নৈশ অপেরা – ১১

১১

তুমি অপবাদকারী হইয়া আপন লোকদের মধ্যে ইতস্ততঃ ভ্রমণ করিও না, এবং তোমার প্রতিবাসীর রক্তপাতের জন্য উঠিয়া দাঁড়াইও না ; আমি সদাপ্রভু।

– Leviticus | 19:16

.

একটা ঝুলজমা ঘর, আর টেবিলের ওপর ধুলো জমে ছিল। সেখানে মাদার ডেয়ারির কার্ড, ওষুধের ছেঁড়া স্ট্রিপ, জলের খালি বোতল, মিষ্টির প্যাকেট, অকেজো পালস অক্সিমিটার। দেওয়ালে ঝোলানো ক্যালেন্ডারের পাতা ছিঁড়ে ঝুলছিল। আমি যখন একটা জানালা খুলে দিলাম, তখন শুকনো হাওয়া ঢুকে ফড়ফড় করেছিল ছেঁড়া অংশটা। ফ্রিজের দরজা খুলে দেখলাম খাঁ-খাঁ মরুভূমি। দীর্ঘদিন সুইচড অফ থাকায় ভেতরে সবুজ ফাঙ্গাস জমেছে। সোফায় বসেই আমি উঠে পড়েছিলাম, কারণ ধুলোর দল ঘর আচ্ছন্ন করেছিল। দেওয়ালে হাত রাখলে হিম লাগে। আমি তাদের ফেলে এগিয়ে গেলাম। লাগোয়া বন্ধ দরজার গায়ে আমি কান পেতেছিলাম, ওপারের জমাট নৈঃশব্দ্য ফেটে পড়ছিল সমুদ্রগর্জনের মতো। ওভাবে কতক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলাম জানি না। কিন্তু, একসময়ে আমি দরজা ঠেললাম। তখন বুঝলাম, যাকে আমি নৈঃশব্দ্য ভেবেছিলাম তা অজস্র ফিসফিসানি জুড়ে তৈরি হয়েছিল। সেগুলো নেমে আসছিল দেওয়ালের ফাঁকফোকর বেয়ে। সেগুলো ছিল চুঁইয়ে আসা মানুষের কণ্ঠ। কিন্তু, তাদের অর্থ বুঝতে পারছিলাম না। অন্ধকার ঘরের দেওয়ালে পিঠ দিয়ে দাঁড়ালে অর্থহীন গুঞ্জনগুলো একে অন্যের সঙ্গে যুক্ত হয়ে নীরবতা বানাচ্ছিল, ঠিক যেন একটা জঙ্গলের ভেতর, যেখানে একটাও গাছ নেই, তবু তুমি পাতাদের মর্মরধ্বনি শুনতে পাবে, দেখবে অনেক ছায়া, গাছ, ঝোপঝাড় আর জ্যোৎস্নারাত্রের হাওয়াতে বাঁশবনের মাথা দোলানো, যারা সবাই তোমার চারপাশে একটা জঙ্গল বানাবে। ঘরে ছিল বিছানা, বালিশ, চাদর, একপাশে গুটিয়ে রাখা মশারি। একটা টেবিল যার ওপর কিচ্ছু রাখা ছিল না। ন্যাড়া চেয়ার, তার একটা পা ভাঙা ছিল।

অন্ধকারে চোখ সইয়ে নিতে গিয়ে বুঝেছি, খাটের ওপর কেউ শুয়ে। আমি তখন তার দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। তার ওপর ঝোঁকাতে চাইছি নিজের মুখ। আমি বুঝতে পারছি, কেউ নিষেধ করছে আমাকে। তাকে আমি দেখতে পাচ্ছিলাম না। কিন্তু, বিছানার লোকটা কে ছিল আমি জানতাম। ঘরে ঢোকার আগে থেকেই যেন জানতাম। সেই বিছানা রাখা ছিল একটা জঙ্গলের ভেতর, যার অজস্র সুড়ঙ্গ আর গলিঘুঁজিগুলো একটা গোলকধাঁধা বানিয়েছিল। মরা আমগাছের নীচে সেই খাট শোয়ানো ছিল, তার মাথার কাছে রাখা ছিল ফ্রিজ। সেটা যদিও কাজ করত না, কারণ জঙ্গলের ভেতর ইলেকট্রিক লাইন ছিল না, কিন্তু মাঝে মাঝে ফ্রিজটার ভেতর থেকে অস্পষ্ট নড়াচড়া অথবা কচিগলায় কান্নার আওয়াজ পেতাম। কখনো গোঁ গোঁ শব্দে ফ্রিজটা নড়ত, যেন ভেতরের মানুষজন বাইরে আসার জন্য ঠেলাঠেলি লাগিয়েছে। সারাদিন টিপটিপ বৃষ্টি পড়ত। স্যাঁৎসেঁতে থাকত জঙ্গল। মশাদের দল ছুটে আসত। তখন আমি দেখলাম, খাটের নীচে একটা পুতুল পড়ে। তার মাথা ভাঙা, শুধু ধড়। আমি অস্থির হয়ে মুন্ডু খুঁজতে চাইলাম। নীচু হয়ে খাটের তলা দেখলাম। টেবিলের দিকে গেলাম কিন্তু সেটা ন্যাড়ামাথা ছিল। অন্ধকারে চোখ চালাতে অসুবিধে হচ্ছিল যখন, আমি বিরক্ত হয়ে ভাবলাম, গোল্লায় যাক। আমি আবার ফিরে এলাম। মাথার ওপর আকাশ দেখা যেত না, কারণ ন্যাড়া আমগাছের ডাল ছাড়িয়ে আরও ওপরে সব ধোঁয়া কিন্তু, কোথা থেকে ধোঁয়াটা আসছিল আমি বুঝিনি। বৃষ্টির ফোটাগুলো সেই ধোঁয়ার ভেতর থেকে নেমে আসছিল বলে সেগুলো গরম ছিল। তাদের গায়ে লেগে ছিল পোড়া গন্ধ। খাটের চারপাশে ফোঁটাগুলো পড়ে পড়ে ছোটো-বড়ো গর্ত তৈরি করেছিল। সেখানকার মাটি এত নরম ও আলগা ছিল যে, আমি বুঝতে পারছিলাম, খাটটা ধীরে ধীরে গভীরে ঢুকে যাচ্ছে। আমার হাত থেকে কাদামাখা পুতুলটার ধড় নীচে পড়ে গেল—

অনেকদূর হেঁটে আমি সেই জায়গায় পৌঁছোলাম যেখানে রকিদের সঙ্গে দেখা হয়েছিল। ধূসর গাছের দল রাস্তাকে ছায়াচ্ছন্ন রেখেছে, মিঠে হাওয়াতে মহুয়ার গন্ধে ঝিম ধরে। আশেপাশে কিছু নেই। যতদূর চোখ যায় জনহীন। ভনভনে মাছির দলের কুচকাওয়াজ বাদ দিলে অন্য শব্দও নেই। মরা হেমন্তের গাছ, হলুদ আলোয় নতমুখ যারা। পিচরাস্তার গায়ে অজস্র খানাখন্দ। কয়েক মিনিট পেরিয়ে রাস্তার মোড় ঘুরলে পর পর কটেজগুলো পড়ে। এখানে কিছু মানুষজন আছে যারা মূলত মিস্ত্রিমজুর। তারা কটেজ ভাঙার কাজ চালাচ্ছে। গেটের সামনে হলুদ প্ল্যাকার্ডে লেখা পি কে রিয়ালটর্স। অদূরে আরও দুই-একটা কটেজ ঝোপজঙ্গলে ঢাকা।ধানবাদের রিয়েল এস্টেট তাদের এখনও কিনতে পারেনি। তারাও কি পেটের ভেতর লুকিয়ে রেখেছে কোনো হারানো কিশোরীর চিঠি?

তখন চেনা গলায় নিজের নাম শুনে বুঝলাম, আমাকে কেউ অনেকক্ষণ ডাকছে, কিন্তু খেয়াল করিনি। চোখে পড়ল, রাস্তার অপর প্রান্তে ছড়ানো জায়গা জুড়ে একটা গথিক প্যাটার্নের বাংলো, যার গায়ে বয়েসের প্রাচীন হিজিবিজি। শেষ দুপুরে বারান্দায় আলো জ্বলছে আর তার নীচে চেয়ারে বসে একলা সিগারেট খাচ্ছেন জেনিফার। বাগান পেরিয়ে তাঁর সামনে দাঁড়ালে ইঙ্গিতে পাশের চেয়ারে বসতে বললেন। পাশে কয়েকটা কমিক্‌সের বই রাখা।

‘পরশু এডওয়ার্ড ওরকম অভদ্রতা করার পর তুমি কি সত্যিই হাত গুটিয়ে নিলে নাকি?” চোখে পড়ল, দরজার ফাঁক দিয়ে সেই মেয়েটার মুখ উঁকি মারছে, যাকে সাদা লংড্রেস পরে টাউনের এখানে-ওখানে প্রায়ই দেখি। হলুদ চকচকে চোখ। গালের একপাশে কালি লেগে। গলায় অ্যাপ্রন। বুঝলাম, বয়েস চল্লিশ পেরিয়েছে অনেক আগে। আমাকে দেখে চিনতে পারল না, ভাবলেশহীন মুখ আকাশ দেখছে। আমি ঠোঁট নেড়ে হ্যালো জানাতে গেলে জেনিফার পিছু ফিরে ধমকালেন ‘জামাকাপড়গুলো ইস্তিরি করতে বললাম যে?’ মুখ দ্রুত অন্তর্হিত হল পর্দার আড়ালে।

‘আপনার ভাইঝি? ‘

‘আমার বোন আমার কাঁধে অ্যালিসকে চাপিয়ে সেই কবে ওপারে চলে গেল। তিরিশ বছর কেটে গেল দেখতে দেখতে! আমার হয়েছে যত জ্বালা। আমার নিজের হার্টের অসুখ উত্তেজনা সহ্য হয় না। তার ওপর এই ফাঁকিবাজ অকম্মার ঢেঁকিকে বইতে হচ্ছে। একটা কাজ করতে বললে সাত বাহানা দেখাবে। আর কত দিকে সামলাব! আজকাল নাকি ব্লাডি দেহাতিগুলোর সঙ্গে লুকিয়ে বিড়িও খাচ্ছে। হাউ ডিজগাস্টিং!’

‘খুবই কঠিন জীবন তাহলে আপনার।’ গলায় যতটা পারা যায় দরদ ঢাললাম।

‘আর জীবন! যেতে পারলে বাঁচি। আমার লেট হাজব্যান্ড মাঝে মাঝে আসে, কান্নাকাটি করে, কতদিন আর অপেক্ষা করবে! এদিকে অ্যালিসের জন্য ঈশ্বর আমাকে ফেলে রেখেছেন।’

টুকটাক কথার পর আমি অ্যাগনেসের প্রসঙ্গ তুললাম।

‘অনেকদিন আগের কথা। অ্যাগনেসকে তো লোকে ভুলেই গেছে, সেই দুঃখে ঘুরে বেড়াত। তাকেও দেখি না অনেকদিন। বার দুই আমার ঘরেও এসেছে। কথা বলত না। চুপচাপ বিমর্ষমুখে বসে থাকত। তবে কথা বলাবার উপায় ছিল। কে ওকে মেরেছে জানার তরিকা বার করেছিলাম। তোমাকে ট্রিকটা বলি, গুহ্য কথা পাঁচকান কোরো না। একটা আয়নার চারপাশে গঁদের আটা চিপকে দেবে। তার ওপর মন্ত্রপূত জল ছেটাবে। তারপর একটা দাঁড়কাকের পালক পুড়িয়ে—’

‘আমি লিখে নেব। নাহলে এখন শুনলে মনে থাকবে না।’

‘মোবাইল আছে তো। লেখো না।’ কী জ্বালা! বাধ্য হয়ে বলতে হল ফোন হ্যাং করেছে। ভাগ্যিস সাইলেন্ট ছিল! জেনিফার হতাশ হয়ে আরেকটা সিগারেট জ্বালালেন, মার্ভেল কমিক্‌স তুলে ওলটালেন আনমনে। ‘আমার কী! লোকের সাতে-পাঁচে থাকি না বাবা!’

তারপর খিলখিল করে হেসে উঠলেন। ‘হাওয়ার্ড দ্য ডাক কিডনি লেডিটাকে যা শায়েস্তা করেছে না!’

‘অ্যাগনেস কে ছিল?’

সিগারেটের ছাই ঝাড়তে গিয়ে জেনিফারের খেয়াল হল অ্যাশট্রে নেই, এতক্ষণ মাটিতেই ছাই ঝাড়ছেন। রেগে চিৎকার করলেন অ্যালিসের নাম ধরে। অ্যালিস দৌড়ে এসে অ্যাশট্রে রেখে গেল। তারপর অবাধ্য ঘোড়ার মতো ঘাড় ঝাঁকিয়ে ঢুকে গেল ঘরের ভেতর। ‘অ্যাগনেস ও’ব্রায়েন। ওদের পূর্বপুরুষ আইরিশ ছিল। তবে ওর দাদু, দেরাদুনে পোস্টমাস্টার, স্থানীয় একটা মেয়েকে বিয়ে করে সমাজ থেকে ব্রাত্য হয়। অ্যাগনেসের বাবা মাইকেল এখানে এসেছিল, তা সে ১৯৬৩/৬৪ হবে। জলের দরে একটা কটেজ কিনেছিল বাপের জমানো টাকা দিয়ে। নিজে তো খুব বড়ো কিছু করত না। শিব শর্মার সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে ছোটোখাটো ডাক্তার হয়ে উঠেছিল। ওতেই যা রোজগার, আর নিজেদের ফুল, ফলের বাগান ছিল বড়ো। সেগুলো বেচে একটা টাকা আসত। এই টাউনের অনেক বাড়িতে ওদের ফুল সাপ্লাই হত। তোমার ব্রাউনদের হোটেলও ওদের ফুল দিয়ে সাজানো হত, কারণ অত বড়ো সাইজের আর বিচিত্র রঙের ডালিয়া বলো বা চন্দ্রমল্লিকা কি গোলাপ এই টাউনে অন্য কোনো বাগানে হত না। কিন্তু মাইকেলের বউ মার্গারেট, আমরা ম্যাগি বলে ডাকতাম, তার মাথার গণ্ডগোল প্রথমে ধরা যায়নি। এমনিতে ঠিক আছে, কিন্তু সময়ে অসময়ে চোখ লাল হয়ে উঠত। ঘর অন্ধকার করে কম্বল মুড়ি দিয়ে বসে থাকত। বিড়বিড় করত দুলতে দুলতে। কী রূপ ছিল ম্যাগির! রাস্তা দিয়ে হেঁটে গেলে পুরুষের দল বুকে হাত দিয়ে বসে পড়ত। মাইকেল ডাক্তার বদ্যি দেখিয়েছিল। তারা বলেছিল হাসপাতালে রাখতে। ওরা রাজি হয়নি। ক্যাথলিক ছিল, গির্জার মন্ত্রপুত জল তিনবেলা ম্যাগির গায়ে ছেটাত। তার মধ্যেই অ্যাগনেস হল। তার চার বছর পর ডলোরেস। অ্যাগনেসের ছিল মায়ের রূপ, কিন্তু ওরও মাথায় নাকি গোলমাল ধরা পড়েছিল। অ্যাগনেসের লাল চুল থেকে যেন আগুনের ধোঁয়া বেরোত। চুল ছিল ওর প্রাণ, কেউ চুলে হাত দিলে পাগলের মতো রেগে উঠত। আঁচড়েকামড়ে দিত, নয়তো গাছের মগডালে উঠে বসে থাকত সারাদিন। বসে চেঁচিয়ে ভোজপুরি গান গাইত। বদ ছেলেপুলে তাই ইচ্ছে করে ওর চুলে টান মেরে পালিয়ে যেত আর অ্যাগনেস গালাগালি দিতে দিতে মুখ থেকে থুথু ছেটাত। তারপর উঠে যেত গাছের মাথায়। সবই শোনা কথা অবশ্য- অমন বাঁদর মেয়েকে আমি বাড়ির ত্রিসীমানায় ঘেঁষতে দিইনি। একবার তো মারামারি করে স্কুল থেকে সাসপেন্ডও হয়েছিল। ডলোরেস বলত, দিদির পাগলামি মায়ের ওপর দিয়ে যায়। তার ওপর চরিত্রেরও তো ঠিক-ঠিকানা ছিল না। মাইকেল ছোটোখাটো মানুষ। বউ, মেয়ের জন্য আরও যেন মিশে গিয়েছিল মাটিতে। মাথা নীচু করে হাঁটত। কথা বলত না বিশেষ। ডলোরেস অবশ্য বাধ্য মেয়ে ছিল। পড়াশোনাতেও ভালো। তবে ওরা অন্যদের সঙ্গে তেমন মিশত না। একটেরে হয়ে থাকত।’

‘চরিত্রর কথা কী বললেন? বুঝলাম না।’

‘সবার হাল-হকিকত তো জানি। দুই মেয়েকেই জন্মাতে দেখেছি। অ্যাগনেস একটু বয়েস হতেই নষ্ট হয়ে গেল। শহর জুড়ে ওর প্রেমিক ছিল। ওই বয়েসে কম কেলেঙ্কারি করেনি। ওর রূপ দেখে পটাপট প্রেমে পড়ত ছেলেরা। ঢি ঢি পড়ে যেত ওর কীর্তিকলাপে। এই কারোর বাগানে কোনো ছোকরার সঙ্গে ওকে শুয়ে থাকতে দেখা গেছে। আবার দু-দিন পরেই হয়তো অন্য কেউ দেখল মাঝরাতে ব্যাচমেটের বাড়ি থেকে চুপিসারে সিঁড়ি বেয়ে নামছে জামার বোতাম লাগাতে লাগাতে। মাঝে মাঝেই শুনতাম, অ্যাগনেস এই করেছে, ওই করেছে। ডলোরেস কান্নাকাটি করত চার্চে গিয়ে—দিদির জন্য বাড়িতে অশান্তি হচ্ছে।’ ‘কিন্তু, অ্যাগনেসের হয়েছিলটা কী?’

‘সেটাই তো জানার চেষ্টা করছি এতদিন,’ মনের ভুলে আবার মেঝেতে ছাইঝাড়লেন জেনিফার, ‘কিন্তু অ্যাগনেস তো আসেই না।’

‘আর, অ্যাগনেসের অন্তর্ধান?’

‘১৯৮৬ সালে। একদিন স্কুল থেকে বেরিয়ে বাড়ি ফেরেনি। সারাদিন মেঘলা, কয়েক দিন ধরেই বৃষ্টি পড়ছিল। ছাতা মাথায় ওকে নাকি দেখা গিয়েছিল স্টেশনের অন্য পারে যে কবরখানাটা আছে সেখানে উত্তেজিতভাবে মুন্না নামের একটা দেহাতি ছেলের সঙ্গে ঝগড়া করতে। পরে শুনেছিলাম ছেলেটা ওর বয়ফ্রেন্ড। কে জানে বাবা, কত যে বয়ফ্রেন্ড ছিল! তারপর হাঁটতে হাঁটতে চলে যায় অ্যাগনেস। সেই শেষ। আর কেউ ওকে দেখেনি। ছাতাটা এক সপ্তাহ পরে জোহার হালে-র একটা ঝোপের ভেতর খুঁজে পেয়েছিল পুলিশ। ওরা মুন্নাকে তুলেছিল। মারধরও করেছিল। লাভ হয়নি। এটাই বুঝিনি এতদিন। মুন্নাই কি ওকে খুন করেছিল? নাকি, অন্য কেউ?’

‘অ্যাগনেস খুন হয়েছে নিশ্চিত হচ্ছেন কী করে?’

“আরে বাবা, বললাম তো, আমার কাছে এসেছিল। সিঁয়াসে ডেকে পাইনি। সেদিন রাতে এল, তখন আমি শুয়ে পড়েছি। মাথার কাছে বসল। চোখে জল টলটল করছে। আমি ক্রস আঁকতে গেলে মাথা নেড়ে নিষেধ করল। অ্যাগনেসের পেছনে তিনটে ডাইনি দাঁড়িয়ে, একজনের নাম অলিপর্বা, একজন—’ মাথা ঝুঁকিয়ে মনোযোগী ছাত্রীর মতো শুনছিলাম বলে আমার মুখের ভাব জেনিফারের চোখে পড়ল না। তিনিও এত নিবিষ্ট শ্রোতা সম্ভবত বহুদিন পাননি। ‘হতেই পারে, মুন্না। নেটিভদের পক্ষে কিছু অসম্ভব নয়। আবার ম্যাগিও হতে পারে।

পাগল ছাগল মানুষ, কখন মাথায় ভূত চেপেছে! তবে, অ্যাগনেসের দেহ জোহার হালে-তে পুঁতে দিয়েছে ওর খুনি। বলেছে আমাকে।

‘এই মুন্না এখানে আছে?’

‘নাহ্, ছাড়া পেয়ে সেও তখনই উধাও হয়ে গেছে। তা, ছত্রিশ বছর তো হলই। বেঁচে থাকলে অ্যাগনেসের তিপ্পান্ন হত।’

‘ডলোরেসের সঙ্গে ভাবছি দেখা করব।’ লুকিয়ে লাভ নেই, জেনেই যাবে এমনিতে। ‘কেসটা খুবই ইন্টারেস্টিং লাগছে।”

‘তাহলে ক্রিসের ব্যাপারটা কী হবে?’

‘দেখি। খুব একটা বুঝছি না। আমার বিদ্যেতে কুলোবে না মনে হয়।’

উলটোদিকে লোকটাকে বোকা দেখলে মানুষ খুশি হয়। জেনিফার তৃপ্তমুখে বললেন, ‘ওদের পরিবারটা ওপর থেকে সহজ-সরল লাগে, ভেতরে প্যাঁচ। ওই যে এডওয়ার্ড, ওর অনেক কাদা, ওইজন্যেই গতকাল বাজিয়ে দেখলাম। যার মনে পাপ নেই, সে অত রাগবে না। তুমি জানো, রাঁচিতে ওর মেয়েমানুষ রাখা। সে আবার এক মুসলমান। বারবারা আরেক চিজ। বাবার কানে মন্ত্রণা দিত এডওয়ার্ডের বিরুদ্ধে। এমনি এমনি এডওয়ার্ড রাঁচি চলে যায়নি। এদিকে মনীষার দোষ হল টাকা ওড়ানো। পাগলের মতো খরচ করে। বাজারে এডওয়ার্ডের প্রচুর ধার আছে ওর জন্য।’ সিগারেটে টান দিয়ে বললেন, ‘ক্রিসের ব্যাপারে খোঁজখবর তাহলে বন্ধ রাখছ? অবশ্য, পরশু এডওয়ার্ড যেমন করে বলল— তোমার আর দোষ কী !

.

‘আপনার কী মনে হয়, ক্রিসকে কে এমন কাজ করতে পারে?

চোখের পলক ফেলার আগে জেনিফার বললেন, ‘এ তো সবাই জানে। আগাথা বাচ্চাটাকে সরিয়ে দিয়েছিল।’

‘আগাথা? কিন্তু, পুলিশ তো তেমন কিছু বলেনি?’

‘পুলিশ বোকা পাঁঠা, তাই ধরতে পারেনি। অবিনাশের দৌড় তো জানি! ছোটোবেলায় ল্যাং ল্যাং করে ঘুরত এখানে-ওখানে। খেতে পায় না। পাঁজরার হাড় বেরিয়ে পড়েছে। নাকের শিকনি চিবুক বেয়ে গড়াচ্ছে। সারাগায়ে ঘা। কবচ, তাবিজ পরিয়ে রাখত ওর মা, ব্লাডি সুপারস্টেশাস। কেউ ওকে পাত্তাই দিত না। মুখ চুন করে রাউন্ড দিত। সবাই জানে আগাথার কাজ, কিন্তু কেউ কিছু বলে না। অন্যের পাঁক ঘাঁটার দরকারটাই-বা কী!’

“ঠিকই তো। সবাই যদি আপনার মতো বুঝত! কিন্তু, আগাথা কেন করবেন এরকম?’ আমার মুখের সামনে মুখ ঝুঁকিয়ে খি-খি হাসলেন জেনিফার। সাদাচুল কপালের ওপর নেমে তাঁর মুখ ঢেকে দিল। ‘বাচ্চাটা তো এডওয়ার্ডের ছিল না!’ ‘তাই বুঝি?’

‘নয়তো কী? মনীষার তুতোভাই আর্চি দিল্লিতে বড়ো অফিসার ছিল। ওদের কটেজেই তো এডওয়ার্ডরা রাঁচি থেকে এসে ওঠে। আর্চি মাঝে মাঝেই দিল্লি থেকে আসত। এখন রিটায়ার করার পর পাকাপাকি আস্তানা গেড়েছে। বিয়ের আগে থেকেই দুপুর বেলা ওর কটেজে মনীষা চুপিসারে যেত। আগাথা মানতে পারেনি। কোথাকার রক্ত, নষ্ট জন্ম। সেপাপের প্রমাণ বাড়িতে থাকবে কেন! আগাথাকেও ডেকেছিলাম। দু-বার এসেছিল। বলে গেল, এখন অনুতাপ হয় ওর। না-করলেই পারত। কিন্তু, কোথায় সরিয়ে দিয়েছিল ক্রিসকে, শত চাপাচাপিতেও বলল না। দেখি, আরেকবার ডাকব।’

‘আচ্ছা। দেখুন, কিছু বলেন কী না। ডলোরেসদের বাড়ি কতদূরে?’

‘বাড়ি কেন, স্কুলে যাও। ওখানেই সারাদিন পড়ে থাকে। সে আবার আরেক কাঠি সেয়ানা, জানো তো! পড়াশোনায় ভালো, বাধ্য মেয়ে, কিন্তু দেখতে খারাপ। তাই সবার মনোযোগ যেত দিদির দিকে। ওদের ফুলের বাগান দেখভাল করত সুশান্ত বলে একটা ছেলে। সে গল্প করত, ডলোরেস নাকি বাবার কান ভাঙিয়ে অ্যাগনেসকে মার খাওয়াত। অ্যাগনেস কোন ছেলের সঙ্গে গা ঘষাঘষি করছিল, ডলোরেসের চোখে পড়েছে। ব্যস, দাও বাবাকে বলে! অ্যাগনেস ক্লাস টেস্টে ফেল করেছে, বাবাকে দিয়ে মার খাওয়াও। একবার বাগান থেকে নাকি লাঠি দিয়ে সাপ তুলে এনে অ্যাগনেসের ইস্কুলের বুটের ভেতর ঢুকিয়ে রেখেছিল। এসব আমার জানার কথা নয়। সুশান্ত বলেছে। আমি জেরা করতে মাইকেল নিজেও স্বীকার করেছিল একদিন— সে অ্যাগনেসকে বেশিই মারধর করে। কিন্তু, সারাদিন খাটনির পর বাড়ির ওই গুমরানো পরিবেশে ফিরে যদি মেয়ের কীর্তি শোনে, তারও মেজাজ ঠিক থাকে না। এখন ডলোরেস কেমন হয়েছে, জানি না। এখানে বসে থাকি, রাস্তা দিয়ে ওকে চলে যেতে দেখি, এই অবধিই। তবে স্বভাব কি শোধরায়? ওই যে পরশু যাকে দেখলে, আলফ্রেড হেমব্রম, ওর স্কুলের শিক্ষক। ডলোরেসের সঙ্গে খুব পিরিত। আশনাই চলে নাকি জানি না। বয়েস তো হল অনেক দু-জনেরই, আর কত ঢলানি করবে! আলফ্রেডের গায়ের রং জামের খোসার মতো কালো না? ডলোরেসকে, বলতে নেই, বয়েসকালে দেখতে, শুনতে দিব্য হয়েছিল। ওই ট্রাইবালটার মধ্যে কী যে দেখেছে! সারাক্ষণ একসঙ্গে ঘোরে, অফ টাইমে এখানে-ওখানে বসে গুজগুজ করে। এদিকে নাকি ক্যাথলিক। জানি না বাবা ব্যাপার-স্যাপার। ফ্যামিলিটাই নোংরা।’

‘কিন্তু, ডলোরেস যদি দিদিকে হিংসেই করত, সেও তো খুন করতে পারত?’ জেনিফারের মুখ দেখে মনে হল, সেটা হলেই খুশি হতেন। বিমর্ষমুখে মাথা নাড়লেন, ‘সেদিন ডলোরেস এখানে ছিলই না। মাইকেল ওকে নিয়ে জামশেদপুর গিয়েছিল কী সব জানি চিকিৎসার ব্যাপারে। নাহলে তো একদম শুরুতেই পুলিশ ধরত ওকে।

‘পুলিশ অ্যাগনেসকে খোঁজেনি ?

‘প্রথমদিকে অনেক খুঁজেছে। অ্যাগনেসের বাবা, মা, বন্ধুবান্ধবদের বার বার জেরা করেছে। পায়নি কিছুই। তোমাদের এডওয়ার্ডকেও তো জেরা করেছিল। এদিকে যখন অ্যাগনেস নিখোঁজ হয়, গোটা দুপুর এডওয়ার্ড নিজের ঘরে শুয়ে। কনজাংটিভাইটিস হয়ে চোখ লাল, কষ্ট পাচ্ছিল খুব। আমি জানি, কারণ সেদিন দুপুরে ওদের বাড়িতে আমার বর গিয়েছিল একটা কাজে। সে দরজা থেকে এডওয়ার্ডকে “হ্যালো” বলেছিল। এডওয়ার্ড খাটে শুয়ে চোখে হাত চাপা দিয়ে বলেছিল, কাছে এলে যেন চোখ ঢেকে কথা বলে। তবুও পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদ করতে ছাড়েনি।’

‘মুন্নার বক্তব্য কী ছিল?’

‘বলেছিল যে, তাদের তুচ্ছ কারণে ঝগড়াঝাঁটি হয়েছে। পরে অনুতাপ হওয়াতে সন্ধেবেলা সে অ্যাগনেসের বাড়িতে যায় এবং জানতে পারে যে, অ্যাগনেস ফেরেনি। তারপর তো রাত্রিবেলা থানা-পুলিশ হল। পরদিন খবর পেয়ে মাইকেল আর ডলোরেস ফিরে এল।’ ‘আচ্ছা, আপনি তো পুরোনো মানুষ, সবাইকে চেনেন। এখানে আর্থার বলে কেউ আছে, বা, ছিল?’

‘নাহ্।’ ভুরু কুঁচকে মাথা নাড়লেন জেনিফার। ‘চেনাজানা কাউকেই তো মনে করতে পারছি না। এক হতে পারে আর্থারকাকা, আর্থার মরিসি। সে তো কবেই ফৌত। তবে, খালারিতে কয়েক ঘর থাকে। খুবই ন্যাস্টি, গরিব। ওদের নাম-ধাম জানি না বাবা !”

আর কিছু জানার ছিল না। চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে দেখলাম দরজা ঘেঁষে অ্যালিস উবু হয়ে বসে। তার হাতে ডালপালা দিয়ে বানানো মুকুট। সেটাকে মাথায় পরলে কেমন লাগবে হাত-আয়নায় ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখছে। যদিও আজ পরনে লংড্রেস ছিল না, সাধারণ ম্যাক্সি। তাকে বললাম, ‘হাই, আমি তনয়া।’ অ্যালিস ফিরেও তাকাল না আমার দিকে। জেনিফার নাক দিয়ে অসন্তুষ্ট ঘোঁত আওয়াজ করলেন। হাতে তুলে নিলেন কমিক্‌সের বই।

বেরোতে গিয়ে মনে পড়ল, আসল প্রশ্নটাই করা হয়নি। ‘আপনি কেন বলেছিলেন গুড ফ্রাইডের দিন অ্যাগনেসের আত্মা আসে? গুড ফ্রাইডে কেন?’

জেনিফার আমার দিকে কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে থাকলেন। ‘তুমি জানো না? সত্যিই? গুড ফ্রাইডের দিন ও নিখোঁজ হয়েছিল।’

‘আপনারা কাকে সন্দেহ করছেন? কাউকে করছেন কি?’

কিছুক্ষণ চুপ থেকে অক্ষয় বললেন, ‘আমি শিয়োর নই। কিন্তু, অন্য ক্যান্ডিডেট পাচ্ছি না।’

“কে?”

‘আমাদের তদন্ত বিষয়ে এত কথা ফাঁস করে দেওয়া কি উচিত হবে, মিস ভট্টাচার্য? আপনিও নিশ্চয় স্কুপ পেলে ছাড়তেন না অন্য কাউকে?”

‘এতক্ষণ ধরে এত কিছু শেয়ার করেছেন, সেটা নিশ্চয় জেনে বুঝেই করেছেন।’ ‘অবিনাশ যাদব।’

‘অসম্ভব। অ্যারনের ক্ষেত্রে তাও “কিন্তু কিন্তু” করছিলাম, কিন্তু অবিনাশ যাদবকে গ্রেপ্তার করার মানে একজন নিরপরাধকে শাস্তি দেওয়া।’

‘এত দূরে বসে এত নিশ্চিত হচ্ছেন কী করে?’

‘কারণ, অবিনাশকে আমি দেখেছি। এরকম পোস্ট মার্ডার স্টেজিং, মৃতদেহ সাজিয়ে রাখা, তাঁর চরিত্রের সঙ্গে যায় না। তিনি খুন করলে তখনই করবেন। অতদিন অপেক্ষা করবেন না।’ অক্ষয়ের দিকে ঝুঁকলাম, ‘কিন্তু, অবিনাশের কথা আপাতত বাদ দিন। যেটার উত্তর এতক্ষণেও দিলেন না, এবার সেটা আপনার বলার সময় এসেছে। আমাকে বলুন, অ্যাগনেস কীভাবে আপনাদের কেসের সঙ্গে জড়িয়ে।’

ঋতু বদল হচ্ছে। তাই বাতাস ভরে উঠেছে হিমের চাবুকে। আকাশে হাঁসুয়ার মতো ধারালো চাঁদ। জেনিফারের বাড়ি থেকে ফেরার রাস্তায় চোখে পড়ল, মাঠে ব্যাডমিন্টনের জাল টাঙিয়েছে স্থানীয় ছেলের দল। ধু-ধু প্রান্তরে নিঃসঙ্গ সাদা নেট হাওয়ায় দোল খায়। ফোন বার করে গতকালকের মাথাছেঁড়া পুতুলের ছবিটা আবার দেখলাম। সাধারণ প্লাস্টিকের পুতুল যেমন হয়। লাল শার্ট আর হাফপ্যান্ট পরা, হাতে আবার বাহারি ঘড়ি। কেমন দেখতে ছিল তাকে? ছেলে, না, মেয়ে পুতুল? কেন একটা পুতুল এই গল্পে গুরুত্বপূর্ণ হল? তাকে কেউ প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করছে কি? এলোমেলো দিকহারা ক্রিস ঘুরে বেড়াচ্ছে ভূতুড়ে টাউনে, এমন ভাবনা অলীক। বারবারা জানিয়েছে, মনীষা সত্যিই অসুস্থ। আমাদের জিজ্ঞাসাবাদের পর থেকে শুয়ে আছেন। কিছু খেলেই বমি হচ্ছে। সেই কারণে এডওয়ার্ড রেগে গিয়েছিলেন হয়তো। কিন্তু, সেটুকুই সব নয়। এডওয়ার্ডের জীবন তিক্তবিরক্ত হয়েছে। বিভীষিকা ও আতঙ্কের এক জীবন। হয়তো এভাবেই নরকদর্শন হয়ে গেছে তাঁর। কী ছিল সেই নরকের প্রকৃতি? সে কি নিরুদ্দিষ্ট ক্রিসের অসহনীয় ভার, নাকি, গাছের ডাল থেকে ঝুলতে থাকা পিতার নির্জন মৃতদেহ? আমি জানি না। ক্রিসের জন্ম বিষয়ে জেনিফারের ইঙ্গিত সত্যি কি না সেটাও জানি না, কিন্তু সত্যি হলেও-বা কী? এডওয়ার্ডের রাঁচির প্রেমিকা থাকাও অসম্ভব নয়। বিয়েতে খুচখাচ এসব লেগেই থাকে। এগুলো কি সত্যিই একটা শিশুকে নিখোঁজ করে দেবার পেছনে গুরুতর ফ্যাক্টর হতে পারত?

ভেবেছিলাম আজ রকিদের দেখা পাব। কিন্তু, চারপাশ ধু-ধু করছিল। আমি চাইলে ওদের কটেজে যেতে পারি, কিন্তু সেটা ভালো দেখায় না, কারণ এমনকী নামটুকুও জানি না ভদ্রলোকের। তাই মাথা নীচু করে হাঁটার গতি বাড়ালাম কারণ, শীত করছিল। তারপর আমি রাস্তা হারালাম। সব রাস্তাই সোজা যায় না, এবং কোন বাঁকটা ঘুরে কোন বনাঞ্চলের ভেতর দিয়ে যেতে হবে সেটা অন্ধকারে বোঝা একজন বহিরাগতর পক্ষে সহজ নয়। রাস্তায় অটো বা রিকশার নামগন্ধ ছিল না। তারা সন্ধে হলে পাট গুটিয়ে ফেলে। এই সময়ে রাস্তা নির্জন হয়। ফলত পথচারীদের ভরসায় না-থেকে আমি নিমগাছে ঘেরা একটা জঙ্গলের ভেতর এসে পড়লাম। ভ্রম হল এখান দিয়ে ডান দিকে ঘুরলেই স্যাংচুয়ারির রাস্তা পাব। কিন্তু, সেদিকে বেঁকে আরও ঘন বনের ভেতর ঢুকে গেলাম যেখানে বাইরের আলো ঢোকে না। কুয়াশার পুঞ্জ গাছ থেকে ঝুলতে ঝুলতে এগিয়ে আসছিল আমার দিকে। পেছন ফিরে আগের রাস্তায় পড়লাম, তারপর যা থাকে কপালে ভেবে হেঁটে গেলাম সোজা। কোথাও-না-কোথাও জঙ্গল ফুরোবে, আমাজন তো নয়। সত্যিই কিছুদূর হাঁটার পর বনাঞ্চল পাতলা হল। আমার চোখে পড়ল জমিটা ঢালু হতে হতে কাদা আর পাঁকে ভরা জলায় নেমে গেছে। কিন্তু, সেটা যে কোনোমতেই স্যাংচুয়ারির পেছনের জলাভূমি নয় তা বেশ বুঝছি। আকারে নিতান্তই ডোবা। একটা ধোঁয়া উঠছে কোথা থেকে জানি না। তার ওপর চাঁদের ভাঙা আলো পড়েছিল, বিক্ষিপ্ত জলের ওপর ছিল তারাদের ঝিলমিল। সেদিকে তাকিয়ে কয়েক মুহূর্ত স্থির হয়ে গেলাম, কারণ যুক্তিহীনভাবে আমার মনে হচ্ছিল যে, ফেরার পথ পাব না। জঙ্গলে সবাই বৃত্তাকারে ঘোরে। ফোনের নেটওয়ার্ক এখানে পাওয়া যাচ্ছে না। ফলত, ম্যাপ দেখার সম্ভাবনা নেই। চোখ বন্ধ করে জোরে শ্বাস নিলাম। খুব একটা সাংঘাতিক পরিস্থিতি নয়। পিছু ফিরে অন্য রুট নিলেই সমাধান হয়ে যাবে।

কিন্তু পেছন ফিরে কয়েক পা এগিয়ে বুঝলাম কুয়াশা চাপ হয়ে বসেছে, ফলে সমস্ত দিকই একরকম লাগছে। চতুর্দিকে উঁচু গাছেরা, তাদের ভেতর দিয়ে কয়েক টুকরো গলি এদিক-ওদিক চলে গেছে, জায়গাটা হিম নির্জন। পৃথিবীর সমস্ত শব্দ ব্লটিং পেপার দিয়ে শুষে নিয়েছে যেন কেউ। এক মৃত উপত্যকার বুকে দাঁড়িয়ে থাকার অনুভূতি হল। আন্দাজমতো এগিয়ে মনে হল মাটি চড়াইতে যাচ্ছে, টিলা? তবু ওপরে উঠলে আন্দাজ পাব এই আশায় হেঁটে গেলাম সেদিক। কয়েক মিনিট পর একটা ফাঁকা জায়গায় এসে চারপাশে তাকিয়ে দেখলাম ঘন অরণ্যের মাথায় কুয়াশার সর। টিলার নীচে যেন একটা উপত্যকা যা বাটির মতো ছড়িয়েছে। তার কানা বেয়ে আবার প্রাচীরের মতো উঠে গেছে শালপিয়ালের স্তর। হতভম্ব চোখে দেখলাম ভেজা মাটি, যার ওপর দিয়ে উঠে এলাম, সেটাকে এখন সাদা কাপড়ে আচ্ছাদিত শবদেহ লাগছে। বাটপট শব্দে চমকে উঠলাম— কয়েকটা রাতপাখি উড়ে গেল অন্ধকারের মধ্যে। সেই জলাভূমিটা কিন্তু বুঝতে দেখা যাচ্ছিল দূর থেকে। রাত বেশি নয়, মাত্র সাড়ে সাতটা। কিন্তু, থমথমে অন্ধকার ঝড়ের মেঘের মতো জমাট বেঁধেছে। হাওয়া আরও হিম হয়েছে, আমার চামড়ায় ছুরির মতো কেটে বসছে। আমার ভয় লাগল। সত্যিই কি জঙ্গল গিলে ফেলল আমাকে, অথবা, আমার অবস্থা ক্রিসের মতো হবে? কাউকে ফোনও করা যাবে না, কারণ সিগনাল নেই। যা থাকে কপালে ভেবে আমি টিলা বেয়ে আবার নামতে শুরু করলাম এবং তার পরেই আছাড় খেলাম একটা পাথরে। কয়েক ধাপ গড়িয়ে কাঁটাঝোপে জিন্‌স আটকে গেল। বিষব্যথায় চোখে জল এল আমার। হাঁটুর কাছে সম্ভবত কেটেছে, কিন্তু সেদিকে দেখার সময় এখন নেই। অসহায় দিগ্‌ভ্রান্তর মতো হাঁটতে লাগলাম। এখন কোনদিকে যাচ্ছি আর খেয়াল নেই। এরকম পরিস্থিতি গল্পে পড়েছি। কিন্তু, জঙ্গলের ভেতর পথ হারানো আসলে কী ভয়াবহ, তাও আবার এমন শীতের রাতে, কল্পনা করতে পারিনি। তখন চোখে পড়ল, কুয়াশা ফুঁড়ে বিশাল কয়েকটা পাথরখণ্ড পাশাপাশি মাথা উঁচু করে আমার পথরোধ করেছে। তাদের ফোকর দিয়ে নেমে আসছে ক্ষীণ ঝরনা। তার তিরতির শব্দ নীরবতাকে ঘন করেছে। আমার নিশ্বাস বন্ধ লাগছিল। মনে হচ্ছিল, এই পাথরের দল গড়িয়ে নেমে আসবে আমার ওপর আর-একটা ঘর, অন্ধকার, একটা অগোছালো বিছানা, একজন শুয়ে আছে, সিলিং থেকে—

মাথা ঘুরে গিয়েছিল। সম্ভবত আমি পড়েও যাচ্ছিলাম, কিন্তু তখন একটা শক্ত হাত আমাকে ধরে নিল। আবিষ্টর মতো পেছন ফিরে বুঝলাম আমার পা থরথরিয়ে কাঁপছে। আমার সামনে দাঁড়িয়ে যে, তাকে যেন কোথায় দেখেছি। দেখেছি কি? এক দীর্ঘকায় অ্যাংলো নারীমূর্তি, কালো চাদর জড়িয়ে, মাফলারে কান ঢাকা, আমার কাঁধ ধরে একঝটকায় ঘুরিয়ে দিল। তীব্রস্বরে বলল, “খাদে হাড়গোড় ভেঙে পড়ার ইচ্ছে হয়েছে, না, নেশা করেছ?’ “আমি, রাস্তা— রাস্তা হারিয়েছি।’

কয়েক মুহূর্ত চুপ করে আমার দিকে তাকিয়ে থাকল। তারপর বলল, ‘আমার পিছু পিছু আসুন। এত রাত্রে এখানে কেউ আসে! আপনি মনে হয় টুরিস্ট। দেখিনি এর আগে।’ জঙ্গল ভদ্রমহিলার কাছে জলভাত মনে হল। অনায়াসে এই বাঁক, ওই গাছতলা, সেই ঝোপের ধার দিয়ে আমাকে একটা প্রকাণ্ড প্রান্তরের ধারে নিয়ে এলেন। সেখানে আচমকা বন শেষ হয়ে আকাশটাকে মনে হচ্ছে ছুট লাগিয়েছে শূন্যের দিকে। তার শরীরে জড়োয়ার গয়নার মতো অসংখ্য নক্ষত্রের দল আমার কয়েক মিনিট আগেকার ভয়কে অলীক ছেলেমানুষির বোধ দিল। ত্রাসে পায়ের ব্যথা ভুলেছিলাম। এখন আবার জ্বালা করল ভয়ানক। মাঠের এখানেওখানে অসংখ্য ছোটো-বড়ো ঝোপঝাড়, হু-হু করে ঠান্ডা বাতাস তাদের ভেতর দিয়ে বয়ে চলেছে। উঁচু গাছের পাতারা এমন হাওয়ায় ছিঁড়ে যায়। দূরে মিটমিটে আলো দেখে লোকালয় বুঝলাম। পাশ ফিরে ধন্যবাদ দিতে গিয়ে দেখি, আমার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে। তারপর জিজ্ঞাসা করলেন, “আপনি কি স্যাংচুয়ারিতে উঠেছেন?

‘হ্যাঁ। ঘুরতে এসেছি কয়েক দিনের জন্য।’

‘তাহলে আপনার কাছে এমনিতেই যেতাম। আমার নাম ডলোরেস ও’ব্রায়েন।’

.

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *