নৈশ অপেরা – ১৯

১৯

আইসো, আমরা আপন আপন পথের সন্ধান ও পরীক্ষা করি, এবং সদাপ্রভুর কাছে ফিরিয়া আসি ;

-Lamentations | 3:40

.

সকালে উঠে লালুরামকে জড়িয়ে বাগানে বসে ছিলাম অনেকটা সময়। ও কাল সারারাত ঘুমায়নি, জানালার সামনে দাঁড়িয়ে একমনে রাতের আকাশ দেখেছে। আমি ঘুমের মধ্যে ডেকেছি। সাড়া দেয়নি। তারপর দরজা ঠেলে বেরিয়ে গিয়েছিল বাইরে। অনেকটা সময় পর ফিরল। বুড়ো হয়েছে। আমার থেকেও বেশি। পুনম বাবা-বাছা করে খাওয়ায়, কিন্তু খাবারে মতি নেই লালুরামের। আমি ডাল-ভাত মেখে দিলে মুখে তোলে তবু। লালুরামের পিঠ তিরতির কাঁপছে। হিল্ডার গাল কাঁপত এভাবে, যদি কোনো কথা বলতে চেয়ে পারত না। আমাদের বাগানময় বড়ো বড়ো ঘাস আর বুনোঝোপ ছেয়ে গেছে। নিজের ভেতর তারা কুণ্ডলী পাকায়, আমাদের ভাঙাবাড়িকে সবুজ সাপের মতো জড়ায়। তুমি ঘুমাতে পারো বাগানে। কেউ হয়তো তখন ঘাসের পায়ে কান পাতলে বাড়ির নিশ্বাস শুনতে পাবে। ঢ্যাঙা গাছ থেকে বহুকালের পুরোনো পুতুলেরা ঝোলে। তারা নিশ্চুপে দেখে যায় আমাদের। বাড়ি তাদের থেকে উত্তর দাবি করে না। বেলা বাড়লে রোদ চড়চড়ে হয়। ঝলসে দেয় পিঠ। যখন দিনের ঘণ্টাগুলো লম্বা হয়ে সামনে ছড়িয়ে যায়। সময়ের দিগন্ত ফুরোলে আরেকটা দিগন্ত উঁকি মারে, তখন রোদ ভালো লাগে। তাই ছায়া ঘেঁষে আসি। আকাশ শান্ত। বুনো পেঁপে গাছের অবয়ব দেখে আমার বাবার কথা মনে পড়ে, কারণ বাবা রেগে গেলে ওভাবে হাতপা ছড়িয়ে দাঁড়াত। কিন্তু, এখন গেটের কাছে কেউ এসেছে। আমি বসে বসে তাকে দেখতে পাই না। ঝলসানো রোদে চোখে ধাঁধা লাগে। মনে হয় বনভূমি কাঁপছে। থাকুক দাঁড়িয়ে। এরকম অনেক স্থানীয় মানুষ দাঁড়িয়ে থাকে। তারা অভিশপ্ত বাড়ি দেখতে আসে। মাঝে মাঝে টুরিস্ট পার্টিও আসে। আজকাল গালাগালি করি না। যখন আমার শরীর গুটিয়ে যাবে, শিরদাঁড়া শুকিয়ে দড়ির মতো হবে, আর টাউন তখন আরও ফাঁকা হয়ে যাবে, সেই আগামী তিরিশ বছর ধরেও লোকে এই বাড়ি দেখতে আসবে, কারণ, এ বাড়ি তখনও ভাঙা হবে না। আমি বাড়ির ভেতর যাব। ফিরে তাকাব না ওদের দিকে। তাই উঠে বারান্দার দিকে এগিয়ে গেলাম।

কেউ আমার নাম ধরে ডাকছে, তাই না? লালুরাম গা ঝাড়া দিয়ে উঠে বসেছে, ওর ব্যগ্র দৃষ্টি। এই স্বর চিনি, তবু আমি ফিরলাম না। আমি জানি, ও দাঁড়িয়ে আছে গেটের কাছে একইরকমভাবে, অপেক্ষা করছে। সেবার যেরকম অপেক্ষা করছিল। ওকে আমি বলেছিলাম ‘এসো,’ আর ও দরজা খুলে ঢুকে এসেছিল।

আরও একবার ডাক এল। অনেক দূর থেকে, তিন বছর যার বয়েস। কয়েক মুহূর্ত পর বড়ো নিশ্বাস ফেলে আমি ঘাড় ফেরালাম। গেটের কাছে তনয়া দাঁড়িয়ে। একইরকম আছে। সেই রোগা রোগা লম্বাটে গড়ন, শ্যামলা চিবুকের তীক্ষ্ণতাও অবিকল।

আমি এগিয়ে গেলাম তার দিকে। বললাম, ‘অনেকদিন পর এলে।

হাসল তনয়া, ‘ভেতরে আসতে বলবে না?’ কিন্তু, আমার হোমস্টে বন্ধ হয়ে গেছে। অনেকদিন। ও জানে না, এখানে কেউ বেঁচে নেই।

বিকেলের মরে-আসা রোদে মাঠের সামনে বসে তনয়াকে জানালাম, ও যা চাইছে, তা সম্ভব নয়। এগোতে চাই না আমি। তনয়া আমাকে মনে করাল যে, অবিনাশ নিরপরাধ। যেন সেটা আমি জানতাম না! ও কি শুধুমাত্র সেই কারণে এসেছে? অবিনাশকে ছাড়াতে? কী রাবিশ! সাংবাদিকগুলো এত গাধা হয় কেন? আরে, পুলিশ আছে কী করতে? অবিনাশ ওদের লোক। চার্জ দেবে না তেমন। ভালো উকিল ছাড়িয়ে আনবে। কিন্তু, তনয়া আবার আমাকে খোঁচাল। জিজ্ঞাসা করল, ক্রিসের রহস্যের সমাধান হোক আমি চাই কি না। ওর বাঁদরলাঠির ডগায় আমি আর নাচব না, কথাটা ওর মুখের ওপর ছুড়ে বলতে হবে। কিন্তু, মদ খেলে ভালো হত। বাবা সেই সেবার, মদ খেয়ে এডওয়ার্ডের হাতে জ্বলন্ত সিগারেট তখন আমি নিজের ভেতর দাহ্যপদার্থ খুঁজে মাথা খুঁড়ছি। ড্যাম অ্যাংলো! ‘তুমি পারোনি। তার বদলে মনীষা—’ নিজের ওপর রাগে পায়ের ঘাস দলে, পিষে দিচ্ছিলাম। ও কি জানতে পারছে না, আমি কী ভাবছি? এডওয়ার্ড চলে গেছে। আর কেউ চলে যাক, আমি চাই না। ক্রিস থাক নিজের মতো। তুমি চলে যাও বরং। তনয়া আমাকে জানাল যে, আমিই ওকে এর সমাধান করতে বলেছিলাম। পুরোনো ঘা খুঁচিয়ে আনন্দ পাওয়া ওর স্বভাব। ‘আর তুমি সেই সমাধান করতে পারোনি। তুমি কি বুঝতেই চাইছ না, আমাদের কী অবস্থা? এখন কেন আমি আবার পুরোনো পাঁক ঘাঁটব? ধুর, ব্লাডি—’ লালুরাম আমার শাড়ির কোনা চিবোচ্ছিল বলে হাতের ধাক্কায় সরিয়ে দিলাম। মরুক সব! ‘কেন জড়াচ্ছ আমাকে? শোনো, তুমি এসেছ, এখানে থাকছ, ঠিক আছে। যতদিন খুশি থাকো। কিন্তু, অন্য কোনো ব্যাপারে মাথা দিলেআমাদের এখন শোকের সময়, তুমি কি এতটাই ইনসেন্সিটিভ হয়ে গেলে নাকি, এসব – বুঝতেই চাইছ না? চুলোয় যাক তোমার তদন্ত। আমাদের জড়াবে না।’ চেয়ার ছেড়ে উঠলাম। মদ আনতে হবে। আজ রাত অবধি না-টানলে মাথা ঠান্ডা হবে না। তারপর তনয়াকে ঘাড়ধাক্কা দিয়ে তাড়াব।

কয়েক পা এগোলাম, আর তনয়া বলল, ‘আমাদের দু-জনের হিসেব চোকানো বাকি আছে, বারবারা। ’

চোখ বুজে বড়ো শ্বাস নিলাম। শান্ত করলাম নিজেকে। এ ছুঁড়ি কেন আমাকে বারে বারে টেনে ধরে! আমি তাকে কীভাবে এড়াব? কোনো হিসেবের কথা আমি জানি না। কেউ বলেনি আমাকে। তনয়া যদি বাড়াবাড়ি করে এখনই তাড়িয়ে দেব। অনেকদিন খোঁজ নেয়নি আমাদের। ও কি নিজেকে আমাদের সেভিয়ার ভাবছে নাকি?

‘তোমার-আমার নিজস্ব হিসেব। মনে আছে, সেই অনেকদিন আগে, আমি তোমাকে বলেছিলাম, একবার নিজের উত্তাপটুকু দাও, শেষবারের মতো। ক্রিসের জন্য।’ তনয়ার অভিব্যক্তিতে ওঠা-পড়া ছিল না। ওর চোখ শান্ত, তবু বহু অপেক্ষায় মুখর। এতদিন পরে ও ফিরে এল, সত্যিই? শুধুমাত্র ক্রিসের জন্য? কিন্তু, আমি তো এবারে আর গলব না ঠিক করেছি। তাই থপথপ করতে করতে ওর দিকে এগোলাম। চাইলে ওর গায়ে হাতও তুলে দিতে পারতাম। অথবা, আমি কি তখনই সমর্পণ জেনেছিলাম?

‘কী চাও তুমি? কী আছে তোমার কাছে, যা তিনবছর আগে ছিল না?’ দাঁত চেপে প্রশ্ন করলাম।

উত্তর না-দিয়ে ব্যাগ খুলল তনয়া। একটা পেটমোটা ফাইল বার করে আনল। ‘কেউ জানে না। সবাই ভাবে আমি ভুলে থেকেছিলাম। এই এটা, আমার তিন বছরের পরিশ্রমের ফসল। আমাকে কয়েকটা দিন দাও, বারবারা। বেশি না, মাত্র এক সপ্তাহ। তারপর আমি চলে যাব, আর কখনো ফিরে আসব না। কিন্তু, এবার আমার যেটুকু, আমার তিনটে বছর এই ফাইলে আমি পুরে নিয়ে এসেছি। তুমি যদি এক সপ্তাহ না-ও দাও, একবার কি ফাইলটা দেখবে না?’

‘ক্রিস ব্রাউনের অন্তর্ধান রহস্যকে আমরা সবাই প্রশ্ন করে আসছিলাম, কীভাবে সে নিখোঁজ হল এই জায়গাটা থেকে। কিন্তু অ্যারন একমাত্র, যে বারে বারে আমাকে বলত, আমরা ভুল প্রশ্ন করছি। আসল প্রশ্ন হওয়া উচিত ছিল— কেন। কেন ক্রিস নিখোঁজ হল? তখন এত গণ্ডগোল ঘটেছিল যে, সাইডট্র্যাকড হয়ে গিয়েছিলাম এই ভাবনাটা থেকে। কিন্তু, পরের বছরগুলোতে আমি অনেক ভেবেছি এটা নিয়ে। তখন মনে হয়েছে, যদি জানতে পারি কেন ক্রিস নিখোঁজ হল, তাহলে মোডাস অপারেন্ডি পরিষ্কার হবে। এই যে ফাইল, এখানে দিনের পর দিন ধরে আমি গল্পটাকে টুকরো টুকরো করে সাজিয়েছি, গল্পের সঙ্গে জড়িত পাত্রপাত্রীদের চরিত্র বিশ্লেষণ, তাদের বলা কথাগুলোকে নানা দিক থেকে কাটাছেঁড়া করা প্লেস অফ অকারেন্স মানে এই বাড়ির ভৌগোলিক দ্বিমাত্রিক ম্যাপ, তার সম্ভাব্য এগজিট রুটগুলো ধরে বিশ্লেষণ, ঘটনার সময়কে প্রতি মিনিটে ভাগ করে প্রত্যেকটা স্লটে পাত্রপাত্রীরা কে কোথায় থাকতে পারত, সেটার ওপর নির্ভর করে ক্রিসের অবস্থান কীভাবে মিনিটে মিনিটে পালটে যেতে পারত, তার বহুরকম প্রবাবল সমাধান অঙ্ক কষে দেখিয়েছি। কিন্তু, সেগুলো এখন থাক। এই ফাইলের মূল যে অংশটা তোমাদের সঙ্গে আমি শেয়ার করতে চাই, সেটা আলোচনা করেছে ক্রিসের নিরুদ্দেশের কারণ।’ তনয়া একগোছা কাগজ হাতে তুলল। টাইপ করা হরফে ইংরেজিতে লেখা প্রুফ। কিন্তু, সেপড়ার ধৈর্য আমার নেই। ওকে প্রমাণ করতে হবে যে, এবার অন্তত হাওয়ায় কথা ভাসাবে না। রাত ঘন হচ্ছে। হল ঘরে মশার কোরাসের সঙ্গে পাল্লা দিচ্ছে বাইরের পোড়োমাঠের ঝিঁঝি। ‘সংক্ষেপে বলছি। ক্রিসকে অপহরণের পেছনে একমাত্র উদ্দেশ্য হল প্রতিশোধ। সেটা কীসের, এখনও জানি না। কিন্তু, এর সঙ্গে অ্যাগনেস জড়িয়ে।’

অবাক হলাম না। অ্যাগনেসের ব্যাপারে অক্ষয় মাহাতোও আমাকে বলেছিল। ‘তুমি আগে বলেছিলে অ্যাগনেসের নাম কেউ ইচ্ছে করে জড়াচ্ছে, যাতে ডাইভারশন হয়। কিন্তু, সেসব বাদ দাও। তুমি বললে না, নতুন কী পেয়েছ যা তিন বছর আগে ছিল না।’

‘পেয়েছি, বারবারা। একদম শূন্য হাতে শুধুমাত্র কিছু অনুমান সম্বল করে আমি দ্বিতীয়বার ফিরে আসব না, তুমিও জানো। আর হ্যাঁ, প্রথমে আমি সত্যিই ভেবেছিলাম, অ্যাগনেস একটা ডাইভারশন। কিন্তু, এই ভাবনার কয়েকটা মৌল সমস্যা আছে। একটা মেয়ে যে গত ছয় বছর নিখোঁজ, তার দিকে কেউ তখনই দৃষ্টি আকর্ষণ করবে যদি তাকে সশরীরে হাজির করাতে পারে। কিন্তু, লোকে অ্যাগনেসের ভূত দেখে। তার মানে, জনমানসে জীবিত অ্যাগনেসের বদলে মৃত অ্যাগনেসের ধারণা বেশি গ্রহণযোগ্য। সেক্ষেত্রে, অ্যাগনেস যে সশরীরে হাজির হতে পারে, এই কথাটা সাধারণ মানুষ বিশ্বাস করবে না। তাই অ্যাগনেসের দিকে নজর ঘুরিয়ে দেওয়া একটা নিষ্ফল চেষ্টা। তাহলে অ্যাগনেসের ছবি আর চিঠি? সেগুলো কি ডাইভারশন? সেটা হওয়া কঠিন তার কারণ, ছবি ও চিঠি দেখে অনুমান করা যায় সেগুলো অনেকদিন হল একটা বাক্সের ভেতর পড়ে ছিল। আমি কোনোগতিকে বাক্সটা আবিষ্কার করেছিলাম। যদি না-করতাম তাহলে ওই ছবি আর চিঠি ময়লা ফেলার গাড়িতে উঠে চলে যেত। যদি কেউ অ্যাগনেসের দিকে নজর ঘোরাতে চায়, সে চাইবে ছবিটাকে মানুষের চোখের সামনে রাখতে। ‘ক্রাইম অ্যান্ড পানিশমেন্ট’-এর মোটকা এডিশনের ভেতর রাখবে না। তার কারণ, সে জানে না যে, আমার চোখে বইটা পড়বে এবং আমি সেটাকে তুলে তার ভেতর থেকে অ্যাগনেসের ছবি আবিষ্কার করব। এর থেকে এটা ভাবা অনেক বাস্তবসম্মত যে, ছবি আর চিঠি কারোর হাত দিয়ে এখানে আসেনি, বরাবর এখানেই ছিল। সেক্ষেত্রে, যদি ছবি ও চিঠির ওখানে থাকা অন্যের অভিসন্ধিতে না হয়, চিরুনির থাকাটাই-বা কেন অভিসন্ধিতে হবে? এর থেকে কি এটা অনুমান করা বেশি সহজ নয় যে, ছবি ও চিঠি যে পথে এসেছিল, চিরুনিও সেই পথেই এসেছে? মানে, অ্যাগনেসের হাত ধরে?’

কথাগুলোর অভিঘাত আমার মগজে পৌঁছোতে কয়েক সেকেন্ড বেশি সময় নিল, যেহেতু আমি বোকা বুড়ি। তারপর অসাড় লাগল নিজেকে। অতিকষ্টে উচ্চারণ করলাম, ‘তার মানে, অ্যাগনেস – ,

‘ক্রিসকে সরিয়েছিল।’ অন্ধকার হল ঘরের ভেতর থেকে এতক্ষণ পর কথা বলল অ্যারন। গোটা সময়টা চুপচাপ শুনে যাচ্ছিল। দুপুরে তনয়াকে দেখল যখন, উচ্ছ্বাস দেখায়নি। নির্বিকার মুখে তাকিয়ে ছিল। তনয়া অ্যারনকে জিজ্ঞাসা করেছিল, কেমন আছে। অ্যারন উত্তরে জানিয়েছিল, ‘বুলশিট।’ কিন্তু, বিকেল বেলা যখন তনয়া আমাকে নিয়ে এল হল ঘরে ওর ফাইল দেখাবার জন্য, পেছন পেছন অ্যারনও এল। নিজেকে প্রায় অদৃশ্য করে রেখেছিল। যখন ছোটো ছিল অ্যারন, ভূতের ভয় পেত। ভয় পেত নিজের বাবাকে। আজকাল অনেক রাত পর্যন্ত জলাভূমির সামনে বসে থাকে, কিন্তু ওর চোখের পাতা কাঁপে না। তনয়া অ্যারনের দিকে তাকিয়ে ঠোঁট কামড়াল। কয়েক মুহূর্ত সময় নিয়ে প্রশ্ন করল ওর সিদ্ধান্ত অ্যারনের কাছে বোকা লাগছে কি না। তনয়া মুখ উঁচু করলে ওকে স্কুলগার্লদের মতো বাচ্চা দেখায়। কিন্তু অ্যাগনেস, অ্যাগনেসই কেন? সে তো বহুদিন আগে হারিয়ে গিয়েছিল। বাবা যেদিন ঝুলছিল, চিলশকুনের একটা ঝাঁক গোল হয়ে আকাশের মাথায় উড়ছিল, এটুকুই আমার মনে আছে। তার আগে প্রতিদিন নিজের এক-একটা অংশকে মরে যেতে দেখায় আমরা অভ্যস্ত হয়ে উঠেছিলাম। অ্যাগনেসকে নিয়ে ভাবনার কিছু ছিল না, কারণ ও বুনো হাঁসেদের সঙ্গে সাইবেরিয়া পালাবে বলেছিল। ওর চোখের কোলে গভীর কালির দাগকে আমি অনিদ্রা বা পাগলামি ভেবে গ্রাহ্য করিনি। আর, এই ছুঁড়ি পুরোনো কঙ্কাল খুঁড়ে তার গায়ে জামাকাপড় পরাচ্ছে! অ্যারনের অবশ্য তাপ-উত্তাপ নেই, ও সোজাসুজি জিজ্ঞাসা করল তনয়া ফিরে এসেছে কেন। ভালো করেছে প্রশ্নটা করে। কেন ও আবার পুরোনো ঘায়ের চামড়া টেনে তুলবে? আমাদের কারোর অন্য জীবন নেই? তনয়াকে নার্ভাস লাগল প্রথমবারের মতো। অ্যারন কি চায় না ও ফিরে আসুক? কিন্তু, তবু তো এসেছে। কেউ আসে না।

‘আমি বলেছিলাম, আমাদের সঙ্গে আর যোগাযোগ রেখো না। আমরা কার্সড।’

‘কিন্তু, সিআইডিকে আমার কথা তুমিই জানিয়েছিলে। তোমার ধারণা, তার পরেও আমি হাত গুটিয়ে থাকতাম?

‘আমি জানি, আগেরবার তুমি যদি কিছুটা সময় পেতে আর আমার মা বোকার মতো লাফটা না-দিত, তুমি উত্তর পেয়ে যেতে। আমার আশঙ্কা এটাই যে, এবার তুমি উত্তরটা পাবে। এবং সেটা ডিভাস্টেটিং হবে।’

‘তোমাদের জন্য? তোমার মনে পড়ে, এক রাতে বেথেল মিশনের সামনে দাঁড়িয়ে তুমি বলেছিলে যে, আমি যেন এটার সমাধান খুঁজে আনি?’ কিন্তু অ্যারন জানাল, ‘বিপর্যয়টা তনয়ার জন্য হবে, আমাদের জন্য নয়। ও অনেক কিছু বোঝে, কিন্তু চুপ থাকে। তবে, আমি ওকে চিনি। আমি জানি, অ্যারন চেয়েছিল তনয়া ফিরে আসুক। আমি—নাহ্, আমি ভুলে গেছিলাম। ভুলে যাব।’ ‘আমি বুঝছি না। কী বলতে চাইছ?’ তনয়া বিভ্রান্তস্বরে প্রশ্ন করল। ‘তোমার অর্ধেক কথা আমি বুঝি না, অ্যারন। এতদিন ধরে এটার পেছনে আমি পড়ে ছিলাম, তোমার কি মনে হয় সমাধান খুঁজে না-পাওয়াটা আমার জন্য কম ডিভাস্টেটিং ছিল?’

‘কিন্তু, তুমি মনের ভেতর ভালো করেই জানতে যে, ক্রিসের অন্তর্ধান রহস্য বিষের মতো। তাই এতদিন ধরে এগুলো নিয়ে ভেবেছ, নিজের মতো করে সূত্র খুঁজে বার করেছ, তারপর চুপচাপ থেকেছ। আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করোনি, অন্য কাউকে জানাওনি নিজের সিদ্ধান্তগুলো। ফাইলবন্দি করে রেখে দিয়েছ। বাইরে ভাব করেছ যে, তোমার কিছু যায় আসে না, এগুলোকে ভুলে গেছ। কেন করেছ, আমি বুঝি। তুমি জড়াতে চাওনি, নিজের বৌদ্ধিক আনন্দে এটাকে ধাঁধা সমাধানের খেলা হিসেবে ভেবে একলা ঘরের মধ্যে বসে সমাধানের রাস্তায় হেঁটেছ, কিন্তু তুমি জানতে যে হাতে-কলমে সমাধান করতে গেলে আমাদের সবার জীবন, তোমারও, বিপর্যস্ত হবে। এই ভাবনাটাকে আমি ঠিক বলে মনে করি। তোমাকে আগেই বলেছিলাম, এটার মধ্যে জড়িয়ো না, শহর ছেড়ে চলে যাও। আমার প্রশ্ন হল, এতদিন পর তোমার মত পরিবর্তন কেন হল?’ অ্যারনের গলায় এমন কিছু ছিল যাতে তনয়া মাথা নীচু করল। মিনিটখানেক নীরবতার পর জানাল অবিনাশ যাদব ওর ফিরে আসার কারণ নয়। সবার আলাদা আলাদা কারণ থাকে। আমি এবার ঘরে ঢুকে যাব কারণ এলোমেলো ভাবনাগুলোকে সেখানে ছড়িয়ে রাখতে আমার ভালো লাগে। ঘরে ঢুকলে নরম ঝলমলে জ্যোৎস্না দেখি, হিল্ডার ভেজামুখ জানালার ধারে- ওর শরীর শিশিরে স্বচ্ছ, ঢুকে যাচ্ছে একটা গুদোমঘরের ভেতর যেখানে অন্ধকার, স্যাঁৎসেঁতে মাটি, অনেক দড়িদড়া—

‘আমি বারবারাকে মিথ্যে বলিনি। আমাদের হিসেব চোকানো বাকি আছে। অবিনাশের ব্যাপারটা আমাকে ট্রিগার করেনি। এডওয়ার্ডের হত্যাও না। অবিনাশ খুন করেননি আমি জানি, কিন্তু সেটা ফ্যাক্টর নয়। আসল ফ্যাক্টর হল, তোমার বাবার ছবি দেখে আমি বুঝেছি, দ্য পার্প ইজ স্টিল অ্যাট লার্জ। নাহলে, মৃতদেহ ওভাবে সাজিয়ে নীচে চিরুনিটাকে রাখত না। এমন একজন, যার সঙ্গে অ্যাগনেসের অন্তর্ধান রহস্য, ক্রিসের অন্তর্ধান রহস্য, আর এডওয়ার্ড ব্রাউনের হত্যারহস্যের যোগ আছে। হয়তো একই ব্যক্তি দুটো কাণ্ড ঘটিয়েছিল। এমন একজন, যে আমাদের নাকের ডগায় বসে এতগুলো বছরের ব্যবধানে একাধিক কাণ্ড ঘটিয়ে গেল, কিন্তু তার নাগাল আমরা পেলাম না। শোনো অ্যারন, আমি ধারবাকি রেখে মরতে পারব না।’ তনয়া ফিকে হাসল। ‘শুনতে নাটকীয় লাগছে হয়তো। কিন্তু অন্যদের কথা ছাড়ো, আমি নিজের কাছে প্রতিজ্ঞা করেছিলাম যে, একবার যখন ঢুকেছি, এর শেষ দেখে ছাড়ব। যদি সমাধান না-ও পাই, কেন পেলাম না সেটা অন্তত জানব। এটা শুধুমাত্র আমার জন্য নয়। বারবারাকে আমি বলেছিলাম—’, আমার দিকে কোমল চোখে তাকাল তনয়া। ডুম বাবের মৃদু আলোয় ওর মুখে অনেক ছায়ার কাটাকুটি। গ্রীষ্মের মিঠে হাওয়ায় ঘাসবনে সরসর আওয়াজ হচ্ছে। সেদিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে লালুরাম। ও যেন পিঠ দিয়ে আমাদের কথাগুলোকে শুনছে। ‘বলেছিলাম, জীবনের শেষ পর্যায়ে এসে তুমি আর কী করতে পারো? পারো, শেষটুকু দিয়ে ক্রিসের কী হল খুঁজে বার করতে। কিন্তু, আমি বা বারবারা, কেউই নিজেদের শেষ বিন্দুটুকু অবধি সেবার দিইনি। তার অনেকটা আগে থেমে গিয়েছিলাম। সেই হিসেবটা আমি এবার চোকাব। যেখানে যতটুকু বাকি, আর একবার। কারণ, ওই যে বললাম, আসল অপরাধী এখনও ঘুরে বেড়াচ্ছে। আমি জানতাম, কোনো-না-কোনো সময়ে আমাকে ফিরে আসতেই হবে। আমার সাতদিন চাই। খুব কি বেশি চাওয়া?’

অ্যারনকে হাসতে সচরাচর দেখি না। কিন্তু যখন হাসে, মনে হয় ও একা না, আমার শূন্যপুরাণ হেসে উঠল। বহুদিন পর সেরকম এক মৃদুহাসির উত্তাপ ওর চোখ পর্যন্ত ছড়িয়ে গেল। আমি সম্মোহিতের মতো তাকিয়ে ছিলাম ওর দিকে। ক্রিস বড়ো হলে হয়তো ওর মতোই দেখতে হত, হেসে উঠত এভাবে। অ্যারন বলল, ‘তুমি একদম পালটাওনি।’

‘আমাদের তো সবার সরণ শূন্য।’ তনয়া আর অ্যারন কয়েক মুহূর্ত একদৃষ্টে একে অপরের দিকে তাকিয়ে ছিল। এই আপদগুলো যদি এখন একে অপরের প্রেমে পড়ে, তার থেকে জঘন্য কিছু হবে না। তাই আমি গলা খাঁকড়ালাম, ‘অ্যাগনেসের কথা কী বলছিলে?’

‘পালটাবার কথা তো ছিল না।’ হাসল তনয়াও

চোখ সরিয়ে উত্তর দিল তনয়া, ‘অ্যাগনেস ক্রিসকে অপহরণ করেছে, এই অনুমানকে বহুদিন ধরে অনুসন্ধান করে আমার মনে হয়েছে, সম্ভব—খুবই সম্ভব।’ কিন্তু, তার জন্য অ্যাগনেসকে তো বেঁচে থাকতে হবে। তনয়ার অনুমান—লোকে অ্যাগনেসের ভূত দেখত, ভূতের বদলে যদি আসল অ্যাগনেস হয়? সেক্ষেত্রে ক্রিসকে নিয়ে যাবার সময়ে ধস্তাধস্তিতে তার চিরুনি পড়ে গেছে, এমনটাও হতে পারে। কিন্তু, ওর সমাধানে আমি সন্তুষ্ট হলাম না, কারণ এতদিন ধরে অ্যাগনেস লুকিয়ে থাকল কোথায়? আর, অ্যাগনেস যদি বেঁচে থাকে, তাহলে তো ক্রিসও বেঁচে আছে? ওকে আমি সেভাবেই— বাকিটা আমি বলব না, যেহেতু সবাই আমাকে পাগল ভাবে। ক্রিস বেঁচে থাকলে ওর বয়েস বাড়ার কথা ছিল। ‘প্রতিশোধ একমাত্র মোটিভ। কীসের প্রতিশোধ আমি জানি না। হয়তো অ্যাগনেস উন্মাদনার বশে ভেবে নিয়েছিল যে, তার প্রতি অবিচার করেছ তোমরা— অথবা, হয়তো সত্যিই কিছু ঘটেছিল , কিন্তু, কিছুই তো ঘটেনি! ও সবার বাড়ি যেত, আমাদের বাড়িও আসত। একদিন হারিয়ে গেল। এর বেশি ওকে নিয়ে ভাবার কী আছে? কিন্তু, ওর ছবির ওই ময়ূরের নকশা করা সোয়েটার কোথায় যেন আমি দেখেছি। মদ খেলে মনে পড়বে? তনয়া আমাকে আবার মনে করাল, এডওয়ার্ডের মৃতদেহের নীচে অ্যাগনেসের চিরুনি। চিরুনি তো চিরুনি, আমি কী করব? এডওয়ার্ড কি তাহলে অ্যাগনেসকে খুন করেছিল? কিন্তু, তনয়া তো এদিকে বলছে অ্যাগনেস ক্রিসকে কিডন্যাপ করেছে। তাহলে তো অ্যাগনেসের বেঁচে থাকার কথা। এডওয়ার্ড যদি কিছু না-করে থাকে তাহলে চিরুনি— আমি উলটে তনয়াকে মনে করালাম, ও আমাকে জেনিফারের কথা জানিয়েছিল। শেষদিন বলেছিল যে, জেনিফারকে সন্দেহের বাইরে রাখা যায় না। সেটাকে তবু বোঝা যায়, কিন্তু পাগলি অ্যাগনেসকে টেনে আনলে সেটাকে আমি কিছুতে বুঝি না। ‘অ্যাগনেস এতদিন কোথায় লুকিয়ে থাকল, কেউ ওর সন্ধান কেন পেল না, এগুলো নিয়ে আমিও অনেক ভেবেছি। কংক্রিট উত্তর আমার কাছে নেই। কিন্তু, আমার নিজের যেটা মনে হয়, অ্যাগনেস যদি দূরে কোথাও পালিয়ে যায়, হয়তো রাঁচি বা হাজারিবাগ, তাহলে তার সন্ধান এখানকার লোকে পাবে না। হয়তো মাঝে মাঝে ফিরে আসত। তবে কেন পালিয়েছিল, জানি না।’ কিন্তু, ও যে জেনিফারের কথা বলেছিল?

‘জেনিফার হতেই পারে আসল ক্রিমিনাল।’ মুখ খুলল অ্যারন। ‘কিন্তু, তাতে বাবার হত্যারহস্যের সমাধান হয় না। হুইলচেয়ার ছেড়ে উঠতে পারে না, ওই বয়েস, সে ওভাবে কাউকে খুন করতে পারে না। লোক দিয়ে করালে অন্য কথা। তবে, তার থেকে একটা বড়ো “কিন্তু” আছে। ক্রিস যেদিন নিখোঁজ হয়েছিল, জেনিফার শহরে ছিল না। তার আগের দিন রাঁচি হাসপাতালে চেকআপের জন্য গিয়েছিল। আমি পরে খোঁজ নিয়ে জেনেছি। আবারও, লোক দিয়ে করালে অন্য কথা। কিন্তু, সেটা জেনিফারের টাইপ বলে তোমাদের মনে হয় যে লোক অন্যের হাঁড়ির খবর নিয়ে বেড়ায়, সে নিজের কাজের সাক্ষী রাখতে চাইবে না। সাধারণ মনস্তত্ত্ব।’

‘আমি অন্য একটা কারণে জেনিফারকে বাদ দিয়েছিলাম। জেনিফার ক্রিসকে অপহরণ করা মানে শুধু এই একটাই অপরাধ করেছেন। সেক্ষেত্রে অ্যাগনেসের সঙ্গে ক্রিসকে কানেক্ট করা যাচ্ছে না, এডওয়ার্ডের হত্যার সঙ্গে তো নয়ই। কারণ, অ্যাগনেসের নিখোঁজ হবার সঙ্গে জেনিফারের কোনো যোগসূত্র খুঁজে পাওয়া যায়নি। তাহলে আমাদের কাছে তিনটে আলাদা রহস্য, তিনটে আলাদা সমাধান। সেটা অসম্ভব বলছি না। কিন্তু, তাহলে অ্যাগনেসের ছবি, চিঠি, চিরুনি, এই সমস্ত কিছুকে ভুলে যেতে হয়। এডওয়ার্ডের মৃতদেহের নীচে পড়ে থাকা চিরুনিকেও। এই এত কিছুর দিকে চোখ বুজে রাখা আমার মনে হয় না আর সম্ভব। কিন্তু, জেনিফারের সঙ্গে কথা বলতে হবে আমাদের। জিজ্ঞাসা তো করতেই হবে, এবং সেটা কড়াভাবে। কেন তিনি ক্রিসকে পরীক্ষা করছিলেন। সেটা আমার ওপর ছেড়ে দাও। তোমরা পারবে না।’

“তাহলে প্রতিশোধ, তনয়া?’ চিন্তিত ভঙ্গিতে অ্যারন তাকাল।

‘দেখো, একটা বাচ্চাকে হাপিশ করা হয় যে কারণগুলোর মধ্যে, তার ভেতর থেকে টাকাপয়সার মোটিভকে এই কেসে বাদ রাখা যায়। রিচুয়াল কিলিং, মানে এক্ষেত্রে জেনিফারের দিকটা, সে নিয়ে কথা হল। আরেকটা মোটিভ থাকে সাইকো কিলার। কিন্তু সেক্ষেত্রে একটা খুন নয়, সিরিজ অফ মার্ডারস হবে, কারণ সাইকো কিলিং একটায় থামে না। আমি সেইসময়কার বিহারের পুলিশ ফাইল, বিভিন্ন জেলার, খুঁটিয়ে দেখেছি। তেমন সিরিজ, বাচ্চা অপহরণ বা খুন, সেইসময়টায় ঘটেনি। শিশু পাচার চক্র একটা বড়ো ফ্যাক্টর অবশ্যই। পূর্ব ভারতে এই সমস্যা বহুদিনের। আমি অ্যান্টি ট্রাফিক সেলের এক অবসরপ্রাপ্ত অফিসারের সাহায্য নিয়ে ১৯৯০ থেকে ১৯৯৪, এই চার বছরে বিহারের পরিস্থিতির একটা স্টাডি করিয়েছিলাম। ট্র্যাফিকের যে বড়ো গ্যাংগুলো অপারেট করত তখন, তারা মূলত পাটনা, রাঁচি, হাজিপুর এসব জায়গা থেকে করত। বড়ো শহর এবং ছোটো গ্রাম। গঞ্জ ও তার আশেপাশে এই চার বছরে কোনো ট্র্যাফিক ঘটেনি, ১৯৯৩ সালে খালারিতে একটা বাচ্চাচুরি বাদ দিলে। গ্যাংগুলো মূলত অপারেট করত, এখনও করে, নিম্নবিত্ত অঞ্চলে। গঞ্জ সেরকম জায়গা নব্বইয়ের দশকে ছিল না বলে এটা কখনো তাদের রাডারে আসেনি। তা সত্ত্বেও কি বিচ্ছিন্ন একটা বাচ্চাচুরি হতে পারত না? পারত, কিন্তু তার সম্ভাবনা নগণ্য। তার থেকেও বড়ো কথা, কোনো গ্যাং-এর মোডাস অপারেন্ডির সঙ্গে ক্রিসের ঘটনা খাপ খায় না। এই ধরনের ট্র্যাফিকে বাচ্চা মূলত চুরি যায় বাড়ির বাইরে থেকে। বাড়ির ভেতর থেকে গুটিকয় যে ক-টা কেস ঘটেছে, সেগুলো হয়েছে বাড়ির ভৃত্যশ্রেণির মানুষ অথবা অন্যান্য কর্মচারী যেমন দারোয়ান বা রাঁধুনির সাহায্যে। ক্রিসের ক্ষেত্রে সেই মানুষেরা সবাই পুলিশের কাছে ক্লিনচিট পেয়েছিল। যে দু-জন পায়নি, সমর দুসাদ এবং নির্মলা দুবে, তাদের পরিণতি আমরা জানি। কিন্তু, এরা না-থাকলে, ক্রিসকে চুরি করবে কে? গ্যাং-এর কেউ অচেনা বাড়ির ভেতর ঢুকে বাচ্চা তুলে আনবে না। সেটা তাদের কাজের ধরন নয়, কারণ রিস্ক ভয়ানক বেশি। তাই শিশু পাচারকেও মোটিভের বাইরে রাখলাম। সাময়িক ক্রোধের বশে শিশু অপহরণ ও হত্যা ঘটতেই পারে, কিন্তু সেটা প্রি-প্ল্যানড নয় বলে এত বছর ধরে চাপা দিয়ে রাখা যাবে না। তাহলে পড়ে থাকে একমাত্র একটাই মোটিভ। প্রতিশোধ। সেটা কার প্রতি, আর কেন, আগেই বলেছি, আমি জানি না। জানতে হলে আমাকে গঞ্জে আসতে হত।’ বড়ো নিশ্বাস ছাড়ল তনয়া। ‘আর, আমি এসেছি।’ অ্যারনের দিকে ভুরু কুঁচকে তাকাল। ‘তোমার মনেও এই পয়েন্ট এসেছিল কি? অন্তত অ্যাগনেসের দিকটা? তুমি কিন্তু বারবারার মতো অবাক হওনি।’

‘হইনি। অ্যাগনেস যে ক্রিসকে নিয়ে যেতে পারে, মনে হয়েছিল আমারও। কিন্তু, তার মতো মানসিক ভারসাম্যহীনের পক্ষে এত বছর একটা বাচ্চাকে লুকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। এক যদি না সে,’ আমার দিকে আড়চোখে তাকিয়ে অ্যারন মাথা নামাল। কিন্তু, আমি জানি, ও যা ভাবে ভাবুক, সত্যি নয়। ক্রিস বেঁচে আছে। তবে, আমি কী ভাবলাম তা দিয়ে তনয়ার কিছু এসে যায়নি কখনো। বরাবরের নিষ্ঠুর ও, হিল্ডা যেমন ছিল। তনয়া জানে না, ও অ্যাগনেসের থেকেও মাথামোটা। নাহলে ক্রিস এই জলাভূমিতে ঘুরে বেড়ায়, ও দেখেওছে, তবু বিশ্বাস করবে না। কিন্তু, অ্যারন আমার মনের কথা পড়তে পারে। তনয়ার দিকে চ্যালেঞ্জের ভঙ্গিতে ফিরল। ‘সেই বিকেলের কথা মনে নেই তোমার? জলাভূমির ধারে, ক্রিস দাঁড়িয়ে, মা ঝাঁপ দিল। তোমার সমস্ত ব্যাখ্যার মধ্যে ওটাকে কীভাবে মেলাবে?’

‘আমি জানি না।’ ফিসফিস করে উত্তর দিল তনয়া। অনেকটা নিশ্বাস চেপে রাখা বুক যেমন, ওকে উদ্‌বেলিত মনে হল। অন্ধকার আরেকটু জেঁকে বসল ঘরে। তনয়ার চোখ অস্বচ্ছ। ঘন কুয়াশা নেমে আসবে কিছু বাদে। আমরা কেউ কাউকে দেখতে পাব না। ‘আমার কাছে অনেক কিছুর ব্যাখ্যা নেই। কিন্তু, আমি কি তা বলে থেমে যাব? আমি তা পারি না। পারি না আমি।’

‘কেন ব্যাখ্যা পাও না তুমি? চেষ্টা করেছিলে?’ চাপাগলায় অ্যারন বলল। ‘তোমার সমস্ত খোঁজ একঝটকায় মিথ্যে বানাতে পারে ওই একটা দৃশ্য। আমি বলেছিলাম তোমাকে। দৃশ্য মানে তার অর্থ আছে। আর, অর্থ মানে—’

‘তার ইতিহাস আছে।’

‘সেই ইতিহাস কী? কেন ক্রিস এখনও দাঁড়িয়ে থাকবে ওখানে? কী কারণ?’ ‘কোনো অর্থ নেই। ক্রিসের ওখানে দাঁড়িয়ে থাকা অ্যাবসার্ড। যদি সত্যিই সেই বাচ্চাটা ক্রিস হয়।’

‘সেই অ্যাবসার্ডিটি কেন? কী তার ইতিহাস?”

অনেকটা সময় আমরা কেউ কিছু বললাম না। প্রত্যেকে নিজের ভাবনায় মগ্ন ছিলাম। তারপর অ্যারন কথা বলল, ‘তোমার কথা শুনি বরং। এই তিন বছরে কী কী করলে।’

.

‘চাকরি ছেড়েছি। কলকাতায় থাকি। এখানে-ওখানে পড়াই।’ “কেন?”

‘এমনিই। তোমার কী খবর? আরও রোগা হয়েছ তো। চুলও পেকেছে কয়েকটা। কী করছ আজকাল?’

‘কিচ্ছু না। এখানে পড়ে আছি। বাবার রেখে যাওয়া টাকা ধ্বংস করছি বসে বসে।’ অ্যারন আজ সারাদিন মদ খায়নি। কথাটা আমার মনে ছিল না। এখন মনে পড়ল, কোমর থেকে হিপফ্লাস্ক বার করল যখন। দুই ঢোক খেয়ে বাড়িয়ে দিল তনয়ার দিকে, ‘আজ অন্তত খাও। তোমার ফিরে আসা সেলিব্রেট করা উচিত।’

এক ঢোক গিলে নাক কোঁচকাল তনয়া। অ্যারন জল মেশায় না। ‘আমার ফিরে আসা? যেমন ফিরে আসে ব্যর্থ মানুষ। অপমানে।’

অ্যারন আমার দিকে ফ্লাস্ক বাড়ালে কড়া চোখে চাইলাম। সেদিনকার বাচ্চা, নাক টিপলে দুধ বেরোয়। বাপ-মা মরা অনাথ বলে সাপের পাঁচ পা দেখবে, তা হয় না। হাজার হোক, আমি ওর পিসি। কিন্তু, কী যায়-আসে! ‘মরুকগে যাক’ ভেবে ওর হাত থেকে ফ্লাস্ক নিয়ে গ্লাসে ঢাললাম। নির্জলা মদ খাওয়া সম্ভব নয় আমার পক্ষে।

‘একটা কথা আমাকে জানতে হবে। তোমরা কি আমাকে সময় দেবে? নাকি, থামিয়ে দেবে এখানেই?’ তনয়া আমাকে প্রশ্নটা করল। অ্যারনও তাকাল আমার দিকে।

‘কেন দেব? তুমি নতুন কিছুই বার করতে পারোনি। সবথেকে বড়ো কথা, এখনও জানাওনি—এমন কী আছে তোমার কাছে, যা আগেরবার ছিল না।’

ফাইল থেকে একগোছা হলদে কাগজ বার করল তনয়া। আমার দিকে এগিয়ে দিল। ‘কী এটা?’

‘অ্যাগনেসের ডায়েরি।’

.

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *