১৫
সূর্য্যের নীচে যত কার্য্য করা যায়, তাহার মধ্যে ইহা দুঃখের বিষয় যে, সকলের প্রতি একরূপ ঘটনা হয় ; অধিকন্তু মনুষ্য-সন্তানদের অন্তঃকরণ দুষ্টতায় পরিপূর্ণ, এবং যাবজ্জীবন উন্মাদনা তাহাদের হৃদয়মধ্যে থাকে, পরে তাহারা মৃতদের নিকটে যায়। কারণ কে অব্যাহতি পায়?
– Corinthians | 9:3
.
পর পর কয়েকটা ছবি আমার সামনে টেবিলের ওপর রাখা। স্তব্ধ হয়ে বসে ছিলাম। অক্ষয় মাহাতো আর সোমেন কর্মকার চুপচাপ তাকিয়ে। হয়তো আশা করছেন আমি প্রতিক্রিয়া দেব। কিন্তু আমার আনন্দ, উত্তেজনা অথবা রাগ, কিছুই হচ্ছে না। শুধু মনে হচ্ছে, কেন ছেড়ে চলে এসেছিলাম তিন বছর আগে!
রোদে জ্বলা জোহার হালে। ক্রুশবিদ্ধ মৃতদেহ। তার পায়ের কাছে রাখা একটা সাদা চিরুনি। হাতির দাঁতের কাজ করা।
‘অ্যারন আমাদের বলেছিল আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করতে। এর ব্যাখ্যা একমাত্র আপনিই দিতে পারবেন।’ বললেন অক্ষয়।
‘ব্যাখ্যা নেই আমার কাছে। এতক্ষণ ধরে সেই গল্পই বলে গেলাম।’
‘কিন্তু, এখন তো আপনি নিশ্চিত যে, অ্যাগনেসের সঙ্গে এই সমস্ত কিছুর যোগ আছে।’ ‘না-ও থাকতে পারে। চিরুনি তো একা অ্যাগনেসের ছিল না।’ অনিশ্চিত গলায় উত্তর দিলাম।
‘কাম অন, মিস ভট্টাচার্য!’ এই প্রথম অধৈর্য দেখাল অক্ষয়কে। ‘আপনি জানেন আমি কী বলতে চাইছি। ক্রিস এবং অ্যাগনেস, এবং ব্রাউনদের বাড়ি, কোনো এক সূত্রে গাঁথা হয়ে গেছে। একটা চিরুনি গল্পে ফিরে আসছে বার বার, এর অন্য কী ব্যাখ্যা হতে পারে?’ ‘আমি কী বলব বলুন?’
‘কিন্তু এখন কি আপনার মনে হচ্ছে না যে, আপনি মাঝপথে চলে না-এলে এটার সমাধান পাওয়া যেত?’
‘অ্যাগনেস কেন হারিয়ে গেল? ক্রিস কেন হারিয়ে গেল? একটা প্রায় ভূতুড়ে ঘটনার সামনে দাঁড়িয়ে আমি হাল ছেড়ে দেওয়া বাদে কী করতে পারতাম? তবু চেষ্টা তো করেছিলাম, মহেশকে বলে ছুটি বাড়িয়েছিলাম পাঁচদিন। মহেশ প্ৰথমে রাজি হয়নি, ওকে বোঝাতে হয়েছিল, টোপ দিতে হয়েছিল যে একটা ভালো স্টোরি আমি পেয়েছি। আমাকে শর্ত দিয়েছিল ওখান থেকে অফিস করতে হবে, তাতেও রাজি হয়েছিলাম। কিন্তু যখন দিল্লি ফিরে গেলাম, মহেশ আমার মুখের দিকে তাকিয়ে আর কিছু জিজ্ঞাসা করেনি। নির্মমভাবে হেরে যাবার সমস্ত চিহ্ন আমার সর্বাঙ্গে দগদগ করছিল। আমি ওকে স্টোরি তো দিতে পারিইনি, পরে যখনই ও জিজ্ঞাসা করেছে এই পনেরো দিন কী করেছিলাম, এড়িয়ে গেছি। নিজের ভেতরেও না-ভাবার চেষ্টা করেছি। আপনার মনে হয় এতদিন পরে আমি আবার এটার মধ্যে ঢুকতে চাইব?’
‘আপনাকে ঢুকতে হবে না। আমরা তো তদন্ত চালাচ্ছিই। আমাদের প্রাথমিক সন্দেহ হল, এটা প্রতিশোধ হতে পারে। অতীতের সঙ্গে যোগ আছে এ তো পরিষ্কার। অবশ্য, কেউ ভুলপথে চালিত করার জন্য চিরুনিটা রেখে গেছে সেটা হতে পারে, যেমন আপনি ক্রিসের ক্ষেত্রে ভেবেছিলেন। কিন্তু, তাহলে চিরুনি কেন? এটা দিয়ে তো অ্যাগনেস বাদে অন্য কাউকেই কানেক্ট করা সম্ভব নয়। ঠিক যেমন অ্যাবসার্ড ক্লু হিসেবে আপনি ভেবেছিলেন তিন বছর আগে, ক্রিসের ক্ষেত্রে।’
.
‘অ্যাবসার্ড নয়।” আমি মাথা নাড়লাম। ‘আমার তদন্ত কিছু একটা খুঁচিয়েছিল, যে কারণে চিরুনি ফিরে এল।
‘কিন্তু, তিন বছর পরে কেন? কেন তখনই নয়?’ এবার প্রশ্ন করলেন সোমেন কর্মকার। ‘আমি কৌতূহলী শ্রোতা হিসেবে এই প্রশ্নটা করছি, পুলিশ হয়ে নয়। ধরুন, মিস ভট্টাচার্যর তদন্ত হয়তো তাঁর অজ্ঞাতসারে কোনো সূত্রের সন্ধান দিল, অথবা, কাউকে ভয় পাইয়ে দিল যে, সত্যিটা বেরিয়ে আসবে। সেক্ষেত্রে কেন কেউ তখনই অপরাধটা ঘটাবে না? ‘
উত্তর কারোর কাছেই ছিল না। বাইরে বৃষ্টি থেমে গুমোট রাত নেমেছে। দমচাপা বাতাস বুকে ধরে আছে কলকাতা।
‘আচ্ছা, চিরুনিটা কি ওভাবেই রাখা ছিল?’ কিছুক্ষণ পর আমি জিজ্ঞাসা করলাম।
‘হ্যাঁ। পুলিশ প্রথমে গ্রাহ্য করেনি। ভেবেছি এডওয়ার্ডের পকেট থেকে পড়েছে। কিন্তু, প্লেস অফ অকারেন্সে অ্যারন আসে। চিরুনিটা দেখার পর অ্যারন ওদের বলে আপনার কথা। পুলিশ গুরুত্ব দেয়নি। কিন্তু, এক মাস কেটে যাবার পরে যখন হালে পানি এল না, ওপরমহল থেকে চাপ এল কারণ এডওয়ার্ড ব্রাউনের কানেকশন ছিল প্রচুর। কেস সিআইডি-র হাতে গেল। আমরা এসে রিপোর্টগুলো পড়তে গিয়ে অ্যারনের স্টেটমেন্ট পাই। লোকাল পুলিশ এতই ক্যালাস যে, ক্যাজুয়ালি লিখে রেখেছিল। অ্যারনকে আমরা যোগাযোগ করি, তারপর তিন বছর আগেকার রেকর্ড ঘেঁটে ঘটনাটা জানতে পারি।’
চিরুনিটার কথা এতদিন শুধু শুনে এসেছি। আজ ছবিতে প্রথম দেখলাম। সাদা রঙের, ডাঁটির মধ্যভাগে একটা গোলাপ ফুলের ডিজাইন। দেখে বোঝা যায়, চিরুনিটা হাতির দাঁতের কাজের। বাঁ-দিকের দুটো মোটা দাঁত অদৃশ্য।
‘স্থানীয় মানুষ বলেছিল, ওরা অভিশপ্ত পরিবার। যখন এডওয়ার্ড ব্রাউনের খুন হবার খবর দৈনিক ভাস্করের ফিডে পেয়েছিলাম, প্রথম ওই কথাটাই মনে হয়েছিল। কিন্তু, তারপর মনে হল, আমি মাথা ঘামাব না। ভুলে থেকেছিলাম আপনারা আসার আগে পর্যন্ত। আচ্ছা, মোডাস অপারেন্ডি কী ছিল?’
‘হাত-পা বেঁধে ঝোলানো হয়েছে, তার কিছুক্ষণ পর গুলি। সম্ভবত মাঝের সময়টায় জেরা করে হয়েছিল বা অত্যাচার। কিন্তু, গুলি বাদে অত্যাচারের বাকি বিশেষ প্রমাণ নেই। কয়েকটা চড়থাপ্পড়, একটা মনে হয় ঘুসি মারা হয়েছিল ঠোঁটের পাশে। তবে, পেটে অনেকটা মদ পাওয়া গিয়েছিল। একটা কথা বলুন আমাকে। অ্যাগনেসের সঙ্গে এডওয়ার্ডের যোগাযোগ ছিল কি? থাকলে কীরকম? আমরা জানি, অ্যাগনেস নিখোঁজ হবার পরে এডওয়ার্ডকে পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদ করেছিল।’
‘কিন্তু, সেরকম আরও অনেককেই তো করেছিল। তার বাইরে আলাদা করে এডওয়ার্ড—জেনিফার সবার খুঁটিনাটি খবর রাখেন, মানে বুঝতেই পারছেন কী বলতে চাইছি। এডওয়ার্ডের ব্যাপারে কিছু জানাননি। আচ্ছা, আপনারা কি অন্য সম্ভাবনাগুলো সব বাদ দিয়ে ফেলেছেন? যেমন, ব্যাবসায় শত্রুতার কারণে হত্যা, অথবা, নিছক ডাকাতি বা ছিনতাই, আরও যা যা মোটিভ থাকতে পারে?’
‘খুন করে এভাবে টাঙিয়ে রাখবে কেন? চিরুনির ব্যাখ্যা কী? না, আমরা অন্য দিকগুলো খতিয়ে দেখেছি। এডওয়ার্ড ব্রাউনের কানেকশন ভালোই ছিল রাজনৈতিক মহলে। যে কারণে আমাদের ওপর বার বার চাপ আসছে, এমনকী সিআইডির হাতে তুলে দেওয়াও এইজন্য। নাহলে আমি কলকাতায় আসতাম না। বলতে পারেন, অন্য দিশা না-পেয়ে অ্যারনের কথায় আপনার কাছে এসেছি।’
.
দীর্ঘশ্বাস ফেললাম, ‘গল্প কিন্তু এখনও কিছুটা বাকি। ধৈর্য আছে তো?’
ডলোরেসকে দেখে আমার মনে হয়েছিল, নিজের ভেতর শোক, অপেক্ষা আর অন্যান্য রহস্যময় অনুভূতিগুলোকে স্তরে স্তরে ঢেকে রেখেছিলেন। সেই রাত্রে আমি কীভাবে জঙ্গলে পথ হারালাম, নাকি মাথা কাজ করেনি, অথবা ক্লান্ত ছিলাম, জানি না। কিন্তু, নিরীহ বনাঞ্চলকে একলহমায় রাক্ষুসে হাঁ-মুখ মনে হয়েছিল। ডলোরেস না বাঁচালে বিশ্রী দুর্ঘটনা অবশ্যম্ভাবী ছিল, কারণ আমি একটা শুকনো গভীর খাদের প্রান্তসীমায় দাঁড়িয়েছিলাম, যার ওপার থেকে টিলা উঠে গেছে। ধন্যবাদ জানানো একটা কারণ তো বটেই, তার থেকে বেশি ছিল কৌতূহল, তাই ডলোরেসকে ফোন করে পরদিন জিজ্ঞাসা করলাম সেদিন দুপুর বেলা তাঁদের বাড়ি যেতে পারি কি না। আমার চলে যাবার দিন এগিয়ে আসছে, ছুটি বাড়ানো যাবে না ।
জাগৃতি বিহারের পেছনের রাস্তায় কিছুটা হাঁটলে ডলোরেসদের কটেজ। ক্ষয়ে যাওয়া দোতলা বাংলো, যার চারধারে ছাগল ও মুরগি চরে বেড়াচ্ছে। জঙ্গলে ঘেরা শান্ত ও নির্জন। আশেপাশের অন্যান্য কটেজগুলো পরিত্যক্ত। বাড়ির একদিকের দেওয়াল ভেঙেছে, তার গায়ে সোনালি অক্ষরে লেখা ‘তাহার মহিমা’ এখনও পড়া যায়। একটা বৃদ্ধ পলাশ গাছ সবার মাথা ছাড়িয়ে উঁচুতে দাঁড়িয়ে। তেলাকুচোর জঙ্গল হয়ে আছে এখানে-ওখানে। টিলাপাহাড়ের দিক থেকে একটা শুকনো বাতাস এসে ধুলোর চাদর ছড়িয়ে যায় মাঝে মাঝে
ডলোরেস গেটের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তাঁকে দূর থেকে দেখে মনে হল, নিজের সম্পর্কে যা বলুন না কেন, যথেষ্ট সুন্দরী এবং আকর্ষণীয়া, এই বয়েসেও। আলফ্রেড প্রেমে পড়লে তাঁকে দোষ দেওয়া যাবে না। অ্যাগনেসের ছবি আমি পুলিশ ফাইলে দেখেছি, হলুদ বিবর্ণ সে-ছবি দেখে আলাদা করে উচ্ছল বালিকাকে বোঝা সম্ভব ছিল না।
বাড়ির ভেতরে পুরোনো দিনের গন্ধ, গুমোট ও বিষণ্ন। আমরা বসার ঘরে এলাম। কাগজপত্র, ট্রাঙ্ক, ছেঁড়া ফাইল, বিবর্ণ বইতে ঠাসাঠাসি। সোফার গদি ফেটে তুলো বেরিয়ে পড়েছে। তবু শৌখিন কেটলিতে অপেক্ষারত চায়ের স্বাদ ডলোরেসের রুচি বোঝায়। বেকারিতে বানানো কুকিতে মাখনের টাটকা গন্ধ।
‘এই ঘরটা অ্যাগনেসের প্রিয় ছিল। অনেকদিন রাতে এখানেই ঘুমিয়েছে। এই যে জানালা থেকে বাগান দেখা যেত, বসে বসে দেখত সারাদিন। বাগান খুব প্রিয় ছিল ওর।’ দেওয়ালে একটা ধূসর ছবি। চারজনের। সুখী সময়কার। ‘আমরা ঘুরতে গিয়েছিলাম ভাইজ্যাগ। আমি তখন ছয়। সেই আমাদের শেষবার চারজন একসঙ্গে ঘুরতে যাওয়া। খুব আনন্দ হয়েছিল।’
‘আপনার কখনো মনে হয়নি, মানে বড়ো হয়ে, যে, অ্যাগনেসকে খুঁজে বার করবেন?’ ‘হয়নি যে, তা নয়। দুই-একবার পুলিশ স্টেশনেও গিয়েছি। কিন্তু, কেউ বিশেষ উৎসাহ দেখায়নি। আমার মনে হত, নিজের জীবনটাকে গুছিয়ে নেব এবার। অ্যাগনেসের ছায়ায় থাকব না। তাই নিজেকে বোঝালাম যে, ও পালিয়ে গিয়ে বেঁচে গেছে। আবার তাকে ফেরানোর চেষ্টা করলে কোনো পক্ষের ভালো হবে না।’
‘আমাকে ক্রিসের গল্প করা হয়েছিল। অ্যাগনেসকে নিয়ে সত্যিই কারোর ইন্টারেস্ট নেই।
‘অদ্ভুত, না? অ্যাগনেস নাহয় পালিয়েছে, অন্তত সেরকমই মনে করি আমরা। কিন্তু, অত ছোটো শিশু পায়ে হেঁটে তো কোথাও যেতে পারবে না।’ ডলোরেস আমাকে বাগান দেখালেন। দেখার কিছু নেই, চারদিক ঝোপেঝাড়ে ভরতি, তবে অনেকটা জায়গা জুড়ে। এখানে ফুল চাষ হত অনেক। বুড়ো পলাশের নীচে একটা টুল। মুরগির ঘরের পাশ থেকে আরেকটা টুল বার করে আনলেন ডলোরেস। দু-জনে মুখোমুখি বসার পর হাসলেন, “এই জায়গাটা আমার সবথেকে প্রিয়। পারলে সারাদিন বসে থাকি এখানে। মাটিও অন্যরকম এই গাছের নীচে, দেখো! শীতকালে ঊষ্ণ থাকে, গরমে ঠান্ডা। কত ফুল হয়! সময় আসবে কিছুদিন পর। ঝড়ের মতো পাপড়ির দল সারা বাগানে বইবে।’ মরে আসা রোদের ভাপে চোখ জুড়িয়ে আসছিল আমার। কত রাত ঘুমোইনি ভালো করে! টেটভ্যাক নিয়ে গা ম্যাজম্যাজ করছে। বাড়ির ভেতর থেকে চায়ের কাপ নিয়ে এলেন ডলোরেস। ‘এখানে বসলে আরাম লাগে। মায়ের শরীর ভালো থাকলে শাল মুড়িয়ে নিয়ে আসি বাগানে। বসে বসে ঢোলে।’
কঁক কঁক শব্দে মুরগির দল হেলেদুলে চরে বেড়াচ্ছিল। একটা ছাগল এসে সন্দিগ্ধমনে আমার প্যান্ট চেটে দেখল, চিবোনো যায় কি না। লালুরামের কথা মনে পড়তে অস্বস্তিতে নড়েচড়ে বসলাম আমি। ‘ডলোরেস, আপনার কখনো মনে হয়েছে, এই দুটোর মধ্যে যোগ থাকতে পারে?’
‘না!’ ডলোরেস অবাক চোখে মাথা নাড়লেন। ‘কীসের যোগ! মানে, আমরা তো এডওয়ার্ডদের চিনতামও না ভালো করে।
‘কিন্তু, অ্যাগনেস ওদের বাড়ি যেত।’
‘আমরা বলতে আমি বাবা-মায়ের কথা বলেছি। অ্যাগনেসের গোটা শহর জুড়ে বন্ধু। তোমার কি মনে হয়, সত্যিই যোগাযোগ আছে?’ এটুকু বলে ডলোরেস আর প্রশ্ন করলেন না। আনমনে চা খাচ্ছিলেন। তখন বিকেল ঢলে পড়ল। যেখানে যেটুকু রোদ, তাকে শীতের চাদরে মুড়িয়ে সূর্য ঝরবার পালা এল এবং তার দীর্ঘ অবসান আমাকে মনে করাল, অ্যাগনেসের ডায়েরির কথা ডলোরেসকে বলতে হবে। ডলোরেস জানালেন, সে-ডায়েরি ছিঁড়েখুঁড়ে বিবর্ণ। তারপর বাড়ির ভেতর ঢুকে গেলেন। কয়েক মিনিট পর বেরোলেন একটা ব্যাগ হাতে। ‘ন্যাপথলিন দিয়ে রেখেছি, তাও তো পোকা লেগেছে, পাতা ঝুরঝুর করছে।’ সেক্ষেত্রে ফটোকপি করানো বিপজ্জনক না? সাধারণ যেকোনো ডায়েরি যেমন হয়, বাদামি চামড়ায় বাঁধানো। সাল ১৯৮৫। অ্যাগনেস নাকি শেষদিকে মাঝে মাঝে ডায়েরি লেখা ধরেছিল, কিন্তু সেগুলো যে আসলে কী, ডায়েরি, না, গল্প, না, তার উন্মাদনার হ্যালুসিনেশন, পড়ে কিছু বোঝা যাবে না। ‘আমি বুঝিনি, দেখো তুমি যদি পারো।’ ভেতরের পাতাগুলো হলুদ, আঙুলের চাপে ভেঙে যেতে পারে ভয় হল। ডলোরেস সাবধানে পাতা ওলটাচ্ছিলেন। খাপছাড়া টেক্সট, অনেক জায়গায় বাজারের হিসেব, অথবা, চেনা হিন্দি গানের লাইন টুকে রেখেছে। তবে, হাতের লেখা পরিচ্ছন্ন। সবক-টা পাতার দরকার নেই, তাই আমি ডলোরেসকে বললাম সাবধানে একটা করে পাতা খুলতে। ফোনের স্ক্যানার দিয়ে তুলে নিচ্ছিলাম। বাড়ি গিয়ে পিডিএফে কম্পাইল করে নিলেই হবে। ডলোরেস জানালেন, তাঁর স্কুলে প্রিন্টার আছে। পিডিএফটা পাঠালে প্রিন্টআউট করে কারোর হাত দিয়ে পাঠিয়ে দেবেন। প্রায় চল্লিশ পাতা মতো। অ্যাগনেসের জীবনের শেষ এক বছর অনিয়মিতভাবে লিখেছিল। পাতা বেছে বেছে স্ক্যান করতে গিয়ে সন্ধে হয়ে গেল। জিজ্ঞাসা করলাম, মার্গারেটের সঙ্গে দেখা করা যাবে কি না। ডলোরেস ইতস্তত করছিলেন প্রথমে, ‘মা কেমনভাবে রিঅ্যাক্ট করবে জানি না। অনেকদিন তো অচেনা কেউ আসে না!’ তারপর কী ভেবে বললেন, ‘আচ্ছা, চলো। সবই তো বলেছি তোমাকে। মা আবোলতাবোল বকলে কিছু মনে কোরো না।’
‘আপনি কেন খুলে বলছেন না বলুন তো? সেদিন ভোরবেলা আমাকে একলা রেখে উধাও হয়ে গেলেন?’
রকির বাবা হাসলেন। ‘উধাও হইনি। রকিকে হাঁটাতে গিয়েছিলাম। কিন্তু, সেসব ছাড়ুন। আপনি দিশা পেলেন কিছু?’
‘অ্যাগনেস খুন হয়েছে বলেছিলেন কেন?’
হাসি মুছল না রকির বাবার। ‘এমন কিছু বলেছি বলে তো মনে পড়ে না। বলেছি নাকি, রকি?’ রকি কান ঝাড়া দিয়ে হুঁ-হুঁ স্বরে কিছু জানাল। গা ঘেঁষে এল আমার, আদর খেতে চায়। নীচু হয়ে পিঠে হাত বোলালাম।’
‘আপনি ঘুমের মধ্যে ভুল শুনেছিলেন সম্ভবত।’
.
কথা কাটাকাটি করতে ইচ্ছে করল না। নির্জন রাস্তা। তরল অন্ধকারে বনাঞ্চলকে মায়াবী লাগছে। ‘আজ আমি ডলোরেসের বাড়ি থেকে আসছি। চেনেন ওকে? অ্যাগনেসের বোন। উত্তর দিলেন না। পাশাপাশি কিছুদুর নীরবে হাঁটার পর বললেন, ‘আপনি সমাধান করতে না-পারুন, অন্তত লিখুন এই গল্প। মানুষ যাতে ভুলে না যায়—’
‘মানুষের কিছু এসে যায় না চল্লিশ বছর আগে কী ঘটেছিল। শুধু কয়েকটা পরিবার স্থায়ী ক্ষতচিহ্ন পিঠে নিয়ে ধুঁকে যায়। এই গল্পের সম্ভাবনা কতদূর?’
‘ততদূর, যতটা আপনি একে নিয়ে যেতে চান। কথকের দায় তার কাহিনিকে বাঁচিয়ে রাখা। শ্রোতা তো উপলক্ষ্য মাত্র। আপনি কি নিজের কাছেও এই গল্প জ্যান্ত রাখবেন না? নাহলে বৃথাই আপনার খুঁড়ে চলা, মিস ভট্টাচার্য।’
‘মাঝে মাঝেই দেখা হয় আপনার সঙ্গে। অদ্ভুত সব কথা বলেন। আগ্রহটা কীসের, বলবেন?’
‘অ্যাগনেস নিজেকে মেডুসা বলত, এটা শোনার পরে আগ্রহ জেগেছিল বলতে পারেন। একটা সাধাসিধে মেয়ে, অল্প বয়েস, সে নিজেকে মেডুসা কেন বলবে?’
‘কারণ, তার লাল চুল ছিল। সে স্কুলে পড়েছিল পুরাণের কাহিনি, হয়তো
‘অথবা, তার রূপে মানুষ পাথর হয়ে যেত। এই ব্যাখ্যাগুলো সেদিন শুনেছি আপনার মুখে, কিন্তু এগুলোই কি যথেষ্ট? আপনার কী মনে হয়? কোনো মানুষের গলায় জন্মগত নীল জড়ুল থাকলে সে নিজেকে মহাদেব বলবে, এটা কষ্টকল্পনা না?”
‘আপনার বক্তব্যটা কী?’
‘এবার আমাকে জঙ্গলের পথ ধরতে হবে, মিস ভট্টাচার্য। রকির খিদে পেয়েছে। দেখুন, কেমন করুণ চোখে তাকাচ্ছে আমার দিকে। আবার দেখা হবে। কালই হতে পারে।’
‘আমি বেশিদিন এখানে নেই।’
‘যাবার আগে তো অবশ্যই দেখা হবে। আসবেন আমার কটেজে। আপনাকে একটা স্পেশাল অ্যাপল পাই খাওয়াব, রেসিপি আমার সিক্রেট।’ রকির পিঠে মৃদু চাপড় মেরে ডান দিকে বেঁকে গেলেন। ‘চলি, মিস ভট্টাচার্য। ভালো থাকবেন।’
দোতলার প্রায়ান্ধকার ঘর। দুটো চেয়ার, তাদের গদি ফাটা। টেবিলে ধুলোর আস্তরণ। তার ওপর রাখা রাজ্যের ওষুধপত্র, লিথোসান থেকে শুরু করে সাইজোডন—বোঝা যায় এই বাড়িতে এক মনোরোগী থাকেন। খাটে হেলান দিয়ে বসে আছেন যে বৃদ্ধা, এই বয়েসেও তাঁর অসামান্য রূপ দেখে বোঝা যায়, অ্যাগনেসের প্রেমে পড়া কত স্বাভাবিক ছিল। ডলোরেস আলো জ্বালালে দেখলাম, মার্গারেটের নাক, চোখ, গালের হাড়, ও চিবুকের নিখুঁত ভাস্কর্য বিগত দিনের গ্রিক দেবীদের মনে করায়। জীর্ণ, ঝুলঝুলে ত্বক, মুখের চামড়া ঝুলেছে, হাত কাপে, তবু মনে হল পোর্ট্রেটের প্রতিমা। চুপচাপ জানালার দিকে তাকিয়ে বসে ছিলেন। ডলোরেস আলাপ করালে হাসলেন, দেখে গণ্ডগোল লাগল না। হিন্দি-ইংরেজি মিশিয়ে কথা বলেন। ‘ডলোরেস বলেছে তোমার কথা। এখানে ঘুরতে এসেছ। আমাদের বাগানে অনেক ফুল হত, জানো! গোলাপ, চন্দ্রমল্লিকা, হাসনুহানা, ডালিয়া, গাঁদা। কলকাতায় নিউ মার্কেটে পাঠাতাম। আমাদের কথা লিখবে?”
‘লিখলে আপনার ভালো লাগবে?’
‘এই যে কটেজ, এটাও কিন্তু ঐতিহাসিক। এক স্কটিশ সাহেব, খাঁটি সাহেব, আমাদের মতো দো-আঁশলা নন, এখানে নিজের বন্দুকের গুলিতে আত্মহত্যা করেছিলেন ১৯৪৩ সালে। তাঁর ভূতকে নাকি তারপরেও অনেকে দেখেছে। হাতে লণ্ঠন নিয়ে ঘুরে বেড়াতেন, গলায় ফুটো। রাতের ট্রেনকে লণ্ঠনের আলো দেখাতেন প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে। এই গল্পগুলো লিখো, নাহলে হারিয়ে যাবে সব।’
‘মনে রাখব। এই জায়গার তো সমৃদ্ধ ইতিহাস।’
‘মুলুকের ইতিহাস।’ মার্গারেট চোখ বুজে ধীরে ধীরে বলতে থাকলেন, যেন মন্ত্ৰ পাঠ করছেন। ‘নির্জন ঢেউ খেলানো অরণ্য পাহাড়। নদীনালায় ভরতি এ অঞ্চলে আবহাওয়া সারাবছর শুষ্ক ও মনোরম থাকত। গঞ্জ, আমাদের মিনি ইংল্যান্ড। গথিক স্থাপত্য। পিয়ানো, ফ্রুটকেক, ওয়াইন গ্লাস। ক্যারলের ঝংকার। টেনিস কোর্ট। গির্জার দেওয়ালে অপূর্ব ফ্রেসকো। সুগন্ধি ফুলের সমারোহ। আমি চোখ বুজলে সিনেমার দৃশ্যের মতো পর পর এগুলো চলতে থাকে!’
‘আমরাও শুনে আসছি এই জায়গার কথা। যেন এক ইউটোপিয়া ।’
‘কিন্তু, ছোটো হয়ে আসছে। সবাই চলে গেল। শুনছি নেটিভরা দখল করে নিচ্ছে বাড়িঘর। হেরিটেজ ভ্যালু নাকি ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে, আমার মেয়ে বলে। ‘
ডলোরেস জানালার ধারে দাঁড়িয়ে ছিলেন। ফিরে বললেন, “কিছু করার নেই, মা! আমাদের টাকা ছিল না।’
ডলোরেসের দিকে তাকিয়ে অসন্তোষে বেঁকে গেল মার্গারেটের ঠোঁট। তাঁকে কুশ্রী লাগল সেই মুহূর্তে। ‘তা বলে পুরোনো সব কিছুকে শেষ করে দিয়ে? তুই অদ্ভুত কথা বলিস, ডল! তোর মায়াদয়া নেই। আমি জানি, চোখ বুজলে বাড়িঘরদোর বেচে দিবি। অবশ্য, অ্যাগনেস বেচতে দেবে না তোকে। এ বাড়ি তার প্রাণ। আজ সকালে দালিয়ার খিচুড়ি খাব বলেছিলাম। ভুলে মেরে দিয়েছিস। তোর শরীরে কবে ভালোবাসা ছিল?’
ডলোরেসের মুখে বিকার নেই। জানালার শিক ধরে বাইরে তাকিয়ে আছেন। ‘অ্যাগনেস কি এখানেই থাকে?’
‘নাহ্, থাকে তো কোথায় যেন একটা। মাঝে মাঝে আসে। আজকাল কমে গেছে আসা। ডল, দিদির একটু খোঁজখবর নিতে পারিস তো। কেমন আছে, কোথায় আছে।’ ‘খুব সুন্দর দেখতে অ্যাগনেসকে।’
হাসলেন মার্গারেট। ‘লোকে বলে, আমার মুখ কেটে বসানো। মাথায় এখনও কী চুল! কোমর ছাপিয়ে যায়। এমন মেয়ে নিয়ে কার গর্ব হবে না, বলুন! ‘
‘আজ আলাপ হল না। পরে একদিন এসে আলাপ করব।’
‘আসবেন। তবে, অ্যাগনেস যে কবে আসে! যেদিন মেজাজ হল, এসে কয়েক ঘণ্টা কাটিয়ে গেল। আবার দিনের পর দিন এলই না।’ বলতে বলতে মার্গারেটের চোখ ঘোলাটে হল। ফুঁপিয়ে উঠলেন রুদ্ধগলায়, ‘কে যে ওকে দূরে সরিয়ে দিল! কতকাল হয়ে গেল, এই বাড়িতে থাকে না ও। আসতে চায়, কিন্তু ভয় পায়। লোকে যদি জেনে যায়, যদি মেরে ফেলে ওকে! ওহ্, শয়তান, শয়তান!’ নিজের বুক চেপে হাহাকার করলেন, ‘যারা ওকে আসতে দেয় না, দূরে সরিয়ে রাখে, তাদের পাপ, পাপ—
ডলোরেস এগিয়ে এলেন। ‘ওষুধ খাবার সময় হল।’ আমাকে চোখের ইশারা করলেন। মার্গারেট খেয়াল করলেন না। মাথা ঝুঁকিয়ে তখন বিড়বিড় করে চলেছেন।
বাইরে বেরিয়ে ডলোরেসকে বললাম, ‘সরি, আমার কথাবার্তা থেকেই হয়তো‘না, না। এরকম প্রায়শই হয়। কোন কথা থেকে যে ট্রিগার করবে কেউ জানে না।’ ‘অ্যাগনেস কি আপনি?”
হাসলেন ডলোরেস। ‘এমনি সময়ে আমাকে পছন্দ করে না। বলে, তার দুর্ভোগের জন্য আমি দায়ী। কিন্তু, মাঝে মাঝে আমাকে অ্যাগনেস বলে ডাকে, কাছে বসিয়ে গায়ে, মাথায়, পিঠে হাত বুলিয়ে আদর করে। বলে এই কটেজ লিখে দিয়ে যাবে বড়োমেয়ের নামে। আমাকে, মানে ডলোরেসকে, কিচ্ছু দেবে না, সে নাকি তার মেয়ে নয়। ওষুধ খাইয়ে মেরে ফেলার চক্রান্ত করছে। আমি চুপ করে শুনে যাই, মাথা নাড়িয়ে হুঁ-হাঁ করি, আদর খাই। মাকে জড়িয়ে চুমু খাই। তারপর মা আবার সেন্সে ফেরে। আমাকে দেখলে ভুরু কুঁচকে যায়। কথা বলে না, গুম হয়ে থাকে। কথা বললেই হরেক অভিযোগ। এই চলছে আজ বছরের পর বছর।’
‘আপনার রাগ হয় না? কষ্ট হয় না?’
‘কার ওপর রাগ করব? তার কি যুক্তি দিয়ে বোঝার ক্ষমতা কোনোকালে ছিল? আজকাল কিছুই হয় না। সত্যি বলতে কী, মায়ের অসুস্থতাতেও যন্ত্রের মতো কাজ করে যাই, বিকার হয় না মনে। তুমি বলবে ঔদাসীন্য। কিন্তু, এটুকু নাথাকলে তো আমিও পাগল হয়ে যেতাম।’
‘আমার বাবা বলত, একটা সময়ের পর সবাইকে ছেড়ে দেওয়া শিখতে হয়। টু লেট গো।’
“ঠিকই বলতেন। আমি ছোটো থেকেই শিখিয়েছি নিজেকে। কীভাবে নিজের আবেগকে কাটছাঁট করতে হয়, ইমোশনাল দূরত্ব তৈরি করতে হয়। ওটা আমার আত্মরক্ষার উপায় ছিল।’
‘মা মাঝে মাঝেই অ্যাগনেসকে দেখেন, না?’
‘আজকাল কমেছে বরং। আগে খুব হত। আসলে মা কখনোই বিশ্বাস করেনি অ্যাগনেস হারিয়ে গেছে। বাবাও দিনে দিনে নীরব হয়ে গিয়েছিল। মা যা বিশ্বাস করত, তাতে প্ৰতিবাদ করেনি। আমি প্রথম প্রথম মা-কে বোঝাবার চেষ্টা করেছি, অ্যাগনেস নেই। তারপর হাল ছেড়ে দিয়েছি।’ আমি আবার অ্যাগনেসের ভূতের কথা তুললাম। ডলোরেস বলছিলেন, তাঁর চেনা কারা কারা দেখেছে। কারোর মত হল অ্যাগনেস সারাদিন লুকিয়ে থাকে জঙ্গলে. রাত হলে বাইরে বেরোয়। খিদে পেলে বনের সাপ, ব্যাং মেরে পুড়িয়ে খায়। তাকে জোহার হালে-তে অনেকে দেখেছে। ডলোরেসদের বাড়িতে কাজ করত একদা রামচরণ, তার ছেলে দেখেছে। এক দুপুর বেলা সাইকেল চালিয়ে ঘরে ফিরছিল, তখন ওর বাচ্চা বয়েস, দেখে দূরে বেথেল মিশনের উঁচু পাঁচিলের ওপর বসে আছে। লাল চুল সাপের মতো হাওয়াতে উড়ছে। সাইকেল থামিয়ে রামনাম জপতে থাকল, তারপর দেখল পাঁচিল থেকে নেমে কোথায় চলে গেল। ‘এত লোক দেখল, তবু আমি তো দেখলাম না! কতদিন বসে থেকেছি এখানে ওখানে, যদি একবার দেখা দেয়।’
হোয়াটসঅ্যাপের ভাইব্রেশনে ফোন খুলে দেখলাম, অ্যারন মেসেজ করেছে। আজ ওর সঙ্গে আমার জোহার হালে-তে রাত্রিবেলা যাবার কথা। কোনো কারণে নয়, তবু রাত্রে জায়গাটা কেমন হয়, এত যে প্রবাদ আর ভূতের গল্প ওটাকে ঘিরে, আমি একবার দেখতে চেয়েছিলাম। সেদিন ওখানে আমার দিকে যে পুতুলটা ছুড়ে মারা হয়েছিল, সেটা এখন আমার টেবিলে বসানো আছে। ভূত হোক বা মানুষ, তার গমনপথে কিছুক্ষণ বসে থাকতে চাই। ‘আজ আসি তাহলে? আবার দেখা হবে, যদি থাকি এখানে।’ ডলোরেসের সঙ্গে আর দেখা হবে কি না জানি না। তবে, অ্যাগনেসের ডায়েরিটা পড়ে শেষ করব এখানে থাকার মধ্যেই। ‘একটা কথা জিজ্ঞাসা করে যাই। যদি কিছু মনে না-করেন। অ্যাগনেস সময় কাটাত কী করে? সেলাইফোড়াই, বই পড়া, রেডিয়ো শোনা, বা, অন্য কিছু?”
‘বইপত্রের ধার দিয়ে ওকে যেতে দেখিনি।’ ডলোরেস হেসে ফেললেন। ‘সেলাই-টেলাই তো কস্মিনকালেও করেনি। ওর সময় কাটাবার উপকরণ ছিল বন্ধুবান্ধব, মূলত ছেলেরা। বাড়ি থাকলে, যখন মাথার ঠিক থাকত আর কি, আমার কানের পোকা খেত নতুন বয়ফ্রেন্ডদের গল্প করে। বাকি সময়টা বাগানের কাজ করত, নয়তো হাঁ করে বসে থাকত,
কল্পনার জাল বুনত। তবে, এসবই ও সুস্থ থাকার সময়ে। মাথা বিগড়োলে, আগেও বলেছি, তখন ও অন্য মানুষ। ‘
ডলোরেসের থেকে বিদায় নিয়ে ডেগাডেগি নদীর রাস্তা ধরলাম। বাগানের বুড়ো পলাশের নীচে গিয়ে আবার বসেছেন ডলোরেস, চলে যাবার সময়ে দেখলাম। সেই চেয়ারে হয়তো রাত অবধি একা একা বসে থাকবেন। কয়েক পা হেঁটে চোখে পড়ল, আলফ্রেড হেমব্রম এগিয়ে আসছেন। গন্তব্য বুঝতে অসুবিধে হবার কথা নয়। আমাকে দেখে মাথা নাড়লেন, কিন্তু তাঁর চোখে প্রশ্ন ছিল। জানালাম, ডলোরেসের সঙ্গে দেখা করে আসছি। জঙ্গলের মধ্যে আমাকে উদ্ধার করেছেন, বললাম সেটাও। আলফ্রেড কথা কম বলেন, তাঁর মুখে শঙ্কার ছাপ দেখলাম। এই লোকটার সঙ্গে ডলোরেসের সম্পর্কের কানাঘুসো শুনেছি, কিন্তু দু-জন গম্ভীর মানুষের প্রেম কীভাবে হয়?
.
