নৈশ অপেরা – ২৫

২৫

বন্ধু সর্ব্বসময়ে প্রেম করে, ভ্রাতা দুর্দ্দশার জন্য জন্মে।

— Proverbs | 17:17

.

বারান্দা থেকে তনয়া হাত নেড়ে আমাদের ডাকল। গাড়ি থেকে নেমে অ্যারনের পাশে হাঁটার সময়ে খিটখিটে স্বরে জানালাম এর কোনো দরকার ছিল না। কিন্তু, আমি আসলে আসতে চেয়েছিলাম, আরও আগেই। সাহসে কুলোয়নি। সেই কতদিন আগে ও আমাকে মারামারির জায়গা থেকে বার করে এনেছিল। কতদিন আমার পাশে দাঁড়িয়ে থাকত রাত্রিবেলা, আমি যখন ক্রিসকে খুঁজেছি। গত তিন বছরে যে কয়েক বার রাস্তায় টুকটাক দেখা হয়েছে, অপ্রতিভ হয়ে চোখ নামিয়ে সরে গেছি দু-জন। অথবা, শুকনো গলায়, ‘ভালো আছ?’ শেষ দুই মাসে তো সেটুকুও না। আমাদের দেখা হয়নি। হলেও বাক্যালাপের পরিস্থিতি ছিল না। আমার গায়ে শুনেছি ওয়েলস রক্ত বইছে। আমাদের গোঁ সাংঘাতিক। কিছুতেই কথা বলতাম না আগ বাড়িয়ে। হিল্ডার সঙ্গেও বলিনি ঝগড়ার পর। প্রতিবার ও আমার রাগ ভাঙিয়েছে।

ঘরের ভেতর জানালার ধার ঘেঁষে নিজের জায়গায় বসে ছিল অবিনাশ। আমায় দেখে অপ্রস্তুতের মতো হাসল। আমি তো এগোব না! কিন্তু, কত বুড়িয়ে গেছে ও! মুখের কালো ছোপগুলো স্পষ্ট হয়েছে। চুল উঠে মাথার সামনে মস্ত টাক। গালের চামড়া আরও ঝুলেছে না? ভুঁড়িও আগে এত ছিল কি? পাজামাটা ঝলঝলে নোংরা, ঝোলের দাগ। এই লোক সারাদিন মল্লিকার্জুন মনসুর শোনে, বিশ্বাস করতে হবে?

‘কেমন আছ তুমি?’ অবিনাশ প্রশ্ন করল। ন্যাকা! ও কি জানে না আমার কেমন থাকার কথা? আমার প্রতিটা নিশ্বাস-প্রশ্বাসকে চেনে।

‘তুমি তো শরীরের বারোটা বাজিয়েছ। সারাদিন গিলছ নাকি বসে বসে? তোমার বউ আছে, না, মরে গেছে, নাকি, ভেগে গেছে অন্য কারোর সঙ্গে?’

‘সবাই আছে নিজের জায়গায়।’ হাসল অবিনাশ। ‘মাল খাবে?’ কিন্তু, তনয়া বারণ করল, এখন না। এই ছুঁড়ি সবার ওপর লাঠি ঘোরাবে নাকি? বলা নেই কওয়া নেই, উড়ে এসে জুড়ে বসেছে। ঘেঁটি ধরে বিদেয় করব একদিন। জিভ সুলোচ্ছে মদের জন্য। রাত আটটা বাজে, খাবার ভালো সময়। কিন্তু, অ্যারন আর তনয়া চোখ পাকিয়ে আছে। শান্তি দেবে না এরা! অবিনাশ তখন জানাল, ও পুলিশের চোখে সন্দেহভাজন। আমাদের চোখে? ও সোজা চোখ তুলে তাকাতে পারছে না কেন? আমি তো শুরু থেকেই জানতাম ও নির্দোষ। মাঝে নতুন কিছু ঘটেনি যাতে করে আবার পুনর্মিলন জাতীয় ন্যাকামি করতে হবে। সব তনয়ার দোষ! কিন্তু, ও আমাকে এখানে টেনে আনল, যাতে অবিনাশের সঙ্গে দেখা হয়। আবার কি সহজ হবে আগের মতো? অথবা, হয়তো সব সহজই ছিল? জটিল বানিয়েছি আমরাই? অবিনাশ চুপচাপ। মাথা নীচু করে ওকে বসে থাকতে দেখলে আমার ভালো লাগে না।

তনয়া পিছু ফিরে অবিনাশের আদ্যিকালের টেপরেকর্ডারে খুটখাট করছিল। এবার মৃদুকণ্ঠে বেজে উঠল কুমার গন্ধর্ব। ‘বাবার প্রিয় ছিল। আমার অবশ্য ইনস্ট্রুমেন্টাল বেশি পছন্দের।’ ফিরে এসে সোফায় গা এলিয়ে চোখ বুজল তনয়া। ও কি গান শুনতে এসেছে এখানে? অ্যারনেরও দেখি তাড়া নেই। জানালার কবাটে বসে অন্যমনস্ক তাকিয়ে আছে বাইরের অন্ধকারে। অবিনাশ চোরা চোখে মাঝে মাঝে দেখছিল আমাকে। মনীষা মারা যাবার পর থেকে আমাদের বাড়িতে আসেনি। নিজের বাড়িতে কতদিন লুকিয়ে থাকবে? আমার সঙ্গে চোখাচোখি হতে মাথা নামাল। হয়তো বুঝতে পারছে না কী বলবে। নার্ভাস হয়ে আছে।

‘তুমিই-বা এমন নববধূর মতো ব্যবহার করছ কেন?’ বিরক্ত লাগল। অকারণ আবেগফাবেগ বড্ড রোমান্টিক বাবা! আমার ওই কারণে শেলি, কিটসের কবিতা পড়ে হাসি পেত। অবিনাশের কাছে এসেছি, ওকে সন্দেহ করি না, ব্যস, মিটে গেল। যাও সবে নিজ নিজ কাজে! তা না-করে যদি এখন সাতকাহন ব্যাখ্যা দিয়ে নিজের কথা আরম্ভ করে, অথবা, ঘ্যানঘ্যানে দুঃখকষ্টের কথা বলে—ওহ্ মদ পেলে কত ভালো হত! কিন্তু, অবিনাশ কথা খরচ করার লোক নয়, ভাগ্যিস! এখনও আমার মুখঝামটা খেয়ে কিছু বলল না। কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে থাকল আমার দিকে। তারপর বড়ো নিশ্বাস ফেলে তনয়াকে জিজ্ঞাসা করল সে কতদূর এগোল৷

‘একটা মেজর জায়গায় আটকে আছি। সেটার জট যতক্ষণ না খুলছে, বাকিটা খুলে লাভ নেই ।

‘সেটা কী?’

‘তিন বছর আগে মনীষা কাকে দেখে ঝাঁপ দিয়েছিলেন? আমরাই-বা কাকে দেখেছিলাম?’ ভুরু কুঁচকে বলল তনয়া। আমার ঠোঁট নড়ছে। এরা ব্লাডি অবিশ্বাসী। কিন্তু, আমি তো জানি—তনয়া আমাকে হাত তুলে থামাল। ‘না বারবারা, ক্রিস নয়। কিন্তু, আমরা সবাই একসঙ্গে ভুল দেখিনি। যুক্তিহীন কিছু বললেও মানব না আমি। আমার মন সরলরেখায় চলে।’ আচ্ছা, সেটা নাহয় বাদ দিলাম। বাকিটুকুর উত্তর? ‘সত্যি কি না জানি না, কিন্তু আমার প্রশ্নের উত্তর তারা দিতে পারছে। তবে, মাইনর কিছু প্রশ্ন থেকে গেছে, সেগুলো যথাসময়ে জানতে পারব। তার মধ্যে একটা সমস্যা হল, এমন কাউকে আমি পাইনি যে অ্যাগনেসের ভূতকে সামনাসামনি কাছ থেকে দেখেছে। হয় কাছে দাঁড়ালে পেছন থেকে দেখেছে, যেমন কিটি গোমসের মেয়ে, নয়তো সামনে থেকে দেখলে সেটা দেখেছে দূর থেকে, যেমন মনীষা বা সমর দোসাদ। এমন একজনেরও যদি সন্ধান পেতাম, যে হয়তো পাঁচ কি দশ ফুট দূরত্বে দাঁড়িয়ে অ্যাগনেসের মুখ দেখেছে, তাহলে অ্যাগনেসের ভূতকে আসলে কেমন দেখতে, তার একটা বর্ণনা পেতাম।’

‘তুমি বিশ্বাস করো, অ্যাগনেসের ভূত তাহলে আছে? এই নাকি নিজেকে যুক্তিবাদী বলো?’ প্রশ্ন করল অবিনাশ।

‘অনেকে একই জিনিস দেখলে তাকে অস্বীকার করা বরং অযৌক্তিক। সে যা-ই হোক, এটা বড়ো সমস্যা নয়। বড়ো সমস্যা অন্য জায়গায়। আমার অনুমানগুলো প্রমাণ করব কীভাবে? কিছুই তো নেই আমার হাতে!’ অ্যারন তখন মুখ খুলল। বলল প্রমাণের কথা পরে ভাবা যাবে, কারণ তার সময় পরে আসবে। কিন্তু, তনয়া কি জানে, এডওয়ার্ডকে কে খুন করেছে? তনয়া মাথা নাড়ল। ‘এখনও জানি না। কিন্তু, জানাটা এই মুহূর্তে গুরুত্বপূর্ণ নয়। সে-উত্তর আমি পেয়ে যাব। এটুকু বলতে পারি, অবিনাশ নন। তার কারণ সহজ। পোস্টমর্টেম বলছে, এডওয়ার্ডকে আগে হাত-পা বেঁধে তারপর গুলি করা হয়েছে। বুলেট বাদ দিলে শরীরের অন্যত্র হালকা মারধরের দাগ আছে, কিন্তু বড়ো আঘাতের চিহ্ন নেই। তার মানে ধরে নিতে পারি এডওয়ার্ডকে বাঁধা হয়েছে যখন, তাঁর জ্ঞান ছিল। সেক্ষেত্রে তিনি বাধা দিতেন, ধস্তাধস্তি করতেন। অবিনাশের শরীরস্বাস্থ্যের যেরকম অবস্থা—হাত-পা কাঁপে, দুই পা হাঁটতে গেলে হাঁফান— তোমাদের মনে হয় এডওয়ার্ডকে কাবু করা তাঁর পক্ষে সম্ভব ছিল? তিন বছর আগে হলে তা-ও মানা যেত, কিন্তু এখন? পোস্টমর্টেমে যদি উলটো ফল আসত—আগে গুলি করে তারপর হাত-পা বাঁধা হয়েছে—অবিনাশকে সন্দেহের তালিকা থেকে বাদ দেওয়া টেকনিক্যালি সম্ভব হত না। বাকি আরেকটা সম্ভাবনা পড়ে থাকে, বন্দুকের ডগায় এডওয়ার্ডকে বাধ্য করা হয়েছে সারেন্ডার করতে। মানে, অবিনাশ করেছেন। কিন্তু, তাহলে তো অবিনাশ সরাসরিই গুলিই করবেন। হাত-পা বাঁধতে যাবেন কেন? ওভাবে ক্রুশবিদ্ধ ক্রাইস্টের ভঙ্গিমায় তাঁকে টাঙাতে যাবেন কেন? এটা করার অর্থ হল, যে খুন করেছে সে মেসেজ দিতে চেয়েছে। আমার অনুমান হল, সে চেয়েছে দেখাতে যে, এডওয়ার্ড যন্ত্রণাভোগ করেছিলেন অথবা অন্যের পাপ নিজের কাঁধে নিয়েছিলেন। অবিনাশের সঙ্গে এডওয়ার্ডের যে পুরোনো শত্রুতা, তাতে এডওয়ার্ড যদি অবিনাশকে এভাবে টাঙিয়ে দিতেন, সেটার অর্থ থাকত। এক্ষেত্রে অর্থ নেই। মোটিভের কথা তো বাদই দিলাম, সেটা আরও দুর্বল। তিন বছর আগে কাউকে হুমকি দিলে সেটার গুরুত্ব এতদিনে ফিকে হয়ে যায়।’ ‘সেটা কি তুমি পুলিশকে বলেছ?’ অ্যারন জিজ্ঞাসা করল।

‘আজ ফোনে কথা হয়েছে অক্ষয় মাহাতোর সঙ্গে। আমি তো আমার অনুমানটুকুই বলতে পারি। কিন্তু, তাতে একটা প্রশ্নের উত্তর মেলে না।’ তনয়া চোখ রাখল অবিনাশের ওপর। ‘আপনি জোহার হালে-তে কেন ঘোরাঘুরি করতেন?

দাঁত দিয়ে ঠোঁট কামড়াল অবিনাশ। ওর এই ভঙ্গি আমি চিনি। দ্বিধায় আছে, সত্যিটা বলবে কি না। তারপর নিশ্বাস ফেলল। ‘লুকোবার মানে হয় না। গত তিন বছর ধরেই বেথেল মিশনে গিয়ে আমি মাঝে মাঝে বসে থাকি। রেভারেন্ডের সঙ্গে সময় কাটাই, যদি তাঁর স্মৃতি ফিরে আসে। যদি তিনি আর্চি ও মনীষার ব্যাপারে কিছু জানতে পারেন। সত্যিই ওদের ভেতর কিছু ছিল কি না, জানলে তিনিই জানবেন, তাহলে আমি সেটা জানতে চাই। কিন্তু, পারিনি।’ এখনও ওর অবসেশন গেল না! রাগ নয়, দুঃখে আমার গলার কাছে ব্যথা করে উঠল। নাকি, মনীষাকে ভালোবেসেছিল, দূর থেকে হলেও—জানি না, কতটা মানে হয় এসবের। ওর গলা ভাঙা, ঠোঁট কাঁপছে। তাই থেমে থেমে উত্তর দিল। ‘এডওয়ার্ডকে নিয়ে আমার সমস্যা ছিল না, কারণ আমার আগে থেকে সে আছে। কিন্তু, অন্য কেউ যদি থেকে থাকে, সেটা আমি হলাম না কেন! কী ছিল আর্চির ভেতর যা আমার নেই।’ অ্যারনের দিকে ফিরে অবিনাশ মাথা নাড়াল, ‘সরি!’

‘মানে নেই এসবের!’ অ্যারন নিজের মনে উত্তর দিল। ‘আমার সেই উৎসাহই আসেনি জানার, ক্রিস আসলে কার সন্তান। অথবা, আমি কার সন্তান। কী আসে-যায় আজ এসবে!’ তনয়া দীর্ঘশ্বাস ফেলল, ‘যে নেই এমন এক শিশুকে নিয়ে গোটা পরিবার এতটাই অবসেসড হয়ে গেল, এদিকে যে আছে তার দিকে ফিরে তাকাল না!’ অ্যারনের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে ও বসে ছিল। চোখে চোখ রাখতে সাহস পাচ্ছে না? আমিও তো জানি, অ্যারন স্বাভাবিক নয়। ওর কাঁধে মৃত দাদা বোঝার মতো চেপে আছে। আমারও দায় ছিল না কি? কিন্তু, ওরা রাঁচিতে থাকত। আমি পাগল-ছাগল মানুষ। কীভাবে অ্যারনকে প্রোটেক্ট করতাম আমি? ইচ্ছে করল, অ্যারনের পাশে গিয়ে বসি। কিন্তু থাক, ন্যাকামি হয়ে যাবে।

‘এসব প্রসঙ্গ বাদ দাও।’ চাপাস্বরে বলল অ্যারন। তনয়া ঘাড় ফিরিয়ে তাকাল তার দিকে। দু-জনের মধ্যে চোখে চোখে কী কথা হল জানি না। তনয়া মাথা নীচু করল।

কয়েক মিনিট আমরা সবাই চুপ। ম্লান টিউবলাইট ঘরের চাপ চাপ অন্ধকারকে ভাঙতে পারছিল না। বাইরে থেকে কুকুরের কান্না ভেসে এল। দপ দপ করল রাস্তার ল্যাম্পপোস্টের আলো। বারান্দা জুড়ে মথ ও পোকাদের হুড়োহুড়ি। এরকম নিঃশব্দে বাবা বসে থাকত শেষের দিনগুলোয়। অ্যাগনেসের ভূত দেখে অজ্ঞান হয়ে যাবার পর বাবার বয়েস বেড়ে গিয়েছিল। ক্রিস চলে যাবার পর মরে গিয়েছিল, বাবা। হায় অবিনাশ! আমার যদি স্বর থাকত তাহলে ওর পিঠে হাত রেখে শুধু ‘হায়’ বাদে কী উপহার দিতাম?

‘প্রশ্ন শেষ হয়নি।’ অবিনাশের গলা অধৈর্য শোনাল। ‘অ্যাগনেসের কী হয়েছিল?’ ‘আমি জানি না।’

‘তাহলে তুমি জানোটা কী? এই তো বললে মোটামুটি সব প্রশ্নের উত্তর পেয়ে গেছ।’ ‘আপনারা এভাবে আমাকে জেরা করলে কোনো কিছুই জানতে পারবেন না, কারণ এখানে একটা উত্তর আরেকটার ওপর নির্ভর করে আছে। যদি আমি ক জানি তাহলে সেখান থেকে খ জানতে পারব। কিন্তু, তার জন্য ক-কে প্রমাণ করতে হবে। আমি ক জানি কিন্তু কীভাবে প্রমাণ করব সেই রাস্তা খুঁজে পাইনি। আমার সময় লাগবে। আরও কয়েক দিন।’ কিন্তু, এভাবে হয় না। তনয়াকে আমি যেন চিনতে পারছি না। তিন বছর আগেকার ওর বিভ্রান্তি আর অস্থিরতাকে তবু ছুঁতে পারতাম। অ্যারনও কি পারছে? অস্থির পায়চারি করছে ঘরের ভেতর। মনে আছে, সেই একদিন— তনয়া আর অ্যারন, দু-জনের ভাবনা একটা চিরুনিতে এসে দাঁড়িয়েছিল। সেখান থেকে শুরু। তখন ওরা একসঙ্গে ভাবতে পারত। ওদের দিকে হাঁ করে আমি বোকার মতো তাকিয়ে থাকতাম। আমার মনে হত ওরা কী বিরক্তিকর রকমের বুদ্ধিমান! আজ আমরা কেউ যেন বুঝতেই পারছি না তনয়ার কথাগুলো। অ্যারন ও না। তনয়া গলা খাঁকড়াল। ‘আপনারা আমার কথাগুলোকে বুঝতে পারছেন না, সেটাই স্বাভাবিক। আমি গত তিন বছর ধরে অ্যাগনেসের ডায়েরি পড়েছি। ওর মতো করে ভাবার চেষ্টা করেছি। সেই সময়টুকু পেয়েছি অন্তত। আপনারা পাননি। ব্যাপারটা এমন না যে, এখানে তিনদিন আগে এসে হুড়মুড় করে সব উত্তর হাতে পেয়ে গেছি। অনেক অনুমান গত তিন বছরে আমি করেছি। এখানে এসে শুধু যাচাই করছি সেগুলোকে। আপনাদের কাছে তো এই অনুমানগুলো ছিল না। কীভাবে পারবেন? তবু, তনয়া অ্যারনের দিকে ফিরল, “তুমি আমাকে প্রশ্ন করতে বলেছিলে—কেন। কেন অ্যাগনেস হারিয়ে গেল? ক্রিস হারিয়ে গেল? এই প্রশ্নগুলো না-করলে আমি এত মর্মান্তিক একটা গল্পকে ছুঁতে পারতাম না।’ ‘মর্মান্তিক’ শব্দটা কাঁটার মতো আমার মাথায় এসে বিঁধল। তনয়া অ্যারনের হাতে হাত রাখল। ফিসফিস করে বলল, ‘যদি এমন সত্যি বেরোয়, যা ডিভাস্টেটিং—,’ কিন্তু অ্যারনকে আমি জানি। যা আসুক না কেন, ও শুনবেই। তনয়া মুখ ফেরাল আমার দিকে এমন সত্যি, যা তছনছ করে দেবে—কী আর নতুন করে দেবে? এত কিছুর পরেও? এখানে আমরা কেউ বেঁচে নেই, ও কি জানে না?

‘আমার থেকে কোনোরকম সাহায্য কি চাও? যদি কিছু করতে পারি, তবু—’ অবিনাশ অনিশ্চিত গলায় জিজ্ঞাসা করল।

‘জানি না। আগে হলে একরকম ছিল—এখন এই পরিস্থিতিতে পুলিশ ফোর্সে আপনার কনট্যাক্টস সত্যিই কাজ করবে কি না—তবে আমার একটা জিনিস লাগবে। অ্যাগনেসের বাবা মাইকেল ছিলেন চোখের ডাক্তার শিবপ্রকাশ শর্মার সহকারী। এই ডাক্তারবাবু কি-

‘মারা গেছেন বহু বছর আগে।’ উত্তর দিলাম।

‘এঁর পরিবার বা ঘনিষ্ঠ অন্য কেউ কি এখানে থাকেন? তাহলে কথা বলতাম । ‘

‘বাড়িঘর বিক্রি করে চলে গেছেন। তবে, ডাক্তারবাবু রঘুনাথপুরের গ্রামীণ হেল্থ ব্লকে যুক্ত ছিলেন। আমি ছয় মাসের জন্য সেখানে পোস্টেড ছিলাম। তারপর ইনসাবঅর্ডিনেশনের কেসে পানিশপেন্ট পোস্টিং পেয়ে বদলি হয়ে যাই। তো, সেই হেল্থ ব্লকের এক গ্রুপ ডি স্টাফের সঙ্গে মাল খেতাম মাঝে মাঝে। সেখান থেকে চলে যাবার পরেও পাকেচক্রে যোগাযোগ থেকে গিয়েছিল। দুই-তিন বছর অন্তর হলেও ফোন করে। ওকে জিজ্ঞাসা করে দেখব, কোনো ট্রেস পাওয়া যায় কি না। তবে, পাওয়া কঠিন। কিন্তু, ডাক্তারবাবুকে কেন চাও?’

‘একটা অনুমান মেলাবার জন্য। আরেকটা কথা। অ্যাগনেসের মা মার্গারেট কি বরাবরই গৃহবন্দি থাকতেন? নাকি, বাইরে বেরোনো, লোকজনের সঙ্গে মেলামেশা, তারপর ধরুন সামাজিক কাজকর্ম যেমন উৎসব বা চার্চের মেলায় অংশ নেওয়া, এসবও করেছেন কখনো?’ করেছে তো। এটা আমি ভালো জানতাম কারণ ম্যাগিকে ছোটোবেলায় দেখেছি। যখন ভালো থাকত, টুকটাক সামাজিকতায় অংশ নিত। শুধু তাই নয়, ওদের বাগানের ফুলের দেখাশোনাও করেছে একটা সময় পর্যন্ত। সাপ্লাই, আড়তের সঙ্গে যোগাযোগ, হিসেব, এগুলো রাখত । কিন্তু, তারপর ধীরে ধীরে মাথার দোষ ছেয়ে ফেলল ওকে। ওর কাজকর্ম কমে গেল। বাড়িতে ঢুকে গেল ম্যাগি। আমার স্কুলজীবন পর্যন্ত ম্যাগিকে বাগানের কাজকর্ম করতে দেখতাম। কবে থেকে বন্ধ করল মনে নেই যদিও। তনয়ার মুখ উজ্জ্বল হল— অঙ্ক মেলাবার নির্মল আনন্দ। ‘মানে, একটা সময় অবধি ম্যাগি সুস্থ, তাঁর একটা বাইরের জীবন ছিল, তাই তো?’ ‘সুস্থ কি না জানি না। সেই সময়কার কথা অত মনে নেই আমার। ওর বাড়াবাড়ি হল মনে হয় ডলোরেসের জন্মের পর।’

‘তোমার এই নানাদিক থেকে ঘুঁটি সাজানো আদৌ ফল দেবে তো?’ তনয়াকে তীক্ষ্ণ চোখে নিরীক্ষণ করছিল অ্যারন। এবার প্রশ্ন করল।

‘তা তো জানি না! হতেই পারে পুরোটা শুন্যে প্রাসাদ বানাচ্ছি। কিন্তু, এই মুহূর্তে এটার থেকে সহজতর সমাধান আমার কাছে নেই। তাই এই হাইপোথিসিসকে আপাতত ধরছি।

ওকাম’স রেজর। যদি দেখি একটা পর্যায়ের পর গিয়ে আর ব্যাখ্যা করা যাচ্ছে না, তাহলে সত্যিই হাল ছেড়ে দেব, প্রমিস।’ বাচ্চা মেয়ের মতো ঘাড় হেলিয়ে তনয়া জবাব দিল। ‘হাইপোথিসিসের ভিত্তি কী, সেটা নিশ্চয় বলবে না?’

তনয়া ফোন এগিয়ে দিল। ‘অ্যাগনেসের ডায়েরির একটা এন্ট্রি। যেটা আগেরদিন দেখাইনি তোমাদের। এই এন্ট্রিটা আমাকে সবথেকে বেশি ভাবিয়েছিল। ১৯৮৬র এপ্রিল মাস।’

—খুব শীত পড়েছে এখানে। আমরা সবাই কাঁপছি। আমাদের কুঁড়েঘরের চাল থেকে বরফ পড়বে এবার। আর্থার ঠান্ডায় হুঁ হুঁ কাঁদছে। ধরে নাও ডল লিখেছে। মুখ ভার সকলের। একমাত্র হাসিমুখে আছে ডল, কারণ ও হাসার সময়ে কাঁদে আর কাঁদার সময়ে হাসে। ডল একটা পাগল! আমি সারাজীবন ওর দিদি হয়ে থাকব। ওর হাত শক্ত চেপে ধরে। ওকে কোথাও একা ছাড়ব না। ও তো জানে না, বাইরের পৃথিবী কী দয়ামায়াশূন্য! কিন্তু, ও কি আমার বোন হয়ে থাকতে চায়? যদি না-চায়, তাহলে বোনের অর্ধেকটা বরং ছেড়ে দেব।

‘আবার আর্থার! কিন্তু, বাকিটার অর্থ কী?

‘আর্থার কে?’ প্রশ্ন করল অবিনাশ।

‘কে আবার! আর্থার মরিসি।’ বললাম আমি। ‘মনে আছে তোমার? সেই খচ্চর বুড়ো। ওর বাগানে আমরা লিচু পাড়তে গেলে চিৎকার করত। বলত বুলডগ লেলিয়ে দেবে। তনয়া তো ওর সম্বন্ধে খোঁজখবর নিয়ে এসেছে।’ কিন্তু, তনয়া চুপ করে থাকল। ওকে দুই-একবার আর্থার নিয়ে খোঁচাখুঁচি করে লাভ হল না।

‘আমি চাই তোমরা এটা বার বার পড়ো। তারপর কী মনে হয় আমাকে জানাও আমি নিজের মনে হওয়া মেলাব তোমাদের সঙ্গে। কিন্তু, এখন আমার ব্যাখ্যা যদি তোমাদের বলি, সেটা তোমাদের ঘাড়ে চেপে বসবে। ঠিক হোক বা ভুল, সেটার বাইরে বেরতে পারবে না তোমরা। আমার যাবতীয় হাইপোথিসিস এই এন্ট্রির ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে। তাই এটার যদি কোনো ব্যাখ্যা তোমরা দিতে পারো যা আমার ব্যাখ্যার থেকে ভালো, তাহলে আমি এই কেস থেকে হাত তুলে নেব।’

চোখের সামনে তনয়ার ফোন নিয়ে মিনিটখানেক বসে থাকল অ্যারন। তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলল, ‘তুমি তিনবছর পেয়েছিলে। আমার অন্তত তিনদিন তো লাগবেই।’

তনয়া উঠল। কুমার গন্ধর্ব শেষ হয়ে সোঁ সোঁ আওয়াজ বেরোচ্ছে ক্যাসেট থেকে। ‘বাড়ি যাই। আজ রাত্রে ঘুম দরকার।’ অ্যারনও উঠল তার দেখাদেখি কিন্তু, অবিনাশ আমার দিকে তাকিয়ে ছিল।

‘তুমি থেকে যাবে, বারবারা? অনেকদিন একসঙ্গে মদ খাইনি।’

.

মদ খেলে আমি আবার কান্নাকাটি করব, ক্রিসকে ডাকব। ওহো সে বিরক্তিকর! অবিনাশকে কি আমি কম জ্বালিয়েছি? এমনকী তিনবছর আগে এই ঘরে দাঁড়িয়ে বলে গিয়েছিলাম ওকে, আর্চি আর মনীষা—অবিনাশ নিজেকে দায়ী করে মনীষার জন্য। আমাকে ও করবার কথা। কিন্তু, তা না-করে এখন আমার সঙ্গে বসে মদ খেতে চাইছে। এই লোকটা কী নির্লজ্জ! নাহ্, ও লোক নয়। আমার কাছে এখনও সেই ছেলেটা, যে আমাকে একদিন বাসুদেব মুন্ডার দোকান থেকে তুলে এনেছিল। তখন হাট্টাকাট্টা জোয়ান ছিল ও। আজ হাঁটতে গেলে ওর পা কাঁপে। চোখের কোলভাগ থেকে জল গড়ায়। ছোড়াছুঁড়ি দুটো না-দেখুক, আমার চোখ এড়াবে ভেবেছে?

‘তোমার সঙ্গে মদ খেলে হ্যাংওভার হয় আমার। তুমি ব্লাডি দেহাতি, জল মিশিয়ে গঙ্গানদী বানিয়ে দাও।’

অবিনাশ মৃদু হেসে চোখ বুজল। ‘আমি বানাব না, তুমি বানাবে আজ। আমি একটা রাগেশ্রী চালিয়ে দেব। গভীর রাত পর্যন্ত বাজবে। আমরা ততক্ষণ এই ঘরে বসে থাকব। কারণ, আমাদের কোথাও যাবার নেই ।

তনয়া চাপাগলায় বলল, ‘আসি তাহলে।’ আমার কাঁধে চাপ দিল। বোকা, ভেবেছে আমি এবার কান্নাকাটি করব। কিন্তু, আমার তো অন্য কথা জানার আছে। আমি মুঠোয় ওর হাত চেপে ধরলাম। যেহেতু আমি মাতাল নই, তাই গুছিয়ে প্রশ্ন করতে পারব। ওর চোখে চোখ রেখে আমি জিজ্ঞাসা করলাম, ‘অনেক প্রশ্নের উত্তর পেয়েছ, নিজেই বললে। আমাকে অন্তত এটা বলে যাও, ক্রিস কি বেঁচে আছে?’ এই প্রশ্নটা এতক্ষণ করার সাহস পাইনি।

‘উত্তর তুমি জানো।’ তনয়ার কণ্ঠ আবেগশূন্য। ওর চোখে অনেক খুঁজেওআমি উত্তাপ পেলাম না। তবু, আমি ওর মুখের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। তনয়া ও আমার দিকে। সেই একবার, অনেকদিন আগে, ও চেয়েছিল আমার নিভে আসা জীবনের শেষ উত্তাপটুকু ক্রিসের জন্য ওকে ধার দিতে। কিন্তু, আজ ওর কিছু দরকার নেই।

.

রাত প্রায় তিনটের সময়ে মাতাল অবস্থায় গাড়ি চালিয়ে আমি স্যাংচুয়ারিতে ফিরেছিলাম। ঘুমোলাম বেলা এগারোটা পর্যন্ত। ঘুম ভাঙার পর হ্যাংওভার ছিল, বমি পাচ্ছিল, মুখে টকভাব। মাঝে নাকি ডলোরেস এসেছিল, দেখা করে গেছে তনয়ার সঙ্গে, কিন্তু আমার ঘুম কেউ ভাঙায়নি। অ্যারন আমাকে মুড়ি আর লেবুজল দিল। আমার চোখ নাকি টকটকে লাল। সে হোক, অবিনাশের মতো পাজি লোকের সঙ্গে বসে এটুকু গিলব না? ডলোরেসের সঙ্গে তনয়ার কী কথা হল? তেমন কিছুই না, বলল তনয়া। ডলোরেস নাকি জানতে চেয়েছে—

তনয়া সেই কতদিন আগে বলে গিয়েছিল ও চেষ্টা করবে। এখন ওর হাতে কিছু এসেছে কি না। কারণ, ওরা সবাই অপেক্ষা করছে। ম্যাগি নাকি একদমই চলচ্ছক্তিহীন হয়ে পড়েছে। সারাদিন নিজের বিছানায় শুয়ে অ্যাগনেসের সঙ্গে কথা বলে যায়। বেডসোর হয়েছে। দুবেলা নার্স এসে ড্রেসিং করে। অনেকদিন দেখিনি ডলোরেসকে। তনয়া বলেছিল ও আজ সন্ধেবেলা ম্যাগির সঙ্গে দেখা করে আসবে। কিন্তু, ডলোরেস বারণ করেছে। ওকে আজ খালারি যেতে হবে স্কুলের কাজে। নার্সের জিম্মায় থাকবে মা। তাই আজকের দিনটা তনয়া যেন বাদ দেয়। আমার সঙ্গে কথা বলার সময়ে তনয়ার ফোন এল। বাইরে চলে গেল ফোন নিয়ে। পুনম রান্নাঘর থেকে মুখ বাড়িয়ে জানাল তড়কার ডাল শেষ। আজ অ্যারনের কিছু একটা ডিশ বানাবার কথা ছিল। অ্যারনের রান্না দেখে ভক্ত হয়ে গেছে পুনম। রোজ নিয়ম করে এটা-ওটা রান্না ওর কাছ থেকে শিখে নেয়। অ্যারন কি সারাজীবন এখানেই থেকে যাবে? চাকরি করবে না?

‘তোমার কী অসুবিধে হচ্ছে?”

“তোর বাবা বেঁচে থাকলে রাগ করত। তোকে নিয়ে চিন্তা ছিল খুব। ভাবত তুই

হোমোসেক্সুয়াল। তোর কোন ব্লাডি বন্ধুর বাড়ি দিল্লিতে, সেখানে পড়ে থাকিস।’ ‘সন্দীপ উসগাঁওকর। কিন্তু, সন্দীপ দিল্লি ছেড়ে দিয়েছে। ওর দীর্ঘদিনের গার্লফ্রেন্ড শিল্পাকে বিয়ে করে হায়দ্রাবাদে সেটল করেছে গতবছর। একটা স্টার্ট-আপে ঢুকেছে বলল কিছুদিন আগে।’ সবাই কাজকম্ম করছে, এদিকে ও ফ্যা ফ্যা করে ঘুরছে। কিছু বলতে গেলে আবার চ্যাটাং চ্যাটাং কথা বলে। বলে, ‘তোমার টাকা নিচ্ছি না, ভয় নেই।’ এক থাপ্পড় মেরে ওকে বোঝাতে হয়, টাকাটাই সব নয়।

তনয়া ঢুকল ঘরে। উদ্ভাসিত মুখ। ‘অবিনাশ যাদব ফোন করেছিলেন। ডাক্তার শিব শর্মার ছেলেকে ট্রেস করা গেছে। তাঁরও বয়েস সত্তরের কাছাকাছি। তবে, ফোন নাম্বার দিলেন। কথা হল এক্ষুনি। এখন চেন্নাইতে মেয়ের কাছে থাকেন। টাউনের কথা বললেন অনেক। তোমাদের মনে আছে। কেমন আছ জানতে চাইলেন। এডওয়ার্ড ও মনীষার খবর শুনে শকড।’ ওর যা জানার ছিল, জানতে পেরেছে? ‘সেটা নিয়েও কথা হল। যা শুনতে চাইছিলাম, শুনেছি। এখন শেষ একটাই কাজ বাকি। মার্গারেটের সঙ্গে দেখা করা। তারপর কোথাও যাব না। বসে বসে ভাবব— ছোটো ছোটো গল্প জুড়ে যে বড়ো গল্পটা দাঁড় করিয়েছি তাকে কীভাবে ভ্যালিডেট করা যায়। ওই জায়গাটায় এসে আটকে যাচ্ছি। সত্যিই কি প্রমাণ করা যাবে?’ না-গেলে? তনয়া জানাল, প্রমাণ করা না-গেলে যেটুকু দাঁড় করিয়েছে আমাদের জানাবে, পুলিশকেও বলবে। তারপর ওর আর কাজ নেই। তাই চলে যাবে। প্রমাণ বা অপ্রমাণ কিছুই করা না-গেলে বাকি সিদ্ধান্ত পুলিশের। কিন্তু, এটা আমার পছন্দ হল না। এমন আধাখ্যাচড়াভাবে কাজ শেষ করা—তাহলে ও ফিরে এল কেন? শুধু অনুমান তো কলকাতা থেকেই পুলিশকে জানাতে পারত।

‘সব কিছু কলকাতায় থেকে হত না। এখানে এত লোকের সঙ্গে এত কথা হল। এগুলোর দরকার ছিল। অ্যাগনেসের ডায়েরির লেখাগুলোকে যাচাই করে নেবার জন্য আসতেই হত এখানে ।

‘আর ডায়েরি! আবোল-তাবোল বকবকানিকে অত গুরুত্ব দেবার কী আছে জানি না বাবা!’ হ্যাংওভারের মধ্যে অ্যাগনেসের ডায়েরির কথা মনে পড়ায় মেজাজ খাট্টা লাগল আবার। ‘তার ওপর মেডুসা! কী যে ছাতার মাথা লিখেছে— টেক্সটবইতে গ্রেকো রোমান পুরাণ পড়তে গেলেই ছোটোবেলায় মাথা ধরত আমার। নেপচুন, গর্গন, মিনার্ভা—’

‘কী বললে?” তনয়া চেঁচিয়ে ওঠায় চমকে থামলাম।

‘তুমি পড়োনি নাকি এগুলো? পুরাণের ক্লাস হত আমাদের।’

‘শিট! আমি কী বোকা!’ কপালে করাঘাত করল তনয়া। ‘উত্তরটা আমার চোখের সামনে জ্বলজ্বল করছিল। কিন্তু, আমি সম্পূর্ণ উলটো অনুমান করে বসেছিলাম।’ ওরা বোকা, তাহলে আমি কী? হ্যাংওভার নিয়ে মুড়ি চিবোচ্ছি আর থান ইটের মতো শব্দগুলো আমার মাথায় এসে লাগছে। তনয়া আবার এসে আমাকে জড়িয়ে ধরছে। ছুঁড়ি খুবই গোলমেলে চরিত্র, নির্ঘাত লেসবিয়ান ‘তুমি সুপার্ব, বারবারা! কলকাতায় এসো, দেখো সারাদিন ধরে কতরকম মদ খাওয়াই তোমাকে।’ তারপর পা ফেলল দরজার দিকে। ‘আমি আসছি। এখনই পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে। হাতে সময় নেই বেশি।’

সন্ধে কাটিয়ে রাত করে তনয়া ফিরল। অ্যারন তখন কোথায় আমি জানি না। বোতল, গেলাস আর কুরুশ নিয়ে হল ঘরে বসে ছিলাম। পায়ের কাছে লালুরাম। তনয়া ক্লান্তমুখে আমার পাশে এসে বসল। কুরুশ কাঁটা আমার হাত থেকে নিয়ে বুনল দুই ঘর, ‘এখান থেকে চলে যাবার পর বুনিনি। কিন্তু, দেখলে ইচ্ছে জেগে ওঠে।

‘ম্যাগির সঙ্গে দেখা হল?’

হাত থেকে উল ফেলে তনয়া অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে থাকল কয়েক মুহূর্ত। তারপর আমার দিকে ফিরে বলল, ‘বারবারা, সত্যিটা তোমার পক্ষে এই বয়েসে খুব আনন্দের হবে না। তুমি চাইলে আমি এখন সব থামিয়ে ফিরে যেতে পারি। ধরে নাও এটা তোমাকে অফার করছি আমি। তুমি একবার বলো। আমি নিজেকে থামিয়ে দেব।’

‘তুমি নিজে ফিরে এসেছিলে। বলেছিলে আমাদের হিসেব চোকানো বাকি আছে।’ ‘সেই হিসেবের মূল্য সহজ নয়। তখন আমিও ভাবিনি এত কিছু—মনে হচ্ছে হুড়মুড়িয়ে আমার ওপর পুরোনো ঘটনাগুলো ভেঙে পড়তে চাইছে। তাকে আমি চাইলেও এড়াতে পারব না। কিন্তু, তুমি পারবে কারণ এখনও, তোমাদের আমি কিছুই জানাইনি। তুমি কী চাও? সত্যিই জানতে চাও কি? তারপর কিন্তু কেউ আর একরকম থাকবে না।’

এরকম ধাঁধালো কথা পছন্দ করি না, যেহেতু আমি বোকা বুড়ি। তার ওপর মোটা। সন্ধে থেকে খাচ্ছি, মাথা শ্লথ। জড়ানো গলায় হাসলাম, ‘তুমি জানতে, হিল্ডাকে চুমু খেতে গিয়ে সেই কোন ছোটোবেলায় ওর গাল কামড়ে দিয়েছিলাম। বাবা আমাকে আর এডওয়ার্ডকে মারত। আমাকে আটকে রাখত অন্ধকার ঘরে। এডওয়ার্ডের হাতে— রোজ রাতে আমরা ভয়ে কাঁটা হয়ে থাকতাম কারণ চাবুক হাতে বাবা ঘুরে বেড়াত বাড়িময়। মাকেও মারত। বাবা এখানে আছে। হোমস্টে চালাত যতদিন টিকে ছিল। ঘর, চেয়ার, ছাইদানি অবিকল। বাবা সেখানে এসে বসে। সিগারেট খায়, বুঝলে? তুমি রাত্রে এ বাড়ির বারান্দা দিয়ে ঘুরলে ধোঁয়াটে গন্ধ পাবে—’

‘স্টপ ইট।’

‘দেখবে, বাবা হয় জলাভূমির দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে, নয়তো নিজের ঘরে। আমাদের অনুমতি ছিল না সে-ঘরে পা রাখার। নাহলেই চাবুকের সপাং। আমাদের টাউনে বাবার গলার আওয়াজ তুমি পাবে, তনয়া। রাস্তায়, জঙ্গলে, অন্ধকার কটেজের ভেতর, পোড়োমাঠে। কিন্তু, বাবা কোথাও নেই। যেমন ক্রিস নেই। তবু, আমি জানি ওরা রাতে জেগে থাকে, ওদের চোখ। জোহার হালে-তে গেলে এই টাউনের সমস্ত ভূতকে, যারা গত এক-শো বছর ধরে মরে যাচ্ছে, তাদের সন্ধান তুমি পাবে। এডওয়ার্ডকে দেখতে পাবে। মনীষাকে পাবে।’ আমার গলা কি হাহাকারের মতো শোনাল? ‘হাজার হাজার ভূতের রাজত্ব এখানে, তনয়া। কিন্তু, আমার ভয় লাগছে না। আমি শান্ত হয়ে তাদের মুখোমুখি বসি, রোজ। মাটিতে, দেওয়ালের গায়ে, গাছের গুঁড়িতে কান পাতি, রোজ।’ আমার গলায় কেন যে কান্না ভর করে, বিরক্ত লাগে। কিন্তু, এখন কাঁদলে হবে না। ইচ্ছে হল নিজের গালে ঠাস করে একটা চড় বসাই। তনয়া ভাগ্যিস আমার পিঠে সহানুভূতির হাত রাখেনি। রাখলে মেয়েটাকে আমি মেরেই বসতাম। ও কিন্তু নীরবে আমার পাশে বসে ছিল। তাকায়নি একবারও। মুখ ছিল মাঠের দিকে। অনেকটা মদ গিলে বললাম, “শোনো, আমাকে যতই পাগল ভাবো না কেন, আমি জানতে চাই। ক্রিসের কী হল। অ্যাগনেসের কী হল। আমার জীবনে আর কী আছে, এটুকু বাদে? বাকি কিছুর উদ্দেশ্য নেই, যেমন-তেমন করে- অবিনাশ বলেছে আমার সঙ্গে ও আবার মাঠের ধারে দাঁড়াবে। আমি চাদরে মাথা ঢেকে ক্রিসের জন্য কাঁদব, অবিনাশ তাকিয়ে থাকবে জলাভূমির মাটির দিকে। বরাবর যেমন তাকিয়ে থাকত ও। দেখতে চাইত সত্যিই এই ঝোপঝাড় আর জলজঙ্গলের মধ্যে ক্রিস লুকিয়ে আছে কি না।’ –

‘বেশ। আমি বলব।’ দীর্ঘশ্বাস ফেলল তনয়া। ‘তারপর চলে যাব কলকাতা। আর কখনো আসব না। কারণ, তোমাদের সামনে দাঁড়াবার সাহস আমার হয়তো হবে না।’

‘কলকাতা চলে যাবে? আবার অফিস-কাছারি শুরু করবে? ভুলে যাবে আমাদের?”

‘অফিস!’ তনয়া আত্মমগ্ন স্বরে বলল, ‘জানো, তোমাকে মহেশের কথা বলেছিলাম। আমার এডিটর ছিল। পুনে-তে একটা বইয়ের দোকান চালায় এখন। এখানে আসার দু-দিন আগে আমাকে ভিডিয়ো কল করেছিল। বলল একটা অনলাইন পোর্টাল খুলবে। আমাকে চায়। কলকাতা ছাড়তে হবে না, বাড়ি বসে কাজ। তবে, অন্যরকম। ক্রাইম নয়। আর্ট অ্যান্ড কালচার, তার সঙ্গে পলিটিকাল বিট। এখনও হ্যাঁ বলিনি।’

‘করতে চাও?’

‘মহেশের হাত ধরে আমার কাজ শেখা। আমার গুরু বলো, মেন্টর বলো, অভিভাবকও ডাকলে “না” করা আমার পক্ষে কঠিন। কিন্তু, আমি দ্বিধায়। হার্ড নিউজে আর ফিরব না ঠিক করেছিলাম। ক্রাইমে তো নয়ই। এখানে যদি অন্যরকম কিছু হয়

‘কেন ফিরবে না? তুমি চাকরিটা ছেড়েছিলে কেন?’

মিনিট দুয়েক চুপ থাকল তনয়া। তারপর উল কাঁটা তুলে আবার কুরুশ করতে শুরু করল। ‘এখান থেকে ফিরে যাবার পর মানসিকভাবে বিধ্বস্ত ছিলাম। বার বার মনে হত আমি ডেলিভার করতে পারিনি যা কথা দিয়েছিলাম। তারপরেও টেনে গেছি। সপ্তাহের শুরুতে মিটিং, স্টোরি ফাইল করা, দরকারে সাবিং, এসব যান্ত্রিকভাবে করে যাওয়া কঠিন নয়। কিন্তু, মাসচারেক পর আমার এডিটর মহেশ যোশি ম্যানেজমেন্টের সঙ্গে ঝগড়া করে দুম করে চাকরিটা ছেড়ে দিল। বলে গেল নিউজে ফিরবে না। ওর জায়গায় আমার বসার কথা। কিন্তু, আমি প্রত্যাখ্যান করি। সম্পাদনার বদলে স্টোরির পেছনে ছোটা আমার কাছে বেশি কমফর্টেবল লাগত তখনও। তারপর একদিন একটা স্টোরি হাতে এল। কাটওয়ারিয়া সরাইতে এক প্রোমোটারের অবৈধ নির্মাণ ভাঙবার সময়ে ট্রাক্টরের গুঁতোয় দেওয়াল ভেঙে পড়েছে। মারা গেছেন পাশের ফুটপাতে থাকা এক মা ও তাঁর দুই সন্তান। অফিসের সবার চোখ চকচক করে উঠল, কারণ অসাধু প্রোমোটারচক্র নিয়ে স্টোরি মানে লোকে গপগপ করে গিলবে। আমি ফটোগ্রাফার নিয়ে স্পটে গেলাম। প্রচুর ভিড় জায়গাটায়। তখনও বডি সরানো হয়নি। ধসে পড়েছে পাঁচিল। তার ওপর নির্মীয়মাণ বিল্ডিং-এর বিশাল বারান্দা কাত হয়ে আছে। আমার চোখে পড়ল, ইট, কাঠ, বালির স্তূপ থেকে একটা কচি হাত বেরিয়ে আছে। ধবধবে ফর্সা, তখনও রক্ত লাগেনি। আমি অন্য কিছু দেখছিলাম না। শুধু সেই নিস্পন্দ হাতটার দিকে তাকিয়ে ছিলাম। তারপর আমার চোখ উঠল ভিড়ের দিকে। আমি দেখলাম সমস্ত ক্যামেরা আর টিভির বুম সেই হাতের দিকে তাক করা। একমুহূর্তে সেই শিশুর হাত সারাদেশের সন্ধ্যাকালীন খাদ্য হয়ে উঠবে। তখন আমি নিজেকে বললাম—দ্যাট’স ইট। এখানেই এবার শেষ হোক। একটা অটো ধরে সোজা অফিসে ফিরলাম। রেজিগনেশন লেটার লিখলাম নিজের ডেস্কে বসে। একমাসের নোটিশ পিরিয়ড সার্ভ করার কথা, সেটাও করিনি। জমানো ছুটির ব্যবহার করেছিলাম, এইচআর ওটুকু দয়ামায়া দেখিয়েছিল। সাতদিনের মধ্যে সব পাট গুটিয়ে কলকাতা ফিরেছিলাম। তারপর থেকে এরকমই—হার্ড নিউজের সাংবাদিক জীবন আমি চুকিয়ে দিয়েছি, বারবারা !”

‘তাহলে তুমি এখানে থেকে যাবে? আমাদের সঙ্গে? থাকো না! কিচ্ছু কাজ করতে হবে না। সারাদিন ঘুরে বেড়াবে। আর চাকরিটায় ঢুকলে তো বাড়ি থেকে কাজ। সে এখান থেকে করো না!”

‘অ্যারনের মতো?’ হাসল তনয়া।

‘ও একটা বাঁদর। তেমন বলছি না। তুমি আমাদের একজন হয়ে—’ আমি ওর হাত ধরলাম। ‘এই বাড়ি ভাঙা হবে। কিন্তু, আমরা নতুন কটেজ পেয়ে যাব। ছোট্ট দেখে। আমি, তুমি, অ্যারন, লালুরাম, পুনম—’ যা খারাপ হোক না কেন, আমি সামলে নেব। সেরে উঠব আমি। আমার বয়েস উনসত্তর। মরে যাবার পক্ষে বড্ড কম।

মাথা নাড়ল তনয়া। ‘আমার বাড়ি আছে কলকাতায়। তার থেকে বড়ো কথা, বাবা ছিল সেখানে। ওখানে ঢুকলে আমার মনে হয়, বাবা এক্ষুনি এককাপ চা নিয়ে আমার সামনে রাখবে। আমি অপেক্ষা করি, আর চা নিয়ে কেউ আসে না। কিন্তু, আমি বুঝি, আমার এককাপ চায়ের দরকার নেই। দরকার ছিল চায়ের স্মৃতি। সেটুকু আমি পেয়ে যাই, রোজ। ওই অপেক্ষাটার ভেতর দিয়ে।’

না?’ তনয়ার হাত থেকে কুরুশ নিয়ে মাথা ঝোঁকালাম। ‘চলে যাবে, আর ফিরবে না। তাই

‘কখনো ফিরব না। এমনভাবে নিরুদ্দেশ হব, যাতে মনে হয় আমার অস্তিত্বই কোথাও ছিল না কখনো।’ তনয়ার গলায় উত্থানপতন নেই। অন্ধকারে ওর মুখ দেখতে পাচ্ছি না আমি। দেখতে চাই না। আমরা সবাই ভুলে যাব। ঘুমিয়ে পড়ব নিশ্চিন্তে। যেন কোনোদিন জাগিনি, এমন ঘুম।

.

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *