে আমি ফিসফিস করলাম। বললাম, ওর লজ্জা লাগা উচিত। অ্যারন আমার দিকে না-তাকিয়ে জানালার ধারে গিয়ে দাঁড়াল আবার।

তনয়াকে দেখে মনে হচ্ছিল অ্যারনের মতো জন্তু সে আগে দেখেনি। তারপর কাঁধ ঝাঁকাল। গুড ওয়ার্কস সংক্রান্ত প্রশ্ন করল রেভারেন্ডকে। রেভারেন্ড অসহায় চোখে তাকালেন। তাঁর স্মৃতি আবার মুছে গেছে। তনয়াকে আমি কিছুটা ইতিহাস বললাম। এডওয়ার্ড আর মনীষা ছোটোবেলা থেকে একে অপরকে চিনত। বাবা এডওয়ার্ডকে পাঠাত বেথেল মিশনের কাজ করতে। অলটারে টুকিটাকি করত, প্রতি রবিবার যে ভ্রাম্যমাণ চিকিৎসাকেন্দ্র তৈরি করা হয়েছিল সেখানে সার্ভিস দিত। মনীষাও সেখানে কাজ করত পড়াশোনার ফাঁকে। সেই থেকে তাদের পরিচয়। বেথেল মিশন মূলনিবাসীদের মধ্যে কাজ করে। এখানে অ্যাংলো পরিবার আসতে চায় না। কিন্তু, বাবা ছিল রেভারেন্ডের বন্ধু, তাই আমরা আসতাম এখানে। বাবা বলেছিল, বিয়ের যৌতুক হিসেবে বেথেল মিশনের সংস্কার করবে। কথা রেখেছিল। বাবা সাহায্য না-করলে তখন মিশনের কাজ বন্ধ করে দিতে হত। এডওয়ার্ডের বিয়ের বছর দুই আগে বড়ো মেরামতির কাজ করতে হয়েছিল। মূল ভবনকে নতুন করে বানাতে হয়েছিল। দেওয়ালে নোনা ধরে খেয়ে নিচ্ছিল বলে সেগুলো ফেলে মাটির গভীর পর্যন্ত চেঁছে তুলে ফেলা হয়েছিল একটা বড়ো চত্বর। নতুন সিমেন্ট ঢেলে তার ওপর অবশেষে নতুন দেওয়াল তোলা, এসবে প্রচুর টাকা চলে গিয়েছিল। এটুকুই মনে আছে। কিন্তু, শেষমেষ কিছু থাকল না। চার্চ আবার ভেঙে পড়েছে, এবার বাঁচাবার কেউ নেই।

‘ডেভিড। গ্রেট ম্যান। ভাঙা হৃদয়।’ রেভারেন্ডের গলা কফবসা, কাঁপা হাতে বুকে ক্রস আঁকলেন।

তারপর বিকেল বেলা, হলুদ রঙের আলো। জলাভূমি আর ঘাসবনকে অলৌকিক লাগছিল। দিগন্তের কাছে দাঁড়ানো ভাঙা অ্যাম্বাসাডরকে খেলনা গাড়ি মনে হয় এমন আলোতে। অনেকটা সময় চুপ ছিলাম বলে গলাখাঁকারি দিল অক্ষয়। আমরা মাঠের সামনে বসে ছিলাম। আমি বাবার কথা ভাবছিলাম। রেভারেন্ড বাবাকে গ্রেট ম্যান বলেছিলেন, কিন্তু আমি চোখ বুজলে বাবার মুষ্টিবদ্ধ হাতের বেশি কিছু দেখতে পাই না। আমি ভুলে গেছি বাবাকে কেমন দেখতে ছিল। কিন্তু বাবার ঘর, কেদারা, সিগারের ছাই ঝাড়বার অ্যাশট্রে রেখে দিয়েছি অবিকল। অন্যেরা বুঝবে না কেন।

বৎস, সদাপ্রভুর শাসন তুচ্ছ করিয়ো না, তাঁহার অনুযোগে ক্লান্ত হইয়ো না; কেননা সদাপ্রভু যাহাকে প্রেম করেন, তাহাকেই শাস্তি প্রদান করেন, যেমন পিতা প্রিয় পুত্রের প্রতি করেন।

‘আপনি নাকি রাতের বেলা বেসমেন্টে ঘুমোচ্ছেন?’ বললাম আমি। ‘শরীর আরও খারাপ হবে তো! মনীষা জানলে কিন্তু বকাবকি করবে।’

অন্ধকার জেঁকে আসছে, জানালার বাইরে ঝোপের ভেতর কাঠপোকার একঘেয়ে আওয়াজ—

নাহ্, হিল্ডা ঠোঁট উলটে মাথা নাড়ল।

–কাকা চলে যাচ্ছে। মা বাবার সঙ্গে খুব ঝগড়া। কথা বন্ধ আমাদের। -কেন রে?

–কাকা মেলবোর্ন চলে যেতে চায়। ভিসা হয়ে গেছে। বলছে এখানে কিছু নেই, সবাই চলে যাচ্ছে। তাই বাড়ির নিজেদের অংশটা বিক্রি করে দিতে চাইছে। বাবা তাতে গেছে রেগে।

-তোরাও চলে যাবি ?

যাব।

আমার হঠাৎ মন খারাপ হল। হিল্ডা চলে গেলে আমি পুরো একা হয়ে

—তুই পাগল, না? আমি কোথায় যাব? ভূত হয়ে তোর ঘাড় মটকাব।

আমার গালে চুমু খেল হিল্ডা।

রেভারেন্ড এবার উঠলেন। নড়বড় করতে করতে সারাঘর ঘুরে বেড়াচ্ছেন। কখনো একটা বইয়ের পাতা উলটে দেখছেন, পরক্ষণে হাতে উঠিয়ে নিচ্ছেন জীর্ণ খাতা। তারপর অবহেলায় ফেলে দিচ্ছেন। ছেঁড়া পাতাগুলো ঘর জুড়ে উড়ছে।

‘রেভারেন্ড গরম্যান, আমি কয়েক দিন পরেই দিল্লি চলে যাব। হয়তো ক্রিসের রহস্যে আলো ফেলা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। বলতে পারেন, আমার মনের কিছু খটকা পরিষ্কার করার জন্য এগুলো জানতে চাইছি, আর কিছু নয়। কিন্তু আমারই তো মন, তাই আমি একটা জিনিসই চাই। পারলাম না, ঠিক আছে, তাতে আমার দুঃখ নেই। কিন্তু, কেন পারলাম না সেটা বুঝে নিতে চাই। আপনার কি কখনো কিছু সন্দেহজনক লেগেছে, যা পুলিশকে জানাননি? হয়তো কিছুই নয় সেটা। তবুও আমি সব কিছু খতিয়ে দেখতে চাই।’ তনয়া হতাশ গলায় যেন দেওয়ালকে শোনাচ্ছে এভাবে কথাগুলো বলল।

রেভারেন্ড তনয়ার দিকে ফিরে মৃদু হাসলেন। স্বচ্ছ হল তাঁর দৃষ্টি। কেটে কেটে বললেন, ‘যখন ক্রিসকে খোঁজা হচ্ছে পেছনের বাগানে, পুলিশ এসেছে, তখন বাড়ির ভেতর থেকে কেউ একজন চেঁচিয়েছিল সামনের গেট দিয়ে কে যেন বেরিয়ে যাচ্ছে। সবাই সামনের গেটে ছুটেছিল, কিন্তু কিছু দেখেনি। যেন ছায়ার মতো সরে গেল, তাই না? যেন দিব্য প্রেত এসে ক্রিসকে নিয়ে গেল। তাই না?’

বড়ো নিশ্বাস ফেললাম। এতক্ষণে কিছুটা অর্থপূর্ণ বাক্য বললেন রেভারেন্ড।

‘গেটের কাছে গিয়ে কেউ দেখতে পায়নি তাকে, যে বেরিয়ে গেল। তাহলে কি সে হাওয়ায় উধাও হয়ে গেল, নাকি, আসলে কেউ দেখেনি? বাড়ির ভেতর থেকে ভুল দেখেছে হয়তো? অথবা, হয়তো সত্যিই দিব্য প্রেত?’ তনয়া হাসল, ‘বারবারা তখন এত উত্তেজিত ছিল যে, সম্ভবত ওর মস্তিষ্ক ওকে ভূত দেখিয়েছে। কিন্তু, রেভারেন্ডের এই চিন্তাটা আমার কাছে ইন্টারেস্টিং লাগছে। কে চেঁচাল?’ হয়তো সেটা আমিই, যেমন সবাই বলে। কী যে দেখেছিলাম তখন সামনের গেটে, কে জানে! একটা অদ্ভুত জিনিস আমার বার বার মনে হচ্ছিল সেদিন। এই মুহূর্তে যদি লোডশেডিং হয়ে যায় তাহলে কেওস আরও বাড়বে। লোকে তখন একে অন্যকে জাপটে ‘ছেলেধরা” বলে চেঁচাতেও পারে। লোকে বলে, তারা দোতলার একটা জানালায় ছায়ামূর্তি দেখেছিল, যে চেঁচিয়েছিল। আমি তখন দোতলায় কিনা, মনে নেই। চেঁচিয়ে ওঠার কোনো স্মৃতিই নেই আমার কাছে। রেভারেন্ডের সব ইন্টারেস্ট আবার ফুরিয়ে গেছে। একটা তার ছেঁড়া ল্যান্ডলাইনের রিসিভার হাতে তিনি জানালার ধারে হেঁটে গেলেন। ক্রেডলটা ভেজামাটিতে খ্যাড়খাড় শব্দে এগোচ্ছে, দাগ কাটছে আঁকিবুকি। তনয়াকে চোখের ইঙ্গিত করলাম, এবার উঠতে হবে। সাড়ে আটটা বাজে, রেভারেন্ডের খাওয়ার সময় হয়েছে।

আমরা বেরোচ্ছি, তখন রেভারেন্ডের গলা পেলাম, ‘হ্যালো!’ পিছু ফিরে দেখি কানে রিসিভার চেপে বলছেন, ‘লালু? মেল মরে গেছে। ওর কবরখানায় আমার নাম করে একগোছা ফুল রেখে আসবি?’ অল্প আলোয় রেভারেন্ডের মুখের বলিরেখারা কোঁচকানো কাগজের আভাস আনছিল। আমার মনে হচ্ছিল, একটা টোকা মারলে সেই মুখ ভেঙেচুরে জল হয়ে যাবে।

তনয়া আবিষ্টের মতো তাকিয়ে ছিল রেভারেন্ডের দিকে। কয়েক সেকেন্ডের বিহবল দৃষ্টির পর অ্যারনের ডাকে ঘোর ভাঙল তার। চাপাগলায় উত্তর দিল, ‘কলকাতায় গিয়ে রেখে আসব। অনেক ধন্যবাদ রেভারেন্ড।’ রেভারেন্ড জানালা দিয়ে আকাশ দেখছেন। কানে তখনো রিসিভার।

‘তোমার কি মনে হয়, এতদিন পরে এসে তুমি ক্রিসের রহস্যের কূলকিনারা পাবে?” ‘আমাদের কেসের সঙ্গে ক্রিস জড়িয়ে আছে কি না জানি না, তবে আমার আগ্রহ অ্যাগনেসকে নিয়ে।’

.

স্তম্ভিতচোখে অক্ষয়ের দিকে তাকালাম। ও কি আমার সঙ্গে ঠাট্টা করছে? ‘অ্যাগনেস? তুমি কি সিরিয়াস?’ কিন্তু ওর মুখে তারল্য পেলাম না।

‘আমাদের কেসের সঙ্গে সম্ভবত অ্যাগনেস জড়িয়ে।’

‘এতদিন পর! অথবা, তুমিও তনয়ার মতোই ভুল

রাস্তায় হাঁটছ।’

‘এবার রাস্তা ভুল হবার সম্ভাবনা নেই। অ্যাগনেসের অন্তর্ধান রহস্যের তদন্তকারী অফিসার ছিলেন সেই অবিনাশ যাদব। সমস্ত কিছু একে একে দুই হচ্ছে। না ম্যাডাম,’ অক্ষয় ঘাড় নাড়ল, ‘আমাদের ভুল হচ্ছে না। অবিনাশ যাদব অপরাধী কি না আমি জানি না, কিন্তু অ্যাগনেসের সঙ্গে যে কানেকশন আছে, সেটা নিয়ে আমি নিশ্চিত। ‘

কিন্তু, আমরা নিশ্চিত ছিলাম যে, তনয়া ভুল। তাহলে কি ও ভুল ছিল না? আমি অক্ষয়ের হাত খামচে ধরলাম, ‘তনয়াই কি তাহলে আসল জায়গাটা ধরতে পেরেছিল, অক্ষয়? আমরা তাকে ভুল বুঝেছিলাম? কী হবে, যদি ও ঠিক হয় আর আমরা ভুল? অনেকটা সময় তো কেটে গেল, না?’

গাড়ির হেডলাইটের আলো শুষে নিচ্ছিল পিচরাস্তার অন্ধকার। দু-পাশে শাল, শিশু, মহুয়ার বন হুড়মুড় ঝেঁকে আসতে চাইছে। আমি চুপচাপ গাড়ি চালাচ্ছিলাম। পেছনের সিটে অ্যারন নিজের ভাবনায় মগ্ন। কিন্তু মাঝপথে তনয়া বলল, কয়েক পা হাঁটতে চায়। মাথায় হুডি চাপিয়ে নীরবে আমাদের দু-জনের মধ্যিখানে হাঁটছিল। ল্যাম্পপোস্টের আলো ঘিরে জমাট কুয়াশা। পাশের ঝোপে অস্পষ্ট খচমচ, বোধ হয় রাতপাখি। তনয়া একটা কাটা গাছের গুঁড়ির ওপর বসল। সিগারেট জ্বালিয়ে জোরে টান দিল কয়েকটা। বেথেল মিশন থেকে বেরোনোর পর থেকে এমন ভূতগ্রস্তের মতো আচরণ করছে কেন?

তনয়া ফিসফিস করল, ‘কবরখানা।’ তারপর বড়ো নিশ্বাস ফেলে বলল, ‘সেই ছবিটা, যাকে খুঁজে পাচ্ছিলাম না, এতক্ষণে পেয়েছি। একটা মেয়ের ভূত কবরখানায় বসে চুল আঁচড়াচ্ছে।’

‘সে আবার কী?’

“তোমরা বলেছিলে সেদিন, অ্যাগনেসের ভূতকে দেখা যায়, নিঝুম দুপুরে কবরখানায় বসে চুল আঁচড়াচ্ছে। কী অ্যাবসার্ড একটা ছবি, তাই না?”

‘অ্যাগনেস। হ্যাঁ, শহুরে লোককথা। কিন্তু তার সঙ্গে এর কী সম্পর্ক?’ আছে হাওয়া, আছে রোদ, আছে নীল আকাশের নীচে মর্মর পৃথিবী—’

‘নেই, এবং সেটাই অ্যাবসার্ড। চিরুনি থাকবে কেন ক্রাইম সিনে? এটা আমাকে কেন ট্রিগার করছিল, এখন বুঝছি। কারণ, আমার অবচেতনে অ্যাগনেসের ভূতের কবরখানায় বসে চুল আঁচড়াবার ছবিটা ভাসছিল।’

‘চিরুনি ততটাই অ্যাবসার্ড, যতটা একটা মেয়ের কবরখানায় বসে চুল আঁচড়ানো।’ বলল অ্যারন। ‘আমার মাথায় এটা কেন এল না?’ ভুরু কুঁচকে বলল, ‘দুটো ছবি, নাকি, একটাই?’ ‘তোমার পয়েন্টটা কী?’ তনয়াকে জিজ্ঞাসা করলাম।

“দেখো, অ্যারন যা বলল সেটার সঙ্গে আমি একমত। চিরুনি একটা অ্যাবসার্ড ব্লু। আমার মাথায় প্রথমেই যেটা আসছে, সেটা হল, চিরুনিটা অপরাধী ফেলে রেখে গিয়েছিল অ্যাগনেসকে দোষী দেখাবার জন্য, যেহেতু সে সারাক্ষণ চুল আঁচড়াত। যাকে বলে “ইমপ্লান্টিং দি এভিডেন্স”। কিন্তু, অ্যাগনেসকে কেন কেউ দোষী দেখাবে? সে তো অনেকদিন আগে নিখোঁজ। এখানেই প্যাটার্ন বুঝতে পারছি না। ধরো, আমি কারোর সঙ্গে গোপনে প্রেম করছি, আমি চাই না সেটা অন্যেরা জানুক, কারণ আমি বিবাহিত। এবার, আমাকে যদি আমার প্রেমিকের সঙ্গে কেউ দেখে থাকে এবং পরে হয়তো কথায় কথায় জানায় যে, আমাকে একটা ছেলের সঙ্গে দেখেছে অমুক দিনে, তাহলে আমি সেটাকে ঢাকা দেবার জন্য কী বলব? আমি বলব ওটা আমার স্বামী ছিল অথবা ভাই ছিল, নিদেনপক্ষে অফিসের সহকর্মী ছিল। কিন্তু আমি নিশ্চয় বলব না যে, ওটা শাহরুখ খান ছিল! মানে, ডাইভার্ট করার জন্য এমন কাউকে আমি ব্যবহার করব যে, আমাদের চেনা বৃত্তের মধ্যে থাকে। এমন মানুষকে ব্যবহার করব না যে অ্যাবসার্ড। চিরুনিও তাই। ধরো, এডওয়ার্ডকে বা তোমাকে বা মনীষাকে অথবা নির্মলা দুবেকে কেউ দোষী দেখাতে চায়। সে হয়তো এডওয়ার্ডের ব্যবহার করা সিগারেটের প্যাকেট, বা, তোমার একটা উলের বল, অথবা, নির্মলার বাড়ির চাবি ফেলে রাখতে পারে। যদি বাইরের কাউকেও দোষী বানাতে চায় তাহলে এমন জিনিস ফেলে রাখবে যেটা দিয়ে তাকে চিহ্নিত করা যায়। কিন্তু, এমন জিনিস রাখবে না যেটা দিয়ে কারোর ঘাড়েই দোষ চাপানো সম্ভব নয়। চিরুনি হল, কী বলব, ভুল জায়গায় ভুল জিনিস। আমি আজ সারাদিন নানা জিনিস ভেবেছি আর বারে বারে চিরুনিতে ফিরে আসছি। এটাই আমাকে কাল থেকে জ্বালাচ্ছিল, কী যেন উত্তর আসছে না। হয়তো না-বুঝেই আমি তাই বার বার অ্যাগনেসের কথা খুঁচিয়ে যাচ্ছিলাম তোমার কাছে।’ অ্যাগনেসের কথাই-বা ভাবছে কেন ওরা? চিরুনি তো বহু লোক ব্যবহার করতে পারে। কিন্তু, অ্যারন আমাকে মনে করাল বাড়ি থেকে অ্যাগনেসের ফটো এবং চিঠি পাবার কথা। ‘কষ্টকল্পনা হত, যদি না অ্যাগনেসের ছবি পাওয়া যেত তোমাদের বাড়ি থেকে। আমি বলছি না এই ঘটনার সঙ্গে অ্যাগনেস জড়িত। বরং উলটোটা বলছি। অ্যাগনেসকে কেউ জোর করে জড়াচ্ছে। সম্ভবত সেই কারণেই বাড়ির ভেতর অ্যাগনেসের ছবি ও চিঠি ইমপ্লান্ট করেছিল। হয়তো সে জোর করে অ্যাগনেসের দিকে আমাকে ডাইভার্ট করতে চাইছে। আর সেটা একটা অ্যাবসার্ড রেড হেরিং। কারণ, যার অস্তিত্ব নেই তাকে ফাঁসানোর মানে নেই। কিন্তু, তা সত্ত্বেও অ্যাগনেসকে কেন জড়ানো হচ্ছে, সেই ধাঁধার সমাধান না-করলে সত্যিতে পৌঁছোনো যাবে না।’

‘চিরুনি আর অ্যাগনেসের চুল আঁচড়ানো, দুটো আলাদা দৃশ্য দিচ্ছে। কিন্তু দুটো দৃশ্যের মধ্যে সংযোগ, একটা সংযোগ—’ অস্থির ভঙ্গিতে মাথায় হাত বোলাল অ্যারন। ‘দৃশ্য মানে তার অর্থ আছে। এবং, অর্থ আছে মানে তার ইতিহাস আছে। সেই ইতিহাসটা কী?’

‘পুলিশ সন্দেহ করেছিল অ্যাগনেস পালিয়ে গেছে। উনিশশো ছিয়াশি বা সাতাশি সালের ঘটনা। তবে—’ এবার মনে পড়ল। এডওয়ার্ডকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছিল অ্যাগনেস নিখোঁজ হবার পর। তবে একা এডওয়ার্ড নয়, অনেককেই, ওর স্কুলের বন্ধুদেরও সবথেকে বেশি সন্দেহ তো ওই ছেলেটাকে করা হয়েছিল, ব্লাডি কী যেন নাম, সে নাকি অ্যাগনেসের প্রেমিক ছিল। বিহারি ছেলে। মুখটাই মনে পড়ছে না। ছোঁড়া শহর ছেড়ে পালাচ্ছিল, অবিনাশ গ্রেপ্তার করে। ছোটো শহরের গুজব অন্যরকম হয়। কয়েক বছর পর থেকে আমরা শুনতে থাকলাম অ্যাগনেসকে নাকি এখানে-ওখানে রাতবিরেতে দেখা গেছে। লোকে বলতে শুরু করল, অ্যাগনেস খুন হয়েছে। তার অতৃপ্ত আত্মা ঘুরে বেড়ায়। অনেকেই তাকে দেখেছে নাকি। অ্যাগনেসের ভূত ক্রমে টাউনের এক পাকাপাকি অস্তিত্ব হয়ে উঠেছিল।

পর পর দুই রাত এডওয়ার্ড আঁ আঁ চিৎকার করে জেগে উঠেছে। জোজো পালিয়ে যাবার পর থেকে— আমি দেখেছি, হিসু করে ফেলেছিল প্রথম রাতে। মা-কে দেখালাম। মা বলল, হিসুমাখা পাজামায় নুন মাখিয়ে এডওয়ার্ডকে চাটাতে, কিন্তু আমি পারব না। এগারো বছরের ছেলেকে ওভাবে কিছু করা যায় নাকি? এডওয়ার্ড বলল, ও আবোল-তাবোল স্বপ্ন দেখে, ভয় পায়। ওর হাতের ফোসকা ফেটে আবার রস গড়াচ্ছে।

‘কিন্তু জেনিফার বলেছিল, গুড ফ্রাইডের রাতে অ্যাগনেসকে দেখা যায়। গুড ফ্রাইডে কেন? হ্যালোউইন বললে বুঝতাম।’ তনয়া বোঝে না, জেনিফারের মাথায় ছিট আছে। নিজেও ভূত নামায় তো, তাই কল্পনা করে যে অ্যাগনেসের ভূত নামে। ‘অ্যাগনেস কে ছিল বারবারা?’

.

‘টাউনের একটা মেয়ে। ওরা দুই বোন। ছোটোবোনের নাম ডলোরেস। বাবা ছিল টাউনের চোখের ডাক্তার শিবপ্রকাশ শর্মার অ্যাসিস্ট্যান্ট, আর মা উন্মাদ ছিল। ছিল কেন, মা এখনও বেঁচে। তবে হ্যাঁ, দেখতে কিছু সুন্দরী ছিল! মায়ের সেরূপ পেয়েছিল বড়ো মেয়ে। হাঁটু অবধি গড়ানো লাল চুল, ঘন নীল চোখ, ডিমের আকৃতির মুখ, পাকাগমের মতো গায়ের রং। যেন তুলি ডুবিয়ে চোখের মণিদুটো আঁকা হয়েছে। তাকালে মনে হয় আভা বেরোচ্ছে চোখ দিয়ে। অ্যাগনেস মায়ের রূপ পেয়েছিল, সঙ্গে উন্মাদনাও। তারও নাকি মাথায় গণ্ডগোল দেখা দিয়েছিল ছোটো বয়েসে। কয়েক দিন চাঞ্চল্য হয়েছিল শহরে, যখন ও নিখোঁজ হয়। কিন্তু, তারপর সব থিতিয়ে গেল।’ জোরে নিশ্বাস ছেড়ে বললাম, ‘যা জানতাম সব বলে দিলাম। কৌতূহল মিটেছে?’

‘ডলোরেস বেঁচে আছে?’

‘তুমি ক্রিসের ব্যাপারে খোঁজ করছ, না, অ্যাগনেসের ব্যাপারে?’

হিল্ডা আমার পাশে হাঁটছিল। ডেগাডেগি নদীর ওপর বাঁধের ধারে যাচ্ছিলাম আমরা, কারণ হিল্ডার কামিজের নীচে একটা লুকোনো রামের বোতল ছিল। ওখানে গেলে কেউ আমাদের দেখতে পাবে না।

–তোর কলেজ অনেক দুরে, আমার ভালো লাগে না। সময়ই পাস না তুই আজকাল।

–এই তো আজ পেয়েছি। জোহার হালে যাবি?

-না বাবা, ওখানে অনেকে বসে থাকে, কে দেখে ফেলবে!

–তোকে একজনের কথা বলতাম। আমি বুঝলাম, হিল্ডার বয়ফ্রেন্ড হয়েছে।

ডলোরেস ডন বসকোর লাইব্রেরিতে কাজ করে। বহুকাল দেখা হয় না যদিও। বিয়েথা করেনি, মা-কে নিয়েই ব্যতিব্যস্ত থাকে। অবশ্য এমনিতেও ওরা কম মিশত সবার সঙ্গে। অ্যাগনেস বাদে। তার ওপর গোঁড়া ক্যাথলিক। আমাদের কোনো অনুষ্ঠানে থাকতে দেখিনি ওদের। ওদের একটা ছোটো চার্চও ছিল টাউনের বাইরে। ‘চিরুনিটাকে তুমি পাত্তা দিচ্ছ না কেন?’ অ্যারন জিজ্ঞাসা করল আমাকে। ‘ক্রিসের বোরিং গল্পে ওটা একমাত্র কোয়ার্কি ছিল।’ নিজের দাদার নিখোঁজ হবার গল্প ওর বোরিং লাগছে কেন? ও কি বাবার মতো পাকা অ্যাংলো হয়ে উঠল?

-থাক, আমাকে বলবি না।

-কেন?

-শুনতে চাই না বললাম তো। আমি ওকে ছেড়ে হনহন করে হাঁটা লাগালাম, হিল্ডা পেছন থেকে ডাকছে। পিছু ফিরে দেখলাম, নদীর ধারে দাঁড়িয়ে, জঙ্গল ঝেঁপে আসছে, হাওয়ায় ওর চুল উড়ছে এলোমেলো। ওর কাছে ফিরে গেলাম, কামিজ তুলে বার করলাম বোতলটা। গলায় দু-ঢোঁক ঢেলে বললাম, ‘হ্যাপি? নাউ গো টু হেল।’ হিল্ডা অবাক তাকিয়ে, কিন্তু ছোটোবেলার মতো কথায় কথায় ভ্যাঁ করে না। অনেক বড়ো হয়ে গেল। কত দূরের কলেজে যায়!

‘আমার মাথায় প্রথমেই যেটা স্ট্রাইক করছে, দু-জন নিখোঁজ হয়েছিল যাদের অন্তর্ধান রহস্যের সমাধান হয়নি।’ পকেট থেকে মোবাইল বার করে খুটখাট বোতাম টিপল তনয়া, মুখ থেকে বিরক্তির আওয়াজ করল, ‘এখানে নেটওয়ার্ক এত স্লো…’, তারপর উদ্ভাসিত হল মুখ। ‘১৯৯২ সালের গুড ফ্রাইডে ছিল ১৭ এপ্রিল।’

তো?’

‘ক্রিস নিখোঁজ হয়েছে ২০ এপ্রিল। দুটো দিন কাছাকাছি না?’

‘কিন্তু অ্যাগনেসের সঙ্গে গুড ফ্রাইডের কী সম্পর্ক?’ আমি নিশ্চিত ছিলাম তনয়া ভুলপথে হাঁটছে। যেখানে রহস্য নেই, সেখান থেকে জোর করে রহস্য টেনে আনছে।

অ্যারন বলল, সে আজ স্যাংচুয়ারিতে থাকবে। ওর জন্য একটা ঘর রাখাই থাকে, কিন্তু সেখানে খাট বিছানা রাখতে দেয়নি। মাটিতে একটা চাদর বিছানো থাকে। তার ওপর বসে ও সারারাত সিগারেট খায়, মদ খায়। নীচে থাকলেও আমি বুঝতে পারি, অ্যারন রাত্রিবেলা ঘরজুড়ে হেঁটে বেড়াচ্ছে। তনয়া শুতে চলে যাবার পরে আজ মাঝরাত পর্যন্ত আমি বসে ছিলাম খাবার টেবিলে। অ্যাগনেসকে মনে করার চেষ্টা করছিলাম। সত্যিই কি সে ছিল কোথাও? নাকি, এ সবই তনয়ার কল্পনা? অ্যাগনেসের পড়াশোনায় মন ছিল না। এর গাছে চড়ছে, ওর বাগানের ফল চুরি করছে, দুরন্ত মেয়ে। স্বাভাবিক অবস্থায় হাসিখুশি। কিন্তু, মাঝে মাঝে মাথায় পাগলামি চাপত নাকি ওর। তখন মারধর করত একে-তাকে, চিৎকার করে অশ্লীল গালি দিত। ফেল করেছিল দু-বার। তবে বাইবেলের ক্লাস নাকি মন দিয়ে করত, কে যেন বলেছিল। ধর্মভীরু ছিল অ্যাগনেস। পড়াশোনায় ভালো ছিল ওর বোন ডলোরেস। বাধ্য, শান্ত, সারাদিন বই মুখে পড়ে থাকত। ডলোরেসের থেকে অ্যাগনেসের পাগলামির ব্যাপারে শুনেছিলাম। বাড়িতে নাকি ঢেঁকা যেত না যখন অ্যাগনেসের মাথায় ভূত চাপত। ডলোরেস পালিয়ে স্কুলের লাইব্রেরিতে চলে যেত।

ব্যাগ থেকে বার করে ছবিটা আবার দেখলাম। কোনো এক বাগানে গাছের একটা নীচু ডালে হেলান দিয়ে অ্যাগনেস বসে। হাঁটুর কাছে থেমে যাওয়া বাহারি ফুলছাপ ড্রেস আর চোখে স্টাইল করে পরা সানগ্লাস। একটা হাত আলস্যে রাখা মাথার চুলে। অন্য হাত দিয়ে ডাল ধরে আছে। হাসছে অ্যাগনেস। এই ফটো কে তুলেছিল? সোয়েটার পরা ওই রহস্যময় হাত কি চেনা লাগছে আমার? কোথায় দেখেছি তাকে? ওই ময়ূরছাপ ডিজাইন—

স্মৃতি অনুদার। রুক্ষ শীতের মতো নিজের ডালপালা ছেঁটে ফেলতে চায়।

.

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *