১৩
কারণ তাহারা পড়িলে এক জন আপন সঙ্গীকে উঠাইতে পারে ; কিন্তু ধিক্ তাহাকে যে একাকী, কেননা সে পড়িলে তাহাকে তুলিতে পারে, এমন দোসর কেহই নাই ।
— Ecclesiastes | 4:10
.
আর রোদ মরে এল। বাগানের আম পেকে টসটস করছিল। সেই গন্ধে খিদে পাচ্ছিল আমার। কিন্তু আমি ঢোঁক গিলে নিজের লালা খেলাম, স্বাদ ষাটে। হিল্ডা পাশে বসে ছিল, হাত চেপে ধরলাম ওর। খেতে গেলে বমি হয়ে যাবে। যেভাবে এডওয়ার্ডকে ওরা—ওর নাক, চোখ, মুখ বোঝা যাচ্ছে না, ফুলে বিকট, লাল টসটসে। বাবা দুমদুম করে বাগানে ঘুরছে আর মা থমথমে মুখে ইজিচেয়ারে শুয়ে। বাবা বলছে, গাছটাই রাখবে না। কিন্তু, ওদের কী দোষ ছিল! এডওয়ার্ড আমাকে বলেছিল আগুনে পড়পড় করে পুড়িয়ে মারবে ওদের। ওর নাকি পোড়া গন্ধ শুঁকতে ভালো লাগে।
বহু বছর আগেকার গুদামঘরের স্মৃতিতে আমি হয়তো সত্যিই একা ছিলাম না। ক্রিস সেখানে ছিল, অ্যাগনেস, আরও অন্যেরা, যাদের তখনও জন্ম হয়নি। যারা ভবিষ্যতে ধু-ধু একা হয়ে যাবে, একা একা হারিয়ে যাবে যারা। এমনকী তাদের স্মৃতিরাও এত নির্জন হয়ে উঠবে যে, সেগুলোর সামনে দাঁড়ালে আমাদের বুক কেঁপে উঠবে ভয়ে। সেই নিঃঝুম অস্তিত্বগুলোর কাছে আমার একটা দিনের গুদামঘরের স্মৃতি ফিকে হয়ে যায়। তারা হয়তো ভবিষ্যৎ থেকে এসে আমার পাশে হাঁটু মুড়ে বসেছিল, কারণ ওটাই তারা পারত। যেমন আজ এই যে আমি পোড়োমাঠের দিকে তাকিয়ে বসে, কে বলতে পারে জঙ্গলের ওপার থেকে ক্রিসও একইভাবে আমার দিকে তাকিয়ে বসে নেই? কিন্তু, আমাকে সবাই পাগল ভাবত, কারণ আমি ক্রিসকে দেখতে পাই। বহু বছর দেখিনি যদিও, তবু জানতাম ও ওখানেই লুকিয়ে থাকে সারাদিন। সন্ধেবেলা কাপাস, মহানিম, অশ্বত্থ আর বাবলা গাছেরা হাওয়ায় লুটোপুটি খায় যখন, যখন ভাঙা চাঁদ জলাভূমির ওপর পড়ে শত টুকরো হয়, ফিসফিসে ধ্বনিতে আমাদের টাউন ঢেকে যায়, সেইসময়ে ক্রিস বেরোয়, ঘুরে বেড়ায় জঙ্গলের ভেতর অথবা বেতবনের ধারে শুয়ে থাকে। কিন্তু, কেউ একথা বিশ্বাস করত না, কারণ তারা ক্রিসকে দেখেনি কেউ, আমি বাদে।
ওকে শুইয়ে রাখা হয়েছে, ব্যান্ডেজ সর্বাঙ্গে। হিল্ডা আমার পাশে দোলনায় বসে মাথা হেলাল।
—তুই আমাদের বাড়ি চল আজ রাতে।
–না রে, মা-কে দেখতে হবে আজ।
–আগেও বলেছি, তোর ভাইয়ের বয়েস বাড়েনি।
—কিন্তু ও তো ভীতু ছিল, খুব নরম মনের
—তাহলে কেন এভাবে পুড়িয়ে মারতে যাবে?
–নাকি, মৌমাছিগুলো ওর জানালার কাছে ভোঁ ভোঁ করে, ঘুমোতে দেয় না ওকে। যখন মাটিতে আছড়ে পড়ছে, আমরা ছুটে যাচ্ছি ওর দিকে, তখনও চেঁচিয়ে বলেছে, আই উইল বার্ন দেম অল !
আমি দিব্যি গেলে বলতে পারতাম ক্রিস সেই সোয়েটারটা পরে ছিল যেটা আমি ওর জন্য বুনেছিলাম। সোয়েটারটাকে পরে খুঁজে পাওয়া যায়নি। তবু কাউকে বোঝানোর দায় তো আমার নেই! বাবাকে তবু বলেছিলাম। ততদিনে বাবা একা বসে মদ খায় সারাদিন, ঘরের আলো জ্বালালে চিৎকার করে ওঠে, কিন্তু আমার কথা শুনে উশকোখুশকো চুলে তাকিয়েছিল, চোখ ছিল লাল, বাবা গ্লাস তুলে শুধু বলেছিল, ‘উল্লাস’। আমাকে অবিশ্বাস করার সাধ্য বাবার ছিল না, কারণ তার বছর কয়েক আগে অ্যাগনেসের ভূতকে জলাভূমির ধারে ঘুরে বেড়াতে দেখে বাবা অজ্ঞান হয়ে যায়, চোখের কোলভাগ দিয়ে গড়িয়ে এসেছিল জল। তার পর থেকে বাবাও আর বাবার মতো ছিল না, নুয়ে যাচ্ছিল, একা হয়ে যাচ্ছিল যেন, ঘরের ভেতর নিজের ছায়াকে ভয় পেত। মায়ের ওপর চিৎকার করে উঠেই চমকে নিজের হাতের দিকে তাকাত, ফ্যাকাশে হত তার মুখ। আমি সাহস করে উঁচু গলায় দুটো কথা বললে স্থির হয়ে যেত তখন থেকে। এটাই সম্ভবত বয়েসের পরিণতি। আর, ক্রিসের ঘটনা ছিল কফিনে শেষ পেরেক। যখন শুনেছিল ক্রিসকে আমি দেখি, তখন সন্ধে হয়েছিল, বারান্দার ডুমবাল্ব ঘিরে জমা হয়েছিল মথপোকাদের দল। বাবা ছিল লম্বা চেহারার দশাসই মানুষ। নিঃসঙ্গ ঘরে বসে বসে নিজের গলা টিপে ককিয়ে উঠতে চাইত। অনেক মদের অন্ধচোখ নীরবে আর্তনাদ করত, বাবার দিকে তাকিয়ে।
কিন্তু, সে ছিল বুড়োমানুষের দুর্বলতা। বাকিরা আমায় পাত্তা দিত না। হয়তো মুখ লুকিয়ে হাসত, বা, ভুরু কুঁচকে হতাশ মাথা নাড়ত আমার কথা শুনে, অথবা, এডওয়ার্ডের মতো রেগে যেত। তখন আমার মনে হত, আমি সারাজীবনের জন্য ওই গুদামঘরেই আটকে থেকেছি, আর বেরোইনি। কিন্তু, অক্ষয়কে এত কথা বলে কী লাভ? আমি মোটা বুড়ি, মুখ খারাপ করি আর মদ খাই। আমার মনের ভেতর কী চলে সেসব জেনে ও কী করবে?
তনয়ার পায়ের কাটা জায়গাগুলো ডলোরেস ড্রেসিং করতে করতে জানাল কালকেই যেন একটা টেটভ্যাক নেয়। তনয়া সংকুচিতভাবে বসে ছিল। ‘সরি’ বলল অনেকবার। হল ঘরে রাখা বাক্সগুলোর ভেতর দিয়ে ঘুরতে ঘুরতে লালুরাম এসে তনয়ার হাতে নাক ঘষে গেল। ও-ও বুঝেছে, মেয়েটা ব্যথা পেয়েছে। তনয়া লজ্জিত মুখে ডলোরেসকে বাধা দিল। ‘আচ্ছা, হয়েছে! বললাম না, আমি নিজেই তোমার কাছে আসব ভাবছিলাম। কারণ, একাধিকজন আমায় জানিয়েছিল তুমি অ্যাগনেসের ব্যাপারে খোঁজ চালাচ্ছ। তাই কৌতূহল হয়েছিল। কিন্তু আগে বলো তো, ভর সন্ধেবেলা একা একা পাগলের মতো জঙ্গলের ভেতর ঘুরছিলে কেন?’ কুরুশকাঁটা হাতে তুলে আমি নিজের অনুমান জানালাম— ছুঁড়ি বয়ফ্রেন্ড জুটিয়েছে, তাই মিট করতে গিয়েছিল। তনয়া ভর্ৎসনার চোখে তাকালেও গ্রাহ্য করি না। গতকাল যখন বেথেল মিশনের সামনে পুতুলটাকে পেয়েছিলাম, আমি ওকে যতবার বলেছি ক্রিসের কথা, ও উড়িয়ে দিয়েছে। নাকি, সবই আমার কল্পনা। তাহলে আমার কী দায় পড়েছে ও ছুঁড়ির প্রতি নরম হবার? ‘ভাগ্যিস, আমি তখন ফিরছিলাম ওখান দিয়ে! আমার এক বাল্যবন্ধু বহুবছর হল মুম্বাইতে থাকে, ওর দাদা সেখানকার স্টুডিয়োপাড়ায় কাজ করেন। ওরা ছুটিতে বাড়ি এসেছে। ওর সঙ্গে দেখা করতে দয়াপুর গিয়েছিলাম, ফেরার পথে ওই রাস্তাটা শর্টকাট হয়। হাঁটতে হাঁটতে দেখি পাগলের মতো ঘুরছে, আবার দৌড়ে গেল খানিকটা, শেষমেষ খাদের দিকে পা বাড়িয়েছে যখন, ছুটে গেলাম।’ ডলোরেস জানাল আমাকে।
“ভালো হয়েছে। বহুকাল আসিস না এদিকে। আজ খেয়ে যাবি।’ ডলোরেস আপত্তি করছিল, ধমক দিলাম। ‘বাড়ি গিয়ে করবি তো পাগল-ছাগলের সেবা, সেই করে করে বুড়ো হয়ে গেছিস। একটা লাভার পর্যন্ত জোটাতে পারিসনি। অত ব্যস্ততার কী আছে রে? কে থাকবে তোর পথ চেয়ে? থাক এখানে! খেয়ে যাবি।’ ডলোরেসকে বলতে পারি এসব, কত ছোটো থেকে দেখছি ওকে! মাঝে কত বছর কথা হয়নি যে, ভুলেই যেতাম আমরা এক টাউনে থাকি।
‘ডলোরেসকে দেখে আমার কী মনে হচ্ছিল, জানো?’ রাত্রিবেলা আমার পাশে বসে কুরুশ করতে করতে তনয়া বলল। ততদিনে ওরও কুরুশের শখ জন্মেছে। ‘মনে হচ্ছিল, একটা বিশাল লাইব্রেরি ঘরে আমি যেন হারিয়ে যাচ্ছিলাম। ঠাসাঠাসি বইয়ের দল সার সার শেলফ থেকে আমাদের দিকে তাকিয়ে, তাদের বাদামি স্পাইনে সোনালি জল করা ক্যালিগ্রাফি দেখে মনে হচ্ছিল, আমরা মধ্যযুগের কোনো বেনেডিকটাইন মঠে বসে আছি। এক্ষুনি হয়তো অন্ধ লাইব্রেরিয়ান জর্জে সরু গলিপথ দিয়ে আবির্ভূত হবেন, হাতে কালান্তক মোমবাতি। আমাদের সামনে বসে আছেন এক সন্ন্যাসিনী। ঋজু, গম্ভীর, শান্ত।’ ডলোরেস
লম্বায় প্রায় সাড়ে পাঁচ ফুট, বসন্তলাঞ্ছিত ফর্সা মুখ, চওড়া কপালে জোড়া ভুরু, বয়েসের ছাপ চামড়াকে হালকা কুঁচকেছে। কপালের ওপর চশমা তুলে কথা বলছিল। ওর উচ্চারণ বেশ অভিজাত, কোথা থেকে শিখল? অ্যাগনেসের তো এমন ছিল না? ম্যাগি তো কঅক্ষর গোমাংস মনে হয়। তনয়া বেশ কাব্যি করে বলছে আবার, ‘এমন উচ্চারণ কণ্ঠস্বরকে শ্রুতিমধুর করে, ঠোঁটের চলনকে গাম্ভীর্য দেয়।’ বাবা, কী কঠিন সব উপমা! তবে ডলোরেসকে অনেকদিন পর কাছ থেকে দেখেছি—ব্যস্ত, আত্মবিশ্বাসী। ভালো লাগে। কেউ তো তবু কাজ নিয়ে আছে! কিন্তু এ ছুঁড়ি লেসবিয়ান নাকি?
—আমি এখান থেকে চলে যেতে চাই, জানিস, কিন্তু কোথায় সেটা জানি না। আমি জানি তুইও চলে যাবি তাড়াতাড়ি। তোর তো মাস্টার্স করার শখ। কিন্তু, হিল্ডা বড়ো চোখে আমাকে নীরবে দেখছিল।
—অনেক বছর আগে তুই আমাকে কামড়ে দিয়েছিলি, মনে আছে?
—হঠাৎ এই কথা?
হিল্ডা মাথা নাড়ল নিজের মনে, আমি একই জায়গায় আটকে ঘুরে যাচ্ছি, বার্বি।
-কী হয়েছে তোর, এত নিঝুম থাকিস কেন আজকাল ?
হিল্ডা মৃদু হাসল।
‘এসব শুনে এই মনে হল তোমার, প্রফেসর স্প্রাউট?’
‘জানি না বাপু! ওসব হলে আমার দিকে নজর-ফজর দিয়ো না যেন! আর দাঁত মাজো তো? ওরা খুব নোংরা শুনেছি।’
‘উফ।’ তনয়া কুরুশ কাঁটা ফেলে দিল কোলে। তারপর যেন কেঁপে উঠল একবার। ‘বারবারা, আজ ওই জঙ্গলের কুয়াশা—আমার মনে হচ্ছিল চারধারে সব কিছু মরে গেছে, এমনকী গাছেরাও, মনে হচ্ছিল আমি কোনোদিন এখান থেকে বেরোবার রাস্তা খুঁজে পাব না।’ চোখ বন্ধ করে মাথা ঝাঁকাল জোরে। ‘ছাড়ো এসব। তোমার কী মনে হয়? ডলোরেস যা যা বলে গেল, দেখে তো মনে হল না ও বিশ্বাস করে অ্যাগনেসের ভূত বলে কিছু আছে।’ আমি ওকে আমার ধারণা জানালাম। ডলোরেস জানে যে, অ্যাগনেস পালিয়েছে। মায়ের পেটের বোন, পিঠোপিঠি বয়েস, না-জানাটাই অস্বাভাবিক ছিল। হয়তো দিদির মুখ চেয়ে বলেনি কাউকে। কিন্তু, তনয়া আমার এই তত্ত্বকে গ্রহণ করল না। ‘তাহলে ওরকম ব্যাকুলভাবে আমার হাত চেপে ধরেছিল কেন?’ হয়তো নিজে মুখ ফুটে বলতে পারছে না। তাই চায় তনয়া খুঁজে বার করুক।
সারারাত আমি বাগানে বসে, ঘরে এডওয়ার্ডের তখন জ্বর এসেছে। আমগাছ থেকে ঝুলে থাকা চাকটা ফোপরা খটখটে। বাবার হুকুমে ধোঁয়া দিয়ে তাড়ানো হয়েছে ওদের।
আমার ছেলেকে এভাবে—বাবার মুখে রাগ থমথম করছিল। এডওয়ার্ড প্রি-টেস্টে ফেল করেছে। বাবা জানে না। মা ভয়ে কাঁপে, বাবাকে বলতে বারণ করে, নাহলে ছেলেটাকে মেরে ফেলবে।
.
এদিকে ওই লোকটা, রকির বাবা, সে নাকি তনয়াকে জানিয়েছে যে, অ্যাগনেস খুন হয়েছিল। এসব কথায় পাত্তা দেবার প্রশ্ন নেই। ছোটো শহরে গুজব যেভাবে কানাকানি ভিড় করে, তনয়া যদি জানত! কথায় কথায় বলল, মেডুসার চুল ছিল সাপ দিয়ে তৈরি। আমার ওসব মনে আসেনি বাবা! সাপ না আরও কিছু! আমার ঠাকুমার লাল চুল ছিল। তাঁকে আমি বছর তিনেক বয়েস পর্যন্ত দেখেছি। খরখরে ইটরঙা নুড়ির মতো লাগত, মনে হত পরচুলো। ‘খুব দুরন্ত ছিল? অ্যাগনেস?’ জিজ্ঞাসা করল তনয়া।
‘খুব। আমাদের বাড়ি এসে কম দুষ্টুমি করেছে? একবার তো মই থেকে পড়ে গেল। দোতলা সমান উঁচু। আমরা ভয়ে কাঠ। পরের মেয়ে, যদি কিছু হয়ে যায়। ও মা, দেখি হিহি করে হাসতে হাসতে তড়াক করে উঠে দাঁড়াল। তবে, একটা গুণ ছিল ওর। বাইবেল পড়তে ভালোবাসত।’ আস্তে আস্তে সব মনে পড়ছে কারণ স্মৃতির ঘোলাজল ঝাঁকানি খেয়েছে। ‘এক-একটা প্যাসেজ মুখস্থ বলে যেতে পারত। এদিকে অন্য পড়ায় মন নেই কিন্তু ‘
‘এত সুন্দর দেখতে—ধরো, ওকে কেউ বিক্রি করে দেয় যদি?’
‘কী জানি! আমরা ভেবেছিলাম পালিয়ে গেছে।’
‘কিন্তু, জেনিফার বলল অ্যাগনেসের অনেক বয়ফ্রেন্ড ছিল। তাদের কারোর সঙ্গে পালায়নি তো?’ তবে, তনয়াকেও বুঝতে হবে যে, জেনিফারের সব কথা ধরতে নেই। ওইটুকু মেয়ে, তার আবার বয়ফ্রেন্ড! অবশ্য থাকতেও পারে, আমার মনে নেই সব। দুইএকটা ছেলেকে নিয়ে অশান্তি হয়েছিল মনে হয়। নাকি, ওই বিহারি ছোঁড়াটাকে নিয়ে এতদিন আগের কথা, ভুলে গেছি।
গলার ভেতর শুলোচ্ছে, মনে হচ্ছে লুকিয়ে একটোক—বাবার দেরাজে থাকে, কিন্তু বাবা এখন নিজের চেয়ারে জেগে বসে আছে। মা চুপচাপ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে ভেতরে ঢুকে গেল। এখন আবার অলটারের সামনে মাথা কুটবে। বাবা বলেছে এডওয়ার্ডকে বোর্ডিং স্কুলে পাঠিয়ে দেবে। ও নাকি লুকিয়ে সিগারেট খাচ্ছে।
আমার একটা জিনিসে খটকা লাগল। ডলোরেস এই শহরে থাকে, এডওয়ার্ডও থাকত । অন্যদের কথা বলার সময়ে একবারও ডলোরেসের স্মৃতিবিভ্রম হয়নি। কিন্তু মনীষার নাম মনে করতে পারল না। এদিকে মনীষা ছোটো থেকে এখানে আছে, সবাই তাকে রেভারেন্ডের মেয়ে হিসেবে ভালোমতোই চেনে। গঞ্জ তো খুব ছোটো জায়গা। সেখানে অ্যাংলো পরিবার হাতে-গোনা। তাদের একজন সদস্য আরেকজন কাছাকাছি বয়েসি মহিলার নাম ভুলে যাবে, যেখানে দু-জনেই বহু বছর এখানে কাটিয়েছে, এটা অদ্ভুত না?’
‘আমিও আজকাল অনেকের নাম মনে রাখতে পারি না। বয়েস হয়েছে, বুঝলে?’ ‘আমাকে অনেকগুলো জিনিস ভাবাচ্ছে, বারবারা! কালকের পুতুলটা দেখে ইস্তক মনে হচ্ছে—’ কিন্তু আমি ওকে থামালাম।
‘তোমার থিয়োরি আমি শুনতে চাই না। কারণ, তুমি কখনোই মানবে না এর সঙ্গে ক্রিস জড়িয়ে।’
‘কোনো যুক্তিতেই মানব না।’ তনয়ার স্বর হঠাৎ কঠিন হল, তারপর যেন হারিয়ে গেল অন্ধকারে। ভাসা ভাসা স্বরে বলল, ‘যা আমার লজিকাল সিস্টেমের বাইরে, তাকে আমি মেলাব কীভাবে?’
‘তাহলে ক্রিসের সঙ্গে অ্যাগনেসকে কোন লজিকে জড়াচ্ছ? শুধুমাত্র তোমার ষষ্ঠেন্দ্রিয়, আর কী?’ তনয়া উত্তর দিল না।
স্মিতমুখে মাথা নাড়ল ডলোরেস। ‘তবু ভালো কেউ মনে রেখেছে! আমি কিছু নাবললেও এসব কেস তো চাইলেই পুলিশের মহাফেজখানা থেকে বার করা যায়।’ কিন্তু সব কিছু আর্কাইভে থাকে না, থাকে মানুষের স্মৃতিতে, সেটা ডলোরেসও জানত। অ্যাগনেস কেমন ছিল? প্রশ্নটা শুনে ডলোরেস চট করে উত্তর দিল না। চায়ের কাপ নাড়াচাড়া করছিল। ফোন করে কাউকে একটা বলল মায়ের ওষুধের ব্যাপারে। তারপর মুখ তুলে ফিকে হাসল, ‘যতই সময় বয়ে যাক, এরকম ক্ষত তো মেলায় না!’ ডলোরেসের স্মৃতির অ্যাগনেসের সঙ্গে জেনিফারের স্মৃতির অ্যাগনেসের বিশেষ তফাত নেই দেখলাম। উন্মাদনা, পুরুষসঙ্গ এসব ডলোরেসও বলল। তবে, ডলোরেস বাড়তি যেটা জানাল, অ্যাগনেসের চিকিৎসা শুরু হয়েছিল। কারণ, তার রাগ এবং অস্থিরতাকে থামানো যাচ্ছিল না শেষের দিকে। হুমকি দিত, বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দেবে। অনেক সময়েই গাছ থেকে নামতে চাইত না। ‘এখানে গোপন করার কিছু নেই। আমার মায়ের সম্বন্ধে নিশ্চয় শুনেছ। মায়ের সিজোফ্রেনিয়া। মায়ের দিদিমা শুনেছি উন্মাদ হয়ে গিয়েছিলেন। এগুলো জিনের মধ্যে থাকে। তবে, মা ভায়োলেন্ট হয়নি কখনো। অ্যাগনেস মাঝে মাঝেই হিংস্র হয়ে উঠত। একবার আমার মুখোমুখি বসে কথা বলতে বলতেই খোলা ফাউন্টেন পেন আমার হাতে গেঁথে গর্ত করে দিয়েছিল। শিরা পর্যন্ত ঢুকে গিয়েছিল। তার দাগ আছে এখনও।’ কুর্তির হাতা কনুই পর্যন্ত গুটিয়ে হাত পাতল। কবজির চামড়ায় কোঁচকানো দাগ, তিন ইঞ্চি লম্বা। দাগের পায়ের কাছে একটা গর্ত এখনও চোখে পড়ে, হাতের তালুর ঠিক নীচেই গর্তটা। সেখান থেকে দাগটা উঠে গেছে ওপরদিকে ‘এইখানে গেঁথে গর্ত করে দিয়েছিল। তারপরেও ছাড়েনি, টেনে দিয়েছিল অনেকটা। সেলাই পড়েছিল।’ হেঁটে দরজার সামনে দাঁড়াল ডলোরেস। সামনে হা-হা মাঠ। লালুরাম সেখানে দাঁড়িয়ে হাওয়া খাচ্ছিল। ডলোরেসকে দেখে একবার ম্যা করে ডেকে উঠল। ‘মনে আছে তোমার? আমরা ঘাসবনের ভেতর লুকোচুরি খেলতাম। আমি অবশ্য কম এসেছি এ বাড়িতে। বাবা যেতে দিত না কোথাও। অ্যাগনেস বার দুয়েক নিয়ে এসেছিল।’ নীচু হয়ে ঝুঁকে লালুরামের গলায় আদর করল ডলোরেস। ‘অ্যাগনেস আমাকে ভালোবাসত কিন্তু। ওর থেকে পাঁচ বছরের ছোটো আমি, আগলে রাখত স্কুলের বুলিদের থেকে। আমার খাতা মলাট করে দেওয়া, স্কুলের ক্রাফটের কাজে সাহায্য করা, জ্বর হলে, আর তো কেউ করার ছিল না, জলপটি, ওষুধ সবই ও করত। শুধু রেগে গেলে—’ ডলোরেস আনমনা হয়ে জলাভূমি দেখছিল। ‘ছোটোবেলায় আমি ভাবতে ভালোবাসতাম, অ্যাগনেস এখানে লুকিয়ে আছে।’ ডলোরেসকে আমি জানালাম, ক্রিস এখানে লুকিয়ে। সে ঠোঁট টিপল। একটু আগে আমার পাশে বসে ক্রিসের ঘটনা নিয়েই জানতে চাইছিল, কোনো সুরাহা এতদিনে হল কি না। কিন্তু এখন সেরকম চোখে তাকাল, যেন বিশ্বাস করছে আমায়। বহুকাল কেউ করে না।
‘অ্যাগনেসের কোনো ছবি আছে? এমনি, কারণ নেই, ইচ্ছে হল দেখি।’ বলল তনয়া । ‘বাড়িতে আছে অনেক। আসতে পারো। তবে মায়ের শরীর তো, কখন বিগড়োয় জানি না। সেসব সময়ে বাইরের কাউকে পছন্দ করে না। নাহলে এমনিতে ঠিক আছে। কেউ তো আসেও না। আমরাও অসামাজিক হয়ে গেছি নানা কারণে। ‘আমার বাড়িতে আসতে পারিস তো। সবাই চলে গেল, এই গুটিকয় তো আছি আমরা।’
‘আসব। এর আগে তোমার মতো করে কেউ তো বলেনি এরকম আসতে! সেটাও হয়তো খুব অস্বাভাবিক নয়। আমি সোজাসুজি কথা বলতে ভালোবাসি। বাড়িতে এরকম ইতিহাস থাকলে তারা সমাজে গ্রহণীয় হয় না বিশেষ। আমরা হতে চেয়েছি কি না, সেটাও জানি না। বাবা চায়নি জানি। আমার ইচ্ছে-অনিচ্ছের দাম সেই ছোটো বয়েসে কে দেবে ! অ্যাগনেস চলে যাবার পর তো আরওই ছন্নছাড়া হয়ে গেল সব। বাবা রাত করে ফিরত। সকাল হলে বেরিয়ে যেত। আমি চাইলে সামাজিক হতেই পারতাম। অ্যাগনেসের মতো প্রচুর বন্ধুবান্ধব বানাতে পারতাম। কিন্তু, সেই ফর্মেটিভ বছরগুলোতে আমার কোনো বন্ধু হয়নি। স্কুল থেকে বেরিয়ে বাড়ি ফিরে আসতাম, কারণ ভাবতাম মায়ের দেখাশোনা করতে হবে, ওটাই একমাত্র কাজ। অন্য কোথাও যেতে ভালোও লাগত না আমার। সেটা যে আসলে অবসাদ, বড়ো হয়ে বুঝেছি। নিজের চেষ্টায় কাটিয়েছি তখন। রাঁচির কলেজে পড়তে গেছি। ফিরে এসে খালারির একটা স্কুলে চাকরিতে ঢুকলাম। কিন্তু, আমি জানতাম এখান থেকে বেরোতে হবে। শোক আমার সারাক্ষণের সঙ্গী হতে পারে না। বহু বছর পর একটা সুযোগ পেয়েছিলাম, কলকাতায় একটা স্কুলে চাকরি নিয়ে চলে গেলাম, সেটা ২০১২। কিন্তু, ভুল ভেবেছিলাম। পাকাপাকি ছিঁড়ে বেরোনো আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না। মা যা-ই হোক না কেন, তাকে কী করে অস্বীকার করতাম আমি? ফিরে এলাম তিন বছর পর, কারণ বাবা মারা গেল। কিন্তু, বাইরে একা থাকার সময়টা আমাকে মানসিকভাবে শক্ত করেছিল।’ বলতে বলতে দরজা থেকে তনয়ার দিকে ঘাড় ফেরাল ডলোরেস। মুখে একদিকে আলো পড়েছে, অন্য পাশ অন্ধকার, মোমের মূর্তি মনে হয়। ‘অনেক বেশি কথা বলে ফেললাম, তাই না? এত কিছু তো শুনতেও চাওনি তোমরা।’
‘না, আপনি বলুন। আমার অন্তত শুনতে ভালো লাগছে। ভালো লাগছে বলাটা হয়তো অসংবেদী শোনাচ্ছে কারণ স্মৃতিগুলো তো সুখের নয়। কিন্তু, আপনার মতো মন খুলে সোজাসুজি কথা বলা মানুষদের আমার ভালো লাগে।’
হেসে ঘাড় নোয়াল ডলোরেস। ‘তুমি পারবে, অ্যাগনেসের কী হয়েছিল খুঁজে বার করতে?’
‘আমার ক্ষমতা সীমিত। তবে—
“না, আমি জানি। কিচ্ছু বলতে হবে না। তুমি যদি গল্প শোনার জন্যেও আসো তাতেও আমার ভালো লাগবে কারণ বহু বছর পর অ্যাগনেসের নাম কেউ উচ্চারণ করল।’ ‘আচ্ছা, ওকে নাকি মাঝে মাঝে এখানে-ওখানে দেখা গিয়েছে বলে একটা জনশ্রুতি আছে। আপনি নিশ্চয় জানেন!”
‘জানব না আবার! মানুষ কত কিছু বানায়! আমি যখন ছোটো ছিলাম, এসব শোনার পর জোহার হালে-তে চুপি চুপি গিয়ে অনেক রাত পর্যন্ত বসে থাকতাম। যদি অ্যাগনেসের দেখা মেলে। কবরখানাতেও। কিচ্ছু দেখিনি। তবে, সেও তো বহুদিন হয়ে গেল। খেয়াল করে দেখবে, অ্যাগনেসকে তারাই দেখত, যারা পুরোনো দিনের মানুষ ছিল, যারা ওকে মনে রেখেছে। আর, নতুন প্রজন্ম’, হাসল ডলোরেস, ‘তারা জানে না কে ছিল অ্যাগনেস, তাই তারা দেখেওনি। ও যেন এক বিগত যুগের স্মৃতির অবশেষ, আমাদের গঞ্জের মতোই, যাকে সবাই ভুলে গিয়েছে। এমনকী তার প্রেতও অপ্রাসঙ্গিক। তাই না?’
‘ও চলে যাবার পর আপনাদের বাড়িতে কী হল? মানে, আপনারা সেই পরিস্থিতিকে সামলালেন কীভাবে? খুবই ইনসেন্সিটিভ প্রশ্ন হয়ে যাচ্ছে কি?”
সারাদিন গিটার, ঝ্যাং ঝ্যাং, বাড়িতে আমার অস্থির লাগছে। মা লুকিয়ে টাকা দিয়েছিল, কলকাতার নিউ মার্কেট থেকে আনিয়েছে। ওর ঘরের দরজা বন্ধ। সিগারেটের ধোঁয়ায় দমবন্ধ লাগে। বাবা বেশিরভাগ সময় হোটেলে থাকে বলে বাঁচোয়া। একদিন বাবার পুরোনো অ্যাম্বাসাডার চালিয়ে বন্ধুদের নিয়ে রাঁচি পর্যন্ত ঘুরে এল, এদিকে লাইসেন্স নেই। বাবা বাড়ি ফিরে সব শুনে আবার চাবুক বার করল। কিন্তু এবার ও কাঁদল না, চেঁচাল না, ঠোঁট টিপে বাবার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকল। তাতে খেপে গিয়ে আরও জোরে চাবুক—পাশের ঘরে মা কানে দুই হাত চেপে বসে, কিন্তু আমার কষ্ট, দুঃখ হচ্ছিল না। আজ মাথা ধরে যাচ্ছে আওয়াজে, সুর নেই, তাল নেই, যেন দড়াম করে মাটিতে আছড়াচ্ছে। কিন্তু, আমি ওকে কিছু বলব না। আমাকে দাঁত চিপে গালাগালি দেয়, বেরিয়ে যেতে বলে। ওকে থাপ্পড় মারার জন্য হাত তুলি যদি, হাত ধরে ফেলে। ওর গায়ে কী জোর! আমি কি আবার গুদামঘরে গিয়ে বসব? বসব, বন্ধ করে দেব দরজা, আর অন্ধকার গিলে খাবে আমাকে। ওখানে আওয়াজ যায় না, আমি দু-চোখ বন্ধ করে লুকিয়ে পড়তে পারি।
চায়ে চুমুক দিয়ে ডলোরেস বলল, ‘এতদিন পরে এগুলো ইনসেন্সিটিভ লাগে না। জন্ম থেকে মা-কে দেখে আসছি, অধিকাংশ সময়ে বিছানায় শুয়ে নিজের মনে আবোল-তাবোল বকছে। ঘর অন্ধকার করে রাখত, আলো সহ্য হত না। বাবা আমাদের যেতে দিত না মায়ের কাছে। যতদিন পয়সা ছিল, ন্যানি রেখেছিল। তারপর আর টানতে পারছিল না। অ্যাগনেসকে আমি দোষ দিই না। ওরকম পরিস্থিতিতে অনেকেই চাইবে বাইরে গিয়ে বাঁচতে। কিন্তু, আমার যাবার উপায় ছিল না, কারণ এক তো আমি ছোটো, অনেক সময়েই বাইরে একা যাবার অনুমতি পেতাম না। তার ওপর আমার স্বভাবটাও ছিল বই মুখে পড়ে থাকা। ওকে আমার হিংসে হত খুব, সেই বয়েসে যা হয়! ওর এত ছেলেবন্ধু, কারণ সুন্দর দেখতে। কিন্তু, আমার দিকে কেউ ফিরে তাকায় না। এড়িয়ে যায়, নয়তো উপেক্ষা করে। এদিকে অ্যাগনেসের মাথায় অত বুদ্ধি ছিল না কিন্তু, যে যা বলে সেটাকেই বিশ্বাস করত। মিলিটারি মান্ডির ঝাড়ফুঁক বলো অথবা জেনিফার গর্ডনদের ভূতের গল্প, সরল বিশ্বাসে মানত অ্যাগনেস। প্রায় বারো বছর বয়েস অবধি বিশ্বাস করেছে সান্তাক্লজ আছে, ব্যাপারটা অদ্ভুত নয়? আমার মনে হয় ছেলেরা ওর এই সারল্যের সুযোগটাই নিয়েছিল। কিন্তু, আমার থেকে তো তেমন সুযোগও চায়নি কেউ। সেই বয়েসে রাগ হত। মনে হত, আমিও ওর মতো উচ্ছল হব কাল থেকে। কিন্তু, কার সঙ্গে? আমি তখন বেঁটে রোগা ফড়িং-এর মতো একটা মেয়ে, মুখ ভরতি ব্রণ। তার ওপর নার্ভাস হলে তোতলাতাম। দিনে দিনে স্ট্যামারিং বেড়ে যাচ্ছিল, কারণে-অকারণে নার্ভাসনেস ট্রিগার করছিল। বড়ো হয়ে অনেক কষ্টে কাটিয়েছি। বাবা মা, তাদের যেটুকু এলোমেলো মনোযোগ, ভালোবাসা, এমনকী রাগও, সে যত ছন্নছাড়া ধরনের হোক না কেন, সবই যেন অ্যাগনেসের ওপর। বাবা বাড়িতে থাকত না, নিজের মতো করে পালাবার জগৎ বেছে নিয়েছিল, তার ডাক্তারখানার চেম্বার। মা ভালো থাকলে বসার ঘরে আসত, সেলাই করত অথবা রেডিয়ো চালিয়ে গান শুনত। সেইসময়গুলো আমার মনে হত, সব ঠিক হয়ে গেছে। রোদে ঝলমল করছে ফ্রন্টইয়ার্ড। তারপর সেসব দিন আসত, মায়ের কনফিউশন, আমাদের চিনতে না-পারা, নিজের মনে বকবক করা। মায়ের এক দাদা স্কুলে পড়ার সময়ে টাইফয়েডে মারা গিয়েছিল। মা তাকে দেখতে পেত। তার সঙ্গে কথা বলেছে অনেকদিন। তখন অবশ্য আমাদের কিছু করতে হত না, মা নিজেই ঘরের দরজা বন্ধ করে দিত, ভেতর থেকে দাদার সঙ্গে মায়ের কথাবার্তার আওয়াজ পেতাম আমরা। ওষুধ, খাবার কিছু খেত না। অনেক অনুনয়, বিনয় করলে দরজা ফাঁক করে নিয়ে নিত। এরকম হয়তো টানা দু-দিন, তিনদিন। তারপর দরজা খুললে আমি ভয়ে ভয়ে ঢুকে দেখতাম খাটের এককোনায় বসে আছে জড়োসড়ো হয়ে। আমাকে তখনও চেনে না। অ্যাগনেসকে ডলোরেস বলে ডাকছে আর আমাকে অ্যাগনেস। ঘরের আলো জ্বালাতে দিত না। কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থাকার পর আমি আবার ফিরে যেতাম, বাইরের ঘরে বই নিয়ে পড়তে বসতাম। অ্যাগনেস সন্ধের আগে ফিরত না। ওর ছেলেবন্ধুরা ওকে পৌঁছে দিত। আমি দেখতাম গেট খুলে ঢোকার সময়ে হাসতে হাসতে ঠোঁটের লিপস্টিক হাত দিয়ে মুছে ফেলছে। বাবা ফিরত আরও রাতে। আমি আর অ্যাগনেস তখন নিজেদের ঘরে পাশাপাশি খাটে শুয়ে পড়েছি। বাবা নিঃসাড়ে খেয়ে চোরের মতো নিজের ঘরে চলে যেত। এরকম একটা বাড়ি থেকে পরিবারের বড়ো মেয়ে একদিন চলে গেল। কী প্রতিক্রিয়া হতে পারে বলে তোমার মনে হয়?’
‘জানি না। কারণ, এরকম বাড়ি আমি দেখিনি।’
কিন্তু, আমি দেখেছিলাম। নেতারহাটে বাবার বন্ধু ছিলেন মিস্টার মালহোত্রা, টিম্বার মার্চেন্ট। ছোটোবেলায় তাঁর ওখানে বার দুই ঘুরতে গিয়েছি। মিস্টার মালহোত্রার ভাইও দাদার ব্যাবসার পার্টনার ছিলেন, তাঁদের বাড়ি ছিল পাশেই। সেখানে শারীরিক অসুস্থতার দীর্ঘ ইতিহাস ছিল। পরিবারের মা ও মেজোছেলে দু-জনের ক্যান্সার ধরা পড়েছিল ছয় মাস আগে-পরে, এবং দু-জনেই লম্বা সময় ধরে ভুগেছিলেন। তখন চিকিৎসা এত উন্নত হয়নি। দীর্ঘ অসুস্থতা একটা পরিবারকে কী করে দিতে পারে সেই ছোটো বয়েসেই বুঝেছিলাম। বাড়ি নিঃশব্দ, লোকে পা টিপে হাঁটে, নীচুগলায় কথা বলে। দিনের বেলা আলো জ্বালানো থাকে বড়ো বড়ো ঘরগুলোতে। কেউ জোরে হাসলে বা উঁচুগলায় কথা বললে অন্যেরা ভর্ৎসনার চোখে তাকায়। প্রচুর ঠাকুর-দেবতার ছবি! প্রায় প্রতিমাসে নাকি ওদের বাড়িতে ভজন, নামগান এসব হত।
.
‘প্রথমে ভেবেছিলাম, অ্যাগনেস পালিয়ে গিয়েছে। শুরুতে ওকে হিংসেও করেছি তাই। ও সফলভাবে পালাতে পারল। আমি তো আটকে গেলাম!’
‘কিন্তু, এখন ভাবেন না?”
‘পালিয়ে গেছে? এতদিনে একটা খবর তাহলে দিত না? সমস্ত শিকড় উপড়ে এভাবে চলে যাওয়া সম্ভব?’
‘সেটাই যদি উদ্দেশ্য থাকে, তাহলে সম্ভব।’
‘জানি না। হতেও পারে। লোকে তো দেখেছিল ওকে রেললাইন ধরে হেঁটে যেতে, নীল চুড়িদার পরে ছিল—ওর শখের চুড়িদার ছিল ওটা, কাঁথা স্টিচের আর সানগ্লাস। তারপর থেকে ওকে আর কেউ দেখেনি। আমি আর বাবা ছিলাম না শহরে। খবর পেয়ে পরদিন এলাম। আমাদের বাড়িতে পুলিশ এসেছিল তারপর, স্থানীয় লোকেরাও। কী হচ্ছে, মা কিছুই বুঝছিল না। হাঁ করে তাকিয়ে আছে। বিড়বিড় করে অ্যাগনেসের নাম বলে যাচ্ছে। পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদ করে কিছু পায়নি। আমি ছোটো ছিলাম, আমাকেও জিজ্ঞাসা করেছিল। আমি কয়েক জনের নাম বলেছিলাম যারা ওর বন্ধু ছিল। পুলিশ মাথা ঘামায়নি। অ্যাগনেস পালিয়ে গিয়েছিল ধরে নিয়েছে। বাবাও সম্ভবত সেটাই ভেবেছিল। তার পর থেকে আমি আরও বেশি করে বাড়ির ভেতর ঢুকে যাচ্ছিলাম। অ্যাগনেস চলে যাবার পর মায়ের ঘন ঘন অ্যাটাক হতে শুরু করল। ঘরের ভেতরেই থাকত প্রায় সারাটা সময়। আমাকে অ্যাগনেস বলে ডাকত। বাবা চুপচাপ হয়ে গিয়েছিল। তবে, মাঝে মাঝে অ্যাগনেসের ছবির দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকতে দেখেছি। যতই উদাসীন হোক না কেন, অ্যাগনেসের প্রতি তাদের ভালোবাসা বলুন বা মনোযোগ, যেটুকু থাকার সেটা অ্যাগনেসের প্রতিই ছিল। আমি ছিলাম এক্সট্রা।” আমাদের দিকে ফিরছিল না ডলোরেস, মাঠের থেকে ছুটে আসা খোলা হাওয়া মুখে মাখছিল। ডলোরেস আর লালুরাম দাঁড়িয়ে ছিল পাশাপাশি, মনে হচ্ছিল অন্ধকার দিয়ে খোদাই করা দুটো মূর্তি। ‘মায়ের এখন বিরাশি বছর বয়েস। শারীরিকভাবে সুস্থ, কিন্তু বাকিটুকু একই আছে। আমি, আমার তো রিগ্রেট আছেই। নেই বললে মিথ্যে বলা হবে। কিন্তু, সেসব নিয়ে বাঁচতে পারি। এখন এই ভাবনাগুলো আমাকে আনসেটল করে না। আগে করত।’
তনয়া ব্যান্ডেজ পরা পা সোফায় ছড়িয়ে মাথা নীচু করে বসে ছিল। ঘেঁটে গেছে মেয়েটা এসব শুনে, বেশ বুঝছি। আমার কী আসে-যায়! বাবা মেঘ মাথায় নিয়ে ঝুলছিল, খোলা চোখ তাকিয়ে ছিল আমার দিকে। ডলোরেসকে চাঁছাছোলা গলায় প্রশ্ন করলাম, ‘এডওয়ার্ডের সঙ্গে অ্যাগনেসের আলাপ ছিল? মানে, ওর এত ছেলেবন্ধু বললি, এডওয়ার্ড কি তাদের মধ্যে ছিল? জানিস কিছু?’
‘ঠিক জানি না।’ কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে উত্তর দিল ডলোরেস। ‘অ্যাগনেসের থেকে তো বড়ো ছিল অনেকটা। এডওয়ার্ডেরও তো অনেকদিন আগে থেকেই বান্ধবী ছিল। রেভারেন্ডের মেয়ে। যাকে বিয়ে করেছে। নামটা ভুলে গেছি। কিন্তু, আমাদের বাড়িতে একবার এডওয়ার্ড এসেছে অন্য বন্ধুদের সঙ্গে।’
‘আচ্ছা, অ্যাগনেসকে মেডুসা বলে ডাকত কেউ?’ তনয়ার এই প্রশ্নে ডলোরেস চমকাল।
‘ডাকত তো! তুমি কী করে জানলে? অ্যাগনেস নিজেকে মেডুসা বলত শেষের দিকে। তুমি বলায় মনে পড়ল এতদিন বাদে। আমাকে বলেছিল, “আমি মেডুসা হয়ে যাচ্ছি।” ডায়েরিতেও নিজেকে এই নাম দিয়েছে –
‘ডায়েরি লিখত?’
‘হ্যাঁ। সেসব আমি যত্ন করে রেখে দিয়েছি। মাঝে মাঝে পড়তাম। মাথামুন্ডু নেই, এলোমেলো, আবোল-তাবোল লেখা । ’
‘আমাকে দেবেন? আমি পড়েই ফেরত দেব, বা, ফটোকপি করে নেব।’
‘নিয়ো। বাড়িতে আসবে যেদিন। কিন্তু, মেডুসার কথাটা তুমি জানলে কী করে?’ ‘শহরের একজন পুরোনো দিনের স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে বলেছিল।’
‘অ্যাগনেসের চোখের দিকে তাকিয়ে প্রেমে পাথর হয়ে যেত যুবকের দল, এরকমটা ও ভাবত হয়তো। অন্যেরাও ওর এই ভাবনা ভাঙায়নি। কিন্তু, ওদের কাছে আমি ছিলাম অদৃশ্য।’ হাসল ডলোরেস। তারপর ফিরে এল ঘরের ভেতর। তনয়ার সামনে দাঁড়িয়ে কয়েক মুহূর্ত একদৃষ্টে তার দিকে তাকিয়ে থাকল। আচমকা তার হাত ধরে বলল, “তুমি সত্যিই পারবে? কেউ তো পারল না! অ্যাগনেসের সত্যিটা বার করতে পারবে তুমি? অনেক সময় কেটে গেছে।’ গলা ধরে এল ডলোরেসের।
অন্ধকারে সাপ বেরোয়। ঢুকে দেখি, এডওয়ার্ডের গিটার ঝুলমাখা হয়ে এককোনায় পড়ে আছে। তার ছিঁড়ে ঝুলছে। ওর খোলে সাপ গুটিয়ে শুয়ে থাকতেই পারে। কিন্তু তাতে কী! দরজা বন্ধ করে, দড়িদড়া আর প্যাকিং বাক্সগুলো সরিয়ে গুটিশুটি মেরে বসব। মাথা গুঁজে দেব হাঁটুতে, বরাবর যেমন দিই। তখন কেউ আমাকে খুঁজে পাবে না। হিল্ডা কি খুঁজতে পারে, আমাকে? কিন্তু এখন ওকে অনেকটা রাস্তা পাড়ি দিতে হবে, আমার গুদামঘরে ঢুকতে গেলে, কারণ এখন ও অযুত মাইল দূরত্বে—অযুত মাইল, অথবা, আস্ত একটা জীবন। আমি যে ওকে গত কয়েক দিনে দেখেছি, মাঠের ধারে, জঙ্গলের আবছায়ায় আর জোহার হালের ঝরনার নীচে, কেউ বিশ্বাস করে না।
কয়েকটা মুহূর্ত, আমার তখন মনে হয়েছিল অনন্ত সময় থেকে কেটে আনা সেই কয়েক টুকরো স্থির থাকবে আজীবন। আমরা কেউ নিশ্বাস ফেলিনি। ডলোরেসের চোখ আর্দ্র, তারপর সজল, আর সেখান থেকে সাবুর দানার মতো সাদা অশ্রু কোলভাগ বেয়ে গড়িয়ে নামছিল। সাবধানে ডলোরেসের হাত নিজের মুঠিতে নিল তনয়া, ফিসফিস করল, “আমি চেষ্টা করব।’
.
