১৮
গঞ্জের গোধূলি পোকায় খাওয়া হলদেটে তুলোট ছবির রঙের মতো অস্পষ্ট আলোয় আজকাল ভরে থাকে। গ্রীষ্মের রাত ক্লান্ত। কিছুতেই এগোয় না। তাই গোধূলির প্রলেপ দীর্ঘ যায়। এরকম আলোয় জঙ্গলকে জলরঙে আঁকা মনে হয়, আর মানুষকে লাগে মানুষের মূর্তি। পা টানা অন্ধকার এলাকা দখল করার আগে তার নীরবতা প্রসারিত করে। মানুষজন এখন তাড়াতাড়ি ঘরে ঢুকে যায়, কারণ সময় ভালো নয়। এখন আদিম হাওয়ার ফিসফিসানি, কে যেন খুন হয়েছে না? রাতপাখির ডানা ঝাপটানো তাই প্রকট লাগে কানে। আর ছিল অনেক প্রতিধ্বনি— টুকরো হাসি, চাপা গোমরানো, আবছা শীৎকার। সন্ধে হলে হাওয়ায় হাওয়ায় সেগুলো শোনা যাবে। এই শব্দেরা সারাজীবনের জন্য টাউনে আটকা পড়ে গেছে। ইতিহাস, স্মৃতি, অথবা আখ্যান নয়, নয় এমনকী প্রলাপও এদের নাম আপাতত নিরুদ্দেশ রাখা গেল।
কিন্তু, এখন প্রতিধ্বনি নেই। হাওয়ার শিরশিরানি পাতার ফাঁক দিয়ে, সেটুকু, আর গ্রীষ্মের অজানা ফুলের গন্ধ জোহার হালে-র বনপথকে আমোদিত করেছে। কিছুদূরের ভাঙা চার্চ জঙ্গলের মুকুটের ভারে মাথা নুইয়ে ফেলেছে। ছানাকাটা জলের মতো আলো অবসিত হচ্ছে। ভারী হয়ে চেপে বসছে নির্জন বাতাস। এই সময়টায় তুমি মাঝে মাঝে ঝিমোতে থাকা বুড়ো শালিখের অস্পষ্ট বিলাপ শুনতে পারো। আর, ঝিঁঝিপোকা আড়মোড়া ভাঙছে সাম্রাজ্য বিস্তারের লক্ষ্যে। কাৰে সয়ে গেলে একসময়ে এগুলোকে তুমি শুনতে পাবে না। নিশ্চিন্ত চরাচর ঘুমের চাদরে নিজেকে মুড়িয়ে ফেলবে।
ছেলেটারও কানে কিছু যাচ্ছিল না। অনেকদিন এখানে আছে বলে পাখির কাকলি, ঝিঁঝির ডাক বা রহস্যময় প্রতিধ্বনিগুলো তার চেনা। এগুলোকে অগ্রাহ্য করে বনপথ ধরে সে হেঁটে আসছিল। এখানকার শুঁড়িরাস্তা, এই ঝরনা, ওই টিলা, অথবা, তমুক গাছের নীচ দিয়ে বেঁকে যাওয়া পথঘাট তার কণ্ঠস্থ। সে মাথা নীচু করে হাঁটছিল। ঘেমে উঠেছে। বোঝা যায় অনেকটা রাস্তা অতিক্রম করতে হয়েছে তাকে। ক্লান্তিতে তার গতি মাঝে মাঝে শ্লথ হয়ে যাচ্ছিল। কখনো বুনোঝোপে আটকাচ্ছিল নীল জিন্স। কিন্তু, রাত হবার আগে তাকে বাড়ি ফিরতে হবে।
কিন্তু, ছেলেটার গতি এবার ধীর হচ্ছে, কারণ শুধুই ক্লান্তি নয়। তাহলে সে অনিশ্চিতচোখে এদিক-ওদিক তাকাত না। একটা মহুয়াগাছের গুঁড়িতে হাত রেখে সে তাকিয়ে আছে সামনে। এগোবে কি না নিশ্চিত নয়। কিছু একটা চোখে পড়েছে তার। অথবা, হয়তো কিছু দেখার আগেই সে অনুভব করেছে। অনুভব করেছে যে, গাছের পাতা নড়ছে না। হাওয়া স্তব্ধ। পাখি অথবা ঝিঁঝির দল যেন এই পৃথিবী থেকে অদৃশ্য হয়ে গেছে। এক ভয়াবহ নীরবতা রাক্ষুসে পাথরের মতো নেমে এসেছে চরাচরে। এখনও পুরো অন্ধকার হয়নি। রাত্রির চোয়াল ধরে ঝুলছে দুর্বল হলদেটে গোধূলি। আর, বেশ কিছু দূরে সাদা গাউন পরে দাঁড়িয়ে এক নারী। তার লাল চুলে বিলীয়মান গোধূলির হলুদ আলো যেন গলে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে আভা বেরোচ্ছে চুল থেকে। নারীমূর্তি তরুণের দিকে পিছন করে দাঁড়িয়ে ছিল। তার দিকে তাকিয়ে আটকে গেল তরুণের পা। সে নিশ্বাস ফেলতে ভুলে গেছে। কিন্তু, মুখ দেখে মনে হচ্ছে না যে, ভয় পেয়েছে। বরং, কেউটের কালান্তক ফণার সামনে মন্ত্রমুগ্ধ মানুষ যেমন ভুলে যায় স্থিতি ও বিপর্যয়, তেমনভাবেই তার দেশকাল বিলুপ্ত ও সময়, অদৃশ্য। সে কাঠের মতো স্থির এবং স্থির তার পরিপার্শ্ব। একভাবে তাকিয়ে আছে দূরের নারীমূর্তির দিকে। সেই নারী মুখ ঘোরাবে কি না, সে জানে না। শুধু জানে, মুখ ঘোরালে ওই নীল চোখের ঝলক প্রায়ান্ধকারে তাকে আবিষ্ট করবে।
.
নারীমূর্তি মুখ ঘোরাল না। কয়েক মুহূর্ত মাত্র, যার মধ্যে এত কিছু ঘটেছিল। তারপর সেই মূর্তি বাম দিকে ঘেঁষে একটা ঝোপের ভেতর অদৃশ্য হল। তারপরেও নিশ্চল দাঁড়িয়ে ছিল ছেলেটা। ধীরে ধীরে সে অনুভব করল, গুমোট নৈঃশব্দ্য কাটছে। আবার হাওয়া বইছে। ঘুমোতে যাবার আগে শেষবার কিচমিচ করে উঠল আখুটে ময়না। অদূরে তেঁতুলের ফোকরে কাঠপোকা ক্রিরর শব্দে সচল হল। যা দেখেছে তা নিজের কল্পনা কিনা, এই প্রশ্ন তরুণ নিজেকে করল না। অস্বাভাবিক গুমোট অন্ধকারের মতো চেপে বসা নিঃঝিম খাঁ-খাঁ একান্তই তার স্বপ্ন ছিল এবং হয়তো-বা নারীমূর্তি আসলে এক প্রেত, এমন কোনো ভাবনাকে আমল দিল না সে। একটা বড়ো নিশ্বাস ফেলে সে আবার স্যাংচুয়ারির পথে হাঁটা দিল। নিভে গেল গোধূলির শেষ আলো, আর অন্ধকার এসে পথিক ও তার যাত্রাপথকে গ্রাস করল।
.
