নৈশ অপেরা – ৫

আর তাহারা উত্তর করিয়া বলিবে, আমাদের হস্ত এই রক্তপাত করে নাই, আমাদের চক্ষু ইহা দেখে নাই ;

– Deuteronomy | 21 : 7

.

ওই চেয়ারটায় বসবেন না অফিসার, প্লিজ। জানালার ধারের পাশের আরামকেদারাটা নিন। এখানে বসতে দিলাম না, কারণ আজকাল সিওপিডির ঝামেলাটা ভোগাচ্ছে। দুই পা হাঁটতে গেলে হাঁফাই। হাত কাঁপে। তাই এমন জায়গায় বসতে চাই, যেখানে হাতের কাছে জরুরি জিনিসপত্র মেলে। এক পাত্তর গুছিয়ে এই চেয়ারে বসলে ডান হাতের নাগালের মধ্যে, ওই যে দেখছেন পুরোনো টেপ রেকর্ডার, হ্যাঁ এখনও চলে, ওটার নাগাল পাই। বসে বসেই পালটে দিতে পারি, মল্লিকার্জুন মনসুর থেকে ওঙ্কারনাথ ঠাকুর। আমার দুপুর এবং রাতের বিলাস। এক পেগ চলবে নাকি, অফিসার? আরে, ডিউটির কথা রাখুন, আমরাও করেছি ওরকম। আচ্ছা বেশ, জোর করব না। আমি একটা সাজিয়ে বসলে কিছু মনে করবেন না, আশা করি? জানি, আপনাদের চোখে আমি সন্দেহভাজন। কিন্তু, সন্দেহভাজনের কি মাতলামি করার স্বাধীনতা নেই, বলুন?

গল্পটা, স্বীকার করছি, তিন বছর আগে আমি শুনিয়েছিলাম মূলত টিনার কথা মাথায় রেখে। ওহ্, আপনি জানেন না। তনয়া ভট্টাচার্যর ডাকনাম। বুদ্ধিমতী মেয়ে। বারবারার মনে হয়েছিল টিনাকে বলা যায়, যেমন বিভিন্ন লোককে দেখে মাঝের বছরগুলোতে ওর মনে হয়েছে। সে-পাগলামিতে সায় দিয়েছিলাম। কিন্তু, আসলে সাংবাদিকদের আমার পছন্দ নয়, জানেন! ওরা সবসময়ে পুলিশকে অপদার্থ দেখায়। কেন নকশালিদের মতো ওদেরও সবসময়েই মনে হয় যে স্টেট আসলে দুশমন? টিনার অমীমাংসিত রহস্যের সিরিজটার কথা আপনি জানেন তো? গল্পগুলো এমনভাবে লিখেছে যাতে পুলিশকে সর্বদাই ব্যর্থ মনে হয় । ফলত, গায়ে তো লাগবেই। তাই মনে হয়েছিল, শুনে দেখ, বাস্তব ক্রাইম কীরকম হয়। দেখি তোর বুদ্ধির দৌড় কত। বকবক শুরু করলে আমি থামতে পারি না, অফিসার মাহাতো। বিরক্ত লাগছে না তো? দাঁড়ান, একটা আমির খাঁ সাহেব চালিয়ে দিই। লো ভল্যুমে বাজবে। ডিটেকটিভ গল্প শুনবেন এদিকে আবহ তৈরি হবে না, এ হয় নাকি?

১৯৯২ সালের ২০ এপ্রিল সন্ধে সাড়ে সাতটায় গঞ্জ থানায় ফোন আসে। ফোন ধরেছিল কনস্টেবল অর্জুন সিং। গুলমোহর রোডে ডেভিড ব্রাউনের বাড়ি থেকে ফোন গিয়েছিল। বাড়ির সর্বকনিষ্ঠ সদস্য, দুই বছরের শিশু ক্রিসকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।

ডেভিড ব্রাউন রাঁচি হাজারিবাগ জুড়ে হোটেল ব্যাবসা চালান। তাঁরা প্রথম যুগের সেটলার, গঞ্জে এসেছিলেন বাবা টিমোথি ব্রাউনের হাত ধরে, সেটা ১৯৩৫ এবং কলোনাইজেশন সোসাইটির শেয়ার কিনে প্রায় পাঁচ একর জমির মালিক হয়ে বসেন। ব্যাবসার শুরু হয়েছিল টিমোথির হাত ধরে। তখন রাঁচিতে একটাই হোটেল ছিল। ছেলে সেটাকে প্রসারিত করেন। ডেভিড ব্রাউনের বয়েস তখন বাষট্টি। স্ত্রী আগাথা, আটান্ন। দুই ছেলেমেয়ে। বড়ো বারবারা, অবিবাহিতা, ছত্রিশ বছর বয়েস। বাবার ব্যাবসায় আগ্রহ নেই। ছোটো এডওয়ার্ড, তিরিশ, বাবার সহকারী হলেও নিজস্ব গারমেন্টসের ব্যাবসা খোলবার জন্য তখন উদ্যোগ নিচ্ছে। এডওয়ার্ড চার বছর আগে বিয়ে করেছিল তার ছোটোবেলার বান্ধবী মনীষাকে। বেথেল মিশনের প্যাস্টর পরিতোষ গরম্যানের মেয়ে হলেন মনীষা। তাঁর বয়েস এখন আটাশ, গৃহবধূ। ১৯৯০ সালের ২৭ মার্চ এডওয়ার্ড ও মনীষার পুত্রসন্তান ক্রিস্টোফার জন্ম নেয়। এ ছাড়াও, বাড়িতে আছে কুক, মালি, দারোয়ান, সর্বক্ষণের গৃহভৃত্যরা।

.

আমি তখন অ্যাসিস্ট্যান্ট সাবইনস্পেকটর। সেকেন্ড অফিসার আমাকে যেতে বললেন। আপনি নিশ্চয় বাড়িটা দেখেছেন? টিমোথি ব্রাউন নাম দিয়েছিলেন স্যাংচুয়ারি, এখন ধ্বংসস্তূপ। বিক্রি হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু, মাঝের নানা জটিলতায় এখনও ভাঙা পড়েনি। আমি যে সময়ের কথা বলছি, তখন বাড়িটা দেখে মনে হত পোস্টকার্ডের কভার থেকে উঠে এসেছে। বাগানের ধার ঘেঁষে নানা কিসিমের গাছের সারি। খোলা চত্বরের একপাশে ব্যাডমিন্টন কোর্ট। দোতলা বাড়ি তারপর, যার টালির চাল বেয়ে উঠে যাওয়া লতানে গাছ, চিমনি, দেওয়ালের গায়ে লেখা ‘জগতের পিতা’। বাড়িটাকে আমি ছোটোবেলা থেকে চিনতাম কারণ এদের ক্রিসমাস পার্টি এলাকায় বিখ্যাত ছিল। ডিসেম্বর এলে শুরু হত উৎসবের প্রস্তুতি। আগাথা ঘরদোর পরিষ্কার শুরু করতেন। কাচ ও ধাতব বাসনপত্র আলমারি থেকে সাবধানে নামিয়ে চকচকে করা হত। বাড়িটা আলোর মালা, মোমবাতি, ফুল, ঝালর, রঙিন কাগজে সেজে উঠত। রোস্ট চিকেন, পুডিং, কেকের সুরভি। গেটের বাইরে আমরা স্থানীয় শিশুদের দল ভিড় করে জুলজুলে চোখে দেখতাম। শীতের সবজিতে বাগান ভরে উঠত ব্রাউনদের, টমেটো, মটরশুঁটি, ফুলকপি, ধনেপাতা, কচি শিম, মাচায় ফলফলে পালংশাক। স্টেশনের পাশে ওদের একটা বেকারিও ছিল। একচোখ কানা আবদুল মজিদ সেখানে কাজ করত। মাখনের গন্ধে ম-ম করত জায়গাটা। যদিও আমাদের, মানে আশপাশের স্থানীয় মানুষদের নিমন্ত্রণ ছিল না এসব পার্টিতে। ১৯৯২ সালে যখন সে-বাড়িতে পা দিই, আমার বয়েস সাঁইত্রিশ। সেই প্রথম ভেতরে যাওয়া। দেখলাম একই আছে, বাহারি গাছগুলো বাদে। বাড়ির পেছনে আদিগন্ত পোড়োমাঠও অবিকল, আজ যে অবস্থায় দেখছেন। আগাছায় পূর্ণ মাঠের ভেতর এখানে-ওখানে জলাজমি, বিরাট ঘাসবন, বুনো শুয়োরের আড্ডা, মরা গাছের কঙ্কাল। আগাথা তখনও জ্যাম আর অ্যাপল পাই বানাতেন, কারণ তাঁকে আমি খ্রিস্টউৎসবের মেলায় সেগুলো নিয়ে এসে বিক্রি করতে দেখেছি।

আমরা যখন ঢুকছি, দেখলাম বাড়ির গেটে উদ্বিগ্ন মুখের দল ভিড় জমিয়েছে। ফ্রেঞ্চ উইন্ডো দিয়ে ড্রয়িং রুম দেখা যায়। সেখানে মনীষাকে মুখ ঢেকে বসে থাকতে দেখলাম, অন্যেরা তাঁকে সান্ত্বনা দিচ্ছে। বাইরে দাঁড়িয়ে ডেভিড, এডওয়ার্ড, রেভারেন্ড পরিতোষ গরম্যান, আরও চেনা-অচেনা মানুষজন ।

রেভারেন্ড গরম্যান বেথেল মিশনে আছেন তদ্দিনে প্রায় তিরিশ বছর। আদতে কলকাতার বাঙালি। গির্জার কাজ ছাড়াও সপ্তাহে দু-দিন রাঁচি কলেজে তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব পড়াতে যেতেন। বছর পঞ্চান্নর মানুষটিকে দেখলাম ভেঙে পড়েছেন। তাঁকে প্রশ্ন করলেও উত্তর বেরোচ্ছিল না মুখ দিয়ে। বারে বারে পাশে দাঁড়ানো এডওয়ার্ডের দিকে তাকিয়ে বলছেন ‘আমার জন্য তিনটে জীবন— ওই তিনজন।’ বলছেন, আর এডওয়ার্ডের কাঁধ খামচে ধরছেন, অস্থিরভাবে জিজ্ঞাসা করছেন মনীষা কোথায়, সে কেমন আছে। কিন্তু আমরা প্রশ্ন করলে ফ্যালফ্যাল করে তাকাচ্ছেন। একবার ইংরেজিতে বললেন ‘দিজ নেগেটস অল গুড ওয়ার্কস।’ অসংলগ্ন বকছেন দেখে অন্যদের জেরা করে ব্যাপারটা জানা গেল।

রেভারেন্ড গরম্যান মাঝে মাঝে বিকেল বেলা মেয়ের শ্বশুরবাড়িতে আসতেন। নাতির সঙ্গে সময় কাটিয়ে এককাপ চা খেয়ে যেতেন। তাঁর স্ত্রী অনেকদিন আগে মারা গিয়েছিলেন, তাই বিপত্নীক মানুষটিকে একমাত্র সন্তান মনীষা চাইতেন যতটা সম্ভব কাছাকাছি রাখতে। আজকেও এসেছিলেন বিকেল পাঁচটায়। ডেভিড তখন নিজের অফিসে। এডওয়ার্ড গেছেন অ্যাকাউন্ট্যান্টের বাড়ি। বারবারা তখন কিছুদিনের জন্য একটা স্কুলে পড়াচ্ছিলেন। তিনি সেইসময়েই স্কুল থেকে ফিরেছিলেন। ড্রয়িং রুমে বসে চা খাচ্ছিলেন রেভারেন্ড গরম্যান, আগাথা আর মনীষা। ক্রিস তখন হাঁটতে শিখেছে। সে নাকি দুরন্তপনা করছিল বাড়ি জুড়ে, একটু আগেই একটা ডিশ ভেঙেছিল। মনীষা সারাদিন তার পেছনে ছোটাছুটি করে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন। রাগের মাথায় একটা থাপ্পড় কষিয়েছিলেন ছেলেকে। আগাথা সঙ্গেসঙ্গে ক্রিসকে কোলে তুলে আদর করেছিলেন এবং বকাবকি করেছিলেন মনীষাকে। ক্রিস কাঁদতে কাঁদতে আগাথার কোলে ঘুমিয়ে পড়েছিল। ঘুমোবার আগে আধো আধো কথায় জানিয়েছিল যে, সে মায়ের থেকে পালিয়ে যাবে। কোথায় পালাবে? কেন, পেছনের মাঠে? ওই মাঠের ভূতের গল্প ক্রিসকে শুনিয়ে ঘুম পাড়ানো হত। তখন রেভারেন্ড গরম্যান আসেন। ঘুমন্ত ক্রিসকে কাউচে শুইয়ে আগাথা এবং মনীষা রেভারেন্ডের সঙ্গে বসে ছিলেন। ক্রিসের পাশে বসে ছিল আয়া নিমৰলা দুবে। এ ছাড়া, রান্নাঘরে কুক বিশাল সিং ছিল। মালি ও দারোয়ান ছিল নিজেদের ঘরে। বারবারা এসে চায়ের আড্ডায় যোগ দিলেন। কিছু সময় পর আগাথা চলে গেলেন একতলায় নিজের ঘরে। সন্ধের প্রার্থনার সময় হয়েছিল তাঁর। বরাবর এই সময়টায় আগাথা ঘরে ছোট্ট অলটারের সামনে আধঘণ্টা প্রার্থনা করেন। তখন তাঁর বাহ্যজ্ঞান থাকে না। বারবারা দোতলায় নিজের ঘরে গেলেন। বলে গেলেন তাঁর নামতে সময় লাগবে কারণ স্কুলের খাতা দেখা আছে। প্রসঙ্গত, ভাই-বোন দোতলায় থাকতেন। বাবা-মা, আয়া, বাড়ির ভৃত্যদের জন্য বরাদ্দ ছিল একতলা। আগাথার হাঁটুর ব্যথার কারণে সিঁড়ি ভাঙতে পারতেন না, একতলায় থাকার কারণ সেটাও। দারোয়ান আউটহাউসে থাকত। মালি ও কুক যে যার কাজ সেরে বাড়ি ফিরে যেত।

সন্ধে ছ-টা নাগাদ মনীষার একটা ফোন এসেছিল। তিনি কর্ডলেস নিয়ে নিজের ঘরে গেলেন। ড্রয়িং রুমে তখন রেভারেন্ড গরম্যান এবং নির্মলা দুবে। রেভারেন্ড হাতে একটা কাঠের জপমালা নিয়ে মনে মনে প্রার্থনা করছিলেন। মনীষা চলে যাবার পর নির্মলা রেভারেন্ডকে জানান যে তাঁকে পনেরো মিনিটের জন্য একবার বাইরে যেতে হবে। বাড়িতে প্রতি পনেরো দিন অন্তর মাইনে দেওয়া হত। ২ তারিখ এবং ১৮ তারিখ। নির্মলার ভাই রাজেশ এসে সেই টাকা নিয়ে যেতেন। রাজেশ বাড়ির কাছে একটা চায়ের দোকানে অপেক্ষা করতেন, নির্মলা টাকা দিয়ে আসতেন তাঁর হাতে। নির্মলা চলে যাবার পর প্রার্থনা করতে করতেই রেভারেন্ডের তন্দ্রা এসেছিল। কয়েক দিন ধরে শরীরটা ভালো যাচ্ছিল না তাঁর। ভাইরাল জ্বর থেকে উঠেছিলেন, তাই দুর্বলতা ছিল। সোফায় বসে তিনি ঘুমিয়ে পড়েন। পরে আমরা হিসেব করে দেখেছি রেভারেন্ড মিনিট দশ বারোর জন্য ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। তারপর মনীষা ফোন শেষ করে ঘরের বাইরে এসে রেভারেন্ডের ঘুম ভাঙান। ক্রিসের কাউচ তখন খালি, কিন্তু কেউ তখনও খেয়াল করেনি সেটা, কারণ কাউচের মুখ ছিল ফ্রেঞ্চ উইন্ডোর দিকে। সোফায় বসে টুকটাক কথার পর মনীষা দেখেন ঘড়িতে সাড়ে ছ-টা বাজতে চলেছে (পরে মনীষা বলেছেন তখন ছ-টা পঁচিশ বেজেছিল), ক্রিসের খাবার সময়। নির্মলা তখনও ফেরেনি দেখে বিরক্ত হন মনীষা এবং খাবার আনতে কিচেনে যান। তাঁর নির্দেশমতো কুক বাটি নিয়ে আসে। সে প্রথম আবিষ্কার করে ক্রিস কাউচে নেই। মনীষাকে সেকথা জানালে তিনি প্রথমে গলা তুলে কয়েক বার ক্রিসকে ডাকেন। তারপর একতলায় আগাথা আর দোতলায় বারবারাকে জিজ্ঞাসা করেন ঘুম থেকে উঠে ক্রিস তাঁদের ঘরে গেছে কি না। সেখানে কিছু না-পেয়ে গৃহভৃত্যদের ঘরে ঢুঁ মারেন। বাথরুমগুলো দেখেন। তারপর তিনি ও রেভারেন্ড যান দারোয়ানের ঘরে। মালি ও দারোয়ান দিব্যি কেটে বলে নির্মলা বেরোবার পর থেকে গেট বন্ধ ছিল। রেভারেন্ড আবার বাড়ির ভেতর গিয়ে প্রতিটা ঘর খোঁজেন। কোথাও যখন ক্রিসকে পাওয়া যায় না, তখন রেভারেন্ড মনীষাকে বলেন স্বামী ও শ্বশুরকে খবর দিতে।

আমরা যখন এলাম, ততক্ষণে বাইরের লোকজন ঢুকে গেছে বাগানে। চিৎকার, চেঁচামেচিতে কমপ্লিট কেওস। কেউ চেঁচাচ্ছে, ‘এদিকটা দেখো’, তো, অপরজন বলছে, ‘আরে, ফলসাগাছের ঝোপটা সার্চ করলে না?’ বাগানময় ঘুরছে এদিকওদিক লোক। বাড়ির ভেতর থেকে কেউ আবার চেঁচাচ্ছে ‘সামনের গেট দিয়ে কে যেন চলে গেল।’ সঙ্গেসঙ্গে সবাই সেদিকে ছুটল। আমি আর অর্জুন সিং মাত্র দু-জন পুলিশ দিয়ে এত লোককে সামলানো যাবে না। পুরো ঘটনা সংক্ষেপে জেনে আমরা প্রথমে বাগানটা একটা চক্কর মারলাম। তারপর ঢুকলাম বাড়ির ভেতরে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের পর আমরা তিনটে কাজ করলাম। অর্জুন থানায় ফোন করে জানাল চেকপোস্টগুলোতে নজরদারি বাড়াতে।

আমরা অ্যাডিশনাল তিনজনকে এনে বাড়ি এবং আশেপাশের এলাকা ছানবিন করলাম। লাভ হল না। এবং সবশেষে, বাড়ির যে অংশে এই ঘটনা ঘটেছে সেই অংশের ম্যাপ এবং ঘটনার আগে-পরে প্রত্যেকের অবস্থান ছকবন্দি করা হল। সেই ম্যাপের একটা ফটোকপি আমার কাছে এখনও আছে। আপনার জন্য বার করে রেখেছি। সাবধানে ধরবেন। পুরোনো কাগজ তো, ভাঁজে ভাঁজে ভেঙে গেছে।

ম্যাপ

নীচের তলা খেয়াল করে দেখুন। মুখোমুখি সোফায় রেভারেন্ড আর মনীষা বসে ছিলেন। ক্রিসের চেয়ারের মুখ ছিল ফ্রেঞ্চ উইন্ডোর দিকে। আগাথার ঘর বলতে, এই ঘরে ডেভিডও থাকেন। কিন্তু, বাড়ি থাকলে সিংহভাগ সময় তাঁর কাটে স্টাডি-তে। অনেক সময়ে রাত্রেও সেখানে কাটিয়ে দেন।

রাঁধুনি বিশাল সিং। বয়েস তিরিশ। সে গোটা সময়টা রান্নাঘরে কাটিয়েছে। মাঝে একবার বাথরুমে গিয়েছিল, সেইসময়ে ড্রয়িং রুমের প্যাসেজ তাকে অতিক্রম করতে হয়েছে। ম্যাপ দেখে বুঝতেই পারছেন, লিভিং রুমের ডান দিক দিয়ে সে কমন টয়লেটে গিয়েছিল। ক্রিসের চেয়ারের হাতল ছিল উঁচু। ফলত, ক্রিস সেখানে শুয়েছিল কি না, অতদূর থেকে বিশাল সিংএর দেখা সম্ভব ছিল না। কিচেনের শেষপ্রান্তের একটা দরজা পেছনের মাঠমুখে খোলে, আপনি নিশ্চয় দেখেছেন। ম্যাপেও দেখুন, দরজাটা দেওয়া আছে। কিন্তু, সেই দরজা বাইরে থেকে তালাবন্ধ ছিল। অনেকদিন ধরেই খোলা হত না বলে জ্যাম হয়ে গিয়েছিল। ফলত ক্রিস সেখান দিয়ে বেরোতে পারে না অথবা রাঁধুনির অন্তত ক্রিসকে কিচেন দিয়ে সরাবার সম্ভাবনা ছিল না, সে-ব্যাপারে আমরা নিশ্চিত হলাম।

আগাথা, মনীষা এবং বারবারার ব্যাপারে আগে বলা হয়েছে।

নির্মলা দুবে ছ-টা বেজে পাঁচ মিনিটে বাড়ির বাইরে বেরোয়। দারোয়ান গেট খুলে তাকে বার করে, তারপর আবার বন্ধ করে দেয়। নির্মলা ফেরে ছ-টা চল্লিশে। সে বলেছিল পনেরো মিনিট লাগবে, কিন্তু ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে খেয়াল ছিল না। তারপর একজন তাকে খবর দেয়, ব্রাউনদের বাড়িতে বাচ্চা হারিয়ে গেছে। সে তখন ছুটতে ছুটতে ফেরে। রামচরণের চায়ের দোকানে রাজেশের সঙ্গে তাকে একাধিক লোক দেখেছে। চায়ের দোকান গেট থেকে হেঁটে মিনিট তিনেকের রাস্তা। সেই রাস্তা ধরে যাওয়া এবং ফিরে আসার সময়ে তাকে যেতে এবং ফিরতে অনেকেই দেখেছে, কারণ ব্রাউনদের বাড়ির সামনে রাস্তা মেরামতির একটা বড়ো কাজ হচ্ছিল। অনেকটা জায়গা খুঁড়ে রাখা ছিল। তখন সন্ধে হয়েছে, কাজ বন্ধ করে মজুর-মিস্তিরিদের দল রাস্তার ওপাশে তাঁবু খাটিয়ে গল্পগুজব করছিল। তারা সাক্ষী দিল, নির্মলাকে বেরোতে দেখেছে খালি হাতে।

মালি আদেশ যাদব এবং দারোয়ান সমর দোসাদ, দু-জনেই গোটা সময়টা দারোয়ানের ঘরে কাটিয়েছে। মাঝে সমর বেরিয়ে নির্মলার জন্য গেট খুলেছিল। তারপর আবার নিজের ঘরে চলে আসে। তারপর ঘরের বাইরে বেরোয় সাড়ে ছ-টায়, যখন মনীষা তাকে গেট খুলতে বলেন, কারণ তখন ক্রিসের খোঁজ চলছিল।

একমাত্র রেভারেন্ড গরম্যান গোটা সময়টায় ক্রিসের পাশে ছিলেন। এ ছাড়া, ছিল বাড়ির দু-জন গৃহভৃত্য। তাদের একজন আগাথার ঘরে তাঁর সঙ্গে প্রার্থনায় ছিল। অন্যজন বাসন মাজছিল রান্নাঘরে। প্রথমজনের সাক্ষী আগাথা, দ্বিতীয়জনের সাক্ষী বিশাল সিং।

তাহলে দেখা যাচ্ছে, ছ-টা থেকে, যে সময়ে মনীষা উঠে গেলেন এবং নির্মলা দুবে বাইরে গেল, সাড়ে ছ-টার মধ্যে বাড়ির বাইরে বেরিয়েছে একমাত্র নির্মলা। যদিও দারোয়ান দিব্যি গেলে বলেছে যে, একটা ছোটো ওয়ালেট বাদে নির্মলার হাতে সে কিছু দেখেনি। রাস্তা খুঁড়ছিল যে মজুররা, তারাও একই কথা বলেছে। চায়ের দোকানের সাক্ষীরাও। এ ছাড়াও, রেভারেন্ড তখন জেগে। তাঁর চোখের সামনে একটা বাচ্চাকে উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া অসম্ভব। বাকিরা বাইরে বেরোয়নি। দারোয়ান ও মালি বাদে সবাই এমনকী বাড়ির ভেতরেই ছিল। তাহলে কি দারোয়ানের ঘরে বাচ্চাটাকে রেখেছিল নির্মলা? কিন্তু, তার ঘরেও কিছু পাওয়া যায়নি। তার থেকেও বড়ো কথা, সেখান থেকে বাচ্চাটাকে বাইরে বার করা হল কীভাবে সবার চোখের ওপর দিয়ে?

যুক্তি যতই অন্য কিছু বলুক না কেন, এই পরিস্থিতিতে সন্দেহ পড়বে নির্মলার ওপর, কারণ সে একমাত্র বাইরে বেরিয়েছিল। তাই তাকে আটক করা হল। দারোয়ানকেও আটক করা হল এবং তার সঙ্গে নির্মলার যোগসাজশের সমস্ত সম্ভাবনা খুঁটিয়ে দেখে ব্যর্থ হল পুলিশ। এরপর সন্দেহ পড়বে খোদ ক্রিসের ওপর কারণ সে বলেছিল পালিয়ে যাবে। কিন্তু, ওইটুকু বাচ্চা পালাবে কোথায়? বাড়ি ও বাগান তন্নতন্ন করে খোঁজা হয়েছে। লুকিয়ে থাকার জায়গা কিছুই বাদ দেওয়া হয়নি। স্পষ্টতই ক্রিস নিখোঁজ হয়েছে ছ-টা পাঁচ থেকে ছ-টা বাইশ তেইশ নাগাদ— আমরা হিসেব করে দেখেছিলাম যে, মনীষা ফোন শেষ করে ঘর থেকে বেরোবার পর দুই-তিন মিনিট বসে বাবার সঙ্গে কথা বলেছিলেন। তারপর আবিষ্কার করেছিলেন ঘড়িতে ছ-টা পঁচিশ—এই সময়টুকুর মধ্যে। এই টাইম স্প্যানটাকেও কমিয়ে আনা যায়। রেভারেন্ডের ঘুম আসতে মিনিট পাঁচেক সময় লাগে ধরলে, ছ-টা দশ থেকে ছ-টা বাইশ, এই বারো-তেরো মিনিটের মধ্যে অপরাধ ঘটেছিল। ক্রিস যদি নিজে না-পালায়, তাহলে কি বাড়ির লোক? কিন্তু প্রত্যেকের ঘর, বাগান, চিলেকোঠা, কিছু বাদ রাখিনি আমরা। বলে রাখা ভালো যে, আজ যদি আপনি সে-বাড়িতে যান তাহলে দেখবেন পেছনের পাঁচিল ধসে গিয়েছে, কিন্তু সেইসময়ে পাঁচিল অক্ষত ছিল। সেখানে আরেকটা গেট ছিল মেথরের যাতায়াতের জন্য। সেটার বাইরে পোড়োমাঠ ও জলাভূমি। মেথর গেট দিয়ে ঢুকে বাড়ির পেছনের ঘোরানো সিঁড়ি বেয়ে উঠত। যদি গেট খোলা থাকত তাহলে অন্তত অনুমান করা যেত যে, ক্রিস সেখান থেকে বেরিয়ে গেছে অথবা কেউ তাকে নিয়ে চলে গেছে। কিন্তু, সেই গেট তালাবন্ধ। ব্রাউনদের বাড়িতে গিয়ে আমরা সবার প্রথমে সেই গেট খোলাই এটা পরীক্ষা করতে যে, তালা সত্যিই লাগানো ছিল কি না অথবা মরচে ধরেছে কি না, অথবা, টিপলক কিনা। সেসব কিছুই নয়। ঝকঝকে স্টিলের নতুন তালা, তার চাবি বাড়ির ভেতর আগাথার দেরাজে থাকে। সেটাকে ভাঙা হয়নি, এমনকী বলপ্রয়োগের চিহ্নও পেলাম না। আগেই বলেছি, তখন অনেক লোক ঢুকে জায়গাটায় কেওস হয়েছিল। তাদের দিয়েও তালা পরীক্ষা করালাম। সকলেই একবাক্যে জানাল চাবি ছাড়া এ খোলা অসম্ভব। তার মানে, পেছনের গেট বন্ধ ছিল গোটা সময়টা। পাঁচিল প্রায় সাতফুট উঁচু, যদিও তাকে টপকানো অসম্ভব এমন বলছি না। কিন্তু, বাচ্চা নিয়ে? তা সত্ত্বেও আমরা পাঁচিলের বাইরের জমি পরখ করে দেখলাম, কোথাও কোনো চিহ্ন নেই। অন্তত কেউ লাফালে ঝোপঝাড় দুমড়ে যেত!

পরদিন ভোরের তদন্ত শুরুর আগে দুটো কথা বলে দিই যা ভুলে গিয়েছি। এক, কনস্টেবল অর্জুন সিং আবিষ্কার করেছিল ফ্রেঞ্চ উইন্ডোর ছিটকিনি খোলা। পাল্লাকে বাইরে থেকে টানলে ফাক হয়। তার মানে কেউ চাইলে বাগান থেকে হেঁটে এসে ফ্রেঞ্চ উইন্ডো দিয়ে ড্রয়িং রুমে ঢুকতে পারে। মনীষা জানিয়েছিলেন যে, রাত্রিবেলা ছিটকিনি দেওয়া হয়, অন্য সময়ে আলগা ভেজানো থাকে কারণ এডওয়ার্ড সুবিধের জন্য মাঝে মাঝে এখান দিয়ে যাতায়াত করেন। দুই, গৃহভৃত্যদের একজন, পেলজম ভুজেল, সে বলেছিল একবার যেন খুব ক্ষীণকণ্ঠে এক শিশুর কান্না সে পেয়েছিল। সে আগাথার ঘরে প্রার্থনা করছিল। স্বীকার করেছে যে, এই সময়টায় বসে বসেই টুক করে একটা ছোট্ট ঘুম সে দিয়ে নেয়। আধো তন্দ্রার মধ্যে সে কান্না শুনেছিল। তার মনে হয়েছিল, বার দুই হয়ে থেমেও গিয়েছিল কান্নাটা। তার ঘুম তখন ভাঙেনি, কিন্তু জাগার পরেও কথাটা মনে ছিল। কিন্তু, ঘুমিয়ে থাকার দরুন কান্না শোনার এগজ্যাক্ট সময় জানাতে পারল না।

.

সেদিন শহর থেকে নিয়ে আসা হল এল সার্চডগের দল। অত ছোটো শহরে দুম করে সাচডগ তখন পাওয়া যেত না, ডেভিড তাঁর যোগাযোগ খাটিয়ে এনেছিলেন। তাদের নিয়ে পাহাড়, জঙ্গল আমরা ছানবিন শুরু করলাম। আমার মনে আছে, সেদিন একটা বিশ্ৰী ধোঁয়া আসছিল কোথা থেকে জানি না। শহর ঢেকে গিয়েছিল ধোঁয়ার চাদরে। তাকে ভেদ করে দৃষ্টি চালানো কঠিন ছিল। সেই প্রতিকূলতা নিয়ে কুকুরদের চেন হাতে আমরা এগিয়ে গেলাম মাঠ, জলাভূমি ভেদ করে, এবং ব্যর্থ হলাম। দুপুর বেলা শ্রান্ত পুলিশের দল যখন স্যাংচুয়ারির পেছনের মাঠ ভেঙে ফিরছে, আমার চোখে পড়ল জলাভূমির ধারে দাঁড়িয়ে আমাদের দিকে তাকিয়ে আছেন ডেভিড ব্রাউন। ডেভিড বিশালদেহী ছিলেন। গালপাট্টা ও দাড়িসমেত তাঁর অবয়বকে ছোটোবেলায় আমরা ভয় পেতাম। শুনেছি, শিকার করতে ভালোবাসতেন তাঁর যৌবনে এবং সেটা সবসময়ে বুনো পশু নয়। সেদিন তাঁর চোখ রক্তাভ ছিল। মাথার চুল উশকোখুশকো। আমি গিয়ে তাঁর সামনে দাঁড়ালে বাড়ির ভেতর থেকে কান্নার আওয়াজ পেলাম। ডেভিড বিতৃষ্ণা আনলেন মুখে, ‘মেয়েরা কান্না ছাড়া অন্য কিছু জীবনে পেরেছে?” তিনি আমাদের দেখে বুঝেছিলেন বিফলকাম হয়েছি, ‘বাড়ির চাকর-বাকরদের জেরা করছেন না কেন? কড়া শাসানি কেন দিচ্ছেন না?’ ততক্ষণে আমরা নির্মলা দুবে ও দারোয়ানকে আটক করেছি, সেকথা জানাতে তিনি মাথা নাড়লেন, ‘আপনারা অত্যন্ত নরম। লক-আপে ও বাবা-বাছা করেন।’ তাহলে কী করতাম আমরা? লাল চোখে কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন ‘আপনার বাড়ি ও এখানেই ছিল না? দেহাতিদের গ্রামে—ছোটোবেলায় দেখেছি।’

সম্মতির মাথা নাড়ায় বিড়বিড় করলেন, ‘স্বজাতি!’ উত্তর দিইনি, কারণ শোকের মাথায় মানুষ আবোল-তাবোল বকে। ঝাঁ-ঝাঁ সূর্য মাথার ওপর লাফিয়ে উঠেছিল, ডেভিডের গাল বেয়ে ঘাম গড়াচ্ছিল। তিনি দাঁত বার করে গরগর আওয়াজ করলেন, ‘বিট দেম হার্ড!’ আবার কান্নার আওয়াজ ভেসে এল বাড়ি থেকে। মাথা উঁচিয়ে চিৎকার করলেন ডেভিড, ‘এই শাট আপ!’

আগাথা টেনশন সহ্য করতে না-পেরে অসুস্থ হয়ে গিয়েছিলেন। তাঁর প্রেশার বেড়েছিল। বারবারা আর মনীষা, আমার মনে আছে, হতভম্বের মতো আচরণ করছিলেন। তুলনায় শক্ত ছিলেন এডওয়ার্ড। তিনি ওপরমহলে কথা বলে আমাদের ওপর চাপ বাড়াচ্ছিলেন। তাঁর মনে হচ্ছিল আমরা পুরোটা দিচ্ছি না। তাঁর কথামতো ব্রাউনদের সম্ভাব্য শত্রুদের লিস্ট বানানো হল— প্রতিযোগী হোটেলিয়ার, চাকরি থেকে বহিষ্কৃত কর্মচারী ইত্যাদিরা। কিন্তু, তাদের একে একে জেরা করে দেখা গেল সবার শক্ত অ্যালিবাই আছে। পরদিন বিকেল বেলা ইনচার্জ গিরীশ ভুজবলের কাছে রিপোর্ট দেবার সময়ে ভুজবলজি সোজাসুজি জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তোমরা রেভারেন্ড গরম্যানকে সন্দেহের তালিকা থেকে বাদ রাখছ কেন?’ হকচকিয়ে গেলাম। রেভারেন্ড নিরীহ অজাতশত্রু মানুষ। প্রোটেস্টান্ট ক্যাথলিক হিন্দু, মুসলিম নির্বিশেষে তাঁকে শ্রদ্ধা করে। লোকের আপদ-বিপদে চিকিৎসা, অর্থসাহায্য, চার্চের লোকবল দিয়ে পাশে থাকা, সমস্তভাবে জনজীবনে মিশে আছেন। এরকম মানুষকে সাসপেক্ট ভাবতে গেলে জোরদার কারণ দরকার। ‘প্রায় পনেরো মিনিট রেভারেন্ড বাচ্চাটার সঙ্গে একা ছিলেন। সেইসময়ে তাঁর পক্ষে যা খুশি করা সম্ভব ছিল না কি?’ ভুজবলজি আমার মুখ দেখে চেয়ার ছেড়ে উঠতে গিয়েও উঠলেন না। ‘কিছু বলতে চাও?’

‘স্যার, চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে যদি বাচ্চাটাকে খুঁজে না পাওয়া যায়, আপনি বুঝতে পারছেন—’ ভুজবলজি চুপ করে গেলেন। জানতেন আমি কী ইঙ্গিত করছি। অন্তর্ধান রহস্যে ভিকটিমকে চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে খুঁজে না-পেলে, অথবা, কোনো সূত্র যদি না-আসে, যেমন মুক্তিপণ চেয়ে ফোন, তাহলে তার বেঁচে থাকার সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়ে যায়।

‘আপাতত গরম্যানকে তোলো। কড়া গ্রিল করো। বাকিটা দেখা যাবে।’

.

রেভারেন্ড বেথেল মিশন সংলগ্ন নিজের কোয়ার্টারেই ছিলেন। আমরা গিয়ে দেখলাম, প্রায় শয্যাশায়ী। তাঁর পাশে বসে আছেন ডেভিড। শুধু আত্মীয় নয়, ডেভিড ব্রাউন বেথেল মিশন চার্চের অন্যতম পৃষ্ঠপোষকও ছিলেন, প্রচুর অর্থসাহায্য করতেন। রেভারেন্ড দু-হাতে মুখ ঢেকে ছিলেন। নরম স্বরে বললাম, তাঁকে আসতে হবে থানায়। রেভারেন্ড লাল চোখে আমার দিকে তাকালেন। অস্ফুটে বললেন ‘আমার পাপে তিনটে জীবন শেষ হয়ে গেল।’ ডেভিড বললেন সেদিন থেকে রেভারেন্ড একই কথা বলে যাচ্ছেন। আমাদের সঙ্গে ছিল কনস্টেবল বিকাশ কুমার, সে ক্রিশ্চান। সহানুভূতির স্বরে বলল, ‘এডওয়ার্ড স্যার আর মনীষা ম্যাডামের কথা ভাববেন না, রেভারেন্ড। ওঁদের বয়েস কম, নিজেরা সামলে নিচ্ছেন। আপনাকে শক্ত থাকতে হবে।’ রেভারেন্ড নির্নিমেষে তাকিয়ে থাকলেন বিকাশের দিকে। তারপর আর্ত ডাক ছেড়ে হাহাকার করলেন। মনে হল তাঁর হৃৎপিণ্ড ফেটে চৌচির হবে। তারপর মাটিতে আছড়ে পড়ে চিৎকার করলেন, “দিজ নেগেটস অল গুড ওয়ার্কস। লেট মাই সিনস নট গেট পাউনড।’ আমরা সবাই স্থাণু। তাঁকে স্পর্শ করতে সাহস পাচ্ছিলাম না। দুই হাতে মাথা ঢেকে বসে আছেন ডেভিড। তখন চোখ তুলে দেখলাম, ঘরের দরজায় মনীষা এসে দাঁড়িয়েছেন। বিষাদপ্রতিমা। তাঁর চোখে অশ্রু নয়, শূন্যতা ছিল। তিনি অপলকে আমার দিকে তাকিয়ে ছিলেন। বোবা সে-দৃষ্টিকে পরিমাপ করবার সাধ্য ছিল না বলে একটা সময়ের পর চোখ নামাতেই হয়। রেভারেন্ড তখনও চিৎকার করছেন, কপাল ঠুকছেন মাটিতে। আমি মনে মনে বললাম, ‘মনীষা ম্যাডাম, আপনার জন্য ক্রিসকে আমি ফিরিয়ে আনবই। আমার কেরিয়ার বাজি থাকল। ‘

বুঝতেই পারছেন, কত বোকা ছিলাম। মনীষার মধ্যে নারীর শোক দেখেছিলাম আমি, যুগ যুগ ধরে যাকে আমরা ছুঁতে পারি না। আমার পা কাঁপিয়ে দিয়েছিল, বিশ্বাস করুন, অফিসার মাহাতো। সেবারের আড্ডায় কথাটা বলিনি কারণ এডওয়ার্ড ছিলেন। কিন্তু, আজ এত বছর পর স্বীকার করতে বাধা নেই— না না, ভুরু কুঁচকোবেন না, আমি সেই সেন্সে বলছিও না—আমি মনীষার প্রেমে পড়েছিলাম। সেজন্যেই বছরের পর বছর, এমনকী বুড়ো বয়েসেও, লুকিয়ে লুকিয়ে তাঁকে দেখেছি। দাঁড়িয়ে থেকেছি গাছের আড়ালে, তৃষ্ণার্তের মতো তাকিয়ে থেকেছি, যখন রাঁচি থেকে এসে তিনি বাগানে বসে থাকতেন অথবা এখানে-ওখানে ঘুরে বেড়াতেন। হয়তো এর মধ্যে কামগন্ধ নেই। একটা মেয়ের অবিশ্বাস্য শোকের সামনে অবনত হয় যে ভালোবাসা, অনেকটা সেরকম। আজ পেছন ফিরে দেখলে নিজেকে নির্বোধ লাগতে পারে। আপনিও জানেন, সেই অনুভূতি কীভাবে আমার পতনের কারণ হয়ে দাঁড়াল।

মনীষা বুঝতেন হয়তো, মাঝে মাঝে তাঁর চোখ-মুখ লাল হত আমার উপস্থিতিতে। কিন্তু অফিসার, আপনি হাসবেন না প্লিজ, এ আমার ছেলেমানুষি নয়। আপনারা দু-বার আমাকে থানায় ডেকেছেন, জেরা করেছেন দীর্ঘ সময়। চাইলেই গ্রেপ্তার করতে পারেন, হয়তো প্রাক্তন কলিগ বলে আলগা দিচ্ছেন। আপনার কি মনে হয় এই অবস্থায় আমি তরল কথা বলতে পারি, সে যতই মাতাল হই না কেন? দেখুন, হাত কিন্তু কাঁপছে না। ভগবানের দিব্যি, আমার সঙ্গে মনীষার কখনো একান্তে দেখা পর্যন্ত হয়নি, বাক্যবিনিময় হয়েছে হাতে গুণে। যখন তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য এসেছি, সঙ্গে মহিলা কনস্টেবল রেখেছি। শুধু গত তিরিশ বছর ধরে কখনো মুহূর্তের খেয়ালে আমার ওই লুকিয়ে দেখাটুকু— আর্চির কটেজের গা-

ঘেঁষা ঝোপের আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকা, যদি একবার বাইরে বেরোন, অথবা, সন্ধেবেলায় প্যাটিওতে বসে থাকেন যখন মনীষা, তখন কয়েক মিনিটের জন্য নিজেকে অন্ধকারে মিশিয়ে তাঁকে দেখে যাওয়া, মাত্র এটুকুই, আমার চাইবার অন্য কিছু ছিল না। ব্যাপারটা বাড়াবাড়ি লাগছে, না? ওই একটা দুপুরের কয়েক মুহূর্তের চোখাচোখি, যখন সময় মনে হল স্তব্ধ আর, আমাদের প্রতিটা শোকের গ্রন্থি গিঁট পাকিয়ে অনিরাময়ের জাল তৈরি করছে যার একপ্রান্তে আমি এবং অপরপ্রান্তে মনীষা, দু-জনেই এই জাল থেকে বেরোতে পারব না কখনো। তবু সেটা জেনেও একে অপরের দিকে অপলক তাকিয়ে আছি, এটুকু আমার সমস্ত স্মৃতি, তার আগে-পরে কিছু নেই। আপনি বুঝবেন, যদি আমি উন্মোচিত করি এক ডিটেকটিভের ব্যর্থ আত্মাকে?

রেভারেন্ডকে থানায় নিয়ে আসা হল। ঘণ্টার পর ঘণ্টা জেরা করেও লাভ হল না। উলটে এডওয়ার্ড থানায় এসে চেঁচামেচি শুরু করলেন, তাঁর শ্বশুরমশায়কে হ্যারাস করা হচ্ছে। ওপরমহলে অভিযোগ করলেন যে, ভারতীয় পুলিশ অ্যাংলো কমিউনিটির ওপর গায়ের ঝাল মেটাচ্ছে। অ্যাংলো ইন্ডিয়ানদের ক্লাব থেকে চাপ বাড়ানো হল। রেভারেন্ডের কোয়ার্টার, বেথেল মিশনের অলিগলি তন্নতন্ন করে খোঁজা বিফলে গেল। রেভারেন্ড নিজেকে দায়ী করছেন সত্যি, কিন্তু তা দিয়ে তদন্তের সুরাহা হয় না। আমার কাছে কোনো ক্লু ছিল না, একটা বাচ্চার কান্নার শব্দ বাদে। আর একটা জিনিস, আপাতদৃষ্টিতে নিরীহ, কিন্তু অদ্ভুত বলে আমার মনে ছিল। ক্রিসের ঘরে তার দোলনার নীচে একটা চিরুনি পেয়েছিলাম। সাদা রঙের, হাতির মুখ খোদাই করা। মনীষা, নির্মলা, বারবারা সকলে জানিয়েছিল, এটা তাদের নয়। হতেই পারে অনেক মানুষ তখন সে-ঘরে ঢুকছিল, কারোর পকেট থেকে পড়ে গেছে। যদিও কেউ পরে দাবি জানায়নি। কী করব বুঝিনি, ফাইলের মধ্যে সেটাকে গুঁজে পাঠিয়ে দিলাম। ঘটনাটা মনে আছে আমার, কারণ অদ্ভুত ছিল।

এত ছোটো টাউনে এরকম অপরাধ ঘটলে তার প্রভাব পড়বেই। নানা কারণে ব্রাউনদের পরিবারের ওপর অনেকের রাগ ছিল। শহরে রটে গেল যে, পরিবারের লোকেরাই ক্রিসকে হত্যা করেছে। রোজ আমরা ফোন পেতাম, কারোর থিয়োরি হল ক্রিসকে অনেক আগেই হত্যা করে দেহ সরিয়ে ফেলা হয়েছে, পুলিশ ডাকার ব্যাপারটা চোখে ধুলো দেবার জন্য। কেউ আবার ওদের পরিবারের ওপর অশুভ আত্মার প্রভাবের প্রমাণ পেয়েছে। ক্রিসকে লাতেহারের অমুক পার্কে দেখা গিয়েছে, অথবা, কেউ তাদের উলটোদিকের কটেজ থেকে এক অচেনা শিশুকণ্ঠের কান্না শুনেছে, এমন ফোনও পেয়েছি। প্রথমদিকে প্রতিটা ফোন পেয়ে পুলিশ ছুটেছে। তারপর দেখেছে সবই ভুয়ো। আমরা সংবাদপত্র, রেডিয়ো, টিভির মাধ্যমে আবেদন করতাম, যদি কেউ কিছু জানেন ক্রিসের ব্যাপারে, যেন আমাদের কাছে আসেন।

মনীষাকে দিয়েও একবার আবেদন করানো হয়েছিল। হাবিজাবি ফোন অনেকটা সেইসূত্রেও বটে। ডিপার্টমেন্ট নিরাশ হতই। একসময়ে কথা উঠল ভেতরে, আমি একটা কেস নিয়ে অবসেসড হয়ে গেছি। সেটা ভুল নয়। তখন আমার ঘুম, স্বপ্ন, জাগরণ ও স্মৃতি, সমস্ত কিছু জুড়ে ক্রিস। জুড়ে আছে মনীষার শোকভারানত মুখাবয়ব, যার সামনে আমি নতজানু হই রোজ। রোজ নিজেকে মনে করাই, এই কেস আমি সলভ করব। কিন্তু, ডিপার্টমেন্ট বিরক্ত হয়। নতুন ভুয়ো কলের পেছনে ধাওয়া করতে বললে অনির্দেশ্য ঘাড় নাচায় তারা, তারপর অনিচ্ছুক ঔদাসীন্যে হুকুম তামিল করে। তখন চার মাস কেটে গেছে, আপডেটের অভাবে ঝিমিয়ে গেছে ডিপার্টমেন্ট। শহরময় কানাঘুসোর ছায়াপুঞ্জ, ব্রাউনরা একটা শিশুকে মেরে ফেলেছে। তাদের বাড়ির দেওয়ালে চক দিয়ে লিখে আসে ‘খুনি’। ডেভিড ভূতের মতো বসে থাকেন বেথেল মিশনে রেভারেন্ডের সঙ্গে। বাইরে বেরোন না, খাওয়া-দাওয়া করেন না। বাড়ি ফিরলে নাকি প্রবল চিৎকার করেন কেউ কান্নাকাটি করলে। এডওয়ার্ড নিয়মিত থানায় আসেন। মাঝে মাঝে আসেন মনীষা। কখনো বারবারাও আসে তাঁদের সঙ্গে। আমরা তাঁদের চা অফার করি খান না। প্রথম প্রথম সহানুভূতির সঙ্গে তাঁদের দেখত ডিপার্টমেন্ট। এলে ওসি সাহেব নিজের ঘরে নিয়ে যেতেন, আলোচনা চালাতেন, জানাতেন প্রোগ্রেসের খুঁটিনাটি। তারপর সময় ঢলল, আর আমরাও বীতস্পৃহ হলাম। তাঁদের সামনে দিয়ে যেতে হলে ফাইলে মুখ গুঁজে চলে গেলাম। ওসি সাহেব বলে পাঠালেন তিনি ব্যস্ত, দেখা করতে পারবেন না। মনীষার ওজন মনে হয় ততদিনে অর্ধেক হয়েছে, দেখে ছোট্ট স্কুলবালিকা মনে হয়। এডওয়ার্ড ও বারবারার চোখের তলায় কালি। একদিন মনীষা বমি করে দিলেন থানার ভেতর, দীর্ঘ সময় ধরে অনাহার অথবা খাবার অনিয়ম শোধ তুলছিল। আমাকে সেদিন ভুজবলজি ঘরে ডেকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘ইয়ে, মানে এরা কতদিন আসবে, এনি আইডিয়া?’

‘আমি কী করে জানব, স্যার! বাচ্চা এদের হারিয়েছে, আমার নয়।’ আমার গলার তিক্ততা আন্দাজ করে ভুজবলজির গলাতেও ইস্পাতের কাঠিন্য এল।

‘তুমি ব্যর্থ হয়েছ। এবার কি এটাকে গোটাবার সময় আসেনি?’

‘আমি বোঝাতে পারব না ঠিক। আমার সিক্সথ সেন্স বলছে, কিছু একটা আছে যাকে আমরা মিস করে যাচ্ছি।’

‘এটুকু বোঝার জন্য সিক্সথ সেন্সের দরকার নেই। মিস অবশ্যই করেছ, নাকরলে বাচ্চাটাকে পেয়ে যেতে। তোমার বিশ্বাস, ক্রিস এখনও বেঁচে আছে? অসম্ভব!’ ‘সেটা এডওয়ার্ড ব্রাউনকে কে বলবে? আপনি, না আমি?’

ধড়াম করে দরজা ঠেলে বেরিয়ে গেলেন ভুজবলজি। তাঁর অস্ফুট স্বর শুনলাম, ‘ইডিয়ট!’

সেদিন আমি স্যাংচুয়ারিতে গিয়ে এডওয়ার্ডকে বললাম থানায় আসতে হবে না, কিছু আপডেট পেলে আমরা আসব। কিন্তু, এডওয়ার্ড মাথা নীচু করলেন, ‘এসে লাভ নেই জানি, বারবারার জোরাজুরিতে আসা। সে ক্রিসকে দেখতে পায়।’

এবার আমার চমকাবার পালা, যদিও এই আশঙ্কা ছিলই। ‘পেছনের মাঠে, ক্রিস নাকি জলাভূমির ওপারে বসে থাকে। হাঁটে।’ এডওয়ার্ডের গলা ধরে এল।

আমি দেখলাম বারবারা এসে দাঁড়িয়েছে ঘরের এক কোনায়। এলোমেলো পা, জড়ানো স্বর, হাসার চেষ্টা করছে। মুখ মুছে বলল, ‘সত্যিই দেখেছি।’ এডওয়ার্ড আমার দিকে হতাশ চোখে তাকালেন।

ক্রমে দিন গেল এবং মানুষ ক্লান্ত হল চর্বিতচর্বণে। ভুয়ো ফোন আসা বন্ধ হল। একদিন সকালে আমরা আবিষ্কার করলাম, গত এক সপ্তাহে এডওয়ার্ডরা একবারও আসেননি। তখন থেকে তাঁদের আসা সপ্তাহে একবার, সেখান থেকে মাসে বড়োজোর একবার, শেষমেষ বছরে একবারে দাঁড়াল। ব্রাউনদের পতনের শুরু তখন থেকে। এডওয়ার্ড ও মনীষা বছর দুয়েক পরে রাঁচি চলে যান। ব্রাউনদের ব্যাবসা বন্ধ হয়ে যায়, বিক্রি হয় হোটেল। বারবারা চাকরি ছাড়ে। ডেভিড বাড়ি বসে মদ খান সারাদিন। সামাজিক জীবন শেষ হয়ে যায় তাঁদের, কারোর সঙ্গে মেশেন না, বেরোন না বাড়ি থেকে। বারবারাকে এলোমেলো পায়ে রাস্তায় ঘুরতে দেখা যায়, দেখা যায় সন্দেহজনক শুঁড়িখানায় বসে থাকতে, পুরুষের দল তার ধারেকাছে ঘেঁষে না। অধস্তন কর্মীদের ছাড়িয়ে দেওয়া হয়। বাড়ি অধিকার করে আগাছা। ভাঙতে শুরু করে। সন্ধেবেলা আলো জ্বালানো হয় না, কারণ বাবা, মা, মেয়ে যে যার ঘরে শুয়ে থাকে। টাউনের লোক আঙুল দেখিয়ে বলে, ‘ভূতে পাওয়া বাড়ি।’

১৯৯৯ সালের অগাস্ট মাসে আবার ফোন এসেছিল এবং আমরা আবার স্যাংচুয়ারিতে ঢুকেছিলাম। ঝুপঝুপে বৃষ্টি হচ্ছে তখন, মশার দল আমাদের ঘিরে বিষণ্ণ ঝাঁক রচনা করেছে। ছাতা মাথায় আমরা গেলাম পেছনের মাঠে। ছাই মেঘের দল অনেকটা নীচে নেমে এসেছে, আর মরা আমগাছের ডাল থেকে ঝুলছেন ডেভিড ব্রাউন। তাঁর আধখোলা ঠোঁট, নিমীলিত চোখ, কালো মুখ, কপালে ল্যাপটানো চুল থেকে নেমে আসা বৃষ্টির ধারা নাকি ঘাম, সাত বছর আগের দিনটার মতো— বারবারা মাটিতে বসে ছিল, গালে হাত দিয়ে। আমার সঙ্গে চোখাচোখি হতে বলল ‘ক্রিসকে খুঁজতে গিয়েছিল।’

গলা শুকিয়ে গেছে, অনেকটা সময় বকবক করলাম তো! আরেকটু হুইস্কি নিই? আমাকে গ্রেপ্তার করতে এলে এভাবেই দেখবেন, পাশে খাঁ সাহেব। না, এ প্রশ্নের উত্তর দিতে দিতে আমি ক্লান্ত। খুন করেছি কি না সে নিয়ে বহুবার নিজের ব্যাখ্যা দিয়েছি, আর দেব না। তাতে আপনারা সন্তুষ্ট না-হলে, কী বলব বলুন! একাত্তর বছরে পৌঁছে নিজেকে

বীতস্পৃহ হতে শেখাচ্ছি। আজ অন্তত ক্রিসের গল্পটা আমাকে শেষ করতে দিন, প্লিজ। একটা ছোটো পেগও নেবেন না? সত্যিই আপনি কড়া অফিসার !

আগাথার মৃত্যুর সময়ে অবশ্য আমি এখানে ছিলাম না। তখন হাতিয়াতে পোস্টেড। সেখানে কিছুদিন কাটাবার পর ধানবাদ, তারপর সদর, আবার হাতিয়া, শেষে সিনিয়রিটির বিচারে ফিরে এলাম নিজের জায়গায়। কিন্তু, আমি ক্রিসকে ভুলিনি একটা দিনও। বছরের পর বছর আমি পড়ে থেকেছি। বার বার উলটেপালটে দেখেছি সমস্ত সাক্ষীর বক্তব্য এবং বাড়িটার ম্যাপ খুঁটিয়ে দেখে বোঝার চেষ্টা করেছি, কী মিস করে গেলাম। কোথা দিয়ে ঢুকেছিল অপরাধী? কীভাবে বেরোল সে? আমার বাড়ি ছিল খালারি স্টেশনের কাছে, সেখানে আছে পরিবার, বাবা, মা। কিন্তু, বেশিরভাগ দিনই যাই না। থানার ঘরে অনেক রাত কাটিয়ে দিই। আমার স্ত্রী প্রথমে সন্দেহ করেছিল অন্য মেয়েমানুষ, তার ভুল আমিও ভাঙালাম না। সে শ্বশুরালয়ে দুই ছেলেকে নিয়ে নিজস্ব আবাদ বানিয়ে ফেলল। ছেলেরা আমাকে চিনত না। বাড়ি গিয়ে বসে থাকতাম খেতের ধারে, ছাগলগুলো নিয়ে জঙ্গলে চরাতে যেতাম। দাম্পত্য বাক্যালাপ কমে শূন্যের কাছাকাছি গিয়েছিল। ফাঁকা সময়ে এলোমেলো ঘুরে বেড়াতাম টাউনের আনাচকানাচ, গলিঘুঁজি, দিশি মদের ঠেক, চাইনিজ মালের খুচরো দোকানিদের আড্ডাখানা। ছায়ামূর্তির মতো এক পুলিশ অফিসার, যে আচমকা উদয় হয়, বসে থাকে কিছুটা সময়, তারপর উধাও হয়, সে আমাদের ছোটো শহরে কানাকানি তৈরি করে। ভবিষ্যতের অপরাধীরা অস্বস্তিতে পড়ে। বর্তমানের আইনভঙ্গকারীর দল ক্রুদ্ধ হয়। হাওয়ায় গুমগুমে গুঞ্জন ওঠে, পুলিশ নতুন ফাঁদ পাতছে? তখন আমি উঠে বেরিয়ে যাই পানশালা থেকে, হাঁটতে হাঁটতে বুঝতে পারি শ্বাপদের বহু চোখ, আততায়ীর চোখ, বিশ্বাসঘাতকের চোখ, প্রতিশোধকামীর চোখ আমাকে লক্ষ করে যাচ্ছে। ভয় লাগে না। বিফল মদের দিকে তাকালে অনেক রাত্রির প্রত্যাখ্যান ও যুগান্তের ধোঁকাময় অপরাধী স্রোত আমাকে ঘিরে ব্যূহ রচনা করে। আমি তাদের ভেতর দাঁড়িয়ে কল্পনা করি, সবার চোখের সামনে থেকেও গায়েব হওয়া সম্ভব, ব্যক্তিগত ব্যর্থতার কম্বল মুড়ি দিয়ে নিজেকে লুকোনো সম্ভব। সম্ভব?

আরেকটু নিই, বুঝলেন? কথা জড়ানো অবধি চালিয়ে যাওয়া আমার অভ্যেস।

এই ঘটনার কুশীলবেরা অনেকে জীবিত, আপনি তাঁদের অনেককে জেরা ও করেছেন। রেভারেন্ড গরম্যান বেঁচে আছেন। প্রায় পঁচাশি, গত বছর দশেক তাঁর স্মৃতিভ্রংশ হয়েছে। অসংলগ্ন কথা বলেন, বেথেল মিশনের কোয়ার্টার থেকে মাঝে মাঝে বেরিয়ে যান। উদ্দেশ্যহীন হাঁটেন এখানে-ওখানে। মনীষা বাবাকে রাঁচি নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন কিন্তু রেভারেন্ড যেতে চান না। মিলা দুবে মারা গিয়েছে ২০১৬ সালে। রাঁধুনি বিশাল সিং ভালো জীবনের আশায় দিল্লি পাড়ি দিয়েছিল, তারপর খবর নেই। মালি আদেশ যাদব বহুদিন বেপাত্তা, তার পরিবারের খবরও আমি পাইনি। দারোয়ান সমর দোসাদ এখনও বেঁচে, অশক্ত শরীর, কিন্তু পেট তো চালাতে হবে, একটা শুঁড়িখানায় কাজ করে। এই ঘটনার পর এদের সবাইকেই ছাড়িয়ে দিয়েছিলেন ব্রাউনরা। পেলজম ভুজেল, আগাথার খাস লোক, নিজেই কাজ ছেড়ে চলে যায় কলকাতায় ছেলের কাছে। কনস্টেবল অর্জুন সিং, যে শুরু থেকে আমার সঙ্গে ছিল, ২০০৯ সালে একটা কেসের তদন্তে কোডারমা যাবার পথে গাড়ি দুর্ঘটনায় মারা যায় । ভুজবলজি বেঁচে আছেন যদিও, নাগরিতে নিজের পৈতৃক ভিটেতে চলে গেছেন অবসরের পর। দুই-একবার তাঁর বাড়ি গিয়েছি। গেলে পুরোনো দিনের গল্পে মেতে ওঠেন। চুরাশি বছর বয়েস, কিন্তু অবিশ্রান্ত বকবক করে যাবেন, আমাকে পুরোনো ফাইল দেখিয়ে বলতে থাকবেন কত কী করা যেত, কিন্তু হল না। বুঝতে পারি, পরিবারে অন্যেরা তাঁর বকবকানিতে অতিষ্ঠ, হ্যাঁ-হুঁ করে কাটিয়ে দেয়। আমি গেলে লাঞ্চের আগে কিছুতে ছাড়বেন না। তারপর দাওয়ায় বসে স্মৃতিচারণ করবেন টানা। মালভূমিতে সন্ধে নামবে এবং আমরা দুই বাতিল পুলিশ অফিসার নিজেদের অসার্থকতার সামনে সমর্পণের ভঙ্গিতে বসব।

.

আমার গল্প শেষ, অফিসার। আমি এক হতমান ডিটেকটিভ, যার ব্যর্থতাও তত মহনীয় নয় যা উদযাপনযোগ্য, আপনার সামনে দাঁড়িয়ে একটাই কথা বলব। তিন বছর আগে বারবারার বাড়িতে বলেছিলাম, আপনাকেও বলব। আজকের হত্যারহস্যে আপনারা ব্যস্ত, আপনাদের সময় নেই তিরিশ বছর আগেকার এক কাহিনি নিয়ে মাথা ঘামানোর। ক্রিস বেঁচে আছে কি না সেটাও জানি না। কিন্তু আমি বলছি, তাকে বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব আপনাদের। স্মৃতি, যা আততায়ীর আনুগত্যে এবং বিশ্বাসঘাতকের মসৃণতায় নিজেকে প্রশ্নময় রাখে, তাকে হত্যা করা পাপ। আপনারা মনে রাখুন, মনে রাখুন, এবং মনে রাখুন।

.

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *