নৈশ অপেরা – ২০

২০

তুমি তাহাদিগকে লইয়া যাইবে, আপন অধিকার-পর্ব্বতে রোপণ করিবে ; হে সদাপ্রভু, তথায় তুমি আপন নিবাসার্থ স্থান প্রস্তুত করিয়াছ ; হে প্রভু তথায় তোমার হস্ত ধৰ্ম্মধাম স্থাপন করিয়াছে।

– Exodus | 15:17

.

এখানে গ্রীষ্মের রাত বিচিত্র কিসিমের বাতাস বয়ে আনে। তার সঙ্গে ফিসফিসানি—যারা থাকে না, নেই হয়ে গেছে যারা, তাদের অজস্র কথার প্রতিধ্বনিতে টাউনটা ভরে থাকে। তুমি জলাভূমির দিকে মুখ করে বসলে টুকরো হাসি শুনবে, আর দীর্ঘশ্বাস। জোহার হালেতেও শোনা যায়। সেসব শুনতে শুনতে রেভারেন্ড পাগল হয়ে গেলেন কি না, কে জানে! সেসব কথার ওপর জ্যোৎস্না চলকাত, সেগুলো ছোটোখাটো মানুষদের সুখদুঃখের আখ্যান। তাদের বুক মুচড়ে মেঠোপথে গড়িয়ে যাওয়া ধ্বনিগুলোর ওপর দিয়ে ছিটকে যেত জ্যোৎস্না। আজও চাঁদের আলো, আমাদের তিনজনের মাথার ওপর দিয়ে ওরা অবিরল বয়ে চলেছে। প্রতিটা ঘাসকে যেন আলাদা করা যাবে, ওদের তলোয়ারের মতো ফলাগুলোকে। ঘাসের জঙ্গলের ভেতর দিয়ে টাউনের নাবলা ফিসফিসে ধ্বনিগুলো ছুটে চলেছে, এঁকেবেঁকে বিপজ্জনক বাঁক নিয়ে। ওরা জানে রাতের হাওয়ার শনশনের ভেতর সব কিছুর হারিয়ে যাওয়া। আমাদের।

আমরা নীরব ছিলাম। তিনজনেই চেয়ারে বসে, কান তবু যেন পেতেছিলাম মাটিতে, অনুপস্থিত ক্রিস অথবা অ্যাগনেসের গল্প শুনতে চেয়ে, যারা কখনো ফিরবে না। হাওয়া ফিসফিস করে বলে গিয়েছিল, পুরোনো দিন আর ফিরবে না, হিল্ডা ফিরবে না, এডওয়ার্ড না। আমি মদ খেতে খেতে কাঁদছিলাম, কিন্তু নীরবে। তনয়া চোখ বুজে শরীর ছেড়ে দিয়েছিল চেয়ারের ওপর, যেন তার সমস্ত যাত্রা এখানে শেষ। অ্যারন মাঠের দিকে তাকিয়ে ছিল। এভাবে কী পাব আমরা? আমি কি আর আশা করতে পারি? সে-বয়েস আমার নেই। তনয়া, ওই ব্লাডি টিকটিকিটা, যে তিন বছরে একবারও ফোন করেনি, যার কিছুতে এসে যেত না আমাদের কী হল তাই নিয়ে—

‘করেছিলাম। তুমি ধরোনি। সেটা বছর দুই আগে। কল হিস্ট্রি দেখবে?’

‘একবার করে ছেড়ে দিয়েছিলে? আমি ফোনের কলকবজা সবসময়ে বুঝি না। কেন আবার করোনি? আমি জানি কেন। তুমি আমাদের মন থেকে ঝেড়ে ফেলে দিয়েছিলে। ভেবেছিলে মরুকগে ওরা, আমার কী! তাই তো?”

‘যদি সেটাই করতাম, তাতেও তো তোমার রাগ করার কারণ ছিল না। তুমিও তো বলেছিলে, আমার জন্য সব ঘটেছে।’ হঠাৎ ওর স্বর তেতো লাগল। ভাগ্যিস অন্ধকার, তাই ওর চোখ দেখা গেল না।

‘আমি রেগে গিয়েছিলাম। এখনও রেগে আছি। তুমি বুঝছ না? আমি চাইলেই— ড্যাম ইট, আমি চাইলেই কিন্তু তোমাকে তাড়িয়ে দিতে পারি।’ একটোকে অনেকটা মদ খেয়ে ঠোঁট মুছি। ওরা কেন কেউ আমার কথাকে বিশ্বাস করে না?

কিন্তু, তনয়া ঝুঁকে আমার হাত ধরল। ‘অ্যাগনেসের ডায়েরির পাতাগুলো পড়বার পরেও?’ আমার মুখে উত্তর এল না।

‘অ্যাগনেসের ডায়েরি আমি ফোটোকপি করে নিয়ে গিয়েছিলাম। অনেকদিন ধরে বার বার পড়েছি। তোমরা পড়ে দেখো। শুরুতে মাথামুণ্ডু বুঝবে না। আমিও অনেক কিছু বুঝিনি। কিন্তু যেটুকু বুঝেছি, সেটা আমার স্ট্রাইকিং লেগেছে। ও ক্রিপটিক ভাষাতে লিখত। হেঁয়ালি করত। লোকে ভাববে যে, উন্মাদ অবস্থায় আবোল-তাবোল লিখেছে। যেমন ধরো, এই এন্ট্রিটা, ৫ নভেম্বর, ১৯৮৫।’ তনয়া কাগজ এগোল অ্যারনের দিকে। আমিও ঝুঁকলাম। ইংরেজিতে টুকরো টুকরো লেখা। কোথাও হিন্দি ঢুকেছে।

—অতএব যে যিহুদীরা তাঁহাকে বিশ্বাস করিল, তাহাদিগকে যীশু কহিলেন, তোমরা যদি আমার বাক্যে স্থির থাক, তাহা হইলে সত্যই তোমরা আমার শিষ্য ; আর তোমরা সেই সত্য জানিবে, এবং সেই সত্য তোমাদিগকে স্বাধীন করিবে।

সত্য আমাকে পরাধীন করে। আমার হাত বাঁধে। আশ্রয় থেকে ছিটকে ফেলে আমাকে । বাদামি আতঙ্ক আমাকে খেয়ে ফেলে। আমি তখন পালাই। বুনো হাঁসের মতো। সাইবেরিয়া। ‘এবার আরেকটা এন্ট্রি। এটা ১৯৮৬-র জানুয়ারি, কিন্তু তারিখ নেই ।

–আমার কষ্ট হয় ডলের জন্যে। মায়ের জন্য ও সারাজীবন ভুগবে। আমি শুনেছি, একজনের পাগলামি থেকে তার ভাই, বোন আর ছেলে, মেয়ে সবাই সাফার করে। আমার কি নিজের জন্যেও কষ্ট পাওয়া উচিত? আমি ধার্মিকদিগকে নয়, কিন্তু পাপীদিগকেই ডাকিতে আসিয়াছি, যেন তাহারা মন ফিরায়। আমার মন নেই। একদিন আমি এদের সবাইকে খুন করব। একটা ফাউন্টেন পেন সোজা কবজির ওপর দিয়ে টেনে দিলে কতটা ব্যথা লাগে, কে জানবে? রক্ত দেখে কে বুঝবে? কেননা আমরা বিশ্বাস দ্বারা চলি, বাহ্য দৃশ্য দ্বারা নয়।

.

‘প্রথম এন্ট্রির শুরুর লেখাটা বাইবেলের। তারপর অ্যাগনেস নিজের কথা লিখেছে। আশ্রয় কথাটা ও হিন্দিতে লিখেছে। একটা সত্যের কথা লিখেছে। আবার হিন্দিতে লিখেছে, এক ভুরি সি ঘবরাহট মুঝে খা যাতি হ্যায়। তারপর আবার ইংরেজি। দ্বিতীয় এন্ট্রিতে বাইবেলের কথার সঙ্গে নিজের কথা যোগ করে লিখেছে। হাতে পেন টেনে আঘাতের প্রসঙ্গ। তার আগে, মায়ের পাগলামির জন্য ডলোরেস যে ভুগবে, সেটা যেন ও দিব্যদৃষ্টিতে দেখেছিল। এই দ্বিতীয় এন্ট্রিটা পড়লে ওকে স্বাভাবিক মানুষ মনে হয়। প্রথম এন্ট্রি বরং ক্রিপটিক। এবার, আমি পড়তে পড়তে নিজেকে প্রশ্ন করছিলাম, অ্যাগনেস এরকম হেঁয়ালি করে লিখল কেন? কী সেই সত্য যা ওর হাত-পা বাঁধে? আশ্রয় থেকে ছিটকে ফেলে ওকে, মানে, ওর বাড়ি থেকে। মানে, ও যেন পালাতে বাধ্য হয়েছিল, আর সেটা আগে থেকে জানত। এমন কিছু সত্য, যার ফলে ও বাড়িতে থাকতে পারবে না। এগুলো আমি শুরুতে ভেবেছিলাম।’

‘এই ভাবনার সমস্যা হল, বাদামি আতঙ্কর ব্যাখ্যা মেলে না।’ বলল অ্যারন।

‘ঠিক। আর একটা কথা, যেটা আমাকে ভাবিয়েছিল, বারে বারে বুনো হাঁসের মতো পালাতে চাইছে কেন? বারবারাকেও এই উপমা দিয়েছিল একদিন। এই উত্তর আমি পাইনি। কিন্তু, কিছু একটা আছে। এক উপমা একাধিকবার ব্যবহার করার মানে হল, সেটার অন্তর্নিহিত কিছু অর্থ আছে, যা ব্যবহারকারীকে ট্রিগার করেছে। সেটা আমি খুঁজছি।’

‘অন্যগুলোর উত্তর পেয়েছ? সত্য অথবা আশ্রয়? আতঙ্ক?’

উত্তর না-দিয়ে তনয়া আরেকটা কাগজ এগিয়ে দিল। এবারের এন্ট্রি কিছু আগের, ১৯৮৫-র মার্চ। হিন্দিতে লেখা কয়েকটা বাক্য।

—বাদামি আকর্ষণ। লাল চুল। লাল। আমার হাতির দাঁতের সাদা চিরুনির সেট থেকে একটা হারিয়েছে। পড়ে আছে দুটো। যে কেউ কোনো স্ত্রীলোকের প্রতি মনে মনে কামভাবে দৃষ্টিপাত করলে সে তখনই মনে মনে তার সাথে ব্যাভিচার করল। লাল চুল যদি বাদামি হত—হা হা হা- -যে গ্রহণ করতে পারে সে গ্রহণ করুক।

‘সম্পূর্ণ উন্মাদ।’ বিড়বিড় করলাম আমি।

‘তাই কি? বারে বারে বাদামির উপমা আসছে। তার সঙ্গে বাইবেলের কোট। অ্যাগনেস বাইবেল পড়ত মন দিয়ে, জানি। কিন্তু, ব্যভিচার? বিশেষত যে মেয়ের নাকি অনেক প্ৰেমিক, সে এরকম পিউরিটান কোট কেন করবে? যে গ্রহণ করতে পারে—কী? এটাও বাইবেল থেকেই নেওয়া। ম্যাথিউর অংশ থেকে। নাহ্, আমার এগুলো র‍্যান্ডম লাগেনি। বরং, যেন অনেক অর্থ আর হেঁয়ালি লুকিয়ে আছে।

‘কী সেই অর্থ?’

উত্তর না-দিয়ে তনয়া আরেকটা কাগজ এগিয়ে দিল। ১৯৮৬ সালের মার্চ মাস ।

—কারণ ঈশ্বরের ইচ্ছার সঙ্গে মিল রেখে দুঃখিত হওয়া অনুতপ্ত হতে এবং পরিত্রাণ লাভ করার দিকে পরিচালিত করে আর এর জন্য অনুশোচনা করতে হয় না; কিন্তু জগতের লোকদের মতো দুঃখিত হওয়া মৃত্যুর দিকে পরিচালিত করে। অ্যামনন লুকিয়ে আছে বাদামি আশ্রয়ে। আমার পরিত্রাণ নেই। আর্থারের পরিত্রাণ নেই। বাঁচতে দেবে না ওকে। যে বেশি সংগ্রহ করেছে, তার অতিরিক্ত হয়নি আর যে অল্প সংগ্রহ করেছে, তার অভাব হয়নি। আর্থার। প্রিয় আর্থার!

‘আর্থার? আবার?’ অ্যারন চমকে উঠল।

‘মনে আছে, তোমার? রেভারেন্ড গরম্যান এই নামটা উচ্চারণ করেছিলেন। আমি গোটা টাউনে খুঁজে কাউকে পাইনি যে এই নামের কোনো লোককে চিনত। সেই নাম এখন অ্যাগনেসের ডায়েরিতে। কেন?”

‘আর্থার মরিসি? পিসি যার কথা বলেছিল?’

‘ওদের কটেজটা একবার দেখতে চাই। ওদের কোনো আত্মীয় থাকলে, তার সঙ্গেও কথা বলতে হবে।

‘আশ্চর্য!’ অ্যারন ফিসফিস করল। অন্ধকার চেপে বসছে আমাদের চারপাশে। ‘এত এত কানেকশন, কিন্তু তাদের ব্যাখ্যা নেই।’

‘কিন্তু, সংযোগ যে আছে, সেটা তো অস্বীকার করতে পারবে না! কী আছে এই নামের পেছনে?

‘এগুলোর একটারও উত্তর তুমি পাওনি। তাহলে কেন নিয়ে এলে এই ডায়েরি?’ অধৈর্য গলায় আমি প্রশ্ন করলাম।

‘তোমরা কি এখনও বোঝোনি? তোমরা কি কিছুই বোঝো না? বারবারা? অ্যারন, তুমিও? শুধু তো আর্থার নয়! বাদামি কথাটা কেন বার বার ব্যবহার হচ্ছে? বাদামির ইংরেজি কী? ব্রাউন। আশ্রয়ের ইংরেজি কী? স্যাংচুয়ারি। কতবার আমি চোখে আঙুল দিয়ে তোমাদের দেখাব? ব্রাউন পরিবার আর স্যাংচুয়ারি, এই দুটো জিনিস নিয়ে অ্যাগনেস অবসেসড ছিল। কেন?’

সময় স্থির। ঘড়ির কাঁটা গলে যাবে গরমে। তখন ২০২৫-এর ঘাড়ে উঠে বসবে ১৯৮৬। আমরা কেউ বহুক্ষণ কথা বলিনি। আমি ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়েছিলাম তনয়ার দিকে।

এভাবেই আমাদের সমস্ত কিছু, তনয়া, হ্যাঁ? এভাবেই আবার আমরা অভিশাপের মতো, নাছোড় স্মৃতির মতো, আর শোকের গ্রন্থিগুলোর খুলতে না-পারা গিঁটের মতো, আবার মিশে যাব, অ্যাগনেস ক্রিস এডওয়ার্ড আর যাবতীয়? কেউ কেউ কিছুতেই ভুলবে না— আক্ষেপ, তনয়া? অ্যাগনেস তাহলে এতগুলো বছর পেরিয়ে হা-হা অট্টহাসিতে আমাদের কার্নিশে উবু হয়ে বসে ছিল, ঝাঁ-ঝাঁ দুপুর অথবা নিথর রাত? তাহলে আমাদের নিরাময়? তার কী হবে? আমাদের ত্রাণ? আমাদের? আমাদের?

.

‘তার মানে, অ্যাগনেস—’ অ্যারন ফিসফিস করল। আমি হেসে উঠলাম বিশ্রীভাবে। আমি ওদের বলতে চাইলাম যা হোক গে, আমি নড়ব না। এই মেয়েটার ছেনালিপনা অনেকদিন দেখছি। আমি স্যাংচুয়ারি ব্রাউন কিছুকে গ্রাহ্য করি না। কিন্তু অ্যারনের মুখ ফ্যাকাশে। ওকে মড়ার মতো লাগছিল। সে জিভে ঠোঁট চেটে বলল, ‘অ্যাগনেসের ইতিহাস—তনয়া—অ্যাগনেসের ইতিহাস –

‘ব্রাউনদের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে। ব্রাউন ফিয়ার। স্যাংচুয়ারি থেকে অ্যাগনেসের ছিটকে যাওয়া। তার মানে ও ভেবেছিল এখানে জায়গা পাবে। কেন? কিন্তু, তারপর ব্রাউনদের ভয় পেয়েছিল। সম্ভবত। ওর লেখার মানে সেটাই দাঁড়ায়। আবার ১৯৮৫-র শুরুতে যা লিখেছে, তার মানে হতে পারে, ব্রাউনদের প্রতি আকর্ষণ। সেটাই-বা কেন? এডওয়ার্ডের প্রতি প্রেম? বারবারার প্রতি আকর্ষণ? নাকি, অন্য কিছু? সেটা ভয়ে কীভাবে রূপান্তরিত হল? আর্থার কে ছিল যাকে রেভারেন্ড গরম্যানও চিনতেন? অ্যারন, এগুলোর ভেতর আসল রহস্য লুকিয়ে। তুমি বুঝতে পারছ, এখন এটার থেকে তোমরা চাইলেও মুখ ফিরিয়ে রাখতে পারবে না? যদি ক্রিসের রহস্য খুঁজতে চাও, তোমাকে অ্যাগনেসের দিকে তাকাতেই হবে।’ ‘তার মানে, আবার একই কাজের রিপিট—সেই বিভীষিকা—’, ঠোঁট চেটে বললাম।

তখন রাত ঘন হয়েছে, আকাশে চিলতে মেঘ।

‘একই কাজ, আবার আর আবার এবং বার বার করে যেতে হবে। কিন্তু, নাকরে আমাদের অন্য রাস্তা নেই। তুমি জানো।’ অ্যারন বলল আমাকে।

‘আমাকে কেন? আমি কী করেছি তোদের সবার? এত কিছু ঘটার পর সবাই আগের মতো থাকতে পারে? আমার বয়েস হয়েছে। আর পারি না আমি। নিজের ভাই ছিল আমার। এডওয়ার্ড। তুই ব্লাডি পুরুষমানুষ, তোর কষ্ট হয় না।’ কিন্তু আমি জানি, আমাকে এগোতেই হবে। তনয়া কথা বলছিল না। চুপচাপ তাকিয়ে ছিল মাঠের দিকে।

‘ডায়েরিটা আসল তো?’ অ্যারন প্রশ্ন করল। তনয়া ওর দিকে তাকিয়ে থাকল চুপচাপ। উত্তর দিল না। আসল না হলে? ওরা কি ভাবছে ডলোরেস এসব লিখে অ্যাগনেসের নামে চালাচ্ছে? কী লাভ ওর?

‘তুমি চলে যাবার পর আমরা আবার কোটরে ঢুকে গেছিলাম। সবাই আমাদের দেখিয়ে বলত, এ বাড়িতে শয়তানের বাসা। আমরা কেউ বাঁচব না।’ আমার গলায় অভিযোগ ছিল। ও কেন থাকল না তখন? আর তিন বছর পরে— কোনো মানে হয়?

‘আমিও কলকাতায় একরকম নির্জনেই—এমনও হয়েছে, টানা পনেরো দিন বাড়ি থেকে বেরোইনি। বিগবাস্কেট আর সুইগির ওপর বেঁচেছি। অনলাইনে ক্লাস নিতাম। বাকি সময়ে সিনেমা দেখতাম, বই পড়তাম। ছোটোবেলার অনেক পুরোনো বই খুঁজে ধুলো ঝেড়ে পড়েছি। অনেকগুলো এনিড ব্লাইটন, অনেক অনেক অদ্ভুতুড়ে সিরিজ—সারাদিন শুয়ে-বসে আলস্যে—কী ভালো যে ছিলাম সেই সময়গুলো!’

‘কিন্তু, তুমি জানতে যে আসতে হবে তোমাকে। এখানে আবার।’ বলল অ্যারন। ‘জানতাম। ডিনায়ালে ছিলাম বলতে পারো। তুমি কেন চাকরি-বাকরি করছ না?’

‘আমি তো খারাপ কিছু নেই। মা চলে যাবার পর বাবা উদাসীন হয়ে যায়। আমাকে কিছু বলত না, কাজকর্ম নিয়ে বকাবকি নয়। নিজের ব্যাবসাতে মন দেবার চেষ্টা করত। অনেক অনেকদিন রাঁচির বাড়িতে ফিরত না। আমি তখন গঞ্জে বেশি করে সময় কাটানো শুরু করি। এই বাড়িতে, পিসির সঙ্গে। রান্না করি, বই পড়ি, ঘুরে বেড়াই এদিক-ওদিক। তারপর বাবা মারা যাবার পর আবিষ্কার করলাম, বেশ কিছু টাকা রেখে গেছে, যা দিয়ে আমার চালাতে সমস্যা হবে না। চাকরি করার দরকার হত না। দরকার ছিল একটা এনগেজমেন্ট। এই মরে যাওয়া টাউনে এত ভাবনা তোমাকে ঘিরে রাখে, তনয়া। এত বিচিত্ৰ কল্পনা সব, তোমাকে আচ্ছন্ন রাখে, এগোতে দেয় না এক পা। তোমাকে একবুক অন্ধকার স্থিরজলে ভেসে থাকার অনুভূতি দেয়। বাগান অথবা তিতিরকান্নার মাঠে সারাদিন শুয়ে থাকলে তোমার মনে হবে, মুহূর্তরা একে অন্যের সঙ্গে জট পাকিয়ে স্থির। সেই ঝিমন্ত দুপুরগুলো আমাকে ঘিরে রাখে, নিথর ও শাস্ত রাখে।’

‘তোমার বয়েস হয়েছে, অ্যারন। আসল বয়েসের তুলনায় অনেকটা বেশি।’

‘তার থেকে বড়ো কথা, আমাদের সকলের এখানে দেখা হবার কথা ছিল, তাই না? আরও একবার, হয়তো শেষবারের মতো।’

‘তাহলে, আমরা আবার শুরু করব, তাই তো?’ তনয়া আড়চোখে দেখল আমাকে আমি কী বলতে পারতাম? আমি তো জানি, আমার সামনে অন্য কোনো রাস্তা নেই। ক্রিস শুধু নয়, অ্যাগনেসের কী হল না-জেনে আমি মরতে পারব না। কিছুতেই পারব না, মুখে যা-ই বলি না কেন। যদি সত্যিই অ্যাগনেস আমাদের সঙ্গে জড়িয়ে গিয়ে থাকে, তাহলে আমার দায়, সেটার সুতোগুলো খোলা। তাই আমি মদের গ্লাস তুলে বললাম ‘চিয়ার্স’, যেরকম বাবা বলত, যখন দুম করে অনেকটা বুড়ো হয়ে গিয়েছিল। ডুমবালবের তলায় তার ছায়ারা বড়ো হয়ে বাবাকে গিলে ফেলতে চাইত। ফ্যালফ্যাল চোখে অনুপস্থিত ক্রিসকে ভেবে বাবা শূন্যপাত্র তুলে অভিবাদন জানাত।

‘কিন্তু, এগুলো বেশি ভাবা হচ্ছে না? বাদামি থেকে ব্রাউন, স্যাংচুয়ারিকে টানা— ‘ আমি প্রশ্ন করলাম।

‘আর কতগুলো সূত্র টানলে তবে তোমরা সন্তুষ্ট হবে?’ অধৈর্য শোনাল তনয়ার গলা। ‘তোমাদের বাড়িতে অ্যাগনেসের ছবি, চিঠি। ক্রিসের ঘরে চিরুনি। অ্যাগনেসের ভূতের চুল আঁচড়াবার মিথ। এডওয়ার্ডের মৃতদেহের নীচে সেই চিরুনি আবার। আর্থার। অ্যাগনেসের ডায়েরিতে ক্রিপটিক বয়ান। দুই বছর আগে একটা লোকের অ্যাগনেস সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ। রকির বাবা—,’ তনয়া থেমে গেল। বড়ো নিশ্বাস নিয়ে যোগ করল ‘তোমাদের কি একবারও মনে হচ্ছে না, বারবারা, এগুলো সব একটার সঙ্গে আরেকটার যোগ আছে? মনে হচ্ছে না যে, আসল গল্পটা বিরাট, আর এগুলো তার এক-একটা অংশ? অ্যাগনেস বলো বা ক্রিস, সেই গল্পটা এখনও চলছে, মনে হচ্ছে না তোমাদের?’

‘আমার মনে হওয়া দিয়ে কী আসে-যায়! আমার মাথায় বুদ্ধি নেই।’ বিড়বিড় করলাম। তনয়া আরেকটা কাগজ এগিয়ে দিল আমার দিকে। এবারের এন্ট্রি ১৯৮৬ সালের মার্চ ও এপ্রিল।

—আমি মেডুসা। আমার চোখের দিকে তাকিয়ে পাপীর শরীর পাথর হোক। -ডল কেন এরকম? কেন ও অবোধ ও বিশুদ্ধ হৃদয়? এভাবে বাঁচবে না। ওকে পাপ চেনাতে হবে। ও কি পাপী হবে? আমার দাম পঞ্চাশ সেকেল রুপোর থেকে বেশি হবে, নাকি, কম? একই জলের উৎস থেকে কি মিষ্টি ও তেতো, দু-রকম জল বের হতে পারে? জল যদি তেতো হয়, ডলকেও তেতো হতে হবে। সেটাই কি হয়নি?

অনেকটা সময় তিনজন নীরবে জলাভূমির দিকে তাকিয়ে ছিলাম। জলের ওপর এখানেওখানে চকচক করছে। ভাঙা চাঁদের আলো। বাতাস মাঝে মাঝে জোর বইছে। ভূতুড়ে গাছের কঙ্কাল নিজের আঁকাবাঁকা ডাল আকাশের দিকে তুলে ধরেছে। কতকাল হয়ে গেল, এখনও একভাবে দাঁড়িয়ে। এই গাছ থেকে বাবা—অ্যারন কেঁপে উঠল। দূর জঙ্গলের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আই স হার অ্যাগনেস। আমি ওকে দেখেছি।’

মাতাল শরীর এলিয়ে দিয়েছিলাম। ধড়মড় করে উঠে বসলাম। ‘আমাকে বলিসনি তো?’ ‘কাউকেই বলিনি।’

‘কবে দেখলে?” প্রশ্ন করল তনয়া।

‘মাসখানেক আগে। জোহার হালে দিয়ে ফিরছিলাম।’ অ্যারন যখন বর্ণনা দিচ্ছিল, আমার চোখ আবার জলাভূমির দিকে ঘুরে গেল। ক্রিস ওখানে থাকে, আমি বলায় কেউ বিশ্বাস করেনি।

তনয়া অন্যমনস্ক হয়ে গেল অ্যারনের কথা শুনে। ও কি ভয় পাচ্ছে? কেন যে মরতে ফিরে এল! আমার দু-একটা কথায় হুঁ-হাঁ উত্তর দেবার পর অ্যারন ওকে ঠেলা দিল। সচকিত হয়ে হাসল তনয়া। ‘সরি। অন্য কথা ভাবছিলাম।’

‘তুমি কী করতে চাও?’ জিজ্ঞাসা করল অ্যারন।

‘জেনিফার, অবিনাশ, ডলোরেস, রেভারেন্ড গরম্যান, সবার সঙ্গে আবার কথা বলতে চাই। কাল থেকেই। কিন্তু, তুমি কি এখন কনভিন্সড, বারবারা? তোমার মনে হচ্ছে তো, যে, আমাদের এবার এই কাজটা শেষ করতেই হবে? ক্রিসের জন্য না হলেও, অন্তত অ্যাগনেসের জন্য?’

উত্তর না-দিয়ে চোখ বুজলাম।

.

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *