২৬
কিন্তু আমাদের আমোদ প্রমোদ ও আনন্দ করা উচিত হইয়াছে, কারণ তোমার এই ভাই মরিয়া গিয়াছিল, এখন বাঁচিল ; হারাইয়া গিয়াছিল, এখন পাওয়া গেল।
-Luke 15:32
.
এই আখ্যান শেষ হয়েছিল যখন, আমি কলকাতা ফিরে টানা সাতদিন ঘুমিয়েছিলাম। ফোন ধরিনি। কাজের মাসির ডাকে দরজা কোনোদিন খুলেছি, কোনোদিন খুলিনি। এমনকী খাবারও খেয়েছি যতটা না হলে নয়। দীর্ঘ বছরগুলোর অনিদ্রার হিসেব চুকিয়েছিলাম—আমি কি সাফল্য উদ্যাপন করেছিলাম, না, ব্যর্থতা? সম্ভবত, কোনোটাই নয়, কারণ সাফল্য ও ব্যর্থতার সাদা-কালো ছবি ফুটে ওঠে একমাত্র গল্পেই। জীবন ওভাবে চলে না। কিন্তু, এগুলো পরের উপলব্ধি। সেইসময়টায় আমার মাথা ফাঁকা ছিল। গাঢ় ঘুমজলে শরীরকে ডুবিয়ে আমি নিঃসীম অন্ধকারে ভেসে গিয়েছিলাম। যখন ঘুম ভেঙেছিল, ঘামে ভেসে যাওয়া বিছানার দিকে তাকিয়ে বোধ হয়েছিল যেনবা দুঃস্বপ্ন দেখে জেগে উঠেছি। কিন্তু, প্রকৃতপক্ষে আমার ঘুম ছিল স্বপ্নহীন। বরং, জেগে উঠে অন্ধকার ঘরের দেওয়ালের দিকে তাকিয়ে আমার চোখে পর পর ছবি ভাসছিল—দার্জিলিং-এর রাস্তায় দেখা এক কালো ঘোড়া, গঞ্জের জঙ্গলের ভেতর খাটে শুয়ে থাকা ঘাড়ভাঙা কিশোরী যার পরনে ফুলছাপ ড্রেস আর চোখে রোদচশমা, তার মাথার কাছে দাঁড়িয়ে একটা জংধরা ফ্রিজ, অথবা, শালপিয়ালের বনের ধারে দাঁড়িয়ে তারছেঁড়া রিসিভার কানে ‘হ্যালো, হ্যালো’ করে যাওয়া বৃদ্ধ। আমি ছায়াছবির মতো তাদের চলাচল দেখেছিলাম আমার ঘরে। আমি কিছুই পারতাম না, আবার ঘুমিয়ে পড়া বাদে। আর, আমি সেটাই করেছিলাম।
মার্গারেটের ঘরে চাপ চাপ অন্ধকার ইতস্তত জমাট বেঁধেছিল। একটা অস্বাস্থ্যকর বদ্ধ হাওয়া গলার কাছে আটকে যাওয়া কফের মতো চেপে বসেছিল ঘরের ভেতর। জানালা বন্ধ বলে গুমোট লাগছিল বেশি। মার্গারেট জ্বলজ্বলে চোখে আমার দিকে তাকিয়ে ছিলেন। নার্সকে চোখের ইঙ্গিতে বললাম বাইরে যেতে। বাইরের লোকের কথা নার্সের শোনার কারণ নেই। দোনোমনো করে বেরিয়ে গেলেন নার্স। দরজা ভেজিয়ে দিয়ে ফিরে এসে বললাম, ‘অ্যাগনেসের ব্যাপারে আপনি অনেক কিছু জানেন, কিন্তু কাউকে বলেননি। আমি কি আমার অনুমানগুলো বলব? নাকি, আপনিই নিজে থেকে সব জানাবেন?’
মার্গারেট উত্তর দিলেন না। কিন্তু, তাঁর দৃষ্টি তীব্র হল। সেখানে এই মুহূর্তে উন্মাদনার লেশমাত্র ছিল না। ছিল সতর্কতার আভাস। যেন হিসেব করছেন, কতটা খাপ খুলবেন। তাঁর দিকে ঝুঁকে আমি বললাম, ‘আমার খটকা লেগেছিল, আপনি কেক নিয়ে যেদিন ব্রাউনদের বাড়ি গিয়েছিলেন। মেয়ের প্রতি আপনি এবং আপনার স্বামী দু-জনেই উদাসীন ছিলেন শুনেছি। আপনি থাকতেন অসুস্থতা নিয়ে, মাইকেল সারাদিন তাঁর কাজে ব্যস্ত থাকতেন। মেয়েরা নিজেদের মতো করে বেড়ে উঠছিল। এমন পরিবেশে, স্কুলে অ্যাগনেসের প্রতি সামান্য সদয় ব্যবহার করেছেন বলে একজনের বাড়ি আপনি কেক নিয়ে যাবেন, সঙ্গে করে নিয়ে যাবেন নিজের মেয়েকেও, সেটা আমার অদ্ভুত লেগেছিল। অদ্ভুত লাগত না, যদি আপনার অসুস্থতার ভেতর একটা বড়ো অংশ জুড়ে অ্যাগনেস থাকত। ধরা যাক, আপনি মেয়েকে নিয়ে অবসেসড ছিলেন যেটা বাড়াবাড়ির পর্যায়ে যেত মাঝে মাঝে। সেক্ষেত্রে এই ব্যবহার মানা যায়। কিন্তু, আপনার অসুস্থতা ছিল অ্যাগনেস-নিরপেক্ষ, বরং সেসব সময়ে আপনি কাউকেই চিনতেন না। সেক্ষেত্রে কেন আপনি এতটা করবেন?’
.
মার্গারেটকে দেখে ভয় হল তিনি যদি চিৎকার করে ওঠেন, অথবা, আক্রমণ করেন আমাকে। কিন্তু, মার্গারেট চোখ সরিয়ে জানালার দিকে তাকালেন। মাথা নেড়ে এই প্রথম ফিসফিস করলেন, ‘কেউ জানবে না। আমি কাউকে বলিনি।’
‘একমাত্র অ্যাগনেসকে বলেছিলেন, তাই না?
‘তুমি অ্যাগনেসকে জিজ্ঞাসা করো। আমি কিন্তু কাউকে বলিনি কোনোদিন।’ মার্গারেটের ভাস্কর্যসম মুখ অজস্র রেখা ও কাটাকুটিতে ভেঙেচুরে যাচ্ছিল। গলার শিরা ফুলে উঠছিল নীল হয়ে।
‘অ্যাগনেসকে সাসপেন্ড করার পর যে মিটিং হয়েছিল, সেখান থেকে ডেভিড বেরিয়ে বাইরের বেঞ্চে বসা অ্যাগনেসের সঙ্গে দেখা করেছিলেন। মাইকেল সেসময়ে প্রিন্সিপালের ঘরে। কাজেই, ডেভিডের সঙ্গে মাইকেলের দেখা না-হবারই কথা। ডেভিড তখন জানতে পারেননি, অ্যাগনেসের বাবা কে। অ্যাগনেসের পরিচয় তিনি পেয়েছিলেন সেই রাত্রে, যেদিন আপনি কেক নিয়ে এসেছিলেন। তারপর আতঙ্কে দুই পা পিছিয়ে যান। এসব আমি অন্যের মুখে শুনেছি।
মার্গারেট আবার ঘাড় ফিরিয়ে আমাকে দেখলেন। ‘অনেকদিন হয়ে গেল। তুমি সব কেন মনে রেখেছ?’
‘আরেকটা কথা। আপনার টেবিলে অনেক ওষুধ দেখছি। ডলোরেস আপনার কিছু অসুস্থতার কথা আমাকে জানিয়েছেন।’ ইতস্তত করে বললাম, ‘একটু আগে আপনার নার্সের সঙ্গে কথা বললাম। আপনার প্রেসক্রিপশনে বাইপোলারিটির কিন্তু উল্লেখ নেই।’
মার্গারেট অনেকক্ষণ নীরব থাকলেন। তারপর বললেন, ‘তোমার প্রশ্নগুলো কী?’
পরদিন অক্ষয় মাহাতোকে ফোন করে সব জানালাম আমি। অক্ষয় প্রথমে বিশ্বাস করতে পারছিলেন না, তাই আমার অনুরোধে ইতস্তত করছিলেন। তাঁর মূল সমস্যা যুক্তিযুক্ত। এডওয়ার্ড ব্রাউনের হত্যারহস্যে আমি সরাসরি আলো ফেলছি না। বরং, সাহায্য চাইছি প্রায় চল্লিশ বছর আগেকার দুটো অসমাধিত রহস্যের সমাধানের জন্য। আমার পক্ষের যুক্তি ছিল, এই রহস্যগুলোর সমাধানের ভেতর এডওয়ার্ড ব্রাউনের হত্যারহস্যের চাবিকাঠি লুকিয়ে। অক্ষয় ফোনের ওপার থেকে দ্বিধাজড়িত কণ্ঠে বললেন, ‘আমি রাজি হলেও ডিপার্টমেন্ট রাজি হবে কি?
‘একটা রাতের ব্যাপার। আপনি চাইলে স্থানীয় থানাকে কনভিন্স করাতে পারেন।’ ‘কিন্তু, আপনার পুরোটাই অন্ধকারে ঢিল ছোড়া। আপনি জানেন না এতে সত্যিই লাভ হবে কি না। যদি না হয়, আমাকে প্রশ্নের মুখে পড়তে হবে।’
এই আশঙ্কা ওড়াতে পারলাম না। নিশ্চিত ছিলাম না আমিও। আমি তো শুধু অনুরোধই করতে পারি, তাই তাঁকে বললাম অন্তত দু-জন পুলিশকে যদি আনা যায় কারণ একজনের জীবনহানির আশঙ্কা জড়িয়ে। অক্ষয় জানালেন, তিনি যেটা করতে পারেন, ডেপুটেশনে দুজন কনস্টেবলকে নিয়োগ করতে পারেন এবং কারণ দেখাতে হবে এডওয়ার্ড ব্রাউনের কেস, যেহেতু সেজন্যই তিনি এখানে এসেছেন। তিনি নিজেও স্পটে থাকবেন। এটুকুই যথেষ্ট ছিল। ফোন রাখার আগে অক্ষয় জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আপনি কিছু প্রমাণ করতে পারবেন কি না সেটা পরের কথা। কিন্তু, নিজের অনুমান নিয়ে কি আপনি নিশ্চিত?’
‘পুরোপুরি নয়। আমি ত্রিকালজ্ঞ নই যে, চল্লিশ বছর আগেকার ঘটনাকে চোখের সামনে দেখতে পাব। কিন্তু, কিছু সিদ্ধান্তের বিকল্প নেই আমার কাছে। আপনাকে সব জানালাম। আপনার কাছে অন্য ব্যাখ্যা থাকলে বলুন। আপনি জানেন, প্রমাণ করার কাজ আমার নয়, পুলিশের।’ অক্ষয় কয়েক মুহূর্ত নীরব থেকে ফোন কেটে দিলেন।
.
তারপর জেনিফারের বাড়ি গেলাম। তাঁকে মনে করিয়ে দিলাম যে, আমার একটা কাজ তাঁকে করতে হবে, কথা দিয়েছিলেন। সব শুনে জেনিফার অবিশ্বাসের চোখে তাকালেন। বললেন, ‘তুমি কি পাগল? আমি এসব করি না। অনেক শিক্ষা হয়েছে আমার। আর অন্যের ব্যাপারে নেই।’
‘আমি কিন্তু আপনাকে বাঁচাচ্ছি।’
‘একে বাঁচানো বলে না। যা করতে বলছ তাতে পুলিশ কালকেই আমাকে তুলবে।’ ‘তুলবে না। পুলিশ সব জানে। কিন্তু, আপনি যদি না-করেন তাহলে আমার হাতে অন্য উপায় থাকবে না।’
আমার দিকে তাকিয়ে রাগে দাঁত কিড়মিড় করলেন জেনিফার। ‘অসভ্য মেয়েছেলে ! তুমি আমাদের সবাইকে মারবে। বার্বি কী কুক্ষণে যে তোমাকে থাকতে দিয়েছিল!’
‘আপনি চান না, অ্যাগনেস আর ক্রিসের কী হয়েছিল জানতে? নিজে তো এতদিন ভূত নামিয়েও জানতে পারেননি।’
“আমি ভূত নামাই না, ড্যাম ইউ!’ জেনিফার তেড়ে উঠলেন। ‘অকাল্টের তুমি কিছু বোঝো? এসব প্রাচীন জ্ঞান।’
‘আমার কিছু এসে-যায় না। এই কাজটা আপনাকে করতে হবে। কাল রাত্রিবেলা। আপাতত ফোনগুলো করুন। যা বলতে হবে, লিখে এনেছি সব।’ কাগজ বাড়ালাম। ‘যদি গড়বড় করেন—সিআইডির সঙ্গে কাজ করছি আপনি জানেন। ওরা মুখিয়ে আছে কাউকে বলির পাঁঠা বানাবার জন্য। তার সঙ্গে আমার মিডিয়া কানেকশন। দু-দিনের মধ্যে আপনি খবর হয়ে যাবেন।’
বিষঝরানো দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে মাথা ঝাঁকালেন জেনিফার, ‘কালকের পর তোমার মুখ দেখতে চাই না আমি। বিদেয় হও এখন।’
‘এখনই না। আপনি আমার সামনে বসে ফোনগুলো করবেন। তারপর যাব। আমি চলে যাবার পর যদি ভাবেন যে, আবার ফোন করে সত্যিটা জানিয়ে দেবেন, সে-ভাবনা ছাড়ুন। আপনার আমার সবার, এই কেসে যারা জড়িয়ে, তাদের ফোন ট্যাপ করছে পুলিশ। কোথায় কাকে ফোন করছেন আমার কাছে খবর চলে আসবে।’
আতঙ্কের দৃষ্টিতে হাতের ফোনের দিকে তাকালেন জেনিফার। নির্জলা মিথ্যে বলতে আমার গলা কাঁপে না। কিন্তু, ভয় হচ্ছিল যে, এবার তেড়েমেড়ে বলে ওঠেন যদি, ‘যা করে করুক আমি পারব না,’ তাহলে আমার হাতে অন্য তাস থাকবে না। কিন্তু, জেনিফার ফোন তুললেন। কাঁপাগলাকে স্বাভাবিক করে বললেন, ‘হ্যালো? শোনো, একটা অদ্ভুত ব্যাপার ঘটেছে। কাল রাত্রে অ্যাগনেস এসেছিল। না না, প্ল্যানচেটে না। আমি তখন শুয়ে পড়েছি। আরে, শোনো না আগে পুরোটা! অ্যাগনেস অনেক কিছু আবোল-তাবোল বকে গেল । চিরুনিটা ফেলে গেছে বলল, নাকি খুঁজে পাচ্ছে না। বাথরুমের সিঁড়ি, বালিশ, আরও নানা কথা— আমি মাথামুণ্ডু কিছু বুঝলাম না। আমায় কে বলবে এগুলো! আমি কী করে জানব! আমি তো এখনও জানি না এসবের অর্থ কী! আজ রাত্রে আবার আসবে বলেছে। বলল, ক্রিসকে কে সরিয়েছে ও জানে, আজ বলবে। ক্রিস, মানে, ব্রাউনদের ওই বাচ্চাটা। অ্যাগনেস কী করে জানল? খালি বলে যাচ্ছে, বাথরুমের সিঁড়ি। আমি কিছু বুঝছি না গো! ওর আত্মা তাহলে ঘুরে বেড়াচ্ছে? কাকে আর বলব এসব, ভাবলাম তোমাকেই জানাই। বুড়ো হয়েছি, এসব শুনলে মাথা অস্থির লাগে আজকাল। আজ রাত্রে দেখি, কী জানায়। বললি তো বললি,
মনীষা বেঁচে থাকার সময়ে বলে গেলি না? বড়ো যন্ত্রণা নিয়ে মরেছে মেয়েটা। যাকগে। রাখি গো আজ। মনটা খারাপ লাগছে।’
বেশ অনেকটা সময় লাগল ফোনে, কারণ উলটোপক্ষের ধাতস্থ হওয়া সহজ ছিল না। ওপাশ থেকে উত্তেজিত স্বরও শুনলাম। জেনিফার দেখলাম চমৎকার অভিনয় করে গেলেন, যা যা যেভাবে বলার ছিল। আমার মনে হল, মুখে যা বলুন না কেন, তাঁর নতুন ভূমিকা বেশ উপভোগ করছেন। ফোন রেখে প্রথম প্রশ্ন যেটা করলেন, তা হল, গল্পটা কী। বুঝলাম, ভেতরে উত্তেজিত হয়েছেন। নতুন কেচ্ছার সন্ধান। আমি কথা দিলাম, কাল রাত্রে সব খুলে বলব। ধন্যবাদ দিতে গেলাম, হাত নাড়িয়ে বললেন, ‘এবার বিদেয় হও, আমি তোমাকে সহ্য করতে পারছি না।’ আমি তাঁকে মনে করালাম আগামিকাল রাত্রে কী করতে হবে। জেনিফার উত্তর না-দিয়ে কমিক্সের পাতায় মুখ গুঁজলেন।
বিকেল বেলা স্যাংচুয়ারির গেটে দাঁড়িয়ে আমার নিজেকে নিঃশেষিত মনে হল। সমস্ত কাজ যেখানে যা ছিল, সমাধা করেছি। আমার কাছে রয়েছে একটা গল্প, যাকে সত্যি বলে প্রমাণ করতে পারব কি না, জানি না। কিন্তু, তবু যেগুলো অনুমান করেছিলাম তাদের কয়েকটার সপক্ষে যুক্তি পেয়েছি। সব হয়ে যাবার পর আমার হাতে কী থাকল? রাঙা রোদ শুকিয়ে এল কাঁঠালগাছের মাথায়। তার ডাল থেকে ঝোলানো একটা টায়ার আপনমনে দুলছিল। মগডাল থেকে জোড়া পুতুল আমার দিকে স্থিরচোখে তাকিয়ে ছিল। আমার মনে হল, আজ কলকাতা ফিরে গেলে বেশ হত। এরপর ঘটনাক্রম নিজের মতো চলবে, আমার সেগুলোতে কিছু করার নেই। ক্লান্ত লাগছিল। একটা অবসাদের হাওয়া ধুলো উড়িয়ে ঘুরপাক খাচ্ছিল আমার চারপাশে। আমার পেছনে যে ইট কাঠের ধ্বংসস্তূপ, তার অন্তর্গত ইতিহাসকে চোখ বুজে ভাবতে গিয়ে আমি কেঁপে উঠলাম। মনে পড়ল সন্ত অগাস্টিনের উক্তি, ‘ঈশ্বরের অন্তত একজন সন্তান ছিলেন যার কোনো পাপ ছিল না। কিন্তু, ঈশ্বরের এমন সন্তান নেই যার কোনো যন্ত্রণা ছিল না।’
তখন আমার চোখে পড়ল—অনেকদিন পর তাকে দেখছি, সে আগের মতোই নিজের মনে গুনগুনিয়ে গান গাইতে গাইতে রাস্তা হাঁটছিল। তার হাতে ধরা ছিল বেতের কঞ্চি রংচটা স্কার্ট ও ফ্যাকাশে কুর্তি তার স্বভাবজাত উচ্ছ্বাসকে দমাতে পারছিল না। চলতে চলতে আমার দিকে তার চোখ পড়ল যখন, হাসিতে লুটিয়ে পড়ল দীপিকা সরেন। ‘আবার ফিরে এসেছ? বেঁচে আছ তো, নাকি, ভূত হয়ে এসেছ? ছায়া পড়ে তোমার?’ তখন আমার ক্লান্তি কেটে গেল। তার সঙ্গে বকবক করতে করতে দুই পা, পাঁচ পা হেঁটে জানতে পারলাম তার ইচ্ছে ব্যাঙ্গালোর চলে যাবার। সেখানে নাকি অনেক ছোটোখাটো স্টার্টআপের ফান্ডিং মেলে । তার এক বয়ফ্রেন্ডও হয়েছে যে বোকারোতে চাকরি পেয়েছে। তারপর দীপিকা আমার হাত চেপে ধরল, ‘বাড়িতে বোলো না কিন্তু ও মুসলমান।’ আমাকে উত্তরের সুযোগ না-দিয়ে হাত ছাড়ল পরক্ষণে, ‘ওহ্, তুমি কী করে-বা বলবে! আমাদের তো চেনোই না। আমাদের বাড়িতে এসো না কিন্তু। আমরা তোমাদের পছন্দ করি না, বলেছিলাম না?
আমরা কথা বলতে বলতে জলাভূমির ধারে এসে দাঁড়িয়েছিলাম। ছোপ ছোপ অন্ধকার নেমে আসছে বিস্তীর্ণ প্রান্তরে। ঘাসের বন হাওয়ায় অল্প দুলছে। গ্রীষ্মের তাপ ছাড়তে গিয়ে মাটি হতমান। রোদে জ্বলা ঘাসের গন্ধে চরাচর আমোদিত হয়েছে। দীপিকা হাত তুলল, ‘ওই দেখো ভূত।’ আমার চোখে পড়ল, বহুদূরে অ্যালিস দাঁড়িয়ে, জেনিফারের বোনঝি। সে আমাদের দিকে তাকিয়ে নেই। তার ঘাড় ফেরানো। কাঠের মতো দাঁড়িয়ে। সেই একইরকম সাদা ড্রেস তার পরনে। তার মাথায় কি আজও থাকবে ডালপালার মুকুট? এতদূর থেকে বুঝতে পারছি না। কিন্তু, তার দাঁড়ানোয় কিছু একটা ছিল। তখন অ্যালিস ডান হাত তুলল, যেন আকাশকে নৈবেদ্য দেবে। আমি দীপিকার হাত ধরে টানলাম, ‘চলো!’
‘কোথায়?’
‘অ্যালিসের কাছে।’
‘কেন? ও কিন্তু ভূত সাজে। কাছে গেলেই পালিয়ে যায়।’
‘তবু চলো।’
বুকসমান ঘাসবন ভেদ করে আমরা এগোচ্ছিলাম। মাঝে মাঝে চোখের আড়াল হয়ে যাচ্ছিল অ্যালিস। আমার ভয় হচ্ছিল, সে অদৃশ্য হয়ে যাবে হাওয়ার ভেতর। তারপর দৃষ্টি উন্মুক্ত হচ্ছিল, ওকে দেখতে পাচ্ছিলাম আবার। এখানেওখানে ইতস্তত অন্ধকার একটার সঙ্গে আরেকটা মিশে যাচ্ছিল। সন্ধে নেমে আসছিল শান্ত পায়ে। আকাশে মিটমিটে তারা ফুটল। মাঝে মাঝে ঝোড়ো হাওয়া আমাদের চলাচল এলোমেলো করছিল। আমি পথ ভুল করে বার বার জলাভূমিতে নেমে যাচ্ছিলাম। দীপিকা রাস্তা চেনে, সে আমার হাত ধরে এগিয়ে নিয়ে গেল। জলাভূমির পাঁকে অন্ধকার পিছলে গেল। তারাদের প্রতিচ্ছবি দেখা দিয়ে মিশে গেল স্থির জলে। মরা আমগাছের কঙ্কালে একটা চিল বসে ছিল। আমাদের মাথার ওপর দল বেঁধে ঘুরছিল অনেক কাক। তারা বাসায় ফেরার আগে গোল পাক খেয়ে বিচিত্র নকশা তৈরি করছিল ধূসর আকাশের গায়ে। আমি জানতাম না, কেন এগিয়ে চলেছি। অ্যালিস ফিরে তাকায়নি। এরকম নিস্তরঙ্গ সন্ধ্যার নেভা আলোয় তাকে অ্যালিসের মূর্তি লাগতে পারত, কারণ সে একইভাবে পা গেঁথে আছে। দীপিকা ফিসফিস করল, ‘তোমার ভয় লাগছে না তো?’ কিন্তু, আমার কিছু মনে হচ্ছিল না। আমি শুধু অ্যালিসের সামনে যেতে চেয়েছিলাম। ধাক্কা দিতে চেয়েছিলাম তাকে। কারণ, সে যখন হাত তুলেছিল, অত দূর থেকেও আমি স্পষ্ট দেখেছিলাম। তার হাতে একটা পুতুল ধরা ছিল।
তার সামনে গিয়ে দাঁড়াবার সুযোগ অ্যালিস দিল না। সে আমাদের দিকে তাকায়নি, মাথা উঁচু করে এগিয়ে গেল সোজা। আমি তাকে ডাকতে গিয়ে থেমে গেলাম। তার মাথায় বরাবরের মতো মুকুট। তার পিছু নিয়েছে আদারং বেড়াল। অ্যালিসের হাতে তখনও ধরা ছিল একটা মাথাভাঙা পুতুলের ধড়। সেরকম পুতুল, যাকে আমি জোহার হালে-তে কুড়িয়ে পেয়েছিলাম। আমি ও দীপিকা ঘাস ঠেলে অ্যালিসের পিছু নিলাম। অ্যালিস হাঁটতে হাঁটতে জলাভূমির অপরপ্রান্তে চলে যাচ্ছে। ছোটো হয়ে যাচ্ছে তার মূর্তি। আমরা দ্রুত পা চালালাম। দীপিকা চাপাগলায় একবার বলল, ‘কেন?’ কিন্তু, বাতাস এসে তার কথা ভাসিয়ে দিল। আমরা দু-জন হাত ধরে অ্যালিস ও তার পায়ে ঘোরা বেড়ালের পিছু পিছু এগিয়ে গেলাম। ওরা দু-জন হাঁটছিল, যেন হাওয়ায় ভেসে যাচ্ছে, আরামের ও মৃদুমন্দ। আমি জানি, অ্যালিস বুঝেছে আমরা তার পিছু নিয়েছি। আমরা নিজেকে লুকোবার চেষ্টাও করিনি। মনে হচ্ছিল, সে আমাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে চলেছে গভীরতর কোনো অন্ধকারের ভেতর। সন্ধে ঘন হচ্ছে। কিছুক্ষণ পর নিবিড় কালোয় ঢেকে যাবে মাঠ। আমি অ্যালিসকে খুঁজে পাব না।
কিন্তু, অ্যালিস দাঁড়িয়ে গেল। সেই ভাঙা অ্যাম্বাসাডার, তার পাশে থামল কয়েক মুহূর্ত। তারপর হাত বাড়িয়ে পুতুলটাকে ছুড়ে দিল। দূর থেকে বুঝলাম, জানালা গলে পুতুল ঢুকে গেল গাড়ির অন্ধকারে। অ্যালিস ছুটে পালাল, তার পিছু পিছু অনুগত বেড়াল।
আমরা ধীরপায়ে এগিয়ে গেলাম অ্যাম্বাসাডারের কাছে। কতকালের পুরোনো এই গাড়ি! শরীরের অর্ধেকটা মাটিতে বসে গেছে। একদিকের দরজা খুলে ঝুলছে। ভেতরে আগাছা ৷ সিটের চামড়া খুলে লোহার কঙ্কাল। স্টিয়ারিং-এ সাপের খোলস জড়ানো। টায়ারের হাড়গোড়ের ফাঁক দিয়ে একটা বড়ো পোকা বেরিয়ে এসে লাল চোখে আমাদের দিকে তাকাল। কিন্তু, আমরা তাকে দেখিনি। আমরা এমনকী আগাছা বা স্টিয়ারিংকেও লক্ষ করিনি। আমরা তাকিয়েছিলাম পেছনের সিটে। যার কিছুটা চামড়া তখনও অবশিষ্ট ছিল।
সেই সিটে একটা প্রমাণ সাইজের পুতুল বসানো। হাফপ্যান্ট, লাল গেঞ্জি, হাসিমুখ। দূর থেকে দেখলে দুই কি তিন বছরের বাচ্চা মনে হওয়া আশ্চর্যের নয়। বয়েস হয়েছে পুতুলটার। ত্বকের চকচকে ভাব উধাও, সেখানে গেড়ে বসেছে সবজেটে ছোপ। আমার চোখে পড়ল, তার কোমরের কাছে দম দেওয়া চাবি। ভেতরে ব্যাটারি পুরে চাবিতে দম দিলে এ ধরনের পুতুল হাসিমুখে ঘাড় ফেরায়। হেঁটেও যায় কয়েক পা। কিন্তু, সাধারণ দম দেওয়া পুতুল নয়। সিনেমার শুটিংএ যেসব স্টান্টে শিশুদের দরকার পড়ে, সেই দৃশ্যগুলোতে জীবন্ত শিশুদের বদলে এরকম পুতুল নিয়ে কাজ করা হয়। ক্যামেরার কারসাজিতে এদের দেখায় আসল শিশুর মতো। দূর থেকে দেখলে, কুয়াশা অথবা মেঘের কারসাজি যদি থাকে, তাহলেও জীবন্ত মনে হতে পারে।
‘ক্রিস।’ আমি ফিসফিসিয়ে বললাম। এর বেশি আমার গলা দিয়ে বেরোত না, কারণ অযৌক্তিক অশ্রুতে আমার স্বর রুদ্ধ হচ্ছিল।
দীপিকা আমার হাতে চাপ দিল, “দিদি!’ চোখে পড়ল, যে পুতুলটাকে অ্যালিস ছুড়ে দিয়েছিল গাড়ির ভেতর, সেই মাথাভাঙা পুতুল মেঝেতে গড়াগড়ি খাচ্ছে। বড়ো পুতুলের পায়ের নীচে। এরকমই একটা মুন্ডুছেঁড়া পুতুলকে একরাতে অ্যালিস আমার দিকে ছুড়ে দিয়েছিল। অ্যালিস কি তাহলে সব জানত? কী বোঝাতে চেয়েছিল ও? আমি ওর ইঙ্গিত ধরতে পারিনি। পারলে কি তখনই সন্ধান পেয়ে যেতাম ক্রিস নামক পুতুলের? আমি মাটির ওপর বসে পড়লাম। বারবারাকে উন্মাদ বানিয়ে দিয়েছিল এই পুতুল, বছরের পর বছর তাকে দুর থেকে হাতছানি দিয়েছিল। মনীষা একে দেখে—আর আমরাও—যে এই পুতুলকে দেখিয়ে গেছে বছরের পর বছর, সে কতটা নিষ্ঠুর ও নির্মম হতে পারে? কিন্তু, এখন কত নিরীহভাবে বসে আছে! তবু, ছুঁতে ভয় লাগছে আমার। মনে হচ্ছে আঙুল পুড়ে যাবে। তখনই ঘাড় ঘুরিয়ে হেসে উঠবে কচি গলায়। এত সহজ সমাধান, তবু আমাদের মাথায় এল না! তার বলি হল মনীষা, বারবারা, আমি, আমরা সবাই! আমি দু-হাতে মুখ ঢেকে হু-হু করে কাঁদলাম। দীপিকা কী বুঝল, জানি না। আমাকে জড়িয়ে পাশে বসে ছিল। অন্ধকার চেপে ধরল আমাদের। ঝিঁঝির ডাক তীব্র হল, স্তব্ধ হল পাখির দল। পুতুল একইভাবে সামনে তাকিয়ে হেলান দিয়ে বসে।
অনেকটা সময় পর আমি সামলালাম নিজেকে। দীপিকা আমাকে ধরে তুলল। আমি ওকে বললাম, ‘দীপিকা, এত বছর ধরে একটাই পুতুল এখানে আছে, এমন হতে পারে না । অতদিন একটা বস্তু টেকে না। এর নিশ্চয় ভাই, বোন ছিল।’ কিন্তু, দীপিকা বুঝল না আমার কথা। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকল। ‘আমি নিশ্চিত, জানো,’ আবার বললাম, ‘পুতুলটা গাড়ির সিটে ছিল না। তাহলে এতদিনে কারোর চোখে পড়ত। নিশ্চয় ডিকিতে রাখা ছিল। এত পুরোনো ভাঙাগাড়ির ডিকি খুলে কেউ চট করে দেখবে না। অ্যালিস পুতুলটাকে বার করে পেছনের সিটে বসিয়েছে, আমার ধারণা। যাতে আমাদের চোখে পড়ে।’ দীপিকা চাইছিল পুতুলটাকে বার করে আনতে। আমি বাধা দিলাম। পুলিশের এভিডেন্স। চাইলে হাতের ছাপ পাওয়া যেতে পারে।
গাড়িকে সেই জায়গায় রেখে আমরা ফিরে এলাম। যা চেয়েছিলাম, সেই সব কিছুর উত্তর আমার চোখের সামনে রাখা ছিল। পুতুলও হয়তো বছরের পর বছর অ্যাম্বাসাডারের ভেতর বানিয়ে ফেলেছিল তার আবাদ। তিন বছর আগে আমি দৃশ্যে আচ্ছন্ন ছিলাম। এতটাই যে, তার অর্থ বা ইতিহাসের দিকে মন দিইনি। আজ এতখানি অপচয়ের পর আমার চোখের সামনে পর্দা খুলছে। দরকার ছিল না, এত এত ক্ষয়—
স্যাংচুয়ারির সামনে এসে দীপিকা বিদায় নিল। সে আগের মতো হাসছিল না। চলে যাবার আগে তাকে অনেকটা সময় জড়িয়ে ধরে থেকেছিলাম। তাকে জানালাম, সে চাইলেই কলকাতায় আমার বাড়ি আসতে পারে। যতদিন পারে থেকে যাবে। দীপিকা সরলমনে জিজ্ঞাসা করল, ‘কেন?’ সত্যিই তো, আমরা কেউ কাউকে চিনি না। আমি উত্তর দিইনি, কারণ ও বুঝবে না ।
.
