নৈশ অপেরা – ১৬

১৬

আর প্রভুগণ, তোমরা তাহাদের প্রতি তদ্রূপ ব্যবহার কর, ভর্ৎসনা ত্যাগ কর, জানিও, তাহাদের এবং তোমাদেরও প্রভু স্বর্গে আছেন, আর তিনি কাহারও মুখাপেক্ষা করেন না ৷

– Ephesians | 6:9

.

সমর দোসাদকে তাঁর বস্তিতে পাওয়া গেল না। লোকে জানাল তিনি নাকি শুঁড়িখানাতেই রাত কাটান। টাউন ছাড়িয়ে পাকারাস্তার পাশের দিশি মদের দোকানে তাঁর সন্ধানে হানা দিতে হল। বাঁশের ঝাঁপ তুলে মুখ বাড়ালেন সমর। চোখ লাল, মাথার চুল উশকোখুশকো। মুখে অন্তত সাতদিনের না-কাটা দাড়ি বছর পঁয়ষট্টি হবে। ছেলেরা নাকি দেখে না, তাই এই বয়েসেও শুঁড়িখানায় কাজ করেন। ঘরে আছে বউ, বুড়ি পিসি, আইবুড়ো মেয়ে যার একটা পা খুঁতো হবার কারণে বিয়ে হচ্ছে না। তাদের কাঁইকিচির থেকে বাঁচতে রাত্রে এখানে থাকেন। আমার আর অ্যারনের পরিচয় পেয়ে অবাক হলেন প্রথমে, তারপর অবিনাশকে দেখে হাসলেন। সেই ঘটনার পর কাজ থেকে ছাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। তারপর থেকে খবর রাখেনি, জানিয়েছিল বারবারা। অবিনাশ সমরের কাছে খোঁজ করলেন এখন দিশি, বিলিতি কিছু পাওয়া যাবে কি না। হেঁ-হেঁ করে হাসলেন সমর। এত ভোরে? আমার বা অ্যারনের প্রতিবাদ কাজে এল না। কিছু দূরে একটা শালগাছের নীচে বেঞ্চি পেতে মুখোমুখি বসে পড়লেন দু-জন। সঙ্গতে প্লাস্টিকের গ্লাস, মদ, লিমকা। কোথা থেকে কয়েকটা পেয়ারা কেটে বিটনুন মাখিয়ে নিয়ে এলেন সমর। অবিনাশ বায়না ধরলেন ফুলুরি পকোড়ার, কিন্তু সমর দুঃখিতমুখে জানালেন এত সকালে বানানো হয় না। ভাব দেখে মনে হল তাঁর বুক যেন ফেটে যাচ্ছে অবিনাশের আবদার রাখতে না-পেরে। অবিনাশ আমাদেরও অফার করতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু আমার মুখ দেখে কিছু বলতে সাহস পেলেন না। অবশ্য, আমাদের সম্মান দেখিয়ে দুটো প্লাস্টিকের চেয়ার সমর জোগাড় করে এনেছিলেন। তারপর দু-জনে মেতে উঠলেন মদের আড্ডায়। অ্যারন ভাবগম্ভীর।

‘তোকে কোথায় মেরেছিলাম যেন?’

‘কোনবার, স্যার?’

‘যা শালা! অনেকবার মেরেছি নাকি?’

‘চারবার। ১৯৯৫ সালে শেষবার তুললেন। আমরা ততদিনে গুরুজির অ্যান্টিলবি হয়ে গেছি। গুরুজির অত মাখামাখি কংগ্রেসের সঙ্গে, মানতে পারিনি অনেকে। তাই ওরা যে যেখানে পারে পুলিশ লেলিয়ে দিয়েছিল আমাদের বিরুদ্ধে। সেটা পার্লামেন্ট ভোটের আগে আগে। আমি কিন্তু বরাবরই এ কে রায়ের ফ্যাকশনের লোক ছিলাম, সেই মোর্চা শুরুর দিন থেকে। বোকারোতে আমাদের ইউনিয়নে রায়বাবুর অবদান ভোলার না।’ দু-হাত তুলে নমস্কার করলেন দোসাদ। ‘তো, ১৯৭৫ সালের চিরুদি কেস দিয়ে তুলিয়েছিল। এদিকে আমি তখন এলাকাতেই ছিলাম না, যখন ওই দাঙ্গাহাঙ্গামা ঘটে। পরে আমার নাম ঢুকিয়ে দিয়েছিল ওরা। ভগত মারান্ডিকে মনে আছে? ও শালা উসকেছিল।’

‘খুব মনে আছে ভগতকে। এখন দেওঘরে থাকে। ওখানকার কেবল অপারেটরদের সবক-টা কোম্পানিতে শেয়ার আছে ওর। ২০০০ সালের পর থেকে কোল মাফিয়ারা যখন ওদের ব্যাবসার টাকা বৈধ খাতে ঢেলে সাদা করতে শুরু করল, জলের সাপ্লাই, কেবল টিভি, সিডির ব্যাবসা এসবে, তখন ও মিডলম্যানের কাজ করেছিল। ভালোই গুছিয়ে নিয়েছে এখন। পলিটিক্স ছেড়ে দিয়েছে অনেকদিন। আমার সঙ্গে বার দুয়েক দেখা হয়েছিল।’

‘কোথায়? জেলে নাকি?’

‘আরে না, ওরা বড়োসড়ো ব্যাপার। দেওঘরে একবার ফ্যামিলি নিয়ে ঘুরতে গেছি, আমাকে দেখে বোলেরো থামিয়ে মুখ বাড়াল। তারপর সে কী খাতির! একটা হোটেল আছে ওর। সবাইকে সেখানে বেসিক রেটে ডিলাক্স রুমে রাখল, এলাহি খাওয়া-দাওয়ার আয়োজন। রাতে আমার সঙ্গে মদ খেতে বসে ভোর অবধি টেনেছিল। পুরোনো দিনের কথা। কান্নাকাটিও করল, মনে সুখ নেই। বউ ছেড়ে গেছে। একটা ইয়াং মেয়েকে রেখেছে, ভোজপুরি সিনেমার পার্টটাইম অ্যাকট্রেস। কিন্তু, মেয়েটা নাকি ওকে লুকিয়ে বাইরে প্রেম করে বেড়ায়। আমাকে ধরেছিল শেকড়বাকড়ের জন্য। বিছানায় টানতে পারে না বেশিক্ষণ, তাই মেয়েটা ওকে ধোঁকা দিচ্ছে। মিলিটারি মান্ডির ফোন নাম্বার দিলাম।’ অবিনাশ কিছুক্ষণ স্মৃতিচারণা করলেন তারপর। আমার হাই উঠছিল। সত্যিই কি তাঁর আসল বিষয়ে ঢোকার ইচ্ছে আছে? ‘তখন হাতিয়াতে পোস্টেড। লক-আপে ভগতকে এমন মেরেছিলাম যে দুই পা ফাঁক করে হাঁটত। ও-ও শোধ নিয়েছিল উলটে। কানেকশন খাটিয়ে আমার নামে হিউম্যান রাইটস ঠুকে দিল। ব্যস, শোকজ, কমিশন— এখন নাকি কোলেস্টেরল নিয়ে নাকানিচোবানি খাচ্ছে। সে যাক। তোকে কি ১৯৯৫ সালে পিটিয়েছিলাম? খেয়াল থাকে না সব।’

‘অতটা না। হালকা চড়থাপ্পড়। আসল মার তো ‘৮৩ সালে। ঘুসি মেরে নাক ফাটালেন। ঝরঝর করে রক্ত, আর তা দেখে আমার সে কী কান্না! মনে হচ্ছিল, শরীরের সব রক্ত বেরিয়ে মরে যাব এবার। তাতে খেপে গিয়ে আরও মারলেন। নাকটা ঠিক হয়নি। মাঝেমাঝেই কাঁচা জল বেরোয়, ভেতরে সুড়সুড় করে। এই দেখুন,’ আঙুল দিয়ে নাকের কাছে ফোলা জায়গা দেখালেন।

চুকচুক করে মাথা নাড়লেন অবিনাশ। ‘কত পাপ যে করলাম জীবনে! তবে, ১৯৯২ সালে তোকে মারিনি, না?’

সমর চোখ পিটপিট করলেন। ‘ঠিক মনে পড়ছে না, স্যার!’

‘কেন তুলেছিলাম সেটা মনে পড়ছে?’ উত্তর না-দিয়ে মদে চুমুক দিলেন সমর, আড়চোখে আমার দিকে তাকালেন। অবিনাশ আবার প্রশ্ন করলেন, ‘কী রে, সেবারের কথা মনে আছে তো?’

‘অনেকদিন হয়ে গেল, বাদ দিন না, স্যার! কী জন্য এসেছেন, বলুন।’

‘এইজন্যই এসেছি।’ আমি বললাম। যেভাবে ঢিলেগতিতে এগোচ্ছে, আজ সারারাতেও কথা শেষ না হতে পারে। ‘তখন আপনাকে পুলিশ তুলেছিল, সন্দেহ করেছিল, সেসবের মধ্যে ঢুকছি না। কিন্তু, কয়েকটা প্রশ্ন আছে, করেই চলে যাব।’

‘আর কীসের প্রশ্ন দিদি! আমার গোটা জীবনটা ভেঙেচুরে গেল। কারখানার কাজটা যাবার পর ওখানে ঢুকেছিলাম, মন দিয়ে করছিলাম, কারোর সাতেপাঁচে থাকিনি। কিন্তু গরিব মানুষ তো, তাই আমাদের সবাই প্রথমে টার্গেট করে। তারপর থেকে আর কোথাও ঠিকঠাক কাজ পাইনি। পলিটিকাল লাফড়ায় জড়িয়ে পুলিশের কেস খাওয়া এক ব্যাপার, কিন্তু বাচ্চাচুরির দাগ একবার লেগে গেলে সবাই সন্দেহের চোখে তাকাবে। আমার সব কিছু বরবাদ হয়ে গেল। নাহলে এই বয়েসে এমন ঘষটে যেতে হয়?’ আক্ষেপের ভঙ্গিতে অদূরে শুঁড়িখানার দিকে হাত তুললেন সমর। ‘পরশু রাতেও গায়ের ওপর বমি করে দিল একটা চুতিয়া।’

‘সব চুকেবুকে গেছে। আর আক্ষেপ করে কী করবি?’

‘দাগ তো থেকেই যায়, স্যার। নির্মলা দুবের কথা মনে নেই আপনার? তার কী হয়েছিল শেষতক?

কিছুক্ষণ চুপ থেকে অবিনাশ নীচুগলায় বললেন, ‘জানি।’

‘এই তদন্ত চালাবার সময়ে কি আপনি নিশ্চিত হয়েছিলেন যে, ক্রিসের নিরুদ্দেশ হবার সঙ্গে অ্যাগনেসের নিরুদ্দেশ হবার যোগ আছে?’

‘না। বরং, জেনিফারের বাড়ি থেকে ফেরার পরে আমার ধারণা বদ্ধমূল হয়েছিল যে, ক্রিসের ঘটনার সঙ্গে ইচ্ছে করে অ্যাগনেসের নাম জড়িয়েছিল কেউ। সাদা চিরুনি আর অ্যাগনেসের নিখোঁজ হবার দিন, যা ক্রিসের নিখোঁজ হবার দিনের কাছাকাছি। তখন আমার মনে একটাই প্রশ্ন জেগেছিল, তা হল— কেন? যে মেয়েটা ছয় বছর আগে হারিয়ে গেছে, তাকে টেনে আনলে কার কীসে লাভ? অথবা, সে বিশ্বাস করাতে চেয়েছিল যে, অ্যাগনেসের প্রেত এসে ক্রিসকে নিয়ে গেছে! এতজন থাকতে ক্রিসের ওপর কেন নজর পড়েছিল সেই ভূতের অপরাধী একটা স্মোকস্ক্রিন তৈরি করেছিল ঠিকই, যাতে পুলিশের নজর অন্যদিকে ঘুরে যায় এবং সে গা-ঢাকা দিতে পারে।’

‘কিন্তু, সেটা এতই অ্যাবসার্ড একটা স্মোকস্ক্রিন যে, পুলিশের নজর টানতে ব্যর্থ হল।’ বললেন অক্ষয়।

‘একদমই তাই। বারবারা ভুল বলেননি, একটা চিরুনি দিয়ে অ্যাগনেসকে কানেক্ট করতে গেলে অন্য উচ্চতার কল্পনাশক্তি লাগে।’ বললেন সোমেন। ‘কিন্তু, এখানে একটা স্ববিরোধ আছে। ভেবে দেখুন, ব্রাউনদের বাড়িতে অ্যাগনেসের ছবি? চিঠি? সেগুলোও কি ইমপ্লান্ট? যদি সেটাই হয়, সেগুলো দক্ষভাবেই করেছিল কিন্তু। সেক্ষেত্রে একই লোকের চিরুনি ফেলে যাওয়াকে ব্যাখ্যা করা যায় না, কারণ সেটা নজর ঘোরানোর কাঁচা চেষ্টা। একই মানুষ প্ৰথম চাল দক্ষ দিয়ে পরের চাল কাঁচা দেবে, এ কি বিশ্বাসযোগ্য?’

এই দিকটা তখন আমিও ভাবিনি। তিনজন নীরব থাকলাম খানিকটা সময়।

‘অ্যাগনেস নিখোঁজ হবার পর পুলিশ এডওয়ার্ডকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছিল। তাহলে কি এডওয়ার্ড অ্যাগনেসের কোনো ক্ষতি করেছিলেন, যার প্রতিশোধ এত বছর পর নেওয়া হল? বারবারা বলেছিল, ক্রিসকে অপহরণ এডওয়ার্ডের পক্ষে অসম্ভব ছিল না। তাহলে অ্যাগনেসের ক্ষতি কেন অসম্ভব হবে? বাড়ি থেকে অ্যাগনেসের ফটো খুঁজে পাবার পর আমরা যখন সেটা নিয়ে কথা বলছিলাম, এডওয়ার্ডকে অন্যমনস্ক দেখেছি। তারপর বারবারার বাড়ির আড্ডায় যখন অ্যাগনেসের প্রসঙ্গ উঠল, এডওয়ার্ড উত্তেজিত হয়ে পড়েছিলেন। যেন এই আলোচনা তিনি চান না। সেটাই-বা কেন? কিন্তু, ধরা যাক, এডওয়ার্ড অ্যাগনেসের ক্ষতি করেছিলেন। তারপর? এডওয়ার্ডকে খুন করল কে?’

তাহলে ক্রিসকে অপহরণের সঙ্গে অ্যাগনেসের যোগ থাকার কথা মানতে হলে, হয় অ্যাগনেসকে বেঁচে থাকতে হবে, অথবা, অ্যাগনেসের হয়ে অন্য কেউ এডওয়ার্ডের ওপর প্রতিশোধ নিয়েছিল, সেই তত্ত্ব মানতে হবে। কিন্তু, দ্বিতীয় ক্ষেত্রে যে প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাচ্ছে না— ক্রিসকে অপহরণের পর অপরাধী টানা এতগুলো বছর চুপচাপ ছিল, তারপর কি ঘুম ভেঙে জেগে উঠল? তার মনে হল, আরে এডওয়ার্ডের ওপর প্রতিশোধ তো নেওয়া হল না! যাই, ওকেও খুন করে আসি। এটা প্রচণ্ড কষ্টকল্পনা হচ্ছে। প্রথমত, অ্যাগনেস আর ক্রিসের ঘটনার ব্যবধানই ছয় বছরের, কোনো সংযোগ টানতে গেলে এই প্রশ্ন উঠবেই যে, প্রতিক্রিয়া ঘটতে এত সময় লাগল কেন। সে যদি মেনেও নেওয়া যায়, কিন্তু তার পরের এই পঁয়ত্রিশ বছরের ব্যবধানকে কোনোভাবেই ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়।’

কী? ’ ‘তাহলে এডওয়ার্ডের হত্যার সঙ্গে অ্যাগনেসের যোগ নেই। সেক্ষেত্রে চিরুনির ব্যাখ্যা

‘ডাইভারশন। কিন্তু, ক্রিসের সময়ে ব্যবহার হয়েছিল যে চিরুনি, সেটার কথা কে কে জানে? সবাই ভুলেই গিয়েছিল, অবিনাশ যাদব মনে না-করালে চিরুনির প্রসঙ্গ উঠত না। সেক্ষেত্রে সেই হাতে-গোনা লোকজনের কেউ এডওয়ার্ডকে হত্যা করেছেন ধরে নিতে হয়, যারা আপনার অনুমান শুনেছিলেন যে, চিরুনি চোখ ঘোরানোর জন্য ব্যবহৃত হয়েছিল।’

‘সেক্ষেত্রে অবিনাশ নিজে, বারবারা, অ্যারন, জেনিফার যদিও হুইলচেয়ারে বন্দি, হয়তো ডলোরেস- অন্য তো কেউ নেই! যদি না বাইরের কেউ, যে ক্রিস আর এডওয়ার্ড, দুই অপরাধই ঘটিয়েছে একই পদ্ধতি ব্যবহার করে।’

‘সেক্ষেত্রে আবার আগের প্রশ্নে ফিরে যেতে হবে। এতদিন পরে কেন?’

‘কয়েক বছর আগে এক অঙ্কের শিক্ষিকা আমাকে ওকাম’স রেজর থিয়োরি বলেছিলেন। একটা সমস্যার একাধিক সমাধান থাকলে সবথেকে সহজটা আগে যাচাই করে দেখা উচিত, কারণ সিংহভাগ সময়ে সেটা আসল সমাধান হয়।’ আরেকটা সিগারেট জ্বালালাম। ‘এক্ষেত্রে সহজতম সমাধান হল, অ্যাগনেস, ক্রিস এবং এডওয়ার্ড ব্রাউন একে অন্যের সঙ্গে কানেক্টেড। সবথেকে সহজ বলছি কারণ এক্ষেত্রে তিনটে অপরাধের একটা কমন সূত্র থাকে। এটা না হলে প্রত্যেকটাকে আলাদাভাবে তদন্ত করতে হবে। সেক্ষেত্রে প্রতিটার জন্য আলাদা পাত্রপাত্রী আর মোটিভ চলে এসে পুরোটা সাংঘাতিক জটিল রূপ নেবে। অক্ষয়ের দিকে ফিরলাম, ‘আপনারা কি অতটা সময় এই কেসের পেছনে খরচ করবেন, নাকি হাতের কাছে যাকে সন্দেহভাজন মনে হয়, তাকেই তুলবেন ?

‘আমাদের কেস ক্লোজ করতে হবে, মিস ভট্টাচার্য! আপাতত অবিনাশ যাদবের মতো সাসপেক্ট অন্য কেউ নয়। তিনি হুমকি দিয়েছিলেন, এডওয়ার্ডকে দেখে নেবেন। খুনও করবেন বলেছিলেন। এডওয়ার্ড খুন হবার কয়েক দিন আগে জোহার হালে-তে তাঁকে সন্দেহজনকভাবে ঘুরতে দেখা গেছে। এমনকী অ্যালিবাইও ছিল না।’ অক্ষয় বললেন।

‘আপনারা যদি নিশ্চিত থাকেন অবিনাশই অপরাধী, কলকাতায় এসে আমার কাছে গল্পটা শুনতে চাইলেন কেন? অবিনাশকে তো গ্রেপ্তার করতে পারতেন।’

‘আমি নিশ্চিত নই।’ অক্ষয় মৃদুস্বরে বললেন।

‘আমি নিশ্চিত। অবিনাশ অপরাধী নন। কেন, সেটা আগেই বলেছি। তিনি খুন করে মৃতদেহ ওভাবে স্টেজ করবেন না। আর, অ্যাগনেসের চিরুনি ওখানে রাখা? অসম্ভব।’

অক্ষয়কে প্রায় অনুনয়ের সুরে বললাম, ‘আপনারা কি দেখতে পাচ্ছেন না, পার্প ইজ স্টিল অ্যাট লার্জ? আসল অপরাধী এখনও ঘুরে বেড়াচ্ছে যে হয়তো ক্রিস এবং অ্যাগনেসের রহস্যের সঙ্গে জড়িয়ে!’

‘পুলিশ যখন এডওয়ার্ডের বডি খুঁজে পেল, স্থানীয়রা সবাই ভিড় করেছিল, কিন্তু, অবিনাশ আসেননি। নিজের বাড়িতে বসে ছিলেন।’

উঠে দাঁড়ালাম। ‘মোটামুটি সবই বলে দিয়েছি। আর মনে হয় আপনাদের কিছু জানার নেই। শেষদিন কী ঘটেছিল, পুলিশ ফাইলে সমস্তটা আছে। এবার কি আমি যেতে পারি?’

অক্ষয় বাধা দিলেন না। রাস্তায় পা রেখে হতাশায় মাথা ঝাঁকালাম। কত বড়ো ভুল— কী সাংঘাতিক অন্যায় করতে যাচ্ছে ওরা, কেউ যদি জানত! নিরপরাধ একজনকে শাস্তিই শুধু নয়। আসল অপরাধী একটা মৃতদেহকে ওভাবে স্টেজ করে নীচে চিরুনিটা রেখে দিল, শুধুমাত্র একটা মেসেজ দেবার জন্য। সেটাকে ও অগ্রাহ্য করল ওরা। তবু, আমার কিছু যায় আসে না। আমি বাড়ি ফিরব, ভুলে যাব সমস্ত কথা। কিন্তু, রাস্তার সামনে এসে আমি থমকে দাঁড়ালাম। জোলো বাতাস রাত্রের ফাঁকা শহরের ওপর দিয়ে উড়ে গেল। কেঁপে উঠল খানাখন্দে জমানো জল। অনেকটা সময় ধরে আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভেবে গেলাম, কীভাবে রাস্তা পেরোব।

‘নির্মলার বর আত্মহত্যা করেছিল। বউ গ্রেপ্তার হবার পর সবাই ভাবত ও বাচ্চা চুরি করেছে। এমনকী খালাস পেলেও লোকের সন্দেহ যায়নি। গ্রামবস্তির সমীকরণ অন্যরকম হয়, শহরের মতো না। এখানে একবার গায়ে দাগ লেগে গেলে ওঠে না। ওদের একঘরে করে দিয়েছিল অন্যেরা। কথা বলত না। দোকান, বাজার, মুদিখানা বন্ধ। দু-মাইল দূর থেকে বাজার করে আসতে হত। এমনকী সামান্য তেল কি নুন ফুরিয়ে গেলেও হাঁটো দু-মাইল। ওর বর চাপ নিতে পারেনি। মাসতিনেক পরে গলায় দড়ি দেয়।’ অবিনাশ বললেন।

‘নির্মলার কী হয়েছিল?’

‘ওর মেয়ের বিয়ে হয়েছিল রায়গড়ে। মা-কে সে নিতে চায়নি। সম্ভবত শ্বশুরবাড়ির চাপে। নির্মলার বাপের বাড়ি, বুড়ো বাপ-মা, তার ভাইয়ের সংসার, সেখানেও নির্মলা টাকা দিত। কিন্তু, তারা বলেছিল সংস্রব রাখবে না মেয়ের সঙ্গে। নির্মলা গঞ্জ ছেড়ে মুর্শিদাবাদ চলে গিয়েছিল, সেখানে নাকি বাড়ি বাড়ি ঝিয়ের কাজ করত। শেষ বয়েসে ফিরে আসে, কারণ শরীর অশক্ত হয়ে যাবার পর কাজগুলো হারিয়েছিল। অন্য কোথাও যাবার ছিল না। বছর দশেক বেঁচে ছিল তার পরেও। কেউ দেখত না। টুকটাক কাজ করত, যা পারে। প্রায় বিনা চিকিৎসায় মরেছিল বলা যায়। টিবি হয়েছিল। ঘর থেকে শেষদিকে বেরোত না। ছোঁয়াচের ভয়ে লোকে এড়িয়ে চলত। ডাক্তার দেখাবার সামর্থ্য তার ছিল না ।’

‘আপনি তো টাকাপয়সা দিয়েছিলেন।’ সমর বললেন অবিনাশকে। অবিনাশ না-শোনার ভান করলেন।

কিছু বলার সাহস আমার ছিল না। মাথা ঝুঁকিয়ে কাঠ হয়ে বসে ছিলাম। অ্যারনও চুপ। অবিনাশ বললেন, ‘এসব বাদ দে। অনেকদিন হয়েছে। এরা খারাপ উদ্দেশ্য নিয়ে আসেনি। বাচ্চাটার কী হয়েছে জানলে তুইও স্বস্তি পেতি, ঠিক কিনা? ওইটুকু শিশু, সে তো শত্রুতা করেনি কারোর সঙ্গে।’

‘তা ঠিক, কিন্তু এখন কি মনে আছে অত কিছু?’

‘আমি একটা জিনিস জানতে চাই, সমরদাদা।’ বললাম। ‘বাচ্চাটা নিখোঁজ হয়েছে শোনার কিছুক্ষণ আগে থেকে কিছুক্ষণ পরে, আপনি কাকে কোথায় দেখেছিলেন। মনে আছে?’ কিন্তু, সমরের স্মৃতি থেকে নতুন কিছু পাওয়া গেল না। তবে, কেউ একজন দোতলা থেকে ইংরেজিতে চিৎকার করেছিল, সেটা তাঁরও মনে আছে দেখলাম।

‘আপনার কাউকে সন্দেহ হয়নি?”

‘কী হবে এখন এসব বলে?’

‘তবুও, একটা মিথ্যে অপবাদ আপনার ওপর এসেছিল। আপনার তো মনে হতেই পারত, অমুক লোককে আমি দেখেছিলাম, আমার মনে হয়েছিল সে এমন কাজ করতে পারে, কিন্তু তাকে কেউ ধরল না, ধরল আমাকে। এরকম হয় তো, তাই না? সেরকম কাউকে মনে হয়েছিল?’

‘দেখুন দিদি, আমার মতো অন্য নিরপরাধ মানুষ শাস্তি পাক, সেটা চাই না। পুলিশ আমাকে বিনা দোষে অনেকবার তুলেছে। তাই জানি, কেমন লাগে। আমি আজ রাগ মেটাতে বলে দিলাম ওই লোকটার ব্যবহার সন্দেহজনক ছিল, তারপর তার জীবনটা নরক হল।’ পুলিশ কিছু করবে না, একথা সমরকে বলে লাভ নেই। তিনি অনেক বেশি জীবন দেখেছেন। ‘আর সাধারণ মানুষের সন্দেহ? নির্মলাদিকেও তো পুলিশ ছেড়ে দিয়েছিল। তাতে কি সে তার হারানো জীবন ফিরে পেয়েছিল?’

‘তোর অ্যাগনেসকে মনে আছে?’ হঠাৎ প্রশ্ন করলেন অবিনাশ ।

সমর ভ্যাবাচ্যাকা খেলেন। ‘অ্যাগনেস আবার কে? এমন নামের কাউকে তো শুনিনি! ‘একটা মেয়ে, যে হারিয়ে গিয়েছিল। তার ভূতকে সবাই দেখে।’

‘ওহ্, সেই পাগলি মেমসাহেব! সে তো হারিয়েছিল আমি শহরে আসার আগে। তাকে আমি চোখে দেখিনি। তবে, তার ভূতকে দেখেছি।’

‘কোথায় দেখলেন?’

পেয়ারায় কামড় বসিয়ে কচমচ চিবোচ্ছিলেন সমর, সেই অবস্থায় মাথা নামিয়ে চিন্তা করলেন। ‘অনেক বছর আগে, তা ধরুন কুড়ি তো হবেই, আমি বড়োরাস্তা দিয়ে ফিরছিলাম। তখন সন্ধে যায় যায়, গরমকাল, ভালো বাতাস দিচ্ছে। তো, জোহার হালে পেরোবার সময়ে দেখি আলো জ্বলছে। অত রাত্রে ওখানে কেউ যায় না, আলো কে জ্বালাবে? এক হতে পারে কাঠের চোরাকারবারিরা। সাইকেলটা সাবধানে নামিয়ে বাইরে থেকে উঁকি মারলাম। জায়গাটা তো দেখেছেন, ঢালু হয়ে ওপরের দিকে উঠে গেছে। মাঝামাঝি ঢালে দেখি কে একজন দাঁড়িয়ে। তার পায়ের দিক থেকে আলো বেরোচ্ছে। অন্য কেউ হলে সেখানেই ভয়ে চেঁচিয়ে উঠত। কিন্তু, আমরা রায়বাবুর চ্যালা। রায়বাবু বলেছিলেন, ততক্ষণ সাহস ধরে রাখতে যতক্ষণ বোকা অ্যাডভেঞ্চারে পরিণত না হয়। তাই ভাবলাম, আরেকটু দেখি। কয়েক পা সরে গিয়ে দেখলাম, পায়ের কাছে একটা হ্যারিকেন রাখা। তার থেকে আলো বেরোচ্ছে। দেখলাম, দাঁড়িয়ে এক লম্বা মেমসাহেব। সাদা গাউন পরা, লাল চুল। শুকনো পাতায় মনে হয় পায়ের আওয়াজ হয়েছিল, তাতে হ্যারিকেন হাতে তুলে মেমসাহেব মুখ ফেরাল। তখন সন্ধেবেলা, তবু হ্যারিকেনের আলোয় দেখেছিলাম, কী নীল সে-চোখ! ওই চুল আর চোখ দেখেই বুঝেছি, কাকে দেখছি। আমি এগোইনি, সেভাবেই দাঁড়িয়ে— মিথ্যে বলব না, রায়বাবু যা বলে থাকুন, তখন একটু ভয় ভয়ই লাগছে। শুধু জানি, মেমসাহেব ক্ষতি করে না। তো, সে-ও দাঁড়াল না। হ্যারিকেন হাতে দ্রুতপায়ে জোহার হালের ঢাল বেয়ে ওপরে উঠে গেল। কোথায় গেল, দেখিনি, কারণ ওপরের দিকটা গাছপালায় ঢাকা। আলো ক্ষীণ হয়ে গেল। আমিও বড়ো নিশ্বাস ফেলে সাইকেলে উঠে বসলাম।’

‘শুধু দাঁড়িয়েই ছিল, না, কিছু করছিল? হাতে কিছু দেখেছিলি?’

‘মনে তো হল দাঁড়িয়েই ছিল। হাতে কিছু দেখিনি, দেখলেও মনে নেই এখন। কিন্তু, সেই মেমসাহেবের কথা কেন আনছেন এখানে? তাঁর সঙ্গে কিছু যোগ ছিল?” ‘নাহ্। আসলে, দু-জনেই হারিয়ে গেছে তো, তাই।’

‘কী আশ্চর্য ব্যাপার দেখুন। আপনারা বলায় মনে পড়ল। বছর দুয়েক আগে এক ভদ্রলোক এই শুঁড়িখানার কাছে গাড়ি থামিয়ে একে, ওকে মেমসাহেবের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করছিলেন। কেউ ইদানীংকালে ওর ভূতকে দেখেছে কি না। একজন জিজ্ঞাসাও করল, কেন জানতে চাইছেন। তাতে বললেন, ভূত থাকলে নাকি টুরিস্ট স্পটের দাম বাড়ে। তারপর চলে গেলেন।’

আমরা পাথর। অ্যারনের নিশ্বাস পড়তে ভুলে গেছে।

‘আমাকে অবশ্য জানতে চাননি কিছু। তবে, কাছে ডেকে দুই হাজার টাকা দিয়েছিলেন। এমনিই। আমাকে চেনেনও না। অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, কিছু লাগবে কি না। তাতে জানালেন, কিছু লাগবে না। যেন নিজের খেয়াল রাখি। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, আমাকে কি চেনেন? তাতে বললেন, চেনার দরকার লাগে না।’

‘আর এসেছিলেন তার পরে?’ অবিনাশ চাপাস্বরে জিজ্ঞাসা করলেন।

‘নাহ্। ওই একবারই।’ কেমন দেখতে জিজ্ঞাসা করায় সমর বিভ্রান্ত চোখে মাথা নাড়লেন। ‘সাধারণ মানুষের মতোই। মাঝারি উচ্চতা, কামানো চৌকো মুখ। কপালে একটা কাটা দাগ ছিল।’

নীরবে মদ খেলেন কিছুক্ষণ, অবিনাশ আর সমর। তারপর সমর হাসলেন, “তবু আপনারা খোঁজখবর নিলেন। কেউ জানতেও চায় না, মরে আছি না বেঁচে। ছেলে দুটোও তো অমানুষ হয়েছে। অবিনাশ স্যারকে বলেছিলাম, ছোটোটাকে পুলিশে ঢুকিয়ে দিন। তা বলেন, অন্তত স্কুল পাশ না হলে হবে না। গণ্ডমূর্খ হয়েছে এদিকে। বখাটে, নেশা করে। আমিও করি, তবে হাঙ্গামা পাকাই না। এদিকে এ চুতমারানির ব্যাটা দু-বার লক-আপে গেছে। বাড়িতে সারাক্ষণ বউ আর মেয়ের খ্যাচখ্যাচ। সাধে কি এখানে পড়ে থাকি?’

অ্যারন উঠে দাঁড়াল। দেখাদেখি আমিও। ‘থ্যাঙ্ক ইউ, সমরদা। অনেক উপকার করলেন আমাদের। আজ আসি। দরকারে আবার আসব।’ কয়েক পা হেঁটে ঘুরে দাঁড়াল অ্যারন। অবিনাশ ততক্ষণে গেলাস শেষ করে মুখ মুছছেন। ‘যা বলেছিলাম আপনাকে তখন—যদি এমন কিছু অস্বাভাবিক দেখেছিলেন যা মনে থেকে গেছে, আমাদের বলতে পারেন।’

কয়েক সেকেন্ড চুপ করে আমাদের দেখলেন সমর। তারপর বললেন, ‘একজনের চালচলন আমার সুবিধের মনে হয়নি। কিন্তু, সেটা আমার বোঝার ভুল হতে পারে।’ আমরা সমরের দিকে এগোলাম।

“দেখুন, বাড়িতে নতুন বাচ্চা হয়েছে, সবাই দেখতে আসবে, আদর করবে, তাকে নিয়ে আনন্দ করবে, সে তো স্বাভাবিক। কিন্তু একজনকে দেখেছি, ও বাড়িতে দুইবার এসেছিল। ক্রিসবাবাকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছিল। আঙুলের গড়ন, কানের লতি, নাক। ঝুঁকে পড়ে মনোযোগ দিয়ে দেখছে আর বিড়বিড় করে বলছে, ‘মিলে যাচ্ছে। মিলতেই হবে’। তাকানোর ধরনটা আমার ভালো লাগেনি। কেমন যেন অস্বাভাবিক। তিনি এক সপ্তাহের ব্যবধানে দুইবার এসেছিলেন। আমি যদিও বাইরে থাকতাম, কিন্তু দুইবারই বাড়ির ভেতরে নানা উপলক্ষে থাকতে হয়েছিল সেইসময়টায়। দুইবারই দেখেছিলাম বিড়বিড় করে নিজের মনে কথা বলতে বলতে ক্রিসকে খুঁটিয়ে দেখছেন। আমরা গ্রামগঞ্জের মানুষ। বাচ্চার ওপর নজর পড়া, ডাইন, এসব মেনে চলি। আমাদের গ্রামে যদি এরকম করে কেউ বাচ্চা দেখে, তাহলে সঙ্গেসঙ্গে গালাগালি দেব তাকে, নাহলে জিজ্ঞাসা করব, কেন ওভাবে নজর দিচ্ছে। তেমন বেচাল দেখলে দুই ঘা দিয়ে দিতে পারি। কিন্তু বড়োলোকের বাড়ি, আপনারা শিক্ষিত মানুষ, আপনাদের তো এসব বলা যায় না! আমি জানি, বাড়ির অন্য কেউ খেয়ালও করেনি। আমারই চোখে লেগেছিল। আমি আদেশ যাদবকে বলেওছিলাম। সে এসবে জড়াতে বারণ করেছিল। শেষে আমার ঘাড়ে দোষ পড়বে।’ গ্লাসের অবশিষ্ট মদ শেষ করে ঠোঁট মুছলেন সমর। ‘দুইবার এসেছিল। দ্বিতীয়বার এসেছিল ক্রিসবাবা হারিয়ে যাবার তিনদিন আগে ।

‘কে?’

’‘ওই যে পাগলি বুড়ি, যে ভূত নামায়। তখন অবশ্য জোয়ান ছিল।‘জেনিফার!

‘হ্যাঁ হ্যাঁ, জেনিফার ম্যাডাম। চোরের মতো ভঙ্গিতে তাকাচ্ছিল

চারপাশে। ওই তাকানো দেখেই ভালো লাগেনি আমার।’

‘তখন আমাদের জানাসনি কেন?’ অবাক গলায় অবিনাশ বললেন।

‘আমার ঘাড়ে ক-টা মাথা, স্যার! এডওয়ার্ড স্যাররা বড়োলোক মানুষ, জেনিফার ম্যাডামও তাই। তার ওপর অ্যাংলো। আমাদের মানুষ বলে জ্ঞান করত না। আমি যদি বলতাম একথা, ওদের পুলিশ তো কিছু বলতই না, উলটে আমার সব জায়গায় কাজকম্ম বন্ধ হয়ে যেত। আপনারাও ভাবতেন, অন্যের ঘাড়ে দোষ চাপাচ্ছি। আমি যদি নিৰ্মলাদি বা আদেশ যাদবের ঘাড়ে সন্দেহ চাপাতাম, তাহলে কিছু বলতেন না। কিন্তু, জেনিফার ম্যাডামকে দোষী বলব, আর আপনারা তারপর আমার গায়ে আঁচড় অবধি কাটবেন না, এতটা বোকা আমি নই। আমাকেও তো অনেকবার তুলেছেন আপনারা। এখন বলছি কারণ আর কিছু এসে যায় না।’

অন্যমনস্ক স্বরে অ্যারন বলল, ‘জেনিফার !

‘তবে আমার ভুলও হতে পারে, বললাম তো। শুধুমাত্র সন্দেহের বশে একজনকে ‘তবু, কেন নয়? হতেই তো পারে!”

‘সেসব ভাবিস না। শুধু, তুই যদি আগে বলতিস, কাজ কমে যেত আমাদের।’ গাড়ির কাছে এগিয়েছে অ্যারন, নিজের চিন্তায় মগ্ন। আমি পেছন ফিরে দেখলাম, সমরের বুকপকেটে কিছু গুঁজে দিচ্ছেন অবিনাশ ।

.

‘এভাবে কত দেবেন, স্যার! ফুটো নৌকা কি আর মেরামত হয়! বরং, ছেলেটাকে যদি কিছু জুটিয়ে দিতেন—

‘জুটিয়ে দিয়ে লাভ নেই। তোর ছেলে তোকে তাতেও দেখবে না। বউয়ের হাঁপের একটা টান ওঠে বললি না? লাতেহারে ভালো ডাক্তার বাঁসে, দেখিয়ে নিস এটা দিয়ে। ওদের দাতব্য চিকিৎসাকেন্দ্র, শুধু ওষুধের পয়সা দিবি।’

‘জেনিফার! আগে কেন মাথায় আসেনি!’ অ্যারন আক্ষেপের ভঙ্গি করল। অবিনাশ শালগাছের গায়ে হেলান দিয়ে সিগারেট খাচ্ছেন। আমি ফিসফিস করে ‘স্যাক্রিফাইস’ উচ্চারণ করলাম। মাথা নাড়ল অ্যারন। ‘জেনিফার দুইবার যে বলেছিলেন, “সব মিলে যাচ্ছে”, সেটা হয়তো লক্ষণ মেলাবার কথা বলেছিলেন।

‘তুমি কী বলছ, জানো? এত ক্যাজুয়ালি বলছ কী করে?’

‘শুনতে ভালো লাগবে না তোমাদের। অবশ্য আমি জানি না, জেনিফার কতদূর যেতে পারেন। মানে, তাঁর চরিত্রে সেরকম পাগলামি ছিল কি না যে কারণে একটা বাচ্চাকে অপহরণ করা যায়।’ অ্যারনের হাত চেপে ধরলাম আমি। কথাটা যদি মনীষার কানে যায়—কিন্তু ওর কি এসে যায় কিছু? ‘জেনিফারের নামে আগেও কোনো ফাউলপ্লে-র অভিযোগ উঠেছিল কি—’ অ্যারন অবিনাশের দিকে ফিরল। তিনি নিজের ভাবনায় মগ্ন। দু-বার ডাকার পর হুঁশে এলেন, কিন্তু কিছু বলতে পারলেন না। তিনি যতদিন এখানে পোস্টেড ছিলেন, শোনেননি কিছু।

‘জেনিফার অন্যের জীবনের কাদা ঘেঁটে লোককে বলে, জাস্ট ফর ফান। এটুকুও যথেষ্ট খারাপ। কিন্তু, এর বাইরে— আমার বিশ্বাস হচ্ছে না অ্যারন। কিন্তু ‘

‘অবিশ্বাস করতে ভরসা পাচ্ছ না, তাই তো?”

‘কী করা যায় এখন? জেনিফারকে জিজ্ঞাসা?’ অবিনাশ প্রশ্ন করলেন।

‘অস্বীকার করবে। তারপর ঝগড়াঝাঁটি চিৎকার করবে। শহরময় ছড়িয়ে বেড়াবে মিথ্যে কেচ্ছা। অন্যভাবে ধরতে হবে ওকে।’ আমার ভুরু কুঁচকে গেল। ‘শুধু জেনিফারকে নিয়েই ভাববে? দুই বছর আগে একটা লোক এসে অ্যাগনেসের খোঁজ নিয়েছিল, সেটা তোমাদের ভাবাচ্ছে না? আমরা ছাড়া আরও কেউ কেউ তাহলে অ্যাগনেসকে নিয়ে ইন্টারেস্টেড! অ্যাগনেস বেঁচে থাকতে অনেকের মনোযোগ আকর্ষণ করেছিল। হারিয়ে যাবার এত বছর পরেও করছে। অথবা, অ্যারন মনে করাল, তার ভূত করছে। কিন্তু, এই গুজবে আমি পাত্তা দেবই-বা কেন? ‘ভূতের পয়েন্টটায় আমার ইন্টারেস্ট নেই। থাকলে থাকবে, না-থাকলে থাকবে না। মানে, যতক্ষণ না অলৌকিক কোনো অস্তিত্ব আমার কাজে ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে, সে ভূত, ভগবান যা-ই হোক না কেন, তাকে নিয়ে আমার কিছু এসে যায় না। আমি বেশি ইন্টারেস্টেড মানুষ অ্যাগনেসকে নিয়ে। এখনও কেউ কেউ তাকে নিয়ে কৌতূহলী। কেউ কেউ চায় না তাকে নিয়ে চর্চা হোক। ক্রিসের সঙ্গে এসবের সম্পর্ক কী? আদৌ কিছু কি আছে, নাকি, পুরোটাই আমার কল্পনা?’

‘একটা জিনিস আমার মনে হয়।’ বলল অ্যারন। ‘ওরকম লাল চুল আমাদের টাউনে কারোর ছিল না। নীল চোখ অবশ্য অনেকেরই আছে, জেনিফারের প্রয়াত বরের ছিল, কিটি গোমসের আছে, আমার ঠাকুরদার ছিল। ম্যাকিনলের বড়োমেয়ে হিল্ডার শুনেছি ছিল বেড়ালের মতো কটা চোখ। কিন্তু তাদের চুল ছিল হয় কালো, নাহলে ধূসর, বড়োজোর বাদামি। ডলোরেসের চুল, চোখ দুটোই কুচকুচে কালো। তো, ওই নীল চোখ আর লাল চুলের মেয়েকে একবার দেখলে একজন সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে একজন ভারতীয়, সে বার কয়েক ফিরে তাকাবেই। আর, এরকম মেয়েদের ব্যবহারে সামান্য উত্থানপতন, হয়তো চেঁচিয়ে কিছু বলল কাউকে বা রাগ করল, কয়েকগুণ বড়ো আকারে দেখা দেবে তাদের চোখে। তারা ভাববে এ বদরাগী। একটা উদাহরণ দিচ্ছি। আমাদের ছোটোবেলায় হিন্দি সিনেমা দেখে ধারণা হয়েছিল যে, ফ্রেঞ্চকাট, দাড়িওয়ালা, টাকমাথা লোক মানে, সে বদ । রাস্তায় এরকম লোক দেখলে আমি বার বার তার দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাতাম। সে হয়তো পার্কে বসে তার ছেলেকে বকছে, কিন্তু আমার মনে হত লোকটা এবার ছেলেটাকে গলা টিপে খুন করবে। লাল চুল, নীল চোখের সুন্দরী মেয়ের ক্ষেত্রে সেটা হয়ে দাঁড়ায় অতিজাগতিক কিছু। মেয়েটা যেন এ পৃথিবীর নয়, তার অস্তিত্ব এবং আচার-ব্যবহার আমাদের সঙ্গে মেলে না। এটা সচেতনভাবে কেউ ভাববে না, কিন্তু মনের ভেতর এগুলো আসতেই পারে। তাই এই মেয়েটার সঙ্গে উন্মাদনা বলো বা বহু প্রেমিক, এগুলো কানেক্ট করে দেওয়া সহজ। হয়তো তাকে পর পর দু-দিন দুটো আলাদা ছেলের সঙ্গে দেখা গেল, একজনের সঙ্গে স্কুল যাচ্ছে, আরেকজনের সঙ্গে টিউশনি। কিন্তু, লোকে ভেবে নিল দু-জনেই ওর প্রেমিক। ডলোরেসের বেলায় কিন্তু ভাববে না। তাকেও দেখতে-শুনতে মন্দ নয়, রূপও আছে। কিন্তু, তার চেহারায় এমন ব্যাপার নেই যা আউট অফ দ্য বক্স, ভারতীয় চোখে অন্তত। তাই এখানে, তনয়া, তোমার প্রশ্নের একটা উত্তর হতে পারে যে, রূপ নয়, বরং অন্যরকম ফিচারগুলো ওর সম্পর্কিত অতিকথা উসকে তুলেছে।’

এভাবে ভাবিনি। আমি মনের ভেতর যে অ্যাগনেসকে বানিয়ে নিয়েছিলাম সে রহস্যের প্রতিমূর্তি। কিন্তু, অ্যাগনেস আসলে তো একজন কিশোরী মাত্র, তাকে ভুলব কী করে?

‘একটা সমাধান না-হওয়া রহস্য কীভাবে অনেকগুলো জীবন নষ্ট করে দেয়, সেটাই আসল গল্প, তনয়া।’ বলল অ্যারন। ‘এটার কথা তোমাকে বার বার বলেছি। একটা কমিউনিটির ওপর কী প্রভাব পড়ে। ডিটেকটিভ গল্পগুলো অসম্পূর্ণ, কারণ সেখানে এই কাহিনিগুলো নেই।’

‘এমন কাহিনি, যেখানে তোমার পরিবার একইসঙ্গে ভিক্টিম এবং অপরাধী।’ তখন চোখে পড়ল, কাঁধে ব্যাগ নিয়ে দীপিকা সরেন হেঁটে যাচ্ছে। গুনগুনিয়ে গান করছিল, নাম ধরে ডাকায় থমকাল। তারপর এগিয়ে এল কাছে।

‘তুমি নাকি গোয়েন্দা?’

‘তেমন কিছু না। তোমার বাড়ির ঠিকানা দিলে না তো! তাই খুঁজে পেলাম না সেদিনের পর।’

‘তাতে কী হল! শহর তো ঘুরে নিয়েছ।’ অ্যারনের দিকে সোজাসুজি তাকাল। ‘তোমার বয়ফ্রেন্ড?’ অ্যারনের মুখে বিকার নেই, সে সিগারেট ধরিয়ে অবিনাশের দিকে হেঁটে গেল। ‘না। পরিচিত একজন। ব্রাউনদের বাড়ির ছেলে।’

“ওহ্! অ্যাংলোদের আমরা পছন্দ করি না, জানো তো! ওদের চার্চ নাকি আমাদের ধরে ধরে খ্রিস্টান বানাবে। তাই এখানে স্কুল খুলবে, মিশনারিরা হাসপাতাল বানাবে।’ কিন্তু দীপিকার মুখ দেখে মনে হল না সত্যিই কাউকে অপছন্দ করার তীব্রতা তার ভেতর আছে। ‘এই ছেলেটাও তো অ্যাংলো, কিন্তু দেখতে গুন্ডাদের মতো। এরকম কাউকে বয়ফ্রেন্ড বানালে কী করে?’

‘আবার বাজে কথা? স্কুল তো এখানে অনেক আগে থেকে ছিল। মিশনারিরা এসে ১৯৩৫ সালে স্কুল বানিয়েছিল।’

‘তখন থেকেই নাকি সবাইকে খ্রিস্টান বানাচ্ছে? তাই তো ওরা পালটা মন্দির তৈরি করছে এত। আমাদের বলেছে চার্চের মেলায় যেন না-যাই। আমাদের নাকি লাঠিখেলা আর ক্যারাটে শেখাবে।’

দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। ‘দীপিকা, তুমি অ্যাগনেসের ভূতকে দেখেছ?’

‘না। তবে এখানে অনেকে ভূত। মানুষের ছদ্মবেশে ঘোরে। জোহার হালে-তে রাত্রিবেলা গেলে দেখবে, ফিসফিস করে কথা বলছে অনেকে, ছায়ার মতো ঘুরছে। তাদের হয়তো সকাল বেলা বাজারে স্টেশনে দেখেছ, দিব্যি চা খাচ্ছে ক্যারম পিটছে, কিন্তু রাত বাড়লে জঙ্গলে ফিরে যায়।’

‘সবাই অ্যাংলো ভূত?’

‘তা কেন হবে! আমরা তো ওদের আগে থেকে আছি এখানে। আমাদের ভূত অনেক। আমরা রাতুর মহারাজের প্রজাদের বংশধর, জানো তো! টুরিস্ট পার্টি আসার পর আমাদের গ্রামের মেয়েরা ধামসা মাদল নিয়ে নাচতে যাবার বরাত পায়।’ মিচকি হাসল দীপিকা। ‘মানুষ কম যায়, ভূতের দল যায় বেশি। মানুষ যাবেই-বা কেন! আমরা কেউ নাচতে-ফাচতে পারি না। মাদল আমি ছুঁয়েও দেখিনি কোনোদিন। ওরা মেয়েদের ছবি তুলে রাখে, যেন চিড়িয়াখানা এসেছে। তারপর যখন বাড়ি ফিরে ফোন খুলে বসবে, দেখবে ছবি আছে কিন্তু মেয়েরা গায়েব। ভূতেদের ছবি ওঠে না।’

“ব্রাউনদের বাড়ি থেকে যে বাচ্চাটা হারিয়ে গিয়েছিল, তাকে কে গায়েব করেছিল, তোমরা কখনো কিছু শোনোনি?

“তুমি এত জানতে চাও কেন বলো তো? সিনেমা বানাবে আমাদের নিয়ে? নাকি, ডকুমেন্টারি? ইউটিউবে তুলবে?”

‘কেন, নিজের ইচ্ছেতে জানতে পারি না?

‘তুমি সেই পাবলিকগুলোর মতো। একবার একটা দোকান থেকে বার্গার কিনে খাচ্ছিলাম আমি আর আমার এক বান্ধবী, দেখি কয়েকটা টুরিস্ট পার্টি এসে চোখ গোল করে দেখছে। সাঁওতালদের বার্গার খেতে দেখেনি মনে হয়। আবার ছবি তুলছিল। চুতিয়ার বাচ্চাদের ওপর অ্যায়সান রাগ ধরল যে বার্গার ছুড়ে ফেলে মা, বোন তুলে খিস্তি করলাম। তখন বলে, নিজেদের ইন্টারেস্ট থেকে ছবি তুলছিল। ইন্টারেস্টের মা কি আঁখ! তোমারই-বা এত ইন্টারেস্ট কেন? ওসব কতদিন আগের কথা, আমরা ভালোই আছি সবাই।’

দীপিকাকে দেখতে দেখতে অ্যালিসের কথা মনে পড়ল। একটা মেয়ে, যে কথা বলে না, জিপসিদের রাজকন্যা। অন্যমনস্ক স্বরে বললাম, ‘তবু আমাকে খুঁজতে হবে।’

‘খোঁজো তাহলে। আমি যাই। তবে, উত্তর তুমি পাবে না।’ ফিক করে আবার হাসল দীপিকা। ‘এখানে সবাই পেটে কথা লুকিয়ে রাখে। কেউ কাউকে বিশ্বাস করে না।’ দৌড়ে দীপিকা এগিয়ে গেল, পিছু ফিরে চেঁচাল আবার, ‘যখন চলে যাবে, আমাকে ভুলো না কিন্তু ! আমিই তোমাকে রাস্তা চিনিয়েছিলাম প্রথমদিন।’ তারপর হি-হি হেসে জঙ্গলে ঢুকে গেল।

অবিনাশ গেলেন অন্য একটা কাজে। আমি আর অ্যারন বাড়ির পথে হাঁটা লাগালাম। শিশিরের দল শুকিয়ে গেছে। পাশের জঙ্গলে মহুয়া গাছের তলায় পাতা পোড়াচ্ছে একদল আদিবাসী। কাঁচা ফুল সংগ্রহ করে বাজারে বিক্রি করবে তারা। আমাদের দেখে কপালে হাত ঠেকাল একজন। হিন্দিতে বলল, ‘মাই বাপ ভগবান’। দূরে পূর্বের পাহাড়ে সবুজ রং ধরেছে। জোয়ার, বাজরা, গম কাটার মরসুম। একঝাঁক বটের উড়ে যাচ্ছে মাঠের ওপর দিয়ে। কী অনর্থক অপচয়, হাঁটতে হাঁটতে মনে হল আমার। ক্রিস চলে গেছে, তার খোঁজ করে এতদিন পরে কী ইতরবিশেষ হবে? কেন অ্যারনেরা অন্য পাঁচটা স্বাভাবিক মানুষের মতো বাঁচবে না? বর্তমানে বাঁচবে না? সেই একই কাজ, অন্তর্ধান রহস্যের তদন্ত, সেই এক, আবার এবং আবার এবং আবার করে যেতে হবে, যেন সময় এক চ্যাপটা বৃত্ত যার ভেতর আমরা ফিরে ফিরে আসব সেই এক বিভীষিকার কাছে, আর তবু, এ সমস্তই এক অন্ধগলি। অ্যাগনেসের স্মৃতির মতো অন্ধগলি। নির্মলা দুবের মরে যাবার মতো।

.

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *