১৪
আমার হাত ও আমার পা দেখ, এ আমি স্বয়ং ; আমাকে স্পর্শ কর, আর দেখ ; কারণ আমার যেমন দেখিতেছ, আত্মার এরূপ অস্থি-মাংস নাই।
– Luke 24:39
.
পরের দু-দিন তনয়া এখানে-ওখানে ঘুরল। ফিরত যখন, পরিশ্রান্ত লাগত ওকে। রুক্ষ চুল হাওয়াতে উড়ত, চোখে ক্লান্তি নামত ওর। টেটভ্যাক নিয়ে একদিন জ্বর এসেছিল, তার মধ্যেই ক্যালপল খেয়ে বেরিয়ে যেত। অ্যারন থাকত ওর সঙ্গে। অ্যারনের মুখে নির্বিকার নৈরাশ্য বাদে অন্য কিছু দেখিনি। অ্যারন পরে আমাকে জানিয়েছিল, ওরা টাউনে ঘুরত। জিজ্ঞাসা করত অ্যাগনেস সম্পর্কে, ক্রিস সম্পর্কে। যত লোককথা ছিল, প্রবাদ বলো, তাদের ওরা শুনত। অ্যারন আমাকে বলেছিল, গতকাল ওরা সমর দুসাদের সঙ্গে দেখা করেছে। ক্রিস হারিয়ে যাবার সময়ে আমাদের বাড়ির দারোয়ান ছিল, পুলিশ তুলেছিল ওকে। আমরা চাকরিতে রাখিনি। অনেক বয়েস হয়েছে ওর। অবিনাশের সঙ্গে মদ খায় শুঁড়িখানায় বসে, যেখানে ও কাজ করে। অবিনাশই তনয়াদের নিয়ে গিয়েছিল নাকি। অ্যারন তাকিয়েছিল আমার দিকে। ওর চোখে করুণা নয়, একপ্রকার বিষাদ, যেন অনেক ভুল হয়ে গেছে আমাদের সবার। তনয়া সেই দিনটায় আমার সামনে এসে বসেছিল। সেই শেষ, যেদিন ও পাকাপাকি বিদায় নিয়েছিল। সেই যে চলে গেল, তনয়া তার পরে আর কখনো ফেরেনি।
‘জেনিফারকে কখনো তোমার সন্দেহ হয়নি, না?’ তনয়া আমাকে জিজ্ঞাসা করেছিল। তখন শেষদুপুর। হেমন্তের মেঘ আমাদের বাগানে ঘনিয়ে এসেছিল। ও বলেছিল যে, সমর দুসাদের কাছ থেকে জেনিফারের ব্যাপারে জেনেছে। কিন্তু এখানে যত গুজব ঘোরে, তার সব কিছুকে পাত্তা দিতে নেই। সমর ব্লাডি বুড়ো, আমার মতো মাতাল, ওর কথা ধরতে আছে? তনয়া মাথা নাড়ল, ‘জেনিফার অকাল্টচর্চা করেন। ভূত নামানো শুধু না, অন্যান্য ব্ল্যাক ম্যাজিকও। অকাল্ট চর্চার জন্য অনেক সময়েই সুলক্ষণযুক্ত শিশুর দরকার—’ তনয়া বাক্য শেষ করার আগে আমি ওর মুখে হাত চাপা দিলাম। অ্যারন চোখ বুজে বারান্দায় বসে ছিল, সেই অবস্থায় আমাকে বলল, তনয়াকে যেন কথা শেষ করতে দিই। কিন্তু, আমি কী করে বোঝাব যে, কাল রাতে আমি দেখেছি—
‘ক্রিস মরেনি।’ ফিসফিস করলাম। ‘তোরা অশুভ। তোরা সবাই।’ এমন তো না যে, জেনিফারকে আমি এত ভালোবাসি যে, সন্দেহ করতে পারব না! কিন্তু, ক্রিসের শেষ পরিণাম আমি মানি না। তাই হেলেদুলে বাগানের আমগাছের গোড়ায় চলে গেলাম। খুরপি দিয়ে খুঁচিয়ে মাটি তুলতে হবে, পাতায় অনেক শীতের পোকা, সেগুলোতে স্প্রে করতে হবে। আমি জোরে জোরে খুরপি দিয়ে মাটি চালাচ্ছিলাম। পেছনে তনয়া এসে দাঁড়াল, নীরবে প্ৰশ্ন করছে, আমি কি সত্যিটা জানতে চাই না? ‘ক্রিস বেঁচে আছে। তোমরা বুঝবে না।’ ওর দিকে নয়, কারোর দিকে তাকাবার প্রয়োজন পড়ে না আমার। বলতে পারতাম, ‘কাল রাত্রে ওকে দেখেছি, অনেকদিন পর, কিন্তু চিনতে ভুল হয়নি।’ তবু বলব না, কারণ এরা বুঝবে না কিচ্ছু। তনয়ার দিকে আমি তাকাব না, কথা বলব না ওর সঙ্গে। ওর জন্য গতকাল রাত্রে আমার—কিটি গোমস আর অবিনাশ আর বাকি সবাই, আমাকে ঘেন্না করে, আমাদের, শুধুমাত্র ওর জন্য। ও ব্লাডি অশুভ, তাই আমি মাটি খুঁচিয়েই যাব।
.
ধড়াম শব্দে চমকে আমার হাত থেকে খুরপি পড়ে গেল। প্রচণ্ড স্পিডে এসে এডওয়ার্ডের গাড়ি ধাক্কা মেরেছে গেটে। আমরা তিনজন স্থাণু হয়ে থাকলাম যেটুকু মুহূর্ত, তার মধ্যে এডওয়ার্ড ছিটকে বেরোল। হাত ধরে হিড়হিড় করে টেনে নামাল মনীষাকে। গর্জন করল ‘বার্বি!’ মনীষা হাঁফাচ্ছিল আর টলছিল অল্প। ও কি নেশা করেছে? ভেজা মাটির গন্ধ বাতাসে। বিকেলের কিনারায় ঝোড়ো হাওয়া দিচ্ছে। গাছের পাতায় সিসে রং।
‘আগের দিন রাত্রে ক্রিসকে আপনি দেখেছিলেন?’ অক্ষয় অবাক হল। ‘এর আগে কোথাও বলেননি তো!
‘বলিনি, কারণ পরের দিনেই তো অত কিছু ঘটল, আর আমরা সবাই এতটাই তছনছ হয়ে গেলাম যে, অন্য সব কথা ভুলে গেলাম।’ বেশ রাত হয়েছে। গাছপালার গা ঘেঁষে মিটমিটে জোনাকি। বুড়ো লালুরাম আমার পায়ে মুখ গুঁজে শুয়ে ছিল। আজকাল অ্যারনের পাশে দাঁড়িয়ে জানালা দিয়ে সূর্যাস্ত দেখা ওর প্রিয় অবসর। ‘জানো, সমর দুসাদের সঙ্গে তনয়াদের মোলাকাতের পর অ্যারন আমাকে বলেছিল যে, আমরা নাকি সমরকে খুন করেছি। আমরা এবং আমি। আচ্ছা, তুমি মদ খাবে? মদ না খেলে চা, কফি? না থাক, তার থেকে বরং ডিনার করে যাও। ‘
‘আমি কলকাতা যাচ্ছি। সমরের সঙ্গে কথাবার্তা তনয়া ভট্টাচার্যর মুখ থেকে শুনব। আপনি আগে বলুন, আগের রাত্রে কী দেখেছিলেন। এটা হয়তো আমাদের কেসের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়, কিন্তু তবুও জানতে চাই কারণ একটা টোটালিটি পাব।’
ঘুরঘুট্টি অন্ধকারে ঢেকে যাওয়া মাঠ ও জলাভূমি দেখতে দেখতে মনে হল, হাওয়া বার করে দেওয়া হয়েছে পৃথিবী থেকে, গোপন নীরবতা আমাদের মুড়ে ফেলেছে। বিশ্রী গরম লাগছিল, কুকুর খেপানো গরম, যেখানে গাছেদের মনে হয় কার্ডবোর্ড পিস। ‘তোমাকে যদি সব বলি, তুমি খুঁজে আনবে তো? আমি কিন্তু জানি, ক্রিস এখনও ঘুরে বেড়াচ্ছে।’ ‘আপনি ভাইয়ের হত্যা নিয়ে বিচলিত নন?
উত্তর দিতে অনেকটা সময় নিলাম। এত স্থির ছিলাম যে, লালুরাম অবধি জ্বলজ্বলে চোখ ফেরাল, বেঁচে আছি কি না পরখ করতে। বড়ো নিশ্বাস নিয়ে বললাম, ‘আমি জানি, অবিনাশ এডওয়ার্ডকে খুন করেনি।
হিল্ডা ম্যাকিনলে বেথেল মিশনে প্রার্থনা করে গিয়েছিল। ক্রিসমাসের আগের রাত সেটা। হিল্ডা আমার বন্ধু হয়েছিল, যখন স্কুলের নির্জন বারান্দা অথবা জ্যোৎস্না-ওথলানো প্রান্তর বেয়ে আমরা হাঁটছি। হিল্ডা ম্যাকিনলে, যার স্মৃতি এখন অবহেলার ধূসর কোলাজে একটা টুকরো, হিল্ডা— সিলিং ফ্যান থেকে, কোনো এক ডিসেম্বরে—ক্রিসমাসের পরদিন— আর কিটি গোমসের চায়ের দোকানে সন্ধেবেলা হিল্ডার মতো দেখতে একটা মেয়ে, হিল্ডাকে তার পরেও আমি দেখতে পেতাম, কিন্তু কেউ বিশ্বাস করেনি, সেদিন আবার তখন বাকি মুখেদের ভিড় আমার দিকে নীরবে তাকিয়ে, দল বেঁধে এগিয়ে আসছে, লোডশেডিং-এর রাত, মোমবাতির কাঁপা আলোয় জমাট হিম, ক্লান্ত মুখ, ক্রুদ্ধ মুখ, সন্দেহবাতিকগ্রস্ত মুখ, নিথর তাকিয়ে আমার দিকে, একমাত্র হিল্ডা তাকিয়ে ছিল না। সে দেওয়ালের দিকে মুখ ফিরিয়ে। ‘কী হলটা কী! আমি খুনি নাকি?’
কিন্তু কেউ উত্তর দিল না, যেহেতু আমি চায়ের দোকানে ঢোকার পরেই সব আলোচনা বন্ধ হয়েছিল, মুখগুলো ঘুরে গিয়েছিল আমার দিকে, সেই একবার, তিরিশ বছর না তারও বেশি আগে, বাসুদেব মুন্ডার শুঁড়িখানা— সেবার অবিনাশ আমাকে তুলে এনেছিল, কিন্তু আজ ও কি বৃদ্ধ হয়ে গেছে?
‘বাড়ি যাও বারবারা।’ কিটি গোমস বলল।
‘কেন? পয়সা দিয়েছি বিস্কুট কিনব, না কি?’ হিন্ডা কেন সিলিং ফ্যান থেকে— আমাদের কাউকে বলেনি।
‘এই নাও বিস্কুট। বাড়ি যাও। কিটির গলা শুকনো কাঠ। ওর মুখে ওঠাপড়া ছিল না। একটা রেখাও কোঁচকায়নি ওর। নিরাবেগ স্বরে বলল, ‘কেউ কিছু বলছে না, ভাবছে না । ‘
বাজে কথা! যেভাবে সব্বাই তাকিয়ে, ওদের ভঙ্গি আমি চিনি। আমাদের বাড়ির দেওয়ালে ওরা ‘খুনি’ লিখে আসত। আজ আবার বহুদিন পরে সেরকম লাগছে আমার। কিন্তু, এবার তো কেউ হারিয়ে যায়নি! ‘আরে, সব্বাই পাগল হয়ে গেছে মনে হয়।’ কিটি মুখ ঘুরিয়ে নিল। কিছু হয়নি এমন ভাব করে অন্যেরা কেউ কেউ ঘাড় ফেরাল, অস্বস্তিতে চোখ নামাল কেউ। কতদিনের চেনা এরা! এখন ভাব করছে এমন, যেন আমার উপস্থিতিটাকেই অগ্রাহ্য করছে। আমার মাথায় আগুন জ্বলে উঠল। এলোমেলো হাত ঝাঁকিয়ে চেঁচালাম, ‘ব্লাডি বাস্টার্ডস!’
‘কেন অশান্তি করছ বলো তো? মদ খাবে আর এখানে এসে ঝামেলা পাকাবে।
‘কবে পাকালাম? মিথ্যুক! তুমি দেখছ না সকলে কেমন—আমি পাগল, না, অপরাধী!” বিস্কুটের প্যাকেট ছুড়ে ফেললাম। যাক সব চুলোয়। কিটি আমার পিঠে হাত রাখল, ‘এসো।’ বাইরে এসে আমি আকাশের দিকে হাঁ-মুখ করে শ্বাস নিলে— হয়তো আমিই ভুল বুঝেছি, কিন্তু তা সত্ত্বেও আমি জানি কিছু একটা ঘটেছে। ‘কী হয়েছে কিটি? এরকম করছে কেন ওরা?’
‘অ্যাগনেসকে তোমরা খুন করেছ, সবাই বলাবলি করছে। ওর ছবি নাকি খুঁজে পাওয়া গেছে। পুলিশ আসছে ওর লাশ খুঁজতে। ওইজন্যেই ওই মেয়েটা যে তোমাদের বাড়ি থাকে সে খোঁজাখুঁজি চালাচ্ছে- “
‘শাট আপ! শাট আপ! মাথা গেছে তোমাদের।’
‘বাড়ি যাও, বারবারা। কানাকানি চলছে, সময় ভালো নয়। তারপর তোমাদের পরিবার – “
‘কী? আমাদের পরিবার কী?”
‘এডওয়ার্ডের বাচ্চাটাকে নিয়ে অনেক গুজব আছেই। তোমার বাবার ওরকম—এখন অ্যাগনেস— তুমি বাড়ি যাও। রাস্তাঘাটে মদ খেয়ে ঝগড়া কোরো না । ‘
‘অ্যাগনেসের ছবি, কিটি? আমি নিজেই জানতাম না আমাদের বাড়িতে অ্যাগনেসের ছবিটা আছে। এডওয়ার্ডও জানত না। দু-দিন বাদেই ও বাড়ি ভাঙা হবে। মাটি খোঁড়াখুঁড়ি হবে। তখন কি তোমরা ভাবো অ্যাগনেসের লাশ বেরোবে?’
‘অনেকে ভাবছে।’ কিটির ভাঙাচোরা নির্লিপ্ত মুখে অসময়ের ঘাম জমেছে। শাড়ির আঁচল দিয়ে মুখ মুছে বলল, “আমার দোকানে নানা কিসিমের লোক আসে, দেহাতিরা বেশি তুমি জানো। একবার এদের মধ্যে গুজব রটলে সেবিশ্বাস ভাঙা কঠিন।’
‘আর তুমি? তুমিও বিশ্বাস করো? আমাদের যে কয়েক ঘর আছে—
‘কী এসে যায়!’ কিটি ফিকে হাসল, ‘আমি তোমাদের সমাজ থেকে অনেকদিন ব্রাত্য তো! যেদিন থেকে ভীম যাদবকে বিয়ে করেছি সেদিন থেকে—তুমি ও তো কথা বলতে না, দোকানের সামনে দিয়ে নাক উঁচিয়ে তোমরা হেঁটে যেতে। আমি বহুদিন হল দেহাতি হয়ে গেছি।’
‘এখন এসব কথা তুলে তুমি সিম্প্যাথি নেবে ভাবছ, কিটি? আমাদের বাড়ির কী হবে?’
কিটির চোখ কঠিন হল। আমরা কথা বলছিলাম দোকানের বাইরে রাস্তার ধারে। চোখে পড়ল অনেক মুখ আমার দিকে তাকিয়ে। ওরা রাগছে না, গালাগালি দিচ্ছে না, এমনকী দুঃখও পাচ্ছে না, শুধু অপেক্ষা করছে কবে আমাদের বাড়ি হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়বে। ‘বললাম তো, যাও এখন। লোকে কী ভাবল, তা দিয়ে কবে তোমাদের কিছু এসে গেছে?”
.
‘তোমাদের ভাবনায় আমি ব্লাডি হিসি করি।’
‘বাড়ি যাও, বারবারা।’
‘অ্যাগনেস মরেছে, বেশ হয়েছে। আমাদের ওই যে গুদামঘরটা দেখেছ, ওটার নীচে ওর লাশ পোঁতা। আমিই মেরেছিলাম, ঘাড় মটকে দিয়েছিলাম। পুলিশ সব জানে, কিন্তু কিচ্ছু করবে না, বুঝলে?”
‘বাড়ি যাও, বারবারা। এভাবে চেঁচিয়ো না।’
‘শুনলে কী হবে? কে কী করবে আমার? অ্যাগনেস এতদিনে কঙ্কাল থেকে ধুলো হয়ে গেছে।’
‘বাড়ি যাও, বারবারা।’
‘হিল্ডা দাঁড়িয়েছিল ওখানে। ও সত্যিটা জানে। তাই তোমাদের চোখে চোখ রাখতে ঘেন্না পাচ্ছিল।’
‘বাড়ি যাও, বারবারা।’
‘তোমরা কী ভাবো? কিচ্ছু ফুরোয় না। হিল্ডা জানে—হিল্ডা–সিলিং ফ্যান থেকে— হিল্ডা– আস্তে, ঘাড়ে লাগছে, অত জোরে টেনো না, ব্লাডি মেয়েছেলে, তোর চায়ের দোকানে আমি থুতু ফেলি, হিল্ডা থুতু ফেলে—
কিটি গোমসের দোকান থেকে বেরিয়ে আমি এখানে-ওখানে ঘুরলাম। আমার মনে পড়ল, টাকা দিয়ে বিস্কুটের প্যাকেট ফেলে এসেছি। কিন্তু ফিরব না, ওরা যেভাবে- এদের সবাইকে আমি বুঝে নেব একদিন। আর ওই যে তনয়া, ব্লাডি টিকটিকি, ওর জন্য আজ এমন হল, কারণ ও ক্রিসকে ফেলে অ্যাগনেস নামের কঙ্কালকে আবার মাটি খুঁড়ে বার করছে। এই নির্বুদ্ধিতার দাম ও দেবে না, দেব আমি। এখন হাতের কাছে পেলে ওকে চড়থাপ্পড় মেরে দিতে পারি।
‘তোমাদের জন্য—শুধু তোমাদের— তার বদলে তুমি কী পেলে? বাগানের ধার ঘেঁষে চোরের মতো মনীষাকে দেখে যাও। তুমি জানো, সত্যিটা কি? বলব?’ বিকৃত গলায় হিসহিসে হাসলে অবিনাশ চোখ বন্ধ করল। ওর কষ্ট হলে হোক, আমার কী?
আধো হিম রাস্তাঘাট, বন, প্রান্তরে ঘুরতে ঘুরতে আমার মাথায় অ্যাগনেসের ছবিটা আবার ফিরে এল। গাছের ডালে বসা, আর কেউ একজন হাত বাড়িয়েছে। একটা সোয়েটার পরা হাত, হাতায় ময়ূরের নকশা। এই ডিজাইনটা আমি দেখেছি কোথাও? এত চেনা লাগছে কেন? অ্যাগনেসের বাবা কি এমন সোয়েটার পরত? সে যা হোক, আমরা ওকে খুন করেছি, ঠিক যেভাবে ক্রিসকে মেরেছিলাম। হয়তো আমিই, ক্রিসকে জলাভূমিতে চুবিয়ে দিয়েছি বলে এখন আমার অপরাধী মন ক্রিসকে ওখানে দেখায়, তাই না? এই সমাধানে সবাই তৃপ্তি পাবে। আর, ওই যে টিকটিকি ছুঁড়িটা বোদ্ধা মুখ করে আবোলতাবোল প্রশ্ন করে যাচ্ছে, ও হয়তো জম্পেশ একটা ক্রাইম স্টোরি পেয়ে যাবে ওর ম্যাগাজিনের জন্য। এবার গাছের ডাল থেকে ঝুলবে অন্য কেউ, হয়তো এডওয়ার্ড অথবা অ্যারন— আমাদের নিয়তি— কারণ আমাদের পরিবার অভিশপ্ত, আমিও অভিশপ্ত— এডওয়ার্ড, বাবা প্রচণ্ড মারত এডওয়ার্ডকে, চাবুক হাতে ওকে তাড়া করত বাগানের গাছগাছালির ফাঁক দিয়ে। হাউহাউ কান্নায় ভেঙে পড়েও প্রাণপণে পা ঘষটে এগোতে চাইত। এডওয়ার্ড।
‘বাবা জানত, মা জানত, আমি জানতাম। বুঝলে? আমরা সবাই জানতাম। তোমার দিকে তাকিয়ে আমরা হেসেছি নিজেদের মধ্যে। মনীষাও জানত আমরা জানতাম যে, তবু ও পুলিশকে জানায়নি। বোকা বানিয়েছে তোমাকে।’ অবিনাশ কাঁপছিল থরথর করে। ওর চোখ কুঁচকে যাচ্ছিল, সেখানে রক্তের ছিটে জমা হয়েছে। এই চেয়ারটায় বসে থাকা ওর বরাবরের প্রিয় বিলাস আমি জানি। আজ বিলাসখানি টোড়ি বাজছে, কিন্তু কে শুনবে ওসব? পাত্তা দেবার দরকার পড়ে না। আমাকে বসতে বলেছিল, বসিনি। মদ খেতে বলেছিল, খাইনি। ও সেদিন গল্পটা না-বললে এত কিছু হত না। কিন্তু, ওকে তো আমিই বলেছিলাম তনয়াকে যেন জানায়। জলাভূমির ধারে আমার সঙ্গে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে, আমার কান্না শুনতে শুনতে ও ক্ষয়ে গিয়েছিল কি? আমার কাউকে দরকার নেই। তনয়াকে তাড়াব, অ্যারনকে তাড়াব, অবিনাশকে জানাতে হবে ও আসলে কী ছিল, এতগুলো বছর ধরে কী ভূমিকা পালন করে গিয়েছে। বাগানের ধার ঘেঁষে চোরের মতো। আমাদের বাড়ির সামনের কাঁঠালগাছ থেকে ঝোলানো ওই পুতুল দুটো, কাপড়ের ওপর কালো চোখ-নাক-মুখ আঁকা, জল্লাদের মতো পাহারা দিয়ে যাচ্ছে আজীবন যারা আমাদের, কারা ওদের টাঙিয়ে গিয়েছিল? বাবা কি ওদের দেখতে পেত? কিন্তু, পুতুল দুটো দেখে আমার বাবা, মায়ের কথাই মনে পড়েছে বরাবর। আছে হাওয়া, আছে রোদ, আছে মর্মর পৃথিবী, আর আমাদের করুণা আছে— বাবা বলেছিল। অ্যাগনেসের ভূত দেখে জ্ঞান হারাবার পর যখন চেতনা ফিরেছিল বাবার, তখন জলাভূমির ওপারে স্থির দাঁড়ানো অ্যাগনেসের সাদা গাউন, ওর লাল চুলে আগুন ঝলসে যাচ্ছিল। বাবার চোখ বেয়ে সেই প্রথম অশ্রু গড়াতে দেখেছিলাম আমি । তারপর থেকে ওরা পুতুল হয়ে গাছ থেকে ঝুলছে। যেমন ঝুলছিল বাবা, হিল্ডা ঝুলছিল সিলিং ফ্যান থেকে। এই প্রথম অবিনাশ কথা বলল জড়িত স্বরে।
‘আমার অনেক বয়েস বেড়েছে। এগুলো শুনে কী করব, বারবারা? যে যেভাবে সুখী থাকে থাকুক।’
‘কিন্তু এখন বুঝেছ তো, কেন ক্রিসকে খুঁজে পাওনি? লোকে তোমাকে বুদ্ধু গোয়েন্দা ভেবেছিল। কারণ, মনীষা সব জেনেও তোমাকে বাঁদর নাচিয়েছে।’ মুখ দিয়ে হুস করে আমি ধোঁয়া ছাড়ার ভঙ্গি করলাম।
‘বাড়ি যাও।’
আমার মা ক্রিসকে লোপাট করেছে। আমার বাবা মানুষ খুন করেছে। আর, আমি অ্যাগনেসকে। অ্যারন আমাদেরই রক্ত যেহেতু তাকেও কিছু-না-কিছু খুন করতে হবে। এই দেখো না কেমন হাতের তালুতে বিঁধিয়ে দিয়েছি কুলগাছের কাঁটা, তবু আমার কিছুই মনে হচ্ছে না, ব্যথাও লাগছে না। বাবা শেষমেষ কাউকে না-পেয়ে নিজেকেই খুন করেছিল। এসবের সন্ধান পুলিশ পাবে না, আর তনয়া তো সেদিনকার মেয়ে! আমাকে কনফেস করতে হবে কারণ মানুষের বিশ্বাস, ঘেন্না, সন্দেহ আর বাকি যা কিছু সেগুলোই সত্যি। তাদের পিঠে করে বইতে গিয়ে স্থায়ী ক্ষত বানিয়ে ফেলেছি আমরা। ‘যাব না। তোমাকে আজ জানতে হবে, মনীষা আর আর্চির পাশাপাশি বসে থাকার ভেতরের রহস্যটুকু। কী নিরীহ ছবিটা। না? যদি না পেছনে এডওয়ার্ড দাঁড়িয়ে থাকত, তাহলে অনায়াসে ভাইবোনের ছবি— তুমি যদি জানতে অবিনাশ, ওহ্, এতদিনেও কেউ বলেনি তোমাকে—’
‘জেনিফারের কথায় বিশ্বাস করার কারণ নেই।’ নিজেকে শোনাল। আমি হেসে উঠলাম। কারণ না-থাকলে নিজের কাছে বলতে হয় না। দেহাতি মানেই বোকা। শুধু বোকা না, কুত্তার বাচা। যেমন অ্যাংলো মানেই কুত্তার বাচ্চা। বাঙালি মানেই কুত্তার বাচ্চা। গুজরাতি মানেই, মারাঠি মানেই— ‘আমি জানতে চাই না! জ্বালিয়ো না আমাকে।’
আদিম হাওয়ার ফিসফিসের মতো টাউন আমার কানে বলে গেল, বিশ্বাসঘাতক, খুনি, প্রবঞ্চক আর অনেক শব্দ। মেঠোরাস্তার চড়াই-উতরাই পেরিয়ে, পূর্বের পাহাড়ের গায়ে ফুটে থাকা বাজরা এবং ডেগাডেগি নদীর হাতছানি পেরিয়ে, কুন্তী ফলসের অবিশ্রাম মর্মর পেরিয়ে আমি হেঁটে গেলাম। এই ইতিহাস ভূগোল, জালিম ও প্রপঞ্চনাময় — ধূসর আগাছায় ঢাকা কটেজের ভাঙা শার্সির ভেতর থেকে লাফ দিয়ে একটা বেড়াল বেরিয়ে এল। জ্বলজ্বলে সবুজ চোখে তাকিয়ে রইল আমার দিকে। রাগী চোখ। একটা ঢিল কুড়িয়ে ছুড়লাম ‘যাহ্, পালা ৷ হারামজাদি, নাহলে কুচ করে কেটে খেয়ে ফেলব।’ ভয়ের নামগন্ধ নেই। তখন চোখে পড়ল, কটেজটার সামনের বাগানে লতাপাতায় ভরতি একটা কুয়ো, তার ওপর পায়ে পা তুলে বসে অ্যালিস। সাদা ড্রেস, মাথায় ডালপালার মুকুট, সামনের ভাঙা দাঁতও অবিকল। চিবুকে হাত দিয়ে, আমাকে দেখছে না। গভীর ভাবনায় মগ্ন। বেড়ালটা তার পায়ের কাছে। অ্যালিসকে
এভাবে দেখতে আমি অভ্যস্ত। কিন্তু, আজ ও আমাকে জেনিফারের কথা মনে পড়াল। জেনিফার, যে সব জানে। জানে ক্রিসের ক্ষতি আমরা করেছি, হয়তো অ্যাগনেসের ক্ষতিও I জানে মনীষা এবং আর্চির গোপন অন্ধকার। জেনিফার সবাইকে বলে বেড়িয়েছে। সবাই জানে সব, জানে না একমাত্র অবিনাশ! বোকা অবিনাশ, অপদার্থ। আমাকে অবিনাশের বাড়ি যেতে হবে। বলতে হবে ওকে, সব জানাতে হবে। আর কতদিন ইডিয়টের ভূমিকা পালন করবে ও?
অবিনাশের বাড়ি থেকে বেরিয়ে স্যাংচুয়ারি ফিরে এলাম। তনয়া ফেরেনি। নাফিরুক, আজ আমার থেকে দূরে থাকলে ভালো করবে। অবিনাশের মুখ বিধ্বস্ত, যেন এখনই কেঁদে ফেলবে, কিন্তু সেগুলো ভাবার দরকার পড়ে না। আমি জানি, কাল ও আবার এসে আমার পাশে বসে মদ খাবে। রাত হলে জলাভূমির দিকে তাকিয়ে কাঁদব আমি। বরাবর হয়ে এসেছে। ওকে গালমন্দ করেছি মাথা গরম হলে, তাতে কার কী!
পোড়োমাঠ পাতলা কুয়াশায় চুবে আছে, তাকে ভেদ করে ওপাশের অরণ্য দেখলে মনে হবে, কুয়াশার চাদরে টোকা দিলে কেঁপে উঠবে। একটা-দুটো গাছের অবয়ব তার ভেতর থেকে মাথা তুলেছে। তাদের গা থেকে টপটপ করে চুঁইয়ে নামছে কুয়াশা। আজ বরফ মেশাব না। উফ, জ্বলছে! চারপাশে আলো নেই কোথাও, কিন্তু অন্ধকারে চোখ সইয়ে নিতে গিয়ে দেখলাম, টুকরো মেঘের ওপর থেকে লাফিয়ে উঠল চাঁদ। পোকায় কামড়ানো, রক্তাক্ত। হিম প্রান্তরে ভাঙা আলো ছড়িয়ে গেল। তখন আমার চোখে পড়ল, দূরের জঙ্গলে কিছু একটা নড়ছে। শেয়াল ভেবে এগিয়ে গেলাম দুই পা। তখন আমি ক্রিসকে দেখলাম।
ভালো বোঝা যায় না, আবছা। কিন্তু, এই অবয়ব আমার চেনা। এভাবেই স্থির দাঁড়িয়ে আমার দিকে তাকিয়ে থাকত। সে কতদিন হয়ে গেল! গত প্রায় দশ বছর আমি ওকে দেখিনি, কিন্তু বিশ্বাস করতাম যে ও আছে, যেকোনোদিন আবার আসবে। আজ অবিকল একরকম ও। কী পরে আছে এখান থেকে বুঝতে পারছি না এই অন্ধকারে। দিনের বেলা যখন দেখতাম, তখন আমার হাতে বোনা একটা জামা পরে থাকত ও। সেই জামাটা পরেই ও হারিয়ে গিয়েছিল, এতগুলো বছর পেরিয়ে নিজের হাতের কাজ আমি বুঝতে পারি। আজ কি ওটাই পরে আছে? ওর ঘাড় আমার দিকে ফেরানো। নাকি আমাকে দেখতে পাচ্ছে না, দেখছে আসলে বাড়িটাকে? আমি ফিসফিস করলাম, ‘আসছি আমি। তুই দাঁড়া ওখানেই।’ তারপর আমি ঘাসবনের দিকে এগোলাম।
বেশিদূর যেতে হল না কারণ উঁচু ঘাসে আমার দৃষ্টি রুদ্ধ হয়েছিল। সেগুলোকে সরিয়ে দেখলাম, ক্রিস নেই। এমন আগেও হয়েছে। যতবার যেতে চেয়েছি ওর কাছে, পালিয়ে গেছে ক্রিস। আমি ঘাসবনের ভেতরে দাঁড়িয়ে থাকলাম কতক্ষণ জানি না। আমার গাল ভিজে যাচ্ছিল, হিমের স্পর্শে হতে পারে, কারণ কোনো কষ্ট অনুভব করছিলাম না। কিটি গোমস, হিল্ডা, অবিনাশ, জেনিফার, অ্যালিস, নাহ্। বস্তুত, আমার শূন্য লাগছিল। তাই খাঁ-খাঁ চোখে পাথরের মতো আমি দাঁড়িয়ে থাকলাম। তারপর একটা বিশ্রী কালো মেঘ এসে চাঁদকে আবার ঢেকে দিল আর চরাচর ব্যাখ্যাহীন অন্ধকারে ডুবে গেল।
.
.
