নৈশ অপেরা – ২

আমি মরিয়াছিলাম, আর দেখ, আমি যুগপর্যায়ের যুগে যুগে জীবন্ত; আর মৃত্যুর ও পাতালের চাবি আমার হস্তে আছে।

Book of Revelation 1 : 18

.

‘জীবনে বহুবার এমন হয়, অফিসার। সব রহস্যের উত্তর মেলে না। আমি সেগুলোকে নিয়ে বাঁচতে শিখেছি। আপনাদের পেশায় আরও ভালো বুঝবেন। যাকে বলা হয় রেবেকা কেস। অমীমাংসিত রহস্য।’ সোফার আরামে আমার চোখ বুজে আসছিল। বহুদিনের সঞ্চিত ঘুম শোধ তুলছে। আঙুলের জ্বলন্ত সিগারেটে টান না-মেরে অ্যাশট্রেতে ঘষে দিলাম। ‘কেন আপনারা ক্লোজার চান বলুন তো? পেশাগত বাধ্যবাধকতা?’

ইনচার্জ-এর ঘরটা সাজানো ও পরিষ্কার। থানা বলতে যে অগোছালো, হট্টগোলের পরিবেশ চোখে ভাসে, এই কক্ষের সঙ্গে তার সাদৃশ্য নেই। এসি বন্ধ রাখা হয়েছে আমারই কথা ভেবে। নাহলে সিগারেট খেতে পারব না। যদিও অনুমতি নেই, সম্ভবত অক্ষয় মাহাতোর অনুরোধে একসময়কার নামি সাংবাদিককে এটুকু ছাড় দিতে রাজি হয়েছিল পুলিশ। বলেছিলাম, সিগারেট খেতে না-পারলে টানা অতক্ষণ কথা বলে যাওয়া সম্ভব নয়।

‘বারবারা ব্রাউন আর অবিনাশ যাদব, এই দু-জনের সঙ্গে আপনার বন্ধুত্ব হয়েছিল কীভাবে?’ বললেন অক্ষয়।

‘বারবারা! আমি ওকে প্রফেসর স্প্রাউট বলে ডাকতাম।’

‘স্প্রাউট?’

‘বাদ দিন। আছে একটা বইয়ের চরিত্র। বারবারাকে ওরকম

দেখতে।’

অক্ষয় হাসলেন, ‘আপনার বেশ কল্পনাশক্তি তো! লেখালেখি করতে গেলে লাগে হয়তো।’

‘লেখালেখি প্রায় কিছুই করিনি গত দুই বছর। ক্লাস নিই কলেজ ইউনিভার্সিটিগুলোতে, এখানে-ওখানে ওয়ার্কশপ করি, আর ন্যূনতম ফ্রিলান্সিং। গতকালও আপনারা যখন ফোন করলেন, অনলাইন ক্লাস নিচ্ছিলাম একটা। তাই ধরিনি তখন।

আমার উলটোদিকে অক্ষয় মাহাতো। তাঁর পাশে গল্প শোনার কৌতূহলে বসে ছিলেন থানার ইনচার্জ সোমেন কর্মকার, যাঁকে দেখে মনে হচ্ছিল আজ বিকেলের সমস্ত কাজ আলমারিতে তালাবন্দি করে বিলম্বিত লয়ের মৌতাতে বসেছেন। বেঁটেখাটো অক্ষয়ের ক্লিন শেভেন পঞ্চাশোর্ধ্ব মুখে কৌতূহল নয়, প্রশ্রয়ের ঝিকিমিকি। আপাতত আকাশে মেঘ। কলকাতার বুকে স্যাঁৎসেঁতে সন্ধে গল্পের অবকাশ জোগাচ্ছে।

‘বারবারা সম্বন্ধে কী বলছিলেন—’

‘২০২২ সাল। অক্টোবর মাসের শেষে ছুটি নিয়ে গঞ্জ বেড়াতে গিয়েছিলাম। আসলে তার আগে একটা লম্বা স্টোরি করেছিলাম ঝাড়খণ্ডের কাঠ মাফিয়াদের ওপর। সেই কারণে বেশ কিছুদিন রাঁচি পালামু বেল্টে কাটাতে হয়েছিল। স্টোরি ফাইল করতে আমি দিল্লি ফিরিনি, রাঁচি থেকে ই-মেল করেছিলাম। প্রচুর পরিশ্রমও হয়েছিল স্টোরিটা করবার জন্য। ঠিক ছিল, এটার পর দিন দশেক ছুটি নেব। অফিসকে আগে থেকেই জানানো ছিল। কলকাতায় ফেরার কথা, কিন্তু মনে হল স্বাদ বদলানো যাক। তাই গঞ্জে চলে আসি। প্রথমে ভেবেছিলাম পাঁচদিন এখানে কাটিয়ে বাকি ছুটিটা কলকাতায় থাকব। তারপর এখানেই থেকে গেলাম, দশদিন কাটিয়ে আরও পাঁচদিন। আমার এডিটর মহেশ প্রচুর চেঁচামেচি করেছিল, এত ছুটি দেওয়া যাবে না বলে। কিন্তু তখন আমি জড়িয়ে গেছি।’ হাসলাম। মহেশ এখন পুনে-তে থাকে। মাঝে মাঝে রাতবিরেতে ভিডিয়ো কল করে। আবোল-তাবোল গল্প করি দু-জন। সেসব দিনগুলোতে আমার ওয়াইনের মাত্রা চড়ে যায়। মহেশ নিজের বইয়ের দোকান নিয়ে দিব্যি আছে। মিডিয়াতে আর ফিরবে কিনা জানি না।

‘উঠেছিলেন স্যাংচুয়ারিতে?’

‘মেকমাই ট্রিপ থেকে সন্ধান পেয়েছিলাম। বারবারার হোমস্টে। ছবি দেখে ভালো লেগে গিয়েছিল। একটা ওল্ড স্কুল চার্ম ছিল বাড়িটার ভেতর। বারবারা কীরকম ছিল জানেন ? এখানে-ওখানে ভূত দেখত। ওর বিশ্বাস ছিল কেউ ছেড়ে যায় না। সবাই টাউনে থেকে গেছে। মৃত সহপাঠী। ছোটোবেলার মালি। কয়েক মুহূর্ত সময় নিয়ে বললাম, ‘আর অবিনাশ যাদব?’ ‘ক্রিস।’

‘আপনারা গল্পটা শুনবেন বলেছিলেন।’

‘অবশ্যই। কিন্তু, আগে এই দু-জন সম্পর্কে ধারণা করতে চাই।’

‘অবিনাশকে লোকে মাতাল হিসেবে চিনত। সকাল থেকে খাচ্ছে। এদিকে ওই শরীর, আর বয়েসটাও তো—নিজেই বলত, যা কিছু অ্যাচিভমেন্ট ওর, সব বোতলের জল হয়ে ড্রেন দিয়ে বয়ে গেছে। অবিনাশ কি আমার বন্ধু ছিল? ঠিক বলতে পারব না। মনে হত, যেন আমাকে চ্যালেঞ্জ করছে—নিজেকে এত বুদ্ধিমান ভাবো, দেখো এই ধাঁধাটার সমাধান পারো কি না। ও-ই তো জোর করে আমাকে কেসটা শুনিয়েছিল।’

‘রেভারেন্ড পরিতোষ গরম্যানও কি— মানে, রিপোর্টে তাঁর উল্লেখ আছে।

‘দেখুন, বড়ো গল্প। অলৌকিক বলব কি না জানি না, কিন্তু কোনো ব্যাখ্যা আমার কাছে আজও নেই। সমাধানও আসেনি। আগেই বলেছি, আমি ব্যর্থ হয়েছিলাম।’ অক্ষয়কে বললাম আমি ৷

‘তবু বলুন। সমাধান পাওয়া যায়নি আমিও জানি।

‘আপনি তো পরিচিত নাম। দার্জিলিঙের কেসটা তো—’ সোমেন হাসলেন। ‘সেসব আমি ভুলে গেছি। প্লিজ!’ বারে বারে মনে করালে বিরক্ত লাগে। ‘আপনারা সব ছেড়ে কেন অবিনাশ আর বারবারাকে নিয়ে উৎসাহী হলেন?

‘সেই প্রসঙ্গে পরে আসছি। হাতে সময় আছে তো।’ অক্ষয় মাহাতো আবার হাসলেন। কোঁকড়া চুল, পুরু ঠোঁটের ভদ্রলোককে ইউনিভার্সিটির সৌম্য প্রোফেসর হিসেবে বেশি মানাত। টিপটিপে বৃষ্টি শুরু হয়েছে, কাচের জানালা দিয়ে দেখলাম।

‘কিন্তু মিস ভটচাজ,’ সোমেন কর্মকার বললেন, ‘আপনি তো দীর্ঘ সময় তদন্তমূলক সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। একটা রহস্যকে আধাখ্যাচড়া অবস্থায় ছেড়ে আসার পরেও এতদিনে আপনার মনে হল না, আরেকটু খোঁজখবর করে দেখি?’

‘যে রহস্যের সমাধান নেই, তার পেছনে ছোটার অর্থ হয় না। আমি অলৌকিক বলেছিলাম, সেটা অন্য ব্যাখ্যা না-পেয়ে। ওই যে, রেবেকা কেস! ক্লোজার পেতেই হবে সব কিছুর, এই পণ করে থাকলে আপনার হৃদয়ভঙ্গ হতে বাধ্য। আপনাকে জানতে হবে, কোথায় দৌড় থামাবেন। তাতে গন্তব্য আসুক অথবা না-আসুক।’

‘সেই সমাধান না-হওয়া রহস্যের গল্পটা শুনব বলেই এতদূর আসা। শুরু থেকে এবং কিচ্ছু বাদ না-দিয়ে।’ বললেন অক্ষয়। আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলে চোখ বুজলাম।

.

গঞ্জে প্রবেশ করার পর গাড়ি ছেড়ে দিয়েছিলাম, কারণ আমার কাছে একটা বড়ো লাগেজ আর একটা ল্যাপটপ ব্যাগ বাদে কিছু ছিল না। ঠিক করেছিলাম বাকি রাস্তা হেঁটে অথবা টোটোতে যাব। একটা ধূসর চায়ের দোকানে বসে আমি কফি খেলাম। তখন ধুলোটে দুপুর। দূরে জঙ্গলের ওপর পাতলা ধোঁয়াটে আস্তরণ পড়েছে। জনহীন রাস্তায় মাটি চাটছে একটা কুকুর। কাছে দূরে নিঝঝুম দোকানপাটের ডালা ফেলা। পূর্বদিকের বনের মাথা দিয়ে পাহাড়ের মাথা দেখা যায়। বেশি দুধ দিয়ে বানানো বাজে কফি খেয়ে আমি সিদ্ধান্ত নিলাম হেঁটে যাব, কারণ স্যাংচুয়ারি হোমস্টে কাছেই দেখাচ্ছে। দোকানদার মরা চোখ মেলে দেখছিল আমাকে। সে জিজ্ঞাসা করল আমি টুরিস্ট কি না। তাকে জানালাম, ডেভিড ব্রাউনের হোমস্টে যাব। স্যাংচুয়ারির কথা শোনায় বিষম খেল সে। বিড়বিড় করল, ‘সাক্ষাৎ শয়তানের বাড়ি।’

তার কাছে আর কিছু জানতে চাইনি। ছোটো টাউনে হরেক লোককথা জন্মায় ও মরে যায়। আমি উঁচু-নীচু রাস্তা ধরে হাঁটা লাগালাম। দুই পাশের পিটিস মহুয়ার জঙ্গল ঘন হল। সেই রাস্তায় আমার সঙ্গে দেখা হয়েছিল, পরে নাম জেনেছি দীপিকা সরেন। ফ্যাশন সচেতন ঘন কৃষ্ণবর্ণের দীপিকা কামিজের ওপর ম্যাচিং জ্যাকেট পরেছিল, সঙ্গতে নীলবর্ণের টর্ন জিন্স। অকারণ হাসিতে লুটিয়ে যেত তার পানপাতা গড়নের মুখ। চিবুকের ডৌল দেখে মনে হয়েছিল এখানে বাল্বের আলো পড়লে উজ্জ্বল অন্ধকার তৈরি হবে। কিন্তু এসব আমি পরে জেনেছি। প্রথমদিন তাকে দেখেছিলাম রাস্তা দিয়ে নিজের মনে হাঁটতে—সতেরো-আঠেরো বছরের বাচ্চা মেয়ে, হাতে একটা বেতের কঞ্চি, তা দিয়ে দুমদাম ঝোপের গায়ে পেটাচ্ছে আর আপনমনে গুনগুনিয়ে গান। তাকে আমি জিজ্ঞাসা করলাম সেন্ট জন’স চার্চ কোথায়। ওটাই স্যাংচুয়ারির ল্যান্ডমার্ক ছিল।

‘আমার সঙ্গে চলো।’ দীপিকা ঝকঝকে হাসল। রাস্তা নীচে নামে সোজা, কিন্তু ওপর উঠতে গেলে কসরত করতে হয়। দিনটা ছিল মরা হেমন্তের যখন তপ্ত হাওয়া অবসাদের মতো কানের কাছে ফিসফিস করে। কেন এখানে এসেছি আমি জানি না। ছোটোবেলায় বাবার কাছে শুনতাম এখানে একসময় একটুকরো ইংল্যান্ড ছিল। আপাতত ভাঙা কটেজ, বারান্দায় বসে থাকা ক্বচিৎ ঝিমন্ত বুড়ো, জঙ্গল ধেয়ে এসেছে বাড়িগুলোর চিমনির ওপর। ফাঁকা রাস্তায় নিজেদের পায়ের আওয়াজ কানে গুমগুম বাজে। ‘এখানে থাকার ভালো হোটেল নেই?’

‘বানানো হবে বলে শুনি আজকাল। তবে, আমরা কিছু কষ্টে নেই।’

‘কিন্তু সব বাড়িঘর ভাঙাচোরা। কেউ কি থাকে না এখানে?’

‘সবাই চলে গেছে। আমরাও এরকম একটা ভাঙা কটেজের দখল নিয়েছি জানো ! ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক থেকে একবার এসে ছবি তুলেছিল আমার। ইন্টারভিউ নিয়েছিল।’ টলটলে রোদে চরাচর কাঁপছিল। ঝিমুনি আসছিল আমার। দীপিকা নিজের মনে গুনগুনিয়ে গাইছে। এবার আমাকে জিজ্ঞাসা করল কোথায় উঠেছি।

‘স্যাংচুয়ারি। কনফার্মেশন ই-মেল এসেছিল ডেভিড ব্রাউনের ই-মেল আইডি থেকে। চেনো?’

‘ওহ্!’ সে আমার দিকে আড়চোখে তাকাল। তারপর হঠাৎ হাত তুলল সামনে, “ওই দেখো, ভূত।’

চমকে দেখি, সামনে কিছুটা দূরে একটা মেয়ে সাদা লং ড্রেস পরে হাঁটছে। তখন নির্জন রাস্তা। মেয়েটার ড্রেস ময়লাটে, নীচের দিকে কাদা মাখামাখি। ‘ভূত কেন হবে?”

‘সেজেছে ওরকম। আমাদের টাউনে সত্যি সত্যি ভূত বেরোয় দুপুর বেলা।’ মেয়েটা এবার মুখ ফেরাল আমাদের গলা শুনে। মধ্যবয়স্ক, দূর থেকে হাসি দেখে বুঝলাম হলুদ দাঁত। মাথার চুলও উলোঝুলো। কিছুদূর হেঁটে পাশের জঙ্গলে ঢুকে গেল। দীপিকা বলল, ‘এখানে কিছু নেই। পোড়ো ঝোপ, মুসলমানদের কবরখানা, কিছুদূরে ভাগাড়। এখানেই আস্তানা গেড়েছে।’ মেয়েটা না দীপিকা, কে পাগল স্থির করতে পারলাম না।

‘বললে না তো, ডেভিড ব্রাউনকে চেনো কি না?’ আমরা চড়াইতে ছিলাম, ফলত দূর অবধি দেখা যাচ্ছিল। আমার চোখে পড়ল জঙ্গলের মাথায় অনেক কাক একযোগে ঘুরছে। রৌদ্রের ধূসর জলছবিতে তাদের কাঁপতে দেখেছিলাম।

দীপিকা হাঁটার গতি বাড়িয়ে দিল। লাগেজ কাঁধে আমাকে হাঁফাতে হাঁফাতে তার পেছন পেছন যেতে হচ্ছিল। মুখ ফিরিয়ে বলল, “ও বাড়িতে শাপ লেগেছে। কেন যেতে চাও? ওকে মেকমাই ট্রিপ-এর কথা মনে করালাম। দীপিকা বুনোঝোপের গায়ে সশব্দে বেতের বাড়ি মারল, এবং হাওয়া স্তব্ধ। সামনের রাস্তার দু-পাশে ভাঙা কটেজ। আমি দেখলাম সামনের দিকটা প্রসারিত, যেন রাক্ষসের হাঁ। আর দেখলাম একটা চার্চের চূড়া। তার ক্রস ঘিরেই কাকের দল, যাদের উড়তে দেখেছিলাম। রাস্তার মধ্যিখানে ধুলোরা পাক খেয়ে উঠছিল। দীপিকা হাত তুলল, “ওই যে। এটা কিন্তু শহরের বাইরে। আমি আর এগোব না। দেখো গিয়ে, তোমার জন্য অভ্যর্থনার মালা সাজিয়ে রেখেছে। ‘কে? ডেভিড ব্রাউন ?

‘কেউ থাকে না আমাদের টাউনে।’

‘আর ডেভিড?’

‘ডেভিড ব্রাউন বহু বছর আগে মারা গেছে।’

.

এমন দুপুরে বুড়োরা ঘরে ঢুকে থাকে আর তরুণেরা কাজে। সেজন্য ছোটো শহর নিস্তরঙ্গ হয়। কিন্তু, তা বলে মরে যায় কি? সেন্ট জন’স-এর মাথা ঘিরে বিচিত্র আকৃতিতে কাকের দলের ঘুরপাক। জঙ্গলে কাঠপোকার কিড়কিড় বাদে অন্য শব্দ আমি পাচ্ছি না। জায়গাটায় জিপিএস কাজ করছে না, তাই দরজাবন্ধ চার্চের সামনে দাঁড়িয়ে আমি এদিকওদিক তাকালাম। ‘গোটা টাউনে ভূতেরা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মতো রাজ বসিয়েছে। এখানে আমরা কয়েক জন বাদে কেউ বেঁচে নেই। তুমি যাকে ভাববে বেঁচে, সে মরে আছে। আর যাকে মরা ভাববে, সে আসলে জ্যান্ত।’ যাবার আগে দীপিকা বলেছিল আমাকে। আরও জানিয়েছিল একদিন জাদুবলে জঙ্গল ও পোড়োবাড়িদের দল উধাও হয়ে সেখানে মাথা তুলবে রিসর্ট, সুইমিং পুল, স্পা সেন্টার। ‘ওই যে দেখছ চার্চ, ওটাই সেন্ট জন’স। রবিবার করে লোকজন আসে, কিন্তু বাকি সময়ে থমথমে। রাজ্যের সাপখোপের আড্ডা ওর অলটারের নীচে। আর আমার নাম দীপিকা সরেন।’ আলগোছে, যেন অবহেলায় কাঁধ থেকে ঝাঁকিয়ে ফেলছে সে, যেভাবে অগ্রাহ্য করে এলোমেলো চুলের অবাঞ্ছিত ঝামরানো, জানিয়েছিল আমাকে। ‘মনে রাখবে, এখন যতই গরম লাগুক, বিকেল থেকে কীভাবে তোমার হাড়ের ভেতর হিম ঢুকে যায়।’ তবু আমার মনে হল সবাই আছে এখানে, জানালার ফাক দিয়ে আমাকে দেখছে ।

আমি দেখলাম সাদা ড্রেস পরা মেয়েটাকে জঙ্গল থেকে বেরিয়ে আসতে। সামনের একটা দাঁত ভাঙা ছিল তার। মাথায় বুনোফুলের মালাকে মুকুটের মতো পরেছে দেখে আমার মনে দুম করে শব্দবন্ধ এল—জিপসিদের রাজকন্যা। অবশ্য, রাজকন্যা হবার বয়েস তার গেছে। তাকে আমি স্যাংচুয়ারির কথা জিজ্ঞাসা করলাম। সে নাক খুঁটে হলুদ শিকনি হাতে মন দিয়ে দেখল, তারপর বাঁ-দিকে হাত তুললে চোখে পড়ল দূরে ঝোপঝাড়ের আড়ালে ঢাকা পড়া সাইনবোর্ডে ‘ctuary’। তারপর মেয়েটা দুদ্দাড় চার্চের পেছনে ছুটে গেল, যেদিকে ফলসা আর আমলকীর দঙ্গল জড়িয়ে-মড়িয়ে আচ্ছন্ন রেখেছে। পাশের কটেজের জানালার ভাঙা শার্সি বেয়ে একটা আদারং বেড়াল বেরিয়ে আমার দিকে রাগী চোখে তাকাল, মাটিতে নাক ঘষল দুবার। তারপর দৌড়োল জিপসি রাজকন্যার পেছনে। আমি এগিয়ে গেলাম কারণ এমন নৈঃশব্দ্যে অভ্যস্ত নই। স্যাংচুয়ারির ভাঙা গেটের সামনে দাঁড়িয়ে দেখলাম সামনের আগাছা ভরতি বাগানে চাপ চাপ অন্ধকার ইতিমধ্যে বাসা বেঁধেছে। তাদের পেছনে যে বিশালাকৃতির দোতলা বাড়ি, সেটার দরজা-জানালাগুলো বন্ধ। গা বেয়ে উঠে যাওয়া ঘোরানো সিঁড়ির অর্ধেকটা ভেঙে ঝুলছে। বাড়ির শরীরে গজিয়েছে নিঃশব্দ ছত্রাক। পাঁচিলের গায়ে ঠেস দিয়ে একটা পুরোনো অলটো বিশ্রাম নিচ্ছে। কাকের বিষ্ঠা ও শুকনো পাতার ভিড়ে মলিন তার ছাদ। গেটের উলটোদিকের কাঁঠালগাছ থেকে কাপড়ে বানানো দুটো পুতুল ঝুলছে। ওদের নাক, চোখ কালি দিয়ে আঁকা। চোখে পড়ল, বাড়ির ডান দিকের অংশটা ভাঙা হয়েছে। সেই ভগ্নস্তূপে এখনও অবশ্য সটান দাঁড়িয়ে রয়েছে দুটো থাম, তাদের মাথায় একফালি ছাদ। ফ্রেঞ্চ উইন্ডোর ভাঙা কাচ দিয়ে ভেতরের লাউঞ্জের অন্ধকার চোখে পড়ল। বাড়ি থেকে প্রেশার কুকারের সিটি ভেসে এল যখন, বুঝলাম ভেতরে লোক আছে। বাগানের দোলনাও অবশ্য অক্ষত। সেখানে এক বৃদ্ধা বসে ছিলেন। তাঁর পায়ের কাছে কুচকুচে কালো ছাগল, পরে নাম জেনেছি লালুরাম। ছাগলের চোখগুলো কুচফলের মতো লাল। বৃদ্ধা মোটাসোটা চশমা পরা। একটা কটকি শাড়ি পরে দোল খাচ্ছিলেন। এবার হাত তুলে বললেন, ‘এসো।’ আর আমি স্যাংচুয়ারির পেটে ঢুকে গেলাম।

আমি স্যাংচুয়ারিতে থেকে গিয়েছিলাম, দশদিন ছাড়িয়ে আরও পাঁচদিন। বাড়িটাকে তামার পয়সা ঘষা কাচের মতো অস্বচ্ছ মনে হত আমার। বাড়ির ডান দিকের ভগ্নস্তূপে চোখ চালালে ঘর, স্টোররুম, গাড়িবারান্দার অনুপস্থিত ছায়া। বামদিকের যে অক্ষত অংশে আমরা ছিলাম, তার বন্ধ ঘরগুলোর দরজায় কান পাতলে নৈঃশব্দ্যকে অন্তর্ভেদী ও হাহাকারময় লাগতে পারত। সস্তা পর্দার দল প্রবল হাওয়ায় ওড়াউড়ি করত। বাড়ির পেছনে পাঁচিল ভেঙে পড়েছে। তার ওপাশে নাকি কোনো একসময়ে একটা জঙ্গল ছিল, একশো বছর আগে পুড়ে যায়। এখন একটা আগাছা ভরতি দিগন্তবিস্তৃত বিরাট মাঠের আকার নিয়েছে যার বেশিরভাগ অংশ জুড়ে গভীর কাদা, জলাভূমি, বুকসমান বুনোঘাসের সারি। একটা অ্যাম্বাসাডর গাড়ির কঙ্কাল জলার অপরপ্রান্তে বসে আছে। মাঠ ও জলার ভেতর ইতিউতি মাথা উঁচু করে থাকে গাছের গুঁড়ি, আমগাছের হাত মেলা কঙ্কাল। অঞ্চলটা আকারে এতই বিশাল ও স্থানে স্থানে অগম্য যে, তার অপরপ্রান্তের জঙ্গলকে আকারে বামন লাগে, শালগাছকে মনে হয় কোমরসমান। স্যাংচুয়ারির অক্ষত অংশের মাথায় টালি। সেখান দিয়ে বুনো লতা নেমেছে। বাড়ির সামনে, পেছনে অনেকটা জায়গা ঘিরে বাগান। সেখানে যত্নের অভাবে আগাছা। শিশু কোলে মেরির ছোট্ট মন্দির, মুরগির ঘর। জায়গাটা টাউনের বাইরে। এখান থেকে লাতেহার ফরেস্টের একটা অংশ শুরু হচ্ছে। কিছুটা এগোলে চামা। আশেপাশে অনেক পোড়ো কটেজ। মহুয়ার্টাড়ের জঙ্গল তাদের অধিকার করতে এগিয়ে আসছে। কয়েকটা কটেজ ভাঙাভাঙি হচ্ছে। দূরবর্তী নাট্টা পাহাড়কে এখান থেকে দেখা যায় না। পরিবর্তে ধু-ধু বিকেল জুড়ে সারাদিন পাতা ঝরে। ডেগাডেগি নদীর বুক থেকে উঠে আসা হিমাভ ভাপ জায়গাটাকে অধিকার করে। বাড়ির সামনের শিশিরভেজানো পাহাড়ি পথ ধুলোয় ঢাকা। প্রতি সন্ধেবেলা গম্ভীর মোষের সারিকে সেই পথ দিয়ে ঘরে নিয়ে যায় এক আদিবাসী ছেলে। পশুদের খুরের আঘাতে ধুলোময় সূর্যাস্ত দেখে আমার মনে হয় তাদের এই মেলাংকলিক যাত্রার গন্তব্য বুঝি কোনো সমাধিস্থলই হবে।

দিগন্ত থেকে মাঠ পেরিয়ে একলা আগন্তুককে হেঁটে আসতে দেখি— তার ডান পাশে ভেড়ার সারি, বামপাশে ছাগল। তারপর সে কুয়াশায় ঢেকে যায়। বাড়িতে আমি বাদে টুরিস্ট নেই। বাকি ঘরগুলো ভেজানো থাকে। বারবারা বকবক করে তার রাঁধুনি পুনমের সঙ্গে, আমি দোতলা থেকে শুনতে পাই। কুকুরেরা বেড়া টপকে বাগানে ঢুকে পড়লেও কেউ কিছু বলে না। আমার ঘরে দুটো জানালা ছিল। পেছনেরটা খুলত জলাভূমির দিকে, ব্যালকনির দিকের জানালা দিয়ে চোখে পড়ত টুকটাক খেতভূমি, ঝাঁটিফুলের ঝোপ। সেখানে নির্ভয়ে বহুরঙা পাখিরা উড়ে আসে। প্রৌঢ় হেমন্তের থকথকে কুয়াশা দৃষ্টিকে দূরে যেতে দেয় না অনেকটা বেলা পর্যন্ত। ভোরবেলা ব্যালকনিতে কফির কাপ নিয়ে বসলে ঝিম আর্দ্রতা আর আচ্ছন্ন করে আমার শরীরকে। মনে হয়, অনেক মদের সম্ভার অবিরল প্রকৃতির ঢালে, যারা সুপ্ত ও ইশারাপ্রবণ, আমার ইনসমনিয়ার ত্বক বেয়ে গলা মোমের মতো গড়িয়ে নামছে।

পরদিন থেকে আমি টাউনে নিজের মতো ঘুরব ভেবেছিলাম, এলোমেলো উদ্দেশ্যহীন। আমি নিশ্বাস ফেলে চারপাশে তাকিয়ে দেখেছিলাম, গঞ্জ তার গলিঘুঁজি চোরাপথে নিজের ভেতর লুকিয়ে রেখেছে অনেকগুলো আলাদা গঞ্জ। কুবলাই খানের কাছে মার্কো পোলো যেরকম কিছু কিছু শহরের বর্ণনা দিয়েছিলেন যাদের ভেতর জেগে আছে এক বা একাধিক প্রতিরূপ, সেই হিডন সিটিদের মতোই গঞ্জ যেন আমাকে ইশারা পাঠাত। প্রলুব্ধ করত তার পেটের ভেতর আততায়ীর প্রেমের মতো সযত্নে লুকোনো অতিকথা ও গল্পদের খুঁজে বার করতে। পরিত্যক্ত বাংলো, রাত্রের জোনাকি ও ঝিঁঝির কনসার্ট, কুমারপাত্রা নদীর কলোরাডো ভূমিরূপ, ভগ্ন চার্চের অন্দরে বাতাসের ফিসফিসানি, ফাঁকা টেনিস কোর্ট, প্ল্যাটফর্মবিহীন ছোট্ট স্টেশন, তার ওপারের বেরিয়াল গ্রাউন্ড যেখানে আমি এক অ্যাংলো তরুণীকে প্রতি বিকেল বেলা বসে থাকতে দেখি, এখানে-ওখানে বেখাপ্পা হনুমান মন্দির, তাদের মাথায় উড়ছে গেরুয়া ঝান্ডা, বাদামি চামড়ার অ্যাংলো বৃদ্ধর শরীরজোড়া মাকড়সার জাল। কখনো দেখেছি খেতের প্রান্তে বসে গমের শিষ ছিঁড়ে খাওয়া শ্রান্ত পথিক, ওরাওঁ রমণীর চোখের নীচে স্থায়ী অন্ধকার, মাথা নুইয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ভাঙা অটো, বিকেলের মরা আলো যেন দেশি কইয়ের পেটের মতো হলুদ— এই সমস্তই গঞ্জকে সিপিয়া টোনে রাঙায়। রাত ঘনায় যখন, ঘুমের চাদরে টাউনকে মোড়ানোর পরিকল্পনা বানচাল করে আচমকা স্থানীয় ক্যারম দলের ম্যাচ জেতার উল্লাস ছিটকে আসে জীর্ণ ক্লাবঘর থেকে। মহুয়াবনের ভেতর মাথার কাঠকুটো একপাশে নামিয়ে হাফপ্যান্টের পকেটে আঙুল গলিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে দেহাতি মেয়ে, একপাশে হেলানো তার গাল, হাতে ভর রেখে, টুরিস্টের চোখে এ সমস্তই ক্যামেরার সম্পদ। কিন্তু ফ্রেম ছাড়িয়ে যেটুকু, তাদের ভেতর ঘাপটি মেরে থাকে লোকালয়ের ইতিহাস। তার গড়ে ওঠার মুখে আদিবাসীদের সঙ্গে সাহেবদের সংঘাতের ইতিহাস। অরণ্যের ভেতর থেকে জ্বলজ্বলে চোখে তাকিয়ে থাকা ভাল্লুক ও চিতাবাঘের অসহায় ক্রোধের ইতিহাস। অনতিঅতীতে যাদের শিকারের মহোৎসব শুরু করেছিল সেটলাররা। অসংখ্য নামগোত্রহীন মুন্ডা ওরাওঁদের গল্পের গায়ে জন্মানো ঘাস, মরা গাছ, খ্যাতা কুয়াশা আর জঙ্গলের মধ্যে মধ্যে খুদে গ্রামগুলো, আরও অনেক কিছু যাদের অবহেলায় ঝরিয়ে দিই রোজ আমাদের স্মার্টফোনের ফ্রেম থেকে। সে-ইতিহাসকে বাঁচিয়ে রাখে গঞ্জ। তার নাগাল টুরিস্টরা পাবে না।

বারবারা আমাকে না-চিনেও হাত নেড়ে ডেকেছিল, ‘এসো।’ কারণ, বহুকাল এখানে কেউ আসেনি। বারবারার পেছন পেছন অন্ধকার প্যাসেজ ডিঙিয়ে হেঁটে যেতে গিয়ে দেখেছিলাম একটা ঘরের দরজা খোলা। তার ভেতর পরিচ্ছন্ন সাজানো সোফা, চেয়ার, টেবিল। দাঁড়িয়ে পড়তে বারবারা পেছনে ঘুরে বলেছিল, ‘এটা বাবার ঘর।’ কিন্তু, তার নিজের বয়েস সত্তরের কাছাকাছি। দু-জন আমাকে বলেছে বাড়িটায় গণ্ডগোল আছে, শয়তানের বাসা অথবা অভিশপ্ত। তাদের কথায় কান দেবার প্রয়োজন নেই। কিন্তু, বাড়ি জুড়ে গভীর নিশ্বাসপতনের আওয়াজ আমি পাচ্ছিলাম। স্যাঁৎসেঁতে দেওয়াল, ঠান্ডা মেঝেতে ফাট, সিলিং থেকে আদ্যিকালের ঝুলকালি নেমেছে। আধো আলোতে বারবারার ছায়া বিশাল লাগছিল। ‘আর কোনো বোর্ডার নেই?’

‘অনেকদিন হল। আমারও বয়ে গেছে। ন্যাস্টি লোকজন সব। তুমি একলা মেয়ে, তাই দিচ্ছি। এই যে তোমার ঘর।’ ছোট্ট কিন্তু ছিমছাম। একটা কাঠের টেবিল, প্লাস্টিকের চেয়ার। বেডকভারে ঝোলের দাগ নজর এড়াল না। ফ্যান চালাতে প্রতিবাদের ঘ্যাঁচঘোঁচ করল শুরুতে। তবে, লাগোয়া ব্যালকনিটা সুন্দর। আমার কিছু লাগত না। ক্লান্তিতে শরীর ছেড়ে দিচ্ছে। রাত্রে কী খাব জিজ্ঞাসা করাতে মাথা নেড়ে যা খুশি বলে দিলাম।

সারাদিন ঘরে ছিলাম। দেখেছিলাম ধোঁয়াটে সন্ধে নেমে আসার সময়টুকু। স্যাংচুয়ারি নিঝুম। তার বাগানের আলোর ফিলামেন্ট কেটে গেছে অনেকদিন। মুরগির ঘর থেকে অস্পষ্ট নড়াচড়ার আওয়াজ আসছিল। কুচকুচে কালো ছাগল লালুরাম অন্ধকারেও বাগান পেরিয়ে এদিক-ওদিক চলে যাচ্ছিল বলে বকতে বকতে তাকে ডেকে আনল পুনম। নীচে বারবারার অস্পষ্ট গলার স্বর, মাঝে মাঝে উচ্চগ্রামে চিৎকার। অনেক দূরে জোহার হালে-র ভাঙা বেথেল মিশন গির্জা অন্ধকারে জেগে। নতুন গজানো হনুমানজির মন্দিরের দেওয়াল সিঁদুরল্যাপা। সেখান থেকে দেহাতি ঢোলের আওয়াজ আসছে আর সঙ্গতে ফুর্তির গান সন্ধের মধ্যেই নৈঃশব্দ্যর চাদর মুড়ি দিয়ে গঞ্জ ঘুমিয়ে পড়ল। ঝুপঝাপ আলো নিভল কাছে, দূরে। তখন একান্ত নিজের সময়টায় আমি ব্যালকনিতে গিয়ে বসলাম। দূরে অন্ধকার টিলার ঢালে মিটমিটে আলো দেখে আকাশের গয়না কল্পনা করলাম। মেঘ গর্জনের গুমগুম আওয়াজ এল। দিগন্তের আকাশকে লালচে লাগে। নিঃশব্দ বিদ্যুৎ কখনো। কিছু করার নেই জেনে কফির কাপে ঠোঁট ঘষি। কার্ডিগানটা আরেকটু মুড়িয়ে নিতে গিয়ে শুনি, সার সার শূন্য ঘরে গভীর শ্বাসপতনের শব্দ। তাকে আসন্ন বজ্রপাত হিসেবে ভুল হয় না।

.

রাত্রে ঘুম আসছিল না। খাটের পাশে যে জানালা, তার ওপারে অস্পষ্ট শব্দ হচ্ছিল। ভেবেছিলাম কিচ্ছু করব না এখানে। ল্যাপটপ খুলব না, অফিসের ই-মেল দেখব না, এমনকী বইও নয়। শুধু বসে থাকব আর ঘুরব আলস্যে। তাই খাটে শুয়ে অন্ধকারে চোখ মেলে আকাশকুসুম ভাবছিলাম। কিন্তু, শব্দটা ক্রমাগত হয়েই যাচ্ছিল। মানুষের গলার আভাস পেলাম তার মধ্যে। তাই জানালা খুললাম। তখন রাত সাড়ে বারোটা।

অন্ধকার পোড়ো মাঠ। তার বুকসমান ঘাস, কাদার সাম্রাজ্যের বুকে ইতস্তত জলার অবশেষ। তাদের মধ্যে শূন্যে হাত ওঁচানো গাছের কঙ্কালকে ভিক্ষুকের মতো লাগে। ভাঙা চাঁদের আলো জলকাদার ভেতর পড়ে চিকচিক করছিল। চারপাশ মৃত্যুর মতো নিথর। কিন্তু, আমি প্রকৃতি দেখছিলাম না। মাঠের প্রান্তে একটুকরো পাথরের ওপর সর্বাঙ্গে চাদর মুড়ি দিয়ে বসে আছে বারবারা। বসে আছে-র থেকে বলা ভালো, হাঁটুতে মুখ গুঁজে ফোঁপাচ্ছে রুদ্ধস্বরে। তার পাশে দাঁড়িয়ে এক পুরুষমূর্তি। কিন্তু, তার দৃষ্টি বারবারার দিকে নয়। বরং, যেরকম মনোযোগের সঙ্গে কল্পবিজ্ঞান কাহিনির নায়ক পর্যবেক্ষণ করে নতুন গ্রহের মাটি, সেভাবে ঝোঁকা ভঙ্গিতে— না দেখতে পেলেও অনুমান করলাম, সুতীব্র চোখে সে তাকিয়ে আছে জলাভূমির দিকে। বারবারা তবু সেদিকে আগ্রহ নাদেখিয়ে নিজেতে মগ্ন। গাছের পাতা নড়ছে না কারণ হাওয়ারা স্তব্ধ ছিল আর মেঘ, সতর্ক।

কয়েক মিনিট তাকিয়ে থাকার পর সাবধানে জানালা বন্ধ করলাম।

.

সোমেন কর্মকার উশখুশ করছেন দেখে হাসি পেল। লম্বা বর্ণনা শোনার ধৈর্য পুলিশের থাকে না। এদিকে আসল গল্প শুরুই হয়নি। সহানুভূতির কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘সংক্ষেপে বলব?’

‘না। সেটার জন্য পুলিশ ফাইলই ছিল।’ বললেন অক্ষয় মাহাতো। ‘তিন বছর আগে পুলিশের কাছে যা স্টেটমেন্ট দিয়েছিলেন আপনি, আমি পড়েছি। কিন্তু, আমি আপনার স্টেটমেন্ট না, ভার্শন শুনতে চাই। তাই অনুরোধ করেছিলাম, সন্ধেটা ফাঁকা রাখবেন। বুঝতেই পারছেন, বিশেষ কারণ না-থাকলে ঝাড়খণ্ড সিআইডি আমাকে কলকাতায় পাঠায় না।’

সোমেন হতাশ মুখে ফোন ঘাঁটছিলেন। বাইরে মৃদু কোলাহল শুনে দেখি, দুটো পার্টি ডায়েরি লেখাতে এসে নিজেদের মধ্যে ঝামেলা করছে। একজন কনস্টেবল হুংকার দিচ্ছেন তাদের থামাতে। সাড়ে ছ-টা বাজে। কুরুশ করতে করতে নেটফ্লিক্স দেখার সময়। দুটো অ্যাবসল্যুট উইথ লাইম নিয়ে সন্ধে কেটে যাবে। গভীর রাত্রে গতকালের পাস্তা গরম করে খেয়ে নেব। তারপর বিছানায় যাব নিল গাইম্যানের নতুন বই হাতে। যেটুকু যেখানে স্মৃতির অবশেষ, তাদের বন্ধ দরজার ওপাশে দাঁড় করিয়ে রাখব, কারণ অন্ধকার ঘরে আমার ঘুম হবে নিশ্ছিদ্র। অক্ষয় মাহাতো বুঝবেন না, বিবর্ণ দিন কীভাবে ঝরে যায়।

‘সেই সময়েই কি অ্যারনের সঙ্গে আলাপ হয়েছিল আপনার? অ্যারন ব্রাউন, এডওয়ার্ড ব্রাউনের ছেলে। তারপর, জেনিফার গর্ডন?’ টেবিলে রাখা একটা ফাইল থেকে নামগুলো পড়লেন অক্ষয়।

‘কয়েক দিন পর। আমি যখন গঞ্জ ছেড়ে চলে আসি, তখন অবশ্য কারোর থেকে বিদায় নিইনি। পালিয়ে এসেছিলাম বলতে পারেন। অথবা, আপনারা আমাকে ঘাড়ধাক্কা দিয়ে তাড়িয়েছিলেন, যেভাবে ভাবেন।’ হেসে সিগারেটের প্যাকেট তুলে হতাশ হলাম। শেষ। কাঁধ ঝাঁকালে সোমেন বললেন, ‘আনিয়ে দিচ্ছি। চা, কফি কিছু বলি?’

“চা খাই না। কফি হলে কালো, চিনি ছাড়া। আপনি অ্যারনের কথা বললেন। অ্যারন আমার গল্পের এমন একটা চরিত্র যে আমাকে বার বার বলত, আমরা ঠিক প্রশ্ন করছি না। আমরা ভাবছি—কীভাবে। আসল প্রশ্ন হল-কেন। কিন্তু, সে যাই হোক, আপনারা তো শুরু করেছিলেন বারবারা আর অবিনাশকে নিয়ে হঠাৎ অ্যারন বা জেনিফার কেন? নাকি, এরা সকলেই আপনাদের তদন্তের কেন্দ্রে?’

‘অ্যারন এখানে গুরূত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর। তার সম্পর্কে বিশদে জানতে হবে তো বটেই। তবে আগে বলুন, বারবারার সঙ্গে আপনার বন্ধুত্ব কীভাবে শুরু হল?’

.

স্যাংচুয়ারিতে প্রথম দু-দিন আমি কাউকে আসতে দেখিনি। বারবারার সঙ্গেও কথা হয়নি তেমন। খাবার ঘরেই আনিয়ে নিতাম। বুঝেছিলাম, বাড়িটার বেশিদিন নেই। ছাদ ধসে পড়ার মুখে। নোনা-তে খেয়ে নিচ্ছে দেওয়াল। বারবারা একাচোরা থাকত। মাঝে মাঝে উচ্চকণ্ঠে পুনমকে বকত। বাকি সময়টুকু কুরুশ করত নিজের ঘরে বসে। রাত হলে ডাইনিং টেবিলে গেলাস আর বোতল সাজিয়ে বসত, হাতে উল-কাঁটা। আমি থাকলেও গ্রাহ্য করত না। বরং, একবার গেলাস নিয়ে বসে যেতে বলেছিল। আমি হেসে প্রত্যাখ্যান করি। সে মাঠের ধারে বসে কেঁদেছিল কেন? টাউনটাও যেন, আমাকে সন্দেহের চোখে না-দেখুক, আড় হয়ে আছে, যেদিন থেকে জেনেছে আমি স্যাংচুয়ারিতে থাকি। এমনিতেই থাকে হাতে-গোনা লোক। সন্ধের মুখে টিমটিমে দু-চারটে দোকান খোলে। তাসের আড্ডায় ম্লানচোখে বসে মাফলার জড়ানো দেহাতি বুড়োরা। ক্বচিৎ কোনো শ্বেতাঙ্গ সাহেব ছাতা পড়া ত্বক ও ঘোলাটে চোখ নিয়ে নড়বড়ে হেঁটে যায়। গালে হাত দিয়ে বসে থাকে গোমসের চায়ের দোকান। তারা আমাকে দূর থেকে দেখে, কানাকানি করে নিজেদের ভেতর- বেশ বুঝতে পারি। আমার হাতে কাজ থাকে না। দিনের বেলা এখানে-ওখানে ঘুরি। কখনো চলে যাই জোহার হালের জঙ্গলে। সন্ধে হলে জলাভূমির দিকে মুখ করে চেয়ারে বসি। দেখতে পাই, অনেক কাক দিনশেষে উড়ে বেড়াচ্ছে নির্জন জলার ওপর দিয়ে। দিগন্তের কালিমাখা জঙ্গল আকাশের গায়ে মিশে যাচ্ছে। অ্যাম্বাস্যাডারের কঙ্কালকে ধোঁয়ার মতো লাগে তখন। ধু-ধু শূন্যপুরাণ, নির্জনতার ইনস্টলেশন।

তৃতীয় দিনে সকাল থেকে মেঘলা ছিল আকাশ। শীতও করছিল। দুপুর বেলা টিপটিপে বৃষ্টি দেখে বুঝিনি। হাঁটতে বেরিয়েছিলাম। ফেরার সময়ে জোর বৃষ্টিতে ভিজে গেলাম। একটা দোকানের ছাউনির নীচে দাঁড়িয়ে হাত নিশপিশ করছিল সিগারেট ধরাতে। কিন্তু, কোভিড হবার পর নিজেকে কথা দিয়েছি, দিনে একটার বেশি নয়। আমি অন্যমনস্কভাবে দেখছিলাম দোকানে নানা জাতের আচারের সম্ভার। কলকাতায় যাবার সময়ে নিয়ে গেলে হয়। যেদিন রান্না করতে ইচ্ছে করবে না, একথালা ভাত উড়িয়ে দেওয়া যাবে। এদিকে গা বেয়ে জল ঝরছে। বিরক্ত লাগছিল কারণ শীতের বৃষ্টিতে টনসিল ফুলবে। তখন সামনে এসে দাঁড়াল লাড়ে অলটো। বারবারা মুখ বাড়াল, ‘আটকে পড়েছ?’

‘ছাতা আনিনি। বুঝিনি এত জোরে নামবে।’

‘উঠে এসো।”

এই রাস্তা ওই রাস্তা, গির্জার উঠোন ও ঘেঁষাঘেঁষি গাছেদের আবছায়া পেরিয়ে বারবারা আমাকে নিয়ে এল। তখন মেঘ ঝুঁকে এল, ঝিমিয়ে এল বৃষ্টি। ফুটিফাটা রাস্তার গর্তগুলোর ওপর দিয়ে লাফাতে লাফাতে ভাঙা গাড়ি এগোচ্ছিল, আর সেই ফাঁকে আমি রোগা, মাঝারি উচ্চতার একটা ধূসর টাউনকে দেখছিলাম। মাঠে ফুটে থাকা লিলি ফুলের মতো সে সাজায় না নিজেকে। অপরিশ্রমী, আন্তরিক তাই। পোড়ো কটেজের সম্ভার পেরিয়ে টিলার জানুদেশ। সেখানে গাছের দল একত্রে জঙ্গলের ছায়া বানিয়েছে। বারান্দায় বসে থাকা অশীতিপর বৃদ্ধা, তাঁর চারপাশ জনহীন—পোস্টকার্ডের ছবি হতে পারে। দূর থেকে অস্ত মোরগের ডাক ভেসে আসছে, ভিজে যাবার ভয়। তারপরেই দেহাতি বস্তি। একটা ধাবার সামনে দাঁড়ানো ট্রাক । তরুণী মেয়ে ঠোঁটে আঁচল টেনে উবু হয়ে বসে মোবাইল দেখছে। তার শিশু কাদার ওপর লাফালে ছপাক শব্দে ছিটকোচ্ছে জল। কয়েকটা শুয়োর দূরে দাঁড়িয়ে টিপটিপ বৃষ্টি গায়ে মেখে নিচ্ছে। অনুমান করলাম আমরা গঞ্জের বহির্ভাগ দিয়ে যাচ্ছি।

‘একটা প্রশ্ন ছিল। ডেভিড ব্রাউন কে?’

‘আমার বাবা।’

কী বলব বুঝছিলাম না। ‘আসলে ই-মেল পেয়েছিলাম, তাই—’

‘তাতে কী? মেল করবে না তো কি প্লেনে উড়ে গিয়ে খবর দিয়ে আসবে?’ কয়েক মুহূর্ত চুপচাপ থাকার পর বলল, ‘আমার বন্ধু অবিনাশ যাদব জানিয়েছে তুমি নাকি নামকরা সাংবাদিক। খুনের তদন্ত করো।’ তাকে জানালাম আমি খবর করি মাত্র। ঝাড়খণ্ডের জঙ্গল মাফিয়ার স্টোরির কথাও জানালাম। বারবারা উত্তর দিল, ‘হাতে চাকরি না-থাকলে কী করবে ছেলেপুলেরা? জঙ্গল চিবিয়ে খাবে? বেশ করেছে মাফিয়া হয়েছে।’ ফলত, আমি নিরুত্তর হলাম। ততক্ষণে বৃষ্টি থেমেছে। গুম হয়ে ছিল প্রকৃতি। নুয়ে পড়া গাছের পাতা থেকে টুপ টুপ জল পড়ে এক-একটা জায়গায় কাদা বানিয়ে তুলেছে। আচমকা হাওয়ায় গাছের মাথা থেকে ঝরঝর করে অনেকটা জল পড়ছিল।

‘ভয় পেয়ো না। তোমার গায়ে কেউ হাত দেবে না তা বলে। তুমি আমার শেষ বোর্ডার।’ বুঝতে না-পেরে ওর দিকে তাকিয়েছিলাম। ‘তুমি চলে যাবার পর আমি ব্যাবসা তুলে দেব, কারণ বাড়িটা বিক্রি হয়ে গেছে। এরপর ভাঙা হবে। এখানে সব বাড়ি ভাঙছে ওরা।’ ‘কারা?’

‘তোমার স্টোরির ভিলেনরা। জঙ্গল মাফিয়া। আমাদের শহরকে টুরিস্ট স্পট বানাবে। এখানে ইতিউতি অনেককে দেখবে, যারা বহুদিন আগে মরে গেছে। সারাদিন তাদের ফিসফিসানি শুনবে। তবে, টুরিস্ট স্পট হলে এরা কেউ থাকবে না।’ বারবারার মুখ থেকে হালকা অ্যালকোহলের গন্ধ পেলাম ।

.

বারবারা আমার বন্ধু হয়েছিল। থপথপে চেহারায় শাড়ির ওপর কার্ডিগান জড়িয়ে সে জলাভূমির দিকে মুখ করে বসে থাকত আর কুরুশ করত সারাদিন। মাঝে মাঝে কপালে চশমা তুলে ভুরু কোঁচকাত, কিছু কি দেখা যাচ্ছে জঙ্গলের গা ঘেঁষে? নিজের এলোমেলো কাঁচা-পাকা চুল মুঠোয় ধরে বিড়বিড় করত বারবারা, ‘আমি ভুল দেখিনি।’ বাড়ির পড়োপড়ো অবস্থা, বাগানময় আগাছা, পুনমের দুই মাসের মাইনে বাকি- কিন্তু তার গ্রাহ্য নেই। তখন থেকে আমি রাতের খাওয়া বারবারার সঙ্গে সারতাম। মুরগির ঘর থেকে ছানাপোনাদের ক্বচিৎ ডাক, একটানা ঝিঁঝির আওয়াজ চরাচরকে নীরব করত। গাঁজানো রাত হিমেল স্পর্শ নিয়ে জেঁকে বসত। বারবারা রুম হিটার পরখ করে অসন্তুষ্ট মাথা নাড়ত, ‘একদম কাজ করছে না।’ আমাকে ধমকাত, ‘ফালতু ক্রাইম রিপোর্টার তুমি। কলকাতার স্টোনম্যান মার্ডার সলভ করতে পেরেছ?’ সম্পর্কের গড়ানে ঢাল বেয়ে আমাদের হিন্দি সম্বোধন ততদিনে তুমিতে নেমেছে। আমি হাসতাম—কে তাকে বোঝাবে যে আমি গোয়েন্দা নই?

‘তুমি বরাবরই এরকম—একলা ছিলে?’ আলাপের সপ্তাহখানেক পরে আমি জিজ্ঞাসা করেছিলাম।

‘বিয়ে হয়েছিল কিনা? পুরুষেরা ব্লাডি অফুল, বুঝলে? এক ছাদের তলায় থাকা অসম্ভব। অবশ্য, মেয়েরাও ব্লাডি অফুল। মানুষমাত্রেই অফুল।’ আমরা চেয়ার পেতে জলাভূমির সামনে বসেছিলাম। তখন বিকেল ঘনাচ্ছে। পাখিদের কর্কশ চিৎকারে কান পাতা দায়। কুয়াশা গেঁজেছে জলার ওপর। বারবারা বিরক্ত হল, ‘একদিন পয়জন গ্যাস স্প্রে করে দেব। যারা নেচারকে ভালোবাসতে বলে তারা ব্লাডি লুজার। প্রেমে ছ্যাকা খেয়েছে অথবা কেরিয়ারে গাড্ডু, আমার মতো। ‘

‘শুধু বিয়েই নয়—’

‘তাহলে আবার কী? লিভ টুগেদার? আমরা ধর্মপ্রাণ প্রোটেস্টান্ট।’

‘আর প্রেম?’

‘ভালো লাগেনি কাউকে। তোমরা যাকে বলো, কী বলো যেন—’ গেলাস নামিয়ে বারবারা কথা হাতড়াল। তার কণ্ঠস্বর জড়িয়ে এসেছে। ‘ধুর ব্লাডি! ফর্নিকেট করার ইচ্ছে রে, বাবা!’

‘ডিজায়ার?”

‘ইয়েস। ডিজায়ার। আমার হয়নি। ভাগ্যিস! আমি যেরকম মোটা, ছেলেগুলোর কী অবস্থা হত ভেবেছ?’ কিন্তু, মেয়েও তো হতে পারত! বারবারা মাথা নাড়ল, ‘দুর্ভাগ্যবশত, হোমোসেক্সুয়ালদের দেখে আমার দুঃখ বাদে কিছু আসে না। ছেলেগুলো জানল না কী হারাল আর মেয়েগুলো শাড়ির নীচে সাদা কেডস পরে বেড়াল পুষে গেল সারাজীবন।’ বারবারা একচুমুকে অনেকটা মদ খেয়ে হাসল, ‘আমি প্রাউড অ্যান্টি-রোমান্টিক ছিলাম। শেলি-কিটস পড়ে খ্যাকখেঁকিয়ে হাসি পেত। তবে, এই ছেষট্টি বছর বয়েসে কী এসে যায়!’ জলাভূমির ওপারে শালমহুয়ার জঙ্গল আন্দোলিত হচ্ছে। ততদিনে আমি কল্পনা করতে শিখেছি, টাউন জুড়ে অগুনতি ফিসফিসানি। কারণ, মৃত মানুষেরা এখানে আটকা পড়ে আছে।

“তুমি কেন দাঁড়িয়ে থাকো জলাভূমির ধারে? এখনও?’ প্রশ্নটা করতেই হত।

‘তুমি কি ভাবো যে কিছু দেখতে পাবে?’

‘আমার তো দাঁড়িয়ে থাকাটাই কাজ। আমাদের।’ বারবারা স্বপ্নাচ্ছন্নের মতো হাসল । ‘একবার যদি ও এসে দাঁড়ায়, শুধুমাত্র এটুকুই তো—।’

‘এতদিন পরেও?’

‘আশা বাদে আমার আছেটা কী এই বয়েসে? তুমি দার্জিলিঙে পঁয়তাল্লিশ বছরের পুরোনো রহস্য খুঁড়তে গিয়েছিলে। আশা না-থাকলে, পারতে ওটার সমাধান বার করতে?’ ‘কোনো গতিকে হয়ে গিয়েছিল। আমারও জেদ চেপে গিয়েছিল যে, শেষ দেখে ছাড়ব। তাও, কপিবুক সমাধান করতে তো পারিনি! অন্ধকারে ঢিল ছুড়েছি কয়েকটা, ভাগ্যক্রমে লেগে গেছে।’ বারবারা জানতে চাইল আমি ডিটেকটিভ ওয়ার্ক বিষয়ে এত উদাসীন কেন। তাকে বললাম, যেটা আমি বিশ্বাস করি। সব অপরাধ দিনের শেষে এক। জাগতিক লাভ, প্রতিশোধ, সাক্ষ্য হাপিস, আর বেসিক ইনস্টিংকট, এই চারটে মোটিভের বাইরে ক্রাইম বেরোয় না। এগুলো নিয়ে দিনের পর দিন লিখতে গিয়ে আমার মনে হয়েছে, ইনোভেশন শব্দটা হয়তো শুধুমাত্র প্রযুক্তিতেই থাকে। আমাদের সময় শেষ। এই পৃথিবীতে আর মাস্টার ক্রিমিনাল জন্ম নেবে না। হাসলাম, ‘ভাগ্যিস নেবে না! তাই রহস্যরা আমাকে আলাদা করে সমাধানে আকৃষ্ট করে না।’

‘তাহলে কেন এখানে এসে ক্রিসের রহস্যের সমাধানে উদগ্রীব হলে?”

‘প্রফেসর স্প্রাউট, তোমার স্মৃতিভ্রংশ হচ্ছে। তুমিই চেয়েছিলে, আমি যেন এগিয়ে আসি। এখন কি চাও না?

‘আমার ভয়, তুমি ব্যর্থ হবে।’

‘আমার ভয়, তোমরা চাও যে, আমি ব্যর্থ হই।’

.

যে বৃষ্টির দুপুরে বারবারা আমাকে গাড়িতে করে তুলে নিয়ে এল, সেই রাত্রেই টোকা পড়েছিল আমার দরজায়। অল্প মাতাল, দুলছে। খপ করে আমার হাত চেপে বলল, ‘তুমি তো রহস্যের সমাধান করেছ, পারবে এটার হিল্লে করতে?’ বলে আমাকে টানতে টানতে নিয়ে গেল নীচে। চাদর জড়াবার সময়টাও দেয়নি। অবাক লাগছিল কারণ আজ দুপুর বেলা বৃষ্টির ভেতর গাড়িতে লিফ্ট দেবার আগে তার সঙ্গে বিশেষ বাক্যবিনিময় হয়নি। এই কয়েক ঘণ্টায় সেই মানুষ এত ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠল যে, রাতবিরেতে দরজায় টোকা মারছে? বারবারা পেছনের দরজা খুলে বাগানের ঝোপঝাড় ডিঙিয়ে আমাকে জলাভূমির সামনে দাঁড় করাল। আঙুল তুলল দূরে। ঘাসের প্রাচীর ডিঙিয়ে সেদিকে তাকালে আমি কিছু বুঝলাম না। ঝড়ো হাওয়ায় জঙ্গলের আন্দোলনে নতুনত্ব কী আছে?

‘এখানে, এই জলাভূমিতে ক্রিস লুকিয়ে আছে। তুমি পারবে খুঁজে বার করতে?” ‘ক্রিস?”

‘আমার ভাই এডওয়ার্ড। এডওয়ার্ড আর মনীষার প্রথম সন্তান ক্রিস। ক্রিস্টোফার। বত্রিশ বছর বয়েস, কারণ ও বেঁচে আছে।’

‘আমি কিছু বুঝছি না, বারবারা!’ মাথার ওপর রাতপাখির ডানা ঝাপটানোর আওয়াজ পেলাম। ঝোড়ো হাওয়া দিল অকস্মাৎ। জলাভূমির ওপর চাঁদটা ভেঙে যাচ্ছে। ডাইনিদের উপত্যকা— ভেজা ডুমুরগাছ, মৃত্যুর মতো শান্ত৷

“ক্রিস হারিয়ে গিয়েছিল। কেউ খুঁজে পায়নি। কিন্তু, সবাই জানে, ও সারাদিন এখানে লুকিয়ে থাকে। রাত্রে বেরোয়। ঘুরে বেড়ায়। হাঁটে জলের পাশ দিয়ে। জঙ্গলের ভেতরেও ঢুকে যায়। আমি ওকে দূর থেকে দেখেছি। কিন্তু, ক্রিস বলে ছুটে যেতে গেলে দৌড়ে জঙ্গলের ভেতর ঢুকে গেছে।’ বারবারা মাটির ওপর হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। ফুঁপিয়ে উঠল মাতাল স্বরে, ‘আমার দমবন্ধ লাগে, জানো! একটা গুদাম ঘর, ঘুটঘুটে অন্ধকার, পচা চামড়ার গন্ধ— ,

কালকেই বাসস্থান পালটাবার সিদ্ধান্ত নিলাম। এখানে থাকা অসম্ভব। কিন্তু, এখন পাগলকে সাঁকো নাড়াবার কথা বলা যাবে না। তাকে জানালাম কাল সকাল বেলা সব শুনব, কিন্তু এখন আমার ঠান্ডা লাগছে। টনসিল ফুললে জ্বর আসতে পারে, সেক্ষেত্রে তদন্ত সম্ভব নয়। এতে কাজ হল। বারবারা আমাকে জড়িয়ে কাঁদল একটু। কয়েক বার সরি বলল। প্রমিস করাল কাল আমি পুরোটা যেন শুনি। তারপর আমরা বাড়ির ভেতরে গেলাম। কিন্তু, যাবার আগে অভ্যেসবশত আমি পেছনে ফিরে তাকিয়েছিলাম। কেউ কি জলাভূমির ওপারে দাঁড়িয়ে দেখছিল আমাদের? এই পরিস্থিতিতে মন অনেক কিছু বানিয়ে নেয় জানি। অন্ধকারে বোঝা সম্ভব নয়। তবু কেন আমার মনে হল, শান্ত অপেক্ষায় কেউ জঙ্গলের ধার ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে, কোনো যুক্তিতেই বুঝলাম না।

.

‘তখন আপনি জড়াতে চাননি?”

‘ইন্টারেস্ট পাইনি। দু-দিন বাদেই চলে যাব, অফিস শুরু হবে। কেন এসবে মাথা ঘামাতে যাব? আমার তো কাজও নয় এটা।’

বাইরে ঝগড়াঝাঁটি স্তিমিত। লক-আপ থেকে করুণ কান্নার আওয়াজ আসছে, সম্ভবত কোনো মাতাল। কফি এল। আরেকটা সিগারেট ধরিয়ে অক্ষয়ের দিকে তাকালাম। ‘১৯ মার্চ, ২০২৫। গঞ্জে একটা মার্ডার ঘটেছে। সেই কেস তদন্ত করতে এসেছেন, তাই তো?’

অক্ষয় ও সোমেন একে অপরের দিকে তাকিয়ে হাসলেন। ‘কলকাতার কাগজে ও বেরিয়েছে?

‘নাহ্। যখন চাকরি করতাম, ফোনে রিজিওনাল নিউজপেপারের অনেক অ্যাপ রাখতে হয়েছিল। সেগুলোকে ডিলিট করিনি। মন দিয়ে স্ক্রোল করতাম এমনও নয়। এই খবরটা চোখে আটকায় কারণ “দৈনিক ভাস্কর”-এর ফিডে শুরুতেই গঞ্জের নাম ছিল।’

অক্ষয় টেবিল থেকে একটা ফাইল তুললেন। ‘যদিও নিয়ম নেই, তবু চাই আপনি দুটো ছবি দেখুন।

রোদ ঝলসানো দুপুর। একটা জঙ্গুলে জায়গায় ভাঙা দেওয়াল। তার গায়ে আটকানো দেহটা। পরনে পোশাক ছেঁড়াখোঁড়া। শরীরটাকে দুই হাত ছড়িয়ে ক্রুশবিদ্ধ করার স্টাইল দেওয়া হয়েছে। অনুমান করলাম, বড়ো পেরেক দিয়ে হাত দুটো আটকানো। পা যদিও মাটি ছুঁয়েছে। মাথা ঝুঁকে পড়েছে বুকে। দ্বিতীয় ছবিতে মুখের ক্লোজ-আপ। চোখ বন্ধ, বিস্ফারিত ঠোঁট। নীলচে আভা সারামুখে। কপালে একটা ফুটো। বুলেটের তাপে আশপাশের চামড়া পুড়েছে।

অনেকটা সময় সম্মোহিতের মতো তাকিয়ে ছিলাম। হত্যাকাণ্ড ঘটেছে জানতাম, কিন্তু নিউজে বলা হয়নি যে, দেহটাকে এভাবে স্টেজ করা হয়েছে। অক্ষয় এই ছবিটা আমাকে কেন দেখালেন? আমি তো নিজেকে বার বার বোঝাতাম, আর ফিরে যাব না!

‘জোহার হালে-র চার্চ।’ উত্তর দিলেন অক্ষয়। ‘বেথেল মিশন।

ছবি দুটো ফেরত দিয়ে বড়ো নিশ্বাস ফেললাম। ‘রিচুয়াল কিলিং হতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হল – ‘

‘তিন বছর আগে যে রহস্যের তদন্ত করতে গিয়ে আপনি ব্যর্থ হয়েছিলেন, তার সঙ্গে গতমাসের এই হত্যাকাণ্ডর যোগাযোগ কোথায়।’ স্মিতস্বরে অক্ষয় বললেন।

.

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *