১
খালারি স্টেশনের পাশ দিয়ে বেঁকে যাওয়া রাস্তা ছয় কিলোমিটার অতিক্রান্ত হবে যখন, গঞ্জে ঢোকার মিনিট পাঁচেক আগে রাস্তার ডান পাশ দিয়ে একটা টিলা উঠে যেতে দেখা যাবে। তার অন্যদিকের গা বেয়ে জঙ্গল ভর্তি খাদ। এই জায়গায় ঢেউ খেলানো পথ বাঁ-দিকে একটা বাঁক নিয়েছে। অঞ্চলটাকে মন দিয়ে লক্ষ্য করা দরকার। লোকে বলে, এখানে পাহাড়ি ভূতের দল বাসা বেঁধে আছে অনেকদিন হয়ে গেল। সেই যেদিন থেকে রেভারেন্ড ওয়েসলি গঞ্জে প্রথম মিশনারি স্কুল তৈরি করেছিলেন, তা সে আজ থেকে প্রায় নব্বই বছর আগের কথা, অথবা, তারও আগে হতে পারে, যেহেতু মানুষ ভুলে গেছে। রাত্রিবেলা সেসব ভূতের ফুটিফাটা আত্মার গহ্বর থেকে বেরোনো সাঁই সাঁই গাঢ় নিশ্বাসকে আশপাশের মুন্ডা ওরাওঁ গ্রামগুলোর অভুক্ত কাঠকয়লা চোরের হাঁপানি হিসেবে ভুল করার কারণ দেখেনি কেউ। একপাশে আধভাঙা বেথেল মিশন চার্চ ভূতের গল্পে সারজল জুগিয়েছে। অন্ধকারে ফিসফিসানি, চাপাগলায় অট্টহাসি, অথবা, অকস্মাৎ ফুঁপিয়ে কান্নার আওয়াজ সবাই পেত সেখানে। দিনের বেলা জায়গাটা সাফসুতরো থাকত। আদিবাসী রমণীরা খোলা জায়গায় বসে রোদ পোয়াত। আচার শুকোতে দেওয়া হত পাথরের গায়ে। কিছুদূর দিয়ে বয়ে গেছে একটা পাহাড়ি ঝোরা। তার জলে নিঃসংকোচে স্নান করার সময়ে পথচলতি টুরিস্টের হাঁ চোখকে নির্লিপ্ত অবহেলায় ঝরিয়ে দেওয়া যায়। শিশুরা ধুলো, পাথর অথবা বল নিয়ে অক্লেশে লাফালাফি করে, লুকোচুরি খেলে চার্চের ভেতর। মায়েরা অলস চোখে তাকায়। মাঝে মাঝে গলা উঁচু করে ধমক দিলেও তার ভেতর নিষেধ ছিল না। পাথুরে চ্যাটালো চত্বর, তাকে ঘিরে শাল, সেগুন, পিয়ালের পুঞ্জ আর অবিরল সূর্যোদয় নিশ্চিন্তির উষ্ণতা দেয়। অনতিদুরে গঞ্জের প্রান্তভাগ তাকে স্তিমিত করতে পারবে না।
এখানে দুপুর বেলা আসে কিশোরীর দল। তারা বিভিন্ন গ্রামে ছড়িয়ে থাকা বান্ধবীরা, যারা মিলনস্থল হিসেবে জায়গাটাকে বেছে নিয়েছে। ছোটো থেকে তারা এই স্থানকে ‘জোহার হালে’ বলে জানে। শব্দটা মুন্ডারি, যদিও এই মুহূর্তে এখানে, শুধু এই মুহূর্তে কেন, যেদিন থেকে কোল বিদ্রোহে অংশ নেওয়া মানকি মুন্ডাদের নির্মমভাবে দমন করেছিল ব্রিটিশ সরকার, সেদিন থেকে সমগ্র ছোটোনাগপুর জুড়ে আদিবাসীদের সাংস্কৃতিক আধিপত্য কমছে। তবু সংস্কৃতি মাথা নোয়ায় না। ফলত, তাকে নিরুপায় হয়ে মেনে নিয়েছে রাজতন্ত্র, তার পরের রাতু মহারাজরা, তার পরের অ্যাংলো ইন্ডিয়ানরা, তারও পরের বাঙালিহিন্দি পাঁচমিশেলি উপনিবেশ ও তারও পরের, পরের ও পরের—শব্দের মৃত্যু নেই। অন্য যে নামে ডাকো না কেন, নাছোড় স্মৃতি তবু ‘জোহার হালে’ নামেই জায়গাটাকে চিনবে। ‘জোহার হালে’ মানে, দু-জন মানুষ মুখোমুখি দেখা হলে যেভাবে একে অপরকে অভ্যর্থনা জানায়। যেমন, ইংরেজিতে ‘হ্যালো’। কিশোরীরা এখানে আসে নিজেদের রহস্যময় কাহিনিগুলোর ভাগবাটোয়ারা করতে। কোন তরুণকে তাদের ভালো লেগেছিল অথবা নিভৃত চুমুর বিনিময়ে কে দিল হৃদয়প্রস্তাব, সেই সমস্তকে শোনে পাথুরে শ্যাওলা, ঝরনা, শালবন।
অবশ্য, বিকেল থেকে অঞ্চলটা নির্জন হয়ে যায়। শীতকালে তো ছায়া ঘনাবে বেলা চারটে থেকেই—সেই স্তব্ধ রাতগুলোয় দুম করে একটা শালগাছ মাথা ঝাঁকুনি দিয়ে থপ শব্দে অনেকটা জল ঝরিয়ে দিল, চাপাকান্নার আওয়াজ ভেসে এল যেন, অথবা, কোথাও কেউ নেই পায়ের আওয়াজ এগিয়ে আসছে তোমার দিকে—এতে তোমার ভয় লাগবেই। তখন নিকটবর্তী গঞ্জের গায়ে ছড়িয়ে থাকা মিটমিটে আলোগুলো থেকে তুমি আশ্বাস খুঁজতে গিয়ে ব্যর্থ হবে, কারণ মনে হবে ঘাড়ের কাছে কেউ চাপা নিশ্বাস ফেলছে। অন্ধকারে মুখ ফিরিয়ে তাকে দেখতে পাবে না। হা-হা বাতাস, শাল, সেগুনের প্রহরা ও নির্জন টিলা তোমাকে মনে করাবে মৃত সমাধিদের কাহিনি। জবুথবু জোহার হালে তখন কুয়াশায় নিজেকে মুড়ে ফেলে। গাছেরা পাতা ঝরিয়ে রিক্ত হয়। দরিদ্র গ্রামগুলোর মাটির নীচে জলস্তর নেমে যায় অনেকটা। কাছেপিঠের বেআইনি ইটভাটাদের ধোঁয়া ও কুয়াশা একত্রে মিশে গিয়ে অঞ্চলটাকে আচ্ছন্ন করে। দূষণমাত্রা বিপজ্জনক সীমার ওপরে যায়। বনবাংলো, পরিত্যক্ত সাহেবি কটেজ এবং আশপাশের হোমস্টেগুলো গ্রিলড চিকেন আর হুইস্কির সুগন্ধে আমোদিত হয়। জলের অভাবে ধুঁকতে থাকা গ্রামের ঘোলাটে চোখের মণিতে দপদপিয়ে ওঠে বারবিকিউ। মুরগির উদ্ধত ঊরু ও তেজি ঘাড় ধিকিধিকি আগুনে জ্বলে।
তারপর ক্রমে ফেব্রুয়ারি, মার্চ আসে। বসন্তে উচ্ছল সামগানে পরিণত হয় জোহার হালে। পলাশ, শিমুলের দল পাহাড়ের গায়ে আগুন ছেটায়। বনমোরগ, তিতির ও ঢাবপাখিদের তালবাদ্যে জায়গাটা অস্থির হয়। এখানে বসন্তকাল মানে টুরিস্টের আগমন বেড়ে যাওয়া। রাঁচি থেকে আগত অস্থায়ী খাবারের ঝুপড়ি, ভাত-রুটি-চিকেন-ডিমের ঝোলের দোকান—মানুষের হাতে কিছু পয়সা আসবে। সকালগুলো তখন অবিরল সূর্যের আশ্বাসে মুখর হয়। শুকনো হাওয়ার হিমেল স্পর্শ গরিব মানুষকে দুঃখ ভোলায়। এরকম দিনে শিশুদের কলরোল বাড়ে। তারা টিলার ঢাল বেয়ে ওপরে উঠে হারিয়ে যায়। ছুটতে ছুটতে নেমে আসে দূরবর্তী জঙ্গলের শিরদাঁড়া বরাবর। চার্চের অন্ধকার থেকে ক্বচিৎ ভেসে আসে ক্যারল। কিশোরীদের আগমনও বাড়ে কারণ তাদের স্বপ্ন, কামনা ও শঙ্কাগুলো কালার প্যালেটের বিভিন্ন খোপে জমে থাকা রঙের মতো আলাদা ও স্পষ্ট রূপ নেয়। এইরকমই হয়ে আসছে বছরের পর বছর, প্রতি বসন্তে। জোহার হালে-র কোলে শুয়ে শিশুরা তারুণ্যে যায়, কিশোরীরা যায় প্রৌঢ়ত্বে। কিন্তু, কখনো তার ব্যতিক্রম ঘটে। কোনো কোনো কিশোরীর বয়েস সেসব বসন্তকালে আর বাড়ে না। সেই মেয়েদের হোঁচট খাওয়া গল্পরা পা রাখে না যৌবনের চৌকাঠে। বসন্ত তাদের জন্য নিজের আস্তিনে অন্য পরিকল্পনা লুকিয়ে রাখে।
.
