৬
কারণ জীবিত লোকেরা জানে যে, তাহারা মরিবে ; কিন্তু মৃতেরা কিছুই জানে না, এবং তাহাদের আর কোন ফলও হয় না, কারণ লোকে তাহাদের বিষয় ভুলিয়া গিয়াছে।
— Ecclesiastes । 9:5
.
পরদিন সকাল বেলা তনয়া অবিনাশ যাদবের বাড়ি গেল, একে ওকে জিজ্ঞাসা করে বাড়ি খুঁজে নিয়েছিল। ফিরে এল দুপুর বেলা। আজকের দুপুরের মতো সেদিনও আমরা বাগানে বসে ছিলাম। তনয়ার ছায়া বড়ো ঘাসগুলোর ওপর পড়ে কাঁপছিল, হাওয়া এলে টুকরো টুকরো হয়ে ছড়িয়ে যাচ্ছিল বাগানময়।
বাবা বাড়ি ফিরে চিৎকার করছিল কারণ গতকাল আমি হিল্ডার গালে চুমু খেতে গিয়ে কামড়ে দিয়েছি। খুব কেঁদেছিল হিল্ডা, তিতিরকান্নার মাঠ বেয়ে ছুটে গিয়েছিল বুনোকুলের জঙ্গলে, সারাটা দুপুর একটা ঝোপের ভেতর ঢুকে ফুঁপিয়ে কেঁদেছিল। ওকে আমি অনুনয় সাধ্যসাধনা করেও বার করে আনতে পারিনি। আজ হিল্ডার বাবা আমার বাবার কাছে গিয়েছিল। এরপর থাপ্পড়, থাপ্পড়— ভেবেছিলাম পেছনের মাঠে লুকিয়ে থাকব, কিন্তু রামদাসকাকা ‘এই যে পেয়েছি’ বলে কবজি ধরল—এডওয়ার্ড খিলখিল করে হাসছে বাড়ির ভেতর থেকে, ওর ছোট্ট গোলাপি ফুলো ফুলো আঙুল, ছুঁলে বালিশের মতো লাগে, কিন্তু আমাকে হ্যাঁচড়াতে হ্যাঁচড়াতে নিয়ে যাচ্ছে বাবা আর রামদাসকাকা, কোথায় যে—
‘আমি তো শুনতে চাইনি, আমাকে তবু কাল তোমরা গল্পটা শুনিয়েছ। এরপর আমি যদি কৌতূহলী হই, তার দায় তোমাদেরও নিতে হবে বই কী। আমি জানতে গিয়েছিলাম, অবিনাশ যাদবের কাছে কেসের ডিটেলস আছে কি না।’ ‘তুমি’ করে বলছে আজ। কী জ্বালা, ছুঁড়ি কি ভাই-বেরাদরি পাতাবে নাকি? নাকি, সত্যিই ক্রিস নিয়ে উৎসাহ জাগল? তনয়া জানাল দুটো জিনিসে তার খটকা লাগছে। প্রথমটা শুনে আমি হাঁ হয়ে তাকিয়ে থাকলাম তার দিকে। চিরুনি ?
অ্যাংলো ক্লাবের প্রেসিডেন্ট, বেথেল মিশন গভর্নিং বডির আজীবন সাম্মানিক সেক্রেটারি, ওল্ড কোর্ট লাইব্রেরির ফাউন্ডিং বডির সভাপতি-আরও কী কী যেন সব পোস্ট— আউটহাউসে লোকের এত ভিড় আমার ভালো লাগে না—এখন আমি বাইবেল জানি, বাবা হল পরাক্রম ও বীর আত্মার সুসমাচার। এডওয়ার্ড কয়েক বার উঁকি মেরে এসে জানিয়েছে শক্ত ইংরিজিতে মিটিং চলছে। এডওয়ার্ড বাবার মতো লম্বা হবে, কিন্তু রাগলে ওর ঠোঁট বাবার মতো বিচ্ছিরিভাবে বেঁকে যায় না। ওর খুব দয়ামায়া। এডওয়ার্ড আগের মাসে বাবার এয়ারগান মাটিতে ঠুকে ভেঙে ফেলেছে, কারণ ও খুব কাঁদত বাবা শিকার থেকে ফিরলে। এডওয়ার্ড বলেছে মরা খরগোশের চোখ দেখলে ওর ভয় লাগে। আজ দিনটা খারাপ কারণ বাবা রাঁচি বা হাজারিবাগের হোটেলে যাবে না আজ। সারাদিন বাড়ি থাকা মানে ওয়াইন, শ্যাম্পেন, গ্রামোফোনের মিঠে সুর, সন্ধের ঝাড়বাতি। এডওয়ার্ড আর আমি ব্যাডমিন্টন খেলব বিকেল বেলা। সিগার আর ওডিকোলনের মিঠে গন্ধ, কারণ আমরা ক্ষুধার্তকে খেতে দিয়েছি, পিপাসিতকে দিয়েছি পান করবার জল, পরনের কাপড় দিয়েছি আতুরকে, অসুস্থর সেবা করেছি আর কারাগারে – পিতার আশীর্বাদ আমাদের নিশ্চিন্ত ছায়ার মতো ঢেকেছে। দিয়েছে নিটোল মাছের স্বপ্ন—আর দ্রাক্ষেখেতের মজুরদল তৃপ্তমনে বাড়ি ফিরেছে—
তনয়া। ‘অবিনাশ যাদব একটা চিরুনি খুঁজে পেয়েছিলেন ক্রিসের ঘর থেকে, মনে নেই?’ বলল
‘হ্যাঁ, তাতে কী হল? ‘
‘চিরুনি নিয়ে কে বাচ্চা চুরি করতে আসে? ছুরি না, সিগারেট না, চিরুনি! মানে, সিগারেটের টুকরো বা কাপড়ের ছেঁড়া অংশ, এসব থাকতে পারে। কিন্তু, চিরুনি কেন?’ ‘আমরা কেউ পাত্তাও দিইনি। তোমার কী মনে হয়?’
‘আমি জানি না। হয়তো কিছুই নয়। হয়তো বাড়ির কারোর। কিন্তু, অন্য কথা ভাবতে গেলেও ঘুরে-ফিরে চিরুনিতে এসে আটকে যাচ্ছি। সাধারণ বুদ্ধিতে দেখলে এটা আমাকে ট্রিগার করার কথা নয়, কিন্তু এটার ভেতর কিছু একটা আছে, যা আমি ধরতে পারছি না। সেটাই ভাবাচ্ছে। কিছু একটা, ভুলে যাচ্ছি যেন। কেন ট্রিগার করছে, জানি না, কিন্তু করছে।’
অক্ষয় মাহাতোকে দেখে আমার এককালের ছাত্র অ্যালান রোজারিওর কথা মনে পড়ে। অ্যালান ওভাবে হাসত, চোখ ছোটো করে কপাল কুঁচকে। যেন শিশুসন্তানের দুষ্টুমি দেখে আমোদ পাচ্ছে। সেইসময়কার ছেলে অ্যালান, যখন আমাদের জীবনে লোডশেডিং বলে বস্তু ছিল, আমার ছিল একটা স্কুল, তার বিশাল মাঠ, সকাল বেলার প্রেয়ার, আরও কী কী— ব্লাডি ভুলে যাই কেন আজকাল? কেউ আমাদের সঙ্গে মেশে না। বলে আমরা অভিশপ্ত পরিবার। রাস্তায় বেরোলে আমার দিকে আঙুল তুলে দেখায়। ড্যাম ইট, আমি যেন খুব কেয়ার করি! কিন্তু অক্ষয় কি শুনেছে এগুলো?
বাড়ির বাগানে আমরা দু-জন বসে ছিলাম, আমি দোলনায় আর অক্ষয় চেয়ারে। তখন সূর্যের তাপ অনেক ছিল, কিন্তু অন্ধকার ঘরগুলোয় আমার ঢুকতে ইচ্ছে করেনি। ওগুলোতে একমাত্র লালুরাম থাকে কারণ ও বুড়ো হয়ে গেছে। তাই জানালার পর্দা চিবোতে চিবোতে সূর্যাস্ত দেখা ওর প্রিয় অবসর। বেচারা, আমাদের শোককে কত আপন করেছে ও! জানোয়ারেরা তাড়াতাড়ি বোঝে। বাড়িটাও তো আর বাড়ি নেই, মুমূর্ষু মোষের মতো ঘাড়, মাজা ভেঙে কাত হয়ে পড়েছে একপাশে। কবে যে ভাঙা হবে! তিনবছর ধরে গড়িমসি করেই চলেছে রিয়েল এস্টেট। অনেককাল আগে, রাঁচি চলে যাবার সময়ে একদিন বাড়ির দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে এডওয়ার্ড বলেছিল ‘আই অলওয়েজ হেটেড দিস প্লেস।’ দিস প্লেস। বাবার বাড়ি। বাবার ঘর, চেয়ার, সিগারের বাক্স-
‘আপনি বলুন, যা মনে আসে আপনার। আবোল-তাবোল হলেও থামবেন না। আমার হাতে সারাদিন আছে।’ অক্ষয় বলল।
‘তোমার কোনো প্ৰশ্ন নেই?’
‘আছে। তবে, আপনার বক্তব্য আগে শুনতে চাই। হয়তো এর পর কলকাতায় গিয়ে তনয়া ভট্টাচার্যের সঙ্গেও কথা বলতে হবে আমাদের।’
‘এখানে কেউ থাকে না, বুঝলে? তনয়াও চলে গিয়েছিল। ওকে আমার ভালো লাগত, কারণ ও ভারি সুন্দর করে চুপ থাকত। মাথাটা বুকের কাছে ঝুঁকিয়ে, ঠোঁটটা একে অন্যের ওপর চাপ দিয়ে বসিয়ে। তবে, ও আরও অনেক কিছু সুন্দর পারত, যেমন আশা উসকে দেওয়া, অথবা, গভীর ভাবনার সময়ে ভুরু কুঁচকে নীচের ঠোঁট কামড়ে ধরা। আর, সবসময়েই তোমাকে ও প্রশ্ন করছে, এটার পর ওটা। তখন আমাদের বৃষ্টি, শীতের হিম কুয়াশা, চাপা কান্না বৃষ্টির ফোঁপানির সঙ্গে মিশে যেত, বুঝলে! তনয়া কিন্তু কান পেতে শুনে নিত, ও বুঝে যেত কে কাঁদছে, আমি ক্রিসকে খুঁজতে চেয়ে, নাকি, অ্যাগনেসের ভূত—ওহ্ আমারই মাথাটা গেছে, অ্যাগনেসের ভূত তো আজকাল আসেই না। তাহলে তনয়া কী যে বুঝেছিল—একটার সঙ্গে আরেকটা সুতো, যেন কুঁচকে জট পাকানো সময়, দুটো আলাদা সময়, বুঝলে, অ্যাগনেসের সময় আর ক্রিসের সময়, তবু ও কুরুশের মতো সে দুটোকে জট পাকাবেই! বোকা! অবিনাশ যেদিন গল্পটা বলেছিল তার পরদিনই তো তনয়া প্রথমে মনীষা, তারপরে রেভারেন্ড গরম্যানের কাছে গিয়েছিল। কিন্তু, তাদের কথা ও বুঝতে পারেনি কারণ আমরা সবাই অনেক দূরে চলে গিয়েছিলাম। নিশ্চয় আমাকে ওর মনে আছে, না? কিন্তু চলে যাবার পর ফোন করেনি একবারও। সবাই চলে যায়।’
‘সবাই মানে?”
‘এই, সব কিছু।’ হাত দিয়ে চারপাশ ঘোরালাম। ‘যা দেখছ, সব পরিত্যক্ত। আমাদের মতো।’ তারপর আমার কান্না পেল আবার, হি হি করে কাঁদলাম। অক্ষয় ভেবেছিল শোক, তাই চুপচাপ বসে ছিল। কিন্তু, আসল কারণ হল আমার মদ খেতে ইচ্ছে করছিল। বাবা যেদিন ঝুলছিল, সেদিনও খেয়েছিলাম অনেকটা। তবে, আজ পূর্বের পাহাড় রোদে জমজম করছে। বুনো টিয়ার দল সার বেঁধে নামছে বেগুন খেতে। যত নষ্টের গোড়া ওই ছুঁড়িটা, সবাইকে খালি প্রশ্ন করে যেত আবোল-তাবোল। কিন্তু, ও আর কখনো ফিরে আসবে না কারণ আমাদের সবাইকে ও ঘেন্না করত মনে হয়। নিজেকে আমি যে কতবার বলেছি, আমাদের সব শেষ, এখানে বড়োদিন আসবে না। আমার গোড়ালি বেয়ে একদিন শ্যাওলা উঠবে। ভারতবর্ষে লর্ড কর্নওয়ালিস পা না-রাখলে আমাদের গঞ্জ বানানো হত না, কিন্তু অক্ষয় অবাক চোখে তাকাল। কর্নওয়ালিস তো এসেছিলেন ১৭৮৬ সালে, আর গঞ্জের জমি রাতুর মহারাজদের কাছ থেকে তার দেড়শো বছর পর কেনা হয়েছিল!
‘হঠাৎ কেন তনয়াকে নিয়ে পড়লে?”
‘সম্ভবত কানেকশন আছে। সব তো এখনই জানাতে পারব না আপনাদের, তবে আমরা সবক-টা অ্যাঙ্গলই খুঁটিয়ে দেখছি। আচ্ছা, অবিনাশ যাদবের সঙ্গে আপনার অনেকদিনের আলাপ নিশ্চয়?’
উত্তর না-দিয়ে চায়ের কাপে হাত বোলালাম। সব কথা অক্ষয়কে জানানো যায় না। করুণা ও আক্ষেপ আমার স্মৃতির ছায়ায় হাঁটু গেড়েছে, তাদের ঝেঁটিয়ে বিদায় করব কীভাবে? মোটা মানুষদের কেউ ভালোবাসে না। কতদিন হল, অবিনাশ রাত্রিবেলা আমার পাশে দাঁড়িয়ে পোড়োমাঠ দেখছে?
অক্ষয় জোরাজুরি করল না। ব্লাডি নেটিভ, তাই বুদ্ধিমান। বদলে অন্য প্রশ্ন করল, ‘একটা জিনিসে কৌতূহল জাগছে, কারণ পুলিশ রিপোর্টে নেই। কীভাবে তনয়া ক্রিসের ঘটনায় আকৃষ্ট হলেন? অবিনাশ যাদব তো বললেন প্রথমে শুনতেই চাননি।’
অবিনাশ মুখ বাড়াল। বাসুদেব মুন্ডার শুঁড়িখানা তখন জমজমাট। সন্ধের আড্ডা, মাতাল চিৎকার, হাসি, ঝগড়া, বাকিটা ঝাপসা আমার কাছে। গালাগালি, লাথি, ঘুসি, বোতল ভাঙা, চুল ছেঁড়াছেঁড়ি, কপালে ডান্ডার বাড়ি— আমার মনে হচ্ছিল পাগল হয়ে গিয়েছি কিন্তু ওরা বলল আমি নিছক বদমাইশ। ওরা কেউ মরা মানুষকে গুমরোতে দেখেনি, তাই খুব সুখী ছিল ওরা। ওরা আমাকে টেরিয়ে দেখত। শুঁড়িখানার পেছনের গুমটিতে রক্তাক্ত মুখ নিয়ে বসে আছি তো আছিই, কখন বেরোতে দেবে কে জানে! ওই যে তিনটে যা, যতই পাহারার ভান করুক না কেন, ওদের একজন অণ্ডকোষে হাত বোলাচ্ছে মাঝে মাঝে। যন্ত্রণায় কাতরে আমার দিকে বিষদৃষ্টিতে তাকাচ্ছে। কেন যে অবিনাশ এল! আমার ওকে চোখ তুলে দেখার দরকার পড়ে না কারণ ছয় মাস হল ক্রিস হারিয়ে গেছে, তবু ওরা কেউ কিচ্ছু করতে পারেনি।
-মদ কিনতে এসে হঠাৎ গালাগালি শুরু করল। তারপর বোতল ছুড়ে ভাঙ্গল একটা। মারপিট শুরু করল—বাসুদেব কুকুরের মতো গরগর করছে। হঠাৎ আমার হাসতে ইচ্ছে করল হি-হি করে।
সবাই সেই রাত্রে বিদায় নেবার পর তনয়া আমার পাশে এসে বসেছিল জানালার সামনে শান্ত বৃষ্টির ফিসফিসে গুঁড়ি পড়ছিল। আকাশে চমকাচ্ছিল নীরব বিদ্যুৎ। নেশাগ্রস্ত মাথায় কুরুশ করার চেষ্টা করছিলাম আমি, কিন্তু হাত কাঁপছিল। ভারী ফোঁটাগুলো সাদাটে সর্দির মতো বিরক্তিকর লাগছিল। নাক ফোঁত করছিলাম বার বার। তনয়া আমার হাত থেকে উলকাঁটা নিয়ে বুনল কিছুটা, ‘ছোটোবেলার শখ। এখনও কাজ না-থাকলে বসে পড়ি।’ আমার চোখ লাল দেখে কিছু বলল না, ভালো মেয়ে। সম্ভবত চলে যাবে কালকেই, মুখে নাবললেও সেন্স করছি। কিন্তু, তনয়া তখন বলল যে, তার ক্রিসের ঘটনাকে অদ্ভুত মনে হয়েছে, এই কারণে নয় যে, একটা অবিশ্বাস্য অপরাধ ঘটেছিল। ওর আশ্চর্য লেগেছে কারণ ওই যে মেয়েটা, অ্যাগনেস, সে নিখোঁজ হয়েছিল ক্রিসের মতোই। আবার যে বাড়ি থেকে ক্রিস নিখোঁজ হয়েছে সেখানেই অ্যাগনেসের ছবি। কিন্তু, আমার অস্বাভাবিক লাগল না। এতগুলো বছর পেরিয়ে পাগলি অ্যাগনেসকে আমি ভুলে গেলেও একসময়ে প্রবল জীবন্ত ছিল তার উপস্থিতি। ভালো মেয়ে ছিল অ্যাগনেস। মাঝে মাঝে কাছে-দূরে পালিয়ে যেত আর ফিরে এসে কী হচ্ছেনা-হচ্ছে সব বলত আমাদের। কোন গ্রামে গিয়ে দেখে এসেছিল আড়াইশো বছর বয়েসের এক বুড়োকে। একবার খালারির মেলায় সে নাকি দেখেছিল একটা কুকুরের ধড়ে শুয়োরের মাথা, সেই নিয়ে দিব্যি হাঁটছে, চলছে, খাচ্ছে। এসব বকবক করত অ্যাগনেস, কথা বলতে পারলে তাকে তখন পায় কে! আমাদের সঙ্গে মাঝে মাঝে বেথেল মিশন চার্চে চলে যেত। কাজকর্ম করত সেখানে। বাড়িতে এলে রাঁধুনির কাছ থেকে রান্না শিখতে চাইত। আমাদের বাগানে নিজের মনে খেলত। রোদ বাড়লে চলে আসত ঘরের ভেতর। মায়ের নেলপালিশ, কাজল, পাউডার বাক্স নিয়ে খুটখুট করত। অবাক চোখে সেগুলো ঘুরিয়েফিরিয়ে দেখত। আমি একবার ওর গালে ক্রিম ঘষে দিয়েছিলাম বলে সে কী ভয় মেয়েরওদের বাড়িতে নাকি কসমেটিক্স ব্যবহার হয় না, ওর মা পছন্দ করে না। জানলে কুরুক্ষেত্র হবে। ঘষে ঘষে গাল পরিষ্কার করল অনেকক্ষণ ধরে। আমি বলতাম, ‘অ্যাগনেস, তুই আজ বাদে কাল কলেজ যাবি, এখনও মা-কে ভয় পাস এত?’ সেই শুনে অ্যাগনেস নীরবে মাথা নীচু করত যখন, আমার আচমকা মনে পড়ত, অ্যাগনেসের মা উন্মাদ। তখন আমার মুখে কথা জোগাত না। আমরা জানতাম, অ্যাগনেস মায়ের পাগলামিতে অভ্যস্ত হয়ে উঠছিল, কারণ সেই পাগলামির রোগ তার ভেতরেও এসেছিল। দিনে দিনে তারও মাথার দোষ বাড়ছিল। তবু সেই জেনেই তাকে পছন্দ করতাম আমরা। আবার কখনো আমার বাবা অসময়ে বাড়ি ফিরে হুংকার দিত, ‘আগাথা, এত হট্টগোল কেন?’ ‘অ্যাই রাসকেল, চাবকে ছাল ছাড়াব।’ গোটা বাড়ি ভয়ে একপায়ে খাড়া হয়ে যেত তখন। সেসব সময়ে অ্যাগনেস ঠোঁটের ওপর আঙুল রেখে ফিসফিসিয়ে জানাত ‘আমার ভয় লাগে’, এই বলে ছুটে পেরিয়ে যেত গেট। কিন্তু, বড়ো হবার সঙ্গেসঙ্গে অ্যাগনেসের চোখ কঠিন হতে শুরু করেছিল। একবার স্কুল থেকে ফেরার রাস্তায় আমাকে একা পেয়ে ও জানিয়েছিল, ‘আমি বুনো হাঁসের মতো সাইবেরিয়া পালিয়ে যাব।’ আমি বলেছিলাম, ‘তাহলে পালা।’ আর, অ্যাগনেস পালিয়ে গেল। কোনোদিন ফিরে আসেনি। কিন্তু, তনয়া জিজ্ঞাসা করল অ্যাগনেসকে কেউ মেডুসা বলে ডাকত কি না। মাথামুন্ডু নাবুঝে হাঁ করে তাকিয়ে ছিলাম। তনয়া দোনোমনো করছে, তারপর বড়ো নিশ্বাস ফেলল। ‘এই অ্যাগনেস কি ক্রিসের আগে হারিয়ে গিয়েছিল?’
‘হ্যাঁ, বছর পাঁচ আগে তো বটেই, তার বেশিও হতে পারে। এডওয়ার্ড তখন বাবার ব্যবসায় ঢুকেছে, এটুকু মনে আছে।’ তনয়া জেনিফারের প্রসঙ্গ তুলল— কোনো অস্বস্তি ছাড়াই গল্পটা বেশ উপভোগ করছিল।
—টিটকিরি দিয়েছিল, ব্লাডি সোয়াইনস! আমরা নাকি ক্রিসকে মেরে ফেলেছি—কাঁদতে কাঁদতে অবিনাশকে জানালাম, কিন্তু আমার এখন কাঁদতে ভালো লাগছে না। একটু আগেই হাসি পেয়েছিল। আপাতত এখান থেকে বেরোতে হবে।
-মেয়েছেলে বলে বেশি কিছু করিনি। অন্য কেউ হলে—এর আগেও অনেকবার মদ কিনে নিয়ে গেছে। মেমসাহেব বলে পার পেয়ে যাবে নাকি?
অবিনাশ কোমরে হাত দিয়ে চারপাশ ঘুরে ঘুরে দেখছে। বাসুদেবের কথা ওর গ্রাহ্যে আনার দরকার নেই।
–নেহাত ওদের বাড়িতে অমন ঘটনা ঘটে গেছে, তাই থানায় যাচ্ছি না। নাহলে যে ক্ষতি আজ করেছে—চার-পাঁচটা বিলিতির বোতল ভেঙেছে—
আমি ওকে জেনিফার সম্পর্কে বললাম, যেটুকু জানি। তিনকুলে কেউ নেই এক ভাইঝি বাদে, তারও বছর পঁয়তাল্লিশ বয়েস হল। চাকর-বাকরের মতো খাটায়। রাতে ভূত নামায় জেনিফার। একটা ছোটো দল আছে ওর, বলে অকাল্ট চৰা করে। তনয়া অবাক স্বরে জিজ্ঞাসা করল যে, ওকে পছন্দ না-করলে বাড়িতে ডাকি কেন। কী করে বোঝাব ওকে, এগুলো পছন্দ-অপছন্দের ব্যাপারই নয়। আমরা জানি জেনিফার এটাই। মেরিলকে নিয়ে তনয়ার কাছে যা বলল, পরিষ্কার শুনেছি। আমি জানি, টমাসও শুনেছে। জানি, আমার পেছনেও আমার সম্বন্ধে বলে বেড়াবে। কিন্তু, যদি এটা না-করত, তাহলেই বরং অস্বাভাবিক লাগত। ও নিজেও জানে যে, আমরা এগুলো জানি। কিন্তু, তার পরেও ও বলে বেড়াবে আর আমাদের আড্ডায় আসবে। এগুলো তনয়া বুঝবে না। কিন্তু, ও জিজ্ঞাসা করল আমি সত্যিই ক্রিসকে দেখতে পাই কি না। এমন প্রশ্নের উত্তর হয় না।
এখন অনেক রাত, অতিথিরা বাড়ি চলে গেছে। বাবার দেরাজ থেকে চাবুক বেরিয়েছে বলে আমি আর এডওয়ার্ড স্টাডির আলমারির পেছনে লুকিয়ে। চাবুক সপাং আওয়াজ করলে আমার সেটাকে সাপের মতো লাগে। বাবা বাড়ি আর বাগান জুড়ে হেঁটে বেড়াচ্ছে। দোতলার জানালায় কি মা এখন দাঁড়িয়ে? সকালে এডওয়ার্ড বমি করছিল। মা ওকে ওষুধ খাওয়াচ্ছিল। বাইরের ঘরে রসে দাঁত চিপে বাবা বলল, দ্যাট হোর অ্যান্ড হার বাস্টার্ড। মা কেঁপে উঠল। কিন্তু, বাবার দিকে ফিরল না। কাঁদছিল। আমার কিন্তু দুঃখ হয়নি। তুই না কলেজে উঠবি, তাহলে বাবাকে ভয় পাস কেন এত? কিন্তু, আমি স্ স্ করে এডওয়ার্ডকে থামালাম, কারণ পায়ের শব্দ এবার আমাদের জানালার কাছে এগোচ্ছে। দাঁত ঘষা আর বিড়বিড় গালি কান পাতলে শুনতে পাব। বেডরুমের দরজা আধভেজানো। আমি জানি, মা কাঠের মতো বসে আছে বিছানায়। আমাদের কথা হয়তো মনেও নেই কারণ বাবা টলতে টলতে ফিরে এসে দরজা বন্ধ করে দেবে একটু বাদেই। মাত্র এটুকু সময়, দরজা বন্ধ হলেই আর ভয় নেই।
তনয়া আমার কাঁধে হাত রাখল, চোখ তুলে দেখলাম মুরগির ঘর লো হিট ল্যাম্পের হলুদ আলোয় ম্লান, ছানাদের দল পালকে মুন্ডু গুঁজে ঘুমোচ্ছে। ঘাড় নামিয়ে তনয়াকে উলের দুটো ঘর দেখালাম কারণ মনে হচ্ছিল আবার ছাড়িয়ে লম্বা বানাতে হবে। আমি যদি হ্যাঁ বলি, ও আমাকে পাগল ভাববে। তনয়া কুরুশ থামিয়ে চুপচাপ বসে থাকল অনেকক্ষণ। একসময়ে হাই তুলে ঘুমোতে গেল, কিন্তু সিঁড়ির মুখে উঠতে গিয়ে ফিরে এল বাইবেল চাইতে। ‘ঘুম আসে না, পড়ব। ধর্মের বই ভালো ঘুমপাড়ানি ওষুধ।’
‘চিরুনিটা আপনি দেখেছিলেন?’ অক্ষয় প্রশ্ন করল।
“মানে?’
‘তনয়া যে চিরুনিটার কথা বললেন। যেটা পাওয়া গিয়েছিল ক্রিস নিখোঁজ হবার দিনে । আপনি দেখেছিলেন? কেমন দেখতে, মনে আছে?’
‘ভুলে গেছি। সাদা। মাঝে হাতির মুখ খোদাই। এটুকুই। চা খাবে আরেক কাপ? খাও
না! কেউ আসে না আমাদের বাড়ি। শুধু অ্যারন মাঝে মাঝে এসে থেকে যায়। তুমি যদি সন্ধে অবধি থাকো, তোমাকে ক্রিসের গল্প শোনাব। তুমি পারবে, ক্রিসকে খুঁজে বার করতে?’ ‘আমি কাল অবিনাশ যাদবের বাড়ি গিয়েছিলাম। তাঁর বক্তব্য শুনেছি।’ চা খেতে খেতে নিবিষ্টমনে শুনছিল অক্ষয়। এবার প্রশ্ন করল। ‘প্রমিসড ল্যান্ডে নেটিভ বনাম মূলনিবাসী বনাম অ্যাংলো, এই সমীকরণ সম্পর্কে আপনার ধারণা কী?’
.
‘মূলনিবাসীদের ওপর সবার রাগ কারণ সরকার থেকে তাদের জমিজির দিয়েছে, চাকরিতে অনেক কোটা। তুমি নিজেও তো তাই, আমাকে দিয়ে এসব বলাচ্ছ কেন?” ‘আপনাদের কমিউনিটি? তারা কী ভাবে?
.
‘হু কেয়ারস! কী যেন বলে, জীবনের উদ্দেশ্য সবার প্রতি সহনশীল হওয়া, সেটাই হবার চেষ্টা করছি আজকাল। অ্যাংলো ট্রাইবাল মাতাল প্রতিবন্ধী সবাইকে ক্ষমার চোখে দেখি।’ অক্ষয় আবার হাসে। কথায় কথায় হাসে ছেলেটা, অ্যালান রোজারিওর মতো। চায়ে চিনি খায় না, নাকি ডায়াবেটিস। মাত্র একান্ন পুরেছে, নিজেই জানাল। কথায় কথায় বলল, মেয়ে রাঁচির লোরেটো কনভেন্টে পড়ে। বউ কাজ করে রেডিয়োতে। মনীষার ইচ্ছে ছিল, ক্রিস বড়ো হলে তাকে সেন্ট জেভিয়ার্সে দেবে। টাউনের সবাই বলে, আমরা ক্রিসকে মেরে ফেলেছি। আর আমাদের কে মেরেছে?’ ‘এই প্রশ্নগুলো কেন করছ? প্রথমে চিরুনি, তারপর এসব। তোমার কেসের সঙ্গে কী সম্পর্ক? ‘
অবিনাশ সময় নিল চারপাশ জরিপ করতে। আমাকে ধরে বাইরে বার করল তারপর।— ওদের টাকা মিটিয়ে দিতে যেন না ভোলে, ফেরার সময়ে অবিনাশকে মনে করালাম। স্মার্ট, তাজা জোয়ান ও, কিন্তু এত বোকা— আমার হাতে কাজ নেই তাই গোটা রাস্তা কাঁদলাম, এত অ্যাংলো পুলিশ থাকতে একজন দেহাতিকে কেসের ভার দিল? জাতভাইদের ছেড়ে দিল, আমাদের ফ্যামিলি সবার কাছে হাসির খোরাক হয়ে উঠল। অবিনাশ নির্বিকার মুখে জিপ চালাচ্ছে। ও পুলিশ, এসবে কিছু এসে যায় না।
‘আমি একটা পার্সপেকটিভ চাইছি। এখানকার জীবন, সমাজ, সংকট। এই কেসের সঙ্গে এগুলো জড়িয়ে। হয়তো আপনাদের এমন বিপর্যস্ত সময়ে এত কথা বলানোটা ঠিক হচ্ছে না, কিন্তু যেহেতু আমি বাইরের মানুষ, তাই এরকম গল্প আমার নিজের বোঝার জন্য কাজে লাগে।’ আমি নিশ্বাস ফেললাম। আমাদের বিপর্যস্ত সময় তেত্রিশ বছর আগে শুরু হয়েছে। আজ নতুন করে কী ই-বা ঘটবে! ‘তনয়া দুটো খটকার কথা বলেছিলেন। দ্বিতীয়টা কী?’
‘গুড ওয়ার্কস, বারবারা? গুড ওয়ার্কস?’
‘মানে?’
‘রেভারেন্ড পরিতোষ গরম্যান দু-বার বলেছেন, দিজ নেগেটস অল গুড ওয়ার্কস। দ্বিতীয়বার বলেছেন, তাঁর পাপের ক্ষমা যেন না হয় এর জন্য। আর একবার জানিয়েছেন যে, তাঁর পাপে তিনটে জীবন শেষ হল। সেই তিনজন কারা? কারা কী পাপ করেছিল? এই কথাটাই-বা উঠল কেন?”
‘এর উত্তর কি তুমি পাওনি? রেভারেন্ড ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। ক্রিস, এডওয়ার্ড ও মনীষা, তিনজনের জীবন বিধ্বস্ত হল তাঁর ঘুমের কারণে, কারণ তাঁর জিম্মায় ছিল ক্রিস এবং তিনি অবহেলা করেছেন। অবশ্যই সেটা ভালো কাজ ছিল না।’
তনয়া হাসল, ‘তুমি যতই চার্চে যাও না কেন, ধর্মকর্মে মন নেই একদম।’
‘বাজে কথা যত! কী বলতে চাইছ?’
আজ ভেবেছিলাম এডওয়ার্ডকে নিয়ে দোলনায় দোল খাইয়ে ঘুম পাড়াব, কারণ এখন আমি বড়ো হয়ে গেছি, ওকে সামলাতে পারি। কিন্তু, হিল্ডা-ও আমাকে বলেছিল তিতিরকান্নার মাঠের ওপর হরিয়ালের ঝাঁক নেমে আসে বিকেল বেলা, আমাকে দেখাবে। আমি ওকে চুমু খেলাম কারণ সূর্য নেমে আসছিল মাথার ওপর। হলুদ ছায়া আমাদের ঘিরে ধরছিল। আমি কি এখন রামদাসকাকার হাতে কামড়ে দেব? কিন্তু, বাবা প্রচণ্ড মারবে।
‘বারবারা, আমি ক্যাথলিক কনভেন্টে পড়াশোনা করেছি। সেখানে বাইবেলের ক্লাস করতে হয়েছিল বাধ্য হয়ে। কাল শুনে কানে লেগেছিল তাই। তারপর গুগল করলাম। বেথেল মিশন অ্যাংলিকান চার্চের সেই অংশটার প্রতিনিধি যারা প্রোটেস্টান্ট সংস্কারের পাঁচটা মন্ত্রকে কট্টর মেনে চলে। সোলা স্ক্রিপচুরা, সোলা ফাইদ, সোলা গ্রাসিয়া, সোলাস ক্রিস্তাস আর সোলি দেও গ্লোরিয়া। রেভারেন্ড যখন গুড ওয়ার্কসের কথা বললেন, সেটার মানে ভালো কাজ নয়। সেন্ট পল বর্ণিত ওয়ার্কস অফ ল, যা মানুষকে পাপমুক্ত করে। কিন্তু, সেটা ক্যাথলিক চিন্তা। তার বিপরীতে প্রোটেস্টান্টিজমের পাঁচটা মন্ত্রের দ্বিতীয়টা, সোলা ফাইদ, তার মানে হচ্ছে জাস্টিফিকেশন বাই ফেইথ অ্যালোন। শুধুমাত্র ঈশ্বরে বিশ্বাসই মানুষকে স্যালভেশন দেয়, তার জন্য গুড ওয়ার্কসের দরকার নেই। বেথেল মিশন ১৫৭১ সালে প্রকাশিত থার্টি নাইন আর্টিকলস অফ রিলিজিয়ন, যা চার্চ অফ ইংল্যান্ডের মূলমন্ত্র, তার অনুগামী। এই দেখো, ওয়েবসাইটে আছে।’ তনয়া ফোন বাড়াল। ‘We are accounted righteous before God, only for the merit of our Lord and Savior Jesus Christ by faith and not for our work or deservings। এগারো নম্বর অনুশাসন।’
বাবা ঘরে ঢুকে যাবার পরে এডওয়ার্ড বড়ো নিশ্বাস ফেলে আমার দিকে তাকিয়ে হি-হি হাসল— তুই কি ভীতু রে, বার্বি! এত বড়ো হয়ে গেছিস, তাও লুকিয়ে থাকিস। —চুপ কর, তুই লুকোলি কেন?
দেখ— —আমি ছোটো না? বাবা তোকে বেশি ভালোবাসে, তাই কম মারে, আর আমাকে
–হুঁ, তোর মনে নেই, সেই যেবার আটকে রাখল, তখন তোর দু-বছর বয়েস। এডওয়ার্ডের কবজির দিকে আমি তাকাব না। চোখ ঘুরিয়ে নিলাম। শেষবারেরটা ঘটেছিল একমাস আগে, এডওয়ার্ড যেবার বাবার এয়ারগান ভাঙল। জায়গাটা শুকিয়ে গেছে। ওর বিছানায় হিসি করাও বন্ধ হয়েছে। জোজোর কথা ভুলে গেছে ও। বাইরে ঘুরঘুট্টে অন্ধকার। ফেলু ধোপার দলবল দূর বস্তিতে ঢোল বাজাচ্ছে, অল্প হাওয়া দিচ্ছে বলে আওয়াজটা বেশ পরিষ্কার। স্টাডির টেবিলে হেলান দিয়ে এডওয়ার্ডের দিকে তাকালাম— তোর মনে আছে, দোদোর কথা? তোকে কোলে নিয়ে ঘুরত। তুই বুকের ওপরেই ঘুমিয়ে পড়তিস।
-দোদোর একমুখ সাদা দাড়ি ছিল, না রে? আমার ওটুকু মনে আছে। ফ্রুটকেক খাওয়াত আমাকে, ওই গন্ধটা—
–তোর পায়ের আঙুলগুলো ফুলো ফুলো গোলাপি ছিল। বাবা বলত, ভাল্লুকের আঙুল। কাঁঠালগাছের ছায়া এঁকেবেঁকে আমাদের ঘরে ঢুকে পড়েছে, থিরথির কাঁপছে। —আজ এখানেই ঘুমিয়ে পড়বি? কী সুন্দর হাওয়া দিচ্ছে, দেখ!
–না, তারপর ভোরবেলা বাবা দেখলেই হয়েছে আর কি!
—তুই আমার থেকে ভীতু বেশি, কলেজে উঠবি তবু কত ভয় তোর! মারলে লাগে না জানিস, পিঠটাকে শক্ত করে নিতে হয়।
‘রেভারেন্ড থিয়োলজির শিক্ষক, তিনি তো জানেন যে গুড ওয়ার্কস হোক অথবা নাহোক, তাঁর পাপের ক্ষমা পাবার সঙ্গে এর সম্পর্ক নেই। এটা সাধারণ মানুষ বললে আমার কানে লাগত না; কিন্তু, রেভারেন্ড কেন ক্যাথলিকদের ভাষ্য বলবেন, যিনি নিজে প্রোটেস্টান্টিজমের পাঁচটা মন্ত্রকে মেনে চলেন? কেন তিনি ভাববেন যে, তাঁর কাজের ফলে স্যালভেশন ঘটবে না? নাকি, তিনি অন্য কোনোদিকে ইঙ্গিত করছেন?’ তনয়া অস্থিরভাবে বারান্দাজুড়ে হাঁটতে শুরু করল। ‘রেভারেন্ড যদি বলতেন তাঁর দোষে এই ঘটনা ঘটল, বুঝতে অসুবিধে হত না। কে পাপ করেছে? কেউ তো না। আর, গুড ওয়ার্কসের কথা রেভারেন্ড প্রথম বলেছেন ক্রিস হারিয়ে যাবার সন্ধেবেলায়। তখনও পুলিশ তদন্ত আরম্ভ করেনি। তার আগে রেভারেন্ড কীভাবে ধরে নিচ্ছেন যে, ক্রিসকে আর পাওয়া যাবে না এবং তার বাবা-মায়ের জীবন শেষ হয়ে যাবে?’ কিন্তু, আমি বা তনয়া আর কী বুঝব এসবেরআমাদের সন্তান নেই। নিজের সন্তানের জীবন বিপর্যস্ত হতে দেখলে মানুষের মাথার ঠিক থাকে?
অক্ষয় আমাদের গঞ্জকে চেনে না। আমাদের গঞ্জ এক ঘুমিয়ে পড়া টাউন, যেখানে কুড়ি ঘর অ্যাংলো ইন্ডিয়ান মাত্র, আর বাকিরা স্থানীয় মানুষ, নয়তো কলকাতার বাঙালি কিছু। কটেজগুলো হয় পরিত্যক্ত, নয়তো বিক্রি হয়ে গেছে, অথবা নয়তো দখল। সবাই একে একে ছেড়ে চলে গেল। আমাদের অধিকার করল উপকথা, স্মৃতি ও রহস্যময় ফিসফাসের দল। শীতের থকথকে কুয়াশা ক্লান্তির মতো, আমাদের ভাঙা রাস্তা, ঘুপচি দোকানঘরের অন্ধ চোখ, পিয়ালের জঙ্গল, ভিখিরিদলের কাঁচা কাঠের আগুনের ওম, জবুথবু বালিকার পিঠে বাঁশের ঝুরিভরতি হিমবর্ণ মুলো, দিনের একটা ট্রেন, অকস্মাৎ গাঁজার গন্ধের ঝিম মৌতাত মিশে যায় অবৈধ ইটভাটার ধোঁয়ার সঙ্গে, দীর্ঘশ্বাসের মতো আমাদের অভ্যন্তরে চারিয়ে ওঠে। এখানে সবাই সবাইকে চেনে, অঢেল অবসর, আমরা সেগুলোর ফাঁকফোকর ভরিয়ে তুলি গল্পে। কর্নওয়ালিসের গল্প। অবৈধ সন্তানের প্রতি পিতার বিশ্বাসঘাতকতার গল্প। পাহাড়ের গল্প। অরণ্যের গল্প। জোহার হালে-র গল্প।
ক্রিসের গল্প।
নয়। অক্ষয় বুঝবে না। অ্যাংলোদের কেউ পছন্দ করে না। মোটা অ্যাংলো বুড়িদের আরওই
‘নাহ্, সাধারণ মানুষ আর একজন প্র্যাকটিসিং থিয়োলজিস্ট যিনি তাঁর বাইবেল জানেন, তাঁরা সমান না। দ্বিতীয়জনের পুরো জীবন এটাই। তিনি হাজার বিপর্যয়েও নিজের বিশ্বাসের বাইরে গিয়ে কথা বলবেন না।’
‘শোনো, হতেই পারে রেভারেন্ড সন্দেহজনক আচরণ করেছেন। ক্রিশ্চান পাদরি যখন, তার ওপর গায়ে অ্যাংলো রক্ত, ফলত খারাপ কাজ করা স্বাভাবিক। কিন্তু, খারাপ কাজ এভাবে করবার ধাত তাঁর ছিল না। ক্ষতি করতে হলে তিনি কারোর কানে মন্ত্রণা দিয়ে, তাকে ব্রেনওয়াশ করে ড্যামেজ করতেন, কিন্তু নিজের হাত নোংরা করতেন না। এক-একটা মানুষের ধরন এক-এক রকমের হয়।’
‘কিন্তু, কাউকে তোমার সন্দেহ হয়েছিল।’ তনয়া চোখ সরু করল। একটা কাঠপোকা ক্রির ক্রির শব্দে ডেকে চলেছিল। এইসময়ে পেছনের পোড়োমাঠে গেলে পা টেনে টেনে চলা অনেক ছায়াদের দেখা যাবে। কাছে গেলে দেখবে কেউ নেই সব ভোঁ-ভাঁ। ওরা দুপুরে জলাভূমির ধার ঘেঁষে ঘুরে বেড়ায় আর বিকেলে ঘুমোতে যায় জোহার হালে-তে। আমার মনে পড়ল, অ্যাগনেসের ভূতকে এক দুপুর বেলা দূর জঙ্গলে দেখে বাবা অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল। তারপর আমরা যখন মুখে জলের ছিটে দিয়ে চেতনা ফেরালাম, বাবা বিড়বিড় করেছিল ‘আছে হাওয়া, আছে রোদ, আছে নীল আকাশের নীচে মর্মর পৃথিবী—যা করুণায় আচ্ছন্ন রাখে আমাদের দুঃখশোক।’ বাবার চোখ থেকে জল গড়াচ্ছিল। দোমড়াচ্ছিল শরীর। এমন কথা শুনব আমরা ভাবিনি। বাবা চোখ খুলে বলেছিল করুণা, দুঃখশোক বলেছিল, তারপর বুড়ো হয়ে গেল। তখনও ক্রিস হারিয়ে যায়নি। বাবা কি দেখেছিল, আলোর ফোঁটার মতো শরীরের চারধারে ঝরে পড়া ঈশ্বরের অনাবিল নিরাময়, অ্যাগনেসের ভূতকে আমাদের টাউন যেভাবে জেনে এসেছে?
‘আমার সন্দেহ হয়েছিল তো। এডওয়ার্ডকে। ও এটা করতে পারে, নিজে না হলেও লোক লাগিয়ে।’ তনয়া কি অবাক হল? ‘বাবা,’ বলল মৃদুস্বরে। বোগাস! বাবা যেন নিজের সন্তানকে অপরহরণ করে না! মোটিভও ছিল এডওয়ার্ডের। ও নিজের ব্যাবসা শুরু করেছিল। ধার হয়েছিল অনেক জায়গায়। আমি জানি, ওর একলপ্তে অনেক টাকা দরকার ছিল। মুক্তিপণ চাইলে বাবা সঙ্গেসঙ্গে দিয়ে দিত। আমি অপেক্ষা করছিলাম কবে মুক্তিপণ চেয়ে ফোন আসে। কিন্তু যখন এল না, বুঝলাম এডওয়ার্ড করেনি। তনয়া হাঁ করে তাকিয়ে ছিল। ‘আরে ব্লাডি আমাদের বয়েস হয়েছে অনেক। সন্তানের মাথার চুলের বদলে টাকার বান্ডিলে নাক ডোবালে কখনো কখনো গন্ধ বেশি সুন্দর লাগে, আমরা জানি।’
‘তোমার হৃদয়, বারবারা—’ তনয়া হাসতে শুরু করল।
‘আমার হৃদয়, কী?’
‘প্রাক্তন প্রেমিকের চুমুর থেকেও শীতল।’ কিন্তু ও সত্যিই ইন্টারেস্টেড এটার ভেতর ঢুকতে? আমি বাধা দেব না, কারণ আমিই তো ওকে বলেছি, তবে সাবধান করে দেব। এই একটা কেস শুধু আমাদের জীবনকেই বিপর্যস্ত করেছে এমন না। অবিনাশ নিজের মুখে জানিয়েছে তার কী অবস্থা হয়েছে। আগামী সাত কি দশদিনে ও যদি সমাধান খুঁজে না-পায়, তারপর? নিজেকে সামলাতে পারবে তো? ক্রিসের অন্তর্ধান রহস্য বিষের মতো, যে স্পৰ্শ করেছে তার জীবন আর একরকম থাকেনি। তবু, তনয়া যেন এ সতর্কবাণী কানে না-তোলে।
জোজো পালিয়ে যাবার পর থেকে এডওয়ার্ড চুপচাপ হয়ে গেছে। হাতের তালু মেলে তাকিয়ে থাকে। গোনে, কতগুলো হল। শেষ ফোসকাটা কিছুতেই শুকোচ্ছে না। দগদগ করছে জায়গাটা। আমাদের বাগানে কাঁঠাল গাছে ম-ম করছে গন্ধ, বোলতার দল ঝাঁক বেঁধে উড়ে আসে। এডওয়ার্ড গাছের নীচে বসে থাকে দুপুর বেলা। ছায়ার ভেতর থেকে টলটলে মুখ উঁকি মারে ওর।
‘আমার হৃদয়ও কি হিমশীতল নয়?’
‘কিন্তু, কেন চাও? এটা জানা দরকার, যেহেতু নিজে বার বার বলেছ রহস্য সমাধান তোমার কাজ নয়।’
‘ধরে নাও, টাইমপাস।’
দোলনায় লাথি মেরে উঠে দাঁড়ালাম আমি। কান গরম হচ্ছে। দাঁতে ঠোঁট কামড়ে নিজেকে বললাম, অচেনা একটা পুঁচকে মেয়ের সামনে ধৈর্য হারাব না। ‘হাউ ডেয়ার ইউ! ক্রিস তোমার টাইমপাস, ভাবলে কী করে!’
তনয়া স্থিরচোখে কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে বলল, ‘যে বাচ্চাটাকে নিয়ে তুমি আজও এত সংবেদনশীল, তার পরিণাম জানতে কি তুমি ভয় পাবে? অ্যারন আমাকে বলেছে, তুমি আসলে জানতে চাও না।’
‘কী এসে যায় তোমার? ড্যাম ইউ!’
‘তোমার এই রাগটা দেখতে চেয়েছিলাম বারবারা, দেখতে চেয়েছিলাম—’ কী দেখতে চেয়েছিল ও? আমরা ওর গিনিপিগ কিনা? ‘দেখতে চেয়েছিলাম তোমার হৃদয়ে উত্তাপ আছে কি না।’
‘দেখে তোমার লাভ?’
‘সেটুকু উত্তাপ আর একবার, শেষবারের মতো দাও। একটা শিশুর জন্যে। জীবনের এই পর্যায়ে এসে আর কী তুমি করতে পারো, বারবারা?’
এবার সত্যিই চোখে জল এল। অবাক হলাম, বিরক্তও। আমি কি শেষে মদ না-খেয়েই ন্যাকা হয়ে যাচ্ছি? মুখ ফিরিয়ে নিজেকে সংযত করলাম, কিন্তু গলা কেঁপে গেল। ‘কেন চাইছ তুমি? নিজেই তো বলেছিলে উৎসাহী নও। টাইমপাস, সত্যিই?’
এডওয়ার্ড চাইলেও আমি পারব না। কোথায় পালাব? ও বোকা, তাই ভাবে বাবাকে ফাঁকি দিতে পারবে।
—খবরদার এমন কথা ভাবিস না কিন্তু, বাবাকে বলে দেব।
–তাহলে আমি লুকিয়ে পড়ব, দেখিস।
-কোথায় লুকোবি?
-কেন? ওই তো জলাভূমি, ওখানে সবাই লুকিয়ে থাকে।
-ভূতেরা থাকে ওখানে, তুই ভূত দেখতে চাস? এডওয়ার্ড ঢোক গিলল।
—তাহলে অন্য কোথাও চল। বম্বে চল। ওখানে রাজেশ খান্না থাকে।
—এডওয়ার্ড, আমার কথা শোন। আমি ওর সামনে বসলাম, কিন্তু আমার কান্না পাচ্ছে। ‘না। সত্যিই না। কিন্তু, আমি আমার জগতে ব্যাখ্যাহীনতা অপছন্দ করি। যে কেসের মীমাংসা হয় না, সেটার কেন মীমাংসা হল না, তার ব্যাখ্যা আমার কাছে থাকে। যখন প্রশ্নের উত্তর পাই না, কেন পেলাম না সেটুকু জানা থাকলেও আমি সন্তুষ্ট। কিন্তু, এখানে জানা নেই। আমি আজ সারাদিন ধরে ভেবেছি, কেন এই কেসের সমাধান হল না। কিন্তু, ওই দুটো জায়গায় এসে আটকে যাচ্ছি। চিরুনির মতো অদ্ভুত একটা জিনিস যা আমাকে ট্রিগার করছে কেন জানি না, আর গুড ওয়ার্কস।’
.
একটা অন্ধকার ঘর, ড্রাম, দড়িদড়া ছড়ানো, স্যাঁৎসেঁতে, সাপ বেরোবে এবার, ওদের বড়ো বড়ো দাঁত থাকে, রাগে চোখ জ্বলে ওদের- এডওয়ার্ডের ঠোঁটের কোনায় কালশিটে।
—তুই তো বড়ো হয়ে গেছিস, বল? আট বছর কম বয়েস না।
—সেজন্যেই তো চলে যাব। তোকেও নিয়ে যাব।
–শোন না, বাবা যেমন সংসারের দায়িত্ব সামলায়, তোকেও তো এরপর থেকে সামলাতে হবে। আমাকে, মা-কে দেখে রাখতে হবে। এডওয়ার্ড ভুরু কুঁচকে ভাবল। সব ছেলেরাই খুশি হয় কেমন, ওদের যদি মনে করিয়ে দিই যে ওরা ছেলে।
—তুই বম্বে পালালে আমাদের কে দেখবে? এডওয়ার্ড খুব কঠিন চিন্তা করছে।
‘আমি জানি না। আমার এত শক্তি নেই, সত্যিই।’ ফিসফিস করে বললাম আমি। ‘নেই, তবু ক্রিসকে তুমি জলাভূমিতে দেখতে পাও, বনের ধারে দেখতে পাও, রাত্রে মাঠে বসে তার জন্য কাঁদো। আমরা কি শেষবার, ধরে নাও শেষবারই, আমি আর তুমি, চেষ্টা করে দেখব? সাহায্য করবে তুমি আমাকে?”
এই প্রথম কেউ এমনভাবে বলছে, যার চাওয়ায় হুজুগ ছিল না, অথবা ডিটেকটিভ সাজার খেলা। তবু উত্তর দিতে অনেকটা সময় নিলাম। তনয়া নির্নিমেষে তাকিয়ে আমার দিকে। সে-দৃষ্টির অর্থ বোঝার সাধ্য আমার ছিল না। প্রত্যাশা, আকুলতা অথবা ব্যগ্রতা নয়, একমাত্র কাছাকাছি অর্থ হতে পারে, অপেক্ষা। তার জন্য এক-একটা মুহূর্তকে অনন্তকাল বানিয়ে তাদের ভেতর সে দাঁড়িয়ে থাকতে রাজি।
অনন্তকাল পরে আমি উত্তর দিলাম, ‘করব।’
.
.
