নৈশ অপেরা – ৩

তখন ভ্রাতা ভ্রাতাকে ও পিতা সন্তানকে মৃত্যুতে সমর্পণ করিবে; এবং সন্তানেরা আপন আপন মাতাপিতার বিপক্ষে উঠিয়া তাহাদিগকে বধ করাইবে ।

– Mark 13:12

.

এই কাহিনির শুরু এমনভাবেও হতে পারত যে, ব্রাউনদের বাড়ির ধ্বংসাবশেষ থেকে আমি তুলে নিচ্ছি একটা হারানো ছবি। স্মৃতির খননে উপযোগী দৃশ্য, সন্দেহ নেই।

যে রাত্রে বারবারা আমাকে পোড়ো মাঠের ধারে টেনে নিয়ে গেল, তার পরদিন ভোরে আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম যে, স্যাংচুয়ারি হয়তো ছাড়তে হবে, কিন্তু একদিন দেখে। হাজার হলেও আমি একজন সাংবাদিক। যদি গল্পের সম্ভাবনা দেখি কোথাও, সে যত তুচ্ছ হোক না কেন, তার থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া কাজের কথা নয়। স্থানীয় মানুষেরা বলেছে এই বাড়ি অভিশপ্ত। কেন, তাকে খতিয়ে দেখিনি। একটা বড়ো স্টোরি করার পরে আলস্য আসা অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু, তাই বলে গল্পগুলোর থেকে মুখ ফিরিয়ে থাকব কেন? শুধুমাত্র স্টোরি লেখার খাতিরেই তো নয়! একজন সাংবাদিকের মূল চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য হল তার কৌতূহল। স্বাভাবিকের থেকে কোনোরকম বিচ্যুতি তাকে যদি কৌতূহলী নাকরে, সে প্রশ্ন না-করে যদি, তাহলে বুঝতে হবে তার পেশাগত জীবন শেষের মুখে।

অফিস থেকে মহেশ হোয়াটসঅ্যাপ করেছে। রেগেমেগে জানতে চেয়েছে, আমি ছুটিতে আছি ভালো কথা কিন্তু কয়েকটা লেখা এডিট করব কি না। এখানে একটা ভুল করেছি। আমি এখন সিনিয়ার সাবএডিটর। ছুটি নিলেও সব কানেকশন অফ করে দেওয়া উচিত হয়নি। মহেশকে মিষ্টি করে উত্তর দিলাম, বললাম মাধুরীর জন্য এখান থেকে হ্যান্ডলুমের সুন্দর একটা কাঁথা কিনেছি। যদিও ভবি ভোলবার নয়। ফোন করলেই গাল পাড়বে, তাকে অথই জলে ফেলে আমি ভেগে গিয়েছি। মহেশ কাজপাগল। তাকে বোঝানো সম্ভব নয় যে, কখনো মানুষের এমন ফেজ আসে যখন তার ভেতরের সিস্টেমগুলো শাট ডাউন করে যায়। টানা দুই বছর আমি ছুটি নিইনি, কলকাতায় যাইনি। কোভিডের সময়ে বাড়ি থেকে সারাদিন কাজ করেছিলাম। এই দশদিনের কথাও আগে থেকে বলা ছিল—স্টোরিটা ফাইল করেই আমি ছুটিতে যাব। কিন্তু, মহেশ বুঝলে তো! ল্যাপটপে অফিসের টুকটাক কাজগুলো সেরে হাঁটতে বেরোলাম। বারবারার সঙ্গে একঝলক দেখা হল। কিন্তু, সে অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে বাগানের দোলনায় বসে। আমাকে যেন চিনতে পারল না। গতরাত্রে যা বলেছিল, হয়তো তার মদের খেয়াল। বৃষ্টির পর মিঠে হিম নেমেছে চরাচরে। আকাশ এখনও মেঘে ঢাকা। কাপড়ের পুতুল দুটো কাঁঠালগাছের ডাল থেকে আমার দিকে স্থির তাকিয়ে। মনে পড়ল গতরাতের জলাভূমির দৃশ্য। কেউ কি দেখছিল আমাদের? আজ সকালে জানালা খুলে আবার দেখেছি। একইরকম ম্লান ও নিস্পন্দ। নিষ্পত্র গাছের কঙ্কালে কয়েকটা পাখি বসে ছিল। নীচের কাদায় ঘোরাঘুরি করছিল একটা মোরগ। সে আমার দিকে ঘাড় বাঁকিয়ে স্থির হয়ে ছিল। ওপাশের জঙ্গল লেপাপোঁছা মুখে নিশ্চুপ।

গোমসের চায়ের দোকানে বসে আমার চোখে পড়ল, দীপিকা সরেন কাঁধে ব্যাগ নিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। হাতে তার কঞ্চি। সামনে চার-পাঁচটা ছাগল। চোখাচোখি হতে হাসল, ‘বেঁচে আছ? পালাওনি এখনও?’ তার পাশে হাঁটতে হাঁটতে তিতিরকান্নার মাঠে চলে এলাম। ছাগলগুলোকে খুঁটিতে বেঁধে দীপিকা মাথার চুল হর্সটেল করে বাঁধল, আড়চোখে আমাকে দেখে বলল, “অনেক প্রশ্ন আছে মনে হয়? দেখো যা করবার ঝটপট করে ফেলো। আমাকে এখান থেকে পঞ্চায়েত যেতে হবে। ওখানে সেল্ফ হেল্প গ্রুপগুলোর ভিডিয়োও মিটিং আছে আজ।’ আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম কেন ও বাড়িতে শাপ আছে বলেছিল।

‘আছে তো। অনেক বছর আগে ওদের বাড়ি থেকে একটা বাচ্চা নিখোঁজ হয়ে যায়। লোকে বলে, বাড়ির লোকেরাই নাকি গলা টিপে মেরে ফেলেছিল। তারপর জলাভূমিতে পুঁতে দেয়। তারপর ওদের বাড়ির একটার পর একটা লোক মরেছে। আরও কত গল্প! সবাই জানে এখানে।’ প্রান্তর তন্দ্রালু, আবছায়া গুমোটে প্লাবিত। এখান থেকে সার সার ভাঙা বাড়িদের দেখা যায় দূরে। মনে হয়, অন্ধচোখে ঘাড়গোঁজা বৃদ্ধের দল। ‘ওদের লোকে এড়িয়ে চলে। তার অ্যাংলো, খুব অহংকার ওদের। কিন্তু, এখন দেখো, পুরো ধ্বংসস্তূপ। ওই বাগানে কত যে সাপ! বাড়ির পেছনদিকটা দেখেছ? ভেঙে দিয়েছে। আমার বাবারা ওদের বাড়িতে ফাইফরমাশ খাটত। এখন কেউ যায় না। তুমি কেন এসেছ? এখানে কিছু পাবে না। আমাদের ছবি তুলে দু-পয়সা কামাবে যদি ভাবো, লাভ নেই। ওসব ছবি পচে গেছে। লোকে ভাবে ট্রাইবাল মানেই ধামসা, মাদল নিয়ে নাচবে আর মেঠো ইঁদুর ধরে মাংস খাবে। এখানে পিৎজার একটা দোকান হয়েছে, কিন্তু কেউ যায় না। সেটা বাদে ভালো খাবার কোথাও পাবে না, বুঝলে? পুনমদি ওখানে কাজ করে না? রান্না মুখে তুলতে পারো?’ বকবক করতে করতে দীপিকা এগিয়ে গেল। চেঁচিয়ে বলল, ‘আমরা থাকি ওসমান সাহেবের বাংলোতে। কিন্তু, সেখানে খবরদার এসো না। আমরা তোমাদের পছন্দ করি না, বুঝলে? তোমাদের দেখলেই বুঝি, শহরের লোক আমাদের উৎখাত করে কটেজ কিনে নেবে।’

‘তাহলে তোমার সঙ্গে যদি আবার দেখা করতে চাই? ফোন নাম্বার আছে?’

‘স্টেশনে গিয়ে খোঁজ করবে। অচেনা লোককে ফোন নম্বর দিই না। বাচ্চা মেয়ে না আমি?’ চোখ ঘুরিয়ে রহস্যের ইঙ্গিত করে দৌড়ে পালাল দীপিকা। তার পায়েরা অদৃশ্য হল ধুলোর মেঘে।

ফিরতে গিয়ে থমকে দাঁড়ালাম। সেন্ট জন’স চার্চ-এর পেছনের জঙ্গল দিয়ে শর্টকাট করছিলাম। দেখলাম কিছুদূর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন এক বৃদ্ধ। তাঁর পরনে পাজামা, কিন্তু খালি গা। সাদা দাড়ি, মাথায় এখানে-ওখানে খাপচা খাপচা চুল, জরাগ্রস্ত মুখ। বাম হাত কাঁপছে, ডান হাতে ধরে আছেন একটা টকটকে লাল রঙের ল্যান্ডফোনের রিসিভার। সেটার তার নেমে গেছে মাটিতে। তারে আটকানো ফোনের ক্রেডল মাটিতে ঘষটানি খেতে খেতে বৃদ্ধকে অনুসরণ করছে। মহুয়া, পিটিসের বাধা ও ঝোপঝাড় পেরিয়ে নড়বড় করতে করতে তিনি জঙ্গলের ভেতর ঢুকে যাচ্ছেন। এই ঠান্ডায় খালি গায়ে ঘুরছেন কেন? পাগল নাকি? বাড়ির লোক হয়তো এতক্ষণে খোঁজ শুরু করেছে। ইতস্তত করছিলাম, কাছে যাব কি? কিন্তু, বৃদ্ধ ততক্ষণে একটা ঝোপের আড়ালে অদৃশ্য হয়েছেন।

স্যাংচুয়ারিতে ঢুকতে গিয়ে দেখি, বেশ কিছু লোক বাগানে ঘুরছে। বারবারা এগিয়ে এল আমাকে দেখে। শুনলাম, আজ বাড়ির ভেঙে দেওয়া অংশটার জিনিসপত্র বার করা হচ্ছে। মালিকেরা চাইলে স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে রাখতে পারে, নাহলে ফেলে দেওয়া হবে। এরপর শুরু হবে পেছনের বাগানে জরিপের কাজ। মূল বাড়ি ভাঙা হতে অবশ্য দেরি আছে। ইতস্তত মিস্ত্রি, মজুরেরা ছড়িয়ে। তার মধ্যে আবার টিপটিপে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। স্যাঁৎসেঁতে মেঘলা দিন বিষণ্ণ করে তুলেছে গঞ্জের সকাল। বড়ো বড়ো পিচবোর্ডের বাক্সভরতি জিনিস এনে বাইরে রাখছে মজুরের দল। এক প্রৌঢ় সেগুলোকে অলস চোখে দেখছেন। মনে হল না একটাকে নিয়েও উৎসাহ আছে। বারবারা আলাপ করাল। এডওয়ার্ড ব্রাউন। লম্বা ও ছিপছিপে, তবে সুদর্শন মুখে অত মোটা গোঁফ থাকার দরকার ছিল না। এডওয়ার্ড হাসেন না। কথা বলেন মেপে। আমার সঙ্গেও মাপা ভদ্রতা করে হাত বাড়ালেন, ‘আপনার নাম শুনেছি বারবারার কাছে।’ তারপর কথা ফুরিয়ে গেল তাঁর। ভুরু কুঁচকে একটা কার্ডবোর্ডের বাক্স থেকে বাতিল বিয়ারের বোতল তুলে লেবেল ঘুরিয়ে দেখলেন। বিড়বিড় করলেন অসন্তুষ্ট গলায়। ভদ্রলোকের ইংরেজি উচ্চারণ খাঁটি অক্সফোর্ডের স্টাইলে। বারবারার মতো দেশি অ্যাক্সেন্ট না। কনভেন্ট স্কুলে পড়াশোনা করেছিলেন নাকি? পাজামা-পাঞ্জাবিতে যদিও রাজকীয় অ্যাংলো আভিজাত্য ফুটে বেরোবার প্রয়াস ছিল, কিন্তু তখন তাঁর ফোন বাজল। শুনতে পেলাম ‘চিকনি চামেলি’। তাড়াতাড়ি মুখ না-ফেরালে বিপদ হত, হেসেও ফেলতাম হয়তো।

একটা রংচটা ছাতা তুলে বারবারা বলল, ‘মনে আছে, বাবা এটা দিয়ে তোকে পিটিয়েছিল একবার? হাফইয়ার্লিতে ফেল করার পর বাড়িতে রেজাল্ট লুকিয়েছিলি। বাবাকে রেক্টর জানিয়ে দিয়েছিলেন।’

‘রেক্টর না, ওটা তুই।’ এডওয়ার্ডের ভুরু কুঁচকে গেল। ‘কলেজে উঠে নিজেকে বিশাল কেউকেটা ভাবতিস। ভাবতিস বাবার কাছে চুকলি না কাটলে ভাই মানুষ হবে না।’ ‘আমি না, আপন গড। আমি কি জেনিফার নাকি?”

‘তো, কী করতে চাস ছাতাটাকে নিয়ে? আমার মার খাবার স্মারক হিসেবে রেখে দিবি?” ‘অ্যারনকে দেব। তার বাপ ছোটো বয়েসে কেমন বাঁদর ছিল দেখবে। সে কোথায়?’

এডওয়ার্ড অসন্তুষ্ট গলায় ছেলের কীর্তিকলাপের বিবরণ দিচ্ছিলেন। এমবিএ শেষ করার পর দুটো চাকরি ছেড়েছে। ঘুরে বেড়ায় এদিক-ওদিক। দিল্লিতে কোন বন্ধু আছে, সে আবার তার থেকে বয়েসে অনেক বড়ো, তার বাড়িতে মাঝে মাঝে কয়েক সপ্তাহ কাটিয়ে আসে। ‘আমি বুঝছি না, এর পেছনের গল্পটা কী! এত বড়ো ছেলের কোনো বান্ধবী নেই! ওই বন্ধুর সঙ্গে অত খাতিরদারি কীসের?”

“তুইও তো গঞ্জে এসে মিলন চতুর্বেদীর মতো একটা ব্লাডি ওয়াইফ-বিটারের সঙ্গে গুজগুজ করিস সারাসন্ধে। কেউ কি তোকে জিজ্ঞাসা করে, কেন করিস?’

‘অ্যারন হোমোসেক্সুয়াল নয় তো? ছোটোবেলা থেকে দেখেছিস, পুতুল নিয়ে খেলত।

মারধর করে অনেক কষ্টে সে-স্বভাব ছাড়িয়েছিলাম। এত বড়ো ছেলের হবি কী, রান্না করা ! আমি ইতস্তত এদিক-ওদিক ঘুরছিলাম। আজকেই অন্য হোমস্টে-তে চলে গেলে ভালো হত। সারাদিন এখানে হইহট্টগোল লেগে থাকলে আমার পোষাবে না। অথবা, যদি কলকাতায় চলে যাই এখান থেকে? পুরোনো বাড়ির একপাশ কাত হয়ে ধসে গেছে মাটিতে। শ্যাওলা ধরা ইট, কাঠ, পাথর, সিমেন্টের টুকরোতে জায়গাটা ধুলোময়। গাছগাছড়ার জঙ্গল চারপাশে। ডুমুরের কচি ডালে পাতা আসার সময় হয়নি। ফলত, স্যাঁৎসেঁতে শীত ঘাড়গোঁজা আমাদের আর্দ্র ও ভারাক্রান্ত করেছিল। আমি হলে প্রাণে ধরে বাস্তুভিটে বিক্রি করতে পারতাম না । কিন্তু, এত বড়ো বাড়ি আমার হবেও না কখনো।

তখন আমি দেখলাম একপাশে অনাদরে পড়ে আছে একটা বাক্স, যার ভেতর থেকে লাল চামড়ার মলাটে বাঁধানো ‘ক্রাইম অ্যান্ড পানিশমেন্ট’ উঁকি মারছে। সোনালি অক্ষরে বাহারি ক্যালিগ্রাফি। এডওয়ার্ড অভিযোগ করছিলেন, বাড়িতে এত ফালতু বই ডাই হয়ে আছে যে, সেগুলো সরাতেই দু-দিন সময় যাবে। সব কিলোদরে বেচে দেবেন নাকি। বই তুলে দেখলাম, পাতাগুলোর প্রান্তভাগও সোনালি রঙের, পোকায় কাটেনি। বইটা খুলে কয়েকটা পাতা ওলটাতে গিয়ে কী যেন খসে পড়ল ভেতর থেকে। নীচু হয়ে চোখে পড়ল, একটা ছবি। সাদাকালো ও বিবর্ণ, হলদে আভায় যেন সিপিয়া টোন। পাতার ভাঁজে রাখা ছিল। এক কিশোরী গাছের ডালে হেলান দিয়ে বসে। পরনে ফুলছাপ ড্রেস হাঁটু অবধি। সানগ্লাস পরে হাসছে মেয়েটা। একটা হাত হাঁটুতে রাখা। অপর হাত আলস্যে ঝুলছে। ছবি দেখে মনে হয় সুন্দরী। কত বয়েস হতে পারে? হয়তো পনেরো বা ষোলো। আরও দেখা যাচ্ছে, ময়ূর ডিজাইনের ফুলস্লিভ সোয়েটার পরা একটা হাতের অংশ ছবির বাম দিক থেকে বাড়িয়ে ধরেছে। যেন মেয়েটাকে কিছু নিষেধ করতে চায় হাতের মালিক। গার্টার দিয়ে কিছুর সঙ্গে আটকানো ছিল ছবিটা। তুলে দেখলাম, পেছনে একটা প্লাস্টিকের প্যাকেট। প্যাকেটের ভেতর সম্ভবত চকোলেটের রাংতা গিঁট পাকানো এবং একটা চিঠি জাতীয় কিছু। প্যাকেটের মুখ খুলে চিঠিটা বার করতে গিয়ে দেখলাম সেটাকে জড়িয়ে রেখেছে একটা লম্বা লাল চুল। আশ্চর্য, এত বছর পরেও অবিকৃত থেকে যায়! লাল চুল কি ছবির মেয়েটার? সাদা-কালো ফটোতে চুলের রং বোঝা যায় না। চিঠি খুলে দেখলাম চার্চের লেটারহেড। বামদিকের একপাশে ক্রসচিহ্ন, ডান দিকে ইংরেজিতে লেখা লাতিন ফ্রেজ, প্যাক্স ভবিসকাম। এই কথাটার মানে আমি জানি। পিস বি উইথ ইউ। মেয়েলি হস্তাক্ষরে একটা অসম্পূর্ণ চিঠি। ‘Forgive me, father, for I have sinned. Two days back…’, এটুকুই। কনফেশন লিখতে গিয়ে লেখেনি মেয়েটা, হয়তো সাহস হয়নি। অথবা, তার ক্যাথলিক চার্চের পুরোহিতকে বিশ্বাস করতে পারেনি সে।

মুখ ফিরিয়ে উঁচু স্বরে বারবারাকে বললাম, ‘ছোটোবেলায় আপনি দারুণ সুন্দরী ছিলেন তো!’

বারবারা আর এডওয়ার্ড এগিয়ে এল। কিন্তু বারবারা অবাক হল, ‘এ তো অ্যাগনেসের ছবি। এখানে কী করে এল?’

‘আমার অবশ্য বোঝা উচিত ছিল, এটা আপনি না।’ বললাম আমি। ‘আপনারা প্রোটেস্টান্ট ক্রিশ্চান। কিন্তু, এ মেয়ে ক্যাথলিক কনফেশন লিখেছে।’

বারবারা বিড়বিড় করল, ‘অ্যাগনেস! কতদিন বাদে ওর ছবি দেখলাম। তোর মনে আছে এডওয়ার্ড?’ কিন্তু, এডওয়ার্ড দূরে অন্যমনস্ক দাঁড়িয়ে। বারবারা তাঁকে আবার অ্যাগনেসের কথা জিজ্ঞাসা করল। এডওয়ার্ড মাথা নেড়ে অস্পষ্ট কিছু বললেন, তারপর অনির্দেশ্য তাকালেন আকাশের দিকে।

“চিঠি কি মেয়েটাই লিখেছে? আবার লাল চুলে জড়ানো।’ চিঠি, চুল আর চকোলেটের রাংতা বারবারার হাতে তুলে দিলাম।

‘অ্যাগনেসের চুল ছিল লাল।’

‘আপনাদের আত্মীয়? ’

মাথা নাড়ল বারবারা, ‘টাউনের একটা মেয়ে। হারিয়ে যায়। কেউ তাকে খুঁজে পায়নি।’ তারপর বিড়বিড় করল, ‘ক্রিসের মতো।’ আমার দিকে পূর্ণদৃষ্টি মেললে তার ভেতর পাগলাটে বুড়িকে আমি খুঁজে পেলাম না, সম্ভবত প্রথমবার। ‘আমি বলেছিলাম আজ তোমাকে ক্রিসের গল্প বলব। তুমি কি শুনবে?’ আমি তাকে বললাম যে, এটা আমার কাজ নয়। তার ওপর চিনি না কাউকে। ‘অবিনাশ তোমার কথা বলেছে। ও পুলিশে চাকরি করত। জানে সব। একটা রহস্য, একটা—’ বিভ্রান্তভাবে বারবারা কথা হাতড়াচ্ছিল। অসহায় চোখে তাকাল আমার দিকে, ‘তুমি কি জানো, সমাধান না-হওয়া রহস্যের অভিঘাত কী হয় একটা পরিবারে?’

আমার মনে হল, এখনই হোমস্টে পালটাবার উত্তম সময়। কিন্তু সাংবাদিক সত্তা যাবে কোথায়? উত্তর দিলাম, ‘বেশ, শুনব নাহয়। তবে, কোনো কথা দিচ্ছি না। এই অ্যাগনেস, এর কী গল্প ছিল?’

‘কিছুই না। হারিয়ে যায়, আর ফেরেনি। লোকে এখনও ওর ভূত দেখে। এই টাউনে অ্যাগনেসের ভূত বিখ্যাত । ‘

মিস্ত্রি, মজুরদের কেউ কেউ এসে দাঁড়িয়েছিল। তারা বাইরের লোক, অ্যাগনেসকে তাদের জানার কথা নয়। তবে, সকলে একবাক্যে স্বীকার করল, মেয়েটা সুন্দরী। ছবিটা হাতে হাতে ফিরছিল। ফলত, খবর ছড়াল। টুকটাক একজন দু-জন এসে দেখে যাচ্ছিল ছবিটাকে। কেউ কেউ স্থানীয় লোক, তারা অ্যাগনেসকে চিনতে পারল। সে নাকি প্রায় চল্লিশ বছর আগে হারিয়ে যায়। চিঠি দেখে কেউ কিছু বলতে পারল না। বারবারা ছবি ও প্লাস্টিকের প্যাকেট ব্যাগে ঢোকাবার আগে কী মনে হল আমার, ফোনে সবক-টার ছবি তুলে নিলাম। তখন চারপাশ অন্ধকার করে শীতের ঘ্যানঘ্যানে বৃষ্টি নেমেছে ঝুপঝাপ। চোখে পড়ল, সামনে যে মাঠ, তার একপাশে উঁচু ঝোপজঙ্গল আবছায়া বানিয়েছে। তার ওপাশে দাঁড়িয়ে আছে ছাতা মাথায় একজন। লোকটার পাশে একটা কুকুর বসে। দু-জনেই নিস্পন্দ। জায়গাটায় ঘন গাছের ছায়া। তার ওপর মেঘলা দিন বলে লোকটার মুখ বোঝা যাচ্ছে না। কিন্তু সে এবং তার পোষ্য যে আমাদেরই দেখছে, বেশ বোঝা যায়। তবু কাছে আসছে না। আলাপ করার বাসনা আছে বলে মনে হল না। ওভাবে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকা অস্বস্তিকর। আমি বারবারার দিকে মুখ ফেরালাম, ‘লোকটাকে দেখলেন?’ বারবারা ভুরু তুলল। হাত তুলে দেখাতে গিয়ে আবিষ্কার করলাম, জায়গাটায় কেউ নেই ।

.

‘এতক্ষণে একটা রোমাঞ্চের আবহ আসছে। পুরোনো বাড়ি, রহস্যময় ছবি, অচেনা ছায়ামূর্তি।’ হালকা গলায় বললেন সোমেন কর্মকার।

কফিতে চুমুক দিয়ে সিগারেট ধরালাম। ‘ছায়ামূর্তি অচেনা ছিল না তো। সেদিনই আলাপ হয়েছিল। রকির বাবা । ”

‘রকি কে?’

‘পোষা কুকুরটার নাম রকি। আমি ভদ্রলোকের নাম জানতাম না বলে রকির বাবা বলে ডাকতাম।’

‘পুলিশের কাছে আপনার স্টেটমেন্টে রকির বাবার উল্লেখ নেই।’ বললেন অক্ষয় মাহাতো।

‘আমি তাঁর নাম জানতাম না। তিনি কে, সেই পরিচয়ও জানিনি। কিন্তু, আমার তদন্তে তিনি একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিলেন।’ অনিশ্চিত গলায় উত্তর দিলাম।

‘বুঝলাম না। কীরকম গুরুত্বপূর্ণ? তাঁর পরিচয় পাওয়া তো অসম্ভব ছিল না। ওইটুকু ছোটো শহর—’

‘আমি বাদে তাঁকে কেউ দেখেনি।’

অবিশ্বাসের চোখে দু-জন তাকিয়ে থাকলেন আমার দিকে। চোখ সরিয়ে কফির কাপে চুমুক দিলাম। । অনেক জিনিসের ব্যাখ্যা আমার কাছে আজও নেই।

‘দেখেনি মানে? একটা জলজ্যান্ত মানুষ, কুকুর আছে—

‘বারবারা, অবিনাশ, টমাস অ্যাক্টায়ার, সবাইকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম আমি। সেরকম চেহারার কাউকে চেনে না এলাকার মানুষ। কুকুরটাকেও দেখেনি। কিন্তু, প্রায়ই রাত হলে তাঁর সঙ্গে দেখা হত আমার। রকিকে হাঁটাতে বেরোতেন। তাঁর নাম জিজ্ঞাসা করেছি, উত্তরে হেসেছেন। অবশ্য কোথায় থাকেন সেটা আমি জানতাম। শহরের বাইরে একটা পুরোনো কটেজে। কিন্তু, একদিন দুপুরে তাঁর খোঁজে গিয়ে সে-কটেজ আমি তালাবন্ধ দেখেছি।’ সোমেন আর অক্ষয় একে অপরের দিকে তাকিয়ে কাঁধ ঝাঁকালেন। ‘দেখুন, যা ঘটেছে, কোনো ব্যাখ্যায় না-গিয়ে আমি সেটুকুই বলব, শুনতে যত অবিশ্বাস্য লাগুক না কেন। এতদিন পরে বানিয়ে বলে আমার লাভ নেই। কেসটা আপনারা শুনতে চেয়েছেন। আমি নিজে থেকে বলতে তো আসিনি !”

‘আপনি পুলিশের স্টেটমেন্টে উল্লেখ করলে হয়তো তাঁকে খুঁজে বার করা যেত তখন।’ ‘কী বলতাম? একজন মানুষ যাঁর সঙ্গে আমি কথা বলতাম, আমার তদন্ত নিয়ে আলোচনা চালাতাম, কিন্তু তাঁর নাম ঠিকানা জানি না? আপনারা ভুলে যাচ্ছেন, পুলিশ দায়সারাভাবে আমার স্টেটমেন্ট নিয়েছিল, মূলত অন্যদের চাপে। সেইসময়ে আমি শহর ছাড়লে তারা বাঁচে। কেন তারা এত পুরোনো কেস নিয়ে মাথা ঘামাবে? আমার উৎসাহ ছিল, কিন্তু তাদের তো থাকার কথা নয়।’

অক্ষয় মাহাতো বড়ো নিশ্বাস ছাড়লেন। ‘তার থেকেও বড়ো কথা, পুলিশ তখন কীভাবে জানবে যে, তিন বছর পরে একটা খুন হবে যা হয়তো এসবের সঙ্গে সম্পর্কিত।’

‘আপনি এখনও বললেন না, কেন আমাকে জড়াচ্ছেন। আমি নিশ্চয় সন্দেহভাজন নই ? সেইসময়ে আমি কলকাতায় এবং কুশীলবদের সঙ্গে আমার যোগাযোগ নেই গঞ্জ ছেড়ে আসার পর থেকে। চাইলে কল রেকর্ডও চেক করতে পারেন। অবশ্য আমার ধারণা, সেসব আপনি জানেন। তাহলে, কেন?”

‘ছবি দুটো দেখে কী মনে হল?’

‘ইন্টারেস্টিং। হত্যাকারী যখন একটা মৃতদেহকে এভাবে সাজিয়ে রাখে, সে হয়তো কোনো বার্তা দিতে চায়। আর—’, বলব না ভেবেও বলে ফেললাম, ‘আশ্চর্য লাগছে এটা ভেবে, এই টাউনে যখন যে অপরাধ ঘটে, সেটা কি সর্বদাই এরকম বিদঘুটে মার্কা হয়?”

‘আপনার মনে হচ্ছে না, তিন বছর আগেকার ঘটনাগুলোর সঙ্গে এর যোগ আছে?’

কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থাকলাম। কী উত্তর দেব এর? যদি যোগ থাকেও-বা, আমি কি নিজেকে এসব থেকে সরিয়ে নিইনি? মাথা নামিয়ে মৃদুগলায় বললাম, ‘সেগুলো আপনাদের খতিয়ে দেখার কথা। আমি কীভাবে সাহায্য করতে পারি বলুন?’

সোমেনের ফোন এল। ‘হ্যাঁ স্যার’, ‘করে দিচ্ছি স্যার’ বলতে বলতে ঘরের বাইরে বেরিয়ে গেলে মিনিটখানেক আমরা দু-জন চুপ করে থাকলাম। আমি সিগারেট খেতে খেতে বারবারার কথা ভাবছিলাম। গঞ্জ ছেড়ে আসার পর একবার ফোন করেছিলাম, কিন্তু বারবারা ফোন তোলেনি। রিংব্যাকও করেনি। বহুদিন হল আমি ঔদাসীন্যকে বর্ম বানিয়েছি। যা হোক, কিছু আসে-যায় না।

অক্ষয় মাহাতো আমাকে নিবিষ্টচোখে দেখছিলেন। চোখাচোখি হতে সেই হাসিটা দিলেন, যা এতক্ষণ হেসেছেন। সহৃদয় মানুষের সহানুভূতির হাসি, যাতে চোখ ছোটো হয়ে কুঁচকে যায় কপাল। ‘একটা জিনিস জানার কৌতূহল আছে। আপনি সাংবাদিকতা ছাড়লেন কেন?’

‘ভাববেন না, এই ঘটনার কারণে ছেড়েছি। তারপরে দিল্লি ফিরেছি, চাকরি করেছি মাস ছয়েক। কিন্তু, তারপর ইচ্ছে করছিল না। আমার বলার মতো গল্প শেষ বলে মনে হয়েছিল। তাই মিডিয়াকে “টা টা” করে কলকাতায় চলে আসি। সিম্পল। আপনি সিগারেট খান? ‘ ‘ছেড়ে দিয়েছি। ষোলো বছর আগে কন্যা জন্মেছিল যখন।’

‘আজ একটা খেতে পারেন। লম্বা গল্প। বাইরে দেখুন, আকাশ কালো করে বৃষ্টি হচ্ছে। এই সময়টুকুর জন্য আমাদের কোথাও যাবার নেই। ফলত—’, প্যাকেট বাড়ালাম। ইতস্তত করলেন অক্ষয়, তারপর একটা সিগারেট তুলে নিলেন।

.

দুপুরের পর থেকে গুমগুমে নৈঃশব্দ্য নেমে এল বাড়িতে। মিস্ত্রি-মজুরদের দল চুপচাপ পায়ে হাঁটছিল, যেন তারা কারোর ঘুম ভাঙাতে চায় না। এত লোক দেখে বারবারার সম্ভবত প্রেশার বেড়ে গিয়েছিল। মাঝে মাঝে তার উচ্চ গলার চিৎকার বাড়ির নির্জনতাকে আরও জমাট বানাচ্ছিল। ঝোড়ো বাতাস জলাভূমির ওপর দিয়ে পচা গন্ধ বয়ে আনল যখন, জানালার সামনে বসে আমি নিজেকে প্রশ্ন করলাম— কেন আছি এখানে? কলকাতায় না-ফিরে এরকম চাপা অবসাদের জায়গায়, যেখানে বাড়ির মালকিনের কথাবার্তা ঠিকঠাক লাগছে না। হাজাররকম গুজব দাঁতচাপা ফিসফিসানিতে ছায়া নামিয়ে আনছে আমার ওপর, তবু সেখানে আজও থেকে গেলাম শুধুমাত্র পুরোনো কিছু গল্প শোনার আশায়? কী আসে-যায়, এটা তো আমার স্টোরি মেটিরিয়াল হবে না! অমীমাংসিত রহস্য বিষয়ে আমার লেখা সিরিজ তিন বছর আগে পাট গুটিয়ে ফেলেছে। ঠিক করলাম, আজকের সন্ধেটা দেখি। কাল চলে যাবার বন্দোবস্ত করব।

বিকেল বেলা হাঁটতে বেরিয়েছিলাম, কারণ হাতে কাজ ছিল না। এখন বেলা মরে আসে তাড়াতাড়ি। বৃষ্টি থেমে হাওয়ায় চোরাটান উঁকি দিচ্ছে। লাইটপোস্ট ঘিরে পুঞ্জ রচনা করেছে মশাদের দল। ধু-ধু মাঠ হেমন্তের থিতোনো আলোয় নৈশ অপেরা নিঃঝুম। কাছেপিঠে ভাঙা কটেজের দল এক-একটা গল্পের কেন্দ্র হয়ে দাঁড়িয়ে। স্যাংচুয়ারি থেকে ডাইনে বাঁক নিয়ে কিছুদূর হেঁটে গেলে রাস্তার একটা মোড় আসে। সেখানে যে কটেজটা দাঁড়িয়ে, তার গল্প গতকাল আমাকে শুনিয়েছিল বারবারা, যখন গাড়িতে করে নিয়ে এল। তাদের স্কুলের এক শিক্ষক লি স্যামুয়েলস-এর কটেজ। লি ছিলেন কেরলের ক্রিশ্চান। কামিনী-কাঞ্চন থেকে দূরে সারাজীবন ব্ল্যাকবোর্ডে অঙ্ক কষে কাটাবার পর পঁচাত্তর বছর বয়েসে পৌঁছে এক আঠেরো বছরের তরুণীকে বিয়ে করেছিলেন। সেই মেয়েটার ওজন ছিল তিরিশ কেজি। সে ফলের রস বাদে কিছু খেত না। তার ফ্যাকাশে চামড়া এত পাতলা ছিল যে, স্পষ্ট বোঝা যেত রক্তচলাচল। মেয়েটিকে ঘরে তালাবন্ধ রেখে বৃদ্ধ মিস্টার স্যামুয়েলস থুথুড়ে পায়ে স্কুলে আসতেন। ক্লাস নিতেন, ঘুমিয়ে পড়তেন ক্লাস নিতে নিতে, ছেলেদের ওপর রাগ করে ডাস্টার ছুড়ে মারতেন। বিকেল হলে টলায়মান পায়ে বাড়ির তালা খুলতেন, তখনও অন্ধকার ঘর। একটু পরে দেখা যেত, দু-জনে ছাদে বসে। মিসেস স্যামুয়েলস মুখ হাঁ করে রেখেছে জ্যোৎস্নার উৎসে, যেন পান করবে। আর বুড়ো ঘুমিয়ে পড়েছেন বউয়ের কাঁধে মাথা রেখে শোনা যায়, মেয়েটি মাঝে মাঝে স্বামীর সামনে পোশাক খুলে নগ্ন হত। তার ফিনফিনে হাওয়ায় গড়া কোমর দু-হাতে জড়িয়ে পায়ের ফাঁকে মুখ গুঁজে দিতেন স্যামুয়েলস। সেভাবে বসে থাকতেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা। তাঁর বৃদ্ধ পিঠ কাঁপত। মাথায় অল্প যে কয়েক গাছি পাকা চুল ছিল, সেগুলোতে হাত বুলিয়ে দিত মিসেস স্যামুয়েলস। সে কারোর সঙ্গে মিশত না। সারাসকাল শুয়ে থাকত। তারপর একদিন স্যামুয়েলস মরে গেলেন। দরজা হা-হা করছিল দু-দিন ধরে। পচা গন্ধ এসেছিল। কৌতূহলী প্রতিবেশীরা উঁকি মেরে দেখেছিল, সম্পূর্ণ নগ্ন অবস্থায় খোলা চোখে মাটিতে পড়ে আছেন মিস্টার স্যামুয়েলস। তাঁর শরীর কুঁচকে গেছে। লিঙ্গ করুণ ও অজস্র বলিরেখাময়। শুকিয়ে যাওয়া ঊরু দেখে বাজপড়া ফলসার ডাল মনে হচ্ছিল। ডাক্তার বলেছিলেন, হার্ট অ্যাটাক। সেই মেয়েটিকে আর কেউ কখনো দেখেনি। লোকে বলে, সে নাকি হাওয়ায় মিশে গিয়েছিল। জ্যোৎস্না উঠলে তিতিরকান্নার হলুদ মাঠে কেউ দেখেছে, কুচফলের গাছেরা গা জড়াজড়ি করে যে ঝোপ বানিয়েছে, তার পাশে কাঠির মতো রোগা এক নগ্ন মেয়েমানুষকে শুয়ে থাকতে। কৌতূহলী হয়ে কাছাকাছি এগোতে গেলে সে ঢুকে গেছে ঝোপের ভেতর, খুঁজে পাওয়া যায়নি। এডওয়ার্ডরা তখন কৈশোরে পদার্পণ করেছেন। তাঁরা কয়েক জন বন্ধু দেখতে গিয়েছিলেন মিস্টার স্যামুয়েলস-এর কটেজ। খাঁ-খাঁ করছে। দরজা খোলা ছিল। মাঝে মাঝে একটা শুকনো হাওয়া বইছিল দীর্ঘশ্বাসের মতো। ধুলোর দল টোপর হয়ে পাকিয়ে উঠছিল শূন্যে। বাড়ির ভেতর সব একরকম। চেয়ার-টেবিলখাট শান্ত শুয়ে আছে। টপ টপ করে ভাঙা কলের জল পড়ার আওয়াজ আসছিল। সিলিং ঘেঁষে একটা মোটা টিকটিকি স্থির। তার চোয়ালে আটকানো খয়েরি আরশোলা মাঝে মাঝে ফরফর করছিল। ভয় পেয়ে ছেলের দল পালিয়ে আসে।

‘মেয়েটাই হয়তো খুন করেছিল। করে পালিয়ে গিয়েছিল।’

‘অথবা, মরে গিয়েছিল সে নিজেও। তাই লোকে ওর ভূত দেখত। প্রেম করলি কিনা বুড়ো বয়েসে এসে, যখন কলকবজা কাজ করছে না। ব্লাডি পুরুষগুলো বোঝেও না, ভালোবাসার থেকে ইউটিআই বেশিদিন স্থায়ী হয়।’ গাড়িকে স্যাংচুয়ারিতে ঢোকাবার সময়ে বারবারা উত্তর দিয়েছিল।

এই গল্পগুলো মাটি পাবে চিরতরে, যেদিন বারবারাদের প্রজন্ম থাকবে না। এখনই অনেকে ভুলে গেছে, কারণ বেশিরভাগ কটেজ পরিত্যক্ত। লোকজন চলে গেছে কানাডা বা অস্ট্রেলিয়া। কোনোটার হয়তো দখল নিয়েছে কেয়ারটেকারের ফ্যামিলি। অথবা স্থানীয় দেহাতি কি মূলনিবাসীরা ঢুকে গেছে। আবার, অনেক কটেজ এমনিই পড়ে আছে, ঝোপজঙ্গলে ঢাকা। এখন পরিকল্পনা চলছে এগুলো ভেঙে হোটেল, স্পা সেন্টার, পুলপার্টির স্থান বানাবার। ধানবাদের একটা রিয়েল এস্টেট এগিয়ে এসেছে, যারা বারবারাদের বাড়িটাকেও কিনেছে। জায়গাটাকে পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে জনপ্রিয় না-করলে স্থানীয় অর্থনীতিতে জোয়ার আসবে না।

অন্ধকারে নিজের মনে হাঁটছিলাম। হঠাৎ পায়ের কাছে ফোঁস আওয়াজ শুনে চমকে চোখ নামালাম। একটা বাদামি ল্যাব্রাডর আমার হাঁটু শুঁকছে। কুকুরটার গলার লিস লুটোচ্ছে মাটিতে। কুকুর আমি ভালোবাসি। কিন্তু, এভাবে অন্ধকারে হুট করে এল, কামড়ে দেবে না তো, ভাবতে ভাবতে এদিক-ওদিক চোখ চালাচ্ছিলাম তার মালিকের খোঁজে। দেখলাম জঙ্গল থেকে একটা লোক রাস্তায় নেমে আসছে। মৃদুস্বরে ডাকছে ‘রকি!’ কুকুরটা তড়বড় করে তার দিকে ছুটে গেলে লিস ধরে বকুনি দিল মালিক। ভদ্রতার ঘাড় নেড়ে হাঁটতে শুরু করেছি, তখন ডাক এল, ‘তনয়া ভট্টাচার্য?’

পিছু ফিরলাম। লোকটা এগিয়ে এসে হাসিমুখে মাথা ঝোঁকাল। একমুখ দাড়িগোঁফ, পঞ্চান্ন মতো বয়েস। ভারি কাচের চশমা, মাথায় কানঢাকা টুপি। জোব্বা ধরনের সোয়েটার পরে আছেন বলে ভাল্লুকের মতো লাগছে। চেহারা দেখে মনে হল, এঁকেই আজ বারবারাদের বাগানের অপরপ্রান্তে দেখেছি।

‘আপনার কথা অনেক শুনেছি। জানি শহরে এসেছেন। আলাপ করার ইচ্ছে ছিল কিন্তু সংকোচ হচ্ছিল, জানেন! আজ রকির কল্যাণে আলাপ হয়ে গেল। ও যদি দুষ্টুমি করে দৌড় না-লাগাত—,’ ভদ্রলোক কথা শেষ না-করে হাঁমুখে বড়ো নিশ্বাস ছাড়লেন আর হিম ধোঁয়া বেরিয়ে ল্যাম্পপোস্টের আলোর বিপরীতে বিচিত্র ডিজাইন বানাল।

তিনিই আজ বাগানের ধারে দাঁড়িয়ে ছিলেন কি না, প্রশ্নের উত্তরে হাসলেন। দেখলাম রকির লিস ধরে আমার পাশাপাশি হাঁটছেন। অনেক কথা বলে গেলেন ভদ্রলোক ৷ অমীমাংসিত রহস্য বিষয়ে আমার লেখা সিরিজটা পড়তেন মন দিয়ে। যখন জেনেছেন আমি এসেছি, ভেবে রেখেছিলেন একদিন দেখা করে অনেক প্রশ্ন করবেন। কোথায় থাকেন জিজ্ঞাসা করাতে জঙ্গলের ভেতর হাত তুললেন, ‘আহমেদ সাহেবের বাংলো বলে লোকে। ‘ কখন বিদায় হবেন, ভাবতে ভাবতে এগোচ্ছিলাম। নিজের সময়টুকুতে অন্যের সঙ্গে ভ্যাজর ভ্যাজর ভালো লাগে না। তখন ভদ্রলোক বললেন, ‘আমি কিন্তু খুব খুশি হয়েছি জানেন, আপনি ব্রাউনদের বাড়ি উঠেছেন বলে। ওখানে না-থাকলে ওই ছবিটা তো আপনি পেতেন না!’

লোকের মুখে খবর ছড়িয়েছে তাহলে। ‘অ্যাগনেস বলে কোনো মেয়ের ছবি শুনলাম।’ ‘এমন একটা মেয়ে, যে হারিয়ে গেছে। মনে রাখেনি কেউ। তাই না?’ নিরুত্তর ঔদাসীন্যে ফোন দেখলাম। এই ইঙ্গিতেও বিদায় না-নিলে আজকের সন্ধেটা গেল। এবং বিদায় নিলেন না। উলটে বললেন, ‘দেখুন না খোঁজ নিয়ে একবার। হয়তো অভূতপূর্ব কোনো রহস্যের সন্ধান পাবেন।’ কত মানুষ যে আমাকে এরকম হাবিজাবি রহস্যের সন্ধান দেয় ! কাঁধ ঝাঁকালাম ভদ্র হেসে। ‘সত্যিই দেখবেন, না, কথার কথা? আপনারা বিখ্যাত মানুষ মিস ভট্টাচার্য! আমি জানি, আমাদের মতো আম-আদমিরা অনেক আবোল-তাবোল প্রত্যাশা রাখে আপনাদের কাছে। ফলত, সবাইকেই স্তোকবাক্য দিয়ে থাকেন আপনারা। কিন্তু, আমি সত্যিই চাই, জানেন, ছবির মেয়েটার ব্যাপারে আপনি খোঁজ নিন। ভীষণভাবে চাই।’ হাসিমুখে বলছিলেন, কিন্তু গলায় কিছু ছিল, ফলত, ফোন থেকে আমার চোখ উঠল। ‘কেন বলুন তো?’

ভারী কাচের ওপার থেকে চোখ দুটো বড়ো লাগছিল। যেন ঝিকমিক করছিল নক্ষত্রের দল। ভুরু উঁচিয়ে বললেন, ‘রকিও চায়। আপনার হাতে ছবিটা গেছে বলে ও খুশি হয়েছে। আজ বলল আমাকে।”

‘অ্যাগনেসকে চিনতেন আপনি?

‘আমি এখানে নতুন এসেছি। এটুকু জানি, অ্যাগনেস বহু বছর আগে হারিয়ে যাওয়া একটা মেয়ে ছিল, যে নিজেকে মেডুসা বলে ডাকত।’

‘মেডুসা?’

‘ছোটো শহর, কিছু ঘটে না এখানে। সবাই ভাবে আমাদের জীবন খুব ম্যাড়ম্যাড়ে। কিন্তু, অনুত্তেজক জীবনের ভেতরেই আসল রহস্যগুলো লুকিয়ে থাকে, জানেন!” ‘কীরকম রহস্য?’ ,

রকি দূরের দিকে তাকিয়ে গোঁ গোঁ করল। কুয়াশায় ভালো বোঝা যায় না। তার মালিক লিসে টান দিয়ে পিঠে চাপড় মারলেন দুটো। ‘রকি বুড়ো হয়ে গেছে। নয় বছর হল। কিন্তু, খুব ভীতু। নির্ঘাত বেড়াল-টেড়াল দেখে ভয় পেয়েছে।”

আমার চলে যাওয়া উচিত, কিন্তু তার বদলে দাঁড়িয়ে পড়লাম। ‘আপনি কি এই মেডুসা সম্পর্কিত রহস্যের সমাধান আমাকে দিয়ে করাতে চান?’

‘তিন বছর আগে দার্জিলিঙে এক অমীমাংসিত হত্যার সমাধান আপনি করেছিলেন। তাই এটুকু প্রত্যাশা করা কি অন্যায়?”

‘এখানে কার হত্যা হয়েছে?’

‘হয়তো কারোর নয়। কিন্তু আপনি যদি খুঁজে পান, এই ছবিটা ওই বাড়িতে গেল কীভাবে, সেটাও একটা বড়ো ব্যাপার, না?’ আবার ঝিকিমিকি চোখ হেসে উঠল। ‘আমি গোয়েন্দা নই।’

‘পারলে আপনিই তো পারবেন, মিস ভট্টাচার্য। গত চল্লিশ বছর ধরে যে রহস্যের সমাধান হয়নি,’ ভদ্রলোক থেমে গেলেন।

‘তার মানে আপনি জানেন এই ছবির পেছনের রহস্য। তাহলে আমাকে খুঁজতে বলছেন কেন?’

‘কারণ, আমি তো সমাধান জানি না! আর নিজে খুঁজতেও পারব না!’ করুণ কণ্ঠে উত্তর দিলেন। ‘বয়েস হয়েছে। দ্রুত হাঁটতে গেলে হাঁফাই। সুগার, কোলেস্টেরল খেয়ে ফেলছে আমাকে। রকিরও চোখে ছানি। দিনের আলোতে দেখলে বুঝবেন। একদিন আসুন না আমার কটেজে! রকি খুব খুশি হয় অতিথি দেখলে। আসে না তো কেউ!’

‘আমি দুঃখিত। রহস্যের সমাধান আমার পেশা বা হবি নয়।’

‘আচ্ছা, আচ্ছা। আমিও দুঃখিত, যদি জোর করে থাকি। বয়েস হচ্ছে তো, কথাবার্তায় তালজ্ঞান থাকে না। কিছু মনে করবেন না, প্লিজ। কিন্তু আপনি অবশ্যই একদিন আসুন। আমার খুব লোভ, বাস্তব জীবনে রহস্যের সমাধান করেছেন এমন কাউকে মিট করব।’

বিরক্ত হবার কথা কারণ সময় নষ্ট হচ্ছে। তবু খারাপ লাগছিল না। অমায়িক টাইপের মানুষটা হয়তো বকবক করতে ভালোবাসেন। রকি আমার পা শুঁকছে। লেজ নাড়ছে ঘন ঘন। হেসে বললাম, ‘আসব একদিন। কিন্তু, আপনার পরিচয়টাই তো জানা হল না।’

‘আমিই নিয়ে যাব আপনাকে। সেদিন পরিচয়পর্বটাও হবে নাহয়? যদি বেকন ভালোবাসেন, তাহলে নিরাশ হবেন না। আমার স্টকে নানারকমের সঞ্চয় আছে।’ ভদ্রলোক রকিকে নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে এগিয়ে গেলেন। মুখ ফিরিয়ে বললেন, ‘কথা হবে মিস ভট্টাচার্য! ভালো থাকবেন।’ তারপর হারিয়ে গেলেন ভেজা অন্ধকারে। সন্ধের আকাশে কয়েকটা নিশাচর পাখি ওড়াউড়ি করছে। জঙ্গলের ভেতর থেকে বুড়ো পেঁচা ডেকে উঠল একবার। আমার মনে হল, লোকটা পাগল, অথবা, বৃদ্ধ বয়েসের মতিভ্রম। নিজের পরিচয় দেব না, কীসের রহস্য তা বলব না, এদিকে চাইব আদ্যিকালে কে নিখোঁজ হয়েছিল তার সমাধান করবে অন্য কেউ!

কিন্তু, বাড়ি ফিরে অস্বস্তি যাচ্ছিল না। এ যেন হারানো ইতিহাস খুঁড়ে বার করা। তেমন ইচ্ছে আমার নেই, কেননা প্রতিটা মানুষের জীবনেই এমন রহস্য থাকে যাদের প্রত্যেকটার ওপর সার্চলাইটের দপদপে আলো ফেলা প্র্যাকটিকাল নয়। তবুও অচেনা এক মানুষ চায় আমি তার সমাধান করি। কেন আমাকেই, তার উত্তর জানি না। দার্জিলিঙেও আমি তো সমাধান করতে যাইনি, একটা গল্প লিখতে গিয়েছিলাম। নিজের ঘরে ফোন খুলে আবার ছবিটা দেখলাম। ঝলসানো রোদে পোড়া হলুদ ছবি। অচেনা হাতের মালিক। কিশোরীর হাস্যমুখ। নুয়ে থাকা গাছের ডাল। এগুলো পেরিয়ে একটা ধু-ধু বিষণ্ণতা ছবিকে অধিকার করেছে। কিশোরী কী কনফেস করতে গিয়েছিল? কী ছিল তার পাপ? এর সঙ্গে কি যোগ ছিল তার অন্তর্ধান রহস্যের?

টোকা পড়ল আমার দরজায়। বারবারা।

.

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *