নৈশ অপেরা – ২১

২১

আর সমুদ্র আপনার মধ্যবর্তী মৃতগণকে সমর্পণ করিল, এবং মৃত্যু ও পাতাল আপনাদের মধ্যবর্তী মৃতগণকে সমর্পণ করিল, এবং তাহারা প্রত্যেকে আপন আপন কার্য্যানুসারে বিচারিত হইল।

– Revelation । 20:13

.

পরদিন দুপুর বেলা ডেগাডেগি নদীর ধারে বসে অ্যারন আমাকে জানাল, সে অবিনাশের সঙ্গে দেখা করেছে। পুলিশ কোনো অজ্ঞাত কারণে এখনও অবিনাশকে গ্রেপ্তার করেনি। অ্যারনকে দেখে অবিনাশ ঘরে ঢুকে গিয়েছিলেন। বেরোননি অনেকক্ষণ। অ্যারন বারান্দায় বসে ঝিমোচ্ছিল। প্রায় আধঘণ্টা পর অবিনাশ এসে অ্যারনের পাশে বসেন, কিন্তু কথা বলেন না। অ্যারন যখন তাঁকে জানায় যে, তারা কেউ তাঁকে অপরাধী ভাবে না, তখনও অবিনাশ নিশ্চুপ থাকেন। তারপর অ্যারন আমার আসার খবর দেয়। অবিনাশের ঠোঁট কাঁপে। অ্যারনের মনে হয়েছিল যে, অবিনাশের গলার কাছে অনেক কথা জড়ো হয়েছিল। তাঁর বুক ওঠা-নামা করছিল আবেগে। তিনি অ্যারনের দিকে তাকিয়ে কিছু বলতে যান, কিন্তু থেমে গিয়ে নীরবে মাথা নাড়েন। অ্যারন তাঁকে জিজ্ঞাসা করে, তিনি জোহার হালে-তে কেন ঘুরতেন। অবিনাশ বিড়বিড় করে উত্তর দেন ‘তোমরা বুঝবে না।’ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে অ্যারন বেরিয়ে যায়। সে পিছু ফিরে দেখেছিল, অবিনাশ চোখ বন্ধ করে মাথা ঝুঁকিয়ে বসে। তাঁর চোখ দিয়ে অশ্রু গড়াচ্ছিল কি না সে-বিষয়ে সিদ্ধান্তে আসা যায়নি।

সকালে আমি সমর দোসাদের খোঁজে গিয়েছিলাম, কিন্তু তাঁকে পাইনি। এদিকওদিক ঘুরে স্থানীয় মানুষের সঙ্গে কথা বললাম। দেখলাম টাউনটায় পর পর ভাঙা কটেজ। কোথাও কোথাও খাপছাড়াভাবে সুদৃশ্য গেস্টহাউস গজিয়েছে। বাগানে ফোয়ারা। খুঁড়ে রাখা খাঁ-খাঁ সুইমিং পুল ততোধিক বেমানান। দাঁত খিঁচিয়ে হাসছে রংবেরঙের সাইনবোর্ডের অভ্যর্থনা। তাদের পিঠের ওপর জঙ্গল ঝাঁপিয়ে পড়ছে। কিছুতেই যেন এই টাউনকে তারা পালটাতে দেবে না। তখন অ্যারনের ফোন এল। বলল, ডেগাডেগি নদীর ধারে দেখা করবে। ওখান থেকে আমরা যাব রেভারেন্ড গরম্যানের কাছে। তিরতিরে ক্ষীণতোয়া নদীতে পায়ের পাতা ভেজানোর বেশি জল ওঠে না। অদ্ভুত আকৃতির নানা পাথর ছড়ানো, তাদের পাহারা দিচ্ছে দুই পাশের অরণ্য। ব্রিজের ওপর দিয়ে ঝমঝম শব্দে মেল ট্রেন গেলে নদীর জলে তার নিখুঁত প্রতিবিম্ব পড়ে। ব্রিজের একটা জায়গায় চওড়া, সেখানে পা ঝুলিয়ে বসা যায়। গিয়ে দেখি অ্যারন বসে আছে নদীতে মুখ ঝুঁকিয়ে। আমার পায়ের শব্দে মুখ তুলে বলল, ‘বাবাকে এখানে শেষবার দেখা গিয়েছিল। সন্ধেবেলা ব্রিজের ধার দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল, দেখেছে মনীশ ভকত।’

‘আচ্ছা, জেনিফারের সেই পাগলি বোনঝি আছে এখনও? অ্যালিস?’ অ্যারনের পাশে বসলাম।

‘আছে। এখানে-ওখানে দেখতে পাই। পুরোনোদের মধ্যে নেই একমাত্র টমাস অ্যাক্টায়ার। গত বছর জানুয়ারিতে ম্যাসিভ স্ট্রোক—মেরিলকে তার পর মেয়ে নিজের কাছে নিয়ে গেছে। ওদের কটেজ তালাবন্ধ। শুনছি, কটেজটা নাকি ওঁদের মেয়ে বিক্রি করে দেবে। ধানবাদের সেই কোম্পানির কাছে।’

‘সেই কোম্পানি এত ধীরে কাজ করছে কেন? পবন কুমার বা সিং, এরকম কারোর নামে কোম্পানির নাম, তাই না? দিল্লি ফিরে সার্চ করেছিলাম। এরা আগে দুটো মাঝারি মাপের প্রোজেক্ট করেছে। তবে, ঝাড়খন্ড বেল্টের সাংবাদিক মহলে মালিকের সম্পর্কে সুনাম নেই। নানা পলিটিকাল পার্টির হাতে তামাক খেয়েছে। খুনজখমের ইতিহাসও আছে। তার পরে একটা রিয়েল এস্টেট খুলেছে, কিছু কাজও করেছে আগে। অভিজ্ঞতা তো হবার কথা। তিন বছর অনেকটা সময় যা এরা পেয়েছিল। শহরের ভোল বদলে যাবার কথা ছিল।’

‘অতই সহজ? এত বছরের ইতিহাস—তবে তার থেকে বড়ো কথা, পলিটিকাল টেনশন। জমি দখলের বিরুদ্ধে আদিবাসী গোষ্ঠীগুলো আন্দোলনে নেমেছে। রাতুর মহারাজের বংশধরেরা ধড়াদ্ধড় কেস করছে আর এক-একটা বাড়ির হাতবদল পিছিয়ে যাচ্ছে কোর্টের শুনানির চক্করে। বিরোধী পলিটিকাল পার্টিরা ল্যান্ড রেভিনিউ দপ্তরের দুর্নীতি নিয়ে ঝড় তুলছে। সবমিলিয়ে টাউনের সংস্কার বিশ বাঁও জলে।’

‘অ্যাগনেসের ভূত আসলে তোমাদের ঘাড়ে চেপে আছে। কিছুতেই নামবে না। ওটা যেন তোমাদের ইতিহাস, তার যাবতীয় অস্বস্তি এবং গোপনীয়তা নিয়ে – তাকে তোমরা কাঁধ থেকে নামাতে পারো না।’ হালকা গলায় বললাম।

‘কিন্তু, তুমি প্রতিজ্ঞা করেছ তাকে ছিঁড়েখুঁড়ে ভেতরের রহস্যকে বার করে আনবে। যদিও আমি এই তিন বছরে ভাবা ছেড়ে দিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম, কিছু রহস্য অমীমাংসিত থাকা ভালো। আপাতত চলো, যাওয়া যাক।’ উঠে পড়লাম আমরা। বিকেলের আগে বেথেল মিশনে যেতে হবে। সেখান থেকে বেরিয়ে জেনিফারের বাড়ি।

জোহার হালে-র জঙ্গল ঘন হয়েছে। থমথমে নির্জন চার্চ আরেকটু বেশি ভগ্ন। দেওয়াল ফাটিয়ে বেরোনো লতাপাতা আর বটের চারা আগেও ছিল। নতুনের মধ্যে যা প্রথমে চোখে পড়ল, ডান পাশের দেওয়াল পড়ে গেছে। সেই শূন্যস্থানে ঝোপঝাড়। এই ঘরটা আগে ভাড়ার হিসেবে ব্যবহৃত হত। চার্চের উঠোন তিন বছর আগে খোলামেলা দেখেছিলাম, এখন আগাছার সাম্রাজ্য। মূল ভবনে ঢুকতে হলে ঝোপ সরিয়ে এগোতে হবে। দেখলাম, মূল ভবন মোটামুটি অক্ষত, তবে দেওয়ালে অজস্র ফাটল। মাত্র চল্লিশ বছরে স্থাপত্য এত ভেঙেচুরে যায়?

ভেতরে ঢুকব, তার আগে চারপাশ ঘুরে দেখছিলাম। এই জায়গাটায় এডওয়ার্ড ব্রাউনের দেহ পড়েছিল। এখন রোদে জ্বলা ঘাস। বাদামি মাটি থেকে অবসন্ন ভাপ উঠছে। জঙ্গল অল্প কাঁপে। মনে হয় বিভ্রম, রৌদ্রছায়ার কারুকার্য। এডওয়ার্ডকে কি গুলি করা হয়েছিল এখানেই? এরকম অজস্র গল্প পেটে লুকিয়ে জোহার হালে বুড়ো হয়। বুড়ো পলাশের কোটর অন্ধচোখে আমার দিকে তাকিয়ে। এখানেই আমার পায়ের কাছে কেউ ছুড়ে দিয়েছিল একটা পুতুলের কবন্ধ। হাঁ করে ভাঙা দেওয়ালের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে গিয়ে আমার মনে হল, এভাবে হাজার বছর এখানে ঘুরে গেলেও জোহার হালে নিজের রহস্যদের উন্মুক্ত করবে না। অ্যারন আমার কাঁধে হাত রাখলে বড়ো নিশ্বাস ছাড়লাম। ‘ভেতরে চলো।’

রেভারেন্ড আরও জরাজীর্ণ হয়েছেন। হাতের চামড়া কাগজের মতো। মুখে অস্বাস্থ্যকর কালো ছোপ। পরনের জামা ছিঁড়ে গেছে। স্যাঁৎসেঁতে প্রায়ান্ধকার ঘরে নিজের খাটে মাথা ঝুঁকিয়ে বসে ছিলেন। চাদর, বালিশ তেল-চিটচিটে। দেওয়ালের ফাটল বেয়ে পিঁপড়ের দল উঠে যাচ্ছে। চোখে পড়ল, গতরাত্রের খাবারের উচ্ছিষ্ট ছড়িয়ে আছে টেবিলে। ঘরের এককোনায় জল, মেঝে ফাটিয়ে উঠে আসছে। আমাদের সম্ভাষণে রেভারেন্ড মুখ তুললেন না। আমায় চিনতে পারার প্রশ্নই নেই। কিছুক্ষণ চুপচাপ অপেক্ষার পর বললাম, “ক্রিস ও অ্যাগনেসের ব্যাপারে কিছু প্রশ্ন ছিল রেভারেন্ড।’

ধীরে মাথা তুললেন রেভারেন্ড। হলুদ চোখ, ঘুমে-ভেজা। আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আমি সেই চির জীবন্ত, আমি মরেছিলাম, আর দেখো আমি চিরকাল যুগে যুগে জীবিত আছি। মৃত্যু ও পাতালের চাবিগুলি আমি ধরে আছি।”

‘আর্থার কে ছিল? আপনি কি তাকে চিনতেন? কোথায় থাকত সে?’

রেভারেন্ডের গলার পেশি কাটা ব্যাঙের মতো একবার লাফিয়ে উঠল। বর্ণহীন হয়ে গেল তাঁর মুখ। তারপর বললেন, ‘আর্থার। মানবশিশু। ওকে শান্তিতে ঘুমোতে দাও।” ‘আর্থার কে ছিল?’

ফিসফিস করে আমাকে প্রশ্ন করলেন রেভারেন্ড, ‘তুমি কে?’

‘আমি তনয়া। এক্ষুনি পরিচয় দিয়েছি। কলকাতা থেকে এসেছি। আগেও এসেছিলাম, মনে আছে আপনার?’

আতঙ্কিত চোখে আমার দিকে কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে থাকলেন রেভারেন্ড তারপর ঘড়ঘড়ে গলায় চেঁচিয়ে উঠলেন, ‘সন্তাপ! সন্তাপ! পৃথিবীবাসীদের সন্তাপ! কারণ, বাকি তিনজন স্বর্গদূত যখন তূরী বাজাবে তখন সেই সন্তাপ শুরু হবে। শুরু হবে। শুরু হবে।” বার বার ‘শুরু হবে’ বলে যাচ্ছিলেন আর মাথা নাড়াচ্ছিলেন অস্বাভাবিকভাবে। আমি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে দুই পা পিছিয়ে অ্যারনের দিকে তাকালাম। তার ভুরু কুঁচকে গেছে। দরজা ঠেলে মলিন ছাপা শাড়ির এক বয়স্ক মহিলা ঢুকে এলেন। আরতী স্টিভেন। রেভারেন্ডের দেখাশোনা করেন। রেভারেন্ড তখন কাঁপছেন। ঠোঁটের পাশ দিয়ে লালা গড়িয়ে পড়ছে। আরতী অ্যারনের দিকে ভর্ৎসনার চোখে তাকালেন, ‘দুপুর বেলা বাবার ঘুমের সময়। তোমরা জানতে না?’

ঘর থেকে বেরিয়ে আসার সময়েও কানে আসছিল ‘শুরু হবে’। বাইরে বেরিয়ে জঙ্গলের রাস্তায় দু-জন নীরবে দাঁড়িয়ে থাকলাম কিছুক্ষণ। তারপর অ্যারন বলল, ‘আর্থারকে খুঁজে বার করতে হবে। সে হয়তো এখনও বেঁচে আছে। ওই রহস্যের ভেতর একটা সূত্র লুকিয়ে আছে আমি নিশ্চিত। দরকারে টাউনের আর্কাইভ ঘাঁটতে হবে, সেটলারদের নাম থাকবে সেখানে। স্থানীয় পঞ্চায়েত অফিস দিয়ে শুরু করব কাল থেকে। ‘

‘অত কিছু করার আগে আর্থার মরিসির ব্যাপারে খোঁজ চালানো উচিত। সম্ভবত, আর্থারকেই মিন করেছিলেন।’ এই

‘কিন্তু, মানবশিশু—

‘একটামাত্র শব্দের ওপর ভিত্তি করে আর্থার মরিসিকে বাতিল করব? যেখানে অন্য কোনো আর্থার আমাদের হাতে নেই? হয়তো এঁকেই রেভারেন্ড স্নেহভরে মানবশিশু বলে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু, অ্যাগনেস কেন? আর্থার মরিসি কী করেছিলেন?

‘জেনিফার আর্থার আঙ্কল বলে ডেকেছিলেন, তুমি বলেছিলে না? বেঁচে থাকলে হয়তো এক-শোর কাছাকাছি বয়েস হত। মানে, অ্যাগনেস যখন নিখোঁজ হয়, তখনই ষাটের ওপর বয়েস। আপাতদৃষ্টিতে, অ্যাগনেসের সঙ্গে কোনো কানেকশন থাকার কথা নয়, তাই না?”

‘তোমার দাদু ভয় পেয়েছেন, সেটা দেখলে? কী এমন রহস্য এই আর্থার, যার কথায় রেভারেন্ডের মতো অজাতশত্রু মানুষ ভয় পাবেন? আর্থার যদি আমাদের খোঁচায়, তাকে অগ্রাহ্য করব না, অ্যারন। আমাকে তিন বছর আগে চিরুনির ব্যাপারটা এরকম ভাবিয়েছিল, মনে পড়ে? শুরুতে কিছুতেই বুঝছিলাম না, একটা ছবি যেন—তোমারও আমার মতো হঠাৎই অন্য কোনো সূত্র ধরে মনে আসবে।’

অ্যারন বিদায় নিল। তাকে একবার রাঁচি যেতে হবে। আমি বললাম এখানে কিছুক্ষণ একা ঘুরতে চাই। কিন্তু, নির্জন জঙ্গল আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে মনে হল। এরকম ভূতুড়ে জায়গায় পরিত্যক্ত চার্চ রেখে কার কী লাভ হচ্ছে? ধানবাদের কোম্পানি কি একেও অধিগ্রহণ করবে?

হঠাৎ খচমচ আওয়াজ শুনে চকিত হয়ে ফিরে তাকালাম। জঙ্গল ঠেলে চার্চের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন, এঁকে আমি চিনি। আলফ্রেড হেমব্রম। চুল আরেকটু পেকেছে, দাড়ি সাদা হয়েছে তাঁর। চশমা ঝুলছে আগের মতো বুকের কাছে।

আমাকে দেখে থমকে দাঁড়িয়ে চশমা পরলেন চোখে। প্রশ্ন করলেন, “আপনি?’

ফিরে এসেছি আবার।’ হাসলাম। ‘কেমন আছেন?’

আলফ্রেড উত্তর দিলেন না। আমাকে কয়েক মুহূর্ত দেখলেন, তারপর এগিয়ে গেলেন আমাকে ফেলে জঙ্গলের দিকে। এতক্ষণ খেয়াল করিনি, একটা শুঁড়িপথের ধারে পাথরের বেঞ্চ করা। সেটা পাহাড়ের গায়ে, তার পাশ দিয়ে তিরতিরে ঝরনা বয়ে যাচ্ছে। আলফ্রেড সেখানে গিয়ে বসলেন। আমি তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে বললাম, “আমি এসেছি, কারণ তিন বছর আগে একটা কাজ অসমাপ্ত রেখে চলে যেতে হয়েছিল।’ কিন্তু, আলফ্রেড এবারও নীরব থাকলেন। চুপচাপ মাথা ঝুঁকিয়ে বসে থাকলেন কয়েক মুহূর্ত। আমি তাঁর পাশে গিয়ে বসলাম। প্রান্তর নীরব। শুধু একটা পোকা কাঠ খেয়ে যাচ্ছে কিরকির করে, আর ঝরনার মৃদুধ্বনি। আগেরবার শুনেছিলাম আলফ্রেড মাঝে মাঝে রেভারেন্ড গরম্যানের খোঁজখবর নিতে আসেন। এখন সেদিকেই যাচ্ছিলেন হয়তো। তাঁকে বললাম, আমরা রেভারেন্ডের কাছ থেকেই আসছি। আলফ্রেড হাসলেন। কিছুটা অপ্রাসঙ্গিকভাবেই যেন বললেন, অনেক বুড়ো হয়েছেন রেভারেন্ড। আরও অনেক বুড়ো, এত বুড়ো মানুষ যেন কোনোদিন কখনো হয়নি।

‘আগেরবার আমার মনে হয়েছিল, আপনি চান না আমি এটা নিয়ে খোঁচাখুঁচি করি।’ ‘আপনি কীসে বিশ্বাস করেন, মিস ভট্টাচার্য? পুরুষকার, নাকি, নিয়তি?’ কিছুক্ষণ পর প্রশ্ন করলেন আলফ্রেড।

‘পৃথিবীতে কোনো প্রস্থানের ওপর আমার অবিমিশ্র আস্থা নেই। কেন এই প্রশ্ন করছেন?” ‘কারণ, আমি দ্বিধাগ্রস্ত। আজকাল বুঝে পাই না, কোনটা ঠিক। আমার স্ত্রী বলে, মানুষের হিসেব এই জীবনে মিটিয়ে দেওয়াই নিয়তি। তার পুরুষকার তার নিয়তিকে নির্ধারিত করে। আমি অত বিশ্বাসী হতে পারি না এই বয়েসে এসে। জন্ম থেকে ধর্মপ্রাণ ক্রিশ্চান আমি, এখন বিশ্বাসচ্যুত হয়েছি কি না জানি না, কিন্তু মনে হয় আমাদের পরিপার্শ্ব আসলে বিশুদ্ধ কেওস। সেখানে কার কাজের পরিণাম কে চোকাবে, আমরা জানি না।’ কিন্তু, আমি তো কেওসেও বিশ্বাস রাখি না। সব কিছুর একটা প্যাটার্ন আছে। তার বাইরে কিছু হয় না সেকথা বলব না, তবে হলে সেটা অস্বাভাবিক। আলফ্রেড যদি জিজ্ঞাসা করেন, অ্যাগনেসের ঘটনায় আমি প্যাটার্ন পেলাম, না, কেওস, তাহলে উত্তর দিতে পারব না।

‘আপনি কতটা জানেন, মিস্টার হেমব্রম? আপনি কি জানেন তার কী হয়েছিল?”

‘নাহ্।’ মাথা নাড়লেন আলফ্রেড। ‘আমার জানা সীমিত।’

‘একটা সতেরো বছরের সাধারণ মেয়ের পরিণতি এত এনিগম্যাটিক কীভাবে হয়?’ আমি তাঁকে জানালাম, অ্যাগনেসের ব্যাপারে আমি কেন আকৃষ্ট হয়েছিলাম। আলফ্রেডের ভুরু কুঁচকে গেল, কিন্তু সহজাত সংযমের কারণে বিস্ময় দেখালেন না। দূর থেকে ঢোলের আওয়াজ আসছে। গয়ারাম ধোপার দলবলের আনন্দ করার সময়। আমি তাঁকে জিজ্ঞাসা করলাম, অ্যাগনেসের ঘনিষ্ঠ বন্ধু কারা ছিল।

‘আমি জানি না।’ আলফ্রেড অন্যমনস্কভাবে বললেন। ‘কেউ ছিল কি? অ্যাগনেস তো কাউকেই ঘনিষ্ঠ হতে দিত না।’ এটা আবার আমার কাছে নতুন একটা দিক। কারণ, অনেকে বলেছে অ্যাগনেসের প্রচুর প্রেমিক ছিল। কথাটা শুনে আলফ্রেড হাসলেন। ‘কতদূর তারা চেনে, অ্যাগনেসকে?’

‘আপনি চিনতেন?’

‘দূর থেকে।’

‘অ্যাগনেসের সেই বয়ফ্রেন্ড, মুন্না, তাকেও চিনতেন?’

আলফ্রেড সচকিত তাকালেন। ‘আপনি পুলিশ ফাইল থেকে বলছেন নিশ্চয়?

‘হ্যাঁ। তারপর থেকে তার নাকি খোঁজ পাওয়া যায়নি।’

কিছুক্ষণ নীরব থেকে আলফ্রেড বললেন, ‘আপনাকে জিজ্ঞাসা করলাম, পুরুষকার এবং নিয়তি, কে সত্য, তার উত্তর দিতে পারলেন না। কিন্তু, দুটোর মধ্যে একটা সাদৃশ্য আছে। দুটোই আমাদের ধ্বংস ডেকে আনে।’ কিন্তু, হেঁয়ালি আমার ভালো লাগে না। নিয়তিতে বিশ্বাস নেই। আলফ্রেড কি কর্মফল জাতীয় কিছু বোঝাতে চাইছেন? তার মানে আবার অতীতের ভেতর লুকিয়ে থাকা পাপ! এই এত এত না-জানা গল্প, এদের ভেতর আসল অ্যাগনেস কোথায়? আলফ্রেড জানালেন তখনকার যারা ছিল, তাঁদের সহপাঠী এবং বন্ধুবান্ধব, তারা বেশিরভাগ গঞ্জ ছেড়ে চলে গিয়েছে। মরেও গিয়েছে দুই-একজন। থেকে গেছেন আলফ্রেড। তিনি যেটুকু জানেন, আমাকে বলবেন কি? আমার প্রশ্নের উত্তরে আলফ্রেড সময় নিচ্ছিলেন। তখন রোদ নিভে আসছিল। সবুজে কালচে ছোপ লেগেছে। ‘আমার জানাটাও নিজের দিক থেকে দেখা। সেটা দিয়ে আপনার লাভ হবে কি?’

‘কেন একথা বলছেন?’

‘কারণ, শিকারির ইতিহাস আর শিকারের ইতিহাস এক নয়। যে অ্যাংলো সাহেবরা এখানে সেটলমেন্ট করলেন এবং দিন ঢলে পড়বার ক্রান্তিকালে আচ্ছন্ন থাকলেন বিগত যুগের মহিমায়, তাঁদের ইতিহাস, আর তাঁদের বন্দুকের গুলিতে যে অসংখ্য বাঘেরা এই জঙ্গলে প্রাণ দিয়েছিল, তাদের ইতিহাস এক দাঁড়িপাল্লায় বসানো যাবে না। আপনারা গঞ্জে যখন আসেন, ইউটোপিয়ার দিনাবসানে রোমান্টিক দুঃখ খুঁজে পান। আপনারা আস্থা রাখেন শিকারির ভাষ্যে কিন্তু, আমাদের মতো মূলনিবাসীরা, যারা বাস্তুচ্যুত হয়েছিলাম একদা, জঙ্গল, জমি, নদীর অধিকার রক্ষার লড়াইতে যারা কোণঠাসা হল রাতুর মহারাজের একটামাত্র সইয়ের কারণে, তারা জানে ইউটোপিয়া কোনোকালে ছিল না। তাই আপনি, যে বারবারা ব্রাউন অথবা ডলোরেস ও’ব্রায়েনের ভাষ্যে আস্থা রেখেছেন, তাঁর কাছে আমার ভাষ্য বিভ্রান্তিকর অথবা প্ররোচনামূলক লাগতে পারে। মনে হতে পারে, আমি মিথ্যে বলছি। কারণ, আপনাদের দেখার চোখ আগে থেকেই নির্মিত।’

‘কথাটা অস্বীকার করছি না। আমি সভ্যতার সন্তান। কিন্তু, তা সত্ত্বেও, অথবা হয়তো সেই কারণেই, আমি জানি যে, ইতিহাস বহুস্তরীয়। কোনো একটা দিকে ভাষ্যের ঢলে পড়াকে আমি তাই সন্দেহের চোখে দেখি। কিন্তু, আমাকে অবাক করল আপনার অন্য একটা কথা। আমি শুনেছিলাম, মানে, কিছু মনে করবেন না, ডলোরেস আপনার খুবই বন্ধু। তবু, তার সম্পর্কেও আপনি অনুযোগ করলেন, মানে –

‘আপনি শুনেছেন ডলোরেসের সঙ্গে আমার প্রেম আছে। তাই তো?’

‘হ্যাঁ।’ আমি সোজাসুজি কথা ভালোবাসি। তাই আলফ্রেডকে পছন্দ হয়ে গেল।

‘আমাদের দেখা, মানে গেজ যাকে বলি, সেটা এত বেশি সোশ্যালি কন্ডিশনড যে, একটা ধাঁচার বাইরে বেরোতে পারি না। কিন্তু, যদি সত্যিই ডলোরেসের সঙ্গে আমার প্রেমও থাকত, তাহলেও আমি এই কথাগুলো বলতাম, কারণ ডলোরেস তো তার শ্রেণি থেকে বিচ্ছিন্ন সত্তা নয়। তার প্রতিটা নিশ্বাস-প্রশ্বাস তার শেকড়ে নিহিত নয় কি?’

‘সেটা আপনিও।’

‘আর সেখানেই অনপনেয় দ্বন্দ্ব।’

‘কীসের দ্বন্দ্ব? আপনাদের সম্পর্ক বিষয়ক ? ”

আলফ্রেড হাসলেন। ‘আপনি যত সহজ করে ভাবছেন, তত সহজ নয়, মিস ভট্টাচার্য।’ ‘মিস্টার হেমব্রম, আপনি অনেক কিছু জানেন। সেই গল্পটা আমার জানা জরুরি। অ্যাগনেসকে আমি চিনতে চাই। এখনও কেন কেউ কেউ অ্যাগনেসের ব্যাপারে খোঁজখবর পছন্দ করছে না, সেটাও জানতে চাই।’

আলফ্রেড ভুরু তুললেন। ‘এখনও মানে ? ‘

আমি বিস্তারে সমর দোসাদের কথা বললাম। বছর পাঁচেক আগে একজন এসে তাঁর কাছে অ্যাগনেসের খোঁজ করেছিল। মনে হচ্ছিল আলফ্রেডকে বিশ্বাস করা যায়। কিন্তু আলফ্রেডের বিস্ময়, যা আশা করেছিলাম, তা হল না। তিনি যেন এটাই আশা করেছিলেন। আমার কথা শেষ হলে দীর্ঘশ্বাস ফেলে চোখ বুজলেন।

‘আপনি কোনো মন্তব্য করলেন না যে?’

‘কারণ, আমার কিছুই বলার নেই। আমি শুধু টেস্টিমনি বেয়ার করে যেতে পারি।’ ‘অ্যাগনেস কে ছিল, মিস্টার হেমব্রম?’

তো?’ ‘আপনাকে তাহলে গল্পটা বলতে হয়। লম্বা গল্প। রাত হয়ে যাবে। শোনার ধৈর্য আছে

‘আমার হাতে আছেটাই-বা কী! এমনকী নিজেকে ব্যস্ত রাখার মতো কাজও নেই। তাই অধৈর্য হওয়া অ্যাফোর্ড করতে পারব না। আমি ছোটো থেকেই গল্প শুনতে ভালোবাসি। বাবা শোনাত।’

‘আমার গল্পটাও সত্যের কত কাছাকাছি যাবে, জানি না। অথবা, এটা দিয়ে অ্যাগনেসের রহস্যের সমাধান হবে কি না। এসব পুরোনো দিনের কথা। ভুলে গেছে সবাই। কে-ই বা অকারণ খোঁড়াখুঁড়ি করে কষ্ট জাগাতে চায়!’

‘কিন্তু, আপনি তো মনে রেখেছেন! তাহলে আমি শুনব।’

তারপর আলফ্রেড আমাকে একটা দীর্ঘ গল্প শোনালেন। শব্দের পর শব্দের নুড়িপাথর গড়িয়ে গিয়ে ভুলে যাওয়া ইতিহাসের অন্তঃশীলাকে উন্মুক্ত করছিল। সন্ধ্যা ছিল মন্থর এবং স্মৃতিরা জীবন্ত হয়ে উঠছিল। আমার মনে হয়েছিল, চাইলে তাদের এখন ছুঁতে পারা যাবে।

.

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *