নৈশ অপেরা – ৭

যদি কেহ মনে করে, সে কিছু জানে, তবে যেরূপ জানিতে হয়, তদ্রূপ এখনও জানে না ;

– 1 Corinthians । 8:2

.

‘ও বলেছিল, সবটুকু দিয়ে চেষ্টা করবে। আমি দরজা খুলেছিলাম আবার, আর ও ঢুকে এসেছিল।’

‘কিন্তু, তারপর—’ নিজের মনে অক্ষয় মাথা নাড়ল। আমি বুঝিনি, ওর আক্ষেপ হচ্ছে কি না।

‘তারপর আমরা একে একে সবাইকে প্রশ্ন করেছিলাম। আমি তনয়াকে ক্রিসের ঘর খুলে দেখিয়েছিলাম। বহুকাল পর সেখানে আমি ঢুকেছিলাম, যখন হা-হা শূন্যতা আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে মনে হয়েছিল। অ্যারন বাইরে দাঁড়িয়ে তখন মদ খাচ্ছিল। ওই সময়টায় ও সারাদিন মদ খেত।’

অ্যারন আজকাল স্যাংচুয়ারিতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটায়। লালুরামের পাশে বসে থাকে, আবার কখনো মাঠের বুক চিরে হেঁটে অনেক দূর চলে যায়। ফিরে আসে ধুলোমাখা পায়ে, ক্লান্ত লাল চোখ তখন ওর। সন্ধেবেলা পুনমের কিচেনে যায়। এটা- ওটা রান্নার নতুন পদ দেখায়। সরষেবাটা দিয়ে গ্রিলড ব্রকোলির একটা দারুণ ডিশ বানিয়েছে গতকাল। ও কি এখানেই থেকে যাবে? কয়েক দিন আগে আমাকে বলেছিল, ‘আমরা এমন কেউ যাদের হওয়াই উচিত ছিল না।’ ওকে আমি বলতে পারিনি যে, শুধু মরে যাওয়াটা কোনো ব্যাপার ছিল না আমার কাছে কারণ আমরা কেউ সত্যিই বেঁচে নেই। ওর চোখের তলায় কালি জমেছে। ছোটোবেলায় আমার কোল থেকে নামতে চাইত না যখনই আসত রাঁচি থেকে। আমি ওকে ইশপের গল্প শোনাতাম। অবাক অ্যারনের হাঁ-ঠোঁট থেকে লালা গড়িয়ে নামত রামদাসকাকাকে লাথি মারলাম, উফ করে হাত আলগা করল।

-দেখেছেন দাদা, কী জোর হয়েছে?

বাবা লাল চোখে তাকাল— বেয়াড়াপনা আজকেই ঘোচাচ্ছি।

কয়েক দিন আগে বিকেল বেলা অ্যারন আমার সঙ্গে বেথেল মিশন চার্চে গেল, কারণ বহুদিন পরে মাস হচ্ছিল। অন্য যারা গিয়েছিল, আমাদের দিকে তাকাচ্ছিল না, কিন্তু নিজেদের ভেতর ফিসফিস করছিল। আমি পিঠ দিয়ে দেখছিলাম, অনেক চোখ, ওরা আমাদের বলছে শয়তানের বাড়ি, নরক— সেদিন বসন্তের একটানা হাওয়া আমাদের সমবেত চাপাকান্নার গায়ে মলম বোলাচ্ছিল। আমি শুনলাম, ‘আমাদের পাপের ক্ষমা আর শরীরের পুনরুত্থান। আমেন।’ রেভারেন্ড গরম্যান অলটারের সামনে অনেকক্ষণ ঝুঁকে ছিলেন। তাঁর জীর্ণ শরীরকে হয়তো টানতে চাইছিলেন না। ক্লান্তচোখ আকাশে রেখে যদি বলতেন ‘হায় প্রভু’, তবু মানে দাঁড়াত। কিন্তু তার বদলে, পাপের ক্ষমা। রেভারেন্ড আজকাল কিছু মনে রাখতে না-পেরে অলটারের সামনে ঝুঁকে থাকেন, বৃদ্ধ মোমবাতি যেমন। অ্যারন দুই হাতে মাথার ভর দিয়ে চুপচাপ বসে ছিল। ও সারাক্ষণ চিন্তা করে কিন্তু তাদের ভাগ কাউকে দেয় না।

জোরে শ্বাস টেনে মনীষা বলল, ‘অনেকবার বলেছি। তবু, জানতে চাইছেন যখনসেদিন আমি ফোন রেখে ঘর থেকে বেরিয়ে দরজায় বাইরে থেকে হুড়কো লাগিয়ে দিই । দরজা খোলা রাখলে যখন-তখন নির্মলা দুবে ঢুকে আসত, প্রিভেসির বালাই ছিল না তার। আমার পছন্দ হত না। তাই আমি বাইরে থেকে হুড়কো লাগাতাম ওকে দেখিয়ে, যেন দরজা খোলার আগে আমাকে জিজ্ঞাসা করে। তারপর নীচে নেমে দেখি বাবা ঘুমোচ্ছে। বাবাকে জাগাই, জিজ্ঞাসা করি নির্মলা কোথায় গেল। বাবা বলে ভাইকে টাকা দিতে গেছে। মিনিট পাঁচেক পর আমি সময় দেখি, আর নির্মলার ওপর রাগ হয়। বাবাকে বলেছিলাম, ও ফিরলে কড়া করে বলব। ক্রিসের খাবার আনতে রান্নাঘরে যাই, ওখানে বেবিফুড ছিল। বাটিতে ঢেলে রাঁধুনিকে বলি, জল গরম করে যেন মেশায়। তারপর আমি নীচের টয়লেটে গিয়েছিলাম। বেরিয়ে দেখি, কাউচের সামনে রাঁধুনি আর বাবা দাঁড়িয়ে। তারা আমাকে জিজ্ঞাসা করছে ক্রিস কোথায়। আমি উত্তর দিয়েছিলাম, বেশ মনে আছে, হয়তো বারবারা বা আমার শাশুড়ির ঘরে। গলা তুলে কয়েক বার ক্রিসকে ডাকাডাকি করে তারপর নীচে শাশুড়ির ঘরে টোকা দিই। উত্তর আসে না। দরজা অল্প ফাঁক করে দেখি মাটিতে বসা পেলজম খাটে মাথা রেখে ঘুমোচ্ছে। আমার শাশুড়ি খাটে বাবু হয়ে বসে খাটের মাথায় যে ছোট্ট অলটার সেখানে মাথা ঠেকিয়ে রেখেছেন, ভঙ্গিটা কুঁজোমানুষের মতো চোখ বুলিয়ে ঘরে ক্রিসকে পেলাম না। ওপরে উঠে দরজা ধাক্কাই। বারবারা দরজা খুললে তাকে জিজ্ঞাসা করি। সে বলে, ঘর থেকে বেরোয়নি। তবু আমি অভ্যেসবশত ঘরের ভেতর চোখ চালিয়েছিলাম। ক্রিস নেই। তখন আমার মনে হয় নির্মলা ফিরে হয়তো ক্রিসের ঘরে ঢুকেছে। কিন্তু, ক্রিসের ঘর শূন্য ছিল। তারপর দোতলার একটা স্পেয়ার ঘর, যেটা গুদোম হিসেবে ব্যবহার হত, সেখানে গিয়েও পেলাম না। নীচে নেমে একতলার অন্য ঘরগুলো দেখলাম। বাবা ও রাঁধুনি ততক্ষণে বাইরে বেরিয়েছে, যদি বাগানে ক্রিস বেরিয়ে যায়। সেসব জায়গা খোঁজার পর তারা দারোয়ানের ঘরে ঢুকেও দেখে নিয়েছে। আমি যখন বাড়ির বাইরে বেরোচ্ছি, তখন বাবা আসছে দারোয়ানের ঘর থেকে, তার পেছনে দারোয়ান আর মালি। রাঁধুনি তখন দৌড়ে দৌড়ে বাড়িটা একপাক ঘুরে এসে জানান দিচ্ছে, বাচ্চাকে পাওয়া যাচ্ছে না। দৃশ্যটা ছবির মতো গেঁথে আছে মনে। বাবা তারপর বলল এডওয়ার্ডকে ফোন করতে। দারোয়ান ও মালি বাড়ির মেইন গেট খুলে বাইরে বেরোল, যদি কেউ কিছু দেখে থাকে। আমি তখন ওপরে উঠেছি কারণ ফোন করার পর কর্ডলেস নিজের ঘরে রেখে এসেছিলাম। দরজা খুলে কর্ডলেস নিয়ে বেরোই, আবার দরজা লাগিয়ে ফোন করতে করতে নীচে নামি। তখন আমার হাত-পা কাঁপছে, তবু মাথা ঠান্ডা ছিল। নীচে নেমে ফ্রেঞ্চ উইন্ডো দিয়ে দেখি, নির্মলা দুবে ঢুকছে। সেই প্রথম আই লস্ট ইট। চিৎকার করে তার দিকে দৌড়ে যাই এবং গালাগালি দিই, বলি তাকে পুলিশে দেব। এ-ও বলি, তার জন্য ক্রিসকে আজ পাওয়া যাচ্ছে না। নির্মলা ভয়ে থরথর করছিল, তার মুখ সাদা হয়ে গিয়েছিল, চোখে জল। বাবা ও দারোয়ান আমাকে সামলাচ্ছিল। আমাকে ধরে ড্রয়িং রুমে নিয়ে যাওয়া হয় এবং বারবারা আমাকে তারপর থেকে জড়িয়ে বসে ছিল। অনেক লোক ঘুরছিল আশপাশে, এডওয়ার্ড ও তার বাবা এসেছিল, তারপরে পুলিশ, কিন্তু কখন কী ঘটেছিল তারপর থেকে আমার মাথায় ছিল না।’

ঘরটাকে বাতিল-ঘর হিসেবে ব্যবহার করি আমরা। বাগানের একধারে। হোটেলের বাতিল জিনিসপত্র থাকে। অনেক ড্রাম, দড়িদড়া, উঁচু টুল, মই, প্যাকিং বাক্স, আরও কী কী—দরজাটা অবশ্য ভারী কাঠের, বন্ধ করলে বাইরে থেকে আলো ঢোকে না। আমার একবার মনে হল, পেছনে দাঁড়িয়ে মা গুনগুন করে কাঁদছিল, যখন আমাকে ঘরে ঢোকানো হচ্ছিল। কিন্তু, মা এখনই আবার অলটারে মাথা কুটবে, ফুঁপিয়ে কাঁদবে, ঘুমিয়ে পড়বে তারপর।

কিছুক্ষণ চুপ থেকে মনীষা যোগ করল, ‘আসলে এতবার নানারকম জেরায় আমাকে এগুলো বলতে হয়েছে যে, মুখস্থ হয়ে গেছে। চাইলেই সেইদিনের সমস্ত ঘটনা, বাগান থেকে ড্রয়িং রুমে ফিরে আসার আগে পর্যন্ত, ছবির মতো দেখতে পাই। মনে হয় আধঘণ্টা আগের ঘটনা।’ সেদিন চরম বিশৃঙ্খলা চলছিল। যে পারছে, ভেতরে ঢুকে পড়ছে। চিৎকার, চেঁচামেচি। আমার মনে আছে ওই হট্টগোল। ওই টেনশনে এমনিই মাথার ঠিক থাকে না। আগের দিন অবিনাশ গল্প করল যেরকম- -ওরা যখন পেছনের বাগানের গেট খুলে তালা পরীক্ষা করছে, বাড়ির জানালা থেকে কে যেন চিৎকার করে বলল, ‘সামওয়ান ইজ ক্রসিং দ্য ফ্রন্ট গেট।’ সঙ্গেসঙ্গে সব ফেলে সবাই ছুটল সেদিকে। এদিকে কে যে বলল, সেটাই আর খুঁজে পাওয়া গেল না। নির্মলা বলেছিল, গলাটা মনীষার। সেই কয়েকটা ঘণ্টার মুহূর্তগুলো যেন একসঙ্গে জট পাকিয়েছে। কোনটা কখন ঘটেছে কিছুতেই আলাদা করা যায় না। ‘নাহ্, আমি তো তখন ড্রয়িং রুমে বসে। আমিও চিৎকারটা শুনেছি, ভেবেছি তুমি চেঁচিয়েছ।’ মনীষা বলল আমাকে। কিন্তু, আমিই কি? হতেও পারে। তখন যা চলছে, মাথা ঠিক রাখা মুশকিল। কোথায় যাচ্ছি, কাকে কী বলছি, নিজেরই মনে নেই। ‘অবিনাশ যাদব বলেছিলেন, দোতলার একটা অন্ধকার জানালায় দাঁড়িয়ে কেউ একজন চেঁচিয়েছিল। তিনি মুখ তুলে একটা ছায়ামুর্তির বেশি কিছু দেখেননি। বারবারাই হবে হয়তো।’ মনে পড়ল, তারপরেই আরেকটা তীব্র চিৎকার। নির্মলা দুবে আর্তনাদ করে অজ্ঞান হয়ে গেল।

গুদামঘরটার ভেতরে ভ্যাপসা গরম লাগার কথা, কিন্তু কেমন স্যাঁৎসেঁতে। মাটি ভেজা। পচা চামড়ার গন্ধ। মাটির এখানে-ওখানে ফুটো ছিল, কেঁচোর দল মুখে মাটি তুলে আনত। কাঠি দিয়ে কেঁচো, নাকি কেন্নো, কী জানি বাবা, একবার ছুঁয়ে দিলে গুটলি পাকায় কেমন। সেগুলোকে কাঠিতে তুলে এনে গোল পাক করে আকাশে ছুড়ে দেওয়া যায়. ভাসতে ভাসতে নেমে আসবে, কিলবিলে শরীরটা টান করে দেবে। কিন্তু আজ ভয় লাগছে। একসময়ে অনেক কেন্নোর ওপর অত্যাচার করেছি এভাবে। যদি এখন শোধ নেয়? পা বেয়ে উঠে আসে কিলবিল করে, তারপর আমার প্যান্টের ভেতর ঢুকে যায়? আমি ঘরের এককোনায় গুটিশুটি মেরে বসলাম। ওরা দুপুর বেলা নিশ্চয় আমাকে খেতে ডাকবে? বাবার তো রাগ পড়ে যাবে

তখন! হিল্ডাকে কাল গিয়ে ‘সরি’ বলব। চোখ ছুঁয়ে বলে দেব, আর করব না, প্রমিস।

আমরা কথা বলছিলাম ক্রিসের ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে। মনীষা সেদিন দুপুরে এসেছিল আমাদের বাড়িতে একটা দরকারে। তখন তনয়া তাকে ধরেছিল। অ্যারনও ছিল। সিঁড়ি দিয়ে উঠে একপাশে ছিল আমার ঘর। সিঁড়ির অপরপাশে এডওয়ার্ডদের বেডরুম। তনয়া এখন থাকে আমার পাশের ঘরে। বাদবাকি বেশিরভাগ ঘর তালাবন্ধ। এডওয়ার্ডদের বেডরুম খুলে তনয়াকে দেখালাম, বেডরুমের অপরপ্রান্তে ছোট্ট ব্যালকনি, যা দিয়ে মাঠ ও জলাভূমি দেখা যায়। অ্যাটাচড টয়লেট আগের মতোই আছে, তবে বাথটাবটাকে ভেঙে জমি সমান করে দিয়েছিল এডওয়ার্ড। এককোনায় আরেকটা সবুজ দরজা, ওর লাগোয়া ঘোরানো সিঁড়ি দিয়ে মেথরেরা নীচে নামত ।

দুম দুম ধাক্কা দিয়ে লাভ হবে না জানি, হয়তো বাবা আবার মারবে। দোদো ভালো থাকার সময়ে আমাকে অনেকবার বাঁচিয়েছে, লুকিয়ে রাখত নিজের ঘরে। কিন্তু, দোদো এখন নিজের ঘরে সারাদিন শুয়ে থাকে, আমাকে সেখানে ঢুকতে দেয় না। নার্স দিদি, আর ওষুধের গন্ধ। হাঁটুতে মাথা গুঁজলে থাকলে ভয় কম লাগবে, না? কিন্তু, যদি সাপ বেরোয়? ওরা অন্ধকারেও দেখতে পায়। নাক দিয়ে রাগের আওয়াজ করে ওরা। ইশকুলে একবার বেরিয়েছিল। দেহাতি গ্রাম থেকে সাপুড়ে এসে ধরে নিয়ে গিয়েছিল, এই লম্বা আর কালোর ওপর লালের ছিটে। আমরা দালানে ভিড় করে দেখেছি। আমার আবার কান্না পেল, গলার কাছে গুটলি পাকাচ্ছে। মা তো কিছু বলতে পারত! আমি ইচ্ছে করে কামড়াইনি ওকে।

বাথরুমের মাটি স্যাঁৎসেঁতে, নীচ থেকে জল উঠছে। দেওয়ালের ড্যাম্প অদ্ভুত মুখের আকৃতি নিয়েছে। ছোটোবেলায় এই বেডরুমটা ছিল আমার ঘর। একবার এক রাত্রিবেলা, জ্বর হয়েছে, সন্ধে থেকে দরজা-জানালা বন্ধ করে শুয়ে আছি একা। ঘুমিয়েও পড়েছিলাম, সেদিন ছিল অল সোলস ডে। বেশ রাতের দিকে সাদা মুখোশ পরে এডওয়ার্ড বাথরুম থেকে মুখ বাড়িয়েছিল। ‘আঁ আঁ’ করে চেঁচিয়ে উঠেছিলাম, চিৎকার থামতেই চায় না। তারপর বাবার সে কী মার এডওয়ার্ডকে! লাঠি দিয়ে পিটিয়েছিল। এডওয়ার্ড রাগ করে মুখ ঘুরিয়ে থেকেছিল পরের দু-দিন, কথা বলেনি। আমিই অপরাধীর মতো মুখ করে শুয়ে থাকতাম। শেষমেষ রাগ ভাঙাতে আমার একটা প্রিয় প্যাস্টেল কালারের সেট দিতে হয়েছিল ওকে। এই বেডরুমের লাগোয়া ক্রিসের ছোট্ট ঘর। দুটো ঘরের মাঝে দরজা, যা দিয়ে মনীষা ওর কাছে চলে যেত। সে-ঘরে ক্রিস থাকত ছোট্ট খাটে, তার পাশে নির্মলা। একটা বাহারি ওয়ার্ডরোব ছিল, যেখানে ক্রিসের খেলনা, জামাকাপড়, পুতুল ইত্যাদি সাজানো থাকত। অবশ্য, বেশিরভাগ দিনই রাত হলে মনীষা দোলনা থেকে তুলে ক্রিসকে নিজের কোলের কাছে এনে শুত। এখন ঘরটা ন্যাড়া। রংচটা ওয়ার্ডরোব খাঁ-খাঁ করছে। খাট বা দোলনা কিছু নেই। সব ফেলে দেওয়া হয়েছিল। মনীষা বাধা দিয়েছিল, এডওয়ার্ড শোনেনি। একটা শুকনো হাওয়া ঘরটার ভেতর পাক দিচ্ছিল। অনেকদিন পরে খোলা হলে ভ্যাপসা গন্ধ কাটতে সময় লাগে। মনীষা হাসল, ‘অনেক বছর পরে ঢুকলাম।’

‘আর কিছু মনে পড়ে, মনীষা?’ তনয়া নীচুগলায় নাম ধরে ডাকল তাকে। মনীষা বড়ো চোখ মেলে তাকাল, বুঝতে পারছে না প্রশ্নটা। ‘এমন কিছু সেদিন ঘটেছিল, যা আপনি পুলিশকে জানাতে ভুলে গিয়েছিলেন, অথবা, খুব তুচ্ছ কিছু, যা হয়তো অস্বাভাবিক, কিন্তু জানাবার মতো মনে হয়নি?”

‘কেন? কী হবে এতদিন পর এসব প্রশ্ন করে? ঘর তো দেখেই নিয়েছেন। সেদিন কী ঘটেছিল সেসবও বললাম।’ মনীষা বড়ো নিশ্বাস ফেলে অপরাধীর মতো হাসল। ‘জানেন, ক্রিসকে যদি কখনো আবার ফিরে পাই— আমি চাই না ও আসুক কারণ আমি হয়তো সেই ধাক্কায় পাগল হয়ে যাব। অথবা, হয়তো হব না, কী জানি! হয়তো ওর কাছে চলে যাব সব ছেড়ে।’ ঘরের চৌকাঠে দাঁড়িয়ে ওর দুলুনি অস্বাভাবিক লাগছিল। পায়ে ভর দিয়ে শরীর আগু-পিছু করতে করতে নিজের মনে কথা বলছিল মনীষা। মাতালেরা এভাবে টলে। ওর চোখ চকচক করছে। ‘আমি সেদিন ওকে থাপ্পড়টা যদি না-মারতাম! ও বলেছিল, পালিয়ে যাবে। আর দেখুন, সেই তো পালিয়েই গেল! বারবারা ঠিক বলে। ও লুকিয়ে আছে। ওই জলাভূমিতে।’

‘হয়তো এমন কিছু, সামান্য হলেও দৈনন্দিনের মধ্যে পড়ে না, তেমন অস্বাভাবিক কিছু কি মনে পড়ে আপনার?

‘যেমন, একটা চিরুনি।’ দরজায় হেলান দিয়ে বলল অ্যারন। তনয়ার চোখ বিস্ফারিত হল। সে অবাক দৃষ্টিতে তাকাল অ্যারনের দিকে।

আর একবার এমন হয়েছিল, আমি তখন অনেক ছোটো, এখন তো অনেক বড়ো হয়ে গেছি। ঘাসবনের ভেতর হারিয়ে গেছিলাম। তখন আমার হাউ হাউ কান্না, আর মা-কে দেখতে পাব না, বাবাকে না, দোদোকে না। তখন দিনের আলো মরে আসছে, ভয় লাগছে, আমি যদি মরে যাই? বাড়ি দেখতে পাচ্ছি না, মাঠ না, জলা না, শুধু লম্বা লম্বা ঘাস। তারপর কোথা থেকে কিছু নেই, বাবা, হুড়মুড়িয়ে এসে আমাকে কোলে তুলে নিল। হাঁফাচ্ছিল। লাল চোখ। হা-হা করে হেসে উঠল আমাকে বুকে জড়িয়ে। আমি ভয় পেয়ে আবার কেঁদেছিলাম।

‘এর মধ্যে চিরুনি আসছে কোথা থেকে?’ বিভ্রান্তস্বরে বলল মনীষা। অ্যারন উত্তর নাদিয়ে ফ্লাস্ক থেকে গলায় মদ ঢালল। ‘আচ্ছা, আপনি সত্যিই পারবেন, ক্রিসকে খুঁজে বার করতে? কেউ তো পারল না এতদিনে!’ মনীষা ঢোঁক গিলল। চোরাচোখে তনয়ার দিকে তাকালে তনয়া মুখ ঘুরিয়ে নিল—অস্বস্তি অথবা দ্বিধা—তবু, ও তো চেষ্টা করবে বলেছে! আমি যে ক্রিসকে দেখেছি, একমাত্র মনীষা বিশ্বাস করে।

আমাদের কিছু বলার ছিল না। অপেক্ষা করারও নয়। ক্রিসের শূন্যঘর মনীষা নিজের মতো করে সামলাক। কিন্তু, সিঁড়ির দিকে এগোবার সময়ে মনীষা বলে উঠল, ‘বালিশ।’ আমরা পিছু ফিরলাম।

‘একটা বালিশ। এডওয়ার্ড মাথায় দিত।’ থেমে থেমে বলল মনীষা, কুণ্ঠিতস্বরে। যেন লজ্জিত। ‘মানে, কিছুই নয় এটা। তবে, ক্রিস নিখোঁজ হবার পরদিন এডওয়ার্ড চেঁচামেচি করছিল। বালিশ পাচ্ছে না। আমিও খুঁজেছিলাম। নেই।’ অ্যারন সবার পেছনে ছিল। মনীষা তার হাত শক্ত চেপে ধরেছে, ‘বাবাকে বলিস না এসব। আবার চেঁচামেচি করবে।’ অ্যারন মনীষার হাতে চাপ দিয়ে সরে গেল একপাশে। পুলিশকে জানায়নি ও? আমিও তো বালিশের কথা জানতাম না, অথবা, ভুলে গেছি। অবশ্য, একটা বোকা ঘটনা, তখন এগুলো নিয়ে মাথা ঘামাবার সময় কার থাকে? কিন্তু আশ্চর্য, এত বছর পেরিয়েও মনীষার মনে আছে?

সেদিন তো তাও হারিয়ে গেছিলাম, আজ কিন্তু বাড়ির মধ্যেই আছি। তবু কান্না পাচ্ছে। খিদে পাচ্ছে। যদি দরজা খুলে দিত, অন গড়, পালাতাম না, বলতাম আমি এখানেই বসে আছি, আমাকে ভাত দাও। পিঠের কাছে সরসর আওয়াজ শুনছি না? প্রাণপণে চোখ বুজে হাঁটুতে মাথা ঢোকালে আওয়াজটা চলে যাবে। ওসব কিচ্ছু না, বাবা বলে মনের ভুল। আর মা খালি বুকে ক্রস আঁকে।

‘বালিশ! সত্যি?’ অক্ষয় অবাক হল।

‘তুমি দেখি ছোটো ছোটো জিনিস নিয়ে পড়ে আছ। চিরুনি, বালিশ! তনয়াও এমন ছিল। ছায়ার পেছনে ছুটে সময় নষ্ট কোরো না। ওই করে তিন বছর আগে তনয়া ডুবেছিল। তারপর আর ফিরে আসেনি। শোনো, আমার প্রায় সত্তর হতে চলল, তাই অনেক কিছু দেখেছি। যদিও তোমরা বিশ্বাস করবে না, কিন্তু সত্যিই আমাকে শক্ত মানুষ মনে হয় না? দেখো, সেই সেদিন থেকে গত এক মাসে সবাই কেঁদেছে, আমি কিন্তু একবারও কাঁদিনি। এমনকী রাতগুলো যখন বিভীষিকার হয়, পোড়োমাঠের মুখোমুখি দাঁড়ালে যখন তুমি অজস্র ফিসফিস শুনবে, নাকে এসে লাগবে মেয়েমানুষের গায়ের গন্ধ, পুরোনো হাসি আর ক্লান্ত স্বরের ভাংচুর, তখনও আমার কান্না বা ভয় কিছু পাবে না। কারণ, ওরা আমাকে অনেকদিন চেনে। তুমি বলো আমাকে, ক্রিসকে খুঁজে বার করবে কি না। আমার সঙ্গে রাত্রিবেলা জলাভূমির ধারে দাঁড়াবে? অন্ধকারে তোমার চোখে জোর লাগবে কিন্তু। ওপাশের বন আঁতিপাঁতি করে খুঁজলে হয়তো দেখতে পাবে, ক্রিস পা ছড়িয়ে বসে আছে। কিন্তু, দিনের বেলা ও জলাভূমিতে লুকিয়ে পড়ে। গল্পগুলো না-জানলে খুঁজবে কীভাবে?’

‘একটা কথা জিজ্ঞাসা করব? আপনার কি মনে হয় খুনটা মিস্টার যাদব করতে পারেন?” “শোনো, প্রত্যেকটা লোক পোটেনশিয়াল খুনি, পাগল আর পারভার্ট। কিন্তু, অবিনাশ এটা করেনি। করলে তিন বছর অপেক্ষা করত না।’ আবার কান্না পাচ্ছিল আমার। দীর্ঘ চেষ্টায় চাপা দিতে চাইলেও গলা কেঁপে যাচ্ছিল। ফলত, বিরক্ত হলাম নিজের ওপর। উলটোদিকে মুখ ঘোরালাম। অক্ষয় ঘাঁটাল না। এই ছেলেটা অন্যদের মতো নয়। অনেক কিছু যেন বোঝে। ‘অবিনাশ আমার বন্ধু। ওকে অনেকদিন চিনি। সেই একদিন, আমাকে যেদিন ও তুলে নিয়ে এসেছিল শুঁড়িখানা থেকে—,’ কিন্তু সব কথা সবাইকে বলা যায় না। বাকিটুকু আমি মনে মনে বলব।

বাগানে ফিরে তনয়া অ্যারনের হাত চেপে ধরল, ‘আপনি চিরুনি নিয়ে কী বলছিলেন?’ তনয়া আমার দিকে তাকাচ্ছে। কিন্তু, অ্যারনকে আমি এ বিষয়ে কিছু বলিনি। তনয়ার সঙ্গে ওর চিন্তার সাদৃশ্য দেখে বরং অবাক লাগছে।

‘আপনারও মাথায় এসেছে তার মানে! একটা চিরুনির ওখানে থাকা—অদ্ভুত লাগে আমার। যেন মিসফিট।’ রোদ নেমে এল, ছায়া অধিকার করল বাগান, উত্তুরে আচমকা হাওয়ায় কাঁঠাল গাছের পাতা খড়মড় করল। অ্যারনের বুকের ওপর একটা সানগ্লাস ঝুলছিল, এগিয়ে গিয়ে সেটাকে লালুরামের চোখে পরিয়ে দিল। লালুরামও আপত্তি করল না, সানগ্লাস পরে গটগট হেঁটে যাচ্ছিল বাগানের মুড়ো দিয়ে। ‘ও কী হচ্ছে,’ বলে থেমে গেলাম কারণ আমার ভালো লাগছে না। বাড়িটার একটা দিক তো ভাঙা পড়েছেই। অন্যদিকের সার সার বন্ধ ঘরগুলো এই কারণে খুলতে চাই না। অ্যারন হাত তুলল লালুরামের দিকে, ‘ওখানে চিরুনি থাকা ঠিক এরকম অ্যাবসার্ড।’

‘যা-ই ভাবি না কেন, ঘুরে-ফিরে সেই চিরুনির জায়গায় চলে আসছি আমিও। খচখচ করছে কাল থেকে। আর, একটা ছবি। ঝাপসা, যেন কোথায় দেখেছি।’ ‘কী ছবি?’

‘সেটাই ভালো দেখতে পাচ্ছি না যে। একটা অসংগতি যেন।’ ভুরু কুঁচকে ঠোঁট কামড়াল তনয়া। তারপর নিশ্বাস ফেলল, ‘জোর করে মনে করা যায় না। কোভিড হবার পর এমনিও বোকা হয়ে গেছি।’

‘আপনাদের কাছে এগুলোর কিছুই অ্যাবসার্ড লাগে না, তাই না? এই যে, কোমর বেঁধে কেস সমাধান করা, সেটা নিয়ে দিনরাত পড়ে থাকা, এই সমস্ত কিছু?’ অ্যারন প্রশ্ন করল তনয়াকে।

‘অ্যাবসার্ড কেন লাগবে?”

‘কারণ এই কমিউনিটি, আমরা, মানুষ হিসেবে আমাদের ক্ষয়, এগুলোর কিছুই আকৃষ্ট করছে না আপনাকে। বরং, একটা সাধারণ রহস্য ও তার সমাধানের পেছনে এত শক্তিক্ষয় করছেন।’

‘তোমার ভাইপো আসলে পেছনপাকা।’ সেদিন রাত্রে আমার সামনে, গ্র্যানি স্কয়ার তুলতে গিয়ে তনয়া বলেছিল। কিন্তু, অ্যারন ছোটোবেলায় বোকা ছিল। খেলাধুলোয় কাঁচা বলে এডওয়ার্ড রাগ করত। বই মুখে বসে থাকত সারাদিন। এখানে এলে আমার পেছন পেছন ঘুরত। আমার সেসব দিন মনে পড়ে যখন রাত্রিবেলা বিছানায় কান পেতে আমি অ্যারনকে বলতাম, “ক্রিসের পায়ের আওয়াজ শুনছিস?’ চোখ বুজে বালিশে মুখ গুঁজত, ও কিন্তু ভয় পেত না। সত্যি করে কীভাবে দাদাকে শুনতে পাবে, অ্যারন আমাকে জিজ্ঞাসা করত খালি। তখন ওকে নিয়ে জানালার কাছে দাঁড়াতাম। শূন্যমাঠের দিকে হাত বাড়িয়ে খুঁজতে বলেছি তন্নতন্ন, কিন্তু কিছুই না—একটা পাখিও ছিল না কোথাও। ওর মাথা ক্রিসের অনুপস্থিতিতে ভরে আছে, আর সেটা ওকে ভয় পাওয়ায় না। আমার মাথাও তাই। শুনতে পাই ক্রিস হাসছে, তনয়া, আমি তাকে হাসতে দিই কারণ আমি জানি ক্রিস নেই। হিমঝরা রাতে জানালা দিয়ে আমি দেখি জলাভূমির ওপর দিয়ে ছুটে যাচ্ছে। কিন্তু, আমি তো ভালো করেই জানি এগুলো আমার চোখের ভুল, অন্যদের কাছে স্বীকার না- করলেও। আমাদের টাউনের মানুষ খুব অনুপস্থিত হয়, তনয়া। তাই তাদের গলার স্বর, চকিত কথা, অথবা অস্পষ্ট হাসিকে তুমি গ্রীষ্মের শুনশান দুপুরে শুনতে পাবে, যেন ওরা কোনো পোড়োকটেজের ফোকর দিয়ে বেরিয়ে আসছে। ওরা কেউ নেই এখানে, তবু ওদের ফিসফিসানিতে আমাদের লোকালয় ভরে আছে। এই সমস্ত ফিসফিসানিকে শুয়োরের পালের ভেতর আমরা ঢোকাতে পারি না, তনয়া। ঢোকালে হয়তো হ্রদের ঢাল দিয়ে দৌড়ে যেত ওরা। ওরা জলে ডুবে মরত। তখন নীরব হত আমাদের টাউন।

‘তুমি কি ওকে অপছন্দ করো?’

‘না। তেমনভাবে চিনলাম কোথায়? তবে, ওর চিন্তাগুলো তোমার মাথা ঘেঁটে দেবার জন্য যথেষ্ট। ও আমার সঙ্গে ঘুরতে চাইছে। মুখে দেখাচ্ছে এই রহস্য বিষয়ে ইন্টারেস্ট নেই, কিন্তু ওর তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা তুমিও দেখেছ। চিরুনির কথা ওর মুখে শুনে আমি স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিলাম, জানো! ভেবেছিলাম তুমি ওকে বলেছ। যাই হোক, আমি একটামাত্র শর্তে ওকে সঙ্গে রাখতে পারি। মুখ বন্ধ রাখতে হবে, যতক্ষণ না আমি কিছু জিজ্ঞাসা করি। ধ্যাত!” গ্র্যানি স্কোয়ারের বুনোট খুলে গিয়েছিল, বিরক্ত তনয়া কোলের ওপর উল-কাঁটা ফেলে বলল, ‘জলাভূমির ওপর দিয়ে ওপাশের জঙ্গলে যাবার রাস্তা নেই? নাকি, ঘুরে যেতে হয়?’

‘ভেতর দিয়ে আছে, ঘাসবনে ঢাকা, কিন্তু স্থানীয়রা জানে।’ বাবা তো ওখান দিয়েই হেঁটে গিয়েছিল। তনয়া বলল সে দিনের আলোয় একবার—ক্রিস যদি সত্যিই কোনোভাবে ওদিক দিয়ে বেরিয়ে যায়, আমি জানি অসম্ভব, তবু একবার গোটা রাস্তাটুকু যাচাই করতে চায়।

পায়ের কাছে ফোঁস আওয়াজে নীচু হয়ে লালুরামের মাথায় হাত বোলাতে হল। সে এখনও কালো চশমা পরে ঘুরছে। অ্যারন হাত ঘুরিয়ে দেখাল চারপাশ, ‘এই সব কিছু, এই ভূতুড়ে শহর, এরা কেউ বেঁচে নেই। আমাদের কারোরই বেঁচে থাকার কথা ছিল না। উচিত নয়।’

‘উচিত নয়?” তনয়া বিরক্তস্বরে বলল।

.

‘না। মা-কে দেখুন। এভাবে গুমরে গুমরে সারাজীবন বাঁচার বদলে অনেক আগেই আত্মহত্যা করা উচিত ছিল না কি? আমরা আসলে, আমাদের এই হয়ে-ওঠা, পুরোটার একমাত্র যুক্তিগ্রাহ্য পরিণতি যদি হয় এই সাফারিং, সেটাই বলে দেয় আমাদের ইতিহাস কতটা প্রবঞ্চক ছিল।’

পিঠের কাছে আওয়াজটা তবু বেড়েই চলেছে। নির্ঘাত সাপ। আমার গলা শুকিয়ে গেছে, দম আটকে মরে যাব কি এবার? এত কালো, একটুও কিচ্ছু দেখতে পাচ্ছি না। আমাকে কামড়ে চলে গেলেও দেখতে পাব না। নাক চুলকোচ্ছে, কিন্তু হাত তুললেই কামড়ায় যদি? টপ করে একফোঁটা ঘাম মাটিতে পড়ল। আমি সাবধানে পায়ের বুড়ো আঙুল দিয়ে ঘষে দিলাম। ঘামের গন্ধে ওরা বেশি আসে।

অ্যারনের হাত থেকে ফ্লাস্কটা ছুড়ে বাগানের ঝোপে ফেলে দিলাম, দিনরাত মদ গিলে অলক্ষুণে বকছে। ওর হাতে কি কাজকম্ম নেই? এখানে পড়ে আছে কেন? অ্যারন নির্বিকার মুখে ফ্লাস্কটা কুড়িয়ে ছিপি আঁটতে আঁটতে বলল, ‘সাক্ষী থাকব বলে।’ তনয়া অন্যমনস্কভাবে গেটের গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। অ্যারনকে পাত্তা দিলে আমার রাত্রের ঘুম বরবাদ হবে হাবিজাবি চিন্তায়। তনয়ার কাছে গেলাম, ওর মাথায় কিছু এল কি না জানতে।

বুকের ওপর কান পাতলে যে কেউ এখন দুম দুম ঘণ্টা বাজাবার আওয়াজ পাবে। আমি তো কাঁপতে চাই না, তবু কেন—আমি ভয় পাব না, আমি বড়ো হয়ে গেছি। অন্ধকারকে ভয় পায় এডওয়ার্ড, ও ন্যাপি ভিজিয়ে দেয় আর ভ্যাঁ ভ্যাঁ কাঁদে। আমি কেন পাব, আমি তো ভালো! তবু কী অন্ধকার, পেছনে সড়সড় আওয়াজ—আমাকে কি দেখছে এখন? কুচি কুচি চোখ, টুনি বাল্ বের মতো জ্বলে-নেভে, ধারওলা দাঁত, ছুঁচের মতো, খুব রেগে যাচ্ছে, আর করব না প্রমিস –

‘এত সহজে? আমি শার্লক হোমস না। তবে ওই যে, কী-একটা যেন খচখচ করছে। একটা ছবি, মনে আসছে কিন্তু চোখে আসছে না। একটা অসংগতি।’ মাথা ঝুঁকিয়ে ভাবল, তারপর বড়ো নিশ্বাস ফেলে বলল, ‘আপাতত চলো।’

‘কোথায়?’

‘রেভারেন্ড গরম্যান। ‘

.

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *