নৈশ অপেরা – ১৭

১৭

‘কারণ আমার এই পুত্র মরিয়া গিয়াছিল, এখন বাঁচিল ; হারাইয়া গিয়াছিল, এখন পাওয়া গেল। তাহাতে তাহারা আমোদপ্রমোদ করিতে লাগিল।’

– Luke | 15:24

.

সমর দোসাদের কাছ থেকে ফিরে আসার রাত্রে আমার আবার দেখা হয়েছিল রকির বাবার সঙ্গে। তাঁকে আমি জানিয়েছিলাম যে অ্যাগনেস পালিয়ে যাবার বদলে তাকে পাচার করে দেওয়া হয়েছিল, এটাও ভাবা যেতে পারে। সেক্ষেত্রে এমন জায়গায় সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল যেখান থেকে সে যোগাযোগ করতে পারেনি। তার ছিল অল্পবুদ্ধি, মাঝে মাঝেই এখানে-ওখানে পালিয়ে যেত, এমন মেয়েকে লোভ দেখিয়ে পাচার করা অস্বাভাবিক নয়। অ্যাগনেস মাইনর ছিল। ভারতীয় আইনে এর শাস্তি যত বড়োই হোক না কেন, যথেষ্ট ডেটারেন্ট যে নয়, আক্ষেপ করেছিলাম আমি। আমি কি তাহলে মৃত্যুদণ্ড চাই? এরকম একএকটা ঘটনা একটা পরিবারকে কীভাবে সারাজীবন ট্রমায় রাখে, কাজের সূত্রে দেখেছি। তাই তাদের দুঃস্বপ্নকে লেভেল আউট করতে পারে এমন কী শাস্তি হতে পারে, আমি জানি না। কথাগুলো নিজের মনে বলছিলাম। রকির বাবা চুপচাপ শুনছিলেন। তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেললেন, ‘হয়তো আমরাই ভুল। এত বছর পেরিয়ে এসে আবার নতুন করে ফিরে দেখতে গেলে কিছু মেলে না, ধোঁয়াশা বরং বাড়ে। তবু, আপনি তো চেষ্টা করেছিলেন!’ তিনি জানেন, আমার ফিরে যাবার সময় হয়ে এসেছে।

তার পরদিন সকাল বেলা ডলোরেসের লোক এসে অ্যাগনেসের ডায়েরির প্রিন্টআউট দিয়ে গেল আমাকে। এবার সব গোটানোর পালা। নতুন করে জানার কিছু নেই। এখানে এর থেকে বেশিদিন থাকলে কোনো সূত্র পাওয়া যেতে পারে বলে আমার বিশ্বাস হয়নি। এখান থেকে যদিও অফিসের কাজ করছিলাম, কিন্তু তাতে সব হয় না। সাবিং-এর অনেক কাজ থাকে, ডিজাইনারদের সঙ্গে মুখোমুখি কথা বলতে হয়, দরকারে ইনডিজাইনে নিজেকেও হাত লাগাতে হয়। আমি মহেশকে ফোন করে কনফার্ম করলাম, পরশু রাঁচি থেকে ফ্লাইট ধরছি। তার পরদিন জয়েন করব অফিসে। বারান্দায় এসে দেখি, অ্যারন আর বারবারা বসে আছে। অ্যারন তাকে জানাচ্ছে গত দুইদিনের বিবরণ। বারবারাকে আমি তখন জেনিফারের কথা বললাম। বারবারা আমার দিকে তাকাচ্ছিল না, অদ্ভুত আচরণ করছিল। আমি ওকে বলতে চাইনি, কিন্তু মুখ দিয়ে বেরিয়েই গেল শিশুবলির কথা। ওর মুখ ফ্যাকাশে হল, কাঁপতে কাঁপতে গিয়ে বাগানে বসে পড়ল বারবারা। ও কি এখন আমাকে ঘেন্না করছে? অ্যারন পিসির দিকে তাকিয়ে ছিল, ঘাড় ঘোরানো অবস্থায় আমাকে বলল, ‘রেভারেন্ড গরম্যানের দয়া আর ঐশ্বরিক অনুগ্রহের প্রতিশ্রুতি এসে শেষ হল জেনিফারের ব্ল্যাক ম্যাজিকে। এরপরেও তুমি দাবি করবে, মানুষ বাস্তববাদী?”

‘এখন এগুলো না-বললেই নয়? এমপ্যাথি বলে শব্দ কি তোমার অভিধানে নেই?’

‘একটা টাউন, টাউনও নয়, তার স্মৃতি, তার ঘনিয়ে আসা জঙ্গল, তার ভেতর গুটিকয় মানুষের পাগলামো আর নৃশংসতা, এর কোনটা আমাদের এমপ্যাথির যোগ্য ছিল বলে তোমার মনে হয়? আমার হাতে সিগারেটের ছ্যাকাগুলো তুমি দেখেছ। আমার বাবাকে দেখেছ। জেনিফারকে দেখেছ। এরা চার্চে যায় প্রভুর করুণা পাবার আশায় কারণ একটা দিনকে কাঁধে বয়ে টেনে নিয়ে যাবার জন্য এর থেকে বড়ো উপকরণ এদের কাছে কিছু নেই। তারপর দিনের শেষে এরা সেই ডিভাইন গ্রেসকে টেনে আনে অলৌকিকতা আর ঝাড়ফুঁকের চৌহদ্দিতে, কারণ সেটা এদের কমফর্ট জোন। তারপরও তোমরা আশা করো এমপ্যাথি নামক শুশ্রূষা বর্ষিত হোক মানুষের ওপর? প্লিজ গিভ মি আ ব্ৰেক !”

মাথার চুল ছিঁড়তে ইচ্ছে হল আমার। জিভের ডগায় চলে এসেছিল ‘অ্যাসহোল’, নিজেকে সামলে বারবারার পেছনে গিয়ে দাঁড়ালাম। একবার মনে হল, ওকে বলি যে, ক্রিস মরে গেছে একথা আমিও বিশ্বাস করি না। কিন্তু, আকাশে সিসে রঙের মেঘ এসেছিল, ঝোড়ো হাওয়ায় কেঁপে উঠেছিল চরাচর, আর তীব্রবেগে এসে এডওয়ার্ডের গাড়ি স্যাংচুয়ারির গেটে ধাক্কা মারল। এডওয়ার্ড ছিটকে বেরোলেন। তার কয়েক মিনিট পর টাউনের লোকেরা দেখল আমি আর অ্যারন এডওয়ার্ডের গাড়ি চালিয়ে তিরের মতো ছুটে চলেছি লাতেহারের দিকে।

আর্চির কটেজের সামনে একটা লেবুগাছ। সেখান থেকে টুপটাপ ফুল ঝরে মাদকতাময় গন্ধে ভরিয়ে দিয়েছে শেষ দুপুর। সোঁদা হাওয়ায় তারা এদিকওদিক উড়ে বেড়াচ্ছিল। গেট ঠেলে ঢোকার সময়ে একটা জোর বাতাস বইল। ঝপ করে বাতাবি ফল পড়ল মাটিতে বিছানো শুকনো পাতার ওপর। কটেজের মাথায় একটা দাঁড়কাক বসে আমাদের দিকে তাকিয়ে ছিল। তার কামড়ে ধরা ঠোঁটের অভ্যন্তর থেকে একটা ল্যাজ ঝুলছে। মেঠো ইঁদুর। দেখলাম, ল্যাজটা একবার কেঁপে উঠল। খিঁচুনির মতো গুটিয়ে গেল একবার, পরক্ষণে টান টান সোজা হল। কিন্তু, কাক তাকে গিলছে না। আমাদের পায়ের শব্দে রক্তাভ চোখ তুলে অবিনাশ হাসলেন, ‘আমি স্যাংচুয়ারিতে যাব। এক্ষুনি।’

হল ঘরের চেয়ার, টেবিল ওলটানো। সেরকম একটা চেয়ারে পিঠ দিয়ে মেঝেতে বসে আছেন আর্চি, মনীষার তুতোই। বাসন, জামাকাপড়, বইপত্র ছত্রখান চারদিকে। ইতস্তত ছড়ানো ভাঙা কাচের টুকরো। দুই হাত দিয়ে মুখ ঢেকে আছেন আর্চি। অবিনাশ তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে হাত মুঠো করছেন আর খুলছেন। কবজিতে রক্তের দাগ দেখলাম। এডওয়ার্ড আর মনীষা হল ঘরে বসে চা খাচ্ছিলেন। একপাশে বসে ফাইল বার করে দরকারি কিছু কাজ সারছিলেন আর্চি। হঠাৎ ঘরে ঢুকে আসেন অবিনাশ। আঙুল তুলে এডওয়ার্ড আর মনীষাকে বলেছিলেন বেরিয়ে যেতে, আর্চির সঙ্গে নাকি তাঁর বোঝাপড়া আছে। এডওয়ার্ড বারবারাকে ফোন করতে গেলে হাত মুচড়ে ফোন নিয়ে ছুড়ে ফেলেছিলেন। এডওয়ার্ড ভয় পেয়েছিলেন কারণ অবিনাশের এই রূপ আগে দেখেননি। তিনি মনীষাকে নিয়ে বারবারার কাছে আসেন। তাঁর মনে হয়েছিল অবিনাশ শারীরিক ক্ষতি করতে পারেন। আসার পথে মনীষার ফোন থেকে পুলিশ স্টেশনে ফোন করেছিলেন, বারবারাকেও। কিন্তু, কেউ ফোন ধরেনি। একবার ভেবেছিলেন থানায় যাবেন, কিন্তু মনীষা বললেন, দেরি হলে আর্চির ক্ষতি হয়ে যাবে কারণ পুলিশের দীর্ঘসূত্রিতা তাঁদের অজানা ছিল না।

এডওয়ার্ডের ফোন মুখ থুবড়ে পড়ে আছে। স্ক্রিন ফেটে চৌচির। তীব্র মদের গন্ধে আমার গা গুলিয়ে উঠল। অবিনাশের দিকে তাকিয়ে দেখি টলছেন। গতরাত থেকে খাচ্ছেন কি না জানি না। আমি আর্চির দিকে এগিয়ে গেলাম। ঠোঁটের কোনায় কাটা দাগের চারপাশে কালশিটে বাদে অন্য আঘাত চোখে পড়ল না। কিন্তু, দৃষ্টি হতবুদ্ধিকর। এই প্রথম আর্চিকে দেখছি। রোগা ছিপছিপে, এই বয়েসেও মুখে তারুণ্যের অবশেষ। কিছুটা নারীসুলভ কমনীয়তা থেকে গেছে। কিন্তু, এগুলো এখন ফিরে ভাবছি। সেইসময়ে এসব ভাবনার অবকাশ ছিল না। ঠিক আছেন কি না জিজ্ঞাসা করাতে মাথা নাড়লেন। অবিনাশ জড়ানো গলায় বললেন, ‘বেশি মারিনি, আই সোয়ার।’ আর্চি অবাক চোখে তাকালেন তাঁর দিকে। মুখে নীরব জিজ্ঞাসা—কেন? অ্যারন তাঁর ঘাড়, হাত, মুখ পরখ করে নিশ্বাস ফেলল, আঘাত জোরদার নয়। আর্চিকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে হবে। কিন্তু, আর্চি মাথা নাড়লেন। ফিসফিসিয়ে বললেন, তিনি ধাতস্থ হতে চান। চান নিজের সঙ্গে একা থাকতে। আমি আপত্তি জানাচ্ছিলাম, অ্যারন চোখের ইশারায় ছেড়ে দিতে বলল। অবিনাশকে নিয়ে বাইরে এসে জিজ্ঞাসা করল, কী ব্যাপার।

‘কিচ্ছু ব্যাপার নয়। স্যাংচুয়ারিতে সবাই আছে, সেখানে গিয়ে যা কথা হবার হবে। ‘আপনার কি মাথাটা গেছে? এই বয়েসে এরকম মারপিট, আপনার সঙ্গে ঝামেলা হয়েছিল নাকি?’ মোবাইলে দেখলাম বারবারা মিসড কল মেরেছে দুটো। ‘আমি জানি না এই ঝামেলায় বারবারা আর এডওয়ার্ড নিজেকে জড়াতে চাইবেন কি না, তবে আর্চি সম্ভবত ডায়েরি করবেন আপনার নামে। সেটা করা উচিতও। সম্ভবত পুলিশ আসবে। এখানে আপনাকে না-পেয়ে আপনার বাড়িতে যাবে। আপনি যদি স্যাংচুয়ারিতে যেতে চান, অন্যেরা রাজি হবে কি?’

‘সব তোমার জন্য হয়েছে।’ অবিনাশ এলোমেলো আঙুল তুলে টলে পড়তে যাচ্ছিলেন, অ্যারন ধরে নিল তাঁকে। ‘খুব শখ ছিল, না? গোয়েন্দা হবে!”

‘আমি কিছুই হতে চাইনি, মিস্টার যাদব। আপনারা আমাকে গল্পটা—’ কিন্তু অ্যারন আমার কাঁধে চাপ দিল, অবিনাশকে এখান থেকে বার করতে হবে। আমার ইচ্ছে করছিল না এসবে নিজেকে জড়াতে। সিগারেট খেতে ইচ্ছে করছে। আর্চিকে দেখলাম একইভাবে বসে আছেন মাথা ঝুঁকিয়ে। কতটা তাণ্ডব চালালেন অবিনাশ, আর কেনই-বা? আমি আবার জিজ্ঞাসা করলাম ডাক্তার নিয়ে আসব কি না। কিন্তু, আর্চি জানালেন তাঁর কাছে ফার্স্ট এইড বক্স আছে, আপাতত সেটা দিয়ে কাজ চালিয়ে তারপর প্রয়োজনে কাউকে দেখাবেন। একপ্রকার বাধ্য হয়ে অবিনাশকে গাড়িতে তুললাম। কাচে মাথা ঠেকিয়ে হুঁ হুঁ হাসলেন অবিনাশ। তারপর চোখ বুজলেন।

এর পরের ঘটনাগুলো দ্রুত ঘটেছিল। আমি পরের পর সিগারেট খেয়ে যাচ্ছিলাম। স্যাংচুয়ারিতে ফিরে আসার পরের ঘটনা মনে করতে গেলে প্রথমেই মনে আসে অনেক চিৎকার আর ক্রুদ্ধ গাঁ গাঁ গর্জন। মুখে হাত চাপা দিয়ে মনীষা কাঁপছিলেন। বারবারা চিৎকার করে উঠল। দৌড়ে এসেছিল পুনম। এডওয়ার্ড আর অবিনাশ দু-জনেই তার দিকে সাবধানসূচক আঙুল তুলে বলেছিলেন ‘খবরদার’। অ্যারন কী করছিল গোটা সময়টা? ও কি দু-জনকে আটকাচ্ছিল, নাকি, দোলনায় বসে দেখে যাচ্ছিল চুপচাপ? অবিনাশ চিৎকার করলেন, ‘আপনাদের জন্য আমি কেস সলভ করতে পারিনি।’ আমার দিকে ফিরলেন আবার, ‘সব তোমার জন্য।’ এডওয়ার্ডের ধাক্কায় অবিনাশ মাটিতে পড়ে গিয়েছিলেন। তাঁর চোখের কোনা কেটে গিয়েছিল, জল বেরোচ্ছিল ক্রমাগত। এডওয়ার্ড বার বার চিৎকার করছিলেন আর জানতে চাইছিলেন, এর অর্থ কী। অবিনাশের ঠোঁট বেঁকে গেল নিষ্ঠুরের মতো। তিনি জানালেন, বাচ্চাটা আর্চির ছিল বলে আগাথা সরিয়ে দিয়েছিলেন। এদিকে তাঁরা মানে পুলিশের দল, বিশেষত তিনি নিজে, বোকার মতো ঘুরে গেলেন এতগুলো বছর। এক সেকেন্ডের ভগ্নাংশের জন্য এডওয়ার্ড স্থির হয়ে গেলেন। তারপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন অবিনাশের ওপর। পাগলের মতো এলোপাথাড়ি কিলচড় মারছিলেন। আমরা তাঁকে থামাতে পারছিলাম না। অবিনাশ মার খেতে খেতে চেঁচালেন, ‘একজন রাঁচি গিয়ে মেয়েমানুষ পুষবে আর একজন লুকিয়ে আর্চির সঙ্গে প্রেম করবে। তার গুনাগার কে দেবে? কে দেবে?’ তারপর আঁক করে থেমে গেলেন, কারণ তাঁর মাথা মাটিতে ঠুকে দিয়েছেন এডওয়ার্ড। অ্যারন হ্যাঁচকা টানে বাবাকে টেনে তুলল, ধাক্কা মেরে সরিয়ে দিল দেওয়ালের দিকে। ভারসাম্য সামলাতে না-পেরে এডওয়ার্ড পড়ে গেলেন। অবিনাশ বিকৃত গলায় বললেন আবার, ‘কেউ জানে না আবার কী কথা? দেখাই তো যাচ্ছে সবাই জানে, আমি বাদে।’

‘ইউ ব্রুট!’ মনীষা চেঁচিয়ে উঠলেন।

‘আর, তুমি একটা কুত্তি।’ এডওয়ার্ড মনীষার দিকে ফিরে হিসহিস করলেন। যেন চাবুক খেয়েছেন, এমন ভঙ্গিতে মনীষা পিছিয়ে গেলেন দুই পা। আমি মনীষাকে ধরবার জন্য এগোতে গেলে এডওয়ার্ড চিৎকার করলেন, ‘ডোন্ট টাচ হার ইউ ডার্টি স্লিউথ। তুমি যত নষ্টের গোড়া। আমি পুলিশে যাব।’

‘সবার ভালোবাসা, ওহ্ ভগবান, ভালোবাসা এভাবে—’ বারবারাকে ঘিনঘিনিয়ে কাঁদতে দেখে এডওয়ার্ড হাসলেন।

‘ভালোবাসা থাকলে, যখন আর্চির পাশে বসে থাকত, একবার পেছন ফিরে দেখত মেয়েরা কুত্তির জাত। তুই নিজেও তাই। তাই আমার পেছনে টিকটিকি লেলিয়েছিস।’ আমার দিকে তাকিয়ে থুতু ফেললেন। রক্তমেশানো সাদা কফ। মনীষা ভূতগ্রস্তর মতো ধীরপায়ে পিছু হটে অদৃশ্য হলেন বাড়ির অন্ধকারে। বুঝতে পারছিলাম না কী করব। অ্যারন বাবার সামনে দাঁড়িয়ে ঠোঁটে আঙুল রেখে চুপ করতে বলছে। আমি তখন বারবারাকে সামলাচ্ছিলাম, কারণ ও হাতের কাছে একটা গেলাস পেয়ে ছুড়ে মেরেছে। হতভম্ব দাঁড়িয়ে পুনম।

অবিনাশ আবার বললেন, ‘কেউ কিচ্ছু জানত না। অথচ, সবাই সব জানত। আমরা শালা চুতিয়া, সবাই আমাদের দিকে তাকিয়ে খি খি করে হেসেছে। আগাথা যখন ক্রিসকে হাপিশ করছে- ,

‘চুপ,’ অ্যারন ধমকে উঠল।

‘যখন হাপিশ করছে, আমরা তখন বাড়ির ঘরদোর, বাগানে টর্চ মারছি। যখন বাচ্চাটার হাত-পা বেঁধে দিয়েছে যাতে চেঁচাতে না-পারে—

‘শাট-আপ,’ এডওয়ার্ড চেঁচালেন এবার। অবিনাশ হেসে উঠলেন।

‘তখন লোকাল থানা শহরের বর্ডারগুলোতে লোক পাঠাচ্ছে। আর আমি? আমি তার পরের তিরিশ বছর ধরে লুকিয়ে দেখে যাচ্ছি আপনাদের। আপনারা বসে থাকেন বাগানে। মনীষা বসে থাকেন। আর্চি থাকেন। বসে বসে ক্রিসের কথা ভাবেন। ভাবেন আগাথা বেঁচে থাকলে তার পেট থেকে কথা বার করতেন। আমি গাধার মতো দাঁড়িয়ে থাকি।’

এডওয়ার্ড উঠতে চেষ্টা করলেন কিন্তু অ্যারনের ধাক্কায় আবার পড়ে গেলেন মাটিতে, ‘তোকে আমি মাটিতে পুঁতে ফেলব। নোংরা দেহাতি ছোটোলোক।’

অবিনাশ উত্তর দিতে যাচ্ছিলেন কিন্তু পুনমের চিৎকারে থমকে গেলেন। সে আর্তনাদ করছে ওপরের দিকে তাকিয়ে। আমরা সবাই বাগানে নেমে এলাম।

বাড়ির যে অংশটা ভাঙা হয়েছে, তার একদিকের কিছুটা ছাদ নড়বড়ে ভাঙা থামের ওপর বেঁচে ছিল। আমরা দেখলাম, সেই ছাদের একপ্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছেন মনীষা। তাঁর দৃষ্টি দূরে। বারবারা চেঁচাল, ‘মনীষা, নেমে আয়!’ নীচের থাম নড়ছে, একটা মানবশরীরের ভার কতক্ষণ নেবে কেউ বলতে পারে না। মনীষা একবার মাথা নীচু করে আমাদের দিকে তাকালেন। তাঁর মুখে কোনো কষ্ট আমি দেখিনি। বরং, সে-মুখে অদ্ভুত প্রশান্তি ছিল, চোখ দেখে মনে হচ্ছিল মোহের ঘোর আঁকা। তিনি আবার দূরের দিকে তাকালেন। ভাঙা থামের গা থেকে খসে পড়ল সিমেন্টের চাঙড়। ছাদটা যেন কাঁপছে। বারবারা আবার অবোধ্য স্বরে চেঁচিয়ে উঠল, তার মুখ ছাইয়ের মতো। এডওয়ার্ড ফিসফিস করলেন, ‘ভেঙে পড়বে।’ অ্যারনের শরীরটা বাড়ির ভেতর ছুটে যাবার জন্য সবে স্প্রিন্ট নিয়েছে, কিন্তু তখন মনীষা তাঁর হাত বাড়িয়ে ধরলেন জঙ্গলের দিকে। স্পষ্ট গলায় উচ্চারণ করলেন, ‘ক্রিস দাঁড়িয়ে আছে।’ আর না-চাইতেও আমাদের চোখ সেদিকে ঘুরে গেল।

আকাশ কালো। উথালপাথাল জঙ্গলের মাথা। জলাভূমির ওপর দিয়ে হা-হা শব্দে ছুটে যাচ্ছে হাওয়া। ঘাসবনের ভেতর সরসর আওয়াজ হচ্ছে। দূর সীমান্তের যে জঙ্গলরেখা, তার প্রেক্ষাপটে উঠে আসছে শেষ বিকেলের কুয়াশা। তারা দিগন্তকে আবছা করে দিচ্ছে। কুয়াশা ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে, জমাট বেঁধে আমাদের দিকে ধেয়ে আসছে, ঝোড়ো বাতাস তার চাদরকে ছিঁড়তে পারছে না। তিন বছর পেরিয়ে এসে আমি দেখতে পাই, একটা কয়েক মুহূর্তের সচল ফ্রেম। ফ্রেমটার ডান দিক থেকে গুঁড়ি মেরে লাফ দেবে কুয়াশার পুঞ্জ। বাঁদিকে, আলো যেখানে স্বচ্ছ এবং বাতাস হাহাকার, সেই জায়গাটায় আমি দেখলাম, এক শিশু দাঁড়িয়ে জঙ্গলের সেই জায়গায়, যেখানে দিন তিনেক আগে আমি আর অ্যারন বসে ছিলাম। তার মুখ ঘোরানো আমাদের দিকে কিন্তু বাকিটা বোঝা যাচ্ছে না। আমার গায়ে কাঁটা দিল। ধড়াস করে উঠল বুকের ভেতর—আমরা কি মাস হ্যালুসিনেশন করছি? চোখ কচলে আবার দেখলাম, স্পষ্ট এবার, সেই শিশু আমাদের বাড়ির দিকেই তাকিয়ে। তার পরনে লাল জামা, প্যান্টের রং এত দূর থেকে বুঝিনি। আমাদের সবার বুক থেকে সশব্দ নিশ্বাস বেরোল। মড়ার মতো মুখে আমরা একে অন্যের দিকে তাকালাম। মনীষা ওপর থেকে দেখেছেন, কী দেখেছেন আমি জানি না। কিন্তু, নীচে দাঁড়িয়ে আমরা সকলে একই জিনিস প্রত্যক্ষ করেছিলাম। এডওয়ার্ডের মুখ সাদা। আতঙ্কে তাঁর গলা দিয়ে ঘড়ঘড়ে আওয়াজ বেরোল। অবিনাশ ফিসফিস করলেন, ‘তাহলে যেকোনো মুহূর্তে—’ এটুকুই, আর কথা বেরোল না। অ্যারন ঘাড় নেড়ে চাপাগলায় বলল, ‘অসম্ভব, অসম্ভব।’ কিন্তু, তার গলা আটকে গেল কারণ, আমাদের চোখ আবার চলে গেল মনীষার দিকে। তিনি হাসছেন। ক্রিসের দিকে হাত বাড়ালেন আবার। ককিয়ে উঠলেন, ‘ক্রিস!” তারপর ঝাঁপ দিলেন নীচে, আর মাথা উঁচিয়ে থাকা একখণ্ড লোহার রড তাঁর বুক ফুঁড়ে দিল।

কয়েক মুহূর্তের স্তব্ধতা। সেই কয়েকটা মুহূর্তে আমরা নিজেদের হৃৎপিণ্ড মুঠোতে পুরে রেখেছিলাম। তারপর মনীষার গেঁথে থাকা দেহ একবার লাফিয়ে উঠল। কালচে লাল রক্ত ধীরে ধীরে বেরোচ্ছিল। তখন কর্কশ স্বরে ডেকে উঠল লালুরাম, তীব্র বিস্ফোরণে যেন স্থির মুহূর্তগুলোর প্রাচীর ফাটল, আর সময় দৌড়োতে শুরু করল স্বাভাবিকের তুলনায় দ্রুত।

পুনম চিৎকার করল সবার আগে। আমরা মনীষার কাছে দৌড়ে গিয়ে দেখলাম তাঁর দেহ প্রাণহীন। মুখে তখনও আলগা হাসি ঝুলছে। এডওয়ার্ড মনীষার হাত ধরলেন, মাথা নীচু করে বসে থাকলেন কয়েক মুহূর্ত, তারপর উঠে দাঁড়িয়ে হিংস্র মুখে তাকালেন অবিনাশের দিকে। তাঁর চোখ থেকে জল গড়াতে দেখলাম। তিনি বিকৃত গলায় জানালেন যে, অবিনাশকে শেষ করে দেবেন। পালটা চিৎকার করলেন অবিনাশ, বললেন এডওয়ার্ডকে খুন করবেন কারণ মনীষাকে তিনি কুত্তি বলেছেন, এবং তারপরেই— আমি দেখলাম দু-জনেই কাঁদছেন। তাঁরা একে অপরকে আঘাত করতে গিয়ে এলোমেলো হাত চালাচ্ছেন। তারপর দু-জনেই মাটিতে বসে পড়লেন। আমার পা চলছিল না, গলার কাছে শুকনো লাগছিল, কিছুক্ষণের জন্য যেন অসাড় হয়ে গিয়েছিলাম। নিজেকে সামলে আমি অ্যারনের হাত আঁকড়ে ধরলাম। অ্যারনের পিঠ আমার দিকে ফেরানো ছিল বলে ওর মুখ আমি দেখতে পাইনি, কিন্তু ও কাঁপছিল বোঝা যায়। মায়ের পাশে উবু হয়ে বসে মুখে হাত ঢাকল। আমি ওর পেছনে দাঁড়িয়ে জলাভূমির দিকে মুখ তুলে দেখলাম, সেই শিশু অদৃশ্য হয়ে গেছে। তার শূন্যস্থান পূরণ করতে আরও এগিয়েছে কুয়াশা, আবার কখনো সেটা ঝোড়ো হাওয়ার দাপটে ছিঁড়েখুঁড়ে যাচ্ছে। দগদগে অভিশাপের মতো শূন্য জঙ্গল। সে আদৌ ছিল কি? ওটুকু মুহূর্তের মধ্যে কোথায় গেল তাহলে? একটা চাপা ভয় আমার তলপেট থেকে উঠে আসছিল। এ কেমন ভৌতিক ঘটনা? কিন্তু, তখন গুছিয়ে চিন্তা করতে পারছিলাম না, কারণ ততক্ষণে আর্তনাদ ও ছোটাছুটি শুরু হয়েছে বারবারার আঙুল তুলে ধরল আমার দিকে, ‘তোমার জন্য এত কিছু।’ অ্যারন আমার কাঁধে হাত রাখল, ‘তুমি নিজের ঘরে যাও, তনয়া।’ আমি একমাত্র যা করতে পারতাম তখন, পিছু হটে বাগানের এক কোনায় চলে যাওয়া। আমার জন্যই তাহলে এত কিছু? সেই অসাড় ভাবটা আবার ফিরে আসছিল। বাগানের দিকে হেঁটে যাবার সময়ে গাছের শেকড় পায়ে জড়িয়ে পড়ে যাচ্ছিলাম, আমার কাঁধ ধরে শক্ত হাতে দাঁড় করাল কেউ। পুলিশি গলায় নির্দেশ দিল, ‘আপনাকে থানায় আসতে হবে।’

পুলিশ আমার জবানবন্দি নিয়ে প্রাথমিকভাবে নির্দেশ দিয়েছিল, স্যাংচুয়ারি ছেড়ে অন্য হোটেলে চলে যাবার। কিন্তু, এটাও বলেছিল যে, আগামী দিন দুয়েক টাউন যেন আমি নাছাড়ি। আমি ওই হট্টগোলে একটাই কাজের কাজ করতে পেরেছিলাম। মহেশকে ফোন করে বলেছিলাম, আমাকে এখান থেকে বার করে আনে যেন। কারণ, আমাকে যদি টাউন ছেড়ে যেতে না-দেয়, তাহলে আগামী বহুদিন নষ্ট হবে। শুধু সেটাই নয়, এই টাউনে আমি থাকতে পারতাম না—কারণ, সবাই আমাকে বলেছে যে, আমি নাক না গলালে এত কিছু হত না। যেহেতু আমি একজন সাংবাদিক, নামকরা এক পত্রিকায় কাজ করি, তাই গঞ্জের মতো ছোটো থানার পুলিশ জানত যে, চাইলেও দুম করে আমার গায়ে হাত দেওয়া সহজ হবে না। কিন্তু, এডওয়ার্ড ব্রাউন তাঁর বয়ানে বার বার আমার কথা বলেছিলেন—আমি নাকি খোঁচাখুঁচি করতে গিয়ে অশান্তি ডেকে এনেছি। মনীষার অবসাদ কি আমিই বাড়িয়ে তুলেছিলাম? এই জায়গাটায় আমি বিপদে পড়তাম যদি না অ্যারন সাক্ষ্য দিত। সে ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন আর ওষুধের লিস্ট দেখিয়েছিল পুলিশকে, জানিয়েছিল তার মায়ের দীর্ঘদিনের সমস্যা ছিল। এমনকী আর্চিকে যে আমি আর অ্যারনই বাঁচিয়েছিলাম, অ্যারন সেটাও জানাল । পুলিশ সম্ভবত রিপোর্টে অবসাদজনিত আত্মহত্যার কথা লিখেছিল, যদিও আমি নিশ্চিত নই যেহেতু তখন আমি শহর ছেড়ে চলে গেছি। মনে আছে, থানায় আমি বারান্দার বেঞ্চে চুপচাপ বসে ছিলাম। তখন ইন্টেরোগেশন রুম থেকে বেরিয়ে অ্যারন চাপাস্বরে বলল, ‘প্রথম সুযোগে বেরিয়ে যাও এখান থেকে।’

‘আর তুমি?’

‘আমাকে তো থাকতেই হবে। কিছু করার নেই।’

‘বারবারা কি আমার বিরুদ্ধে- ,

‘পিসি পাগল হতে পারে, কিন্তু শয়তান নয়। তোমাকে নিজেই জোর করেছিল, সেটুকু বোধ তার আছে। পিসিকে আমি সামলে নেব। তুমি চলে যাও। আর যোগাযোগ রেখো না আমাদের সঙ্গে।’

‘রাখব না?’

‘না। তনয়া, আগেও বলেছিলাম, আমরা কার্সড। ভেবেচিন্তেই বলছি, এই জায়গা থেকে না-বেরোলে তোমার ক্ষতি। আমাদেরও ভালো হবে না।’ আমি মাথা নীচু করে তার সামনে থেকে সরে গেলাম। সেই আমাদের শেষ কথা। বারবারার সঙ্গেও কথা হয়নি আর।

মহেশের যোগাযোগ কাজে এসেছিল। সেদিন সারারাত আমরা থানায় ছিলাম, তার পরদিন দুপুর বেলা পুলিশ আমাকে জানাল যে অনুমতি পাওয়া গেছে, কালবিলম্ব না-করে যেন আমি চলে যাই। প্রায় হুমকির স্বরে বলেছিল তারা— আমি বড়ো শহরের সাংবাদিক,

ছোটো টাউনের ব্যাপার-স্যাপার না-বুঝে বিপদ বাড়িয়েছি। এক কনস্টেবল তখন হেসে হেসে পাশের জনকে বলছিল, আমরা নাকি একটা বাচ্চার ভূতকে দেখেছি। তাদের দোষ ছিল না, তাদের জায়গায় আমি থাকলে আমিও বিশ্বাস করতাম না। কিন্তু, বারবারা দিব্যি করে বলেছিল যে, ক্রিসের ওই লাল সোয়েটার তার হাতে বোনা। অন্য সময় হলে তার কথা উড়িয়ে দিতাম, তিরিশ বছর আগেকার সোয়েটার—কিন্তু এখন ওড়াব কী করে? যে শিশুকে দেখেছি, সে কি অন্য কেউ ছিল? তাহলে সে কেন ওখানে দাঁড়িয়ে আমাদের দিকে তাকিয়ে ছিল— অত দূর থেকে সেটুকু তো স্পষ্ট বোঝা যায়— সে উবেই-বা গেল কেন? আমার মাথা বলছিল, এর হাজারটা অন্য ব্যাখ্যা আছে, কিন্তু মন অন্য কিছু ভাবতে চাইছিল না। অলৌকিকে বিশ্বাস করার কারণে নিজের ওপর আবার রেগে উঠলাম। পুলিশের হাসিকে কাঁধ থেকে ঝরিয়ে আমি বেরিয়ে এলাম থানা থেকে। স্যাংচুয়ারিতে গিয়ে নিজের ব্যাগ গুছিয়ে নিলাম। থমথম করছিল বাড়ি, সেখানে কেউ ছিল না। সিগারেট খেয়ে খেয়ে আমার মুখ তেতো। বমি বমি লাগছে, জ্বালা করছে পায়ের কাটা জায়গাটা। লালুরাম একা বাগানে ঘুরছিল। দৃকপাত না-করে বেরিয়ে এসেছিলাম। কিন্তু, রাঁচি থেকে ফ্লাইট সেদিন দিল্লি ছাড়েনি প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে। তাই আমাকে পরদিন অবধি অপেক্ষা করতে হয়েছিল।

অবিনাশের বিরুদ্ধে এডওয়ার্ড অভিযোগ আনায় তাঁকে আটক করেছিল পুলিশ। কিন্তু, আর্চিকে মারধর বাদে অন্য সারবত্তা সে-অভিযোগে ছিল না। অ্যারন আগেই জানিয়েছিল যে, মনীষার অবসাদের ইতিহাস পুরোনো। আচিৰ এফআইআর করতে রাজি হননি। তিনি নাকি মনীষার খবরে এতই মুহ্যমান ছিলেন যে, নিজের ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে ছিলেন। অবিনাশ থানাতেই পাগলের মতো চেঁচিয়ে জানান দিয়েছিলেন যে, ছাড়া পেয়ে এডওয়ার্ডকে তিনি খুন করবেন। আমি জানতাম, অবিনাশকে আটকে রাখবে না পুলিশ। প্রথমত, তাঁর বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ নেই। দ্বিতীয়ত, তিনি পুলিশ ছিলেন। শুনেছিলাম, সরকারি হাসপাতালের মর্গ মনীষার বড়ি তখনও ছাড়েনি। অ্যারন সেখানে ভোর থেকে পড়ে আছে। বারবারার পাত্তা নেই। এডওয়ার্ড পুলিশের ডেরায়। আমি মনে মনে বলেছিলাম, ‘গোল্লায় যাক সবাই,’ আর ব্যাগ কাঁধে বেরিয়ে এসেছিলাম। রেভারেন্ড গরম্যান কি মেয়ের খবর শুনেছিলেন? শুনলেও তার অর্থ হৃদয়ঙ্গম তিনি করতে পারতেন কি না, জানি না।

আজ এতগুলো দিন পেরিয়ে এসে যখন আমাকে আবার সেই স্মৃতির ঝাঁপি খুলে বসতে হয়েছিল, একটাই কথা মনে হয়েছিল। কী অবিশ্বাস্য অপচয়! সময়, শ্রম, ভাবনা, এমনকী দুঃখেরও। পুলিশ তাদের সমস্ত প্রকার শক্তি ও দক্ষতা প্রয়োগ করে শেষে কিনা অবিনাশ যাদবকে গ্রেপ্তার করতে যাচ্ছে। আমিও সাংবাদিকতা কিছুকাল করেছি, খুনির ধরন আমি বুঝি। অবশ্যই অবিনাশ খুন করবার ক্ষমতা রাখেন, কিন্তু সেটা তাহলে ছাড়া পেয়েই করবেন, অথবা মাথা গরম করে, যেভাবে আর্চিকে আঘাত করেছিলেন। তিন বছর ধরে পরিকল্পনা ও আটঘাট বেঁধে খুন করা তাঁর ধরন নয়। অনেক কিছুর উত্তর নেই। অক্ষয়কে দেখে বুঝেছি তিনিও কনভিন্সড নন। কিন্তু, কেস ক্লোজ করার চাপে—মানে, আবার সেই একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি, যা সমর দোসাদ অথবা নির্মলা দুবের সঙ্গে ঘটেছিল। এদিকে আসল পার্পেট্রেটর গত তিরিশ-চল্লিশ বছর ধরে টাউনে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কিন্তু, আমি কি এবার চুপ থাকব? কী করতে পারি আমি? তিন বছর আগে সব সম্পর্ক ছিন্ন করে বেরিয়ে এসেছিলাম। এতদিন পরে নতুন করে কী দিতে পারি? একথা তো সত্যি যে, ওই কয়েক দিনের মধ্যে কিছু গল্প জোগাড় করা বাদে অন্য কিছুই আমি পারিনি। জেনিফার আঙুল তুলেছিলেন আগাথার দিকে, সমর আঙুল তুলেছিলেন জেনিফারের দিকে, সবাই শেষমেষ আঙুল তুলেছিল আমার দিকে। আর, অ্যাগনেসের ব্যাপারে সকলে চুপ থেকেছিল। এতগুলো ধোঁয়াশার জাল ছেঁড়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়।

অনর্গল কফি আর সিগারেটে জিভ অসাড় লাগছে। কিছু খেতে ইচ্ছে করছে না। সোফাতে বসে ল্যাপটপ খুললাম আমি। গুগল ড্রাইভে গঞ্জের ফোল্ডারে গেলাম। খুলে বসলাম পুরোনো ছবিগুলো। একটা ছবিতে বারবারা বিরক্ত হয়ে লালুরামকে ধমকাচ্ছে। একটায়, ধুধু রোদের মধ্যে একলা স্যাংচুয়ারি। আরও অনেকগুলো ছবি। একটায় অ্যারন দোলনায় বসে আছে। বেথেল মিশন, জঙ্গলে ঢাকা। ঝাঁটিফুলের মাঠে দীপিকা সরেন দৌড়ে যাচ্ছে একটা ছাগলের পেছনে। অ্যাগনেসের সেই পুরোনো ছবি, গাছের ডালে হেলান দিয়ে।

আর একটা ছবি, শেষ বিকেলের জলাভূমির। মাথার ওপর উড়ছে কাকের দল। এখানে ক্রিস দাঁড়িয়ে ছিল।

তন্ময় হয়ে দেখছিলাম। তারপর রাস্তার কুকুরের চিৎকারে চমকে উঠলাম। রাত আড়াইটে। আমি ভাবব না, কেন এত ভাবছি? আমি ভালো আছি নিজের জীবন নিয়ে? কেন এত রাত অবধি ছবিগুলো দেখছি আমি, কী আসে-যায়? এরকম অপরাধ অনেক ঘটে। তাদের সমাধানের জন্য পুলিশ আছে। আমি ফিরে যার না সেখানে। আমার ঘুম হবে নিশ্ছিদ্র। আমি ভুলে যাব সবাইকে।

কিন্তু, গুগল ড্রাইভ খোলা রইল সারারাত। এবং, আমি ল্যাপটপের সামনে বসে ছবিগুলো বার বার দেখে গেলাম। সারারাত।

.

.

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *