২৮
কারণ এমন গুপ্ত কিছুই নাই, যাহা প্রকাশিত হইবে না ; এবং এমন লুক্কায়িত কিছুই নাই, যাহা জানা যাইবে না ও প্রকাশ পাইবে না ।
– Lukel 8:17
.
বাইরে থেকে গাড়ির আওয়াজ এল। পুলিশের দল। এখন ঘরে বসে আছি আমি, বারবারা, আলফ্রেড হেমব্রম, আর অবিনাশ। জেনিফারকে পাশের ঘরে নিয়ে প্রেশার চেক করা হচ্ছে। অ্যারন বাইরে গেছে হাওয়া খেতে। আমাদের সামনে সোফায় নীরব বসে ডলোরেস। নিমীলিত চোখে যেন গভীর চিন্তায় মগ্ন। হাতে ধরা লাল পরচুলা। সর্বাঙ্গে ক্লান্তির ছাপ।
অক্ষয় আমাকে বাইরে ডাকলেন। ‘কয়েকটা কথা মনে করিয়ে দিচ্ছি। অ্যাগনেস অথবা ক্রিসের কী হল, সেটা আমরা জানতে চাইব স্বাভাবিকভাবেই, কারণ এতদিনের কোল্ড কেস সমাধান হলে সেটার আলাদা মূল্য আছে। কিন্তু, আমাদের মূলত দেখার যেটা, এডওয়ার্ড ব্রাউনকে হত্যার স্বীকারোক্তি ডলোরেস দেন কি না। যতক্ষণ না দিচ্ছেন, আমরা গ্রেপ্তার করতে পারব না। এমনিতে ও সূর্যাস্ত হয়ে গেছে। অন্য থানা থেকে মহিলা পুলিশ আনিয়েছি আমি, কিন্তু তাতে লাভ নেই। আজ রাত্রে বড়োজোর আটক করতে পারি। জেনিফারকে আক্রমণ করলে তা-ও গ্রেপ্তারের গ্রাউন্ড ছিল। কিন্তু, তিনি শুধুই ভয় দেখিয়েছেন, এটা কোনো গ্রাউন্ড নয়। ডলোরেস বলতেই পারেন যে, তিনি ভয় দেখাতে চাননি। কাজেই, আমাদের কনফেশন লাগবে।’
‘কিন্তু, সেটা তো আমার কাজ নয়। কনফেশন বার করতে পারেন আপনারা। সত্যি বলতে, আমি এখনও নিশ্চিত নই যে, ডলোরেসই এডওয়ার্ডকে হত্যা করেছেন।’ অক্ষয়ের কাঁধ ঝুলে গেল। ‘মানে?’
‘শুরু থেকেই আপনাকে বলেছি। এডওয়ার্ড ব্রাউনের হত্যারহস্য লুকিয়ে আছে অ্যাগনেস আর ক্রিসের অন্তর্ধান রহস্যে। সেগুলোকে সমাধান না-করলে এডওয়ার্ডের হত্যার সমাধান হবে না। কিন্তু আমি নিশ্চিত, ডলোরেস জানেন এই সমাধান। তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে আপনারা হত্যাকারীর সন্ধান পাবেন। কিন্তু, তিনিই এডওয়ার্ডকে হত্যা করেছেন কি না, সে-বিষয়ে আমি কিছু জানি না।’
‘তাহলে তো এই মুহূর্তে আমাদের হাতে কিছুই নেই। চল্লিশ বছর আগের কেস রিওপেন করতে গেলে আমাকে কোর্ট থেকে অর্ডার আনতে হবে। আমার ডিপার্টমেন্ট সেটায় আগ্রহী কি না, পরের প্রশ্ন। আমাকে আপাতত তারা প্রশ্ন করবে যে, বর্তমান কেসের কী হল। কনফেশন না হলেও পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্যপ্রমাণ পাওয়া যায় যদি, আমাদের হাতে অন্তত কিছু থাকবে। কিন্তু, এখন আপনার বা আমাদের হাত শূন্য। তাহলে আমরা ডলোরেসকে কোন গ্রাউন্ডে আটক করব?’
‘জেনিফার যদি এফআইআর করেন? সেটা তাঁকে দিয়ে করাবার দায়িত্ব আমার। আপনার পুলিশেরাও আই-উইটনেস আছে। সেক্ষেত্রে আপনি কিছুটা সময় পেয়ে যাচ্ছেন ডলোরেসকে গ্রিল করার।’
অক্ষয় দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। ‘আজ রাত্রের জন্য ডলোরেসকে আমরা তাঁর বাড়িতে পুলিশি পাহারা দিয়ে ডিটেনশনে রাখতে পারি। তাঁর মেডিকাল চেকআপ লাগবে, সেটাকে কিছুক্ষণ দেরি করানো যায়। কিন্তু, কাল ভোরের মধ্যে জেনিফার যদি মুভ না-করেন— ‘আমি দেখছি।’
অক্ষয় পুলিশদের দিকে ফিরলেন। আমি অনুরোধ করলাম, ডলোরেসকে যেন সবাই ঘিরে নিয়ে যায়। রাত হলেও, কৌতূহলী কেউ যদি রাস্তা থেকে মুখ বাড়ায়, তার যেন চোখে না পড়ে কাকে পুলিশ গাড়িতে তুলছে। ডলোরেসকে নিয়ে বেরোল সবাই। ঘর থেকে হেঁটে যাবার সময়ে আমার দিকে তাকালেন। তারপর হাসলেন মৃদু। দাঁড়িয়ে পড়ে বললেন, “থ্যাঙ্ক ইউ।’
‘আপনি জানতেন, আমরা অপেক্ষা করব?’ এই প্রশ্ন করার কারণ নেই। কিন্তু, ডলোরেস ঘাড় ঝুঁকিয়ে নিবিষ্ট চোখে দেখছিলেন আমায়। এই প্রথম তাঁর চোখ সজল লাগল। ঠোট উলটে কাঁধ ঝাঁকালেন, যার অর্থ ‘হ্যাঁ’ ‘না’ দুটোই হয়।
আমার ধাঁধা লাগল। বাধা না-দিয়ে এত শান্তমনে আত্মসমর্পণ করলেন, এখন ধন্যবাদ জানালেন— এগুলো আমার প্রত্যাশার বাইরে। ঠিক করলাম, কাল থানায় গিয়ে এই জট আগে ছাড়াব। এতে কিছু এসে যায় না কারোর। কিন্তু, খচখচানি নিয়ে থাকতে আমার ভালো লাগে না।
ডলোরেসকে নিয়ে পুলিশ চলে যাবার পর অক্ষয় আমার সঙ্গে ঘরে ঢুকলেন। অ্যারন ততক্ষণে এসেছে। আমাকে এবার গল্পটা বলতে হবে। রেভারেন্ড গরম্যান থাকলে ভালো হত। কিন্তু, তাঁকে আনা অসম্ভব। জেনিফারকে দেখলাম এককোনায় বসে আছেন, সিগারেট পাকাচ্ছেন হাতে। পাহারারত এক পুলিশ তাঁকে পরামর্শ দিল থানায় গিয়ে এফআইআরের, কিন্তু অক্ষয় হাত তুললেন। কাল ভোরে গেলেই হবে। পুলিশ দৃশ্যত সন্তুষ্ট নয়, বুঝলাম। তার ওপর অবিনাশ যাদব একজন সন্দেহভাজন, যিনি এখানে বসে আছেন। কিন্তু, অক্ষয়ের কথা অমান্য করার সাধ্য তাদের হবে না। আর, জেনিফারকে দেখে মনে হল না তিনি গল্প শেষ হবার আগে এমনকী বাথরুমেও যেতে চাইবেন।
‘এই কাহিনি বহুস্তরীয়। আমি একবারে এর পুরোটা খুলতে পারিনি। দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পর আস্তে আস্তে জটগুলো উন্মোচিত হয়েছে। তা স্বত্ত্বেও আমি স্বীকার করব, সব উত্তর এখনও আমার কাছে নেই। আমি একটা হাইপোথিসিস দিচ্ছি, যার বিভিন্ন স্তরের কনজেকচারগুলোকে কিছুটা লজিকাল রিজনিং-এর মাধ্যমে পেয়েছি, আর বাকিটা তার এক্সটেনশন হিসেবে অনুমান করেছি। আশা করছি, ডলোরেসের সঙ্গে আগামিকাল কথা বলার পর পুরো ছবিটা পাব। আজ প্রথমে বলি, শুরু থেকে কোথায় ও কীভাবে আমি এগিয়েছিলাম।’ খোলা দরজা দিয়ে হু-হু করে বাতাস ঢুকছিল। জলীয় বাষ্পের গন্ধ ভরা। কয়েক দিনের মধ্যে বৃষ্টি হবে। মাটি থেকে সোঁদা গন্ধ আসছে। মুখে ডিম নিয়ে নালশে পিঁপড়ের দল ফাটা দেওয়াল বেয়ে ওপরে উঠছে।
‘প্রথম যেদিন অবিনাশ যাদব গল্পটা বলেছিলেন, সেদিন আমার দুটো খটকা লেগেছিল। সেকথা এখানে অনেকেই জানেন। প্রথমটা চিরুনি নিয়ে, আর দ্বিতীয় খটকা হল, একজন প্রোটেস্টান্ট যাজক কেন ক্যাথলিক বাণী আওড়াবেন। কিন্তু, এই দুটোর বাইরেও অন্যান্য কয়েকটা প্রশ্ন ছিল যার উত্তর পাইনি। সেগুলো নিয়ে পরে ভাবব বলে ঠিক করেছিলাম। প্রশ্নগুলো হল—রেভারেন্ড গরম্যান বলেছিলেন তাঁর জন্য তিনটে জীবন নষ্ট হল। সেই তিনজন কারা? সেদিন সন্ধেবেলা পুলিশ আসার সময় থেকেই তিনি কেন ভাবতে শুরু করলেন যে, ক্রিসকে পাওয়া যাবে না? সেদিন খোঁজাখুঁজির সময়ে কেউ একজন দোতলার জানালা দিয়ে চেঁচিয়ে বলেছিল যে, গেট দিয়ে কেউ বেরিয়ে গেল। কে চেঁচিয়েছিল? তার খোঁজ পাওয়া যায়নি।
‘এরপর কথাবার্তার মাধ্যমে আমি অ্যাগনেসের খোঁজ পেলাম। তখন জানতে পারলাম যে, সে নাকি মাথাপাগলা মেয়ে ছিল। কেন মাথাপাগলা? কারণ, মাঝে মাঝে রেগে যেত, এর-ওর সঙ্গে মারপিট করত, থুথু ছেটাত, গালাগালি দিত—এসব। এই ভার্সনকে আমি শুরু থেকে সন্দেহ করে আসছি। শুধুমাত্র এটুকুর জন্য একটা মেয়েকে উন্মাদ বানিয়ে দেওয়া যায় নাকি? মানে, আমাদের স্কুলবেলায় হয়তো সবারই এরকম সহপাঠী ছিল যার মাথাগরম, কথায় কথায় হাত চালিয়ে দিত, মুখ খারাপ করত। তাদের আমরা খেপাতাম হয়তো, সেটাও যথেষ্ট খারাপ কাজ করতাম, কিন্তু, তা বলে “পাগল” বলে দাগিয়ে দিতাম না তাদের। এখানে অ্যাগনেসের পাগলামির অন্য সাক্ষ্য আছে কি? নেই। কিন্তু, তাকে আমরা পাগল বলছি, তার কারণ কি এটাই যে, তার মা সত্যিই উন্মাদ, তাই আমরা বিশ্বাস করি যে, সেই উন্মাদনা মেয়ের মধ্যেও এসে পড়বে? সত্যি বলতে কী, আমি যাকেই জিজ্ঞাসা করেছি অ্যাগনেসের ব্যাপারে, তারাই বলেছে যে, তারা শুনেছে অ্যাগনেস পাগল। তারা নিজেরা কি প্রমাণ পেয়েছে? ওই—বড়োজোর মারামারি, চুল ছেঁড়াছেড়ি, ঝগড়া, রেগে যাওয়া—এইমাত্র। এটুকু হয়তো তারা দেখেছে। তাদের কাছে আগে থাকতে এই তথ্য ছিল যে, অ্যাগনেসের মা পাগল। এরপর কেউ যদি তাদের জানায় যে, অ্যাগনেসেরও মাথা খারাপ, তাহলে সেকথাকে অবিশ্বাস করার কারণ নেই। কিন্তু আমি বাইরের মানুষ, যার কাছে প্রায়র নলেজ কিছুই নেই। তাই হয়তো আমি নৈর্ব্যক্তিকভাবে দেখতে পারি। আমার প্রথম সন্দেহ হল প্রচলিত ভার্সনে। তাই আমি সবাইকে জিজ্ঞাসা করে বেড়াতাম, অ্যাগনেস কে ছিল, এই আশায় যে, কেউ যদি আমাকে অন্যরকম কিছু বলে।
‘একই কথা অ্যাগনেসের পুরুষসঙ্গ নিয়েও। জেনিফার, তার পরে ডলোরেস, আরও স্থানীয় মানুষদের কেউ কেউ আমাকে জানিয়েছিলেন যে, অ্যাগনেসের নাকি বহু প্রেমিক ছিল। এখানেও কি তাহলে লোকশ্রুতি? এখানে অবশ্য আমি ভাগ্যবান। অন্তত আলফ্রেড ছিলেন যিনি সজোরে এমন গুজবকে নাকচ করে দিয়েছিলেন। তখন আমার মনে হল, যদি অ্যাগনেসের পাগলামি তার প্রেমিকের সংখ্যার মতোই গুজব হয়?’
‘কিন্তু অ্যাগনেসের মাথায় যে গণ্ডগোল ছিল, আমরা সেটা ছোটোবেলা থেকে জেনে এসেছি।’ ভুরু কুঁচকে বললেন আলফ্রেড।
‘কার থেকে জেনেছিলেন?”
‘এতদিন পর কি মনে আছে—,’ বিপন্ন মুখে আলফ্রেড বললেন। ‘সবাই বলত তো।’ ‘কিন্তু, আপনি নিজে কিছু দেখেননি। বারবারা, জেনিফার, অবিনাশ, সবাই বলেছেন যে, অ্যাগনেস নাকি উন্মাদ ছিল। এবং, সবাই অন্যের থেকে সেই কথা শুনেছেন। কার কাছ থেকে শুনেছেন? একটাই নাম ঘুরে-ফিরে এসেছে। ডলোরেস। ডলোরেস দিদিকে নিয়ে কান্নাকাটি করত। ডলোরেস পুলিশের কাছে স্টেটমেন্ট দিয়েছিল। ডলোরেস আলফ্রেডের কাছে এ ব্যাপারে গল্প করেছিল। সর্বত্র এই একটাই নাম কেন আসছে, এটা আমাকে ভাবিয়েছিল। যাই হোক, এই প্রসঙ্গে পরে আসছি।
‘দ্বিতীয় খটকা যেটা লেগেছিল, তা হল, অ্যাগনেস যেদিন নিখোঁজ হয়, সেদিন সে সানগ্লাস পরে ছিল। ডলোরেস জানিয়েছেন। কিন্তু জেনিফার বলেছিলেন, আমিও পরে চেক করে দেখেছি, সেদিন ছিল মেঘলা। বৃষ্টি পড়ছিল টিপটিপ করে। এমন দিনে কেন কেউ সানগ্লাস পরবে?
“তৃতীয় খটকা হল, ব্রাউনদের বাড়ি থেকে অ্যাগনেসের যে চিঠি পাওয়া গিয়েছিল, সেখানে সে কিছু কনফেস করতে গিয়েছিল। অন্তত সবাই তাই বিশ্বাস করে। আমি কিছুতেই যেটা মেলাতে পারছিলাম না, অ্যাগনেস কেন চিঠি লিখে কনফেস করবে? সে নিষ্ঠাবান ক্যাথলিক ছিল বলে শুনেছি। তার তো চার্চে যাবার কথা। দ্বিতীয়ত, যদি কনফেশন চিঠি লিখেও করে, নিজের বাড়িতে না-লিখে ব্রাউনদের বাড়িতে লিখবে কেন?
‘চতুর্থ খটকা লেগেছিল যেটা, টাউনের অনেকে বলে অ্যাগনেসের ভূতকে দেখেছে। কিন্তু, তারা কি কাছ থেকে দেখেছে? আমি কাউকে পাইনি যারা সামনাসামনি অ্যাগনেসের ভূত দেখেছিল। সবাই দেখেছে দূর থেকে। মনীষা দূর থেকে দেখেছেন, সে কবরখানায় বসে চুল আঁচড়াচ্ছিল। কিটি গোমসের মেয়ে তাকে পেছন থেকে দেখেছে, শনাক্ত করেছে লাল চুল দিয়ে। সমর দোসাদ দেখেছেন জোহার হালেতে-হ্যাঁ, নীচ থেকে। অ্যাগনেস একটা ঢালের মাঝামাঝি দাঁড়িয়ে ছিল। দু-জনের মধ্যে বেশ অনেকটা দূরত্ব ছিল। এরকমই অন্যান্যরাও। ফলত, যাকে দেখেছে সে অ্যাগনেস কি না, কী করে বোঝা যাচ্ছে? লোকে বলেছে, লাল চুল ও ধাঁধানো নীল চোখের কথা। আমার অবাক লেগেছিল, অতদূর থেকে নীল চোখ বুঝল কী করে? তাহলে কি এখানেও গুজব? যদি এমন হয় যে, অ্যাগনেস সেজে কেউ ঘুরে বেড়ায়, আর মানুষ ভূতে বিশ্বাস করতে চায় বলে বিশ্বাস করে?’
‘না, আসলে অ্যাগনেসের ভূত প্রতি গুড ফ্রাইডেতে আসে তো—,’ মিনমিন করে বললেন জেনিফার। বারবারা তাঁকে এমন দৃষ্টি হানল যে, আবার গুটিয়ে গেলেন। অক্ষয় হাল ছেড়ে দেবার ভঙ্গিতে মাথা নাড়লেন এবার।
‘মিস ভট্টাচার্য, আমি অ্যাগনেস বা ক্রিসের গল্প শুনছি ব্যক্তিগত ইন্টারেস্ট থেকে। কিন্তু, ডিপার্টমেন্টের অন্য কারোর আগ্রহ নেই। আপনি যেটা বুঝতেই চাইছেন না, একটা পুরোনো কেস সমাধানের পেছনে আমরা সারারাত খরচ করতে প্রস্তুত না। আমি প্রস্তুত, অন্যেরা নয়। একটু পরেই আমার কাছে ফোন আসবে, ডলোরেসকে নিয়ে কী করা হবে। আপনি কিছুটা সূত্র আমার হাতে এখন না-দিলে আমি নিরুপায়। সেক্ষেত্রে এই কেস গুটিয়ে দিতে হবে।’
কয়েক সেকেন্ড ভাবলাম, তারপর ইশারায় অক্ষয়কে বললাম বাইরে আসতে। বারান্দায় দাঁড়িয়ে তাঁকে বললাম, ‘মনীষা গরম্যানকে আত্মহত্যায় প্ররোচনা দেওয়ার অভিযোগ কি যথেষ্ট হবে আপনাদের কাছে?’
অক্ষয়ের চোখ সরু হল, ‘কীরকম?’
‘ক্রিসকে দেখানো দূর থেকে। আপনি জানেন এটাও ধোপে টিকবে না। আমি আজকের রাতের কয়েক ঘণ্টার জন্য বলছি।’
অক্ষয় দূরে গিয়ে ফোনে কথা বলছিলেন। সেই ফাঁকে একটা সিগারেট শেষ করলাম। অ্যারন আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল। ও বুঝছিল, এর পর কী হতে পারে। তাই আমাকে দেখে যাচ্ছিল সন্ধানী দৃষ্টিতে। থাকতে না-পেরে বললাম, “তোমার তো কিছুতে কিছু এসে যায় না, যেরকম নৈরাশ্যবাদী তুমি।’ তাতে অ্যারন বলল, ওর ভয় যে, আমি ওর মতো সিনিক এখনও হতে পারিনি। আমি মাঝে মাঝেই কেন যে ওর চোখের দিকে সোজাসুজি তাকাতে পারি না! মুখ ঘুরিয়ে উত্তর দিলাম, ‘আমি বাইরে থেকে দেখছি, ফলে আমাকে কিছুই প্রভাবিত করবে না।’ অ্যারন আর কিছু বলেনি। ফোন শেষ করে ফিরে এলেন অক্ষয়। আমরা ভেতরে ঢুকলাম।
‘এরপর আমার কাছে অ্যাগনেসের ডায়েরি আসে। কিন্তু, সেটা পড়ার আগে এখানে একটা দুর্ঘটনা ঘটে। মনীষার মৃত্যু—আপনারা জানেন, আমাকে অনেকেই দোষী সাব্যস্ত করেছিলেন। আমারও চলে যাওয়া বাদে অন্য উপায় ছিল না। একদিক দিয়ে সুবিধে হয়েছিল যে, রহস্য সমাধানের ডেডলাইন আমার ঘাড়ে ছিল না। প্রায় তিন বছর ধরে আমি অ্যাগনেসের ডায়েরি পড়েছিলাম, বার বার ঘুরে-ফিরে। পড়বার পরে আমার বিশ্বাস দৃঢ় হয় যে, অ্যাগনেস পাগল ছিল না। হয়তো উদ্ভট ছিল, হয়তো তার কিছু অনুভূতি প্রখর ছিল যা ট্রিগার্ড হত সহজে, কিন্তু তার উন্মাদনা একটা রটনামাত্র, পরিকল্পিত রটনা। আমার ধারণা অ্যাগনেসের প্রতি অনুরক্ত ছিল যে মুন্না, সেও বুঝেছিল এই কথা। তাই আলফ্রেড যখন তাকে জানিয়েছিলেন যে, অ্যাগনেস পাগল, মুন্না অদ্ভুতভাবে জিজ্ঞাসা করেছিল, “তাই?’ আর কিছু বলেনি যদিও।
‘আমি কীভাবে এরকম সিদ্ধান্তে এলাম? কারণ, ডায়েরির লেখা দেখে মনে হয় না একজন উন্মাদ লিখেছে। ক্রিপটিক লেখা, হ্যাঁ। অনেক জায়গাতেই যেন হেঁয়ালি আছে। কিন্তু যার মাথা খারাপ, সে এত উপমা দেবে না। বাইবেল থেকে অর্থবহ উক্তিগুলো তুলে আনবে না। মনে রাখতে হবে, অ্যাগনেস পড়াশোনায় ভালো ছিল না। তার বয়েসও ছিল কম। কিন্তু, সে বাইবেলের ক্লাস মন দিয়ে করত। তার লেখার ধরনও হয়তো বাইবেল থেকেই প্রভাবিত ছিল—কাব্যিক, ধাঁধালো, গম্ভীর। কিন্তু, পাগলামি? কিছুতেই নয়। ডায়েরির যে লেখাটা পড়ে আমি প্রথম অ্যাগনেসের মস্তিষ্কের সুস্থতা সম্পর্কে নিশ্চিত হই, সেটা ১৯৮৬ সালের এপ্রিল মাসের এন্ট্রি। অ্যারন আর বারবারাকেও পড়তে দিয়েছিলাম। আরেকবার আপনাদের সকলের সামনে সেটাকে রাখছি।’
খুব শীত পড়েছে এখানে। আমরা সবাই কাঁপছি। আমাদের কুঁড়েঘরের চাল থেকে বরফ পড়বে এবার। আর্থার ঠান্ডায় হুঁ হুঁ কাঁদছে। ধরে নাও ডল লিখেছে। মুখ ভার সকলের। একমাত্র হাসিমুখে আছে ডল, কারণ ও হাসার সময়ে কাঁদে আর কাঁদার সময়ে হাসে। ডল একটা পাগল! আমি সারাজীবন ওর দিদি হয়ে থাকব। ওর হাত শক্ত চেপে ধরে। ওকে কোথাও একা ছাড়ব না। ও তো জানে না, বাইরের পৃথিবী কী দয়ামায়াশূন্য! কিন্তু, ও কি আমার বোন হয়ে থাকতে চায়? যদি না চায়, তাহলে বোনের অর্ধেকটা বরং ছেড়ে দেব।
‘হিন্দিতে লেখা। এপ্রিল মাসে শীত পড়ে না। বিহার ঝাড়খণ্ড তখন গরমে জ্বলে। অ্যাগনেসদের বাড়ি কুঁড়েঘর নয়। বরফ পড়ার তো প্রশ্ন নেই। তাহলে অ্যাগনেস এরকম কেন লিখল? আমি আবার পড়লাম, বার বার পড়লাম। একসময়ে চোখ আটকে গেল পঞ্চম বাক্যে। “ধরে নাও ডল লিখেছে।” ডল কী লিখেছে? আগের চারটে বাক্য? আচ্ছা, ধরে নিলাম ডল এই চারটে বাক্য লিখেছে। কেন লিখতে গেল এরকম? অ্যাগনেস তার পরে বলছে, ডল কাঁদার সময়ে হাসে আর হাসার সময়ে কাঁদে। মানে, যখন যা পরিস্থিতি, ডল তার বিপরীত প্রতিক্রিয়া দেয়। তাহলে কি সেটা লেখাতেও? শীতের বদলে গরম। কুঁড়েঘরের বদলে দোতলা বাড়ি। বরফের বদলে হয়তো ঠা-ঠা রোদ। তাহলে অর্থ দাঁড়াচ্ছে। অ্যাগনেস নিজের মতো করে ধাঁধা বানিয়েছে—ডল যদি লিখত তাহলে অ্যাকচুয়াল পরিস্থিতিকে এভাবে বর্ণনা করত। নাউ ইট মেকস সেন্স। আর্থার বাদে বাকিটুকু বুঝতে আর কষ্ট হয় না। স্নেহশীল দিদির হৃদয়কে পড়তে পারি। কিন্তু, একদম শেষবাক্যে এসে আবার হোঁচট খাই। বোনের অর্ধেকটা ছেড়ে দেবে, এ কেমন কথা? আবার আটকে গেলাম অনেকগুলো দিন। তারপর হঠাৎ মনে হল, শুরুর বাক্যগুলোকে আক্ষরিক অর্থে পড়েছি। শুধু সোজার বদলে উলটো অর্থে। এবারের বাক্যটাকে— এটা তো আর ডল নয়, বরং অ্যাগনেস লিখছে— সোজা অর্থে একদম আক্ষরিক ধরি যদি? তখন আমি অর্থ খুঁজে পেলাম। কী পেলাম, তা পরে বলছি। কিন্তু, তখন আমি নিশ্চিত হলাম যে, অ্যাগনেস মানসিকভাবে সুস্থ ছিল। সেটাকে ধরে আমি একটা গল্প দাঁড় করালাম। কিছু জায়গায় ভুল ভেবেছিলাম, সেগুলো অ্যাগনেসের মা মার্গারেটের সঙ্গে কথা বলার পর সংশোধন করেছি। আমি আপনাদের গল্পটা বলব। তার ফাঁকে ফাঁকে বলে যাব, কীভাবে আমার সিদ্ধান্তে পৌঁছেছি।
‘মাইকেল আর মার্গারেটের দুই মেয়ে, অ্যাগনেস ও ডলোরেস। অ্যাগনেস ছোটো থেকে অসামান্য সুন্দরী। সে মায়ের রূপ পেয়েছিল। ডলোরেস সেরকম ছিল না ছোটোবেলায়। সে সাধারণ দেখতে একজন মেয়ে ছিল। সে বার বার দিদির মতো হতে চাইত, যাতে অন্যদের নজর তার ওপর পড়ে। কিন্তু কেউ তাকে দেখত না, সে যেন অদৃশ্য। সকলের মনোযোগের কেন্দ্রে ছিল অ্যাগনেস। মার্গারেটও সম্ভবত অ্যাগনেসকে বেশি ভালোবাসতেন। হয়তো নিজের অসুস্থতার সময়ে ডলোরেসকে বলতেন, সে কেন অ্যাগনেসের মতো হল না। একটা বাচ্চা মেয়ে এগুলোর মুখোমুখি হলে তার ভেতর প্রবল হিংসে জন্ম নেয়। ডলোরেস ব্যতিক্রম ছিল না। সে দিদিকে হিংসে করত। সেখান থেকে জন্ম নিয়েছিল ব্যাখ্যাহীন ঘৃণা। কিন্তু, ওই বাচ্চা বয়েসের ঘৃণা কতদূর যেতে পারে? বড়োজোর দিদির নামে নালিশ করে বাবাকে দিয়ে দিদিকে মার খাওয়ানো? অথবা, লাঠিতে সাপ তুলে জুতোর ভেতর রেখে দেওয়া? অন্য বাচ্চাদের ক্ষেত্রে হয়তো সেটুকুতেই ব্যাপারটা সীমাবদ্ধ থাকত। কিন্তু, ডলোরেস ঠিক সাধারণ বাচ্চা ছিল না।
‘ডলোরেসের ওপর আমার প্রথম সন্দেহ, ঠিক সন্দেহ বলব না, বলা যাক খটকা, শুরু হয় তিন বছর আগে এখানে থাকার সময়। সবাই বলছে, আর ডলোরেস নিজেও নিজেকে দেখাচ্ছেন, যেন সর্বত্যাগী আত্মা, যিনি সারাজীবন সাফার করে এলেন। কিন্তু, কথার ফাঁকে সুচতুরভাবে জানিয়ে দিতে ভুলছেন না, দিদির উন্মাদনা বা চরিত্রদোষের আখ্যান। আগেই বলেছি, অ্যাগনেস যে পাগল তার কোনো প্রমাণ কেউ দেখাতে পারেনি, ডলোরেসও নয়। কিন্তু, বার বার বলে যাচ্ছেন একই গল্প। তাতে সত্যি বলতে কী, অস্বাভাবিক তেমন কিছু ছিল না, একটা জিনিস বাদে। বাইরের লোক অ্যাগনেসের উন্মাদনা বিষয়ে যা বলেছে, ডলোরেসের ভার্সনও তাই—চিৎকার করা, মারামারি করা, গাছে চড়ে বসে থাকা, এসব। কিন্তু, একটা বাড়তি কথা বলেছিলেন ডলোরেস—সন্ধেবেলা বা রাত হলে অ্যাগনেসের ছেলেবন্ধুরা ওকে পৌঁছে দিত। ডলোরেস দেখতেন গেট খুলে ঢোকার সময়ে হাসতে হাসতে ঠোঁটের লিপস্টিক হাত দিয়ে মুছে ফেলছে অ্যাগনেস। আমার খটকা লেগেছিল, কারণ বারবারার কথা থেকে জেনেছিলাম যে, অ্যাগনেস এসব কসমেটিক্স ব্যবহার করতে ভয় পেত— তার মা জানলে নাকি অশান্তি হবে। এমনকী, সে যখন স্কুল পেরিয়ে কলেজের দোরগোড়ায়, তখনও তার গালে ক্রিম ঘষে দেওয়ায় সে ভয় পেয়েছিল। মনে রাখতে হবে যে, এই বয়েসেই অ্যাগনেস নিখোঁজ হয়ে যায়, মানে, স্কুলের উঁচু ক্লাসে। মানে তার বড়ো হওয়া পর্যন্ত সে কসমেটিক্স ব্যবহার করত না বলে বারবারার সাক্ষ্য। সেক্ষেত্রে ঠোঁটের লিপস্টিক অ্যাগনেস মুছছে, সেটা অস্বাভাবিক লাগছিল আমার। আচ্ছা, এমন কি হতে পারে যে, সে হয়তো লুকিয়ে, যখন বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করতে যেত, তখন এগুলো ব্যবহার করত? কিন্তু, তাহলে বারবারা তার গালে ক্রিম ঘষে দেওয়ায় তো ভয় পাবার কথা নয়, কারণ তখন মায়ের চোখে পড়ার ব্যাপার নেই। নাকি, বারবারার স্মৃতি কাজ করছে না? নানা সম্ভাবনা খতিয়ে দেখতে গিয়ে আমার মনে হল, ডলোরেসের কথাগুলোকেই-বা চোখ বুজে মেনে নেবার কারণ কী? উলটে, এটাই যদি ডলোরেসের পদ্ধতি হয়? হয়তো টাউনের সবাইকে এভাবেই বলে গেছেন, আর লোকে বিশ্বাস করেছে যে, অ্যাগনেস পাগল অথবা অসংযত চরিত্রের? অন্তত তার বোনের ভার্সন তো ফেলে দেবে না কেউ। আমি বারবারার সঙ্গে, জেনিফারের সঙ্গে, আলফ্রেডের সঙ্গে, অন্য সবার সঙ্গেই যখন কথা বলেছিলাম, সকলের বক্তব্যে একটা জিনিস কমন ছিল। ডলোরেস নাকি কান্নাকাটি করত—দিদির মাথা খারাপ, তার পুরুষবন্ধুদের সামলানো যাচ্ছে না, এসব। মানে, ডলোরেসের থেকে তারা শুনেছে এসব। তাহলে কি ডলোরেসই সেই মানুষটা, যে এই গুজবের উৎসে? কিন্তু, কেন সে এমন করবে? দিদির চরিত্রদোষ সে দিতে পারত, কারণ ছেলেবেলাতেও যৌন ঈর্ষা মারাত্মক হয়। বিশেষত, অ্যাগনেস যেখানে সুন্দরী এবং ডলোরেস অসুন্দরী। কিন্তু, পাগল বলে রটাবে কেন? সেটা কি এই কারণে যে, অ্যাগনেসের মাথাগরম ছিল? নাকি, এই কারণে যে, তাদের মায়ের ইতিহাস মানুষ জানত বলে এই রটনাকে সহজে বিশ্বাস করবে? কিন্তু, তাতে তো অ্যাগনেস উলটে মানুষের সহানুভূতিই পেয়ে যাবে। তা দিয়ে ডলোরেসের লাভ কী?
‘তিন বছর আগে এই টাউন ছেড়ে চলে যাবার পর অনেকদিন ভাবছিলাম এটা নিয়ে। মনে হচ্ছিল, আমি হয়তো ঝোপেঝাড়ে বাঘ দেখছি। আসলে, ডলোরেসকে অবিশ্বাস করবার কারণ নেই। তারপর আবার মনে পড়ে গেল, অ্যাগনেসের ডায়েরির এন্ট্রি। ডল কাঁদার সময়ে হাসে আর হাসার সময়ে কাঁদে। কেন ডল এরকম করে? এরকম কারা করে? যাদের বোধ নেই, তারা? যারা উন্মাদ, তারা? আচ্ছা, ডল যদি এই ব্যবহার সর্বত্রই প্রয়োগ করে? যদি সে ঠাঠা গরমকে বলে শীত, অ্যাগনেসের দাবি অনুযায়ী, তাহলে কি সে সুস্থকে উন্মাদ এবং উন্মাদকে সুস্থ বলতে পারে? তাহলে, অ্যাগনেস আসলে সুস্থ এবং ডলোরেস উন্মাদ? যেদিন এটা আমার মাথায় এল, ঝটকা খেয়েছিলাম বলতে পারেন। বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। তারপর ধীরে ধীরে ভাবতে শুরু করলাম। মায়ের উন্মাদনা মেয়ে পেতে পারে। কিন্তু, আমরা সবসময়েই বড়োমেয়ের পাবার কথা ভেবেছি। ছোটোমেয়ের দিকে তাকাইনি—এখানেও ডলোরেস অবজ্ঞাত থেকে গেছেন। কিন্তু, ডলোরেসের মস্তিষ্কের সমস্যা হওয়া খুব কি অস্বাভাবিক ছিল? মাইকেলরা মানুষজনের সঙ্গে মিশতেন না বেশি, অন্যদের বাড়ি যেতেন না। ফলে, ডলোরেসের মধ্যে উন্মাদনা থাকলে, সেটা যদি শুরুর বছরগুলোতে সামান্য হয় এবং নিয়ন্ত্রণে রাখার অবস্থায় থাকে, তাহলে তার হদিশ বাইরের লোক না-ও পেতে পারে। মনে রাখতে হবে, মার্গারেটও কিন্তু সারাবছর অসুস্থ থাকতেন, এমন নয়। মাঝে মাঝে তাঁর ফিট হত।
‘কিন্তু, ডলোরেস যে সত্যিই মানসিকভাবে অসুস্থ, তার প্রমাণ কই? এখানে দুটো জিনিস আমার অনুমানের সপক্ষে প্রমাণ হিসেবে কাজ করল। প্রথমটা ছিল একটা বড়ো খটকা। ডলোরেসের সঙ্গে দেখা হবার দিন থেকে এটার কথা আমার মাথায় ছিল, কিন্তু উত্তর পাচ্ছিলাম না। বারবারা, তোমার মনে আছে, অ্যাগনেস ডলোরেসের হাতে ফাউন্টেন পেন দিয়ে আঘাত করেছিল? ডলোরেস সেই ক্ষতচিহ্ন দেখিয়েছিলেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, অ্যাগনেস তাঁর মুখোমুখি বসে ছিল সেই সময়টায়। কবজির চামড়ায়, যেদিকে শিরাগুলো দৃশ্যমান থাকে, সেখানে ক্ষতচিহ্নের নীচে ছিল একটা গর্ত যেখানে পেন গেঁথেছিল, তারপর সোজাসুজি টেনে দেয়। তার মানে, টেনেছিল নীচ থেকে ওপরে, মানে, হাতের তালুর অভিমুখ থেকে কনুইয়ের অভিমুখে। এবার, আমি যদি কারোর সামনে বসে একটা পেন বা ছুরি দিয়ে তার হাতে এরকম আঘাত করি, তাহলে একশোবারের মধ্যে অন্তত পঁচানব্বইবার আমি পেন টানব ওপর থেকে নীচে। নীচ থেকে ওপরে কখন আমি টানব? যখন আমি নিজে আমার হাতে আঘাত করছি। যারা হাতের শিরা কেটে আত্মহত্যা করে, তারাও নীচ থেকে ওপরে ব্লেড টানে। কিন্তু, অপরপক্ষের হাতে আঘাত করতে গেলে অভিমুখ উলটে যায়। বলা যেতে পারে, এই ক্ষতচিহ্নটা দেখার পর থেকেই ডলোরেস বিষয়ে আমার খটকা সন্দেহের রূপ নিতে শুরু করে। তাহলে কি অ্যাগনেস নয়, ডলোরেস নিজেই নিজের হাতে আঘাত করে দিদির ওপর দোষ চাপিয়েছিল? এটাকে কিন্তু উন্মাদনা ধরা যেতে পারে। সুস্থ মানুষ এতদূর যাবে না। ফলত, আমি আবার অ্যাগনেসের ডায়েরিতে ফিরে গেলাম।
‘এক জায়গায় অ্যাগনেস লিখেছিল— আমার কষ্ট হয় ডলের জন্যে। মায়ের জন্য ও সারাজীবন ভুগবে। আমি শুনেছি, একজনের পাগলামি থেকে তার ভাই, বোন আর ছেলে, মেয়ে সবাই সাফার করে। এই লেখাটা আমরা শুরু থেকে পড়ে আসছি এভাবে যে, ডলোরেসকে মায়ের ভার নিতে হবে আর সে সাফার করবে। কিন্তু, মার্গারেটের উন্মাদনা ডলোরেসের ভেতর সঞ্চালিত হবে, এবং তার জন্য ডলোরেস সাফার করবে, এভাবেও পড়া যায়। এটাই কি সঠিক পাঠ? এক-একটা টেক্সট বহুবিধ ইশারা পাঠায়, আমরা জানি। তার ভেতরকার মেটাফরগুলোকে বিচ্ছিন্ন করা সম্ভব হয় না সবসময়। আরেক জায়গায় লিখেছে— ডল কেন এরকম? কেন ও অবোধ আর বিশুদ্ধ হৃদয়? এভাবে বাঁচবে না। ওকে পাপ চেনাতে হবে। ও কি পাপী হবে? একই জলের উৎস থেকে কি মিষ্টি ও তেতো, দু-রকম জল বের হতে পারে? জল যদি তেতো হয়, ডলকেও তেতো হতে হবে। সেটাই কি হয়নি? অ্যাগনেস ডলকে অবোধ বলছে, বলছে বিশুদ্ধ হৃদয়, কারণ উন্মাদ মানুষদের পাপ থাকে না। তারপর বাইবেলের রেফারেন্স, জলের উৎস। জল যদি ডলোরেস আর অ্যাগনেস হয়, উৎস তাহলে মার্গারেট। উৎস উন্মাদ হলে তার মেয়েদেরও উন্মাদ হতে হবে। জল যদি তেতো হয় ডলকেও তেতো হতে হবে। তারপর অ্যাগনেস লিখছে যে, ডল সেটাই হয়েছিল। প্রথম যে এন্ট্রিটার কথা এখানে বললাম, যেখানে গরমকে ঠান্ডা বলা হয়েছে, সেখানে অ্যাগনেস লিখেছে— ডল একটা পাগল! আমি সারাজীবন ওর দিদি হয়ে থাকব। ওর হাত শক্ত চেপে ধরে। ওকে কোথাও একা ছাড়ব না। ও তো জানে না, বাইরের পৃথিবী কী দয়ামায়াশূন্য! স্নেহশীলা দিদি? অবশ্যই! কিন্তু ‘ডল একটা পাগল’, এই বাক্যকে আক্ষরিক অর্থে পড়া হয় যদি? তাহলে বোঝা যেতে পারে, কেন অ্যাগনেস ওকে একা ছাড়বে না। কারণ, উন্মাদ ডল জানে না বাইরের পৃথিবীকে। তার দায়িত্ব তাই অ্যাগনেসকে নিতে হবে।
.
‘দ্বিতীয় যে জিনিসটা আমার অনুমানকে দৃঢ় করেছিল, তা হল মার্গারেটের ঘরে থাকা ওষুধ। অনেক ওষুধের ভেতর লিথোসান আর সাইজোডন ছিল। সাইজোডন সিজোফ্রেনিয়ার ওষুধ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। মার্গারেটের সিজোফ্রেনিয়া ছিল, তিনি নিজের মৃত দাদার সঙ্গে কথা বলতেন। কিন্তু, লিথোসান ব্যবহৃত হয় বাইপোলার ডিজঅর্ডারের ওষুধ হিসেবে। মার্গারেটের বাইপোলারিটি ছিল না। তাঁর প্রেসক্রিপশনে এরকম কিছুর উল্লেখ নেই। প্রেসক্রাইব করা ওষুধের লিস্টেও লিথোসান নেই। তাহলে লিথোসান কার জন্য? এই বাড়িতে থাকেন দু-জন। মার্গারেটের ওষুধ না হলে, ডলোরেসেরই হবার কথা। পেন দিয়ে নিজের হাতে আঘাত করার মতো সেলফ হার্ম বাইপোলারিটির উপসর্গ হয়। সেক্ষেত্রে ডলোরেসের অসুস্থতা বিষয়ে আমার অনুমান ভুল না-ও হতে পারে।
‘এখানে ফিরে আসার আগে এই অবধি আমি ধারণা করে ফেলেছিলাম। কিন্তু, শুধু এটুকু দিয়ে ডলোরেসের দোষ প্রমাণ করা সম্ভব নয়। তিনি উন্মাদ হতেই পারেন। তাতে কার কী?’
‘মাই গড!’ বিড়বিড় করলেন জেনিফার। ‘এটা আমি কেন এতদিনে জানতে পারিনি?’ ‘জানলে কী করতে বুড়ি? কেচ্ছা করতে আবার?’ বারবারা তাকে খেঁকিয়ে আমার দিকে ফিরল। ‘ক্রিসের কী হল, আগে বলো।’ অ্যারন তার হাতে চাপ দিল। এই মুহূর্তে অ্যারনের বারবারার কাছ ঘেঁষে থাকা দরকার।
‘কিন্তু, আমি ডলোরেসের ভেতর উন্মাদনা দেখিনি। শহরের মানুষ কেউই দেখেনি। এতটা লুকিয়ে রাখা সম্ভব নয়।’ বললেন আলফ্রেড। ‘কোথাও ভুল হচ্ছে না তো?”
‘আসছি সে-প্রসঙ্গে। আগে গল্পে ফিরি। ডলোরেস তার উন্মাদনার মুহূর্তগুলোয় দিদিকে দায়ী করত। বাবাকে দিয়ে দিদিকে মার খাওয়াত। উন্মাদনা কাটত যখন, ঠান্ডামাথায় প্ল্যান করত, কীভাবে অ্যাগনেসের ক্ষতি করা যায়। সে বিশ্বাস করতে ভালোবাসত যে, সে সুস্থ আর দিদি উন্মাদ। বিশ্বাস করত কথাটা হয়তো ভুল বললাম। ডলোরেস দিদির মতো হতে চাইত। শুধু দিদির রূপ নয়, দিদির সুস্থতাও কামনা করত সে। তাই বাইরে রটিয়ে বেড়াত দিদির মাথার দোষ আছে।
‘উলটোদিকে অ্যাগনেস? তার অবস্থা কেমন হয়েছিল? বাড়িতে উন্মাদ মা, বোন। বাবা সংসার-বিমুখ। তার রূপের কারণে অনেকের আকর্ষণের কারণ হয়েছিল, যদিও সে নিজে চায়নি। বাড়ির অন্ধকার সামলাতে গিয়ে—তার ওপর বোনের হিংসে আর হিংস্র আক্রমণ সময়ে অসময়ে, বাবাকে দিয়ে মার খাওয়ানো— সে নিজে কি মানসিকভাবে সুখী থাকতে পারত? তার কি মাথা গরম হত না? সে রেগে গিয়ে মারামারি করলে, অথবা কখনো তার মাথায় যদি এই খেয়াল চাপত যে, এই অসুখী বাড়িটাকে সে আগুন জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দেবে সেটা অত্যন্ত অস্বাভাবিক কি? সে মাঝে মাঝে পালিয়ে যেত। ফিরে এসে উদ্ভট গল্প ফাঁদত। দুরন্ত ছিল। বকবক করতে ভালোবাসত। একটা সাধারণ মেয়ে যেমন হয়। তারপর তার মাথা যেত গরম হয়ে কারণ এক অসহনীয় চাপের মধ্যে সে পারিবারিক জীবন কাটাত। আমরা তার জায়গায় থাকলে ওই পরিবেশে আমাদেরও কি ধৈর্য্যচ্যুতি ঘটত না? মনে হত না যে, সবাইকে খুন করে ফেলি? অ্যাগনেস সেগুলো তার ডায়েরিতে লিখেছিল। সে মেজাজ হারাত মাঝেমধ্যেই। সেগুলোকেই ডলোরেসের রটনার সঙ্গে কানেক্ট করে মানুষ দুইয়ে দুইয়ে চার করেছিল। অ্যারন একদিন যেমন বলেছিল, লাল চুলের ওরকম রূপবতী মেয়ের সামান্যতম অসংলগ্ন আচরণ মানুষের চোখে বড়ো হয়ে দাঁড়ায়। অ্যাগনেস তাই বারে বারে বলত সে পালিয়ে যেতে চায়।’
‘বুনো হাঁসের মতো, সাইবেরিয়া।’ অস্ফুটে বলল অ্যারন।
‘আমি জানি না, কেন সে এই উপমা বারে বারে দিত। কিন্তু, তার পালিয়ে যাবার আকুতিকে আমি বুঝি। আমি হলে কি পালাতে চাইতাম না? এই প্রসঙ্গে বলি, ডলোরেসকে নিয়ে আমার ধারণা বদ্ধমূল হয়েছিল আলফ্রেডের সঙ্গে কথা বলে। আলফ্রেড জোর দিয়ে বলেছিলেন অ্যাগনেসের কোনো প্রেমিক ছিল না। কিন্তু, আমাদের বাড়ি এসে ডলোরেস সারা শহরময় অ্যাগনেসের বয়ফ্রেন্ডদের কথা বলে গিয়েছিলেন। আলফ্রেড মিথ্যে বলতেই পারেন, কিন্তু মোটিভ কী? এতদিন পরে এসে অ্যাগনেসের চরিত্র কেমন থাকল তা দিয়ে তাঁর কী আসে-যায়? তিনি তো অ্যাগনেসের প্রেমেও পড়েননি। উলটোদিকে, যার আসাযাওয়ার কথা ছিল, সেই ডলোরেস অ্যাগনেসের পুরুষসঙ্গ বিষয়ে বলে গেলেন। উলটোটা হলে আমার অস্বাভাবিক লাগত না। তখনকার দিনে কোনো সুন্দরী মেয়ে একটা ছেলের সঙ্গে দাঁড়িয়ে কথা বললেই তাদের প্রেম হয়েছে বলে বাইরের মানুষ ধরে নিত। ফলত, আলফ্রেড যদি এমনটা বলতেন আর ডলোরেস যদি অস্বীকার করতেন, তাহলে সেটা প্রত্যাশিত ছিল। কিন্তু, এখানে বিপরীত ঘটল। বাইরের একজন অ্যাগনেসকে ক্যারেক্টর সার্টিফিকেট দিচ্ছে, কিন্তু নিজের বোন তাকে বলছে বহুগামী। কেন এরকম ঘটল, তার একটাই ব্যাখ্যা, যদি আমার আগের অনুমানগুলো ঠিক হয়। পুরোটাই ডলোরেসের রটনা, যেগুলোকে জেনিফারের মতো মানুষ লুফে নিয়ে শহরময় রাষ্ট্র করে বেড়াবেন।’ জেনিফার জ্বলন্ত চোখে আমার দিকে তাকালেন, কিন্তু মুখ খুললেন না।
‘কিন্তু, ডলোরেসের পাগলামি বিষয়ক আপনার তত্ত্ব—’ আলফ্রেড অধৈর্যভাবে বললেন।
‘কেন মানুষ জানতে পারল না? সেটাও বলব। তার আগে একটা আকাড়া প্ৰমাণ দিই। জেনিফার বলেছিলেন, যেদিন অ্যাগনেস নিখোঁজ হয়, ডলোরেসকে নিয়ে মাইকেল জামশেদপুরে কী সব চিকিৎসার ব্যাপারে গিয়েছিলেন। কার চিকিৎসা? যাদের চিকিৎসা দরকার, মার্গারেট, বা ডলোরেসের দাবি মতো অ্যাগনেস, তারা তো গঞ্জে বসে। মাইকেল নিজের চিকিৎসার জন্য ডলোরেসকে সঙ্গে করে নিয়ে যাবেন না। তাহলে ডলোরেসের চিকিৎসা, রাইট? পুলিশ ফাইলে স্টেটমেন্ট দিতে গিয়ে মাইকেল জামশেদপুরের হাসপাতাল ও ডাক্তারবাবুর নাম দিয়েছিলেন। এতদিন পরে তাঁদের খুঁজে পাওয়া সহজ নয়। সেই ডাক্তারবাবু মারা গেছেন। কিন্তু, অফিসার মাহাতো সাহায্য করেছিলেন এখানে। পুলিশের সোর্স খাটিয়ে পুরোনো ফাইল বার করা হয়েছিল। ডলোরেসকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল সাইকিয়াট্রিক ওয়ার্ডে। তার সমস্যার কিছু বিবরণ ফাইলে দেওয়া আছে।’ আলফ্রেড অবিশ্বাসের চোখে তাকিয়ে মাথা নাড়লেন।
‘এরপর কাহিনিতে প্রবেশ করল ব্রাউন পরিবার। অ্যাগনেস এবং মার্গারেট, ব্রাউনদের বাড়ি গিয়ে অপমানিত হলেন। অদ্ভুতভাবে, তারপর সেখানে অ্যাগনেসের যাতায়াত ঘন ঘন বেড়ে গেল। অথচ, হবার কথা ছিল উলটো। ব্রাউন এবং স্যাংচুয়ারি নিয়ে হিন্দিতে ধাঁধা করে সে কিছু কথা লিখে গিয়েছিল নিজের ডায়েরিতে। আমি যখন গল্পটাকে আবার ভাবতে শুরু করলাম, এরপর কোথায় যেতে পারে, আমার চোখে দুটো দৃশ্য বার বার ভাসছিল। এক অ্যাগনেসের ছবি আর চিঠি। দুই, এক মেঘলা দিনে অ্যাগনেসের চোখে সানগ্লাস। দুটো খটকা, যাদের কথা আগে বলেছি। তারপর উত্তর খুঁজে পেলাম। কিন্তু, প্রমাণ চাই। তাই গেলাম মার্গারেটের কাছে। তিনি সেদিন সুস্থ ছিলেন। তাঁর সঙ্গে কথা হয়েছিল আমার। ডলোরেস চাননি আমি সেদিন যাই, কারণ তিনি থাকবেন না। কিন্তু, ততদিনে ডলোরেস যেহেতু আমার সন্দেহের তালিকায় এসে গেছেন, তাই আমি সেদিনটাই বেছে নিয়েছিলাম, যাতে তাঁর অনুপস্থিতিতে কথা বলতে পারি।’
চোখ বুজে ঢোক গিললাম। সেদিনকার সাক্ষাৎ জীবন্ত হয়ে ফিরে আসছে, তার ছায়া ফেলেছে আমাদের সবার ওপর। বিছানায় আধশোয়া মার্গারেট। বাইপোলারিটির প্রসঙ্গ উল্লেখ করার পর মার্গারেট জানতে চেয়েছিলেন, আমার প্রশ্নগুলো কী। আমি মার্গারেটকে জানালাম, আমাদের মধ্যে যা কথা হবে, তিনি কাউকে বলতে পারবেন না। ডলোরেসকেও নয়, কারণ এর সঙ্গে অ্যাগনেসের নিরাপত্তা জড়িয়ে। কেউ জানলে অ্যাগনেসের ক্ষতি হবে। মার্গারেট তীব্রচোখে আমার দিকে তাকিয়ে ছিলেন। তারপর বিড়বিড় করে জানালেন যে, ডলোরেসকে তিনি বিশ্বাস করেন না। তাকে কিছু বলার প্রশ্ন নেই। অ্যাগনেস বিষয়ে তো আরওই না, কারণ ডলোরেস দিদিকে হিংসে করে। তার ক্ষতি করার চেষ্টা করে। জানালা খুলে দিলাম কারণ বদ্ধ আবহাওয়ায় আমার অস্বস্তি হচ্ছিল। উত্তপ্ত সন্ধের হাওয়া ঢুকে ভাসিয়ে দিচ্ছে ঘর। চাদর ওলটপালট হচ্ছে। মার্গারেটের চুল এলোমেলো উড়ে যাচ্ছে হাওয়ায়। আলো জ্বালালে টিউবলাইট দপদপ করে উঠল। তাকে ঘিরে পোকাদের দল উড়ছে। জানালা দিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়তে চাইছে অবাধ্য কাপাস গাছ। আমি নির্বিকার গলায় বলে চলেছি, যা জানি। কথা শেষ করে আমি সোজাসুজি তাঁর চোখের দিকে তাকিয়েছিলাম। মার্গারেট চোখ নামালেন না। আমি তাঁকে জানিয়েছিলাম, অ্যাগনেসের হাত ধরে ব্রাউনদের বাড়ি গিয়ে অত সম্মানিত মানুষটাকে নাম ধরে ডাকা অন্তত কিছু ইঙ্গিত দেয়। তাই না?
মার্গারেটের চোখে আবার অবোধ্য দৃষ্টি ফিরে আসছিল। তাঁর অ্যাটাক হবে কি না, নার্সকে ডাকব কি, এসব ভাবার মধ্যে মার্গারেট ফিসফিস করেছিলেন, ‘অ্যাগনেসের চুল দেখেছ? ঠিক ওর ঠাকুমার মতো।’
অক্ষয়ের গলা খাঁকারিতে সংবিৎ ফিরল আমার। ফ্যাকাশে হেসে জানালাম, ‘ডেভিড ব্রাউন যে অ্যাগনেসের বাবা, এই সত্যিটা মার্গারেট কিছুতেই স্বীকার করলেন না। কিন্তু, আমার জন্য এটুকুই যথেষ্ট ছিল।’
বারবারার ঠোঁট বেঁকে গেল। জিভ চেটে সে বলল, ‘আমরা—কবে এসব—,’ আর কিছু বলতে পারল না। আলফ্রেড আর জেনিফারের বিস্ফারিত চোখকে অগ্রাহ্য করলাম, একমাত্র অ্যারনের ভাবান্তর হল না ।
‘মার্গারেটের কথায় আমি অবাক হইনি। কারণ, আমি নিজে দুটো সূত্র থেকে এই অনুমানে এসেছিলাম। অ্যাগনেসের লাল চুল, নীল চোখ। কিন্তু, মাইকেল বা মার্গারেট কারোর ওরকম ছিল না। ডলোরেসেরও নয়। অপরপক্ষে, একবার কথায় কথায় বারবারা জানিয়ে ছিল যে, তার ঠাকুমার ছিল লাল চুল। আরেকবার অ্যারন বলেছিল তার পিতামহ ডেভিড ব্রাউনের চোখের মণি নীল রঙের ছিল। কথাগুলো স্ট্রাইক করেছিল। আর অ্যাগনেসের চিঠি। চার্চের কাগজে লেখা, ‘Forgive me, father, for I have sinned. Two days back…,’ এটুকুই। সাধারণ ভাবনায়, একটা অসম্পূর্ণ ক্যাথলিক কনফেশন। কিন্তু, আবারও সেই মেটাফর, অ্যারনকে কয়েক দিন আগে যা জানিয়েছিলাম। শব্দ পড়ার সময়ে তার মধ্যে নিজস্ব ধারণা ঢুকিয়ে দিই আমরা। ফলত শব্দ তার আক্ষরিক অর্থ বদলে ব্যঞ্জনা লাভ করে। সাধারণত, কনফেশন যখন লেখা হয়, সেটা আমরা লিখি এভাবে, ‘Forgive me, Father’, যেখানে ‘father’-এর “f ক্যাপিটাল লেটারে হয়, ‘F’। কারণ, পরমপিতাকে এর মাধ্যমে সম্বোধন করা হচ্ছে। অ্যাগনেসের মতো ধার্মিক ক্যাথলিক ক্যাপিটাল এবং স্মল লেটার গুলোবে না। এটা আমার অনেকদিন পর চোখে পড়েছিল। তখন আমার মনে হয়েছিল, যদি এই লেখাটাকে তার মেটাফর ছাড়িয়ে আক্ষরিক অর্থে পড়ি? তাহলে father অর্থে বাবা হয়।
অর্থাৎ, অ্যাগনেস তার বাবাকে চিঠি লিখতে গিয়েছিল কোনো এক পাপের কথা বলতে চেয়ে। সেই চিঠি ব্রাউনদের বাড়িতে। তাহলে কি অ্যাগনেসের বাবার সঙ্গে ব্রাউনদের সম্পর্ক ছিল? আমার মনে পড়ল অ্যাগনেসের ডায়েরির সেই এন্ট্রি। —কিন্তু ও কি আমার বোন হয়ে থাকতে চায়? যদি না চায়, তাহলে বোনের অর্ধেকটা বরং ছেড়ে দেব। বোনের অর্ধেকটা ছেড়ে দিলে থাকে বাকি অর্ধেক। তার মানে বোন হয়ে যায় হাফসিস্টার। তাহলে, অ্যাগনেস ডলোরেসকে হাফ-সিস্টার বানাচ্ছে। কেন? কারণ, দু-জনের মা এক হলেও বাবা আলাদা । ডায়েরির এই অংশটার অর্থ যখন আমি উদ্ধার করলাম, দুটো ব্যাপারে নিঃসংশয় হলাম। এক, অ্যাগনেস মানসিকভাবে সুস্থ ছিল। দুই, দুই বোনের অন্তত একজনের জন্মবৃত্তান্তে অসংগতি আছে। অ্যাগনেসের হবার সম্ভাবনা বেশি, কারণ লাল চুল।
‘বারবারা বলেছিল, মার্গারেট একটা সময় পর্যন্ত তাঁদের ফুলের বাগানের দেখাশোনা করতেন। ডেভিডের হোটেলে ফুল সাপ্লাই যেত। সেইসূত্রে ডেভিড ও মার্গারেটের ঘনিষ্ঠতা হয়। মার্গারেটের অসামান্য রূপকে ডেভিডের মতো প্রবল পুরুষ অস্বীকার করতে পারেননি। ফলশ্রুতিতে অ্যাগনেসের জন্ম। কিন্তু, ডেভিড ততদিনে বিবাহিত, দুই সন্তানের পিতা। তার ওপর টাউনের মাথাদের একজন। অপরদিকে মার্গারেট সাধারণ ঘরের মহিলা। তিনি চাইলেও ডেভিডকে দিয়ে স্বীকার করাতে পারতেন না। তখনকার দিনে সেটা আরও কঠিন ছিল। মার্গারেট চুপচাপ নিজের ঘরে ফিরে এলেন। ডেভিড স্বভাবজাত পৌরুষে হয়তো ভুলেই গেলেন মার্গারেটের কথা।’
বারবারা বিড়বিড় করল, “দ্যাট হোর অ্যান্ড হার বাস্টার্ড।’ স্মৃতির চাবুকে ওর মুখ যন্ত্রণাদীর্ণ। চোখ ফিরিয়ে নিলাম।
‘ধীরে ধীরে অ্যাগনেস বড়ো হল। ডেভিডের সঙ্গে তার পরিচয় ঘটল। মার্গারেট তাঁর অসুস্থ মস্তিষ্কে সিদ্ধান্ত নিলেন, ডেভিডকে নিজের মেয়ের সঙ্গে পরিচয় করাতে হবে। কিন্তু, সেদিন ব্রাউনদের বাড়িতে ডেভিড যখন দেখলেন যে, অ্যাগনেস আসলে তাঁর মেয়ে, অনুমান করি, তাঁর আতঙ্ক হয়েছিল। তাই তিনি অমন দৃষ্টিতে মার্গারেটের দিকে তাকিয়েছিলেন। ওরকম অদ্ভুত ব্যবহার করেছিলেন। অপমানিত মার্গারেটের উন্মাদনা ফিরে এল। সেই ঘোরের মধ্যে তিনি অ্যাগনেসকে তার পিতৃপরিচয় জানালেন।
‘সেই কারণে অ্যাগনেস আবার ফিরে গিয়েছিল ব্রাউনদের বাড়ি। সে বার বার যেত। তার হয়তো কৌতূহল হত, নিজের বাবা কেমন তা জানতে। অথবা, যে বাড়ি তার হতে পারত সেই বাড়িটাকে সে চিনতে চাইত। কিন্তু, কাউকে খুলে বলার সাহস তাদের হয়নি, কারণ তারা ছিল সামাজিক মর্যাদায় অনেকটা নীচুতে। এই কথা জানাজানি হলে ডেভিড কী করতে পারেন, তাদের সম্যক ধারণা ছিল। মাইকেল কি জানতেন? সম্ভবত, হ্যাঁ। সেই কারণে তিনি বাড়ি থেকে দূরে সরে থাকতেন। এই পরিস্থিতিতে অ্যাগনেসের জায়গায় আমি থাকলে হয়তো পাগল হয়ে যেতাম। অ্যাগনেস তবু হয়নি। সে আমাদের থেকে বেশি সুস্থ ছিল। কিন্তু, স্বভাবজাত আগ্রহে সে জানতে চাইত, যে জীবন সে পেল না তার চরিত্র কীরকম। তোমাদের এগুলো শুনে কষ্ট যদি না হয়, তাহলে বলব, আরেকবার ভাবো। যে মেয়েটা আর নেই, তাকে তোমরা ভাবো।’
বারবারা নিঃশব্দে কাঁদছিল। আলফ্রেড দুইহাতে মুখ ঢেকে বসে ছিলেন। অ্যারন চেষ্টা করছিল স্বাভাবিক থাকতে। কতক্ষণ পারবে জানি না। অক্ষয় বিড়বিড় করলেন, ‘গল্পটা এবার শেষ করুন, মিস ভট্টাচার্য।’ কিন্তু, আমাকে সময় নিতে হত। এতক্ষণ অবিনাশ যাদব কথা বলেননি। এবার ফেটে পড়লেন, ‘আমি শুনতে চাই না। এভাবে হয় না। এত বেদনা এই বয়েসে এসে বারবারা কেন নেবে? সে তো কোনো দোষ করেনি।’
‘ঠিক। আপনারা চাইলে আমি কথা থামিয়ে দেব।’
‘না।’ বারবারা উত্তর দিল। ‘তুমি বলো। আমাদের সবাইকে শুনতে হবে।’
‘এর সঙ্গে কি অ্যাগনেসের অন্তর্ধান রহস্যের যোগ আছে?’ প্রশ্ন করলেন অক্ষয়।
কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে আবার শুরু করলাম। ‘অ্যাগনেস বারবারা আর আগাথার সঙ্গে জোহার হালের চার্চে যেত। সেখানে কাজ করতে করতে রেভারেন্ড গরম্যানের সঙ্গে তার পরিচয় ঘটেছিল। কিন্তু, সেখানে আরও কিছু ঘটেছিল। অ্যাগনেস কেন সানগ্লাস পরেছিল মেঘলা দিনে, সেই প্ৰশ্ন আমি নিজেকে বার বার করছিলাম! সে কি নিজের চোখ ঢাকতে চাইছিল? কেন? কাঁদছিল কি সে? তখন মনে পড়ল, শহরে সেসময় কনজাংটিভাইটিসের প্রকোপ বেড়েছিল। কিন্তু, অ্যাগনেসের তো হয়নি। হলে অন্তত পুলিশের রিপোর্টে বা তার চেনা কেউ এর উল্লেখ করতই। অন্য কেউ না হোক, মুন্না বলত। তাহলে কি অ্যাগনেস অন্য কারোর সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিল? জেনিফার বলেছিলেন, এডওয়ার্ডের সেদিন কনজাংটিভাইটিস হয়েছিল। তাই সে নিজের ঘরে শুয়ে ছিল। কিন্তু, অ্যাগনেস কেন এডওয়ার্ডের সঙ্গে দেখা করতে যাবে? অ্যাগনেসের ডায়েরি তন্নতন্ন করে খুঁজে কিছু পাচ্ছিলাম না।
.
‘এবং, অদ্ভুতভাবে একটা নাম আমাদের সবাইকে বার বার তাড়িয়ে বেড়াচ্ছিল। আর্থার। এই নামের জীবিত কাউকে এই টাউনে পাওয়া যায়নি। কিন্তু, অ্যাগনেস এবং রেভারেন্ড দুজনেই এই নামটা বলেছিলেন। আমার বিশ্বাস ছিল আর্থার অবশ্যই এই রহস্যের একটা চাবিকাঠি। আমি অনুরোধ করব, এখান থেকে আমার কনজেকচারকে আপনারা মন দিয়ে অনুসরণ করার চেষ্টা করুন। কারণ, এই নামের সূত্র ধরে টান মারবার পর অ্যাগনেস ও ক্রিস সম্পর্কিত রহস্যের, সমাধান না হোক, অন্তত মোটিভ, আমার কাছে পরিষ্কার হয়েছিল।’
‘আর্থার মরিসি? আমরা কিন্তু রেভারেন্ড বা অ্যাগনেসের সঙ্গে তাঁর কোনো উল্লেখযোগ্য যোগসূত্র পাইনি।’ বললেন অক্ষয়।
‘আর্থার মরিসি! নানা সূত্র ধরে এই নামটা আমার কানে আসছিল। কিন্তু, তিনি কুড়ি বছর আগে মারা গেছেন। তা সত্ত্বেও অন্য কোনো ব্যক্তিকে না-পেয়ে শেষ অবলম্বন হিসেবে তাঁর কটেজে গেলাম। কেয়ারটেকারের সঙ্গে কথা বললাম। তারপর শুনলাম, রেভারেন্ডের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ছিল এবং পরবর্তীকালে মনোমালিন্য হয়েছিল। যে সূত্র ধরে এই মতবিরোধ, তারপর তাঁর স্মৃতিচারণ রেভারেন্ডের মুখে আসা অস্বাভাবিক। এ ছাড়াও, রেভারেন্ড আর্থারকে মানবশিশু বলে উল্লেখ করেছেন। বলেছেন, আর্থার নাকি তাঁর জন্য কাঁদছে। অ্যাগনেসও লিখেছে যে, আর্থার ঠান্ডায় কাদছে। “প্রিয় আর্থার” বলে সম্বোধন করেছে। এক বৃদ্ধের সম্পর্কে এগুলো বলা সাযুজ্যপূর্ণ নয়। সুতরাং, আর্থার মরিসি আমাদের আখ্যানের আর্থার হতে পারেন না। তাঁকে এই গল্প থেকে বাদ দিলাম।
‘তাহলে আর্থার কে? কেন তাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না? আর ঠিক তখনই, অ্যারনের একটা কথা আমার সমস্ত ধাঁধা কাটিয়ে ঘাড় ধরে নির্জলা সত্যের সামনে দাঁড় করিয়ে দিল। অ্যারন জানাল, তার পিতামহকে অনেকে রাজাবাবু বলে ডাকত। তখন আমি বুঝলাম, আর্থারকে খুঁজতে গিয়ে আমাদের চোখের সামনে জ্বলজ্বল করতে থাকা আরেকটা সূত্র আমাদের চোখ এড়িয়ে গিয়েছে।
‘কী সেই সূত্র? রাজাবাবু ডাকের সঙ্গে আর্থারেরই-বা কী সম্পর্ক? এখানে একটা বিরাট ডাইভার্সন আমাদের সম্পূর্ণ দিশাহীন করেছিল। আমরা আর্থারকে খুঁজে যাচ্ছিলাম। আর, সেই খোঁজার তাড়নায় ভুলে গিয়েছিলাম অ্যাগনেসের ডায়েরির আরেকটা অসম্ভব গুরূত্বপূর্ণ লাইনকে। একটা নাম মাত্র একবারই এসেছিল সেখানে। আমাদের চোখ এড়িয়ে গিয়েছিল। ১৯৮৬ সালের মার্চ মাসের একটা এন্ট্রিতে অ্যাগনেস লিখেছিল—অ্যামনন লুকিয়ে আছে বাদামি আশ্রয়ে। বাদামি অর্থে ব্রাউন এবং আশ্রয় অর্থে স্যাংচুয়ারি আমরা ইতিমধ্যে সিদ্ধান্ত করেছি। কিন্তু, অ্যামনন? সে কে ছিল? নামটায় গুরুত্ব না-দিলেও হয়তো আমার অবচেতনে ছিল। যখন রাজাবাবু নামটা শুনলাম, আমার চোখে পর পর দুটো নাম ঝলসে উঠল।
‘কিং ডেভিড। ওল্ড টেস্টামেন্টে বর্ণিত পৌরাণিক রাজা। তাঁর পুত্রের নাম ছিল অ্যামনন। স্পয়েন্ট কিড বলা যায়। অ্যামনন পুরাণে কুখ্যাত, কারণ সে তার হাফ-সিস্টার তামারকে ধর্ষণ করেছিল। অ্যামনন তাহলে এডওয়ার্ড, যে ব্রাউনদের বাসস্থানে লুকিয়ে থাকে। সেই বাড়ির নাম স্যাংচুয়ারি। এডওয়ার্ড তাঁর হাফ-সিস্টার অ্যাগনেসকে ধর্ষণ করেছিলেন। যদিও জানতেন না যে, অ্যাগনেস তাঁর বোন। ডেভিডের অন্য পুত্ররাও ছিল, যেমন সলোমন। কিন্তু, অ্যাগনেস তাদের নাম উল্লেখ না-করে অ্যামননের নাম নিয়েছিল।
‘কিন্তু, শুধু এটুকুই কি যথেষ্ট? ধর্ষণই-বা কেন? এডওয়ার্ড আর অ্যাগনেসের মধ্যে কি প্রেমসম্পর্ক থাকতে পারে না? পারে না, তার কারণ তিনটে আরও গুরুত্বপূর্ণ সূত্র। প্রথমত ১৯৮৬ সালের জানুয়ারি মাসে অ্যাগনেস তার ডায়েরিতে লিখেছিল—ডল যদি ছেলে হত, তাহলে ওকে আশ্রয় দেবার জন্য কোনো তালমাই এই পৃথিবীতে থাকত না। তামারকে ধর্ষণের প্রতিশোধ নেবার জন্য তামারের ভাই অ্যাবসালোম হত্যা করেছিল অ্যামননকে তারপর ডেভিডের ক্রোধ থেকে বাঁচার উদ্দেশ্যে রাজা তালমাইয়ের কাছে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিল। এটাও আমি প্রথমে বুঝিনি। গুগল ঘেঁটে জেনেছি। অ্যাগনেস ভেবেছিল, ডল কি ছেলে হলে অ্যাবসালোমের ভূমিকা নিত? দ্বিতীয় সূত্র, অ্যাগনেসের ডায়েরির একটা অংশ, যার ব্যাখ্যা আমার কাছে পরে এসেছিল। ও লিখেছিল— আমার দাম পঞ্চাশ সেকেল রুপোর থেকে বেশি, না, কম? অনেকদিন মাথামুন্ডু নাবোঝার পর মনে হল, অ্যাগনেসের লেখাকে বুঝতে হলে অ্যাগনেসকে বুঝতে হবে। তার মতো করে ভাবতে হবে। অ্যাগনেস বাইবেল পড়তে ভালোবাসত। মন দিয়ে বাইবেল পড়লাম কয়েক দিন। তারপর আটকে গেলাম ডিউটেরোনমিতে এসে। ডিউটেরোনমি, দ্বিতীয় বিবরণ—অধ্যায় 22। If a man happens to meet a virgin who is not pledged to be married and rapes her and they are discovered, he shall pay her father fifty shekels of silver. আর তার পরেও ছিল তৃতীয় সূত্র। বারবারা আমাকে মেডুসার বিষয়ে বলতে গিয়ে মিনার্ভার কথা বলেছিল। তখন বুঝেছিলাম, অ্যাগনেস কেন নিজেকে মেডুসা বলত। শুধুই লাল চুলের কারণে নয়। মেডুসা ছিল সেই বালিকা, যে মিনার্ভার মন্দিরে নেপচুনের দ্বারা ধর্ষিতা হয়েছিল। এই তিনটে সুত্র আমাকে অভ্রান্তভাবে জানিয়েছিল, এডওয়ার্ড ছিলেন পৌরাণিক অ্যামননের প্রতিকল্প, যিনি তাঁর হাফ-সিস্টারকে ধর্ষণ করেছিলেন। জোহার হালে-র চার্চে কাজ করার সময়ে এডওয়ার্ড এবং অ্যাগনেসের দেখা হয়েছিল। এডওয়ার্ডও সেখানে মাঝে মাঝে বাবার আদেশে কাজ করতে যেতেন। আবার এমনটাও হতে পারে যে, অ্যাগনেস অন্যান্য মেয়েদের মতো জোহার হালে-তে আড্ডা মারতে যেত। খেলাধুলো করত। সেখানেও সে এডওয়ার্ডের চোখে পড়তে পারে। সম্ভবত জোহার হালে-র চার্চের ভেতরেই এই ধর্ষণ ঘটে। মেডুসার রেফারেন্স সেই কারণেই হয়তো অ্যাগনেসের মুখে এবং কলমে ঘুরে-ফিরে আসত।
‘তাহলে আর্থার কে? সে কি শুধুই ডাইভার্সন? রেভারেন্ড আর্থারকে মানবশিশু বলে উল্লেখ করেছেন। আর্থারকে একজন শিশু বলে ধরে নেওয়া যায়। ক্রিসের প্রসঙ্গে আর্থারের নাম আমরা জানতে পারি। ক্রিস হারিয়ে যাবার পর রেভারেন্ড বলেছিলেন, তাঁর জন্য তিনটে জীবন শেষ হল। তারপর আমাকে জলাভূমিতে বলেছেন যে, তাঁর জন্য দু-জন অপেক্ষা করছে, আর্থার তাদের একজন। আর্থার তাহলে ক্রিসের অপর একটা নাম হতে পারে, যে শান্তিতে ঘুমোচ্ছে এখন। কিন্তু, এই সম্ভাবনাকে বাতিল করতে হল, কারণ অ্যাগনেস তার ডায়েরিতে আর্থারের কথা লিখেছে। যে সময়ে এই ডায়েরি সে লিখেছে, ক্রিসের জন্ম তার চার-পাঁচ বছর পরে। তাহলে কি এই ডায়েরি ভুয়ো? অ্যাগনেসের নাম নিয়ে অনেক পরে ডলোরেস লিখেছেন? যেদিন থেকে ডলোরেস আমার সন্দেহের তালিকায়, তখন থেকে এই সম্ভাবনা আমার মাথায় ঘুরছিল। তাই মিস্টার মাহাতোর সাহায্যে হ্যান্ডরাইটিং এক্সপার্টের শরণাপন্ন হয়েছিলাম। তিনি জানালেন, ডায়েরি ও চিঠি একই মানুষের লেখা। অ্যাগনেসের চিঠিও ডলোরেসেরই লেখা, এমন অনুমানের পেছনে কোনো বাস্তব ভিত্তি পাইনি। তাই বলা যেতে পারে যে, আর্থার ডায়েরি ভুয়ো নয়। সেক্ষেত্রে, একমাত্র এটাই সিদ্ধান্ত হতে পারেবলে কারোর অস্তিত্ব ছিল না। এবং, ছিল। আর্থার, এক শিশু। এডওয়ার্ড ও অ্যাগনেসের সন্তান। যে কখনো জন্মায়নি।
‘ধর্ষণের ফলে অন্তঃসত্ত্বা হয়েছিল অ্যাগনেস। সে অনাগত শিশুর নাম রেখেছিল আর্থার। রেভারেন্ড জানতেন। তাই তাকে মানবশিশু বলেছেন। অ্যাগনেস লিখেছিল, আর্থারকে বাঁচতে দেবে না—কে দেবে না? জানাজানি হলে তাকে গর্ভপাতের জন্য চাপ দেওয়া হত। আর্থার শীতে কাঁদছে, সে লিখেছিল। ঠান্ডায় পূর্ণবয়স্ক মানুষ কাঁদে না। কাঁদে পশু ও শিশুরা। আর্থার মানবশিশু, কাজেই সে পশু হতে পারে না। কিন্তু কে সেই শিশু, যাকে নিয়ে অ্যাগনেস বিচলিত হতে পারে? ভয় পেতে পারে যে, তাকে মেরে ফেলা হবে? কোন শিশু অ্যাগনেসের বাড়িতে থাকে? কেউ থাকে না। একমাত্র থাকতে পারে, যদি অ্যাগনেস তাকে নিজের ভেতর বহন করে। আর্থারকে একজন শিশু হিসেবে চিহ্নিত করা ছিল প্রথম কাজ। কিন্তু, শিশু হলে তার বাবা, মা কারা ছিল? অবশ্যই অ্যাগনেসকে তার মা হতে হবে, নাহলে অন্য কারোর সন্তানকে নিয়ে সে লিখবে না— আমার পরিত্রাণ নেই। আর্থারের পরিত্রাণ নেই। অ্যাগনেসের পরিত্রাণ না-থাকলে অন্য কারোর সন্তানের পরিত্রাণ কেন থাকবে না? থাকবে না, একমাত্র সে যদি অ্যাগনেসের নিজের সন্তান হয়। সেইজন্যই—প্রিয় আর্থার। অ্যাগনেসকে এডওয়ার্ড ধর্ষণ করেছিলেন, সে-সিদ্ধান্ত আগে টানা হয়েছে। সেক্ষেত্রে, এই ধর্ষণের ফলস্বরূপ অ্যাগনেস অত্ত্বঃসত্ত্বা হয়েছিল, সেই সিদ্ধান্তেও আসা যায়। কারণ, তার অন্য প্রেমিক যে ছিল না, সেবিষয়ে আমি ততদিনে মোটামুটি নিশ্চিত হয়ে গেছি।’
ঘরে সূচপতনের নিস্তব্ধতা। জেনিফারের মুখ মড়ার মতো সাদা, থরথরিয়ে কাঁপছেন। অ্যারন অন্যদিকে তাকিয়ে কাঠের মতো শক্ত হয়ে আছে। তারপর বারবারা বুক চেপে দাঁড়াল। মাথা নাড়ছিল ঘন ঘন। তার চোখ থেকে গড়িয়ে পড়ছিল অঝোর ধারায় জল। অবিনাশের কাঁধে মুখ গুঁজে গোঙাচ্ছিল যখন, জেনিফার বললেন, ‘বাড়ি যাও, বার্বি’। মুখ তুলল বারবারা। জলে ধোয়া, আহত, কিন্তু ক্রুদ্ধ। টলোমলো পায়ে এগিয়ে জেনিফারের সামনে দাঁড়িয়ে বলল, ‘তোমার জন্য মনীষা মরেছে। ইউ বিচ!’ তারপর হাতের কাছে একটা কাচের গেলাস তুলতে যাবে, অ্যারন লাফিয়ে এসে হাত ধরল তার। জেনিফার রাগলেন না। ভ্যাবলার মতো তাকিয়ে ছিলেন। অ্যারন বারবারাকে বলল, ‘বাড়ি চলো।’ বারবারা মাথা নাড়ল, ‘কোথাও যাব না। সব শেষ হোক এখানে।’ বাইরে বেরিয়ে সিগারেট ধরালাম। কিছুক্ষণ পর অ্যারন বেরোল। আমার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল নীরবে। আলো-ছায়ায় ওর মুখ দুর্গম্য লাগে। যেখানে যতটুকু অর্থ, নিষ্ফলা নদী হয়ে গড়িয়ে যায়। ভালোবাসা আর বিশ্বাসঘাতকতা, ঘৃণা এবং আনুগত্য, তখন স্থান বিনিময় করে।
তখন অ্যারন ফিসফিস করল। ‘তোমাকে পুরোটা বলতে হবে, তনয়া। বলেছিলাম অনেক আগে। উই হ্যাভ টু বেয়ার টেস্টিমনি। আমাদের সম্মিলিত পাপের ইতিহাস।’ ওর গলা কেঁপে গেল। আমি কি নিজেকে অতটা পাথর বানাতে পারি যার স্নায়ুদৌর্বল্য ঘটবে না? দুইয়ে দুইয়ে চার হয় না। সরল ও নিখুঁত ক্লাসিফিকেশনের খোপে জীবন আর অপরাধকে ছকবন্দি করলে আমরা স্বস্তি পেতাম। কিন্তু, সেটা আমরা পাই না। আমি চাইলেও এখন অ্যারনের হাত ধরতে পারব না ।
‘অ্যাগনেসের রূপ ও উপস্থিতি দেখে এডওয়ার্ডের ভেতরের হিংস্র পৌরুষ সর্বসত্তা ফেটে বেরিয়েছিল।’ ঘরে ঢুকে আবার শুরু করলাম। ‘হয়তো তাঁর বাবার রক্ত এডওয়ার্ডের শিরায় রণদামামা বাজিয়ে থাকতে পারে। তখন এডওয়ার্ড উদ্দাম তরুণ। গিটার বাজাচ্ছেন, গাড়ি নিয়ে বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে ফুর্তি করতে বেরিয়ে যাচ্ছেন, টাকা ওড়াচ্ছেন দুই হাতে। যেটা ঘটে থাকতে পারে, এক সন্ধেবেলা জোহার হালের জঙ্গলঘেরা চার্চের প্রাঙ্গণে এডওয়ার্ড অ্যাগনেসের ওপর ঝাঁপান। তার সঙ্গে বলপূর্বক মিলিত হন। এমন হতে পারে যে, এর আগে অ্যাগনেসকে অ্যাপ্রোচ করতে গিয়ে প্রত্যাখ্যাত বা অপমানিত হয়েছিলেন। সেটা তাঁর ভেতরকার আক্রোশ বাড়িয়ে দিয়েছিল। তাই ধর্ষণ। হয়তো অলটারের সামনেই। জানি না এমনটা ঘটেছিল কি না। এগুলো আমার কল্পনা। কিন্তু, এডওয়ার্ডের সঙ্গে অ্যাগনেসের যদি প্রেম হত, ডায়েরিতে তার ইঙ্গিত দিত। তার বদলে, বাদামি আতঙ্ক। শুরুতে কিন্তু ছিল আকর্ষণ। ব্রাউন পরিবারটাকে জানার আকর্ষণ। এরকম পরিবার তারও হতে পারত। কিন্তু, সে তার পরিবর্তে পেয়েছিল একটা ডিসফাংশনাল ফ্যামিলি। তারপর সেটা দাঁড়িয়ে গেল ভয়ে। অজাচার করার পর যে ভয়াবহ আতঙ্ক, অ্যাগনেসকে সেটা অসাড় করেছিল। লাল চুল যদি বাদামি হত, মানে, অ্যাগনেস যদি ও’ব্রায়েনের বদলে ব্রাউন হত, তাহলে কেমন হত, ও নিজের ভাবনার কথা লিখে গিয়েছিল ডায়েরিতে। সেই কারণে ব্যভিচারের প্রসঙ্গ। নিজের মায়ের ব্যভিচার, নিজেরও। মনে রাখতে হবে, ধর্মনিষ্ঠ ক্যাথলিক মেয়ের কাছে এ বিরাট পাপ। সেই পাপ এডওয়ার্ডের যত, অ্যাগনেসের তার থেকে বেশি। তাই ও লিখেছিল—আমার পরিত্রাণ নেই। আর্থারের পরিত্রাণ নেই। বাঁচতে দেবে না ওকে। অ্যাগনেস মারাত্মক ভয় পেয়েছিল, কিন্তু কাউকে বলতে পারেনি। সে যখন আবিষ্কার করেছিল গর্ভবতী হয়েছে, তখনও বলতে পারেনি। তার হয়তো আবার মেডুসার কথা মনে হয়েছিল। ধর্ষিত হবার পর মেডুসাই উলটে শাস্তি পেয়েছিল দেবী মিনার্ভার কাছ থেকে। মিনার্ভা তার চুলগুলোকে সাপে পরিণত করেছিলেন। আধুনিক নারীবাদীরা একে ভিক্টিমব্লেমিং-এর প্রথম উদাহরণ মনে করেন। অ্যাগনেস অত বুঝত না। কিন্তু তার মনে হয়েছিল, এডওয়ার্ডরা ক্ষমতাবান। সে নিজে সাধারণ একটা মেয়ে, যাকে অনেকে পাগল ভাবে আর কেউ ভাবে চরিত্রহীন। সে এডওয়ার্ডের বিরুদ্ধে অভিযোগ করলে তা ধোপে টিকবে না। হয়তো এডওয়ার্ডকেও সে ভয় পেয়েছিল। অজাচারের আতঙ্ক, গর্ভবতী হবার আতঙ্ক, চারপাশের মানুষগুলোর থেকে আতঙ্ক— এই সর্বগ্রাসী অন্ধকারের ভেতর দাঁড়িয়ে সে কী করতে পারত, সেই ষোলো বছর বয়েসে? সে বিশ্বাস করত এই পাপ তার নিজের। একবার ভেবেছিল ডেভিডকে চিঠি লিখে সব জানাবে, যেহেতু মুখোমুখি দাঁড়াবার সাহস তার ছিল না। কিন্তু, চিঠি লিখতেও সাহসে কুলোয়নি। এটা আমার অনুমান, এর পেছনে কোনো প্ৰমাণ নেই—লিখতে শুরু করে সেই চিঠি সে ব্রাউনদের বাড়ি লুকিয়ে রেখে আসে। রেখে আসে নিজের একটা ছবি, লাল চুলে জড়ানো, আর চকোলেটের মোড়ক। অ্যাগনেস সম্ভবত ভেবেছিল, একদিন ডেভিড এগুলো খুঁজে পাবেন। সে অন্য কিছু নিজের বাবাকে দিতে পারত না। একবার কেক দিতে গিয়ে তার মায়ের অপমান সে দেখেছিল। তাই নিজের একটা চুল আর চকোলেটের প্যাকেটকে চিঠি ও ছবির সঙ্গে লুকিয়ে রেখেছিল। তার নিজস্ব বুদ্ধিতে এভাবেই যেন বাবাকে সে বলতে চেয়েছিল—আমাকে প্লিজ ভুলে যেয়ো না। আমি ছিলাম এখানে, এভাবেই।’
ঢোঁক গিললে গলার কাছে ব্যথা করল। ওভাবে কাঁদতে আমি পারি না, যেভাবে বারবারা এখন কাঁদছে। এমনকী জেনিফারের গালের জীর্ণ চামড়াও তিরতির করছে দেখতে পাচ্ছি। দু-হাতে মুখ ঢাকা আলফ্রেডও কি? এক কিশোরী, যে তার ইচ্ছের বিরুদ্ধে বহু মানুষের মনোযোগের কেন্দ্র হল, গুজবের লক্ষ্যবস্তু হল, একটা ভালো জীবনের লোভে চকচকে চোখে সে চেয়ে থাকত অন্য একটা বাড়ির দিকে। তারপর তার জীবন একদিন লণ্ডভণ্ড হল জোহার হালের বুকে দাঁড়িয়ে। তারপর সে হারিয়ে গেল। কারোর কিচ্ছু এসে গেল না। তার স্মৃতি ধূসর হল। তার ভূত অবিরাম পরিহাসের মতো চেপে রইল এই পোড়ো টাউনের কাঁধে। কেন তাকে ফিরিয়ে আনলাম আমি, তার ইমেজ? কেনইবা পুরাণের অভিশপ্ত ডালপালা তাদের আদিম ছায়া বিস্তার করল ভগ্নপ্রায় টাউনের মাথায়? আমি কি তাহলে চুপ করে যেতে পারতাম?
‘তারপর অ্যাগনেসের গর্ভাবস্থা প্রকট হবার মুখে সে আবার ভয় পেল। জানাজানি হবার পর পিতৃপরিচয়ের কী হবে? সে তখন গেল রেভারেন্ড গরম্যানের কাছে। যেহেতু তারা ক্যাথলিক, গর্ভপাত কল্পনাতেও আনতে পারত না। অ্যাগনেস রেভারেন্ডকে কী বলেছিল, আমি জানি না। তারপর কী ঘটেছিল, কী হল অ্যাগনেসের, তা নিয়েও আমি ধোঁয়াশায়। এই সত্যিটার জন্য ডলোরেসের দিকে তাকিয়ে আছি। আমার বিশ্বাস, তিনি জানেন। কিন্তু, আমার যেটা মনে হয়, অ্যাগনেস রেভারেন্ড গরম্যানকে দিয়ে প্রতিজ্ঞা করিয়েছিল, তিনি ক্যাথলিক সেন্সে গুড ওয়ার্কের রাস্তা থেকে বিচ্যুত হবেন না। সে কি চেয়েছিল পালিয়ে যেতে? অথবা, তাকে কি রেভারেন্ড গরম্যান কোথাও সরিয়ে দিয়েছিলেন? আমি সত্যিই জানি না। কিন্তু, রেভারেন্ডের কথা শুনে মনে হয়েছিল, অ্যাগনেস বেঁচে নেই। তিনি বলেছিলেন, তাঁর জন্য তিনটে জীবন নষ্ট হল। অ্যাগনেস, আর্থার আর ক্রিস। জলাভূমির ধারে দাঁড়িয়ে একবার বলেছিলেন তাঁর জন্য ওরা দু-জন অপেক্ষা করে আছে। অ্যাগনেস আর আর্থার। কোথায় অপেক্ষা করছে? আমি জানি না। অ্যাগনেস যদি সত্যিই বেঁচে না-থাকে, তাহলে তার পেছনে রেভারেন্ড কতটা দায়ী, আমার ধারণা নেই। তারপর থেকে অ্যাগনেস নিখোঁজ।
‘যেটা বলতে ভুলেছি, অ্যাগনেস এডওয়ার্ডের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিল। বোধ হয় সাহায্য চেয়েছিল। বাগানের পেছনের দরজা দিয়ে সে ঢুকেছিল। নিজের অনাগত সন্তানের নিরাপত্তার কথা ভেবে কালো চশমা পরে নিয়েছিল চোখে। কিন্তু, এডওয়ার্ড দেখা করতে অস্বীকার করেন। তাড়িয়ে দেন অ্যাগনেসকে। হয়তো হুমকিও দিয়েছিলেন। এসব কথা ডেভিড ব্রাউন জানতেন কি? কোনো ধারণা নেই। কিন্তু, অ্যাগনেসের ভূতকে দেখে একদিন তিনি অজ্ঞান হয়ে যান। তারপর থেকে আগের মতো নাকি থাকেননি, এরকমটা বারবারা বলে। অন্তর্গত পাপবোধ এভাবে ভেতর থেকে কুরে খেয়েছিল তাঁকে। আপাতত এখানে আমি অ্যাগনেসের আখ্যান শেষ করছি। কারণ, এর পর থেকে অ্যাগনেসের সন্ধান পাওয়া যায়নি। এর পর ডলোরেসের পালা।
‘ডলোরেস দিদিকে ঘৃণা করত। মনে মনে চাইত, দিদি মরে যাক বা চলে যাক অন্য কোথাও। কিন্তু, দিদির মুখে কোনো দুর্বল মুহূর্তে সে জেনেছিল, এডওয়ার্ডের সন্তান অ্যাগনেসের গর্ভে। সেটা সে মুন্নাকে জানায়। আলফ্রেড বলেছিলেন, মুন্না শেষ কয়েক দিন গুম হয়ে থেকেছিল। কথা বলছিল না ভালো করে। তারপর সে অ্যাগনেসের মুখোমুখি হয়ে জানতে চায়, খবরটা সত্যি কি না। সেখানে অ্যাগনেসের সঙ্গে কথা কাটাকাটি হয় তার। সেটাই শেষদিন ছিল। তারপর থেকে অ্যাগনেস নিখোঁজ। পুলিশকে কি মুন্না একথা জানিয়েছিল? জানালেও কিচ্ছু যায় আসে না। ওসি গায়ের ঝাল মেটাবার জন্য মুন্নাকে মেরেছিলেন। এডওয়ার্ড কী করেছে তা দিয়ে তাঁর কী? বিশেষত এডওয়ার্ড যেখানে বড়োলোক! ডলোরেস কি কাউকে জানিয়েছিল? সম্ভবত, না। কারণ, অ্যাগনেস নিখোঁজ হবার ট্রমায় সে পাথর হয়ে যায়। তার ভেতর ভয়ংকর অপরাধবোধ, ক্যাথলিক সেন্সে কথাটা বলছি, কাজ করতে থাকে যে, দিদি তার জন্য চলে গেল। সে মনে মনে চেয়েছিল দিদি চলে যাক। মনে রাখতে হবে যে, ক্যাথলিক চেতনায় ইন্টেন্ট এবং ওয়ার্কের তফাত নেই। তাহলে কি তার দোষ? এডওয়ার্ড নয়, আসল ক্রিমিনাল সে নিজে? মার্গারেটও কাঁদতে কাঁদতে বলেছিলেন, ‘কেন ও গেল, তুই কেন গেলি না!’ ওইটুকু মেয়ের কাছে এই শক সাংঘাতিক হয়। সে তাই প্রায়শ্চিত্ত করতে চেয়েছিল। মা-কে বোঝাতে চেয়েছিল যে, অ্যাগনেস বেঁচে আছে। আগে বলেছি, ডলোরেস অ্যাগনেসের মতো হতে চাইত। এরপর যত দিন গেল, গুটিপোকা খোলস ছেড়ে প্রজাপতি হল। ডলোরেস সুন্দরী হয়ে উঠল, আর মার্গারেটের পাগলামো বাড়ল। কারণ, তাঁর প্রিয় বড়োমেয়ে চলে গেছে। অপরাধবোধ থেকে, হয়তো নিজস্ব উন্মাদনার বশেও, ডলোরেস ঠিক করল যে, মা-কে বোঝাতে হবে অ্যাগনেস কোথাও যায়নি, সে এখানে আছে। সেই শুরু তার অ্যাগনেস সাজার পালা। মার্গারেট তিন বছর আগে যখন আমাকে বলেছিলেন যে, অ্যাগনেস মাঝে মাঝে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে আসে, আমি ভেবেছিলাম কল্পনা করছেন। অ্যাগনেস যে সত্যিই আসে, বুঝেছিলাম অনেকদিন পর।
‘লাল পরচুলা জোগাড় করা সমস্যার ছিল না। কিন্তু, নীল চোখ? মাইকেল চোখের ডাক্তার শিবকুমার শর্মার অ্যাসিস্ট্যান্ট ছিলেন। তাঁর ছেলের সঙ্গে কথা বলে আমি জেনেছি, সেইসময়ে ডাক্তারবাবু অঞ্চলের ধনী মানুষদের জন্য কনট্যাক্ট লেন্স বলে একটা নতুন জিনিস আমদানি করছিলেন। তখনও কনট্যাক্ট লেন্স এসব জায়গায় জনপ্রিয় হয়নি। অনেকে নামই শোনেনি। কিন্তু, ডলোরেস তার বাবার সূত্রে দেখেছিল। কীভাবে চোখ ধাঁধানো নীল লেন্স সে জোগাড় করেছিল, আজ আর বলতে পারব না, কারণ মাইকেল বা ডাক্তারবাবু কেউ বেঁচে নেই। পরচুলা আর লেন্স পরার পর ডলোরেসকে দূর থেকে দেখলে বিভ্ৰম লাগতে পারত। যেদিন আমি জঙ্গলের ভেতর রাস্তা হারিয়েছিলাম, ডলোরেস বাঁচিয়েছিলেন আমাকে। আমার ধারণা তিনি তার আগে থেকেই আমাকে অনুসরণ করতেন। সেদিন বিভ্রান্ত অবস্থায় একমুহূর্তের জন্য আমার মনে হয়েছিল এঁকে আগে কোথাও দেখেছি। পরে ঠান্ডামাথায় ভেবে বুঝেছিলাম, তার আগে অ্যাগনেসের ছবি আমি কয়েকটা দেখেছি। পুলিশ ফাইলেও ছিল। ডলোরেসের মুখচ্ছবিতে অ্যাগনেসের ছায়া ছিল। তাকে অ্যাগনেস হিসেবে ভাবা অস্বাভাবিক ছিল না, যদি মানুষ দূর থেকে দেখত।
‘এগুলোর কিছুটা আমার অনুমান। বাকি অনেকটা মার্গারেটের আবোলতাবোল থেকে অর্থ উদ্ধারের চেষ্টা করে গল্পটা দাঁড় করিয়েছি। মার্গারেট সম্ভবত এডওয়ার্ড আর অ্যাগনেসের ব্যাপারে জানেন না। তিনি বার বার বলেছিলেন অ্যাগনেস তাঁর কাছে আসে। পরে বুঝেছিলাম, আসলে আসে ডলোরেস। শুরুতে ডলোরেস কিন্তু বাইরে বেরোয়নি। সে মায়ের সামনে মাঝে মাঝে দেখা দিত অ্যাগনেস সেজে। মার্গারেট বিশ্বাস করেছিলেন, অ্যাগনেস আছে। তারপর ডলোরেসের অসুস্থ মস্তিষ্ক তাঁকে আস্তে আস্তে বিশ্বাস করাতে শুরু করল সে অ্যাগনেস। অন্যান্য সময় এমনি ঠিক আছে, সুস্থ স্বাভাবিক মেয়ে। কিন্তু, কোনো কোনো রাত অথবা দিনে তার অ্যাগনেস হতে ইচ্ছে করত। নিজে একা একা সেজে কী আর হবে, মানুষ যদি জানতেই না-পারে? তাই সে বাইরে বেরোতে শুরু করল টুকটাক। কিন্তু, কাছাকাছি যেত না মানুষের। ওটুকু সেন্স তার ছিল। দূর থেকে দেখা দিত, অথবা, রাত্রিবেলা নির্জন অঞ্চলে ঘুরে বেড়াত। যে এক কি দুইজন দেখত, তারা অন্যদের কাছে গল্প করত রং চড়িয়ে। ঝাঁ-ঝাঁ দুপুরে নির্জন কবরখানায় বসে চুল আঁচড়াত। এগুলো সব সে ভেবেচিন্তে করত, এমন না। ওই সময়গুলোতে সে সত্যিই অ্যাগনেস হয়ে যেত। ধীরে ধীরে অ্যাগনেসের ভূতের গল্প পল্লবিত হয়ে ছড়িয়ে গেল শহরে। গুড ফ্রাইডের কাছাকাছি সময়ে মার্গারেটের অ্যাটাক হত, কারণ অ্যাগনেসের স্মৃতি ফিরে আসত তাঁর কাছে। তাই তখন বেশি বেশি করে অ্যাগনেস সাজত ডলোরেস। এভাবে দিন গড়াল। তারপর একদিন ডলোরেসের চোখে পড়ল এডওয়ার্ড আর মনীষা তাঁদের সদ্যোজাত সন্তানকে নিয়ে ঘুরছেন।
‘এতদিন নিজের অপরাধবোধের বশবর্তী হয়ে ডলোরেস এডওয়ার্ডকে ভুলে থেকেছিল। কিন্তু, চোখের সামনে এডওয়ার্ডকে দেখে পুরোনো আক্রোশ আবার চাগাড় দিয়ে উঠল ডলোরেসের মনে। এই লোকটার জন্য তার দিদি চলে গেছে। সেই দোষ এসে পড়েছে তার ঘাড়ে। সঙ্গে কে? মনীষা! যার সঙ্গে বিয়ে না হলে তার দিদির সঙ্গে এডওয়ার্ডের বিয়ে হত। প্রতিহিংসা নেবার জন্য ডলোরেস পাগল হয়ে গেল। বহুদিন পরে এসেও আমাদের সামনে মনীষার নাম সে মুখে উচ্চারণ করতে চায়নি, এতটাই ছিল তার ঘেন্না। কিন্তু, নিজেকে সে অ্যাগনেস ভাবতে শুরু করেছিল। তাই তার চিন্তার গতিপ্রকৃতি আমাদের থেকে অন্যরকম হবে। সুস্থ মানুষের যুক্তি দিয়ে তাকে ধরা যাবে না। এডওয়ার্ডকে শাস্তি দিতে হবে ঠিকই। কিন্তু নিজের সন্তান, মানে আর্থার? তাকে তো সুরক্ষিত রাখতে হবে। ডলোরেসের চোখ পড়েছিল ক্রিসের দিকে। এডওয়ার্ডের সন্তান, তার মানে তো তারই সন্তান। কিন্তু, তার সন্তান আর্থার তার কাছে নেই। বদলে এডওয়ার্ডের কাছে রয়েছে। কিন্তু, এই লোকটা ভালো লোক নয়। এই লোকটা তাকে ধর্ষণ করেছিল। তাই আর্থার এর কাছে সুরক্ষিত থাকবে না। তাকে নিয়ে যেতে হবে। ডলোরেস, সে তখন অ্যাগনেস, ঠিক করল আর্থারকে নিয়ে পালাবে।’
‘এক মিনিট।’ অবিনাশ মুখ তুললেন। ‘আমরা সে-বাড়ির সমস্ত দিক তন্নতন্ন করে খতিয়ে দেখেছি। ডলোরেসের পক্ষে ক্রিসকে অপহরণ করা কীভাবে সম্ভব ছিল?’
‘বলতে পারেন, তালেগোলে হয়ে গেছে, যেমন বহু অপরাধ হয়। এক মিনিট ও এদিকওদিক হলেই হয়তো ডলোরেস ধরা পড়ে যেত। আমার অনুমান বাস্তবের থেকে বেশি আলাদা হবার কথা না। সেদিন ডলোরেস ঠিক করে রেখেছিল সে ক্রিসকে নিয়ে পালাবে। তার কয়েক দিন আগে থেকেই হয়তো চেষ্টা চালাচ্ছিল। সুযোগ হয়নি। কোনো এক ফাঁকে সেদিন গেট দিয়ে সকলের অজ্ঞাতে ঢুকে বাগানের এককোনায় লুকিয়েছিল সে। যখন নির্মলা দুবে বেরিয়ে যান আর রেভারেন্ড ঘুমিয়ে পড়েন, ডলোরেসের চোখে পড়েছিল ফ্রেঞ্চ উইন্ডো খোলা। সেখান দিয়ে ঘুমন্ত ক্রিসকে তার নজরে পড়েছিল। দারোয়ান ও মালি তখন ঘরে ঢুকে গল্প করছে। ডলোরেস হেঁটে আসে, ক্রিসকে কোলে তুলে নেয়, তারপর ড্রয়িং রুমের মাঝখান দিয়ে হেঁটে সিঁড়ি দিয়ে ওপরে চলে যায়। সোজা ঢুকে পড়ে ক্রিসের ঘরে। দরজা বন্ধ করে দেয়। ক্রিসের ঘরের লাগোয়া মনীষার ঘর। তিনি সেখানে ফোনে কথা বলছিলেন। পাশের ঘরে ডলোরেস বসে থাকে। এবার, ডলোরেস যে ক্রিসকে নিতে এসেছে, সে তো ভালোবেসে নিয়ে যাচ্ছে। কাজেই হয়তো একটা ব্যাগ নিয়ে আসবে যার ভেতর থাকবে একটা সুন্দর জামা, হয়তো একটা খেলনা। আর কী থাকবে? কেন, ডলোরেসের চিরুনি? তার সারাক্ষণের সঙ্গী। ব্যাগ খুলে ক্রিসের জামা বা কিছু একটা বার করতে যাবার সময়ে ডলোরেসের অজ্ঞাতে তার চিরুনি পড়ে যায়। ফোন শেষ করে মনীষা ঘরের বাইরে বেরোন। বাইরে থেকে হুড়কো টেনে দেন ঘরের। ডলোরেস সঙ্গেসঙ্গে দুই ঘরের কমন যে দরজা, যেখান দিয়ে মনীষা ঘুমন্ত ক্রিসকে নিজের কাছে নিয়ে আসতেন, সেই দরজা দিয়ে ঢুকে পড়ে মনীষার ঘরে। দরজা টেনে দেয়। তাহলে ব্যাপারটা দাঁড়ায় এরকম যে, বাইরে থেকে হুড়কো টানা ঘরের ভেতর ডলোরেস এবং ক্রিস।
‘এর মধ্যে বিপদ হয়েছিল, ক্রিস জেগে ওঠে। কাঁদতে শুরু করে। সেই কান্নার আওয়াজ পেলজম ভুজেল পেয়েছিলেন। ডলোরেস দেখে বিপদ। সে বাবাবাছা করে ক্রিসকে ভোলাতে যায়, কিন্তু ক্রিসের কান্না থামে না। আওয়াজ পেয়ে অন্যেরা চলে আসবে এই ভয়ে খাটের ওপর থেকে একটা বালিশ নিয়ে ডলোরেস ক্রিসের মুখে চেপে ধরে। বুঝতে পারেনি, জোরে চাপ হয়েছিল। ক্রিস নেতিয়ে পড়ে আস্তে আস্তে। ডলোরেস একসময়ে দেখে, ক্রিসের নিশ্বাস পড়ছে না।’
ঘরের অন্যেরা পাথর। অবিশ্বাসী মুখে বারবারা তাকাল আমার দিকে। ফিসফিস করল, ‘ক্রিসকে আমি দেখেছি।’ দাঁতে ঠোঁট কামড়ে অ্যারন। চোখ বুজে আলফ্রেড নিজের মনে মাথা নাড়ছেন, যেন শুনতে চান না। অক্ষয় মাথা নীচু করে ছিলেন বলে তাঁর মুখ দেখতে পেলাম না।
‘মনীষা ক্রিসকে এরপর খুঁজতে শুরু করেন। সারাবাড়ি শোরগোল পড়ে যায়। মনীষা ওপরে এসে এক এক করে সবকটা ঘর দেখেন। কিন্তু, নিজের ঘর তিনি কেন দেখবেন? সেখানে তো হুড়কো টেনেই এসেছেন বাইরে থেকে। এদিকে ভেতরে কাঠের মতো বসে ডলোরেস। তার কোলে মৃত ক্রিস। একহাতে ধরা বালিশ। পুলিশ আসে। তখন অন্ধকার নেমেছে। হট্টগোল শুরু হয়েছে চারপাশে। খাঁচায় বন্দি ইঁদুরের মতো ডলোরেস ছটফট করছিল। সে জানত যেকোনো মুহূর্তে ঘরের দরজা খোলা হবে। তখন তার চোখে পড়ে বাথরুম। সে ক্রিস আর বালিশ নিয়ে বাথরুমে ঢুকে যায়। মনে আছে, বারবারা বলেছিল, একবার ছোটোবেলায় ওর জ্বর হয়েছিল বলে এই ঘরে শুয়েছিল। তখন রাক্ষসের মুখোশ পরে এডওয়ার্ড মুখ বাড়িয়েছিল বাথরুম থেকে। বাথরুমের লাগোয়া একটা ঘোরানো সিঁড়ি ছিল, সেটা দিয়ে উঠেছিল এডওয়ার্ড। সেটা ডলোরেস জানত, অথবা, শুনেছিল অ্যাগনেসের মুখে। সে বাথরুমে গিয়ে দরজা ভেজিয়ে দেয়। ফলত, কেউ যদি ঘরের দরজা খুলে উঁকিও মারত, তার চোখে শূন্য ঘর ধরা পড়ত।
‘ততক্ষণে পুলিশ চলে এসেছে। এদিকে বাথরুমে ডলোরেস আটকে। পুলিশ এসে পেছনের গেট খুলে তালা পরীক্ষা করাচ্ছে। ডলোরেস মরিয়া হয়ে চিৎকার করল ইংরেজিতে, সামনের গেট দিয়ে কেউ বেরিয়ে যাচ্ছে। সবাই হুড়মুড় করে সামনের গেটে ছুটল। পেছনের গেট তখন খোলা। ঘোরানো সিঁড়ি বেয়ে নেমে ছুটে গেট দিয়ে বেরিয়ে গেল ডলোরেস। কোলে ক্রিস। ডলোরেসের দিকে নজর ঘুরে যাবার এটা আরও একটা কারণ ছিল আমার কাছে। কে সেদিন চেঁচিয়েছিল? কার ছায়ামূর্তি দেখা গিয়েছিল অন্ধকার দোতলায়? কেউ বলেছে মনীষা, আবার কেউ বলেছে বারবারা। কেন? কারণ, সে ইংরেজিতে চেঁচিয়েছিল। বাড়ির অন্য কোনো মহিলা ইংরেজিতে কথা বলত না। আগাথাকে বাদ দিলাম, কারণ তিনি হাঁটুর ব্যথার কারণে ওপরে উঠতে পারেন না। তাহলে মনীষা আর বারবারা যদি না-চেঁচান, চেঁচাবে বাইরের লোক, যে ইংরেজিতে কথা বলে। সম্ভবত, অ্যাংলো কমিউনিটির কেউ। তাহলে কি অ্যাগনেস নিজেই? কিন্তু, সে হারিয়ে গেছে অনেকদিন। এখন দুম করে সে উদয় হয়েছে, এই ভাবনাটায় কনভিন্সড হচ্ছিলাম না। তাহলে কি অ্যাগনেসের মতো অন্য কেউ? অ্যাগনেসের কাহিনিতে ডলোরেসের ভূমিকা আগেই বলেছি। সে কি তাহলে অ্যাগনেস সেজে এসে ক্রিসকে তুলে নিয়ে গেল?
“ক্রিসকে নিয়ে বেরিয়ে ডলোরেস জলাভূমি দিয়ে ছুটে চলে যায়। বালিশটা মনে হয় জঙ্গলের ভেতর কোথাও ফেলে দেয়। ক্রিসের দেহ সে কোথায় রেখেছিল, জানি না। হয়তো যে বুড়ো পলাশের নীচে নিজের বাগানে ডলোরেস এখন বসে থাকেন, তার নীচে রাখা আছে। কিন্তু আমার ধারণা, ক্রিসকে এই জলাভূমির কোথাও রেখে দেওয়া হয়েছিল।’
বড়ো নিশ্বাস নিয়ে বললাম, ‘তার মানে, যে সময়ে ক্রিসের খোঁজ চলছে আর পুলিশ এসেছে, সেইসময়টায় ক্রিস বাড়ির ভেতরেই ছিল।’ কেউ উত্তর দিল না। একটা পাতা পড়লেও আওয়াজ হবে, এত নিস্তব্ধ চারপাশ। বাইরে ঘন রাত।
‘কেন জলাভূমিতে ক্রিস আছে, সেই অনুমানের পেছনে যুক্তি হল, যদিও জোরালো প্রমাণ আমি দেখাতে পারব না, ডলোরেস পুতুল নিয়ে জলাভূমিতে আসত। ক্রিসকে হত্যা করার পর সে হয়তো স্বাভাবিক হয়ে গিয়েছিল। হয়তো ভয় পেয়েছিল নিজের কাজে। কিন্তু, কিছুকাল পর আবার অ্যাগনেসের অস্তিত্ব ফিরে আসে। ক্রিসকে ডলোরেস খুঁজতে শুরু করে। তার মনে পড়ে, ক্রিসকে জলাভূমিতে ফেলে এসেছে। একটা প্রমাণ সাইজের পুতুল জোগাড় করে সে, তাকে ক্রিসের মতো জামাকাপড় পরায়। তারপর তাকে নিয়ে জলাভূমিতে ঘুরে বেড়ায়। তাকে কোলে তুলে আদর করে, ঘুম পাড়ায়, খাওয়ায়। হয়তো এভাবেই সে নিজেকে বোঝাত, ক্রিস আছে, ঠিক যেভাবে নিজের মা-কে বোঝাত যে, অ্যাগনেস আছে। জঙ্গলের ভেতর পুতুলকে চাবি ঘুরিয়ে হাঁটাত। সেটা হেঁটে কয়েক বার জলার ধারে চলে গেছিল। এরকম ঘুরে বেড়াবার সময়ে বারবারার চোখে পড়েছিল পুতুলটা, যাকে অতদূর থেকে দেখলে একটা বাচ্চা বলে মনে হয়। মাতাল আর বিভ্রান্ত বারবারা তাকে ক্রিস বলে মনে করেছিল।
‘প্রসঙ্গত, এই পুতুলগুলো সাধারণ অন্য পাঁচটা পুতুলের মতো হয় না। এদের বলে বেবি ডল। বিদেশে যেসব বাবা, মা অল্প বয়েসে সন্তান হারিয়েছেন, তাঁদের ট্রমা ম্যানেজমেন্ট কেয়ারের একটা গুরুত্বপূর্ন অঙ্গ হল এরকম বেবি ডল। এরা বেশ দামি হয়। এ ছাড়া, এগুলোকে ব্যবহার করা হয় শুটিং-এর স্টান্ট সিকোয়েন্সে। যেখানে বাচ্চার দরকার লাগে সেসব দৃশ্যে আসল শিশুর বদলে বেবি ডল দিয়ে কাজ চালানো হয়। ডলোরেসের বন্ধুর দাদা বম্বের স্টুডিয়োপাড়ায় কাজ করেন। নিজেই জানিয়েছিলেন সেকথা। তাঁর সোর্স দিয়ে পুতুল আনাতে পারেন। অথবা, অন্য উপায়ে। তাঁকে জিজ্ঞাসা করলে এগুলো জানা যাবে।’
‘এই ভাবনায় একটা বড়ো গলদ আছে। আমরা পরদিন কুকুর এনেছিলাম। তারা জলাভূমি তন্নতন্ন করে খুঁজেছিল। ক্রিসের দেহ ওখানে থাকলে খুঁজে পাওয়া যেত।’ বললেন অবিনাশ।
কয়েক মুহূর্ত আমার মুখে কথা জোগাল না—কুকুর আনার ব্যাপারটা কী করে এতদিন ভুলে থাকলাম? সেক্ষেত্রে কি আমার অনুমানকে আবার পালটাতে হবে? বালিশটাও তাহলে জলাভূমিতে ফেলতে পারেননি ডলোরেস, নয়তো কুকুরেরা সন্ধান পেত।
‘স্বীকার করছি। আমি জানি না সত্যিই, কোথায় ক্রিসের দেহ আছে। ডলোরেসের বাড়ি সার্চ করলে কোনো সূত্র পাওয়া যাবে কি না, তাও এতদিন পর, নিশ্চিত নই। এগুলো পুলিশ দেখবে। আমি যা বলছি, তার অনেক কিছু আমার অনুমান। আমি তো পুলিশ না, তাই প্রমাণ বা অপ্রমাণ করার ক্ষমতা আমার হাতে নেই।’ কিন্তু, এগুলো কথার কথা। ক্রিসের পরিণাম বিষয়ে আমি যদি ভুল সিদ্ধান্তে আসি, তাহলে পরের অনেকগুলো সুতোর জট খোলে না। আমি কি তাহলে আবার ভুল রাস্তায় হাঁটছিলাম এতক্ষণ?
‘ডলোরেসের আস্তে আস্তে বয়েস বাড়ল। তিনি মানসিকভাবে সুস্থ হবার দিকে এগোলেন। হয়তো সম্পূর্ণ সুস্থ হননি, কিন্তু নিয়ন্ত্রণে রাখার অভ্যেস হয়েছিল। কলেজে গেলেন, চাকরিতে ঢুকলেন। হয়তো নিজেই স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে নিজের চিকিৎসা করিয়েছিলেন। ফলত, ডলোরেসের ভূতের আনাগোনা কমতে থাকল। বারবারাও কম দেখতে থাকল ক্রিসকে। তারপর একসময়ে বন্ধ হয়ে গেল। আমি হিসেব করে দেখেছি, ডলোরেস কলকাতার স্কুলে পড়াতে যাবার সময় থেকে বারবারা আর ক্রিসকে দেখেনি। ডলোরেস ফিরে এসেছেন, কিন্তু অ্যাগনেসের ভূত ফেরেনি। ক্রিসও না। ডলোরেসকে এখন সুস্থ মানুষ বলা যেত। আলফ্রেড তাই কিছু বোঝেননি। এমনিতেও গোঁড়া ক্যাথলিক পরিবারে মানসিক অসুস্থতা লজ্জাজনক বিষয় বলে বাইরের মানুষদের সামনে ফাঁস করা হয়নি। ছোটোবেলা থেকে ডলোরেস বুদ্ধিমান ছিলেন। তিনি নিজের অসুস্থতাকে সুপ্ত রেখে দিদির ঘাড়ে চালাতে পেরেছিলেন। বড়ো হবার পর, তিনি যখন প্ৰায় সুস্থই বলা চলে, কেন অন্যেরা সন্দেহ করবে? মার্গারেটের অসুস্থতা প্রকট ছিল বলে চাপা দেওয়া যেত না। কিন্তু, ডলোরেস হয়তো সেভাবে অসুস্থ ছিলেন না। হয়তো তখন তাঁর ভেতর বাইপোলারিটির লক্ষণগুলো সবে ফুটছে। এমনিতেই বাইপোলারিটিকে বাইরে থেকে দেখে অনেক সময়েই শনাক্ত করা যায় না। তার ওপর মাইকেল তাড়াতাড়ি ডলোরেসের চিকিৎসা আরম্ভ করেছিলেন। সেটাও গঞ্জ থেকে অনেক দূরে জামশেদপুরে, যাতে এখানকার মানুষ জানতে না পারে ।
‘এই পর্যন্ত ভালো চলছিল। কিন্তু, আমি এসে সব আবার গণ্ডগোল করে দিলাম। একেওকে জিজ্ঞাসা করছিলাম অ্যাগনেসের ব্যাপারে, ক্রিসের ব্যাপারে। সেকথা ডলোরেসের কানে যেতই। সেটা তাঁর অসুস্থতাকে সম্ভবত আবার ট্রিগার করল। তাঁর মনে পড়ল ব্রাউন পরিবারের কথা, যারা তাঁদের দুর্ভাগ্যের মূলে, তাঁর দিদির অন্তর্ধানের পেছনে। তিনি আমাকে লক্ষ করছিলেন। পিছু নিয়েছিলেন কয়েক দিন। একদিন জঙ্গলের ভেতর পথহারা অবস্থায় উদ্ধার করলেন আমাকে। আমি ফিরে আসার পরেও আমার খোঁজ করতে এসেছিলেন। হয়তো দেখতে চাইছিলেন, আমি কতদূর এগিয়েছি। কিন্তু, তাঁর ভেতরে পাকিয়ে ওঠা ক্ষোভ, অস্থিরতা আর আক্ষেপের খবর বাইরের মানুষ হিসেবে আমি পাইনি। ডলোরেসের আবার মনে পড়ল, ক্রিস হারিয়ে গেছে। তিনি আবার আগের মতো আরেকটা পুতুল জোগাড় করলেন। তাকে নিয়ে জঙ্গলের ভেতর চলে গেলেন। জলাভূমিতে ঘুরে বেড়াতে শুরু করলেন। অবসর সময়ে রেখে দিতেন অ্যাম্বাসাডারের ডিকিতে। অথবা, হয়তো নিজের কাছেই রাখতেন। যেদিন যেদিন পুতুলটাকে বার করার দরকার পড়ত, তার আগের দিন হয়তো গাড়ির ডিকিতে রেখে দিতেন। এটা আমার মনে হচ্ছে, কারণ বেবি ডলকে সত্যিই আর্থার মনে করলে তাকে কাছছাড়া করতে চাইবেন কি? এই মাতৃসুলভ মনস্তত্ত্ব বিষয়ে আমার ধারণা কম। মোট কথা, আবার ক্রিস বারবারার চোখে পড়ল। পরদিন মনীষার চোখে পড়ল। আমাদের সবার চোখে পড়ল। তারপর কী হল আপনারা জানেন। কিন্তু, ডলোরেস জানতেন না যে, অ্যালিস তাঁকে লক্ষ করে। অ্যালিস নিজের মতো করে আমাকে সংকেত পাঠিয়েছিল। তাকে আমি ধরতে পারিনি। শেষদিন চোখে আঙুল দিয়ে না-দেখালে আমি অন্ধকারে থাকতাম। প্রথম যে রাতে বারবারা আমাকে জলাভূমির ধারে টেনে নিয়ে গিয়ে ক্রিসের কথা জানিয়েছিল, আমার মনে হয়েছিল ওপাশ থেকে কেউ দেখছে। যুক্তিহীন মনে হওয়া, আমি প্রমাণও করতে পারব না। অতদূর থেকে সত্যিই রাত্রিবেলা আমাদের দেখা সম্ভব ছিল কি না, তাও জানি না। কিন্তু যদি কেউ থাকে, তাহলে তার অ্যালিস হবার সম্ভাবনা প্রবল।’
.
অক্ষয় গলা খাঁকড়ালেন। ‘থানায় অ্যালিসকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। অ্যালিস দেখেছিল, গাড়ির ডিকিতে পুতুল রাখা। সেখান থেকে বার করে পেছনের সিটে রেখেছিল। কিন্তু ওর ধারণা ছিল, আসল অপরাধী জেনিফার, কারণ জেনিফার তাঁর ব্ল্যাক ম্যাজিকে নানা ধরনের পুতুলের গায়ে সুচ ফুটিয়ে মন্ত্র-তন্ত্র পড়েন। সেরকম পুতুল অ্যালিস চুরি করে এনেছিল কয়েকটা। তাদেরই একটাকে তিন বছর আগে মিস ভট্টাচার্যর গায়ে ছুড়ে মেরেছিল। আরেকটাকে কয়েক দিন আগে গাড়ির ভেতর ছুড়ে দিয়েছিল। কিন্তু, মাসিকে অ্যালিস ভয় পায়। তাই তনয়াকে সোজাসুজি বলতে পারেনি। ইশারা ইঙ্গিত দিত। ওর মনে হত, তনয়া হয়তো পুতুলটা খুঁজে পেলে সত্যিটা জানতে পারবে। সমস্যা হল,’ অস্বস্তিতে মুখ মুছলেন অক্ষয়, ‘অ্যালিস খুব একটা বুদ্ধিমান নয়। কথা বলে না। যেটুকু বলে, সেটাও গুছিয়ে নয়। ওর এলোমেলো বক্তব্য থেকে অর্থ উদ্ধার করা তাই সহজ নয়।’
‘অ্যালিস আমাকে সন্দেহ করত?’ বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে জেনিফার দাঁত কিড়মিড় করলেন। ‘বজ্জাত মেয়েছেলে! দুধ-কলা দিয়ে কালসাপ পুষেছি।’
‘বেশ করেছে সন্দেহ করেছে।’ বারবারা তেড়ে গেল। ‘তুমি আসল কালপ্রিট। বুড়ি মরবেও না, আমাদের জ্বালিয়ে খাবে।’
‘প্লিজ। থামো তোমরা!’ বিরক্ত অবিনাশ হাত তুললেন।
‘বিকল্প প্রস্তাবে, ডলোরেস হয়তো ইচ্ছে করে পুতুলগুলোকে বার করতেন, যাতে ব্রাউনদের চোখে পড়ে, তারা আরও আনসেটলড হয়ে যায়। তাঁকে কখনো দেখা যায়নি, কারণ তিনি জঙ্গলের ভেতর লুকিয়ে থাকতেন। কখনো বেরোতেন কি? বেরোতেন তো! একদিন অ্যাগনেসকে জলাভূমির ধারে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ডেভিড ব্রাউন অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু, পুতুল নিয়ে তিনি জঙ্গলের বাইরে আসতেন না—উন্মাদনার ভেতরেও তাঁর ভয় ছিল যে, মানুষ তাহলে তাঁকে ক্রিসের সঙ্গে দেখে ফেলবে, যে এতদিন ধরে নিখোঁজ। তিনি জঙ্গলের ভেতর বসে থাকতেন। পুতুলকে চাবি ঘুরিয়ে দম দিলে সে হেঁটে যেত কয়েক পা। ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাত এদিক-ওদিক। রাত্রে, অথবা, দিনের কুয়াশায়, বহুদূর থেকে দেখলে এরকম বেবি ডলকে মানবশিশু ভাবা অস্বাভাবিক নয়। এতদিনে কেন ধরা পড়লেন না ডলোরেস? হয়তো পড়তেন, যদি টাউন মরে না যেত। ভূতুড়ে টাউনে পরিণত না হত। কয়েক ঘর মাত্র লোক, তারা বেশিরভাগ বয়স্ক। সন্ধের পর বাড়ি থেকে বেরোয় না। জঙ্গলের ভেতর যাবার তো প্রশ্নই নেই। যারা রাতবিরেতে বেরোয় তারা দেহাতি মানুষ বা, মূলনিবাসী। জন্মগত সংস্কার থেকে তারা ভূতপ্রেত মানে। জানে, অ্যাগনেসের প্রেত ঘুরে বেড়ায়। তার কাছে ঘেঁষা যাবে না। ফলত, ডলোরেস বা ক্রিসবেশী পুতুল ধরা পড়েনি।
‘এটা খুবই সম্ভব যে, এডওয়ার্ড ব্রাউনকে ডলোরেস হত্যা করেছেন। কারণ, তাঁর আক্রোশ ছিল এডওয়ার্ডের প্রতি। থাকাই স্বাভাবিক। এডওয়ার্ডের দেহের নীচে একটা চিরুনি ছিল, তাই অ্যাগনেসের ঘটনার সঙ্গে তাঁর হত্যার কানেকশন থাকার কথা। হয়তো চিরুনিটা রেখে ডলোরেস এডওয়ার্ডকে অ্যাগনেসের কথা মনে করাতে চাইছিলেন। যদি ডলোরেস না-ও করে থাকেন, তিনি এ ব্যাপারে জানবেন অবশ্যই। একমাত্র তিনিই জানবেন। তাই, ‘ অক্ষয়ের দিকে ফিরলাম, ‘আপনারা ডলোরেসকে জিজ্ঞাসাবাদ করুন। আমি নিশ্চিত, উত্তর পাবেন।’
অবিনাশ গলা খাঁকড়ালেন, ‘কিন্তু, আজ রাত্রে কী হয়েছিল?’
‘দেখুন, এতক্ষণ যা যা বললাম, সবই তো অনুমান। এগুলো দিয়ে ডলোরেসকে ধরা সম্ভব ছিল না। এমনকী মার্গারেটের এভিডেন্সও গ্রাহ্য হত না, কারণ তিনি মানসিকভাবে সুস্থ নন। তাহলে? আমার কাছে তো কিছুই নেই যা দিয়ে ডলোরেসকে কনফেস করানো যায়। তখন আমি জেনিফারের কাছে গেলাম। তাঁকে দিয়ে ডলোরেসকে ফোন করালাম। কী বলতেন জেনিফার? অ্যাগনেসের ভূত তাঁর কাছে এসে বলে গেছে তার কী হয়েছিল? সেটা বললে ডলোরেসের কিছু এসে যেত না। বরং, যদি সত্যিই অ্যাগনেসের ভূত এসে এডওয়ার্ডের সঙ্গে তার ব্যাপারে সত্যিটা বলত, ডলোরেসের আক্রোশ কিছুটা কমত। তাহলে কী দিয়ে ডলোরেসকে ট্র্যাপ করা যায়? আমার কাছে একটাই চাবিকাঠি ছিল। ক্রিস ব্রাউনের অন্তর্ধান। জেনিফার ডলোরেসকে জানালেন যে, প্ল্যানচেটে অ্যাগনেসের ভূত এসে তাঁকে হাবিজাবি কথা বলেছে, যেমন বাথরুমের সিঁড়ি অথবা বালিশ। এরপর রাত্রে এসে সে ক্রিসের অন্তর্ধানের সত্য উদঘাটন করবে। জেনিফারের ভূত নামানো বা ব্ল্যাক ম্যাজিকে অন্যদের মতো ডলোরেসও বিশ্বাস করতেন না। কিন্তু, ক্রিসের ব্যাপারে শুনে তিনি স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। তাঁর বিশ্বাস হচ্ছিল না এতদিন পর অন্য কেউ এ ব্যাপারে জানতে পারে। বিশেষত সিঁড়ি বা বালিশের উল্লেখ, যেগুলো অন্যদের জানার কথা নয়। তাই ডলোরেস ঠিক করলেন, যেভাবেই হোক জেনিফারের মুখ বন্ধ করতে হবে। ভূতের থেকে শুনে হোক বা অন্য কোনোভাবে, জেনিফার অনেক কিছু জেনেছেন, এবং ঠিক জেনেছেন। কিন্তু, জেনিফারকে তিনি কি শুরুতেই আক্রমণ করবেন? ডলোরেস জানতেন, জেনিফারের হার্ট দুর্বল। তিনি অ্যাগনেস সেজে এলেন। যদি এতে ভয় পেয়ে জেনিফারের কার্ডিয়াক ফেলিয়োর হত, কাজ মাখনের মতো সমাধা হয়ে যেত। যদি তার পরে বেঁচে থাকতেন জেনিফার, অনুমান করছি ডলোরেস তাহলে হাত নোংরা করতে বাধ্য হতেন। কিন্তু, আমি আগে থেকেই জেনিফারকে জানিয়ে রেখেছিলাম, এরকম কিছু ঘটতে পারে। তিনি যেন চমকে না-যান। তা সত্ত্বেও ভয় পেয়েছিলেন। নাহলে ওভাবে চিৎকার করতেন না। সেটা স্বাভাবিক।
‘যেটা আমি বুঝিনি, এতদিন পরে ডলোরেস আবার অ্যাগনেস সাজতে গেলেন কেন? শুধুই তো জেনিফারকে ভয় দেখাবার উদ্দেশ্য ছিল না। মাসখানেক আগে অ্যারন তাঁকে দেখেছে। কিছু কি ট্রিগার করেছিল আবার? এডওয়ার্ডের হত্যা? অথবা, অন্য কিছু? অ্যারন অ্যাগনেসকে দেখেছে শুনে আমার অবাক লেগেছিল। ততদিনে ডলোরেসকে আমি সন্দেহ করতে শুরু করেছি। কিন্তু, তিনি যে আবার অ্যাগনেস সাজতে যাবেন, সেটা আমার কল্পনাতীত ছিল। জেনিফারকে ভয় দেখানো, সেটা কারণ হিসেবে বুঝি। কিন্তু, বনপথে একা একা ঘুরে বেড়ানো কী উদ্দেশ্যে? নাকি, অ্যারন অন্য কাউকে দেখেছিল?’ মৃদু হাসলাম। ‘সত্যিই হয়তো ভূত। জেনিফার যেমন বলেন।’
জেনিফার বিড়বিড় করে কিছু বলে দাঁত ঘষলেন। তাকাচ্ছেন না আমার দিকে। সামনে ঝুঁকলেন অক্ষয়, ‘আগে যা বলেছিলাম আপনাকে। আমার হয় কনফেশন চাই। নয়তো—,’ জেনিফারের দিকে তাকালেন।
‘আমি এফআইআর করতে চাই।’ বললেন জেনিফার।
‘আমার বিশ্বাস হচ্ছে না।’ আলফ্রেড চোখ মেললেন। সজল ও বাঙ্ময়। ‘ডলোরেস যদি জানত যে, এডওয়ার্ড অ্যাগনেসকে ধর্ষণ করেছে, সেকথা অন্য কাউকে বলেনি কেন? কেন পুলিশকে বলেনি?’
‘প্রথমে বলেনি কারণ নিজের দিদিকে নিয়ে তার ট্রমা ও অপরাধবোধ এত বেশি ছিল যে, এডওয়ার্ডের কথা তার মনে হয়নি। সে তখন একমাত্র নিজেকেই দায়ী করত।’ ‘কিন্তু, পরে তো বলতে পারত?’
‘অসম্ভব। ততদিনে ক্রিসের অন্তর্ধান ঘটে গেছে। ডলোরেস জানত, পুলিশ কেঁচো খুঁড়ে কেউটে বার করে আনতে পারে। পুলিশ প্রথমেই জিজ্ঞাসা করবে ডলোরেস কীভাবে জানল। তারপর তারা আবিষ্কার করবে যে, এডওয়ার্ডের সন্তান নিখোঁজ। ডলোরেসের ওপর সন্দেহ পড়বে না কি? কেউ যেচে বিপদ এভাবে নিজের ঘরে টেনে আনে না।’
আলফ্রেড উঠে দাঁড়ালেন। পা টেনে শ্রান্ত ভঙ্গিতে ঘর থেকে বেরোবার সময়ে আমার দিকে ফিরে বললেন, ‘আমার বন্ধু ছিল ডলোরেস। বন্ধুদের ক্ষয় দেখা এই বয়েসে যন্ত্রণার। হয়তো আপনি বুঝবেন ।
আলফ্রেড চলে যাবার পর কয়েক মিনিট আমরা সবাই নীরব ছিলাম। তারপর বললাম, ‘আমার কথা শেষ। এখানে থাকার দরকার পড়ে না, কারণ এরপর থেকে যা করার পুলিশ করবে। কিন্তু, পুলিশ যদি অনুমতি দেয়, আমি ডলোরেসকে কয়েকটা প্রশ্ন করতে চাই। তারপর এখান থেকে চলে যাব।’ চেয়ার থেকে উঠে বারবারার দিকে এগিয়ে গেলাম। সে মাথা নীচু করে বসে ছিল। আমি তার সামনে গেলে মুখ তুলল বারবারা। অস্বাভাবিক দৃষ্টি। চোখ যেন জ্বলছে। ঠোঁটের কষ বেয়ে ফেনা গড়াচ্ছে। আচমকা চিৎকার করে উঠল, ‘ক্রিস বেঁচে আছে। একটা গুদোম ঘর, অনেক দড়িদড়া, অন্ধকারে সাপ বেরোয়— ওখানে আছে—ক্রিস–’ অবিনাশ তাকে জড়িয়ে ধরলেন। কিন্তু, বারবারার চিৎকার কমছিল না। একবার থুতু ছুড়ল। থ্যাপ করে একদলা পড়ল আমার পায়ের সামনে।
অবিনাশ হাহাকারের গলায় বললেন, ‘এত বিশদে বিবরণ দিলে কেন, টিনা? নিজেকে বুদ্ধিমান দেখালে, এই? কেন! আমরা তো শুনতে চাইনি।’ মাথার অল্প চুল যে ক-গাছি আছে, হাত দিয়ে অস্থির ভঙ্গিতে টানলেন। হাত বোলালেন সারামুখে। বারবারার হাত ধরলেন। বারবারা সে-হাত ছাড়িয়ে নিল। তার গোঙানির সঙ্গে কান্না মিশে ততক্ষণে অবোধ্য স্বরে পরিণত হয়েছে।
জোরে নিশ্বাস ছেড়ে বললাম, ‘সব দায় আমার ওপর আপনারা চাপাতে পারেন না । বারে বারে এই অভিযোগ শুনেছি যে, আমি কেন পুরোনো ইতিহাস খুঁড়ছি। কিন্তু, আমি প্রথমে শুনতেই চাইনি। সমস্যা আমি নই। সমস্যা হলেন আপনারা, যাঁরা বিশ্বাস করতেন ক্রিস বেঁচে আছে। সেই বিশ্বাস থেকে আমাকে টেনে এনেছেন। এখন এই কথাগুলোর অর্থ হয় না! যা হয়েছে সেগুলো ডমিনো এফেক্ট। যদি আপনারা সবাই এই ঘটনা থেকে মুভ অন করতেন, তাহলে এত কিছু ঘটতই না। আমাকে গল্প শুনিয়ে চ্যালেঞ্জ করার খেলাটা, মিস্টার যাদব, আপনি যদি না-করতেন তাহলে আজ মনীষা আর এডওয়ার্ড বেঁচে থাকতেন। কিন্তু আপনারা ভুলতে পারেননি, অন্যকেও ভুলতে দেননি। গতকালও আমি বারবারাকে বলেছি, ও চাইলে আমি থেমে যাব। ও বলেছে যে, ও জানতে চায়। আজ এই ঘরে বসে আমি বলেছি যে, আমি থেমে যাচ্ছি। অ্যারন আমাকে কন্টিনিউ করতে বলেছে। এখন এই ক্রস বহন করবার দায় মূলত আপনাদের। কোনো দরকার ছিল না এসবের। আমাকে গল্পটা নাশোনালেই পারতেন, মিস্টার যাদব!’
অ্যারন উঠে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। আমি দেখলাম, অন্ধকারে তার মুর্তি হাঁটতে হাঁটতে দূরে চলে যাচ্ছে। আজ সারারাত মদ খাবে। জেনিফার গলা দিয়ে ক্ষুব্ধ আওয়াজ বার করলেন। আমার কাউকে কিছু বলার ছিল না। আমি যা করতে পারতাম, তা হল এই জায়গা ছেড়ে চলে যাওয়া। সবার দিকে তাকালাম, হয়তো এই প্রত্যাশায় যে কেউ আমার কথাগুলো বুঝবে। কিন্তু, আমি দেখলাম খাঁ-খাঁ মরুভূমি, প্রত্যাখ্যান। আমি নেমে গেলাম বারান্দা দিয়ে বাগান, সেখান থেকে রাস্তা। পেছনের লোকগুলো কীভাবে নিজেদের সামলাবে, জানতাম না। কিন্তু, আমার এখন ঘুম পাচ্ছে। বহু বছরের অনিদ্রার পর ঘুম যেমন হয়, স্বপ্নহীন ও নির্বিকার। স্যাংচুয়ারিতে আমার স্থান হবে কি? অ্যারন কোথায় গেল? এই গল্প ওকে আঘাত দিয়েছে, জানি। কিন্তু ও নিজে চেয়েছিল আমি যেন সমাধান করি। তারপরেও আমাকে যদি দায়ী করে, কী করতে পারি? ওর হাত যে ধরব, তেমন স্পর্শের জোর আমার কাছে নেই।
অন্ধকার রাস্তা দিয়ে হেঁটে বাড়ি ফিরছিলাম। তখন পেছন থেকে হর্নের আওয়াজ পেলাম। হেডলাইটের আলো পড়ল আমার গমনপথে। মুখ ফিরিয়ে দেখি, অক্ষয় তাঁর গাড়িতে বসে। তাঁর মুখ পাথরের মতো শক্ত ও গম্ভীর। আমাকে ইঙ্গিতে গাড়িতে উঠতে বললেন। আমি কোনো প্রশ্ন করিনি। গোটা রাস্তা আমরা কথা বলিনি। দু-জনে সামনের দিকে তাকিয়ে ছিলাম।
গাড়ি ডলোরেসের বাড়ির সামনে থামল। আমরা নেমে ভেতরে গেলাম। ভেতরে অনেক পুলিশ। ড্রয়িং রুমে দুই হাতে মুখ ঢেকে বসে আছেন ইনচার্জ। এঁকে আগেরবার দেখিনি। অন্য পুলিশেরা ভিড় করে দাঁড়িয়ে তাঁর সামনে। আমাদের সাড়া পেয়ে ইনচার্জ রক্তাভ চোখে মুখ তুললেন। ভয়, বেদনা, অবিশ্বাস মাখামাখি সেই মুখে। দু-জন মহিলা পুলিশ অনিশ্চিত মুখে তাকিয়ে। স্থানীয় এক মহিলাকে আনা হয়েছিল, যাঁর উপস্থিতিতে ডলোরেসকে আটক করা যায়। তিনি গুনগুন করে কাঁদছেন। অসীম ক্লান্তির পাহাড় ডিঙিয়ে চেয়ার ছেড়ে শরীরটাকে তুললেন ইনচার্জ। আমাদের নিয়ে গেলেন পাশের ঘরে।
খাবার ঘর। এখানে আগে আসিনি। ডাইনিং টেবিলের চেয়ারে বসে আছেন ডলোরেস। মাথা একপাশে ঝোঁকানো। চোখ খোলা, মুখ অল্প হাঁ। ঠোঁটের একপাশ দিয়ে সাদা ফেনা গড়িয়ে নামছে। তাঁর সামনে বসে এক ডাক্তার। হতচকিত, বিভ্রান্ত মুখ।
অক্ষয় দাঁত চিপলেন, ‘ব্লাডি ইডিয়ট! হোল বডি সার্চ করার কথা।’
‘করা হয়েছিল।’ জানালেন ইনচার্জ। ওষুধের স্ট্রিপটা নাকি ডলোরেস চেয়েছিলেন, কারণ এটা সুগারের ওষুধ। প্রতি রাত্রে তাঁর খাবার কথা। পুলিশ রাজি হয়নি। পুলিশ তাদের ডাক্তার নিয়ে এসেছিল ডলোরেসের বাড়ি। তাঁকে দিয়ে মেডিক্যাল চেক-আপ করিয়েছিল। ডলোরেস তখন ডাক্তারকে ওষুধের কথা বলেন এবং স্ট্রিপ দেখান। অত রাত্রে ওষুধ অন্য কোথাও থেকে আনানো পুলিশের পক্ষে সম্ভব ছিল না, কারণ কাছেপিঠে কোনো ফার্মাসি খোলা থাকবে না। তাই স্ট্রিপ দেখে আর ডলোরেসের ফোনে প্রেসক্রিপশনের ছবি ম্যাচ করিয়ে ডাক্তার অনুমতি দিয়েছিলেন। তাঁর সামনেই ওষুধ মুখে দিয়েছিলেন ডলোরেস। মিনিট দুয়েকের বেশি সময় দেননি তারপর।
ডলোরেসের মুঠো আলগা। অ্যালুমিনিয়ামের স্ট্রিপ উঁকি মারছে। খতিয়ে দেখার দরকার পড়ে না। ওষুধের স্ট্রিপ খুলে সেখান থেকে ট্যাবলেট বার করে অন্য ট্যাবলেট পোরার পদ্ধতি আমি জানি। স্ট্রিপ আবার টান টান করে পেতে দেওয়া হয়। অসাবধানি চোখ বুঝবে না, আগে থেকে খুলে রাখা ছিল।
“ডলোরেস তার মানে বুঝেছিলেন এমন কিছু ঘটতে পারে। হয়তো মায়ের সঙ্গে আমার কথোপকথনের বিবরণ পেয়েছিলেন।’ বললাম আমি।
‘তবু এসেছিলেন জেনিফারের বাড়ি? তাঁর তো জানার কথা এটা ফাঁদ।’
আমি অক্ষয়কে বললাম না, ধরা পড়ার পর ডলোরেসের চোখে স্বস্তি দেখেছিলাম। যেন নিয়তিনির্ধারিত মানুষ হাতের পিস্তল ফেলে দিয়ে স্বেচ্ছায় বধ্যভূমির দিকে হেঁটে যাচ্ছে। এতদিন ধরে বেড়াল-ইঁদুর খেলা চালিয়ে যাবার পর তাহলে তিনিও ক্লান্ত হয়েছিলেন! অথবা এগুলো আমি ভাবতে ভালোবাসি, আসলে কিছুই ঘটেনি এমন। সত্যিটা আর কখনো জানা যাবে না।
কিন্তু, অক্ষয় বিরক্তিতে ফেটে পড়ছিলেন। এতদিনকার স্থৈর্য প্রবল হতাশার চাপে টুকরো হয়ে গিয়েছিল তাঁর। ‘আমি কেসটা কী লিখব, মিস ভট্টাচার্য? এডওয়ার্ড ব্রাউনকে কি ডলোরেসই হত্যা করেছিলেন? করলে, তার এভিডেন্স কই? এতদিন ধরে এত গল্প শুনে, এত ঘুঁটি সাজিয়ে—শেষে এই—,’ মনে হচ্ছিল তিনি এবার হতাশায় মাটিতে বসে পড়বেন। দেওয়ালে হেলান দিয়ে আমার কাছে সিগারেট চাইলেন। এক কনস্টেবল বলতে গেলেন, ‘স্যার এখানে—’ কিন্তু, অক্ষয়ের চোখ দেখে ঢোক গিললেন।
‘আর, আমি? কতগুলো প্রশ্নের উত্তর পেলাম না, ভাবতে পারেন? অ্যাগনেসের কী হয়েছিল? কে বলবে আমায়, অফিসার মাহাতো? কোথায় গেল সে? ক্রিসের কী হল? ডলোরেস কি সত্যিই এতগুলো কাজ উন্মাদনার বশে করলেন, নাকি, ভেবেচিন্তে?’ চোখ বুজে নিজেকে প্রশ্নগুলো করছিলাম। তারপর সিগারেটে টান দিয়ে বললাম, ‘এটাই হয় জীবনে। সব রহস্যের ব্যাখ্যা আপনি পাবেন না। সেই একবার বলেছিলাম, রেবেকা কেস। আপনি কি এটা মেনে নিতে প্রস্তুত?’ ডলোরেসের নিথর শরীরের দিকে তাকিয়ে আমার প্রশ্ন এল, এ কি আমারই কৃতকার্য? কিন্তু, ক্লান্তি আমাকে খতিয়ে ভাবার অবকাশ দিল না। মনে পড়ল, দোতলার ঘরে শুয়ে আছেন মার্গারেট। হয়তো ঘুমিয়ে। নার্সের ভীতমুখ উঁকি মারতে দেখেছি। কিন্তু, মার্গারেটকে কে জানাবে ?
রাগত ভঙ্গিতে কাঁধ ঝাঁকালেন অক্ষয়। ‘এটা আমার চাকরি। আপনার বুদ্ধিবৃত্তিতে শান দেবার মাধ্যম, আর কিছু নয়। কিন্তু, আমাকে একটা রিপোর্ট লিখতে হবে। আই ডোন্ট গিভ আ ড্যাম অ্যাবাউট অ্যাগনেস অর ক্রিস। এডওয়ার্ড ব্রাউনের—আমরা তো আর অবিনাশ যাদবকেও তুলতে পারব না! ডিপার্টমেন্ট মোটামুটি নিঃসন্দেহ যে, তিনি নিরপরাধ।’
কিন্তু, আমি তাঁকে সাহায্য করতে পারতাম না। এবার পুলিশের মুখ বাঁচাবার দায়। কাল মিডিয়া বা মানবাধিকার কমিশন যখন প্রশ্ন তুলবে, তখন সেগুলো কীভাবে সামলানো হবে, সেসব আমার থেকে ভালো বুঝবেন অক্ষয়রা। ডিপার্টমেন্টাল এনকোয়ারি হবার সম্ভাবনা বেশি। আমি কী করতে পারতাম? ডলোরেস বেঁচে থাকলে তাঁর থেকে কথা আদায় করা যেত। মৃত ডলোরেন্স আমার ক্রুশকাঠ নন যাঁকে আমি বহন করতে পারি। অক্ষয় সে কথা জানতেন। তাই আমি বেরিয়ে গেলাম যখন বাড়ি থেকে, তিনি বাধা দিলেন না। দেওয়ালে হেলান দিয়ে সিগারেট খেয়ে যাচ্ছিলেন। বারান্দায় এসে একবার পিছু ফিরে দেখলাম। এক এক করে পুলিশেরা তাঁকে ঘিরে দাঁড়াচ্ছে। সেই চক্রব্যূহে দাঁড়িয়ে সিগারেট খেয়ে চলেছেন অক্ষয় মাহাতো। মাথার ওপর ডুমবাল্ব ঘিরে পোকাদের ভিড়। এই ছবিটা অনেকদিন আমার মনে ছিল। তারপর আমি মুখ ঘুরিয়ে রাস্তার দিকে হেঁটে গেলাম।
.
