নৈশ অপেরা – ২৩

২৩

কারণ ঈশ্বরের মতানুযায়ী যে অনুতাপ, তাহা পরিত্রাণজনক এমন মনপরিবর্তন উৎপন্ন করে, যাহা অনুশোচনীয় নয় ; কিন্তু জাগতিক অনুতাপ মৃত্যু সাধন করে।

– 2 Corinthians | 7:10

.

আলফ্রেড তাঁর গল্প শেষ করার পরে আমরা অনেকক্ষণ নীরব ছিলাম। তারপর আমাদের ঘিরে ঝিঁঝির দল তীব্র হল। কাছে-দূরে হারিকেনের একটা দুটো মিটমিটে আলো দেখে বুঝলাম, হাট শেষে ঘরে ফিরছে মানুষ। আমি দেখতে পাচ্ছিলাম, ক্ষীণ আলোর রেখা। জট আলগা হচ্ছে। সিগারেট জ্বালালাম।

‘পবন কুমারের সঙ্গে তাহলে আপনার যোগাযোগ আছে!’

‘আজ থেকে কুড়ি বছর আগে একবার আমার বাড়ি এসেছিল। হঠাৎ করেই। তখন প্রায় মাঝরাত। ঘণ্টাখানেক ছিল। যদিও আমরা জানতাম যে, মুন্না মারা গেছে, কিন্তু আমি ওকে দেখে চমকাইনি। কারণ, আমি কখনো ওর মৃত্যুসংবাদ বিশ্বাস করিনি। জীবনের প্রতি যার এত ভালোবাসা, সে মরতে পারে না, মনে হয়েছিল আমার। প্রায় পুরো সময়টাই সোফায় মাথা ঝুঁকিয়ে চুপচাপ বসে থেকেছিল মুন্না। আমি ওকে টুকরো-টাকরা প্রশ্ন করছিলাম, ও উত্তর দিচ্ছিল অস্পষ্ট। সেইসূত্রে এত কিছু জেনেছি। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে মুন্না বলল, “আসি, ফ্রেডি। আর দেখা হবে না মনে হয়।” ও যখন বেরিয়ে যাচ্ছে, আমি ওর হাত ধরে ফেলেছিলাম। “তুই কি আমাকে ক্ষমা করেছিস? সেই অনেক বছর আগে, একটা সকাল বেলা—” কিন্তু, মুন্না অমলিন হেসেছিল। উত্তর দিয়েছিল, “আমাদের সবার বয়েস অনেক বেড়েছে।” তারপর ও চলে গেল। সেদিন কেন এসেছিল আমি জানি না, কিন্তু, পরে কখনো আসেনি। যোগাযোগও রাখেনি। কিন্তু, তার দরকারও পড়ে না। আমরা দু-জনেই জানি, অপরজন কী ভাবছে। আমি যেমন ওর প্রতিটা চলাচলের খবর রাখি, ও রাখে আমার। সেটা আমি বুঝি।

‘কিন্তু, টাউনের অন্য কেউ তাঁকে দেখে চিনতে পারেনি?’

‘পুরোনোরা অনেকেই হয় মারা গেছে, নাহলে টাউন ছেড়ে চলে গেছে। মুন্নারও চেহারায় পরিবর্তন এসেছে। তার থেকেও বড়ো কথা, মুন্না টাউনে আসে না। সেই একবার আমার বাড়ি এসেছিল, তারপর আপনার কাছে শুনলাম যে, বছর পাঁচেক আগে আরেকবার এসেছিল। সমর দোসাদকে টাকা দিয়ে গিয়েছিল, আপনি বললেন। কেন, আমি জানি। সমর ছিল মুন্নার মতোই গরিব। তাই একটা অপরাধের দায় তার ঘাড়ে চেপেছিল, যে অপরাধ সে করেনি। কিন্তু, তার পর থেকে মুন্না আর কখনো এসেছে বলে শুনিনি। যা কাজকর্ম চালাবার, ওর কোম্পানির লোকজন চালায়।’

‘এই গল্প আর কারা জানে, মিস্টার হেমব্রম ? ”

‘জানে হয়তো কেউ কেউ, পুরোনো দিনের মানুষজন যারা টিকে আছে। ডলোরেস তো জানেই। জেনিফার জানতে পারেন। বারবারা কতটা জানেন, নিশ্চিত নই। একজন পুরোটা জানতেন। রেভারেন্ড গরম্যান। কিন্তু, তিনি তো— আমি নিজে থেকে কাউকে বলিনি। কাকেই-বা বলব! আমার মনে হয়, মুন্নাও চায় না। চায় না কেউ ওকে চিনুক, তাই গঞ্জে আসে না। কিন্তু, আপনি বলুন, এই গল্প শুনে আপনার কতটা লাভ হল। আপনার মূল তদন্তের সঙ্গে তো সম্পর্ক কম। বিশেষ আলো ফেলতে পারল কি?’

.

হাসলাম, ‘কতটা লাভ হল তা আপনাকে বোঝাতে পারব না। কিন্তু তার বাইরেও, যে দিন ঝরে গেছে, হারিয়ে গেছে যেসব মানুষ, সেইসময়ের একটা টুকরো স্পর্শ করলাম। আপনি এই ঘটনাগুলোর ভেতরে ছিলেন, তাই আপনার হয়তো হৃদয় মোচড়ায় না। আমরা বাইরের মানুষজন, আমরা তো সাধারণ মানুষ, মিস্টার হেমব্রম। তাই এত বড়ো হাহাকারের সামনে দাঁড়িয়ে আমাদের বুক কাঁপে। আপনাকে ধন্যবাদ, শোনাবার জন্য।’

আলফ্রেড তীব্রদৃষ্টিতে আমার দিকে তাকালেন। ‘অ্যাগনেস বা ক্রিসের ব্যাপারে তাহলে আপনি মুন্নাকে সন্দেহ করছেন। নাহলে আমার গল্প শুনে আপনার জাগতিক কীসের লাভ? ‘ ‘সেটাই মনে হল আপনার?’ হতাশকণ্ঠে উত্তর দিলাম, ‘কিন্তু যদি সন্দেহ করি-ও, আপনার কী আসে-যায় এতদিন পর? পবন কুমার একজন ক্রিমিনাল। সে আরেকটা ক্রাইম কি করতে পারে না?

‘পারে। কিন্তু, আমার সাক্ষ্যের ভিত্তিতে তার অপরাধ যেন প্রমাণিত না হয়।’ “কেন?”

“কোথাও গিয়ে আমি এখনও সেই পনেরো বছরের ছেলেটা, যে জানালা দিয়ে মুন্নাকে ডাকছে, আর ও সেই সতেরো বছরে আটকে, যে দৌড়ে চলে যাচ্ছে। সেটুকুর পর আমাদের বয়েস বাড়েনি, অন্তত আমার কাছে। আমার অনুরোধ, মিস ভট্টাচার্য, মুন্নাকে সন্দেহ করার হলে আপনি তথ্যপ্রমাণ জোগাড় করুন। আমার কথায় এক পা-ও এগোবেন না।’

‘আপনার কী মনে হয়? কী হয়েছিল অ্যাগনেসের?’

‘জানি না।’ মাথা নাড়লেন আলফ্রেড। ‘প্রথমে ভেবেছি, পালিয়ে গেছে। অন্য সবাই যেমন ভেবেছিল। কিন্তু, একবারও খবর দেবে না, অথবা, তার কোনো সন্ধানই পাবে না কেউ, এমন কি বিশ্বাসযোগ্য? পালিয়ে সে কতদূর যেতে পারত? মঙ্গলগ্রহ তো নয়!

‘তাহলে, অ্যাগনেস মৃত?’

‘অথবা, অপহৃত। তাতেও অনেক প্রশ্নের উত্তর মেলে না। কিন্তু, মুন্নার যে এতে হাত ছিল না—আমি জানি, যেহেতু আমি ওকে চিনতাম। সেই সকাল বেলা জানালার এপাশে আমি ছিলাম, অন্য কেউ নয়। কিন্তু, আমি তো জোর করে বিশ্বাস করাতে পারব না, তাই আপনাকে আগে যেমন বললাম— আমার জানাটুকু আমার নিজস্ব, আপনার ওপর চাপাচ্ছি না। এটা আপনার দায়িত্ব— যদি মুন্নাকে সন্দেহ করেন তাহলে আলাদাভাবে তার বিরুদ্ধে প্রমাণ জোগাড় করুন।’

‘আপনি মুন্নাকে নিয়ে ডিফেন্সিভ হয়ে যাচ্ছেন।’

‘আমি নিজের হাত নোংরা করতে চাই না।’

‘বিশুদ্ধতার দায়?’ হাসলাম।

‘সব বুঝেও আপনি না-বোঝার ভান করছেন? আমি একবার ওর পাশে গিয়ে দাঁড়াতে পারিনি। হয়তো দাঁড়িয়ে লাভ হত না, পুলিশ সেই ওকে তুলতই। কিন্তু, যখন কুকুরের মতো তাড়িয়ে বেড়ানো হচ্ছিল ওকে, ওর পাশে কেউ ছিল না। যদি থাকত, তাহলে ও হয়তো আজকের পবন কুমার হয়ে উঠত না। তার পর এতগুলো বছর পেরিয়ে এসে আমি কীভাবে টেস্টিমনি বেয়ার করব বলতে পারেন?

চট করে উত্তর এল না। মাথা নীচু করে টি-শার্ট থেকে ধুলো ঝাড়বার অছিলায় প্রসঙ্গ বদল করলাম। ‘ডলোরেসের কী বক্তব্য এই ব্যাপারে?’

‘এখনকার পবন কুমারকে নিয়ে? কথা হয়নি তেমনভাবে।’ আমার চোখে অবিশ্বাস দেখে আলফ্রেড হাসলেন। ‘আপনাদের ধারণা ডলোরেসের সঙ্গে আমার গভীর প্রেম। আমি ঠিক জানি না, একে প্রেম বলা যায় কি না। তবে শেষ কয়েক বছরে, যখন কলকাতা থেকে চলে এল ও, আমার সঙ্গে একপ্রকার বোঝাপড়া তৈরি হয়েছিল। একই স্কুলে পড়াই। দিনের একটা বড়ো অংশ একসঙ্গে থাকি। তার থেকে বড়ো কথা, একদম ছোটো থেকে দু-জন একে অপরকে চিনতাম। অস্বীকার করব না, দূর থেকে অ্যাগনেসের প্রতি আকর্ষণ ছিল আমার, যেরকম হয় ফিল্মস্টারদের দেখে। তাই ডলোরেসের কাছে ওর গল্প শুনতে চাইতাম। ডলোরেস ভাবত মানুষ অ্যাগনেসকে ভুলে গেছে, তাই আমার মতো শ্রোতা পেয়ে ও মন খুলে কথা বলত। ওর ছোটোবেলা, ওদের মা-বাবার গল্প, অ্যাগনেসের ছেলেমানুষি, ভালোবাসা, রাগ, খেপামি— ওদের পরবর্তী জীবন। আমিও বলতাম, যেভাবে অ্যাগনেসকে দেখেছি। এইভাবে আমাদের ভেতর বন্ধুত্ব হয়ে যায়। সেটা প্রেম নয়, কিন্তু সাধারণ দুই সহকর্মীর বন্ধুত্বের থেকে বেশি কিছু। আমাদের সমস্যা নেই এতে। নিঃসঙ্গ জীবনে থাকতে গিয়ে ডলোরেসও হাঁফিয়ে উঠেছিল। তাই বহু বছর আগে হারিয়ে যাওয়া এক কিশোরী আমাদের মধ্যে সেতু হয়ে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু, পবন কুমারকে নিয়ে আমরা কেউ কখনো কথা বলিনি। আমি জানি ডলোরেস সমস্তটা জানে। তবু সন্তর্পণে দু-জনেই এড়িয়ে গেছি সেপ্রসঙ্গ। এমন এক জায়গা যেখানে দু-জনেই দোষী মনে করতাম নিজেকে।’ ‘ডলোরেস? তাঁর কী দোষ?’

‘প্রথমবার মুন্নাকে পুলিশ তোলা আপনি ভুলে গেলেন? ডলোরেসই তো জানিয়েছিল ওকে, যে, একটা ছেলে অ্যাগনেসকে বিরক্ত করছে। অত মার এবং অপমানের পরেও ডলোরেসের নাম মুন্না থানায় নেয়নি। আমাদের প্রত্যেকের নিজস্ব অপরাধ ছিল, বাইরের চোখে সেগুলো যত তুচ্ছ হোক না কেন।’

‘কখনো ভাবিনি আপনি এত কথা বলবেন।’ হাসলাম। ‘সেবারে দেখে আপনাকে গম্ভীর মনে হয়েছিল। মনে হয়েছিল, আপনি চান না এগুলো নিয়ে নাড়াঘাঁটা করি।’

‘ভাবনাটা ভুল নয়। আমি সত্যিই চাইনি। কী হবে, বেদনা বাড়ানো ছাড়া? আপনি অ্যাগনেস বা ক্রিসকে খুঁজে পাবেন না। পেলে অনেক আগেই পাওয়া যেত।’ আলফ্রেড উঠে দাঁড়ালেন। ‘আপনি কেন অ্যাগনেসকে খোঁজেন, মিস ভট্টাচার্য? ও একটা দুর্বহ স্মৃতির মতো, ভূতের মতো আমাদের ঘাড়ে চেপে আছে। ওকে আমরা চাইলেও অগ্রাহ্য করতে পারি না।’ ‘কারণ, আমি একটা গল্পের পুরোটা দেখতে চাইছিলাম। এখনও পাইনি, কিন্তু অবয়ব আবছা ফুটেছে। আচ্ছা, আপনি তো বহুদিন এই টাউনে আছেন। আর্থার নামের কাউকে চিনতেন কি?”

কিছুক্ষণ ভেবে মাথা নাড়লেন আলফ্রেড। ‘মনে পড়ছে না। পদবি জানেন ?

‘মরিসি হতে পারে। তা বাদে, অন্য কেউও যদি থাকেন—’

‘আর্থার মরিসি? ছিলেন ওই নামে একজন। তিনি তো অনেকদিন আগে মারা গেছেন। তাঁর কেয়ারটেকারকে আমি চিনি। রামপ্রসাদ চাচা। এখন ওই কটেজেই থাকেন। আর্থার মরিসি একসময়ে এই টাউনের অ্যাংলো ক্লাবের সেক্রেটারি ছিলেন।

‘তার মানে ডেভিড ব্রাউনের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ থাকার কথা ।

অন্ধকার বনভূমির শুকনো পাতা মাড়িয়ে আমরা বিদায় নিলাম। যাবার আগে আলফ্রেড বললেন, ‘আমি আমার মহাভারত বললাম। এরকম অনেকে আছে যারা তাদের মহাভারত বলবে। কোনটা আসল, আপনি কীভাবে নির্ধারণ করবেন?’ তারপর নিজের মনে মাথা নেড়ে হেঁটে গেলেন ফাঁকা রাস্তা ধরে। তাঁকে দেখে আমার মনে হল, সেই মুহূর্তে আলফ্রেডের বয়েস রেভারেন্ড গরম্যানের থেকেও বেশি।

ফিরে আসছিলাম। রাত হয়েছে, এখন কারোর বাড়ি যাওয়া উচিত নয়। কাল জেনিফার আর ডলোরেসের সঙ্গে দেখা করতে হবে। ঠিক রাস্তায় হাঁটতে গেলে ভুল রাস্তার গলিগুলো এক এক করে বন্ধ করা দরকার। আমার কাছে আছে কিছু গল্প, যাদের জুড়লে বড়ো একটা গল্পের সন্ধান আসতে পারে। কিন্তু, জোড়াটা ঠিকভাবে হওয়া চাই।

একটা টাটা সাফারি আমার পাশ দিয়ে গিয়ে থেমে গেল। হেডলাইট জ্বলছে। এত রাত্রে টুরিস্ট বেরোল? কী দেখবে? জঙ্গলের ভেতর একরাত্রে আমি রাস্তা হারিয়েছিলাম, মনে হতে গায়ের ভেতর শিউরে উঠল আবার।

কয়েক পা এগিয়ে বুঝলাম, পুলিশের গাড়ি। পেট্রলে বেরিয়েছে সম্ভবত। জঙ্গলের ধারে দাঁড়িয়ে কাঠ মাফিয়ার ধ্যান করছে নাকি? গাড়িটা পেরিয়ে এগোতে গিয়ে আমার নাম শুনে থমকে দাঁড়ালাম। কেউ ডাকছে। ফিরে দেখি, অক্ষয় মাহাতো। দরজা খুললেন। ভেতরে ঢুকে কেঁপে উঠলাম এসি-র তীব্র ঠান্ডায়। ড্রাইভারকে ইঙ্গিত করলেন অক্ষয়। এসি বন্ধ করে বেরিয়ে গেল ড্রাইভার। সামনে আরেকজন দেহরক্ষী ছিল। সে-ও নেমে গেল। পেছনের সিটে পাশাপাশি দু-জন আমরা ।

‘আমার খোঁজেই এসেছিলেন?’ ‘উত্তরে নীরবে হাসলেন অক্ষয়। ‘আপনি জানতেন, তাই না? জানতেন যে, আমি আসব এখানে। আমাকে দিয়ে অত বিস্তারে গল্পটা বলানোর উদ্দেশ্য কী ছিল? আমাকে ট্রিগার করা?’

‘আমাকে আমার কাজ করতে হত, মিস ভট্টাচার্য। তবে আপনাকে ধন্যবাদ, পুরো ছবিটা জানবার জন্য আপনার স্টেটমেন্ট গুরুত্বপূর্ণ ছিল।’

‘তাতে আপনাদের লাভ কী হল? যতদূর জানি, আপনি বলেছিলেন অবিনাশ যাদব প্রাইম সাসপেক্ট। কিন্তু, তাঁকে গ্রেপ্তার করেননি। অন্য কাউকে সন্দেহ করছেন কি?’

‘সমস্ত পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্যপ্রমাণ অবিনাশের দিকে ইঙ্গিত করে। কিন্তু, আমি নিজে যতক্ষণ না কনভিন্সড হতে পারছি, এগোই না। সে ওপরতলা থেকে যত চাপই আসুক না কেন।’ ফিকে হাসলেন অক্ষয়। ‘সেদিন রাত হয়ে গেল বলে থানা থেকে আপনি বেরিয়ে গেলেন। যদি আরেকটু থাকতেন, এটাই বলতাম আপনাকে। এই সমস্ত পারিপার্শ্বিক এভিডেন্স যথেষ্ট লাগছে না। আরও কিছু চাই।’

হালকা রাগ ধরল, ‘সেই চাওয়াটা কি আমার ওপর দিয়ে করাতে চান? দেখুন, কলকাতায় সন্দেহ হয়েছিল, কিন্তু কিছু বলিনি। এখন বলছি। অত বিস্তারে একটা গল্প আমার কাছে শুনতে চাওয়ার কোনো কারণই ছিল না। না, এমনকী অবিনাশ যাদবকে ইনক্রিমিনেট করতে হলেও গঞ্জে আসার দিন থেকে খুঁটিনাটি কী করেছি, কোথায় গিয়েছি সেগুলো জানা অপ্রয়োজনীয় ছিল। একমাত্র তখনই সেগুলো কাজে লাগে আপনাদের, যদি অবিনাশ যাদব নামক ধোঁকার টাটি সামনে ঝুলিয়ে আপনারা অন্য কিছুর সমাধান করতে চান। তাই অত খুঁটিনাটি জানা, আমাকে ট্রিগার দিয়ে এখানে নিয়ে আসা। আপনারা কি আশা করেন যে, আপনাদের কাজ আমি করব?’

অক্ষয় দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। ‘আপনি বুদ্ধিমান।’

‘সেটা আপনার পক্ষে সুসংবাদ নয়। বোকা হলে আমি আগ বাড়িয়ে লাফিয়ে আপনাদের সহায়তা করতে এগিয়ে যেতাম। কিন্তু, তিন বছর আগে আপনাদের পুলিশ কোনো কথা নাশুনে যেভাবে আমাকে গলাধাক্কা দিয়েছিল, তারপর আশা করেন কীভাবে যে, আমি আপনাদের সাহায্য করব?’

‘অবিনাশ যাদবকে আমরা সন্দেহ করেছি কথাটা কিন্তু মিথ্যে নয়। কিন্তু, ব্যক্তিগতভাবে আমার বার বার মনে হয়েছে সত্যিটা অন্য কিছু। সেটার আঁচ পেতে কলকাতায় গিয়েছিলাম, স্বীকার করছি। এটাও স্বীকার করছি যে, আমার মনে হয়েছিল আপনি এখানে আসবেন। তাই লোকাল থানাকে খোঁজ রাখতে বলেছিলাম। কিন্তু, আপনি না-এলেও আমার তো কিছু করার ছিল না। হ্যাঁ, আমি অন্য কিছুর সমাধান চেয়েছিলাম। কেন এডওয়ার্ড ব্রাউনের মৃতদেহ পায়ের কাছে চিরুনি পড়ে থাকবে যেটা তিরিশ বছর আগেকার এক অন্তর্ধান রহস্যকে মনে করায়, তার উত্তর হিসেবে অবিনাশ যাদব আনকনভিন্সিং। আপনার যেমন একটা গল্প লাগে, আমাদেরও গল্প লাগে, মিস ভট্টাচার্য। একটা কেস লিখতে গেলে সেই গল্পটাকে বিশ্বাসযোগ্য হতে হয়। দশজনের মধ্যে ন-জন ডিটেকটিভকে আপনি অবিনাশ যাদব দিয়ে দিন, তারা লুফে নেবে কারণ এর থেকে ভালো সমাধান তাদের কাছে নেই। কিন্তু, ওই কারণেই আমি নেব না, কারণ একটা সমাধান মন্দের মধ্যে ভালো হলে সেটা সমাধানই নয়।’

‘তাহলে আপনি বলুন এবার, আমার বলা গল্প আপনাকে সেই সমাধানের দিকে ঠেলে দিল কি না।’

‘দেয়নি, সে তো দেখতেই পাচ্ছেন। নাহলে আজ রাত্রে আপনার সঙ্গে দেখা করতে আসতাম না।’ অক্ষয় হাসছিলেন না। ‘আপনিও কি কিছুই পাননি?’ ‘আপনি কী চান, অফিসার? আমি সাহায্য করব আপনাদের?’

‘আমাকে। এটাই অনুরোধ। আপনি যা পাবেন, যেভাবে পাবেন, নিজের মতো করে এগোন। যতক্ষণ না আইন ভাঙছেন আমার সমস্যা নেই। শুধু যদি মনে করেন, আমাদের লুপে রাখবেন। আমি তো জোর করতে পারি না এই পর্যায়ে এসে, অনুরোধই করতে পারি মাত্ৰ ৷’

‘কেন? পুলিশ চাইলে জোর করতে পারে না? ‘

‘পারতাম, যদি আপনি আমাদের তদন্তে শুরু থেকে ক্রস করতেন। তেমন কিছু করেননি। বরং, আপনার এখানে আসার পেছনে আমার ভূমিকা ছিল। এখন আমি কী বলতে পারি? বদলে আপনিই বলতে পারেন যে, এখানে আসার উদ্দেশ্য নিছক বেড়ানো। আইনত আমার হাতে কিছু নেই। তাই শুধুই অনুরোধ, আপনি কিছু পেলে আমাদের জানান।’

কয়েক মিনিট চুপ করে থাকলাম। সত্যি বলতে কী, আমি এঁকে অপছন্দ করি না। ভালো ব্যবহার করেছেন বরাবর। আচরণ যথেষ্ট লজিকাল। বিন্দুমাত্র পুলিশি এনটাইটেলমেন্ট দেখাননি কখনো। কথার মধ্যে সবসময়েই সহানুভূতি ফুটেছে। ইনি যদি গুড কপ হন, হয়তো ব্যাড কপ কেউ অপেক্ষা করছেন, কিন্তু সেই আশঙ্কায় এঁকে শত্রু ভাবার মানে হয় না। অনেক জায়গা আসতে পারে যেখানে পুলিশের সাহায্য ছাড়া এক পা এগোনো যাবে না। উলটোদিকে, সব বলে দেবার অসুবিধে একটাই— অক্ষয় একা নন, তাঁর ডিপার্টমেন্টের অন্যেরাও আছেন। তাঁরা কীভাবে এগোবেন, আদৌ আমাকে রাখবেন না বাদ দেবেন, জানি না। পুলিশের একটা অংশ তদন্তমূলক সাংবাদিকদের তীব্র অপছন্দ করে, নিজের বিট করতে গিয়ে তার প্রমাণ বার বার পেয়েছি। সব খুলে ধরা উচিত নয়। অ্যাগনেসের ডায়েরি হোক অথবা পবন কুমারের গল্প, এগুলোর থেকে অন্য অর্থ বেরোবার সম্ভাবনা থাকে। বরং, অল্প সুতো ছেড়ে বাকিটা নিজের হাতে রাখা শ্রেয়।

‘বেশ। যদি আমার মনে হয় যে, আপনাদের সঙ্গে তথ্য ভাগ করা যাবে, তাহলে জানাব। কিন্তু, তার বদলে আমাকে কথা দিতে হবে যে, উপযুক্ত প্রমাণের আগে অবিনাশ যাদবকে আপনারা তুলবেন না। কারণ, আমি এখানে এসেছি অবিনাশ যাদবকে বাঁচাবার উদ্দেশ্যে নয়। আমি বিশ্বাস করি, আসল অপরাধী বাইরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। সেইজন্য এখানে আসা। আপনারা যদি অবিনাশকে গ্রেপ্তার করেন তাহলে সেই উদ্দেশ্য মাঠে মারা যাবে। আপনি না-এগোলেও আপনার ডিপার্টমেন্ট আছে। তাদের সামলাবার দায়িত্ব আপনার । ত

‘অফিশিয়ালি এই কথা কী করে দিই! আমরা সরকারি কর্মচারী। আমাদেরও ওপরতলায় জবাবদিহি করতে হয়।’

‘পুলিশ আনঅফিশিয়ালি অনেক কিছুই পারে।’ হাসলাম আমি। ‘আপনিও তো আনঅফিশিয়ালিই একজন সিভিলিয়ানের কাছে সাহায্য চাইতে এসেছেন।’

‘আমি হ্যাঁ বা না কিছু বলব না। শুধু বলতে পারি, ওয়াটারটাইট সাক্ষ্যপ্রমাণ না-পেলে পুলিশ সাধারণত একজন বয়স্ক মানুষকে হ্যারাস করতে চাইবে না। বাকিটা আপনার হাতে।’ অক্ষয় কমিট করবেন না আমি জানতাম। এভাবে করা তাঁদের পক্ষে যায়ও না। কিন্তু, আনঅফিশিয়ালি যেটুকু সায় দিলেন, আমার কাছে এই মুহূর্তে যথেষ্ট। ‘আপনি কি কিছু পেলেন?’

‘সবে কাল এসেছি। তবে, অ্যাগনেসের সঙ্গে ব্রাউন ফ্যামিলির কিছু যোগাযোগ ছিল, এটার আঁচ পেয়েছি বরাবরই। তার প্রকৃতি কীরকম এখনও জানি না।’ এটা বলাই যায়। অক্ষয় নিজেও এতদিনে এটা আন্দাজ করেছেন। ‘কয়েক জনের সঙ্গে কথা বলতে হবে। আপনাকে একটা পালটা অনুরোধ আছে আমার। আমার মন বলছে, আমি যে রাস্তায় হাঁটছি, সেটা ঠিক পথ হলে আমার পুলিশের সাহায্য লাগবে। তখন আপনাকে ফোন করলে সাড়া দেবেন কি?”

‘দেব। আমি বসেই আছি, আপনি কবে আমাদের কাছে আসেন। কিন্তু মিস ভট্টাচার্য, আমাকে অন্য একটা বিষয় বেশি ভাবাচ্ছে। এই টাউন, এই লোকগুলো, এদের এসব গল্প, একটা পরিবারের মানুষগুলোর একে একে অপঘাতে মৃত্যু, অসংখ্য গুজব— এগুলো চূড়ান্ত অস্বাভাবিক লাগছে না আপনার? যেন একটা ম্যাডহাউসের ভেতর বসে আছি আমরা, যেখানে চরিত্রগুলো একটার পর একটা— আপনার প্রফেসর স্প্রাউট যেরকম, তাঁকে আমি দেখেছি, তাঁর পরিপার্শ্বকেও। হগওয়ার্টসের ম্যাজিক না-থাক, উন্মাদনাটুকু ষোলো-আনা আছে। এই পরিবেশে আপনার মনে হয় না, যে কেউ অপরাধী হয়ে যেতে পারত? মানে, আমি বলতে চাইছি, একা অবিনাশ কেন? কেন বারবারা নয়? অ্যারন নয়?’

ইমপ্রেসড হব না, হব না ভাবতে গিয়ে কথা গোছাচ্ছিলাম। কয়েক মুহূর্ত সময় নিয়ে বললাম, ‘সেই পরিবেশটাকে আমি এতদিন হিসেবের বাইরে রেখেছিলাম। আমি প্রশ্ন করেছিলাম, কীভাবে, আর উত্তর আসেনি। এই প্রথম প্রশ্ন করছিকেন। এবার ক্ষীণ আশা হচ্ছে যে, দরজাটা খুললেও খুলতে পারে। যদি সত্যিই খোলে, ম্যাডহাউসকে তার পূর্ণ রূপে দেখব, এই আশা রাখি। আপনি আমাকে একটা সাহায্য করবেন? কাল একজনের নাম ঠিকানা দেব। জামশেদপুরে থাকেন। বেঁচে আছেন কি না জানি না। যদি থাকেন, তাঁর সঙ্গে কথা বলিয়ে দেবার ব্যবস্থা করবেন?’

‘এই কেসের ব্যাপারে কি—’ অক্ষয় প্রশ্নবোধক চোখে তাকিয়ে বাকিটা বললেন না। ‘কথা দিচ্ছি, যদি আমার অনুমান ঠিক হয়, আপনাকে সবার আগে জানাব। আরেকটা অনুরোধ। আর্থার মরিসি বলে এই টাউনে একজন ছিলেন, তাঁর সম্পর্কে খোঁজ নিতে হবে। ১৯৮০ থেকে ১৯৯০-এর মধ্যে এখানে ছিলেন। অ্যাংলো ক্লাবের সেক্রেটারি ছিলেন। যদি কিছু জানতে পারেন তাঁর বিষয়ে, আমাকে জানাবেন, প্লিজ? আমার ধারণা, রহস্যের অনেকটা সূত্র আর্থারের কাছে আছে। সেটলমেন্টের আর্কাইভ কি কোথাও আছে? অ্যারন বলল পঞ্চায়তের অফিসে খোঁজ নেবে। এমন কোনো জায়গা পেলে ভালো হত, যেখানে গেলে জানা যেত, আর্থারের উত্তরপুরুষ বা আত্মীয় যদি কেউ থাকেন, তাঁরা কোথায় গেছেন।

“এটা সমস্যার। মিউনিসিপ্যালিটি হলে তা-ও খোঁজ পাওয়া যেত। সেন্সাস দেখতে হবে। সেটাও অনলাইন তুলে না-দিলে ডেটাবেস সার্চ করা মুশকিল। চেষ্টা করে দেখব। আর কিছু?”

‘অ্যাগনেসের চিঠির একটা ছবি আমার কাছে আছে। তার আরও একটা লেখার সন্ধান আমি পেয়েছি।’ ডায়েরির কথা খুলে না-বললেও এটুকু বলতে হত। ‘আপনার কেসের সঙ্গে এই মুহূর্তে সম্পর্ক নেই। তবু, আপনাকে আমি ছবি দিচ্ছি লেখাটার। যদি কোনো হ্যান্ডরাইটিং এক্সপার্টকে পাওয়া যায়, এটুকু দেখতে হবে যে, দুটো লেখাই এক মানুষের কিনা।’

‘এটা সহজ কাজ। কাল সকালের মধ্যে হয়ে যাবে। সিআইডিতে হ্যান্ডরাইটিং এক্সপার্ট আমার ঘনিষ্ঠতম বন্ধু। কিন্তু, আমার নিজেরও এই লেখাটা লাগবে। এই কেসের সঙ্গে দূরতম যোগাযোগ আছে এমন কিছুই আমরা ফেলে দিতে পারি না।’

ডায়েরির একটা পাতার ছবি পাঠালাম। সেইসঙ্গে অ্যাগনেসের চিঠির ছবি। সম্পূর্ণ ডায়েরি পরে দেব। আপাতত ব্রেডক্রাম্বিং শ্ৰেষ্ঠ পন্থা।

.

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *