২২
সুগন্ধি তৈল ও ধূপ চিত্তকে আমোদিত করে, মিত্রের আন্তরিক মন্ত্রণাজনিত মিষ্টতা তদ্রূপ।
Proverbs | 27:9
.
আমার জন্ম ১৯৭১ সালে মায়াপুর থেকে দুই কিলোমিটার দূরের এক ক্রিশ্চান আদিবাসী সেটলমেন্টে। আমার বাবা বসন্ত টমাস হেমব্রম ছিলেন লাতেহার পোস্ট অফিসের উচ্চপদস্থ কেরানি। টমাসের জন্ম কোডারমার এক প্রত্যন্ত গ্রামে। নিজের সমাজ থেকে কিছুটা উঁচুতে উঠে তিনি ব্রাত্য হয়েছিলেন, কারণ টমাস কলেজে গিয়েছিলেন এবং খ্রিস্টধর্মের সংস্পর্শে আসেন। কলেজ থেকে মিশনারিদের সঙ্গে কাজ করতে কালিম্পং-এ যান এবং মুগ্ধ হন রেভারেন্ড গ্রাহামের অনাথাশ্রম দেখে। কালিম্পং-এই খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত হয়েছিলেন। সেটা ১৯৫২ সাল। ব্যাপটিস্ট, ক্যাথলিক, লুথেরান, মেথডিস্ট, নানা কিসিমের মিশনারি উদ্যোগ তখন মূলনিবাসী ভারতের পেটের ভেতর দিয়ে তিরতিরে অন্তঃশীলার মতো বয়ে যাচ্ছিল। প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার বছর সেটা। জওহরলাল নেহরু চাইতেন আদিবাসিদের মূলস্রোতে আনতে। ভেরিয়ার এলউইনকে একবার দেখেছিলেন টমাস। ভেরিয়ার কিন্তু আদিবাসিদের বিচ্ছিন্ন করে রাখা অথবা মূলস্রোতে ফেরানো, দুটোরই সমান বিরোধী ছিলেন। টমাসের গ্রাম ছিল ঠাকুর-বর্ণীয় বড়ো জোতদারের মালিকানার অন্তর্গত। মুন্ডা ওরাওঁরা সেজোতের এককোনায় গুটিশুটি মেরে থাকলেও নিজস্ব সংস্কৃতি ও আচার রক্ষায় সমান গোঁড়া ছিল। টমাস কৌমের প্রথম একজন যিনি ধর্মচ্যুত হয়েছিলেন শুধু নয়, নিজের গ্রামে ফিরে এসে ঘোষণা করেছিলেন যে, তাঁদের ঐতিহ্যবাহী সারহুল উৎসব নাকি কয়েক হাজার বছর আগেকার আলেকজান্ডার নামে এক রাজার সঙ্গে পুরু নামের এক রাজার যুদ্ধের কাহিনির ভগ্নাবশেষ, যারা দু-জনেই ভিন্ন ধর্মের। এতটা বাড়াবাড়ি তারুণ্যের উচ্ছ্বাস থেকে এসেছিল হয়তো, কিন্তু সমাজ সহ্য করত না। টমাসকে গ্রাম ছেড়ে যেতে হল। তাতে অবশ্য তাঁর কিছু এসে যায়নি। তিনি শহরের স্বাদ পেয়েছেন ততদিনে। পোস্ট অফিসের চাকরি নিয়ে এখানে-ওখানে বদলি হতে হতে অবশেষে গঞ্জে এসে থিতু হলেন ১৯৬১ সালে। সেদিক থেকে আমরা এখানে বহিরাগত ছিলাম বলা যায়। অবশ্য, টাউনে আমাদের জায়গা হয়নি। নিজস্ব ঘেটো খুঁজে নিতে হয়েছিল।
টমাস ছিলেন মূলনিবাসী মিশনারি প্রোজেক্টের সদস্য। তাদের হয়ে সেবামূলক কাজে মাঝে মাঝেই এ জেলা, ওই জেলা ছুটে বেড়াতেন। আমি তাঁর তৃতীয় সন্তান। চার ছেলেমেয়ে হয়েছিল টমাসের। বর্তমানে তিনজন বেঁচে আছে। সকলেই মিশনারি কনভেন্ট স্কুলে পড়াশোনা করেছিল, যেটা তখনকার দিনে আদিবাসী সমাজের পক্ষে অভিনব ব্যাপার। সম্ভব হয়েছিল প্রোজেক্টের কোটার কারণে। আপনার এগুলো শুনতে কি অদ্ভুত লাগছে? আপনারা হয়তো ভাবেন আমরা নিষ্পেষিত এবং আদিম অন্ধকারাচ্ছন্ন সমাজের থেকে উঠে আসা, যাদের চিহ্নিত করা যায় পরব, মাদল, পলাশ ফুল অথবা শিকার উৎসব দিয়ে আপনাদের দোষ নেই, এই চোখ উপনিবেশের অবদান। আপনাদের গ্রেট সিনেমা “অরণ্যের দিনরাত্রি” আমি দেখেছি। কিন্তু, আমাদের পরিবার একমাত্র ছিল না। উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং বদলে যাওয়া জাতির প্রেক্ষাপটে বহু মধ্যবিত্ত মূলনিবাসী পরিবার নিজেদের অস্তিত্বকে যাচাই করতে চাইছিল। এরাই কৌমের পরিবর্তনের নেতৃত্ব দেবে। এবং সেই অগ্রগতি, যা প্রয়োজনীয় ও যন্ত্রণাময়, তাকে ভোগ করবে ও মূল্য চোকাবে পরবর্তী প্রজন্ম।
আমাকে তার মূল্য দিতে হয়েছিল নিজের মতো করে। টমাস ভেরিয়ারের বদলে নেহরুকে আদর্শ মেনেছিলেন। তিনি চাইতেন তাঁর সন্তানেরা পশ্চিমি শিক্ষায় শিক্ষিত হোক। কিন্তু, মিশনারি স্কুলে পড়তে গিয়ে অসংখ্য অবাক চোখ, কোঁচকানো ভুরু এবং চাপাহাসির সঙ্গে পরিচয় ঘটেছিল আমার। টমাসের প্রথম সন্তান বেনেডিক্টের ক্ষেত্রে অবশ্য ব্যাপারটা আরও মর্মান্তিক ছিল—অ্যাংলো অভিভাবকেরা নিজেদের সন্তানকে বেনেডিক্টের সঙ্গে এক বেঞ্চিতে বসাতে অস্বীকার করেছিলেন বলে তার জন্য আলাদা বেঞ্চ রাখা হয়েছিল। সেখানে সে একা বসত। বেনেডিক্ট আমার থেকে আট বছরের বড়ো। এই আট বছরে সমাজ কিছুটা এগিয়েছে। তাই আলাদা বেঞ্চ রাখার মতো দৃষ্টিকটু ব্যাপার ততদিনে বদলেছে। কিন্তু, স্কুলে আমার বন্ধু হয়নি। আমার সঙ্গে কেউ কথা বলতে চাইত না। আমার বড়ো দুই দাদাও বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো নিজেদের ক্লাসে অবস্থান করছিল। কিন্তু, ততদিনে তারা এই পরিস্থিতি মানিয়ে নিয়েছে। তার ওপর স্কুলের বাইরে নিজেদের সমাজের মধ্যে থেকে তাদের বন্ধুবান্ধব হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু, অন্তর্মুখী ছিলাম বলে আমার সেটাও হয়নি। পলিসিগতভাবে ভেদাভেদ ছিল না অবশ্যই। কিন্তু, সেই স্কুলে যারা পড়ত— অ্যাংলো বালকবালিকা, অথবা, উচ্চবিত্ত স্থানীয় বাঙালি বা বিহারিদের ছেলেপুলে, তাদের সবার থেকে আমি আলাদা হয়ে গেলাম। এগারো বছর বয়েস পর্যন্ত দমচাপা পরিবেশে কাটিয়েছিলাম। নতমুখে স্কুলে আসতাম। টিফিনে একা একা ঘুরে বেড়াতাম। স্কুলশেষে বাড়ি ফিরতাম একা।
স্কুলের স্পোর্টস ডে-তে আমি সেবার চুপচাপ বসে আছি মাঠের এককোনায়। স্রোতের মতো ছেলেমেয়েদের দঙ্গল আমাকে পাশ কাটিয়ে ছুটে যাচ্ছিল। কিন্তু, আমি খেলতে পারতাম না। তখন মাথায় চাঁটি পড়ল। মুখ ফিরিয়ে দেখি, আমাদের ক্লাসের বিচ্ছু ছেলে ডমিনিক। ডমিনিক অন্যদের থেকে আলাদা ছিল। আমার সঙ্গে নিজে থেকে কথা বলত, খেলতে ও চাইত। কিন্তু, ওর খেলার ধরন ছিল মূলত মারপিট অথবা পোকামাকড় ধরে তাদের খুঁচিয়ে অত্যাচার। একবার একটা বেড়ালকে ছ্যাঁকা দিতে গিয়ে তার নখের আঁচড়ে মরতে বসেছিল ডমিনিক। এসবে আমার গা গোলাত, তাই থাকতে চাইতাম না ওর সঙ্গে। লাঞ্চের প্যাকেট থেকে দুটো ডিমসেদ্ধ চুরি করেছিল সেদিন। আমার দিকে হাত বাড়াল, ‘খাবি?’ মাথা নাড়াতে কাঁধ ঝাঁকাল। ডিমে কামড় দিয়ে বলল, ‘এখানে চুপচাপ বসে আছিস কেন? মেয়ে দেখছিস?’ ওই বয়েসেই ওর কথাবার্তা এরকম ছিল। আমি কিছু না-বলে মাথা ঝোঁকালাম। ডমিনিক আমার মাথায় আবার চাঁটি মারল, ‘ডুবে ডুবে জল খাস, মাদারচোদ! অ্যাগনেসকে দেখছিস, আমি বুঝিনি ভেবেছিস?’ আমি অবাক হয়ে তাকালাম, ‘অ্যাগনেস কে?’ তখনও আমি অ্যাগনেসকে চিনতাম না। ডমিনিক হাত তুলে দেখাল। আমার থেকে কিছু দূরে পতাকা তোলার বেদিতে অলস ভঙ্গিতে হেলান দিয়ে বসে আছে একটা মেয়ে। সেই প্রথম আমি অ্যাগনেসকে দেখলাম। হয়তো সেই প্রথম চোখ তুলে কোনো মেয়েকে দেখেছিলাম বলা যায়।
টকটকে লাল চুলে একটা স্কার্ফ বাঁধা। স্পোর্টস কস্টিউমে বসে আছে অ্যাগনেস। আমার মতো সে-ও খেলায় অংশ নেয়নি। কিন্তু, তফাত ছিল— আমি অংশ নিইনি কারণ আমি খেলতে পারি না, আর অ্যাগনেসের ভঙ্গিটা ছিল, যেন, সে অলস চোখে উঁচু থেকে দেখে যাচ্ছে মরজগতের কোলাহল। অ্যাগনেস চুপচাপ বসে ছিল। তবু, গোটা মাঠের মনোযোগ কেড়ে নিচ্ছিল। আমার মনে হয়েছিল, মাঠে অন্য কেউ নেই। শীতের নরম রোদ গায়ে মেখে বসে আছে অ্যাগনেস। মনে হয়েছিল, যেন যাবতীয় শব্দরা তাকে ঘিরে আবর্তিত হচ্ছে। তার বাঁকানো গ্রীবার ভঙ্গিতে অবহেলার খোদাই ছিল অপরূপ। তখন আমি ছেলেমানুষ, মুগ্ধতাকে তখনও বানান করে পড়তে শিখিনি। কিন্তু সেদিন বুঝেছিলাম যে, অ্যাগনেসের থেকে দূরে থাকতে হবে। নয়তো সত্যিই ওর চোখের দিকে তাকালে সম্মোহিত হয়ে যেতে পারি ।
অ্যাগনেসের থেকে দূরে থাকতে পেরেছিলাম, কারণ আমি ছিলাম লাজুক। জানতাম, মেয়েদের কাছে পাত্তা পাব না। তাই একটেরে থাকতে থাকতে অভ্যেস হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু, অনেক ছেলেকেই দেখেছিলাম অ্যাগনেসের কাছে নিজেদের হাস্যকরভাবে জাহির করতে গিয়ে অপমানিত হয়েছে। অ্যাগনেস ব্যঙ্গবিদ্রূপে বা গালাগালিতে তাদের ভূত ভাগিয়েছে। সেসব ছেলেপুলেদের অনেকে পরে রটিয়ে বেড়িয়েছে যে, অ্যাগনেসের বহু প্রেমিক, যেমন বরাবর হয়। কিন্তু, আমি স্কুলে কখনো অ্যাগনেসকে কোনো ছেলের প্রতি আকৃষ্ট হতে দেখিনি। কয়েক জন ওপর ওপর বন্ধু ছিল। খেলত তাদের সঙ্গে। আবার অনেক সময়ে নিজের মনে ঘুরে বেড়াত। গুনগুনিয়ে গান গাইত বা আবোল-তাবোল বকত। যেহেতু আমিও একা একা ঘুরতাম, তাই স্বভাবজাত নিঃসঙ্গ মানুষদের চিনে নেবার ক্ষমতা আমার হয়েছিল। আমি বুঝেছিলাম, অ্যাগনেস ভেতরে ভেতরে ভয়ানক নিঃসঙ্গ। কোনো বন্ধু একটা গণ্ডির পর ওর কাছে আসতে পারে না। এরকম মেয়েদের প্রেমিক হয় না, মিস ভট্টাচার্য। তখন অ্যাগনেস মনে হয় ক্লাস সেভেন বা এইট। সেইসময়ে অন্যান্য মেয়েদের বয়ফ্রেন্ড, নিতান্ত ছেলেমানুষি অর্থেই, হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু, অ্যাগনেসের প্রতি বহু ছেলে আকৃষ্ট হলেও অ্যাগনেস কাউকে পাত্তা দিত না। বন্ধুদের সঙ্গে হাঁটার সময়েও আমি ওকে অন্যমনস্ক দেখেছি। বুঝেছি যে, আসলে ওর মন অন্য কোথাও পড়ে আছে। বন্ধুদের থেকে আলাদা হয়ে যাবার পরের মুহূর্তেই ও তাদের ভুলে যাবে। অ্যাগনেস আমাকে ভালো চিনত না। কখনো দুই-একটা কথা হয়েছে হয়তো, তার বেশি নয়। কিন্তু, ও কাউকেই ভালো চিনত কি না, সন্দেহ আছে আমার।
পড়াশোনায় ভালো ছিল না অ্যাগনেস। একবার ফেল করল। কখনো বাজেরকম দুরন্ত হয়ে উঠত। মারামারি করত অন্যদের সঙ্গে। আমরা শুনেছিলাম ওর মাথায় গণ্ডগোল আছে। ওর বোন ডলোরেসের সঙ্গে অল্পস্বল্প কথা হত। সে কান্নাকাটি করত, বলত বাড়িতে নাকি টেকা যায় না। অনেক শিক্ষক অ্যাগনেসের ওপর বিরক্ত ছিলেন। গোদের ওপর বিষফোড়ার মতো, অ্যাগনেসের প্রেমিকের দল সংক্রান্ত গুজব তাঁদের কানে উঠেছিল। একদিন একটা মেয়েকে বেদম মারল অ্যাগনেস। দোষের মধ্যে সে ডলোরেসকে বলেছিল, ‘তোর মা পাগল । ডলোরেস দুর্বল, বই মুখে পড়ে থাকা মেয়ে। সে ভ্যাঁ কান্না বাদে কিছু পারেনি। কিন্তু, অ্যাগনেস মেয়েটার ঠোঁট ফাটিয়ে দিয়েছিল। ফলত, সাসপেন্ড হল তিনদিনের জন্য। তারপর তার অভিভাবককে নিয়ে আসতে বলল স্কুল। সাসপেনশনের শেষে স্কুলের গভর্নিং বডিতে আলোচনা হবে, টিসি দেওয়া হবে কি না। যেদিন মিটিং হচ্ছিল, প্রেসিডেন্ট তখনও আসেননি। তাঁর সিদ্ধান্তের ওপর অনেক কিছু নির্ভর করত। প্রেসিডেন্ট এলেন কিছুটা পর। সবাই শশব্যস্তে কাঁটা হল, কারণ দোর্দণ্ডপ্রতাপ মানুষটি নিজের ক্ষমতাবলে দিনকে রাত করতে পারতেন। অন্যান্য বিষয়ে আলোচনার পর অ্যাগনেসের প্রসঙ্গ উঠল। সব শুনে প্রেসিডেন্ট প্রথম প্রশ্ন যেটা করলেন, ‘মারামারির কারণটা কী?’ তাঁকে জানাতে হল অ্যাগনেসের মায়ের ব্যাপারে। কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে প্রেসিডেন্ট বললেন, ‘আমার মা নিয়ে কেউ একথা বললে তাকেও আমি একই জবাব দিতাম।’ কিন্তু, অ্যাগনেসের যে অনেক প্রেমিক? এরকম মেয়ের পাল্লায় পড়লে অন্যান্য বাচ্চাদের নৈতিক চরিত্র গোল্লায় যাবে যে! প্রেসিডেন্ট প্রশ্ন করলেন, ‘আপনারা কেউ দেখেছেন?’ সকলে মুখ চাওয়াচাওয়ি করলেন। ধৈর্য হারিয়ে প্রেসিডেন্ট গলা চড়ালেন, ‘যাঁর কাছে প্রমাণ আছে, বা, যিনি নির্দিষ্টভাবে জানেন, তিনি মেয়েটির বয়ফ্রেন্ডদের নামধাম বলুন। নাহলে, আমাদের কমিউনিটির নিজেদের কারোর সম্পর্কে অযথা শত্রুভাব পোষণ করবেন না।’ কেউ উত্তর দিল না। প্রেসিডেন্ট উঠে দাঁড়ালেন, তার অর্থ মিটিং সেখানেই শেষ। বাইরে বেরিয়ে প্রেসিডেন্ট দেখলেন, অ্যাগনেস জড়োসড়ো হয়ে বাইরের বেঞ্চে বসে। মাইকেল তখন প্রিন্সিপালের ঘরে। প্রেসিডেন্ট গিয়ে অ্যাগনেসের সামনে দাঁড়ালেন। অ্যাগনেস মাথা নীচু করে ছিল। গম্ভীর গলায় প্রেসিডেন্ট বললেন, ‘আর কখনো এমন করবে না।’ কয়েক পা এগিয়ে যাবার পর অ্যাগনেস তাঁকে পেছন থেকে ডাকল, ‘স্যার!’ প্রেসিডেন্ট পিছু ফিরলেন। ‘এরকম করব না? মা-কে নিয়ে কেউ যদি এমন বলে, তাহলেও?’ প্রেসিডেন্ট অ্যাগনেসের দিকে তাকিয়ে থাকলেন কয়েক সেকেন্ড। তারপর বললেন, ‘এমন করবে না, তার অর্থ হল, স্কুলের চৌহদ্দিতে করবে না।’ তাঁর মুখে প্রশ্রয়ের চাপাহাসি দেখে অ্যাগনেস সাহস পেল। জিজ্ঞাসা করল, ‘আর স্কুলের বাইরে?’ হাসি চেপে ছদ্ম গাম্ভীর্যে প্রেসিডেন্ট আঙুল নাড়ালেন, ‘কক্ষনো এমন করা উচিত নয়। আর যদি করো, তাহলে কাকপক্ষীও যেন জানতে না পারে।’ কথাগুলো বলে হনহন করে হেঁটে গেলেন প্রেসিডেন্ট। ডেভিড ব্রাউন।
এর কয়েক মাস পরে স্কুলের পুরষ্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে সবাই অবাক হয়ে দেখল, স্টেজ থেকে ডেভিড ব্রাউন অ্যাগনেসকে ডেকে নিচ্ছেন। অ্যাগনেসের পুরষ্কার পাবার প্রশ্নই ছিল না। সে কাঁচুমাচু মুখে স্টেজে উঠলে তাকে পাশে বসালেন। মাথায় হাত বুলিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আর মারামারি করোনি তো?’ ঘাড় নাড়ল অ্যাগনেস। ডেভিড ব্রাউন টেবিল থেকে একটা চকলেট নিয়ে অ্যাগনেসের হাতে দিলেন। অ্যাগনেস যখন স্টেজ থেকে নেমে আসছে, সেইসময়ে তার মুখে যে আলো আমি দেখেছিলাম, আমাদের টাউনের কোনো মেলার হ্যাজাক তেমন আলো জ্বালাতে পারেনি।
তার পরদিন রাত্রিবেলা মার্গারেট অ্যাগনেসের হাত ধরে স্যাংচুয়ারিতে এসেছিলেন। অ্যাগনেসকে বাহারি স্কার্ট পরিয়ে এনেছেন, নিজের পরনে দামি শাড়ি। অ্যাগনেস সংকুচিত ছিল, আসতে চায়নি প্রথমে। কিন্তু, মার্গারেটের তখন পাগলামির প্রকোপ কম। তিনি উৎসাহে টগবগিয়ে ফুটছেন। হাতে করে এনেছিলেন নিজের বানানো চকলেট কেক। অ্যাগনেসের তখন তেরো বছর বয়েস। সে মা-কে অনুনয় করেছিল, যাবে না। দরকার নেই, থাক। কিন্তু, মার্গারেট বদ্ধপরিকর। যথাযথ ধন্যবাদ জানানো তাঁর বংশের শিষ্টাচারের মধ্যে পড়ে। সেদিন আউটহাউসে মিটিং চলছিল একটা। দারোয়ান তাঁদের গেটের সামনে আটকায়। অনুনয় করার পর ভেতরে যেতে দেয়। এগিয়ে আসে ম্যানেজার গোছের দুই ব্যক্তি। মার্গারেট তাদের বলেন, ডেভিডের সঙ্গে দেখা করতে চান। ডেভিড ব্যস্ত মানুষ। প্রতিদিন এরকম বহু অনাহুত লোকজন সাক্ষাৎ করতে আসে। তাই কড়া নিষেধ ছিল মিটিং-এর সময়ে যেন কেউ বিরক্ত না করে। ম্যানেজাররা হয়তো ভাগিয়েই দিত। কিন্তু, রূপসি দুই নারীর সামনে তারা ইতস্তত করেছিল। তারপর বাগানের একটা বেঞ্চ দেখিয়ে সেখানে অপেক্ষা করতে বলল।
.
প্রায় দেড় ঘণ্টা কেটে গিয়েছিল। মা, মেয়ে বসে আছে তো আছেই। মায়ের হাতে ধরা কেক। অ্যাগনেস বারে বারে মা-কে ফিসফিসিয়ে বলেছে, ‘চলো, ফিরে যাই।’ কিন্তু, মার্গারেট অনড়। মাঝে কয়েক জন সামনে দিয়ে হেঁটে গেলে মার্গারেট তাদের অনুরোধ করেছেন যদি একবার ডেভিডের সঙ্গে দেখা করা যায়। তারা অবজ্ঞার সঙ্গে ‘হুঁ’ বলে চলে গেছে। কেউ কেউ আবার মুখ টিপে হেসেছে তাদের দিকে তাকিয়ে, যারা মার্গারেটের পাগলামির কথা জানত। ক্রমে অন্ধকার হয়ে এল বাগান। মূল বাড়ির আলো একটা, দুটো টুপটাপ নিভে গেল। অ্যাগনেস মাথা নামিয়ে বসে ছিল। এবার পায়ের শব্দ পেয়ে মুখ তুলে দেখল, মিটিং শেষে অভ্যাগতরা বেরোচ্ছেন। পা টলছিল তাঁদের, সম্ভবত কিঞ্চিত পান করার কারণে। সবার পেছনে ডেভিড। তাঁর হাসিমুখ লালচে, ঘন নিশ্বাস পড়ছে। তিনি লক্ষ করেননি। অ্যাগনেসদের পেরিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন, কিন্তু মার্গারেট তাঁকে ডাকলেন, ‘ডেভিড!’ ডেভিড পিছু ফিরে ভুরু কোঁচকালেন। যেন তিনি চিনতে পারছেন না। অন্যান্য অতিথিরাও দাঁড়িয়ে পড়েছেন। মার্গারেট নার্ভাস হেসে এক হাতে কেক আর অন্য হাতে অনিচ্ছুক অ্যাগনেসকে টেনে তাঁর সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। নার্ভাসভাবে উলটোপালটা কয়েকটা কথা বকবক করলেন। মূলত ধন্যবাদ জানাচ্ছিলেন। কিন্তু, তাঁর ঠোঁট কাপছিল। ফ্যাকাশে মুখে জোর করে চওড়া হাসি টেনে আবার বললেন, ‘ডেভিড।’ ডেভিড অ্যাগনেসকে দেখলেন, তারপর বিরক্ত গলায় জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কী চাই?’
“কিছু না। কিছু না তো!’ মার্গারেট তাড়াতাড়ি কেকের বাক্স এগিয়ে ধরলেন। উপস্থিতদের মধ্যে একজন হেসে উঠল হঠাৎ।
অ্যাগনেস কেঁপে উঠল, সে মায়ের হাত টানল, ‘চলে এসো।’
ডেভিড বিস্ময়ে তাকিয়ে রইলেন, যেন তিনি বিশ্বাস করতে পারছেন না তাঁর বাড়িতে কেউ তাঁকে উপহার দিতে পারে। তাও আবার মার্গারেটের মতো দীনহীন কেউ। তিনি মার্গারেটকে দেখলেন যেন অদ্ভুত কোনো জন্তু। তারপর হঠাৎ দুই পা পিছিয়ে গেলেন। তাঁর মুখে বিবমিষা অথবা আতঙ্ক, কী ফুটেছিল জানি না। হয়তো মাতাল অবস্থায় তিনি নিজেও বোঝেননি। কিন্তু, তারপর কর্কশ কণ্ঠে হেসে উঠলেন। অন্যদের দিকে ফিরে বললেন, ‘কেক!’ হাসল অন্যেরাও। অস্বস্তিতে কেউ কেউ গলাও খাঁকড়াল। ডেভিড মার্গারেটের দিকে তাকিয়ে বললেন, “কেক? সত্যি? আমাদের জন্যে? হাউ সুইট!’ দাঁত বার করে মুখ খিঁচিয়ে মাতাল হাসতে শুরু করলেন ডেভিড। যেন মার্গারেট ও অ্যাগনেসের মতো অদ্ভুত জন্তু তিনি আগে দেখেননি। ভিড় জমে গেল। অনেকেই অদ্ভুত চোখে তাকিয়ে। লোকজন হাসছে। সেই ভিড়ের মধ্যিখানে মার্গারেট। তিনিও প্রথমে অস্বস্তিতে হাসছিলেন। কিন্তু, তারপর হাসি থেমে গেল। মুকচোখে তাকিয়ে থাকলেন। যেন বুঝছেন না, কী ঘটছে। একটা হাত তখনও কেক বাড়িয়ে। তাঁকে জড়িয়ে কাঁদছে অ্যাগনেস। ভয়ে তার কান্না ফোঁপানির মতো বেরোচ্ছে। ডেভিড হাসতে হাসতে বাড়ির দিকে রওনা দিলেন। তার আগে মৃদুস্বরে কাউকে বললেন, ‘চাকর-বাকরদের বলো কেকটা নিয়ে নিতে।’ সেকথা মা, মেয়ে দু-জনেই শুনেছিল। তারা জমে পাথর হয়ে গিয়েছিল শুনে। ভিড়টা এগোবার পর কয়েক জন ভৃত্যশ্রেণির মানুষ দৌড়ে এল। ঠেলে দুজনকে গেটের দিকে নিয়ে গেল। একজন কেকটা নিতে গেল, কিন্তু মার্গারেট দিলেন না। তিনি শক্ত হাতে কেক আঁকড়ে ধরলেন। তাঁর চোখে ক্রোধ ছিল, বা, ঝড়ের আভাস। অন্যেরা কিছু বলতে সাহস করল না ।
মা, মেয়েকে বাড়ির বাইরে বার করার পর গেট বন্ধ হল। অ্যাগনেস চোখ তুলে দেখল, মূল বাড়ির দোতলার জানালা থেকে দুই-তিনজন তাদের দিকে তাকিয়ে। সে মা-কে ধরে তাড়াতাড়ি এগিয়ে গেল অন্ধকার রাস্তা ধরে।। মার্গারেট স্বপ্নাচ্ছন্নের মতো হাঁটছিলেন। কিছুদূর এগিয়ে তিনি রাস্তার ওপর বসে পড়লেন। অ্যাগনেস কাঁদছিল ফুঁপিয়ে, হেঁচকি তোলার মতো করে। সে দেখল মায়ের দামি শাড়ি ধুলোয় মাখামাখি। মার্গারেট সেই অবস্থায় কেকের বাক্স খুললেন। তারপর হাত মুঠো করে একদলা কেক পুরে দিলেন নিজের মুখে। চিবোতে লাগলেন। অ্যাগনেস কান্না ভুলে বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে ছিল। সে মায়ের হাত থেকে বাক্সটা কেড়ে নিতে গেলে তার হাত বজ্রমুষ্টিতে ধরলেন মার্গারেট আর তার মুখেও ঠুসে দিলেন দলা দলা কেক। ভয়ে, দুঃখে, অপমানে অ্যাগনেস মা-কে জড়িয়ে ধরল। কিন্তু মার্গারেট নির্বিকার, তিনি মুঠো মুঠো কেক নিজের মুখে পুরতে লাগলেন। সেই রাত্রে তারা কীভাবে বাড়ি ফিরেছিল, জানি না। অ্যাগনেস কখনো অন্যদের কাছে সে-গল্প করেনি। কিন্তু বাড়ি ফেরার পর মার্গারেটের আবার পাগলামির অ্যাটাক হল। তিনি ঘর অন্ধকার করে শুয়ে থাকতেন। গুনগুন স্বরে গান গাইতেন। অ্যাগনেস তাঁর পাশে গিয়ে বসলে তার পিঠে হাত বুলিয়ে কথা বলতেন আবোল-তাবোল। ডলোরেস কাঁদত। নীরব থাকতেন মাইকেল।
যেটা আমি বুঝিনি, এরপর কেন অ্যাগনেস স্যাংচুয়ারিতে যাতায়াত আরম্ভ করেছিল। বারবারা আর আগাথার সঙ্গে তার একপ্রকার বন্ধুত্বও হয়েছিল। এডওয়ার্ড বাড়িতে কম থাকত, তাই তার সঙ্গে বেশি চেনা-পরিচয় ঘটেনি। কিন্তু, কেন ও কীভাবে ওই ঘটনার পর অ্যাগনেস ব্রাউনদের বাড়ি গিয়েছিল, মাঝে কী ঘটেছিল, আমি জানি না। এগুলো আমি পরে ডলোরেসের কাছে শুনেছি। কিন্তু, তার কাছেও উত্তর পাইনি। জিজ্ঞাসা করলে চুপ করে থাকত। বারবারার সঙ্গে জোহার হালের চার্চেও যেত অ্যাগনেস। টুকটাক কাজ করত। যদিও তারা ছিল ক্যাথলিক। কিন্তু, রেভারেন্ড গরম্যানের দরজা সবার জন্য উন্মুক্ত ছিল। চার্চের মেলার আগে প্রতি বছর বারবারা, এডওয়ার্ড, আগাথা আর ব্রাউনদের বাড়ির অন্যান্যরা চার্চের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ত। অ্যাগনেস তাদের সঙ্গে ভিড়ে গিয়েছিল। ডেভিড কি জানতেন? অথবা, তিনি কি আলাদা করে লক্ষ করেছিলেন অ্যাগনেসকে? বলতে পারব না। আমার ধারণা, সেই রাতের ঘটনা তিনি ভুলে গিয়েছিলেন।
এভাবে দিন কাটছিল। লম্বা হয়ে উঠছিল অ্যাগনেস, তার ঝলসানো রূপের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছিল গুজব। বাতাসে কানাকানি, অ্যাগনেস অমুক ছেলের বাড়ি রাত কাটিয়ে এসেছে। তমুকের সঙ্গে বসে ছিল ঝরনার ধারে। কিন্তু, অ্যাগনেস বরাবরের মতো মারপিট করে, চিৎকার করে, ফেল করে বছরের পর বছর। ছেলেদের সে আগের মতোই খেদিয়ে দিচ্ছিল, আমি জানি। ওর কাছে আমি ঘেঁষিনি, তা বলে অত দূরত্বও ছিল না যে, নিজের চোখকে অবিশ্বাস করব। বরং মাঝে মাঝে মনে হত, অ্যাগনেসের মাথার চিকিৎসা কেন কেউ করছে না। ওর চণ্ড রাগ দিনে দিনে বাড়ছিল। কথায় কথায় হাত চালিয়ে দিতে দেখেছি। ডলোরেস আমার দুই ক্লাস নীচে পড়ত। নতুন বছর শুরু হবার সময়ে আমরা পুরোনো টেক্সট বুক নীচু ক্লাসের ছেলেমেয়েদের দিয়ে দিতাম, যদি তারা চাইত। ডলোরেস বইগুলো শুধু নয়, ক্লাসের নোটও নিয়েছিল, কারণ পড়াশোনায় তার ছিল সহজাত ঝোঁক। বরাবরই ভালো ফল করতে চাইত। সেই দেওয়া-নেওয়ার সূত্রে ডলোরেসের সঙ্গে আমার আলাপ হয়েছিল। টুকটাক কথাবার্তাও হত। ডলোরেসের মুখে অ্যাগনেসের অসংলগ্ন আচরণের বেশ কিছু গল্প শুনেছি। কিন্তু, তার বাইরে ওর চরিত্রের ব্যাপারে কানাকানি আমি বিশ্বাস করতাম না। হয়তো আমিই একমাত্র। ভুল বললাম। বিশ্বাস করত না আরেকজন। মুন্না।
আপনাকে বলেছিলাম, এগারো বছর বয়েস পর্যন্ত আমি ছিলাম বন্ধুহীন। তারপর মুন্না আমার বন্ধু হয়েছিল। ও আমাকে বাঁচিয়েছিল স্কুলের নবাগত ছাত্ৰ সুরেন্দ্র সিং-এর হাত থেকে। সুরেন্দ্র রাজপুত সন্তান। টকটকে ফর্সা গায়ের রং, ছুরির মতো তীক্ষ্ণ শরীর এবং বয়েসের তুলনায় লম্বা। বেশ কয়েক বার ফেল করার পর ক্লাস সেভেনে এসে ভরতি হয়েছিল এখানে। মূলত বাবার টাকার জোরে। দলবল বানাতে সময় লাগেনি তার। সুরেন্দ্রর প্রথম থেকে সমস্যা ছিল আমাকে নিয়ে। স্কুলের কড়া শাসনে কিছু করা যেত না। তাও কয়েক বার পেছনে লেগেছিল। কয়েক বার চুল খামচে পালিয়েছিল। কখনো ইচ্ছে করে কালি ছিটিয়ে দিয়েছিল গায়ে। অন্য ছাত্ররা উপভোগ করত। তারা নিজেরা যা পারেনি সেটা সুরেন্দ্রকে করতে দেখে তাদের বাধা দেবার কথা নয়। দুর্বল এবং ছোটোখাটো হবার কারণে আমি প্রতিবাদ করতে ভয় পেতাম। তা ছাড়া, লাজুকও ছিলাম। কাকে আমার কথা বোঝাব?
একদিন বিকেল বেলা আমি বাড়ি ফিরছি স্কুল থেকে, দেখলাম একটা অস্থায়ী সেনা ব্যারাকের মাঠে ক্রিকেট খেলছে সুরেন্দ্র এবং তার দল। মাঝে মাঝেই খেলত। কিন্তু, সেদিন কর্কেট বল গড়িয়ে আমার পায়ের কাছে চলে এসেছিল। কিছু না-ভেবেই লাথি মেরে সেটাকে ফেরত পাঠিয়েছিলাম মাঠে। সুরেন্দ্র যেন অপেক্ষায় ছিল এমন কিছুর। খেলা থামিয়ে সে এগিয়ে এল। ‘এইও নিগার, বলে পা দিলি কেন?’ নিগার কথাটা শিখেছিল সম্ভবত আগের স্কুল থেকে। আমি চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিলাম। বিকেলের পড়ন্ত আলো আমার পিঠে পড়েছিল। সামনে থেকে আমার মূর্তিকে কুচকুচে কালো দেখাচ্ছিল বলেই হয়তো আরও খেপে উঠল সুরেন্দ্র। তার চামচাদের ইশারা করল, তারা এসে আমাকে ঘিরে দাঁড়াল। ‘বলে পা দিলি কেন?’ হিন্দিতে কেউ একজন ‘বেহেঞ্চোদ’ বলে গালি দিল। হেসে উঠল অন্যেরা। সুরেন্দ্রর দাঁত বেরোল তখন। হিসহিসে স্বরে বলল, “ওকে উইকেট সাজাব আজ।’ ব্যাপারটা কিছুই না—আমি ব্যাটসম্যানের পেছনে উইকেটের ভূমিকায় দাঁড়াব। ব্যাটসম্যান কোনো বল মিস করলে সেটা আমার গায়ে এসে লাগবে। মনে রাখবেন, ক্রিকেট বল, যেটা ওই গতিতে শরীরে এসে লাগলে হাড়গোড় ভেঙে যেতে পারে। কিন্তু, আমার নড়াচড়া করা চলবে না। করলেই বীভৎস মার। এভাবে সুরেন্দ্ররা স্কুলের অন্যান্য কয়েক জনকে র্যাগ করেছিল আগে। অন্যেরা হর্ষধ্বনিতে সুরেন্দ্রর প্রস্তাবকে স্বাগত জানালে আমি দুই পা পিছোলাম। দৌড় লাগাতে পারতাম কিন্তু মনের ভেতর কেউ আমাকে জানিয়েছিল যে, দৌড়োলে এরা আরও খেপে যাবে। ততক্ষণে আমার ঘাড়ে কেউ হাত রেখেছে, ছটফটিয়ে তাকে ছাড়াতে পারছি না। সুরেন্দ্র ঠাস করে আমাকে থাপ্পড় মারল। দুই-তিনজন ঠেলতে ঠেলতে আমাকে উইকেটের পেছনে নিয়ে এল। আমি ধস্তাধস্তি করছিলাম। দুটো ছেলে তখন আমার কবজি চেপে ধরল। একজন আমার ঘাড়ে এত জোরে রদ্দা মারল যে, মনে হল ঘাড় ছিঁড়ে পড়বে। আমি চোখে অন্ধকার দেখলাম।
হঠাৎ আর্ত চিৎকারে সুরেন্দ্র মাটিতে বসে পড়লে অন্যেরা আমাকে ছেড়ে দিল। সুরেন্দ্রর কপাল থেকে দরদরিয়ে রক্ত পড়ছে। সবাই ঘুরে দেখল একটা দেহাতি ছেলে, খালি গা একটা ছোট্ট ইজের পরে, হিংস্র হাসি হাসছে তাদের দিকে তাকিয়ে। তার এক হাতে বড়ো ঢিল। কেউ কিছু বোঝার আগে সেটা সে ছুড়ে মারল আরেকজনের দিকে। ঠং করে তার হাঁটুতে গিয়ে লাগল। হাউমাউ করে সেই ছেলেটাও পড়ে গেল। এর পরের কয়েকটা মুহূর্ত যেন একটা ঝড় বয়ে গেল ভিড়টার ভেতর দিয়ে। দেহাতি ছেলেটার রোগা শরীর বাকিদের তছনছ করে ফেলল। লাথি, ঘুসি, আঁচড়, কামড়ে ভিড়টা লণ্ডভণ্ড হয়ে গেল। সুরেন্দ্র এবং তার দলবল মারামারিতে দক্ষ নয়। এতদিন প্রতিরোধহীন প্রভুত্বে অভ্যস্ত হয়েছে তারা। পালটা মার খেয়ে প্রথমে হতচকিত, তারপর ভীত হয়ে একটাই কাজ তারা করতে পারত, রণাঙ্গন ছেড়ে পিঠটান দেওয়া। ঊর্ধ্বশ্বাসে পালাল বিপর্যস্ত বালকের দল। সুরেন্দ্র রক্তমাখা মুখে বলে গেল এর বদলা সে নেবে।
আমি তখনও ভালো করে বুঝিনি কী ঘটল। মাটিতে বসে হতবুদ্ধির মতো তাকিয়ে ছিলাম ছেলেটার দিকে। নোংরা, সারাহাতে মাটি লেগে, পায়ের নখ বড়ো। সরষের তেল মাখা খাড়া খাড়া চুল থেকে ঘাম গড়াচ্ছে। বয়েসে হয়তো কিছুটা বড়ো হবে। ছেলেটা হাসল, উঠতে সাহায্য করল আমাকে। ‘কী নাম তোর?’
‘আলফ্রেড হেমব্রম। তুমি কে?’
না।’ ‘মুন্না। তুই এরকম চুপচাপ মার খাচ্ছিলি কেন? শালাদের পালটা না-পেটালে শোধরাবে
মুন্নার বাড়ি কাছের খাপরার বস্তিতে। বাবা, মা নেই। কাকা, জেঠুদের সংসারে মানুষ। মুন্না আমাকে নিয়ে গেল নিজের ভিটেতে। ইটের বানানো অনেকগুলো ঘেঁষাঘেঁষি কোঠা দিয়ে বস্তিটা তৈরি। গোলাঘর, খাটাল, একপাশ থেকে কাঁচা গোবরের গন্ধ আসছে। এক যুবতী ঊরু পর্যন্ত শাড়ি গুটিয়ে বসে আছে খোলা উঠোনে। হলুদমাখা আমের টুকরো খোসাসমেত শুকোতে দেওয়া হয়েছে উঠোনের একপাশে, পেছনে কাকতাড়ুয়া। খাটিয়া পেতে এক শিশুকে ঘুম পাড়ানো হচ্ছে। জায়গাটায় রাস্তা বলে কিছু নেই। গোবরে ছয়লাপ, তার সঙ্গে খড় এবং ভুসির পচা অবশেষ মিশে ভারাক্রান্ত থাকে। কোঠায় অনেক লোক, কিন্তু মুন্নার সঙ্গে আমাকে দেখে কেউ কিছু জিজ্ঞাসা করল না। উদাসীন চোখ মেলে তাকাল একবার। মুন্না ফিসফিসিয়ে জানাল এরা তাকে পছন্দ করে না। সে পড়াশোনা ছেড়ে দিয়েছে। লোকের বাড়ি দুধ বেচে। বাকি সময়টায় খেলাধুলো ও মারামারি। তারপর হি-হি হাসল। আমার হাত ধরে ঘুরছিল সে। হয়তো বালকবুদ্ধি দিয়ে সে বুঝেছিল আমাকে রক্ষার প্রয়োজন। ওকে অচেনা মনে হয়নি আমার। অনেকদিন পরে খোলা গলায় হাসছিলাম। ঢিল ছুড়ে কাঁচা আম পাড়ার টেকনিক শিখছিলাম মুন্নার থেকে, আর ব্যাংবাজি। কিন্তু, সন্ধে হয়ে আসছিল। আমাকে বাড়ি যেতে হত। ‘কী পড়িস তুই? অনেক কঠিন অঙ্ক?’ আমি জানালাম ভূগোল, ইতিহাস, মানববিজ্ঞানের জটিল রহস্যদের কথা। কিন্তু, মুন্না ঠোঁট ওলটাল। তার কাছে একঘেয়ে লাগে এসব। সে কাঠবেড়ালি ধরার পদ্ধতি আমার কাছে জানতে চাইল যেহেতু আমরা সাঁওতাল। কিন্তু, আমরা সাতজন্মে এসব করিনি। ছাড়াছাড়ি হবার সময়ে দু-জন স্থির করলাম পরদিন আবার একই সময়ে ওই মাঠের ধারে দেখা করব। সুরেন্দ্র যদি ধরে? মুন্না বলল ‘ধুস, ও মাদারচোদ ডরপোক আছে। কিছু করলে তো আমি আছিই। তোর আগে চলে আসব এখানে।’
পরের দিন আমাদের দেখা হয়েছিল। তার পরের দিন, তারও পরের দিন। এভাবে রোজ দেখা হতে হতে আমি ও মুন্না প্রাণের বন্ধু হয়ে উঠেছিলাম, যদিও তা কম আশ্চর্যের নয়। আমি নাকে বই গুঁজে পড়ে থাকি, মুন্না পড়াশোনার ধার-কাছ মাড়ায় না। মারপিট দেখলে আমার বুক ধড়ফড় করে, ওদিকে মুন্না এপাড়া-ওপাড়ায় ছেলেপুলেদের পিটিয়ে বেড়ায়। আমি বড়ো হয়ে অভিযাত্রী হতে চাই ক্যাপ্টেন স্কটের মতো, মুন্না চায় এক-শোটা তাগড়াই মোষ আর দুটো ট্রাক্টরের মালিক হতে। তবু অজানা কোন রহস্যবলে আমরা দুই বন্ধু একে অপরের সঙ্গ ছাড়তাম না। সারাদিন জঙ্গলের ভেতর, পাহাড়ের ঢালে, অবারিত মাঠে অথবা ডেগাডেগি নদীর ধারে বসে অর্থহীন আবোল-তাবোল গল্পে দিন কাটত। আজ আমি পেছনে ফিরলে বুঝি, আমাদের দু-জনের দু-রকম বৈশিষ্ট্য ছিল, যাদের প্রত্যেকটা অপরের কাছে ছিল পরম কাঙ্ক্ষিত। আমি অপরপক্ষকে সম্মান দিতাম। তাদের কথা নীরবে মন দিয়ে শুনতাম। যে সম্মান মুন্না কখনো অন্যদের থেকে তার সারাজীবনে পায়নি। আর মুন্নার ছিল জানকবুল আনুগত্য। যাকে সে স্বীকার করবে তার জন্য সারাজীবন নিজেকে বাজি রাখতে পারে। সেরকম বন্ধু ফ্রেডির এর আগে ছিল না। তাই দু-জনেই দু-জনকে যেন আঁকড়ে ধরেছিল। আমার তখন এগারো। মুন্নার তেরো। তাই বয়েসে বড়ো বন্ধুর হাত ধরে মানবরহস্যের গূঢ় গলিঘুঁজিকেও প্রথম চিনেছিলাম। আর মুন্না আমার হাত ধরে চিনেছিল অ্যাগনেসকে। একদিন আমার স্কুলের বাইরে অপেক্ষা করতে গিয়ে অ্যাগনেসকে সে দেখেছিল।
সেদিন মুন্না আমার জন্য স্কুলগেটের বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল। ঘণ্টা বাজার পর অনেকে দল বেঁধে বেরোচ্ছিল বলে ভিড়ের মধ্যে আমাকে দেখতে পাচ্ছিল না। তাই স্কুলের লাগোয়া নিমগাছের নীচু একটা ডালের ওপর চড়ে বসে ছিল। সেখান থেকে অ্যাগনেসকে সে দেখে অ্যাগনেস বরাবরই ছিল ভিড়ের মধ্যে একা। সে আপনমনে ব্যাগ দুলিয়ে হেঁটে আসছিল। তার চোখ পড়ে মুন্নার দিকে। মুন্না চিত্রার্পিত হয়ে যায়। আমাকে পরে বলেছে তার নিশ্বাস ফেলতে ভয় লাগছিল। ঝাঁ-ঝাঁ রোদের ব্যাকড্রপে অ্যাগনেসের মূর্তি একখণ্ড আগুন বলে মনে হয়েছিল তার। থেমে গিয়েছিল অ্যাগনেসের পা-ও। সে অবাক হয়েছিল, কেন একটা ছেলে শুধুমুধু গাছে উঠে বসে থাকবে। ফিক করে হেসে ও ফেলেছিল তারপর। মুখ ঘুরিয়ে চলে গিয়েছিল নিজের পথে। লাফাতে লাফাতে গেটের বাইরে বেরিয়ে ভিড়ে হারিয়ে গেল অ্যাগনেস। কিন্তু, ওই মুচকি হাসিতে মুন্না মরে গেল সারাজীবনের মতো। তার মনে হল, সূর্য স্থির, পৃথিবী নিজের আবর্তন থামিয়ে দিয়েছে, আর মুন্নার চরাচরে হাসির টুকরো শতধা হয়ে আছড়ে পড়ছে। ও খেয়াল করেনি, গাছের নীচে আমি এসে দাঁড়িয়েছিলাম। মুন্নার দৃষ্টি অনুসরণ করে দেখেছিলাম অ্যাগনেসকে। মনে মনে আমি শঙ্কিত হয়েছিলাম। কিন্তু, মুন্নাকে ডাকিনি। অনেকটা সময় পরে মুন্নার খেয়াল হল, আমি দাঁড়িয়ে। গাছের ওপর থেকে বিহবল দৃষ্টি ফেলল আমার ওপর। হেসে ফিসফিস করল, ‘আমি মরে গেছি, ভাই।’
.
‘আমার একে পাগলি লাগে। এর নাকি মাথাখারাপ, লোকে বলে। মাথা গরম বলে চুল অমন আগুনতাতা লাল।’ হাঁটতে হাঁটতে বলেছিলাম ওকে। মুন্না কথা বলছিল না। ঘোরের ভেতর ছিল। আলতো গলায় সাবধান করলাম, ‘তোকে পাত্তা দেবে না। তুই দেহাতি।’ আমরা কিছুদূর হেঁটে ঝাঁটিফুলের মাঠে এসেছিলাম। মুন্না নীরবে ঘাস চিবোচ্ছিল মাঠে বসে। ‘অনেক টাকা করলেও দেবে না?’
.
‘এক-শোটা মোষের মালিক হলে দিতে পারে। ওই দেখ, ওর বোন যাচ্ছে। ডলোরেস।’ ডলোরেস আমার মতো গুটিয়ে থাকত, ওরও বন্ধু হয়নি। বুকের কাছে ব্যাগ গুটিয়ে মাথা নীচু করে হেঁটে যাচ্ছিল। আমাদের দিকে তাকিয়ে পরিচিতের হাসি হাসল। হাত নাড়ল মুন্না। কিন্তু, ডলোরেস ওকে চিনত না বলে ভুরু কোঁচকাল। মুন্না দৌড়ে এগিয়ে গেল ওর দিকে। দু-জনের কী কথা হল জানি না। কয়েক মিনিট পর ডলোরেস চলে গেল। তৃপ্তমুখে আমার কাছে ফিরে মুন্না বলল, ‘অ্যাগনেস আমার বউ হবে। এই মেয়েটা আমার বোন।’
‘হুস!” আমি হাসলাম। কী আকাশকুসুম কল্পনা! ‘সেটাই ওকে বলতে গেলি?”
‘বোন পাতালাম শুধু। খুব হাসল আমার কথা শুনে। তারপর হাত মেলাল কিন্তু, একটুও অহংকার নেই ওর।’
কিছু কল্পনা করতে পারত মুন্না! কাজকর্ম মাথায় তুলে অ্যাগনেসের কথা ভেবে যেত। আমাকে বলত, একটু বড়ো হলে সে অ্যাগনেসকে নিয়ে কলকাতা চলে যাবে। মাঝে মাঝে দূর থেকে পিছু নিত অ্যাগনেসের। অ্যাগনেস যখন বাড়ি ঢুকে যেত, মুন্না অ্যাগনেসের ঘরের জানালার দিকে তাকিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকত। আমি মাঝে মাঝে এসে ওর হাত ধরে টেনেছি, ‘মুন্না বাড়ি চল।’ মুন্না স্বপ্নাচ্ছন্নর মতো চোখ তুলে হেসেছে, ‘আমার কোথাও যাবার ছিল না তো!’ অ্যাগনেস কিন্তু ওকে গ্রাহ্য করত না। পথের ধারে হাঁ করে দাঁড়িয়ে আছে মুন্না, তাকে অগ্রাহ্য করে উদাসীন মুখে অ্যাগনেস হেঁটে যাচ্ছে, পেছন ফিরে তাকাচ্ছে না একবারও— এ দৃশ্য একাধিকবার দেখেছি আমি। কিন্তু, ওই যে সেই প্রথমদিন গাছের মাথায় মুন্নাকে দেখে হেসেছিল অ্যাগনেস, সেটাকেই মুন্না তার জীবনের পরম সম্পদ বানিয়েছিল। কেউ তো এর আগে ওকে দেখে ওভাবে হাসেনি—অন্তত মুন্না সেরকমই বলত আমার কাছে। আমি শুরুতে পাত্তা দিইনি। ভেবেছি, দু-দিনে খেয়াল কেটে যাবে। এ পৃথিবীর মুন্নাদের চেনা আমার সেই বালক বয়েসে অনেক বাকি ছিল। তার থেকে বড়ো কথা, যদি ওকে আমি আটকাতাম আরম্ভেই, মুন্নার পরিণতি এরকম হত না। অ্যাগনেসের হাত ধরেই তার প্রথম পুলিশি প্রহারের স্বাদ পাওয়া। আমি কিন্তু অ্যাগনেসের নিখোঁজ হবার কথা বলছি না। সেটা মুন্নার দ্বিতীয় পুলিশ এনকাউন্টার ছিল। প্রথমবারের কথা অনেকে ভুলে গেছে। অবিনাশ যাদবের মনে থাকতে পারে।
একটা নাছোড় ছেলে অ্যাগনেসের পেছনে লেগেছিল। ছেলেটা মিটমিটে শয়তান টাইপের। অ্যাগনেসকে চিঠি লিখত। পাত্তা না-পেয়ে ওদের বাড়িতে ঢিল ছুড়ত। অ্যাগনেস মাথার চুল ছিঁড়ে গালাগালি দিত, থুতু ছেটাত। ছেলেটা হাসত। রাস্তাঘাটে পিছু নিত অ্যাগনেসের। কিছু করত না, শুধু পেছন পেছন যেত একটু দূরত্ব রেখে। অস্বস্তি হত অ্যাগনেসের, সে গালাগালি দিয়ে ভাগাতে চাইত। কিন্তু, ছেলেটা মুখে বিষহাসি ঝুলিয়ে ওর দিকে তাকিয়ে থাকত। রাত হলেই ঢিলের পর ঢিল। ছোটো শহরে কথা ছড়ায় দ্রুত। মাইকেল কোথা থেকে শুনেছিলেন যে, এই ছেলের সঙ্গে অ্যাগনেসের চক্কর চলছে। মেয়েকে মারধর করলেন। যদিও অ্যাগনেসের কিছুই হাত ছিল না এতে। এই অবস্থায় আসরে নামল মুন্না। ডলোরেসের কাছে শুনে ছেলেটাকে একদিন রাস্তায় ধরল। তুমুল মারপিট হল দু-জনের। মুন্না ওর কষের দাঁত ফেলে দিল ঘুসি মেরে। ছেলেটা পটপট করে মুন্নার মাথার চুল ছিঁড়ে আনল। কপাল খারাপ মুন্নার, ছেলেটা ছিল সম্ভ্রান্ত যাদব ফ্যামিলির। তার বাবা গিয়ে থানায় নালিশ জানালেন। ছোটো জাত বলে মুন্নাকে তুলে আনলেন ওসি। অন্য ছেলেটার কিন্তু কিছুই হল না। সেই প্রথম মুন্নার থানায় যাওয়া। বেদম মার খেয়েও মুন্না কিন্তু নিজের বক্তব্য থেকে নড়েনি—আগে ওই ছেলেটা অ্যাগনেসকে বিরক্ত করেছে। ওসি মুন্নার পিঠে লাথি মেরে বললেন, ‘শালা ছোটোলোকের বাচ্চা, ওদের ঝামেলা ওরা মেটাবে। তুই কেন মাথা গলাতে গেলি আগে বল।’
‘স্যার, আপনি অ্যাগনেসকে ডাকুন। ওর কাছে জিজ্ঞাসা করুন যদি আমি মিথ্যে বলি।’ সেদিন মুন্নাকে লক-আপে রাখা হল। পরদিন অ্যাগনেসকে ডাকা হল থানায়। মাইকেল নিয়ে এলেন। পুলিশের প্রশ্ন শুনে অবাক চোখে মুন্নাকে দেখল অ্যাগনেস। হয়তো মুন্নাকে সে এর আগে চিনতই না। মুন্না ওর সামনে মাথা নীচু করে বসে ছিল। চোখে চোখ রাখতে সাহস পাচ্ছিল না। পুলিশি তাগাদায় অ্যাগনেস এবার ঘাড় নাড়ল— হ্যাঁ, ছেলেটার সঙ্গে তার ঝামেলা হয়েছে বটে। কিন্তু, মুন্নাকে সে কিছুই করতে বলেনি। ‘এ কে? আমি তো একে চিনি ও না। কী করে ও? এই প্রথম দেখলাম।’ অ্যাগনেসের প্রতিটা শব্দে ঝরে পড়া তাচ্ছিল্যকে মুন্না কুড়িয়ে নিচ্ছিল। কিন্তু, মাথা তোলেনি।
‘লোকের বাড়ি দুধ দেয়।’ ওসি চিবিয়ে চিবিয়ে বললেন।
‘এ আমার বন্ধু কেন হবে?’ অ্যাগনেস উদাসীন মুখে দেওয়াল দেখছিল। অ্যাগনেসের সামনেই ওসি আরেকপ্রস্থ মারলেন মুন্নাকে। বলে দিলেন, মুন্না এখন থেকে তাঁর বই-তে উঠে গেল। মুন্নার চোখে আক্রোশ বা প্রতিহিংসা, কী দেখেছিলেন তিনি জানি না। নাহলে অত মারবার কারণ ঘটে না। লাথি মেরে কুকুরের মতো থানার বাইরে মুন্নাকে ছুড়ে দিয়ে জানানো হল, নিজের অউকাদ সে যেন না ভোলে। মুন্নার ইজের খুলে গিয়েছিল।
সে ন্যাংটো হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল থানার বাইরে। অন্যান্য পুলিশেরা জড়ো হয়ে মজা দেখছিল। কিন্তু, তাদের কাউকে মুন্না গ্রাহ্য করেনি। সে শুধু দেখেছিল, অ্যাগনেস বাইরে এসে দাঁড়িয়েছে। উলঙ্গ মুন্নাকে দেখছে, যেমন সার্কাসের জন্তুকে দেখি আমরা। মুন্নার লজ্জা হয়নি। সে সোজা চোখে অ্যাগনেসের দিকে তাকিয়েছিল। মাইকেল পেছন থেকে এসে অ্যাগনেসের চোখে হাত চাপা দেন। তাকে টেনে অন্যদিকে চলে যান। একজন পুলিশ মুন্নার ইজের ভেতর থেকে ছুড়ে দিল। ধুলো থেকে কুড়িয়ে নীরবে পরে নিল মুন্না।
সেদিন থেকে শহরে রটে গেল, মুন্না অ্যাগনেসের নতুন প্রেমিক। কেন, কী জন্যে, আমরা জানি না। কিন্তু, গুজবের ধর্ম বরাবরই যুক্তিহীন হওয়া। মুন্না সেগুজবে কান দিত না, আবার ভাঙাতেও যেত না। চ্যাংড়া ছেলেপুলের দল ওকে ‘ল্যাংটাচোদা’ বলে আওয়াজ দিত। মুন্না ঘুরে বেড়াত নির্বিকার মুখে। আমি ওকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম একবার, “তোর রাগ হয়নি, মুন্না? এত অপমান—’
‘আমার বাপ-দাদাদের পুলিশ এভাবেই শাস্তি দিয়ে এসেছে।’ মুন্না চোখ নামাল। ‘আমাদের লজ্জা বরাবর কম। নাহলে টিকতে পারব না।’
‘অ্যাগনেসের সামনেও লজ্জা হয়নি তোর?’ মুন্না উত্তর দিল না। আমি আবার বলতে গেলাম, ‘অ্যাগনেসও তো তোকে—’
‘ওর দোষ নেই, ফ্রেডি। সত্যিই তো আমাকে চিনত না।’
রেগে গিয়ে বলেছিলাম, ‘তোর বুদ্ধিশুদ্ধির জলাঞ্জলি হয়েছে, মুন্না। নাহলে, তুই ভাবিস অ্যাগনেস তোর দিকে ফিরে তাকাবে!’
‘ভাবি না। আমি জানি। কয়েক দিন পর দেখিয়ে দেব।’
‘কী দেখাবি?’ কিন্তু, মুন্না উত্তর দিল না।
কয়েক দিন পর গঞ্জের মানুষজন দেখল, একটা ইস্ত্রি করা নতুন শার্ট আর চকচকে ফুলপ্যান্ট পরে মুন্না দাঁড়িয়ে আছে স্কুলের গেটের সামনে। তার চোখে হলুদ রোদচশমা। মুন্নার হাতে একটা ফুলের বোকে। সেন্ট জন’স চার্চের বাগান থেকে বাহারি নানা ফুল তুলে সুদৃশ্য সাজিয়ে এনেছিল মুন্না। লোকে দেখেছিল সে ঘন ঘন ঢোক গিলছে। তার মুখ রোদের তাপে লাল। তারপর স্কুলের ঘণ্টা বাজল। ছেলেমেয়েরা বেরোচ্ছিল। আপনমনে গুনগুন করতে করতে অ্যাগনেস বেরোল। মুন্না তাকে ডাকল পেছন থেকে। অ্যাগনেস দাঁড়িয়ে তার দিকে তাকিয়ে ভুরু কোঁচকাল। মুন্না স্মার্টলি এগিয়ে এসে অ্যাগনেসের হাতে ফুলের বোকে তুলে দিয়েছিল। কয়েক মুহূর্ত দুই পক্ষই চুপ। কেউ জানে না কী বলবে। আশেপাশের অন্যেরাও দেখছে। সেই ভিড়ের মধ্যে থেকে হঠাৎ একটা আওয়াজ উঠল, ‘ল্যাংটা রোমিয়ো।’ মুন্না চমকে তাকাল সেদিকে। তারপর তার চোখে পড়ল অ্যাগনেসের সারাশরীর কাঁপছে। তার মুখ লাল হয়ে উঠছে চেপে রাখা হাসিতে। অ্যাগনেস মুখে হাত চাপা দিল, তারপর অবরুদ্ধ হাসির বিস্ফারে শরীর নুয়ে গেল অ্যাগনেসের। তার মুখ থেকে ছিটকে বেরোল হো-হো ধ্বনি সঙ্গে কয়েকটা শব্দ— ‘ওহ্, দ্যাট সিন!’ হাসিতে লুটিয়ে পড়ছিল অ্যাগনেস, পেট চেপে মাটিতে প্রায় বসে পড়ে আর কি। তার হাত থেকে বোকে পড়ে গেল। স্কুলের অন্যান্য ছাত্রছাত্রীরা, যারা মজা দেখতে ভিড় করেছিল, তারাও হেসেছিল। নিজেদের মধ্যে গা টিপে মুচকি নয়, এক মূর্খ দেহাতি ছেলের সামনে যেভাবে হা-হা হাসতে হয়। মুন্না নিজেও বোকার মতো হেসে যোগ দিতে চাইল তাদের কোলাহলে। কিন্তু, তারপর তার ঠোঁট কেঁপে গেল, ফ্যালফ্যালিয়ে তাকিয়ে থাকল শুধু। বছর দুয়েক আগে অ্যাগনেস যেভাবে অপমানিত হয়েছিল ব্রাউনদের বাড়ি, তারই পুনরাবৃত্তি ঘটল যেন এবার। আমি সেদিন স্কুলে আসিনি, জানতামও না মুন্না এমন কাণ্ড ঘটাবে। জানলে আটকাতাম ওকে। কয়েক মুহূর্ত স্থির দাঁড়িয়ে থেকেছিল মুন্না। তারপর হঠাৎ প্রচণ্ড রাগে দৌড়ে গিয়ে দুম করে ঘুসি মেরেছিল একটা হাস্যরত ছেলের পেটে। ছেলেটা ‘ওরে বাপ রে’ বলে পেট চেপে বসে পড়ল। ভিড়ের হাসি আতঙ্কিত চিৎকারে বদলে গেল। দৌড়ে পালিয়ে গেল মুন্না। কেউ কেউ বলে, অ্যাগনেস তখনও হাসছিল। মুন্নাকে ঘুসি মারতে দেখেও তার হাসি থামেনি।
বিকেলে খবর পেয়ে আমি দৌড়ে গেলাম। মুন্না তখন জোহার হালে-তে গিয়ে বসে থাকত। সেখানে স্থানীয় মেয়েদের সমাগম ঘটে। মুন্নার ধারণা ছিল, সেখানে অবিশ্বাস্য রূপবতীরা ব্লাউজ খুলে খোলামেলা বসে থাকে। অনেকটা উঁচুতে একটা বড়ো পাথরের আড়াল খুঁজে পেয়েছিল মুন্না। সেখান থেকে আমরা লুকিয়ে দেখতাম সেই মহার্ঘ্য মেয়েদের, যারা পরস্পরের সঙ্গে গল্প করতে আসে, খিলখিলে হাসিতে গড়িয়ে দেয় লাবণ্যের স্রোত, পরক্ষণেই বিষাদের মুখোশে নিজেদের ঢেকে ফেলে। তেমন অসামান্য বিভঙ্গ আমাদের দুজনের অজ্ঞাত ছিল। মুন্না ফিসফিস করে এক-একটা মেয়েকে দেখিয়ে তার সম্পর্কে গল্প বলত—অমুক নাকি দিন শেষ হলে চট্টি নদীর জলে ডুব দেয়, ওঠে একেবারে ভোরবেলা। জলের নীচে তার রাজপ্রাসাদ আছে। অন্য একটা মেয়েকে দেখিয়ে বলেছিল, তার তলপেটে প্রজাপতির বাসা, রাত্রে সে যখন পোশাক খোলে তখন সেগুলোকে দেখা যায়। আমি বিশ্বাস করতাম না। কিন্তু, মুন্না চোখ ছুঁয়ে দিব্যি কাটত।
সেদিন কিন্তু সে মেয়েদের দেখেনি। পাথরে পিঠ ঠেকিয়ে বসে ছিল। আমি নীরবে তার পাশে গিয়ে বসলাম। একটা কোলাব্যাং আমাদের সামনে ছপাত করে লাফাল। গরম হাওয়া দূর জঙ্গলের মাথার ওপর ঝুলছিল। রোদের তাপে মুন্নার সরু মুখ আনমনা লাগছিল। গাছের ডাল দিয়ে পাশের ঝোপে অকারণে ছপ করে সে অনেকটা সময় পর বলল, ‘একদিন আমি দেখে নেব। সবাইকে ।
‘কীভাবে দেখবি?’
‘এই সব,’ হাত ঘুরিয়ে মুন্না দেখাল চারপাশ, ‘সব দেখে নেব।’ পাগলের প্রলাপ শুনে আমি হাসলাম। মুন্না আমার দিকে ঘাড় ফেরালে আবিষ্কার করলাম, ওর চোখ কী গভীর কালো।
‘হবে, ফ্রেডি। একদিন।’
আমরা একে অন্যকে বুঝতে চাইতাম। পরস্পরের ভেতর অযুত দূরত্ব থাকলেও সেই বালক বয়েসে সহমর্মী হওয়া যায়। সেভাবেই আমরা দু-জন চার বছর ধরে একে অন্যের পাশে থেকেছি। অ্যাগনেসের প্রতি মুন্নার প্রেম কমেনি। কিন্তু, সে নিজেকে এক্সপোজ করত না। সাহস পেত না অ্যাগনেসের সামনে যাবার। একবার থানায় আর একবার স্কুলের সামনে, দু-বারেই সে চরম অপমানিত হয়েছিল। কিন্তু, তার দিবারাত্র শয়ন ও স্বপন অ্যাগনেসের চিন্তা বাদে অন্য কিছু ছিল না। তারা কীভাবে বড়ো হবে, একটা বাড়ি বানাবে কলকাতায়, তিনটে বাচ্চা হবে তাদের যাদের একটা মেয়ে, এসব বলত যখন মুন্না, ওর চোখ কোমল হয়ে যেত, গলার স্বর গভীর। আমার ভয় লাগত ওকে দেখে। মনে হত এই অর্থহীন প্ৰেম ওকে একদিন পাগল বানিয়ে দেবে। ফুলের বোকে দেবার অনেকদিন পর একবার অ্যাগনেসকে সে কাঁচা হাতে লেখা একটা চিঠি পাঠিয়েছিল। তাতে কাগের ঠ্যাং বগের ঠ্যাং অক্ষরে মুন্না জানিয়েছিল, অ্যাগনেসকে নিয়ে সে পালাতে চায়। চিঠিটা ডলোরেসের হাতে দিয়েছিল সে। ততদিনে ডলোরেসের সঙ্গে ভ্রাতৃসুলভ বন্ধুত্ব তার হয়ে গেছে। মুন্না আমাকে বলেছিল, ডলোরেস তার কথাগুলো সহানুভূতির সঙ্গে শুনত। কেঁদে ফেলত কখনো, আবার কখনো মুন্নার পিঠে হাত রেখে বলেছে, ‘তুমি আশা ছেড়ো না। একদিন সব ঠিক হবে।’ সেই চিঠি অ্যাগনেস পেয়েছিল কি না জানি না। মুন্না বিশ্বাস করে ডলোরেস ঠিকই দিদির হাতে তুলে দিয়েছিল। কিন্তু, অ্যাগনেস বলাই বাহুল্য উত্তর দেয়নি। কিছুদিন পর আমি মুন্নাকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, ‘তোর কি মনে হয় অ্যাগনেসের অন্য প্রেমিক আছে বলে তোকে পাত্তা দেয় না?’
‘সবাই যা বলে, সেটা আমাকে বিশ্বাস করতে বলিস না। অ্যাগনেসের ওরকম কিছু নেই। আমি ওর নাড়িনক্ষত্র জেনেছি এতদিনে।’
‘কিন্তু মাথা খারাপ তো।’
‘তাই?” অদ্ভুতভাবে তাকিয়ে থেকেছিল মুন্না। মন্তব্য করেনি।
আমি জানি না, অ্যাগনেস নিখোঁজ হবার দিন কেন মুন্নার সঙ্গে ওর ঝগড়া হয়েছিল। তার আগে মুন্নার সঙ্গে ভালো করে তিনটে বাক্য বিনিময়ও করেনি। তবে, তার কয়েক দিন আগে থেকে গুম হয়ে গিয়েছিল মুন্না। আমার সঙ্গেও তেমন কথা বলছিল না। কিছু একটা হয়েছিল ওর। আমি জিজ্ঞাসা করে উত্তর পাইনি। আমরা তখনও দেখা করছি, আড্ডা মারছি একসঙ্গে। কিন্তু, ও অন্যমনস্ক। আমি বিরক্ত হয়ে উঠে চলে এসেছিলাম। ও পিছু ডাকেনি।
অবশেষে এসেছিল সেইদিন ভোরবেলা, যেদিন আমার জানালার কাছে মুন্না এসেছিল। ওর টোকা আমি চিনতাম। জানালা খুলে দেখি, মুন্নার ফ্যাকাশে মুখ। ‘অ্যাগনেসকে পাওয়া যাচ্ছে না।’
ঘুম কাটেনি ভালো করে। প্রথমে বুঝিনি কী বলছে। তারপর ধীরে ধীরে মাথায় ঢুকল। আমি জানালা দিয়ে হাত বাড়িয়ে মুন্নার হাত চেপে ধরলাম, ‘সবাই জানে তুই ওর জন্য পাগল।’
‘কাল আমার সঙ্গে ঝগড়া করেছে। অনেকে দেখেছে।’ মুন্নার ঠোঁটে রক্ত ছিল না।
‘ঝগড়া? তোর সঙ্গে? অ্যাগনেস তোকে চেনে?’ কিন্তু, বলার পরে মুন্নার চোখে বিদ্যুতের মতো রাগ খেলে গেল। আমি সাবধান করলাম নিজেকে। আমরা কেউ আর ছোটো নেই। আমি পনেরো, ও সতেরো। এই বয়েসে, যত প্রিয় বন্ধুই হোক, তার ইগোকে আঘাত করতে নেই। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, কী নিয়ে ঝগড়া। কিন্তু, মুন্না বলতে চাইল না। আমার শুনে লাভ নেই নাকি ।
সেই সকাল বেলাটা আমি চোখ বুজলে এখনও দেখতে পাই। মেঘলা দিন, স্যাঁৎসেঁতে, টুপটাপ জল ঝরছে আমাদের কার্নিশ দিয়ে। ভিজে মাটিতে আঙুল গেঁথে দাঁড়িয়ে মুন্না। ওর গাল, কাঁধ, হাত গড়িয়ে জল পড়ছে, তবু গ্রাহ্য নেই। ওর মুখ বিভ্রান্ত। নিজেও কেঁদেছিল কি না জানি না, তবে চোখ লাল। আমি জানালা ধরে বসে ছিলাম। বাইরে বেরোব, সেই বোধ ছিল না। মুন্না ফিসফিস করল, ‘আমি অ্যাগনেসকে খুঁজতে যাচ্ছি, ফ্রেডি।’
‘কোথায় যাবি?’
জানি না। কিন্তু, অ্যাগনেস যতদিন ফিরে না-আসে, আমি ওর খোঁজ চালিয়ে যাবই। ওকে নিয়ে ফিরে আসব। সবাইকে দেখিয়ে দেব আমি ওর ক্ষতি করিনি।’
‘তুই ওকে খুঁজে পাবি না। ওটা পুলিশের কাজ ।
“তুই আসবি আমার সঙ্গে?’ কিন্তু, আমি উত্তর দিতে পারিনি। সেই বয়েসে আমি বুঝিনি, নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করার এত তাগিদ কীসের ওর। বুঝিনি, কারণ আমি ওর মতো গরিব ছিলাম না। আমার ওপর লোকাল থানার ওসির নেকনজর ছিল না। যাদব আর ঠাকুরদের গ্রামে ডাকাতির কারণে আমি বিপদে পড়তাম না। আমি নিরাপদ ছিলাম, আর ছোটো ছিলাম। তাই আমার বন্ধুর পাশে কেন দাঁড়াতে হবে, সেদিন আমি সত্যিই বুঝিনি।
মুন্না চলে গেল। রাস্তায় ওঠার পর আমার কী মনে হল, চেঁচালাম, ‘মুন্না, শোন।’ ও ফিরে তাকাল। ‘সত্যিই তুই অ্যাগনেসকে কিছু—’ কিন্তু, তারপর আমার গলায় কথা আটকে গেল। আমি যে ওকে অবিশ্বাস করতে পারি, সেটা হয়তো ও ভাবেনি। ওর চোখে আমি যে কী দেখেছিলাম তখন— কষ্ট, বিস্ময়, ভয়— আরও কিছু। নির্জন রাস্তায় কালো আকাশ মাথায় নিয়ে ওর দাঁড়িয়ে থাকা মুতিৰ দেখে মনে হল সেই মুহূর্তে মুন্না ভয়ংকর একা হয়ে গেল। ওর পাশে, পেছনে, সামনে, ওর চরাচরে অন্য কেউ নেই। কয়েক মুহূর্ত সেভাবে তাকিয়ে থাকল আমার দিকে, তারপর দৌড়োতে শুরু করল মুন্না। রাস্তা থেকে মাঠে নামল। তারপর জঙ্গলের দিকে। আমি আবার ডাকলাম ‘মুন্না’, কিন্তু হাওয়ায় আমার কথা ভাসিয়ে নিয়ে গেল। আমি দেখলাম বৃষ্টি নামছে আর মুন্নার মূর্তি ছোটো হচ্ছে দ্রুত। বৃষ্টিতে ভেঙেচুরে যাচ্ছে ও।
মুন্না কোথাও যেতে পারেনি, সে আপনি জানেন। পুলিশ ওকে ঠিকই তুলেছিল। লকআপে মার খেয়ে রক্তবমি করেছিল ও। গোড়ালির একটা হাড় ভেঙেছিল। ওসির বেল্টের হুক কপালে গিঁথে গভীর ক্ষত করেছিল, সেটা পরে বিষিয়ে যায়। হাসপাতালে দিতে হয় মুন্নাকে। সেপসিস হয়েছিল। নেহাত বয়েস কম আর অন্য অসুস্থতা ছিল না বলে সেযাত্রায় বেঁচে আসে। পুলিশ কিছু না-পেয়ে হাত তুলে নিয়েছিল। কিন্তু, মুন্না গঞ্জে আর ফেরেনি। হাসপাতাল থেকে ওকে নিতে এসেছিল জ্ঞাতি কাকা। মুন্না তার সঙ্গে না-গিয়ে রাঁচিতে চলে যায়। ওর ভয় ছিল গঞ্জে ফিরলে পুলিশ ওকে মেরে ফেলবে, কারণ সেই ওসি ডাকাতির বদলা নেবার জন্য পাগল হয়ে উঠেছিলেন। মিথ্যে কেসে ফাঁসিয়ে দিতেন মুন্নাকে, অথবা অ্যাগনেসের কেসেই আবার তুলতেন হয়তো। রাঁচির বস্তিতে ওর জ্ঞাতিভাই ছিল। মুন্না সেখানে গিয়ে কিছুদিন থাকে। তারপর ঠিকে শ্রমিকের কাজ নিয়েছিল। কয়েক মাস পর ওর সেপসিস আবার ফিরে এসেছিল। ফলত, হাসপাতালে ভরতি হতে হয় আবার। এবার সিরিয়াস অবস্থা হয়েছিল, যমে-মানুষে টানাটানি। কিন্তু, এবারেও বেঁচে ওঠে মুন্না। তারপর হাসপাতাল থেকে একদিন উধাও হয়ে যায়। হাওয়ায় মিশে যায়। কীভাবে যেন রটে যায় যে, মুন্না হাসপাতালেই মারা গেছে।
ভবিষ্যতের বছরগুলোতে অন্ধকার রাস্তায় বিরোধী দলের রাজনৈতিক কর্মীদের যখন আছড়ে ফেলা হত মাটিতে এবং পবন কুমার হাতে পিস্তল ধরে তাদের চোখের সামনে এসে দাঁড়াত, তখন গুলি করার আগে প্রত্যেকবার অভ্যেসবশত সে কপালের কাটা দাগটায় একবার হাত বুলিয়ে নিত, যেটা তাকে পুলিশ সারাজীবনের জন্য উপহার দিয়েছিল। সে শুরু করেছিল রাজনৈতিক খেপ খেটে—স্লোগান দেওয়া, মিছিলে যাওয়া, ভোটের সময়ে মারামারি। ১৯৮৯ সালের ভাগলপুর দাঙ্গায় অনেকগুলো খুনজখম করে পুলিশের খাতায় উঠে আসে। তারপর থেকে শুরু হয় রাজনৈতিক মহলের অন্ধকার গলিঘুঁজি দিয়ে তার যাতায়াত। তারপর থেকে তার ঝোড়ো উত্থানকে রোখা যায়নি। কখনো মুক্তি মোর্চা, কখনো কংগ্রেস,
আবার পরমুহূর্তে বিজেপি, সবার হাতে তামাক খেতে খেতে, আর হাওয়া বুঝে ক্যাম্প বদল করতে করতে সে মাসলম্যান থেকে মাফিয়া হয়ে উঠেছিল, হয়ে উঠেছিল অযুত সম্পদের অধিকারী, আর তার হেঁটে যাওয়া রাস্তায় পড়ে থেকেছিল অনেকগুলো লাশ ও বারুদের গন্ধ। পবন কুমার জানত, নিয়তি যদি তাকে শোষিত গরিব কুর্মি বানায়, তাহলে তাকে জয় করার জন্য সে কাজে লাগাবে পুরুষকারকে। সে জানত বীরভোগ্যা বসুন্ধরা। সে এগুলো জানত, কারণ অন্য কিছু কখনো কেউ তাকে শেখায়নি, এমনকী আমিও না। এমনকী যে অ্যাগনেসকে সে ভালবেসেছিল, সে-ও তাচ্ছিল্যের হাসিতে তার অনুরাগকে সার্কাসে পরিণত করেছিল। বহু বছর পেরিয়ে এসে পবন কুমার যখন পিকে রিয়েল এস্টেট নামের কোম্পানি খুলবে, সে তাই চাইবে এই ইতিহাস বদলে দিতে। ধুলোয় মিশিয়ে দিতে সমস্ত স্থাপত্য, পুরোনো বাড়িঘর, অপমানের গঞ্জকে, বানিয়ে তুলতে নতুন ইতিহাস, যেখানে কেউ তার অতীত মনে রাখবে না। নিজের প্রতিজ্ঞা পবন কুমার ভোলেনি। একটার পর একটা অ্যাংলো কটেজ সে ভাঙছে লাভের আশায় নয়। কোনো কিছু সে বাঁচিয়ে রাখবে না। এই শহর তার প্রথম ভালোবাসাকে কেড়ে নিয়েছিল। তাকে নামিয়ে এনেছিল রাস্তার কুকুরের পর্যায়ে। এবার তার সময় এসেছে।
আর নিয়তির কী অদ্ভুত পরিহাস দেখুন—যেভাবে পুরোনো বাড়িঘর ভেঙে পবন কুমার ইতিহাস মুছে দিতে চেয়েছিল, সেই ভাঙচুরের সূত্রেই আবার উঠে এল অ্যাগনেসের ছবি। অতীত স্মৃতি উথলিয়ে আমাদের সবার সামনে এসে দাঁড়াল। একে আপনি নির্মম রসিকতা বাদে কী বলবেন? পুরোনো সময় যেন কিছুতেই মুছতে দেবে না নিজেকে। তা বারে বারে জ্যান্ত হয়ে উঠে দাঁড়াবে, মুন্নাকে তাড়া করবে। সেইজন্য জিজ্ঞাসা করেছিলাম, পুরুষকার না নিয়তি, কীসে আপনি বিশ্বাস রাখেন।
মুন্না কিন্তু অ্যাগনেসকে ভোলেনি। ওর সারাজীবনের সেটাই একমাত্ৰ প্ৰকৃত প্ৰেম ছিল। তাই দূরে থেকেও অ্যাগনেসের বিষয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খ খবর রাখত। হয়তো, ওর শহর ছাড়া বা পরবর্তী জীবনের পেছনে একমাত্র নির্ধারক যেহেতু অ্যাগনেসের অন্তর্ধান রহস্য ছিল, তাই ও চাইলেও ভুলতে পারত না। যদি অ্যাগনেস ওর প্রেম মেনে নিত, তাহলে কি সব কিছু একইরকম থাকত? মুন্না কি আজকের পবন কুমার হয়ে উঠত? সবথেকে বড়ো কথা, অ্যাগনেস কি হারিয়ে যেত? কী থেকে কী ঘটত, ভেবে লাভ নেই, আমি জানি। কিন্তু, আমার তো বন্ধু ছিল মুন্না, যাকে আমি বাঁচাতে পারিনি। ও চেয়েছিল, তবু ওর পাশে গিয়ে দাঁড়াতে পারিনি সেই সকাল বেলায়। তাই মনে হয়, ও কেন ভালোবাসতে গেল? কী লাভ হল এতে! কেউ তো দিনের শেষে থাকল না। অ্যাগনেস নয়, মুন্নাও তো নয়।
আজ এসব গল্প দিয়ে কারোর কিছু আসে-যায় না। গঞ্জ মরে যাচ্ছে, পবন কুমার না হলে অন্য কোনো রিয়েল এস্টেটের কাছে এমনিই মানুষ তাদের ভিটেমাটি বিক্রি করে চলে যেত। শুধু আমরা, যারা পুরোনো মানুষ, যারা এই টাউন ত্যাগ করতে পারিনি প্রাণে ধরে, বরং প্রাচীন গল্পগুলোকে নিজেদের বুকের ভেতর ধুলো করে মরে যাচ্ছি, তারা রোজ করুণা আর আক্ষেপের আয়নায় নিজেরা দাঁড়াই। ফিসফিস করে মুন্নাকে ডাকি। আমরা দেখতে পাই কালো আকাশ মাথায় নিয়ে মাঠের ওপর দিয়ে মুন্না ছুটে যাচ্ছে, যাকে আর কখনো ধরা যাবে না।
.
