২৪
যাজ্ঞা কর, তোমাদিগকে দেওয়া যাইবে ; অন্বেষণ কর, পাইবে ; দ্বারে আঘাত কর, তোমাদের জন্য খুলিয়া দেওয়া যাইবে।
Matthew | 7:7
.
পরদিন সকাল বেলা আমি গেলাম জেনিফারের বাড়ি। বরাবরের মতো বারান্দায় বসে সিগারেট খাচ্ছিলেন। এই ক-বছরে যেন আরেকটু নুয়ে পড়েছেন। মাথাভরতি শণের মতো চুল ঝাঁকড়া হয়ে পাখির বাসা। বাড়িটাও জরাজীর্ণ লাগছে। ইট বেরিয়ে পড়েছে। স্থানেঅস্থানে বটের চারা। একটা তেঁতুলগাছ দেখেছিলাম গতবার, সেটা এত বড়ো হয়েছে যে, ছাতামাথা নিয়ে ঝেঁকে এসেছে বাড়ির ওপর। অন্ধকার হয়ে আছে প্রাঙ্গণ। জেনিফারের পাশে কিন্তু সেই একইরকম কমিক্সের বই রাখা। আমাকে দেখে ভুরু কোঁচকালেন। ভাব দেখে মনে হল, খুশি হননি। ‘তুমি আবার এসেছ?’
‘কেন? আসতে নেই? ‘
‘গেলবার যা কাণ্ড বাধালে! বারবারা দেখেছে তোমাকে? খুন-টুন করে বসেনি?” ‘ওদের বাড়িতেই আছি। এত তো খবর রাখেন, জানতেন না আমি এসেছি?’
একটা ছেঁড়া কমিক্স বই তুলে হাত বোলালেন জেনিফার। খিটখিট করে উঠলেন নিজের
মনে, ‘অন্যের ব্যাপারে আগ বাড়িয়ে জানতে যাবই-বা কেন? আর, ওদের যা ফ্যামিলি ! ‘ ‘আমার কয়েকটা প্রশ্ন ছিল আপনার কাছে। চাইলে উত্তর না-দিতে পারেন কিন্তু সেটা হয়তো উচিত হবে না ৷
‘এভাবে কথা বলছ যে?’ তেড়িয়া হয়ে উঠলেন জেনিফার। ‘কে তুমি কেষ্টবিষ্টু যে, তোমাকে জবাব দিতে যাব? নাকি, এবারেও ছোঁকছোঁক শুরু করেছ রহস্য রহস্য করে?’
শুরু থেকে আক্রমণে যাব বলে ঠিক করে এসেছি। জেনিফারের সামনে দাঁড়িয়ে কোমরে হাত দিলাম। মুখে আনলাম অভ্রংলেহী গাম্ভীর্য। জেনিফার সামান্য ঘাবড়ালেন মনে হয়। মুখ থেকে সিগারেট নামিয়ে বললেন, ‘এভাবে তাকিয়ে আছ কেন? হয়েছেটা কী?’
‘ক্রিস নিখোঁজ হবার আগে অন্তত দু-বার আপনি ব্রাউনদের বাড়ি গেছেন ক্রিসের হাতপা পরীক্ষা করে নিজের মনে বলেছেন ‘সব মিলে যাচ্ছে’। পুলিশ এতদিন জানত না। এখন জেনেছে। আমি পুলিশ ফাইল থেকে পেয়েছি তথ্যটা। কেন গিয়েছিলেন, সে-প্রশ্নের উত্তর আমাকে না-ই দিতে পারেন। সেক্ষেত্রে পুলিশ আসবে। কারণ, ক্রিসের ফাইল ওপেন হয়েছে আবার।’ নির্জলা মিথ্যে বলতে আমার কখনো গলা কাঁপেনি। তখন যেন অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস চলে আসে।
জেনিফার অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে ছিলেন। রাগে তাঁর বাক্যস্ফুর্তি হচ্ছিল না। ‘তো তো’ করে হোঁচট খেতে খেতে বললেন, ‘এত বড়ো সাহস তোমার? আমার বাড়ি এসে আমাকে হুমকি দাও! গেট আউট এখনই। আমি পুলিশকে জানাব—’
‘সে জানাতেই পারেন। আপনি বললেই আমি চলে যাব। কিন্তু আপনার ব্ল্যাক ম্যাজিক, ভূত নামানো, ঝাড়ফুঁক, এসবের সঙ্গে যদি শিশুবলি জুড়ে যায়, তাহলে কোথাকার জল কোথায় যাবে ভেবে দেখেছেন? এসব কেস কিন্তু তামাদি হয় না। এ আপনার লোকাল থানা নয় যে, ধমকে চমকে ধামাচাপা দেবেন। কেস এখন সিআইডি দেখছে। আমার সঙ্গে, ‘ ফোন দেখলাম, ‘আজ দুপুরেই মিটিং আছে ওদের। তাহলে আপনার কথা যখন উঠবে, আমি বলে দিই যা বলার?’
ফর্সা রং ফ্যাকাশে হলে সাদা নয়, পাণ্ডুর লাগে। জেনিফারের মুখ দেখে মনে হল করোটি। শুকনো ঠোঁটে জিভ বোলালে খড়খড়ে আওয়াজ দূর থেকে পাব। কয়েক সেকেন্ড আগের প্রতাপ নিমেষে অন্তর্হিত। কাঁপছেন মনে হল। বলার চেষ্টা করলেন, ‘এসব, আমাকে হ্যারাস করা—আমিও দেখে নেব।’
‘আচ্ছা, আসি। মিটিং-এ যেতে হবে তাড়াতাড়ি। আজ লোকাল মিডিয়াও আসবে শুনলাম। শিশুবলি, ব্ল্যাক ম্যাজিক, এসব ওরা ভালো খায় আজকাল। তেমন হলে অল ইন্ডিয়া নিউজও হয়ে যেতে পারে। তার ওপর পাস্ট ক্রাইম! এর যে কী কদর বেড়েছে আজকাল, আমরা যারা এই লাইনে আছি, তারা জানি।’ পিছু ফিরলাম।
‘শোনো, শোনো।’ মরিয়া ডাক ছাড়লেন জেনিফার। আকুল মুখে তাকালেন আমার দিকে, ‘প্লিজ, বসে যাও। কথা আছে।’
‘কী আর কথা!’ উদাসীন মুখে বললাম। ‘সেই তো বলবেন, আপনি নির্দোষ। সেসব পুলিশকেই বলবেন নাহয়। আমাকে যেতে হবে।’
‘দাঁড়াও।’ আমার হাত চেপে ধরলেন এবার। ছ্যাঁকা খাওয়া বেড়ালের মতো ভীত ভাব। ‘পুলিশ সত্যি আসবে নাকি?”
‘তাই তো জানি। অবশ্য, আপনি যদি কোঅপারেট করেন-
‘আমার সত্যি অন্য উদ্দেশ্য ছিল না। মরা স্বামীর দিব্যি কেটে বলছি। আমি গেছিলাম অন্য কারণে।’
জেনিফারের সামনের চেয়ারে বসলাম। ‘কী কারণ?’
আড়চোখে জুলজুলিয়ে আমার দিকে তাকালেন জেনিফার। কাঁধ ঝুলে গেছে। আরেকটু জড়োসড়ো হয়ে বসলেন। ‘মানে, লোকে বলত, আমি না, যে, বাচ্চাটা এডওয়ার্ডের ছিল না। আর্চির বাচ্চা। তাই কৌতূহল হয়েছিল। দেখতে গেছিলাম, হাত-পায়ের গড়ন, নাকের হাড়, জন্মদাগ—আর্চির সঙ্গে মেলে কি না। অন্য উদ্দেশ্য ছিল না, সত্যি!’ জেনিফার আবার আমার হাত ধরতে এলেন। কড়াচোখে তাকালাম। চুপসে গিয়ে মাথা নীচু করলেন।
, ‘সব মিলে যাচ্ছে—এরকম কিছু আপনি বলেছিলেন। এর মানে তাহলে ‘সত্যি সব মিলে গিয়েছিল।’ কেচ্ছার আতিশয্যে যেন আগ্রহ ফিরে পেলেন জেনিফার জ্বলজ্বলে চোখে সাতকাহন ব্যাখ্যা করতে গিয়ে আবার দেখলেন আমার কঠিন চোখ। ভিজেবেড়াল ফিরে এল।
‘সেটা আগাথাকে জানিয়েছিলেন। তাই তো?”
জেনিফারের মুখ দেখে মনে হল মাটিতে গর্ত করে ঢুকে যাবেন। মিনমিন করলেন, ‘আমি কেন বলতে যাব! অন্যের ব্যাপার বাবা—অনেকে জানিয়েছিল।’
‘বাজে কথা বলবেন না।’ ধমক দিলাম জোরে। ‘মিথ্যে বললেই পুলিশ আসবে। আপনি আগাথাকে বলেছেন, না, বলেননি?’
জেনিফার আমার চোখের দিকে তাকালেন না। ‘ঠিক মনে পড়ছে না। আমার কি বয়েস কম হল?
‘অ্যাগনেসের অনেক প্রেমিক ছিল, আপনিই রটিয়েছিলেন, না?’
এবার সত্যিকারের বিস্ময়ে মুখ তুললেন জেনিফার। ‘না তো! আমি কেন এটা বলতে যাব! সবাই জানত তো! কত লোক বলাবলি করত! ওই সুশান্তর কাছে কত কথা শুনেছি। যে ওদের ফুলের বাগানে কাজ করত। জিজ্ঞাসা করে দেখো না ।”
‘আর, অ্যাগনেসের পাগলামি?”
“ও মা! আমি বলতে যাব কেন? যেন কেউ জানত না! আমিই বরং অন্যদের মুখে শুনেছি। সুশান্ত বলেছে। মাইকেলের সঙ্গে অবশ্য এ নিয়ে কথা হয়নি। বারবারাকে জিজ্ঞাসা করো, ও জানবে। ডলোরেস তো সবার থেকে ভালো জানবে এগুলো। আমি বানাচ্ছি কি না, ওরাই বলবে তোমাকে। নাহলে রেভারেন্ডের মুখ খোলাতে পারো যদি, তিনিও বলবেন।’
‘ঠিক আছে, এলাম আজ।’ উঠে দাঁড়ালাম।
‘তুমি পুলিশের সঙ্গে কথা বলবে? কী বলবে ওদের?’ জেনিফার হাত কচলাচ্ছিলেন। ‘দেখি।’
‘আমি কিন্তু সব সত্যি বলছি। একটা ফালতু কারণে এ বয়েসে এসে বাড়িতে পুলিশ, লোকলজ্জা—ওহ্ ড্যাম!’ জেনিফার হতাশায় কমিক্স বই খিমচে ধরলেন। ‘তুমি কি বিশ্বাস করছ না?’
‘ভেবে দেখতে হবে। এমন কথা যদি থাকে যা চেপে গেলেন—’
“কিচ্ছু চাপিনি, যা জানি বলেছি।’ ব্যাকুল গলায় বললেন জেনিফার। ‘আচ্ছা, আমাকে কি স্টেটমেন্ট দিতে হবে? তাহলে সেটাও গিয়ে দিয়ে আসব নাহয়। কিন্তু, কেউ যেন না জানে, প্লিজ—’
এতকাল কেচ্ছাখামারি চাষের পর রিসিভিং এন্ডে দাঁড়িয়ে আছেন সম্ভবত প্রথমবারের জন্য। হাসি পেল, দুঃখও হল বুড়ির কথা ভেবে। ভেতরে ভেতরে এত ভঙ্গুর ভাবিনি। আরেকটু শক্তপোক্ত হলে, বা, মাথায় সামান্য বেশি বুদ্ধি থাকলেই আমার হুমকি কতটা অসার ধরতে পারতেন।
‘আপাতত যাচ্ছি। পুলিশকে বলব, যাতে এখনই আপনার কাছে না-আসে। পরে আসতেই পারে, চেষ্টা করব সেটা পিছোনোর। আমার হাতে যতটা আছে। তবে, আমার হয়ে আপনাকে একটা কাজ করতে হবে।’
‘আবার কী কাজ?’ জেনিফার ভীতচোখে তাকালেন।
‘যথাসময়ে জানাব।’ পেছনে না-তাকিয়ে সটান হেঁটে বেরিয়ে গেলাম। কয়েক দিন টেনশনে কাটাক, লাভ হবে। ভাবিনি এত সহজে ভেঙে যাবেন জেনিফার। রাগ হবার কথা, কিন্তু কোথাও কষ্টও হচ্ছিল। একা মানুষেরা এভাবেই কি নিজস্ব পৃথিবী বানিয়ে নেয়, যা রক্তাক্ত ও নিষ্ঠুর? পাশের একা মানুষটাকে আঘাত করবে জেনেও যে পৃথিবী নির্বিকার থাকে? জেনিফার জাগতিক বিচারে অপরাধ করেননি। সেজন্যই তাঁর অপরাধ নির্মম হয়েও এত করুণ।
আর্থার মরিসির কটেজের ওপর নুয়ে পড়েছে প্রাচীন অশ্বত্থ। পোড়া ইটের স্থাপত্যে শ্যাওলার কালচে সবুজ। বাড়ির একটা দিক পড়ে গেছে। প্রাচীন লতাপাতার সমারোহ অন্ধকার ঘনিয়ে এনেছে সেই স্তূপের ওপর। বাড়ির সামনে খোটায় বাঁধা গোরু চরছে। একপাশে সার সার দুধের জার। আমি একপাশে দাঁড়িয়ে রামপ্রসাদ পাসোয়ানের সঙ্গে কথা বলছিলাম। রামপ্রসাদের বয়েস আশির কাছাকাছি। একমুখ সাদা দাড়ি। জরাগ্রস্ত মুখে সন্দেহ প্রকট ছিল প্রথমে। কিছুক্ষণ সময় লেগেছে তাঁকে বিশ্বাস করাতে যে, এই কটেজের অধিগ্রহণ কে করল সে-বিষয়ে আমার আগ্রহ নেই। আমি রিয়েল এস্টেটের লোক নই, সেবিষয়ে নিশ্চিত হয়ে মুখ খুললেন রামপ্রসাদ।
‘সাহেব খিটখিটে ছিলেন। মেমসাহেব অনেকদিন আগে মরে গেছিলেন। তারপর থেকে একা হয়ে পড়েন। কাউকে বিশ্বাস করতেন না। আমাকে দেখতে পারতেন না, কারণ আমরা দেহাতি। ভাবতেন, একদিন সর্বস্ব চুরি করে পালাব। অথচ, বিপদ-আপদে আমিই ছিলাম সাহেবের অন্ধের যষ্টি। শেষের দিকে অবস্থা পড়ে গিয়েছিল। ব্যাঙ্কের সুদের টাকায় চলত না। সাহেব তখন কটেজ বিক্রি করে দেবার কথা ভাবছিলেন। তার আগে নিজেই চলে গেলেন।’ ভেবে ভেবে বলছিলেন, যেন স্মৃতি থেকে খুঁড়ে আনতে হচ্ছিল।
‘ব্রাউন পরিবার, মানে ডেভিড ব্রাউন, এঁদের সঙ্গে সাহেবের যোগাযোগ ছিল?’
“তা, সেরকম যোগাযোগ তো সবার সঙ্গেই ছিল। ছোটো টাউনে যা হয়। আলাদা করে কিছু—’ মাথা নাড়লেন রামপ্রসাদ।
‘আর ও’ব্রায়েন পরিবার? অ্যাগনেস? আপনার মনে পড়ে? একটা মেয়ে হারিয়ে গিয়েছিল, যার ভূতকে দেখা যেত? ওদের সঙ্গে সাহেবের যোগাযোগ ছিল?’
‘ওই চোখের কম্পাউন্ডার যে সাহেব? ওরা ক্যাথলিক ছিল। সাহেব ক্যাথলিকদের পছন্দ করতেন না। এই টাউনে ক্যাথলিক মাত্র কয়েক ঘরই ছিল। সাহেব বলতেন, কোনো অনুষ্ঠানে ওদের ডাকা উচিত না।’
‘অ্যাগনেসের সঙ্গে চেনাজানা ছিল না?’
‘ওই যে মেয়েটা হারিয়ে গেল? নাহ্, আলাদা করে কী আর—তবে সাহেব একবার বলেছিলেন মেয়েটা ভালো নয়। এখানে-ওখানে ঘোরে। বদ ছেলেদের সঙ্গে মেশে। নির্ঘাত লাভারের সঙ্গে পালিয়েছে।’
আর কিছুর সন্ধান পাওয়া যাবে না বুঝছিলাম। রামপ্রসাদের স্মৃতিও ঝাপসা। তার ওপর বারে বারে জিজ্ঞাসা করছিলেন, তাঁদের কিছু হবে না তো? কেউ তাঁদের উৎখাত যেন না করে। কুড়ি বছর এখানে থাকার পর মালিকানা বৃত্তিৰয়ে গেছে, শুনিয়ে দিলেন কয়েক বার। বাড়ি থেকে এক প্রৌঢ়া বেরিয়ে এলেন। আঁচল টেনে ঠোঁটের কাছে ধরা। মুখে অবিশ্বাস আর সন্দেহ মাখামাখি। আমার দিকে বিদ্বেষপূর্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রামপ্রসাদকে তাড়া লাগালেন, খাবার জুড়িয়ে যাচ্ছে। ফিরে আসার সময়ে প্রশ্ন করলাম, রেভারেন্ড গরম্যানের সঙ্গে আর্থার মরিসির যোগাযোগ ছিল কি না।
‘রেভারেন্ড বার কয়েক এ বাড়ি এসেছেন। কিন্তু, সাহেবের সঙ্গে তাঁর মনোমালিন্য হয়েছিল। চার্চের মেলায় নেটিবদের স্টল দেওয়া নিয়ে আপত্তি ছিল সাহেবের। রেভারেন্ড স্পষ্ট জানিয়ে দেন, এই নিয়মের বদল হবে না। সাহেব খেপে গিয়ে চার্চকে টাকা দেওয়া বন্ধ করে দেন। তখন থেকে বেথেল মিশনের বদলে সেন্ট জন’স-এ যেতেন।’
‘সাহেবের কোনো আত্মীয়স্বজন বেঁচে আছেন, যার কাছে যাওয়া যায়?’
‘কেউ নেই। সাহেব কারোর সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন না। এক মা মরা ভাগনে মাঝে মাঝে আসত। তাকেও দুর দুর করে তাড়িয়েছিলেন। সাহেবের ভয় ছিল, আশপাশের সবাই তাঁকে বিষ খাইয়ে মেরে ফেলার চক্রান্ত করছে, যাতে তাঁর টাকাপয়সা গাপ করা যায়।’
রোদ বাড়ছে চড়চড়িয়ে। একটা চায়ের দোকানে বসলাম। এখানে দোকানগুলোয় কফি মেলে, এই একটা বাঁচোয়া। ভেতরে ডালের বড়া ভাজা হচ্ছে, রসগড়ানো চিটচিটে মিষ্টান্ন। গরিব মানুষের ভিড়। তারা চায়ের সঙ্গে ডালবড়া চারটে পাঁচটা করে উড়িয়ে দিচ্ছে। এরপর ডলোরেসের সঙ্গে দেখা করব, বিকেলে অবিনাশ যাদব। তিতকুটে কালো কফিতে চুমুক দিয়ে মুখ বিকৃত করলাম। গত কয়েক রাত ভালো ঘুম হয়নি। এখানে আসার পর থেকে বারে বারে ঘুম ভেঙেছে। চোখ চলে গেছে জলাভূমির দিকে। ভোর হবার আগেই অজস্র কাকের ডাক। জলাভূমি ঘিরে তাদের পাক খাওয়া। তাদের ডানা ঝাপটানোর শব্দে মনে হয়েছে, কেউ যেন সারাজীবনের জন্য ওখানে দাঁড়িয়ে আছে। তার মুখ আমি দেখতে পাই না, ছায়ার মতো সরে যায়। তারপর আমি চোখ বুজলে একলাফে পেরিয়ে আসে মাঠ। আমার জানালার শিকে গাল ঠেকিয়ে দাঁড়ায়। কাল যেটুকু ভাঙা ঘুম তার মধ্যে আমি মুন্নার স্বপ্ন দেখেছি। দেখেছি তার একজোড়া পা ছুটে যাচ্ছে মাঠের ওপর দিয়ে। অ্যাগনেস তাকে হাত নেড়ে ডাকছে, কিন্তু ফিরে তাকাচ্ছে না মুন্না। এই গল্পে মুন্না গুরুত্বপূর্ণ নয়, তবু আমাকে কেন সে ভাবাচ্ছে? ব্যর্থ প্রেমের অভিঘাত কি তাহলে আমাদের মনে এতটাই তীব্র? অথবা, অপমানের ইতিবৃত্ত—আজ পবন কুমার যেটাই হোক না কেন, তাকে ভাবতে গেলে অপমানিত মানুষের মুখ বাদে কিছু মনে আসছে না আমার।
.
মনে পড়ল, ১৯৮৬-র জানুয়ারিতে অ্যাগনেস ওর ডায়েরিতে লিখেছিল— এই হেতু খ্রীষ্টের নিমিত্ত নানা দুর্বলতা, অপমান, অনটন, তাড়না, সঙ্কট ঘটিলে আমি প্রীত হই, কেননা যখন আমি দুর্বল, তখনই বলবান। কেন আমি সেরে উঠব? কেন সুস্থ? এত—অপমান! চারদিকে। আমার কি ভয় পাবার অধিকার নেই? অন্যের ক্রুশ বইতে হয় যদি, তাহলে কেন পাগলের মত কাঁদব না, চিৎকার করে ফাটিয়ে দেব না আকাশ বাতাস? জলের উৎস তেতো হলে প্রস্রবণ তেতো হয়। আমি সেখানে মিষ্টি থাকতে পারব না, না, না। আমি সুস্থ থাকতে চাই না। কারণ ডল যদি ছেলে হত, তাহলে ওকে আশ্রয় দেবার জন্য কোনও তালমাই এই পৃথিবীতে থাকত না।
প্রথম বাক্যটা বাইবেলের, তারপরের অসংলগ্ন কথাগুলো অ্যাগনেসের নিজের। ডল যদি ছেলে হত— মানে কী? …no Talmai would be present to give shelter… এটার অর্থও বুঝিনি। যেটুকু ছুঁতে পেরেছি, তা অ্যাগনেসের ক্ষতবিক্ষত হৃদয়। ‘এত—অপমান’, পড়তে গিয়ে আমার বুকের রক্ত জমে গিয়েছিল। কে অপমান করেছিল ওকে? কেউ কি করেছিল? অ্যাগনেস সুস্থতা চাইত না। অস্বাভাবিকতা যেন ওর নিয়তি। নিয়তি—অপমান। অ্যাগনেস যদি এখন আমার সামনে থাকত, এখনও যদি ওর বয়েস হত সতেরো, আমি চুপি চুপি গিয়ে ওর কানে কানে বলতাম, ‘এক্ষুনি যেদিকে চোখ যায় পালিয়ে যাও।’
হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজের টিং শব্দে খুললাম। অক্ষয় মাহাতো মেসেজ করেছেন। অ্যাগনেসের ডায়েরি এবং তার চিঠি একই মানুষের লেখা। তার মানে ডায়েরি ভুয়ো নয়। এটা যাচাই করে নেওয়া জরুরি ছিল।
সিগারেট ধরিয়ে অ্যারনকে ফোন করলাম। দু-বার রিং হবার পর ফোন তুলে অ্যারন বলল, ‘তুমি এসেছ খবর পেয়ে ডলোরেস দেখা করতে এসেছিলেন। তোমাকে ফোন করেছিলাম কিন্তু টাওয়ার লাগল না। একটু আগে চলে গেলেন। বললেন আজ একটা কাজে গঞ্জের বাইরে যেতে হচ্ছে, কাল তুমি থাকলে সময় বার করে দেখা করবেন।’
‘যাক, আজ তাহলে ওঁর বাড়ি যাচ্ছি না। আচ্ছা অ্যারন, একটা ধাঁধার উত্তর দাও তো। What has 4 letters, sometimes has 9 letters, but never has 5 letters.’ কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে অ্যারন বলল, ‘এর মানে কী?’
‘পারলে না তো?’
‘স্কুলবেলার জামাইঠকানো ধাঁধা। না-পারার কিছু নেই। What শব্দটায় চারটে অক্ষর, sometimes-এ ন-টা, এরকম। তুমি ধাঁধার পেছনে পড়লে যে?’
‘এই ধাঁধার সমাধান কীভাবে আমরা করি জানো? একদম আক্ষরিকভাবে যদি টেক্সটটাকে পড়া হয়, তাহলে সমাধান বেরিয়ে আসে। কিন্তু, আমরা সমস্ত মেটাফর বাদ দিয়ে একটা টেক্সটকে পড়ায় অভ্যস্ত নই। তাই what-কে চারটে অক্ষরের সমষ্টি ভাবি না, বরং what শুনলে বাক্যের শেষে জিজ্ঞাসা চিহ্ন কল্পনা করি। তেমনভাবেই, never-কে একটা কর্তা না-ভেবে, নিদেনপক্ষে স্বয়ং একটা শব্দ, তার আলাদা কর্তা কল্পনা করি। করি, কারণ এভাবে আমরা টেক্সট ভাবতে অভ্যস্ত। সেটা জরুরিও বটে, কিন্তু এই কন্ডিশনিং কখনো কখনো বিপজ্জনক ভুল রাস্তায় চালনা করে আমাদের। কারণ, আমাদের ভাবনায় what বা never স্বয়ংসম্পূর্ণ শব্দ নয়, বরং চিহ্ন। জিজ্ঞাসাচিহ্ন বা নেতিবাচক চিহ্নের পরিপূরক।’
‘তুমি এখন আমাকে সেমিওটিক্সের জ্ঞান দেবার জন্য ফোন করলে?’
‘নাহ্। র্যান্ট করবার জন্য। আমরা অনেক বছর ধরে ভুল রাস্তায় হেঁটেছি অ্যারন। কী চূড়ান্ত ভুল ছিলাম আমরা—কারণ আমরা অর্থের পেছনে না-ছুটে চিহ্নের পেছনে ছুটেছিলাম। আমি তো বটেই।’
.
‘ঠিক রাস্তা পেয়েছ?’
‘একটা জিগ-স পাজল। তার কোনা ধরে মেলাবার চেষ্টা করছি। কখনো এককোণ, কখনো-বা উলটোদিকের বাউন্ডারি। ছবিটা অসম্পূর্ণ এখনও, কারণ আলাদা করে খণ্ডগুলো মেলাতে অনেক সময় লাগছে। কিন্তু, আমি গ্রেট ওয়াল অফ চায়না যেভাবে বানানো হয়েছিল, সেই নীতিতে ভরসা রাখছি। কাফকার সেই গল্পটা পড়েছ?’
—ছন আগ্রাসন থেকে বাঁচার জন্য দেওয়াল তুলতে হত। কিন্তু ভয় ছিল, হুনদের চোখে পড়ে যাবে। তাই সারাদেশ জুড়ে বিভিন্ন জায়গায় খাপছাড়াভাবে দেওয়াল উঠেছিল। শেষমেষ সেই আলাদা আলাদা খণ্ডগুলোকে জোড়া দেওয়া। হুনরা বোঝেইনি কীভাবে দেখতে দেখতে তাদের চোখের ওপর জলজ্যান্ত একটা দেওয়াল উঠে গিয়েছিল। তোমার বক্তব্য কী?’
‘কীভাবে গোটা গল্পটা আমার চোখের সামনে দেওয়াল হয়ে দাঁড়িয়ে যাবে, হয়তো নিজেই বুঝব না। আপাতত এদিক-ওদিক মেরামতির চেষ্টায় আছি।’
‘গল্প! সেটা সত্যি কি না বুঝবে কী করে?’
‘বোঝাবে তো অন্যেরা, যারা পুরোটা জানে।’
‘তার মানে,’ অ্যারন থেমে থেমে বলল, ‘অপরাধ ঘটেছিল এবং অপরাধী বর্তমান। অন্তত তোমার মতে।’
‘অথবা, একাধিক অপরাধ, একাধিক অপরাধী। এখনও জানি না। বললাম না, পুরো ছবিটা পাইনি, অনেক গ্যাপ আছে এদিক-ওদিক। বাড়ি আসি। তোমার সঙ্গে বসে পুরোটা আবার ওয়াকথ্রু করব।’
‘তাহলে জানতে চাই তোমার অনুমান।’
‘এখন নয়। আমাকেও আগে শিয়োর হতে হবে। এখানে আসার আগে ভাসা ভাসা কিছু অনুমান ছিল। গত তিন বছরে হাইপোথিসিস হিসেবেই বানিয়েছিলাম। ভ্যালিডেট করার উপায় ছিল না। এখন তাদের কয়েকটার সপক্ষে প্রমাণ পেয়েছি। সেগুলোর দড়ি ধরে টান মারলে অন্য রহস্যগুলোর স্বরূপও উন্মোচিত হবে, সেটুকু ভরসা আছে। কিন্তু, টানটা সঠিকভাবে মারতে হবে। রাজা নাহলে খান খান হবে না । ’
‘রাজা?’
‘ছাড়ো। তুমি অ্যাংলো ব্র্যাট, এসব বুঝবে না।
‘আরে না, অন্য একটা কথা মনে পড়ল। আমার পিতামহকে স্থানীয় অনেকে রাজাবাবু বলে ডাকত। তেমন ঠাটবাট ছিল, আর চেহারাটাও—মনে হল, তুমি দড়ি ধরে টান মারার তিরিশ বছর আগেই রাজাবাবু খান খান হয়ে গেছেন।’
কয়েক মুহূর্তের জন্য স্থবির লাগল নিজেকে। মনে হল, নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসবে। অবিশ্বাসের চোখে শূন্যে তাকিয়ে ছিলাম। বোধ ছিল না চারপাশে কী ঘটছে। সাড়া না-পেয়ে অ্যারন দু-বার ‘হ্যালো’ করল। আমি অবসন্ন গলায় বললাম, “থ্যাঙ্ক ইউ।’
‘কীসের জন্য? আর ইউ ওকে?’
‘একদম ঠিক আছি, অ্যারন। শুধু মনে হচ্ছে, একটার পর একটা দরজা আমার সামনে খুলে যাচ্ছে।’
‘কী দরজা খুলল এখন? তনয়া? কিছু কি হয়েছে?’
‘রাখছি অ্যারন, বাড়ি আসছি।’
.
