নৈশ অপেরা – ১২

১২

আর যে ব্যক্তি পরের ভার্য্যার সহিত ব্যভিচার করে, যে ব্যক্তি প্রতিবাসীর ভার্য্যার সহিত ব্যভিচার করে, সেই ব্যভিচারী ও সেই ব্যভিচারিণী, উভয়ের প্রাণদণ্ড অবশ্য হইবে।

— Leviticus। 20:10

.

অ্যাগনেসকে আমার মনে পড়ে না আজকাল। হ্যাঁ জানি, আমি ইনভেস্টিগেটিং অফিসার ছিলাম ওর কেসের। কিন্তু, যতই ভুরু কুঁচকে আমার দিকে তাকান না কেন অফিসার, আপনাকে মনে রাখতে হবে, আমি একজন ব্যর্থ পুলিশ যে সারাজীবনে ছিঁচকে চোর বাদে বিশেষ কিছু ধরেনি এবং যার বয়েস এখন সত্তর। তাই তার স্মৃতি সতেজ থাকবে এমন আশা করতে পারেন না। বরং, অনেক স্মৃতিকে সে জোর করেই চাপা দিতে চায়। কিন্তু, তা হলেও বারবারা ও টিনার চাপাচাপিতে ওদের পুলিশ ফাইলগুলো জোগাড় করেছিলাম। আপনি অ্যাগনেসকে নিয়ে কৌতূহলী, তার মানে এডওয়ার্ড ব্রাউনের হত্যার সঙ্গে অ্যাগনেসের যোগ আছে বলে আপনার অনুমান। অ্যাগনেসকে নিয়ে আমার লেনদেন ছিল না কিছু, ফলত তার কানেকশন থাকলে আমি আপনাদের সন্দেহের তালিকায় থাকব না, তাই না? ওহ্, তাতেও থাকব? কেন, তদন্তকারী অফিসার ছিলাম বলে, শুধুমাত্র এটাই? দুর্বল কার্যকারণ না? এডওয়ার্ডের সঙ্গে আমার ঝগড়া হয়েছে তিন বছর আগে, দু-জনেই দু-জনকে দেখে নেবার হুমকি দিয়েছিলাম, কারণ এডওয়ার্ড ছিল শোকগ্রস্ত এবং আমি মাতাল। তিন বছর পরে আমি রাগ মেটালাম কারণ আমার নামে পুলিশে অভিযোগ জানিয়েছিল এডওয়ার্ড—এতদূর তাও মানা যায়। তা বলে অ্যাগনেস? দেখুন, আমার পুলিশি বুদ্ধি বলে, যেকোনো একটা কারণকে ধরে আপনারা এগোতে পারেন। হয় আমার সঙ্গে শত্রুতা, অথবা, অ্যাগনেসের নিখোঁজ হবার সঙ্গে কানেকশন। কিন্তু, দুটোকে একসঙ্গে মেলানো বুদ্ধিমানের পরিচয় নয়।

আগেও অনেকবার বলেছি, এডওয়ার্ড ব্রাউনকে আমি কিছু করিনি। তার আগের সারাসন্ধে আমি এইখানে বসে মদ খেয়েছি আর ভীমপলশ্রী শুনেছি। আরে, আমার স্ত্রী কী বলবে, তার হার্টের সমস্যা, আগের বছর বাইপাস হয়েছে, তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়ে। অ্যালিবাই না-থাকলে আমি তো বানাতে পারব না! হ্যাঁ, তার দু-দিন আগে জোহার হালে-তে ঘোরাঘুরি করছিলাম, কেউ কেউ দেখে থাকতেই পারে। কিন্তু, সেরকম অনেক জায়গাতেই আমি হাঁটাহাঁটি করি। জোহার হালে হাঁটাহাঁটির জায়গা নয় সেটাই-বা আপনি জানলেন কেমন করে? কোনো উদ্দেশ্য ছিল না। আর যদি থাকেও, তার সঙ্গে এডওয়ার্ড ব্রাউনের যোগ ছিল না সেকথা বলতে পারি। ব্যক্তিগত নয়, গিয়েছিলাম রেভারেন্ড গরম্যানকে দেখতে। কিন্তু, তারপর মনে হয়েছিল, সন্ধ্যা হয়ে গেছে, বৃদ্ধকে বিরক্ত করা উচিত নয়। তাই দেখা নাকরে ফিরে আসি। যে বা যারা আমাকে দেখেছে বেথেল মিশনের সামনে দাঁড়িয়ে ইতস্তত করতে, তারা ভুল দেখেছে। কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে ভেবেছিলাম যাব কি যাব না, তারপর পিছু ফিরি। বাজি ফেলতে পারি, আমার আচরণ তাদের চোখে সন্দেহজনক ঠেকত না দুদিন পর এডওয়ার্ডের মৃতদেহ ওখানে আবিষ্কার না হলে

দেখুন, আমি সরাসরি টিনার তদন্তে যোগ দিইনি, কারণ মনে হয়েছিল আমি পারব না। এতদিনেও পারিনি যখন—এখন ও ফ্রেশ চোখ দিয়ে দেখছে, তার মধ্যিখানে আমার বিচারধারা ঢুকিয়ে ওর সেই দেখাটাকে গুলিয়ে লাভ নেই। যদিও অবাক হয়েছিলাম, এটার মধ্যে অ্যাগনেসকে কেন টেনে আনা হচ্ছে। আপাতদৃষ্টিতে যোগসূত্র— হ্যাঁ হ্যাঁ জানি, এডওয়ার্ডকে পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদ করেছিল, আমার মনে ছিল না, বারবারা মনে করিয়েছিল। তার কারণ, নিখোঁজ হবার কিছুদিন আগে থেকে যাদের যাদের সঙ্গে অ্যাগনেস কথা বলেছিল, বা, যে যে বাড়িতে গিয়েছিল, তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা। অ্যাগনেস মাঝে মাঝেই যেত ব্রাউনদের বাড়িতে। হারিয়ে যাবার দিন পাঁচেক আগেও গিয়েছিল। ডেভিডকে জিজ্ঞাসা করলে তিনি অবাক হয়েছিলেন কারণ, অ্যাগনেস যে তাঁর বাড়িতে যায় সেটাই জানতেন না মনে হল, অ্যাগনেসকে চিনতেও পারছিলেন না প্রথমে। অ্যাগনেস যেত হয় বারবারা অথবা আগাথা অথবা এডওয়ার্ডের কাছে, মনীষার প্রসঙ্গ বাদ কারণ তখনও তাদের বিয়ে হয়নি। কিন্তু, গত দুই মাস আগাথা টাউনে ছিলেন না, দেরাদুনে অসুস্থ মায়ের কাছে থাকছিলেন। বারবারা বলেছিল গত একমাস অ্যাগনেসের সঙ্গে তার দেখা হয়নি। তাহলে পড়ে থাকে এডওয়ার্ড। সে জানিয়েছিল অ্যাগনেস তার কাছে একটা ব্যাডমিন্টন র‍্যাকেট ধার করতে এসেছিল। সেটা সত্যি কথা, অ্যাগনেসের সংগ্রহে সেরকম র‍্যাকেট আমরা পেয়েছি। এর বেশি কথাবার্তা এডওয়ার্ডের সঙ্গে তার হয়নি। অ্যাগনেসের হারিয়ে যাবার পেছনে এডওয়ার্ড ছিল কি? সেদিন এডওয়ার্ড যে নিজের ঘরে কনজাংটিভাইটিস হয়ে শুয়ে ছিল, সেটা জেরাতেও জানিয়েছে। ফাইলে পেলাম। এডওয়ার্ডের শুয়ে থাকার বক্তব্যে সিলমোহর দিয়েছে তার স্থানীয় বন্ধুরা। প্রতিবেশীদের ছেলে বেনেডিক্ট দেখা করতে এসেছিল, কিন্তু এডওয়ার্ড ঘরের ভেতর থেকে জানিয়েছিল, সে যেন না-ঢোকে। এডওয়ার্ড তার কলেজের একজন বন্ধুকে, সে রাঁচি থাকে, দু-দিন আগে ফোন করে জানিয়েছিল তার চোখ থেকে জল পড়ছে। ডাক্তারের প্রেসক্রিপশনও তার ঘরে আমরা পেয়েছি। ফলত, এডওয়ার্ড অ্যাগনেসকে অপহরণ করতে পারে না। কাউকে দিয়ে করাবে এমন বিশ্বাস আমার হয়নি। বড়োলোক বাপের বখে যাওয়া ছেলে গুন্ডা পাঠিয়ে কোনো মেয়েকে তুলে আনছে, এ জিনিস হিন্দি সিনেমার বাইরে হয় না। তাহলে টিনা কেন একটামাত্র চিরুনির ওপর ভিত্তি করে অ্যাগনেসকে টেনে আনছে? গতকাল পর্যন্ত বিশ্বাস করেছি ও এই যোগসূত্রটা জোর করে টানছে। আজ, জানি না।

বরং, আমরা জোর খাটিয়ে জেরা করেছিলাম একমাত্র মুন্নাকে, ওর যে বয়ফ্রেন্ড ছিল। দেহাতিদের ছেলে। বাড়ি বাড়ি দুধ দিত। এখানে আমার একটা স্বীকারোক্তি আছে। মুন্নাকে পুলিশ প্রচণ্ড মেরেছিল। কাশতে গেলে মুখ দিয়ে রক্ত উঠছিল ওর। কিছু একটা ইনজুরি হয়েছিল যতদূর মনে পড়ছে, যা থেকে ওর জ্বর এসেছিল প্রচণ্ড, শুনেছিলাম সেপটিক হয়েছে। আমরা বলেছিলাম যে, মুন্না ডাকাত। সেসময় আশেপাশের গ্রামগুলোতে কয়েকটা ডাকাতি হয়েছিল। মুন্না ছিল জাতে কুর্মি। আর তখন পুলিশের ওসি, তিনি ছিলেন ঠাকুর। ডাকাতিগুলোর একটা হয়েছিল ঠাকুরদের গ্রামে। ডাকাতদের একজনের মুখ থেকে গামছা সরে যায়, তাকে চিনতে পেরেছিল সে-বাড়ির একজন। কুর্মিদের একটা ছেলে। পুলিশ তাকে পায়নি, সে এলাকা ছেড়ে পালিয়েছিল। মুন্নাকে সেই ওসি নিজের হাতে মারধর করেছিলেন কারণ, কুর্মি-কুর্মি ভাইভাই। কুর্মিরা নীচু জাত, তারা ঠাকুরদের ঘরে ডাকাতি করছে, সেটা ডাকাতির থেকে অনেক গর্হিত অপরাধ ছিল। মুন্নার কপাল খারাপ, মাঝে পড়ে ফেঁসে গেল। মিস্টার ঠাকুর কয়েক বছরের জন্য এখানে এসেছিলেন, ১৯৮৭ সালে বদলি হয়ে যান। আমি মাত্র কয়েক বছর ডিউটিতে ঢুকেছি তখন। মুন্নাকে এত মেরেছিলাম যে, হাসপাতালে রাখতে হয়েছিল। বেকসুর খালাস দেওয়া হয়েছিল কয়েক দিন পর। অ্যাগনেসের কেস নিয়ে কারোর মাথাব্যথা ছিল না। এরকম বহু ছেলেমেয়ে হারিয়ে যায়। আমরা ধরে নিয়েছিলাম অ্যাগনেসও পালিয়েছে। অ্যাগনেসের ফাইলে বেশ কিছু কাগজ মিসিং ছিল, তার মধ্যে মুন্নার ডিটেইলসও পড়ে।। কোথায় গেল জিজ্ঞাসা করাতে কেউ গা করল না। অন্য অনেক পাতাও অবশ্য নেই, যেমন কিছু সাক্ষীদের বক্তব্য ইত্যাদি। এত বছরের পুরোনো ফাইলে এরকম হামেশাই হয়। কেউ কেউ বলেছিল ছাড়া পাবার কয়েক দিনের মাথায় মুন্না আবার অসুস্থ হয়। ওকে নাকি রাঁচির হাসপাতালে নিয়ে যেতে হয়েছিল, কারণ ওর সেই সেপটিক আবার ফিরে এসেছিল। কয়েক মাস পরে কার কাছে যেন শুনেছিলাম মুন্না হাসপাতালেই মারা গেছে। অন্যমনস্ক ছিলাম, অত গা করিনি, তবে কথাটা মনে ছিল—সেই যে মেয়েটা হারিয়ে গিয়েছিল, তার কেসে মূল সন্দেহভাজন মৃত। তবে লক-আপে যে মরেনি, আমাদের বাপের ভাগ্য।

দেখুন অফিসার, অ্যাগনেস একটা ষোলো-সতেরো বছরের মেয়ে। খুব একটা বুদ্ধিমান বলে মনে হয়নি। পড়াশোনাতে মাথা নেই তেমন। আছে শুধু রূপ, যার ফলে বহু মানুষের মনোযোগের কারণ হয়েছিল। শুনেছি, মাথায় গণ্ডগোল ছিল। ওর বোন ডলোরেস আমাদের কাছে এ ব্যাপারে স্টেটমেন্ট দিয়েছিল, যদ্দূর মনে পড়ে। আমার মাথায় যেটা আসেনি, তার পালিয়ে যাওয়া অথবা হারিয়ে যাওয়া, এত অভিঘাত কীভাবে তৈরি করতে পারে যার ফলে মানুষ তার ভূতকে দেখতে শুরু করবে? এ তো মাস হ্যালুসিনেশন। তখন নিজেকে বুঝিয়েছিলাম যে, এই কেস আমাদের আওতার বাইরে, হয়তো রেভারেন্ড গরম্যান এর আসল ব্যাখ্যা দিতে পারবেন। অ্যাগনেস আমাকে আকর্ষণ করেনি, যেমন করেছিল ক্রিস। আপনিও জানেন, হত্যা মামলায় এরকম ঘটনা মাঝে মাঝেই ঘটে, আমিও তেমন কেস পেয়েছি, যেখানে মৃত ব্যক্তিকে পরে দেখা গেছে বলে কেউ কেউ দাবি করেছে। কিন্তু, সেখানে একটা মৃতদেহ থাকে যা নিজের গল্পটাকে সুচারুভাবে বলে। আমাদের সবথেকে বড়ো সমস্যা হল, দুদুটো রহস্য, যদি অ্যাগনেসের ঘটনাকে রহস্য বলেন, কিন্তু একটাও বডি নেই। নেই গল্প বলতে পারে এমন কোনো ফিজিক্যাল উপাদান। এটাই এই আখ্যানকে প্রায় অসম্ভব এবং সমাধানের অযোগ্য বানিয়েছে, মাঝের অতিবাহিত তিরিশ বছর বাদও যদি দিই।

এখানে আপনি হয়তো ভুল বুঝছেন। আমি বারবারাদের নিরুৎসাহিত করব কেন? তাহলে তো প্রথমদিন গল্পটাই বলতাম না। কিন্তু টিনা এবং বারবারা, ওরা ছিল আইডিয়ালিস্ট। ওরা মনে করে যে, অপরাধ যেহেতু আমাদের স্টেটাস কুয়োকে লঙ্ঘিত করে, আক্রমণ করে ব্যক্তিগত সম্পত্তির পবিত্র ধারণাকে, তাই শাশ্বত ও অপরিবর্তনীয় জগতের স্থিতাবস্থাকে ফিরিয়ে আনার জন্য একটা ডেটারেন্ট দরকার। কী সেই ডেটারেন্ট? নিয়মের গাণিতিক বেড়াজাল ও শৃঙ্খলার বজ্রআঁটুনি, যা দিয়ে মানুষ এবং তার অপরাধকে এক-একটা গাণিতিক সমস্যায় পরিণত করা যায়। অপরাধীর উচ্চতা, ওজন, ডান হাতের ক্ষতর বয়েস, অথবা চুলের রং বিচার করে তার ব্যবহারের প্রোফাইলিং করা যায়। কিন্তু আমি, যে কখনো কোনো অপরাধের সমাধান করেছে বলে নিজেই বিশ্বাস করে না, সেই আমি জানি, এভাবে কিচ্ছু হয় না। পুলিশে এত বছর কাজের সুবাদেই জানি, অপরাধীর ধরা পড়া অথবা না-পড়া দুটোই স্বাভাবিক। বাস্তব মানে অসংখ্য আলাদা আলাদা ফ্যাক্টর, অযুত সম্ভাবনা, তাদের নিযুত ব্যখ্যা। একটা লোক হত্যার সময়ে অকুস্থলে ছিল আর তার হাতে মৃতর রক্ত লেগে ছিল, এর কয়েক হাজার আলাদা ব্যাখ্যা হতে পারে যাদের সবক-টায় সেই ব্যক্তি এবং ওই হত্যাকাণ্ডের মধ্যে কোনো সম্পর্ক নেই। তবু আমরা নিজস্ব ব্যাখ্যার সুবিধের জন্য ওই একটাই সমাধান বেছে নিই, ভুলে যাই য, মানুষ আসলে অসীম সম্ভাবনাময়। তার ভেতর লুকিয়ে আছে বিপুল শক্তি ও উদ্দীপনা, আর সেই কারণেই, ক্ষণে ক্ষণে অপ্রত্যাশিত কাজের মাধ্যমে আমাদের চমকে দেবার ক্ষমতা। তবু টিনা বিশ্বাস করে যে, পাপ সম্পর্কিত প্রোটেস্টান্ট ধারণার প্যাটার্ন খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না বলে রেভারেন্ড গরম্যানকে সন্দেহ করা যায়। এই যান্ত্ৰিক অভ্যাসে মানুষ এবং মানবিক অভ্যাসগুলোকে যেভাবে রিডাকশন করা হয়, সেটা আমাদের একার ব্যর্থতা নয়, ব্যর্থতা আমাদের অপরাধবিজ্ঞানের, শাস্তি, সংশোধন ও জেলখানা সম্পর্কিত ধারণার। এবং, ব্যর্থতা অতি অবশ্যই সোনালি যুগের ডিটেকটিভ ফিকশনের, যারা এই রিডাকশনিস্ট অ্যাপ্রোচকে তাত্ত্বিক বৈধতা দিয়েছে, যারা মনে করেছে ডিটেকটিভ এক ঈশ্বরপ্রতিম অস্তিত্ব যিনি ওপর থেকে মরজগতের পাপ দেখেন, বিশ্লেষণ করেন, কিন্তু তার অংশীদার হন না। প্রতিটা গল্পের শেষে একটা ঘরের ভেতর সবাইকে বসিয়ে অপরাধ বিশ্লেষণ তো যেন শেষ ভোজসভা— জুডাসের মতো এখানেও উপস্থিত সকলের মধ্যে লুকিয়ে আছে আসল অপরাধী। ওরা দু-জন, টিনা আর বারবারা, ওরা এই সেট-আপের ভেতরেই নিজেদের কমফর্ট জোন খুঁজে নিয়েছিল। তাই আমি ভয় পাচ্ছিলাম, কারণ এই প্রত্যেকটাই— অপরাধ, তদন্ত, সমাধান এবং শাস্তি, এর প্রতিটা অধ্যায় আমার কাছে ক্লান্তিকর আর অর্থহীন এক-একটা প্রক্রিয়া। তাই সেখানে সাফল্য পেল, নাকি, পেল না তা দিয়ে কিছু আসে-যায় না, অন্তত আমার কাছে। মাতাল হয়ে আবোল-তাবোল বকছি বলছেন? হতেও পারে। অথবা, যেহেতু আমি ক্রিসকে খুঁজে পেতে ব্যর্থ হয়েছিলাম, তাই আঙুরফলকে টক বলছি, এটাও সম্ভব। কিন্তু, আমার সেই আত্মবিশ্বাস ছিল না যা ছিল ওদের সেই আত্মবিশ্বাসকে আমি ভয় পাই, কারণ জানি সে অন্ধ।

যেদিন টমাসের বাড়ি থেকে প্রথমে এডওয়ার্ড আর তারপর তনয়া রেগেমেগে বেরিয়ে গেল, সেদিন তার কিছু পর আমিও বেরিয়ে পড়েছিলাম, কারণ মেজাজ খিঁচড়ে ছিল এসব দেখে। বাড়ি ফিরে শান্তিতে বোতল নিয়ে বসব বলে অন্ধকার রাস্তা ধরে হাঁটছিলাম। ডাক্তার হাঁটতে বলেছিল, তাই বেশি হাঁটা হবে বলে ঘুরপথ নিয়েছিলাম। তাড়া তো নেই। ডাফরিনপাড়ার রাস্তা দিয়ে যেতে আমার ভালো লাগে। রাস্তার দুই পাশের গাছেরা ঝুঁকে মাথার ওপর চাঁদোয়া রচনা করেছে মনে হয়। হিমশীতল ও নির্জন। টর্চ হাতে হেলতে-দুলতে এগোচ্ছি। তখন দেখি, সামনের একটা কটেজে আলো জ্বলছে। এই কটেজটা আর্চির। মনীষার তুতো ভাই। এইদিকটার সব কটেজ পরিত্যক্ত, আর্চির আর শ্যাডওয়েলের কটেজ বাদে। শ্যাডওয়েলরা হংকং চলে যাবার সময়ে ওদের বাড়িতে কাজ করত ভগত বাসুদেব, তার পরিবারের হাতে কটেজের মালিকানা দিয়ে গিয়েছে। তারা একদিকে থাকে, অন্যদিকটা হস্টেল হিসেবে ভাড়া দিয়েছে। স্থানীয় স্কুলের এক মাস্টারনি আর এক ডিমবিক্রেতা মহিলা, তাদের কাউকেই আমি চিনি না, তারা দু-জন নাকি সম্প্রতি একটা ভাঙা বাংলোর ভেতর পরিষ্কার করে থাকতে শুরু করেছে। সেটা বাদ দিলে, এই জায়গাটা জনহীন। আমি এখান দিয়ে হাঁটি, এডওয়ার্ডরা যখন রাঁচি থেকে আসে। সেদিনও টর্চের আলো নিভিয়ে জঙ্গুলে বেড়ার ধার ঘেঁষে দাঁড়িয়েছিলাম।

কটেজের একদিক ধসে গেলেও ডান পাশটা অক্ষত। দেওয়াল বেয়ে বটের শেকড় উঠেছে ঠিকই, বাগানে হাঁটুসমান ঘাস, কিন্তু বাইরে থেকেও বোঝা যায় যে, অন্তত দুটো ঘর বাসযোগ্য আছে। বাইরে মিটমিটে বাল্ব জ্বলছে যার আলো আমি দূর থেকে দেখেছি। মুখ বাড়িয়ে দেখি, লনে দুটো চেয়ার পাতা। দু-জন বসে। এই ঝোপঝাড় মাথায় নিয়ে, তার ওপর মশার কামড়, হিম পড়ছে, তবু বসে আছে ওরা। আরেকটু এগোলাম। খচমচ শব্দ হচ্ছে, তবু দু-জনের কেউ নড়ল না। সরতে সরতে এমন জায়গায় এলাম যেখান দিয়ে মুখের পাশটুকু দেখা যায়। একটা চেয়ারে বসে আছে মনীষা। পাশের চেয়ারে আর্চি। মাঝে কেউ থাকত না বলে তালাবন্ধ ছিল অনেকদিন, বছরখানেক আগে আর্চি ফিরে এসে আবার থাকতে শুরু করেছে। এই কটেজটা আর্চির বাবা কিনেছিল। রেভারেন্ড গরম্যান মধ্যস্থতা করেছিলেন। তবে, ওরা পাকাপাকি থাকত না। ছুটি কাটাতে আসত। আর্চি একাও আসত অনেক সময়ে। বেশ কিছুদিন বাদে দেখলাম ওকে। কত বুড়ো হয়েছে আর্চি! মাথার সব চুল সাদা। বলিরেখাময় মুখ। হাত দুটো মুরগির ঠ্যাঙের মতো সরু, শিরা-ওঠা। কতই-বা বয়েস, সবে হয়তো ষাট হয়েছে। একটা ছাই রঙের ফুলহাতা সোয়েটার পরে আর মাফলার গলায় গুঁজে বসে আছে। সামনের দিকে তাকিয়ে, কিন্তু কথা বলছে না। মনীষাও সামনে তাকিয়ে। তার হাতে ধরা আর্চির হাত।

বহুবার এই দৃশ্য দেখেছি, তবু ক্লান্ত হই না। বেশ কয়েক মিনিট ওখানে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থেকেছিলাম! নড়াচড়ার শব্দ ওরা শুনতে পাবে, সে-কারণে নয়। মনে হত, এই নিঃশব্দ আড়ালকে আমি নষ্ট করব না। বার বার মনে হত, নির্লজ্জের মতো বলছি, মনীষা কি আমার হাত এরকম ধরে বসে থাকতে পারত না কখনো? তার মুখের ভাব আমি বুঝতে পারি না, শোক, নাকি, হাহাকার অথবা বিগত দিনের আক্ষেপ, অথবা, কিছুই নয় হয়তো, এক চুপচাপ প্রেমই শুধু। সেটুকুর জন্য তো একসময়ে আমি নিজের কেরিয়ার বাজি রেখেছিলাম। রেখেছি আর ব্যর্থ হয়েছি। তবু মনীষাকে ঘুণাক্ষরে জানাতে দিইনি। তবু এত নীরবতা, আপনারা যাকে বলেন শেয়ারিং দ্য সাইলেন্স, সে কি আর্চির জন্যে তোলা থাকল? আর আমি, বিগত যুগের হতাশ ডিটেকটিভ এক, সে উঁকি মেরে দেখবে, এই ভূমিকাই কি নির্দিষ্ট ছিল তার জন্য? তাহলে আমার সেই খোঁজাটুকুর কী হবে? হ্যাঁ, অফিসার? ক্রিস? আমাদের স্মৃতি? মনীষার ভেতরে কোথাও ওর জন্য কি শোক বেঁচে নেই ?

আমি মাতাল হইনি। আরেকটা পেগ নিই। ভাবতে গেলে হিংসে হচ্ছে জানেন, ইচ্ছে হচ্ছে প্রবল মাতলামি করি, সেই শেষদিন হিংসেতে জ্বলেপুড়ে এডওয়ার্ড আর মনীষার সামনে যেমন করেছিলাম। স্বীকার করি, শয়তান ভর করেছিল আমার মাথায় সেদিন। কিন্তু, সে-গল্প পরে আসবে। আমার অপরাধ আমার মুখ থেকে শুনবেনই-বা কেন? আমি নিশ্চিত যে আপনি এরপর বারবারার সঙ্গে কথা বলবেন, হয়তো কলকাতায় গিয়ে টিনার সঙ্গেও। তারা বিস্তৃতভাবে জানাবে আমার নির্লজ্জতার কাহিনি। কিন্তু, সেদিন ঝোপের ধারে দাঁড়িয়ে হিংসে নয়, হিংসের সময় কয়েক দিন পরে এসেছিল, সেদিন আমি নিজের ভূমিকাটুকু দেখে কাতর দীর্ঘশ্বাস ফেলেছি মাত্র, আর কিছু নয়, যে অন্যের জীবনের একান্ত ব্যক্তিগত স্থানগুলোতে সন্ধানী সার্চলাইটের দপদপে আলো ফেলবার পেশাতেই আমাকে অভিনয় করে যেতে হচ্ছে, অবসরের বহু পরেও।

এই ঘটনার দিন তিনেক পর আমাকে বারবারা জানায় যে, জেনিফার নাকি টিনাকে ক্রিসের জন্মরহস্য বিষয়ে কিছু ইঙ্গিত দিয়েছে। শুধু জানায়নি, আমাকে উপহাস করেছিল বারবারা। তখন সেই প্রবল হিংসে, যাকে আপনারা বলবেন ব্যর্থ আক্ষেপ, ফিরে এসেছিল। তার পরিণাম আপনারা জানেন। কিন্তু ঈর্ষায় জ্বলেপুড়ে গিয়েও, বারবারার মুখে শোনার পর একটা ভ্যালিড প্রশ্ন আমার মাথায় এসেছিল। হাজার হলেও আমি একজন পুলিশ, হয়তো খারাপ পুলিশ, কিন্তু পুলিশ, তাই প্রশ্নটা আসতই। জেনিফার যদি ঠিক কথা বলে, তাহলে তিনদিন আগে আর্চি আর মনীষার পাশাপাশি বসে থাকা কী বার্তা দিয়েছিল?

হয়তো আমরা অনেকেই আর্চি ও মনীষাকে এর আগে একসঙ্গে দেখেছি। কিন্তু, তখন জেনিফার আমাদের কানে কানে বলে যায়নি দু-জনের সম্পর্কের কথা। এখন জানি বলে সোজা চোখে সেই দৃশ্যকে ভাবা সম্ভব নয়! ক্রিস যদি সত্যিই আর্চির সন্তান হয়? এতদিন ধরে সম্পর্ক দু-জনের, আমরা কেউ জানলাম না কিছুই, এত ছোটো টাউনের ভেতরেও কানাকানি হল না, ভেবে অদ্ভুত লাগছিল। অবশ্য, মনীষারা বহুদিন হল রাঁচি চলে গেছে, আর্চিও কালেভদ্রে আসত। কিন্তু, ক্রিসের অন্তর্ধান রহস্যে যদি এই দু-জন জড়িত হত, তাহলে তো হাত ধুয়ে ফেলতে পারত না! এভাবে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পরস্পরের হাত ধরে নীরবে বসে থাকতে ক্লান্ত হয় না যে যুগল, তারা নিজেদের পেটে কতটা রহস্য লুকিয়ে রাখতে পারে আর কতদিন ধরে, অফিসার মাহাতো? কিন্তু, এসব ভাবনা আমি ভেবেছিলাম তিনদিন পর। যেদিন আমি মনীষা আর আর্চিকে দেখেছিলাম, তার গল্প শেষ হয়নি।

কয়েক মিনিট পর আমার মনে হল, বেরোতে হবে। ওরা থাকুক বসে, আমি আর কতক্ষণ দাঁড়াব? মশা কামড়াচ্ছে, কেউ দেখলে সেটা ভালোও হবে না। সাবধানে কয়েক পা পিছিয়ে এলাম। কিন্তু, থমকে গেলাম আবারও। আমি যেদিকে দাঁড়িয়ে আছি, সেখান থেকে ডান দিকে ঘাড় ঘোরালে দেখা যায় মহুয়ার জঙ্গুলে ভূমি, যা বাড়ির পেছনদিক থেকে শুরু হচ্ছে। জঙ্গলটা ঘন নয়, দুই-তিনটে সারি দেওয়া গাছ মাত্র, কিছু ঝোপঝাড়, তার পেছনে ঢালু জমি অনেকটা, দুই পাশে দেহাতি বস্তি। জঙ্গলের ধার ঘেঁষে একটা ল্যাম্পপোস্ট লাগিয়েছিল পঞ্চায়েত থেকে, তার আলো মাঝে মাঝে জ্বলা-নেভা করে। এখন সেরকম দপদপিয়ে ওঠায় চোখ চলে গেল। দেখলাম পোস্টের নীচে নিঃসাড়ে দাঁড়িয়ে আছে এডওয়ার্ড। তার চোখ মনীষা ও আর্চির দিকে। সে আমাকে দেখেনি কারণ আমার অবস্থান ছিল ঝোপের সঙ্গে মিশে। কিন্তু, আমি তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকলেও খেয়াল করত কি না সন্দেহ, এত নিবিষ্ট তার দৃষ্টি। তার মুখের ভাব আমি বুঝিনি। বেদনা না আক্ষেপ, অথবা ঈর্ষা। প্যান্টের দুই পকেটে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এডওয়ার্ডের মূর্তির অর্থোদ্ধার করা, সে তখন কী ভেবেছিল অথবা হিংসেতে দগ্ধ হচ্ছিল কি না, আমার পক্ষে সম্ভব নয়। তার আশপাশ থেকে জগৎ মুছে গিয়ে শুধু দুটো মূর্তিই যেন টিকে ছিল, এক ক্লান্ত ভঙ্গিমায় এডওয়ার্ড দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখে যাচ্ছিল যাদের। টমাসের বাড়ি থেকে বেরিয়ে ইস্তক এখানে এভাবেই দাঁড়িয়ে আছে কি? মনীষা ও আর্চি হয়তো ভেবেছিল, এডওয়ার্ড যেহেতু টমাসের বাড়ি নিমন্ত্রণ রক্ষায় গিয়েছে, তাই এটুকু সময় তারা নিজস্ব পাবে। বেচারা এডওয়ার্ড! আমি অনেকবার মনীষাকে দেখেছি, কখনো একা বসে থাকতে, কখনো এডওয়ার্ড, অ্যারন বা আর্চির সঙ্গে। কিন্তু, এডওয়ার্ডকে আড়াল থেকে উঁকি মারতে এই প্রথম দেখলাম।

বারবারা আমায় বলেছিল এডওয়ার্ড তাদের বিয়েটা নিয়ে উদাসীন হয়ে গেছে। এটাও বলেছিল যে, ক্রিস চলে যাবার কিছুকাল পরে মনীষা নাকি প্রায় জোর করেই কনসিভ করে। তখন থেকেই এডওয়ার্ডের চোখ কঠিন এবং গলা কর্কশ হতে শুরু করেছিল।সত্যি? নাকি, এডওয়ার্ড এখনও তীব্র আবেগি, যাকে সহ্য করা মনীষার পক্ষে সম্ভব ছিল না বলে সে আর্চির দিকে ধেয়ে যায়? কিন্তু, এডওয়ার্ডের তো প্রেমিকা আছে বলেছিল জেনিফার, তাই তো? কল্পনা করতে পারি, রাতের পর রাত মনীষা আর আর্চি পাশাপাশি বসে থাকে, রাতের পর রাত এডওয়ার্ড দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তাদের দেখে যায়। তারপর নিশ্বাস ছেড়ে এডওয়ার্ড ফিরে যায় তার প্রেমিকার কাছে। তারপর আবার ফিরে আসে পরের রাতে। নাকি, যদি এমন ভাবা যায়—এডওয়ার্ডের সবার আগে অনুমান করার কথা, সন্তানের পিতা সে কিনা। হয়তো বুঝেছিল। তাই রাগ হোক অথবা রক্তসম্পর্কের জটিল সমীকরণ, যেটা থেকেই হোক না কেন, ক্রিসকে সে নিজেদের জীবন থেকে সরিয়ে দিয়েছে। হয়তো মনীষার ওপর একপ্রকার প্রতিশোধও হতে পারে। তারপর থেকে এখনও সে মাঝে মাঝে দেখতে আসে, মনীষা আর আর্চি সন্তান হারাবার শোককে কেমনভাবে মোকাবিলা করছে। হতে পারে না এটা? হতেও তো পারে। কিন্তু, এটা হলে অ্যাগনেস সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ে। তাতে টিনা হতাশ হলেও আমার অবশ্য আপত্তি নেই। যাই হোক, এগুলো সবই আমার কল্পনা। আমি সেজায়গা থেকে সরে আসি কারণ বুকের ভেতর একটা কষ্ট, রাগ, অভিমান, যা বলবেন তাকে— আশ্চ্যৰ, এডওয়ার্ডকে কিন্তু আমি হিংসে করিনি! করলাম কিনা আর্চিকে, সে একটা হিংসে করার মতো মানুষ হল?

রাত হল। আপনি বার বার মোবাইলে সময় দেখছেন বুঝছি। বুড়ো হয়েছি তো, পেটে মদ পড়লে বকবকানি বাড়ে। আমার বউ এতক্ষণে শুয়েই পড়ল হয়তো। উঠছেন? তাহলে বাকি গল্পটার কী হবে? কাল, পরশু, যেদিন খুশি আসুন আমি কোথাও যাচ্ছি না, এই বয়েসে পালানোও সম্ভব নয়। বরং, একটা বন্দিশ চালিয়ে দিই। সারারাত এখানে বসে ধু-ধু বনাঞ্চলে ঢেকে যাওয়া একটা পোড়ো শহরকে দু-চোখ ভরে দেখে যাই যদি, তাতেই-বা কার কী! আসুন অফিসার, সাবধানে যাবেন। অনেক রাত হল আমাদের সকলের। চারপাশ ধূসর হয়েছে। হয়তো কুয়াশায়। আপনার দেরি হয়ে গেল। দেরি হয়ে যায়, বরাবর।

.

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *