২৯
তিনি দীপ্তির ন্যায় তোমার ধর্ম্ম, মধ্যাহ্নের ন্যায় তোমার বিচার প্রকাশ করিবেন।
– Psalms 137:6
.
আজ ভোর থেকে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। ঝুপঝুপে জলের সঙ্গে বিষণ্ণ আকাশ ঘিরে ধরেছে গঞ্জকে। মশার ঝাঁক সাম্রাজ্য বিস্তারে এগিয়ে আসছে। গোটা রাত আমি বেথেল মিশন চার্চের অলটারের সামনে বসে ছিলাম। অর্থহীন চোখে তাকিয়ে ছিলাম অন্ধকারে। বহু প্রশ্নের উত্তর পাইনি। তাদের ফেলে কি আমি চলে যেতে পারব? কী হয়েছিল অ্যাগনেসের? ক্রিসকে কোথায় রেখে দিলেন ডলোরেস? ক্রিস কি আদৌ নিহত হয়েছে, নাকি, এখনও বেঁচে আছে? অ্যাগনেসের ছবি কে তুলেছিল? সত্যিই কি পুতুলগুলোকে দেখে বারবারা ক্রিস ভাবত? আমিও এতটা বোকা হয়ে গিয়েছিলাম সেই দিনটায়? নাকি, অন্য সমাধান আছে এর? ডলোরেস কেন আত্মহত্যা করলেন? ইনস্যানিটি প্লি করলে তাঁর শাস্তি হত না। এত বছর আগেকার কেস নিয়ে কেউ ভাবিত নয়। তবু তিনি সে-পথে গেলেন না কেন? আমি কিচ্ছু জানতাম না। একটা সমাধান এত আধাখ্যাচড়া হবার পরে, যেখানে কোনো কিছুই প্রমাণ করার রাস্তা নেই, আমার কী উদ্যাপন করা উচিত ছিল? সাফল্য, না, ব্যর্থতা?
রেভারেন্ডের সঙ্গে দেখা হয়নি। তিনি বেসমেন্টে ঘুমোচ্ছিলেন। ভোরবেলা চার্চ থেকে বেরোলাম। জঙ্গলে ঘেরা জোহার হালের রাস্তা দিয়ে হেঁটে আসার সময়ে আমার মনে হল, অ্যাগনেসের ভূত যদি সত্যিই থাকে, তাহলে তার আশ্রয়ের জন্য জোহার হালে-র থেকে উৎকৃষ্ট স্থান অন্য কিছু নেই। এখানে কয়েকশো বছরের ইতিহাস লুকিয়ে থাকে। এখানে কোনো কোনো কিশোরীর বয়েস বাড়ে না।
স্যাংচুয়ারি আজ নির্জন। লালুরাম জানালায় দাঁড়িয়ে পর্দা চিবোচ্ছিল। আমাকে সে ফিরেও দেখল না। বারবারা বা অ্যারন, ছিল না কেউ। তারা কোথায়, আমি জানি না। ফোন করিনি। অ্যারন ভুল বলেছিল। আমি ওর থেকে বেশি সিনিক, তাই চলে-ফিরে বেড়াচ্ছি। ও কি আমার সামনে আসবে না বলে পালিয়ে গেল? যাবার আগে আমি চাইছিলাম যদি একবার দেখা হত। কিন্তু, থাক! ব্যাগ গুছিয়ে বেরিয়ে এলাম। এভাবেই চলে যাওয়া ভালো। অজ্ঞাতে, চুপচাপ, কারোর মাথাব্যথার কারণ না হয়ে রাঁচির গাড়ি আসার কথা ঘণ্টাখানেকের মধ্যে। একটা জায়গায় যাওয়া বাকি আছে।
চারপাশে জঙ্গল। দূর থেকে চট করে বোঝা যায় না এখানে একটা কটেজ আছে। পাশ দিয়ে চলে গেছে ছোটো খাঁড়ি, এখন শুকনো। টিপটিপে বৃষ্টি মাটি ভাপিয়ে তুলছে। আমার পাশ দিয়ে সড়সড় করে ঝোপের ভেতর একটা সাপ ঢুকে গেল। ছাতিম গাছের মাথা থেকে টপ করে একফোটা জল পড়ল আমার হাতে।
রকির বাবা বারান্দায় চেয়ারে বসে ছিলেন। একমুখ দাড়িগোঁফ আরও পেকেছে। চশমার মোটা কাচে বাষ্প। তাঁর পাশে মাটিতে দুই পায়ে মুখ গুঁজে রকি। ঘাড় তুলল আমাকে দেখে, চকচকে চোখে ঘন ঘন লেজ নাড়তে শুরু করল। তার মনে পড়েছে। তারপর একলাফে চলে এল আমার সামনে। আমার প্যান্ট শুঁকে দুই পা আমার কোমরে তুলে দিল। অনেক বুড়ো হয়েছে রকি। তার নাক দিয়ে ঘড়ঘড় আওয়াজ বেরোচ্ছে। হুটোপাটির পর পা নামিয়ে হাঁফাতে শুরু করল।
রকির বাবা হাসলেন। ‘জানতাম, আপনি আসবেন।’
.
বারান্দায় উঠে তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে আমি বললাম, ‘ডলোরেস আত্মহত্যা করেছেন। কাল রাত্রে। নিজের বাড়িতে।’
রকির বাবা কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থাকলেন। তারপর পাশে রাখা ফ্লাস্ক এগিয়ে দিলেন আমার দিকে। দেখলাম, টেবিলে রাখা কাপ। কফিতে চুমুক দিয়ে স্নায়ু টান টান করছিলাম। পাশের চেয়ারে বসলাম।
‘আপনি জানতেন, আমি আসব?’
‘টাউনে আপনার ফিরে আসার সংবাদ পেয়েছিলাম। তারপর থেকে প্রতি রাত্রে আসতাম রকিকে নিয়ে। অপেক্ষা করতাম।
‘আপনার বাড়ি কোথায়?
‘এখান থেকে অনেকটা দূরে একটা গ্রামের ভেতর, দোতলা কটেজ। আপাতত আমি আর রকি সেখানেই থাকি। সন্ধে হলে মাঝে মাঝে ওকে নিয়ে এখানে আসি। এই জায়গাটায় রকি হাঁটতে ভালোবাসে। আপনি যেমন সন্ধেবেলা এখানে হাঁটতে ভালোবাসতেন।’
‘আমি তো এখানে আসতামই, তাই না? শেষের দিন যেমন এসেছিলাম। আগের বার।’ হাসলেন রকির বাবা। রকি ততক্ষণে আমার পায়ের পাতায় মুখ গুঁজেছে।
মনীষা মারা যাবার পর, থানা থেকে যখন আমি ছাড়া পেয়েছিলাম, রাঁচি থেকে দিল্লির ফ্লাইটের টিকিট কেটেছিলাম। কিন্তু, প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে প্রবল বৃষ্টিতে ভেসে গিয়েছিল রাঁচি। সেদিন প্লেন ছাড়েনি। আমাকে একদিন অপেক্ষা করতে হয়েছিল। সেদিন রাত্রে আমার সঙ্গে দেখা হয়েছিল রকির বাবার। তিনি আমাকে এই কটেজে নিয়ে আসেন। তখন আমি বিপর্যস্ত। গুছিয়ে কথা বলতে পারছিলাম না। আমাকে কফি খাইয়ে, খাবার খাইয়ে অবস্থার সামাল দেন। আমি তাঁকে জানাই, কী ঘটেছে। তখন বৃষ্টি থেমেছিল। রকি বায়না করছিল বাইরে যাবে বলে। রকির বাবা অনুরোধ করেন, আমি কি রকিকে হাঁটিয়ে নিয়ে আসব? আমার ভালোই লেগেছিল। রকির সঙ্গে জঙ্গলের ভেতর ঘুরেছিলাম খানিকটা সময়। রকিও আনন্দে লাফালাফি করছিল। কাঠবেড়ালির পেছনে ছুটতে যাচ্ছিল। ধমক দিতে হচ্ছিল তাকে সামলাতে। ফিরে এসে ড্রয়িং রুমের সোফায় আমি ঘুমিয়ে পড়ি।
যখন রকিকে হাঁটাতে গিয়েছিলাম, আমার হ্যান্ডব্যাগ রেখে গিয়েছিলাম ঘরে। তার ভেতর অ্যাগনেসের ডায়েরির পাতাগুলো ছিল।
‘আপনি কি সেগুলোর ছবি তুলে নিয়েছিলেন? কেন আপনাকে এতগুলো দিন অপেক্ষা করতে হল, মিস্টার কুমার?”
চোখ বুজে অনেকটা সময় নীরব থাকলেন পবন কুমার। ক্লান্ত জোলো বাতাস আমাদের পা ভিজিয়ে দিচ্ছিল। ঘ্যানঘ্যানে বৃষ্টি ঠিক করল, আরও মন দিয়ে পড়বে, যাতে চরাচর ঝাপসা লাগে।
‘আমার পরিচয় কে দিল? আলফ্রেড?’
“তিনি জানেন না আপনি এখানে। কিন্তু, আমার অনুমানশক্তি তেমন দুর্বল নয়। আলফ্রেড একদিন মুন্নার গল্প করেছিলেন। সেদিন থেকেই আপনাকে আমি চিনি। এই গল্পের সমস্ত পাঠকরাই এটা হয়তো বুঝবে, তাই না? আলটিমেটলি আমরা সবাই তো একটা গল্পের ভেতরেই বাস করছি! যদিও আপনার কপালের কাটা দাগ দেখিনি কোনোদিন।’
‘আমি জানতাম না, অ্যাগনেসের ছবি ব্রাউনদের বাড়িতে আছে। আপনি যেদিন খুঁজে পেলেন, সেদিন থেকে আপনার ঠিকুজিকুষ্ঠি সংগ্রহ করেছি। আমার মনে হয়েছিল, পারলে আপনিই পারবেন। তিন বছর পর যেদিন আপনি আবার ফিরে এলেন, সেদিন থেকে জানি, আমাকে খুঁজে বার করবেন। আমি অপেক্ষা করছিলাম।’
‘আমার প্রশ্নের উত্তর দিলেন না। এতগুলো বছর আপনি অপেক্ষা করলেন কেন?
‘আমি আপনাদের মতো পড়াশোনা শিখিনি, মিস ভট্টাচার্য। অ্যাগনেসের ডায়েরির অর্থ নিজে খুঁজে বার করতে পারতাম না। তাও বহুদিন একা একা চেষ্টা করেছি। শেষে বিশেষজ্ঞদের কাছে গেলাম। মাইথোলজি, বাইবেল, ইতিহাস ইত্যাদি বিষয়ে জানেন এমন মানুষ। তাঁরাও একদিনে পারেননি। অনেকদিন ধরে বিভিন্ন লোকজন একটু একটু করে অর্থ উদ্ধার করেছে। আমি নিজেও করেছি কিছুটা।’
‘আমার সেটা প্রশ্ন ছিল না। আমার প্রশ্ন আরও সহজ। বহু বছর আগেই মুন্নাকে ডলোরেস বলেছিল, অ্যাগনেস গর্ভবতী। এডওয়ার্ডের দ্বারা। তাহলে এতদিন পরে ডায়েরিতে নতুন কী পাওয়া যেত যা আপনি আগে জানতেন না?
অবাক চোখে পবন কুমার দেখলেন আমাকে। ‘ডলোরেস আমাকে জানিয়েছিল, অ্যাগনেস গর্ভবতী। কিন্তু, এডওয়ার্ডের নাম নেয়নি তো! অ্যাগনেস নিজের বোনের কাছেও তার সন্তানের বাবার নাম প্রকাশ করেনি। আমি যখন অ্যাগনেসকে জিজ্ঞাসা করতে যাই, ও সব কিছুই অস্বীকার করেছিল।’
দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। আমার আধাখ্যাচড়া সমাধানও পুরোটা ঠিক নয় তাহলে! ডলোরেস তখন এডওয়ার্ডের কথা জানতেন না। কিন্তু, পরে জেনেছেন। কীভাবে? অ্যাগনেসের ডায়েরি পড়ে। যে অর্থ বার করতে আমাদের তিন বছর লেগেছিল, ডলোরেস কয়েক মাসে সেটা বুঝে ফেলেছিলেন। পড়াশোনায় মেধাবী ছিলেন বরাবরই।
অথবা, ডলোরেসকে হয়তো অ্যাগনেস এডওয়ার্ডের ব্যাপারে জানিয়েছিল। কিন্তু, ডলোরেস কোনোও কারণে মুন্নাকে এডওয়ার্ডের নাম বলেননি। হয়তো ভয় পেয়েছিলেন। একবার মুন্নাকে একটা ছেলের ব্যাপারে বলার পর মুন্না তার সঙ্গে মারপিট করেছিল। তারপর থানায় মুন্নার প্রথম অপমান। তাই ডলোরেস এবারে নাম বলতে চাননি।
অথবা, তৃতীয় বিকল্প যেটা, ডলোরেস কখনোই জানতে পারেননি যে, এডওয়ার্ড অ্যাগনেসের সন্তানের বাবা। সেক্ষেত্রে আমার সমাধানের সিংহভাগ বাতিল হয়ে যায়। তাহলে ক্রিসকে ডলোরেস অপহরণ করলেন কেন? দুটো আলাদা অপরাধ? নাকি, ক্রিসের অপহরণের সঙ্গে ডলোরেস আদৌ জড়িতই ছিলেন না?
তিনটে বিকল্পের মধ্যে কোনটা সত্যি, কখনো জানা যাবে না। ডলোরেস কি জানতেন, এডওয়ার্ড আর অ্যাগনেস ভাইবোন? পবন কুমার কি জানেন? ডলোরেসের উন্মাদনার ব্যাপারে তিনি কি অবহিত ছিলেন? নাকি, সত্যিই ডলোরেস সুস্থ হয়ে গিয়েছিলেন? হয়তো, যা করেছেন সবটাই জেনেবুঝে? জিজ্ঞাসা করতে ইচ্ছে করল না। মানুষের বেদনা বাড়ানো আমার পার্টটাইম পেশা নয়।
‘এডওয়ার্ডের কথা আমি যখন জেনেছি, তখনও আমি সময় নিচ্ছিলাম। আমার মনে হচ্ছিল, হয়তো দু-জনের প্রেম ছিল। কিন্তু, তারপর ডায়েরির নানা পাতা থেকে আমরা সবাই, যারা এই ডায়েরি পড়েছি, তারা অনুমান করেছি যে প্রেম নয়, এডওয়ার্ড বলপ্রয়োগ করেছিল অ্যাগনেসের ওপর। তারপরেও তার কিছু হয়নি, কারণ ওরা বড়োলোক। আর অ্যাগনেস—’ পবন কুমারের মুখ বিকৃত হল হালকা। তিনি হাত দিয়ে কপালের চুল সরালেন। সেই প্রথম আমার চোখে ঝলসে উঠল কপালে রাজটিকার মতো ক্ষতচিহ্ন।
‘অ্যাগনেস ছিল সাধারণ বাড়ির। আমার মতো গরিব নয়, তবু গরিব। অন্তত, ওদের কাছে। ওরা সেইরকম লোক, মিস ভট্টাচার্য, যারা আমাদের মানুষ বলে মনে করত না।’
.
‘মাই গড! তার জন্য আপনি ওকে খুন করলেন? তাও মদ খাইয়ে মাতাল করার পর?’ খুন করা এত সোজা, আমার মনে হয়নি এতদিন। কিন্তু পবন কুমারের মতো মানুষদের চিন্তার গতি আমাদের থেকে আলাদা হয় ।
‘আপনি একবার বলেছিলেন, মৃত্যুদণ্ড। অ্যাগনেস মাইনর ছিল।’
‘আমি মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধে। কিন্তু কী শাস্তি উপযুক্ত, আমি সত্যিই জানি না।’
‘আমি এটুকু নিশ্চিত ছিলাম যে, এডওয়ার্ড অ্যাগনেসের মুখ বন্ধ করেছিল। অ্যাগনেসকে সরিয়ে দিয়েছিল বা খুন করেছিল। এতটা মানা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। আপনি জানেন, অ্যাগনেস নিখোঁজ হবার পর পুলিশ আমার কী করেছিল। আজ আমি যা, তার পেছনে সেই ঘটনাগুলোর অবদান কতটা ছিল, মিস ভট্টাচার্য? বিনা দোষে—’ পবন কুমার দাঁতে দাঁত চিপলেন। ‘এর পেছনে মূল দায় যার, সে এতগুলো বছর ঘুরে বেড়াল নির্দ্বিধায়। এর থেকে অনেক কম অপরাধে আমি মানুষকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছি।’
‘কিন্তু, আপনি নিশ্চিত হলেন কী করে?’
‘এডওয়ার্ড কনফেস করেছিল।’
‘কী? অ্যাগনেসকে খুন করেছেন?’
কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর পবন কুমার মাথা নাড়লেন। ‘না। অনেক চেষ্টাতেও সেটা স্বীকার করাতে পারিনি। মৃত্যুর আগে এডওয়ার্ড কনফেস করেছিল, অ্যাগনেসকে সে ধর্ষণ করেছে। তারপর হাত ধুয়ে ফেলে।’
‘চিরুনিটা মনে হয় সেই কিশোরী বয়েসেই ডলোরেস আপনাকে দিয়েছিলেন, যদি আমার অনুমান ঠিক হয়। অ্যাগনেসের চিরুনির সেট থেকে একটা হারিয়ে গিয়েছিল। আপনিই কি ডলোরেসের কাছে চেয়েছিলেন? হয়তো চেয়েছিলেন, অ্যাগনেসের ব্যবহারের একটা কিছু আপনার কাছে রেখে দিতে। নাথিং রং ইন ইট। প্রেমে পড়লে মানুষ স্মৃতিগুলোকে রেখে দিতে চায়। কিন্তু, এতগুলো বছর পেরিয়ে এসে এই চিরুনিকে এডওয়ার্ডের মৃতদেহের নীচে রেখে গেলেন কেন? মানুষকে আবার অ্যাগনেসের কথা মনে করাতে? প্রতিশোধের কথা আঙুল তুলে দেখাতে চেয়েছিলেন?’ পবন কুমার উত্তর দিলেন না। ‘জোহার হালে-তে খুনটা করতে গেলেন কেন? অবশ্য, কেনই-বা নয়!’ অজান্তে দীর্ঘশ্বাস গড়িয়ে গেল আমার বুক দিয়ে। ‘অ্যাগনেসের বয়েস তো জোহার হালে-তেই আটকে পড়ে আছে। এডওয়ার্ড কি স্বীকার করেছেন, অ্যাগনেসকে তিনি বেথেল মিশনের ভেতর ধর্ষণ করেছিলেন?
‘করেছে। এডওয়ার্ড তার আগেও অ্যাগনেসকে অ্যাপ্রোচ করেছিল। অ্যাগনেস অপমান করে। সেদিন রাত্রে গির্জায় কেউ ছিল না। রেভারেন্ড রাঁচি গিয়েছিলেন অধ্যাপনার সূত্রে। অ্যাগনেস অলটারের সামনে চুপচাপ বসে ছিল। কিছু কাজের সূত্রে এডওয়ার্ডকে তার বাবা চার্চে পাঠিয়েছিল। অন্ধকারে অ্যাগনেসকে দেখে সে এগিয়ে এসে তার হাত ধরেছিল। অ্যাগনেস আবার তাকে অপমান করে। তখন এডওয়ার্ড নিজেকে সামলাতে পারেনি। ঝাঁপিয়ে পড়ে অ্যাগনেসের ওপর। তবে, অ্যাগনেসই প্রথম নয়। এডওয়ার্ড আগেও অন্য কয়েকজনের সঙ্গে এরকম করেছে। এগুলোর স্বীকারোক্তি দিয়ে গেছে সে। কিন্তু, সেসব কথা এখন কেউ স্বীকার করবে না, কারণ তারা টাউনে আর থাকে না। থাকলেও লজ্জায় অথবা ভয়ে মুখ খুলত না।’
অ্যাগনেস কেন এডওয়ার্ডকে বার বার প্রত্যাখ্যান করত, পবন কুমার কি জানেন? সম্ভবত না। অ্যাগনেস জানত এডওয়ার্ড তার দাদা। এডওয়ার্ড জানতেন না।
‘ক্রুশবিদ্ধ যিশুর মতো করে এডওয়ার্ডকে ওভাবে সাজানো? আপনাকেও মনে হয় ওভাবেই পুলিশ স্টেশনে টাঙিয়ে অত্যাচার করেছিল, তাই না?” পবন কুমারের ভেতর আগেকার হাসিখুশি রকির বাবাকে আমি খুঁজতে গিয়ে ব্যর্থ হলাম। বৃষ্টির তেজ বাড়ল। সিসে রঙের মেঘ নেমে এল গাছের মাথায়। ছায়াচ্ছন্ন কটেজ অন্ধকার হল। অজস্র ছায়া এবং আক্ষেপ কাটাকুটি খেলায় ছক সাজিয়েছে পবন কুমারের মুখে। ‘এডওয়ার্ডের হত্যা আসলে আপনার কাছে প্রদর্শনী। আপনার ইতিহাস। অ্যাগনেসের ইতিহাস। এগুলোকে সংকেত বানিয়ে আপনি ছুড়েছেন আমাদের মুখে—’
‘উত্তর যদি জানেন সব, তাহলে প্রশ্নটা কী আপনার?’
‘অ্যাবসালোম! অ্যাবসালোম!” অজান্তে আমার মুখ থেকে বেরিয়ে এল। পবন কুমার আমার দিকে তাকালেন, কিন্তু কিছু বললেন না। কয়েক মুহূর্ত পর বললাম, “কিছুই জানি না। বহু অনুমান, তাদের অনেক কিছুই হয়তো ঠিক নয়। অ্যাগনেস যে নিজেকে মেডুসা বলত, ডায়েরি পড়ার আগে আপনি কী করে জানলেন?”
‘ডলোরেসের সামনে অ্যাগনেস কয়েক বার নিজেকে এই নামে ডেকেছিল। ডলোরেস বুঝতে পারেনি। আমাকে বলেছিল।’
‘অ্যাগনেসের কী হয়েছিল শেষমেষ?’
‘এডওয়ার্ড বলেছিল, সে জানে না। আমি তাকে বিশ্বাস করিনি। কী আসে-যায়, ও কী বলল তা নিয়ে? ধর্ষণটাই কি যথেষ্ট অপরাধ ছিল না? আমার এতগুলো বছর ওর জন্য অ্যাগনেস, ওর জন্য—ডলোরেসের আজ এই অবস্থা, ওর জন্য—’ আমার মুখের সামনে মুখ নিয়ে এলেন পবন কুমার। আমি গনগনে ক্রোধের আঁচ পাচ্ছিলাম। পবন কুমারের ঠোঁটের ফাঁক থেকে ধারালো দাঁতের সারি উন্মুক্ত হল। ‘আমি যা করেছি বেশ করেছি, এবং দরকার পড়লে ভবিষ্যতে আবার করব। আমার অনুতাপ নেই, কারণ আমার কোনো নিরাময়ও নেই ।
মাথা নাড়লাম নিজের মনে। ‘এডওয়ার্ড হয়তো সত্যিই বলেছিলেন। অ্যাগনেসের পরিণতি তিনি জানতেন না।’
মুখ সরিয়ে নিশ্বাস ফেললেন পবন কুমার। ‘কিচ্ছু এসে যায় না। তার আগেকার সর্বনাশ কি কম কিছু ছিল? অ্যাগনেসকে আমি ভালোবেসেছিলাম—আজ আপনারা এই কথাগুলোকে হাস্যকর ভাবতে পারেন, ভাবতে পারেন শূন্যগর্ভ।’ তাঁর গলা কেঁপে গেল। নিজেকে সামলালেন চোখ বুজে। বড়ো নিশ্বাস ফেলে বললেন, ‘আমি কী করতে পারতাম? এতদিন পর পুলিশকে গিয়ে বলতাম যে এডওয়ার্ড রেপিস্ট। তাতে কার কী হত?’
‘আলফ্রেড ঠিক বলেছিলেন। আপনাদের বয়েস বাড়েনি। আপনারা সবাই সেই দিনগুলোয় আটকে আছেন।’
‘আপনি এখন কী করবেন? পুলিশের কাছে যাবেন?’
‘জানি না। কী হবে গিয়ে? আপনি জানেন, আমিও জানি, পুলিশ আপনার টিকি ছুঁতে পারবে না। গ্রেপ্তার হওয়া আপনার কাছে জলভাত। আগেও হয়েছেন। এবারে হলেও দুই ঘণ্টায় বেরিয়ে আসবেন।’
‘সেটাই কি সব? ফলের কথা ভেবে আপনি কাজ করেন তাহলে?” আমি নিরুত্তর
থাকলাম। ‘সেটাই সব নয়। আপনি ভেতরে ভেতরে জানেন, আমি ঠিক কাজ করেছি।’ ‘না। আমি এতটা নিশ্চিত নই। কারণ, আপনি শুধুমাত্র সন্দেহের বশে একজনকে হত্যা করেছেন—’ ,
‘সন্দেহ নয়। আবার বলছি।’ তীব্রস্বরে বললেন পবন কুমার।
‘অ্যাগনেসের কী হয়েছিল আপনি জানেন?
‘এডওয়ার্ড ওকে খুন করেছিল।’
‘কোনো প্রমাণ নেই। ‘
‘তাহলে আপনি পুলিশের কাছে যাচ্ছেন না কেন? কেন আমার কথা বলছেন না?” ‘কারণ, আমি ক্লান্ত। চিরাচরিত এই অপরাধ-অপরাধী, প্রতিশোধ নেবার এই অধ্যায়, আমি এগুলোর সাক্ষী থাকতে চাই না। আমি জানি, এর কোনো শেষ নেই। আমি চলে যাচ্ছি এখান থেকে, আর বাকিটা আপনার বিবেকের ওপর ছেড়ে দিচ্ছি।’
অবিশ্বাসের চোখে আমার দিকে তাকালেন পবন কুমার। ‘আমার বিবেক! আপনি আশা করেন আমি নিজে পুলিশের কাছে যাব? আমাকে পুলিশ যা করেছিল তার পরেও? আমি যাব না, মিস ভট্টাচার্য। তার বদলে আমি একটার পর একটা কটেজ কিনব আর ভাঙব। পালটে দেব এই গঞ্জের ইতিহাস। শুধুমাত্র ভাঙব না স্যাংচুয়ারি। ওটাকে একটা দগদগে ঘা একটা বিশ্রী দুঃস্বপ্নের মতো ওখানেই আমি রেখে দেব, যাতে মানুষ যতবার দেখে, হাত তুলে বলে “খুনির বাড়ি”। ওই মানুষগুলোকে, ওই বড়োলোক, সমাজের মাথা সবাই যারা বেঁচে আছে, তারা ওই ধ্বংসস্তূপের ভেতর বেঁচে থাকবে। মানুষের অভিশাপ, করুণা এবং বিস্মৃতি নিয়ে ওরা বাঁচবে। ওই বাড়ি ও জলাভূমি, সারাজীবন, যখন আমরা কেউ থাকব না তখনও অভিশাপের মতো থাকবে। আর, তাদের ঘিরে গড়ে উঠবে নতুন টাউন। নতুন ইতিহাস।’
কয়েক মুহূর্ত তাঁর দিকে তাকিয়ে থাকলাম। কষ্ট, রাগ, মায়া, ঘৃণা, কী হচ্ছিল আমার ভেতর, জানি না। কিন্তু, পবন কুমারকে অ্যাগনেসের থেকে সেই মুহূর্তে কম অসহায় লাগছিল না। নিজস্ব সিংহাসনে বসে গর্জন করতে থাকা এক বৃদ্ধ দৈত্য, যাঁর সময় শেষ হবে। এই মুহূর্তে ভয়ংকর একা ওই দৈত্য, একটা বুড়ো কুকুর বাদে যার কোনো সঙ্গী নেই। সে কী করতে চলেছে, তা এতই তুচ্ছ আমার কাছে যে কোনো বিভীষিকার অনুভূতি এল না। আমি চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়লাম। গাড়ি চলে এসেছে। ফোন এসেছিল আমার কাছে, কেটে দিয়েছি। বহু প্রশ্নের উত্তর আমি পাইনি, সেগুলো নিয়ে আমাকে বাঁচতে হবে। আমাকে ঘুমিয়ে পড়তে হবে নিজের অসার্থকতার ভেতর, যার দরজা খুলে কোনো পবন কুমার সান্ত্বনার জাদুকাঠি নিয়ে ঢুকতে পারবে না।
রকি কয়েক পা এসেছিল আমার পেছন পেছন। একটা ঝোপের ধারে দাঁড়িয়ে তাকে বললাম, ‘এবার ফিরে যাও।’ বুড়ো রকি সেখানেই দাঁড়িয়ে পড়ল। সে সজল চোখে তাকিয়ে ছিল। ঝুঁকে তার মাথায় হাত বোলালে ভিজে নাক ঘষে দিল আমার হাতে। মুখ তুলে দেখলাম, দূরে কটেজে একা বসে আছেন, একইভাবে, রকির বাবা। তাঁর অপরিত্রাণ, তাঁর অপরাধের থেকে কম নয়।
.
