নৈশ অপেরা – ৪

তোমাদের কেমন বোধ হয়? কোন ব্যক্তির যদি এক শত মেষ থাকে, আর তাহাদের মধ্যে একটী হারাইয়া যায়, তবে সে কি অন্য নিরানব্বইটা ছাড়িয়া পর্বতে গিয়া ঐ হারান মেষটীর অন্বেষণ করে না?

– Matthew | 18:12

.

সেদিন রাত্রে অতিথিরা বিদায় নিলে আমি পোড়ো মাঠের দিকে মুখ রেখে জেগে ছিলাম অনেকটা সময়। আমার হাতে ধরা ছিল একটা বাইবেল। শীতের রাত্রে জমাট মেঘ অবসাদের মতো ঘনিয়ে এসেছিল। মশাদের কোরাস বাড়িটাকে নিঃসঙ্গতায় ফাঁপিয়ে তুলছিল। কে দাঁড়িয়ে ছিল জলাভূমির ওপাশে? হাওয়ার গুঞ্জন বাদে অন্য কিছু কানে আসেনি। এখানে আসার পর থেকে রোদের তাপ কমে গিয়েছিল। শান্ত গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টির ফিসফিস আমার চারপাশ ভরিয়ে তুলেছিল অবোধ্য গুঞ্জনে। তাদের আমি কান পেতে শুনতে চেয়েছিলাম। সত্যিই কি আমি এগোব? আমার কী লাভ এতে? আমি তো গোয়েন্দা নই। এসেছি নিছক ঘুরতে। একটা অ্যাবসার্ড রহস্য, অবিনাশ যাদব যেমন বলে গেলেন, আমাদের অস্তিত্বের প্রতিটা পূর্বশর্তকে যা হা-হা স্বরে উড়িয়ে দেয়, তার পেছনে ছুটে কী লাভ? কেন আমরা সবাই ইতিহাসে বাঁচব? সময়, যে যতই বলুক, কোনো চ্যাপটা বৃত্ত নয় যার ভেতর ঘুরে ঘুরে আমাদের সেই কাজ, একই কাজ এবং আবার ও বার বার একই কাজ করে যেতে হবে। ক্রিস ব্রাউন হারিয়ে গিয়েছে চিরতরে। তার রহস্যের সমাধান হয়নি। ফলত, এতদিন পরে কেন নাড়াঘাঁটা করব তাকে? আমি একজন পোড়খাওয়া ইনভেস্টিগেটিভ সাংবাদিক। আমার কী এসে যায় বহু বছর আগের এক ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নিয়ে? হাতে ধরা বাইবেলের পাতা উলটিয়ে আমার চোখে তখন ঘুম ঝাঁপিয়ে নেমেছিল। দেখেছিলাম, আমি শুয়ে আছি নিজের সল্টলেকের বাড়ির সোফায়। অকেজো একটা ফ্রিজ আমার মাথার পেছনে বসানো। তার ভেতর থেকে ফিসফিস ভেসে আসছিল। ফ্রিজের পেছন থেকে শুরু হয়েছে একটা জঙ্গল, যার পেটের ভেতর গোলকধাঁধা। আমার মাথার কাছে পায়ের শব্দ। তবু কাউকে আমি দেখতে পাচ্ছিলাম না। চাপাস্বরে আনাগোনা করছিল। শোক। ক্রমে দুর্ভেদ্য কুয়াশায় ঢেকে গেল জলা ও জঙ্গল। মুখ ফিরিয়ে দেখলাম, জঙ্গলে ঢাকা আমাদের ঘর দরজাবন্ধ। সোফা থেকে উঠে ঘরের দিকে আমি হেঁটে যাচ্ছি। ধুলো জমা টেবিল পেরিয়ে, দেওয়ালের ছবিতে শুকনো ফুলের মালা অতিক্রম করে, বেডরুমের বন্ধ দরজায় ধাক্কা মারছি। কান পেতে শুনছি ভেতরের নৈঃশব্দ্য তীব্র চিৎকারে দীর্ণ হচ্ছে। আমি তখন দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকছি। বিছানায় শুয়ে এক কিশোরী। অন্ধকার ঘর হলেও তার চোখে রোদচশমা, পরনে ফুলছাপ ড্রেস। কিন্তু, তার গলায় ফাঁস। যেন ঘাড়ভাঙা পুতুল। আমি হাত বাড়িয়ে তাকে ধরতে যাচ্ছি আর দেখছি আমার গায়ে উঠে এসেছে ফুলস্লিভ সোয়েটার, তার হাতায় সাদা ময়ূরের ডিজাইন। তবু তাকে ছুঁতে পারছি না আমি।

যখন ভোরের আলো গাছের পাতা বেয়ে চুঁইয়ে পড়ল এবং অরণ্যের অপর প্রান্ত থেকে জেদি মোরগের কঁক ধ্বনি ভেসে এল ; তখন আমি চোখ মেললাম। আমার মনে হল’রাত্রির কাফন সরিয়ে আমি শেষবারের মতো পৃথিবীকে দেখব যদিও তা অসম্ভব, কারণ অনেক আগে ওরা আমাকে মেরে ফেলেছে, মনে হল আমার। আমি বুঝলাম, বারবারা না-ডাকলে ও গতকাল আমি সন্ধেবেলা নীচে যেতাম। কারণ, একটা অমীমাংসিত গল্পকে শেষ করার দায় থেকে আপাতত আমার মুক্তি নেই।

.

বারবারা যখন আমাকে ডাকতে এসেছিল তখন ছায়ার সুতোরা বারান্দার বাল্ব থেকে গড়িয়ে নামা চিলকে আলোর সঙ্গে জট পাকিয়ে থমথমে বিভ্রম গড়ে তুলেছে। একতলায় বারবারার বন্ধুরা এসেছে। বারবারা চেয়েছিল আমি যেন সেই আড্ডায় যোগ দিই। এই শহরে বারবারার বন্ধু বলে কেউ আছে, সেটাই জানতাম না। মোবাইলে দেখলাম সাড়ে আটটা। বৃষ্টি থেমেছে। মাঝে মাঝে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। ঝপ করে তাপমাত্রা নেমে গেছে অনেকটা। দোনোমনো করলাম, কারণ চিনি না কাউকে। তারপর হাতে কাজ ছিল না বলে রাজি হয়ে গেলাম।

এর আগে বারবারার ড্রয়িং রুম দেখিনি, কারণ সেটা ছিল বাড়ির যে অংশ ভাঙা হচ্ছে তার একপাশে। সেদিকে দরকার না-পড়লে কেউ যায় না। আজ সেখানে অন্যেরা বসে ছিল। সেখানে মরা বাল্বের হলুদ আলোয় আমি এক প্রাগৈতিহাসিক শহর আবিষ্কারের মতো দেখলাম— বিরাট হল ঘরে অনাদরে উলটে রাখা সোফাদের দল, এখানে-ওখানে ইতস্তত চেয়ার, বাহারি মোমদানিতে মাকড়সার ঝুল, দেওয়ালের গায়ে ড্যাম্পের রাক্ষুসে মুখোশ। একপাশে ঘেঁষাঘেঁষি চেয়ারে কয়েক জন বয়স্ক মানুষ বসে। হল ঘরের ওপাশে ফ্রেঞ্চ উইন্ডো, যা খুলেছে সামনের বাগানের দিকে। তার কাচ ফুটিফাটা। হল ঘরের পেছনদিকে পরিত্যক্ত কিচেনের সামনে আমরা বসে ছিলাম। ঘরের বাকি অংশে গাদাগাদি করে রাখা প্যাকিং বাক্সের দল। কিচেনের অপরপ্রান্তে আরেকটা খোলা দরজা। পরে অবশ্য বুঝেছি, সে-দরজা বন্ধ করা যায় না, কারণ পাল্লার কবাট ভেঙে একপাশে ঝুলছে। সেদিক দিয়ে চোখে পড়ে জলাভূমি। ঠান্ডা হাওয়া ঢুকছে বলে আমার শীত করছিল। কার্ডিগানের ওপর চাদর টেনে নিলাম। উপস্থিত লোকেদের অবশ্য ভ্রূক্ষেপ নেই। তারা এই আবহাওয়ায় অভ্যস্ত। তাদের কোথাও যাবার নেই সম্ভবত। এখানে এসেছে কারণ ব্রাউনদের বাড়ি থেকে আজ টেনে বার করা হয়েছে পুরোনো স্মৃতিদের দল। তাই অতীতভারাক্রান্ত বুড়োরা ফেলে-আসা দিনের অবশেষ দেখতে এসেছিল। ঘরময় ছড়িয়ে থাকা প্যাকিং বাক্সগুলোতে রাখা প্রাচীন সামগ্রীদের দেখে তারা দীর্ঘশ্বাস ফেললেও আমাকে জানায়নি। এডওয়ার্ড ঘাড় গুঁজে চুপচাপ বসে ছিলেন। আমাকে দেখে শুকনো হাসলেন এবং আবার তাঁর ফোনে ‘চিকনি চামেলি’ বেজে উঠল। আমার মুখ দেখে এডওয়ার্ড বুঝেছেন। অপ্রস্তুত গলায় তাঁর স্ত্রী মনীষাকে বললেন, ‘টোনটা বিরক্তিকর। পালটে দিচ্ছ না কেন বলো তো? আগেও বলেছি।’

‘কবে বললে!’ অবাক গলায় মনীষা জিজ্ঞাসা করলেন, তারপর তাড়াতাড়ি বলে উঠলেন, ‘হ্যাঁ হ্যাঁ, খেয়াল নেই আমার।’

মনীষাকে সেই প্রথম দেখলাম। তাঁরা রাঁচিতে থাকেন, কিন্তু এখানে এসে স্যাংচুয়ারিতে ওঠেননি। এডওয়ার্ড নাকি এখানে থাকতে চান না। মনীষার এক তুতোভাইয়ের কটেজে উঠেছেন। মনীষা তাঁর স্বামীর উচ্চতায় সঙ্গত রেখে লম্বা, তবে ভারী চেহারার। ইতিমধ্যে ডাবল চিন ধরা দিয়েছে। তাঁর চেহারায় খাঁটি ভারতীয় ছাপ এডওয়ার্ডের অ্যাংলো কাঠামোর বিপ্রতীপ। চোখের কোনায় কালিকে কেন লুকোলেন না, নাকি দেখাতেই চেয়েছেন, বুঝে পেলাম না।

চোরাচোখে হুইস্কির বোতল দেখছেন, তারপরে তাকাচ্ছেন স্বামীর দিকে। কখনো অস্বাভাবিক হেসেও উঠছেন, চুপচাপ হয়ে যাচ্ছেন পরক্ষণে, ভাবনায় নিমীলিত চোখ সেইসময়ে কেউ যদি কিছু প্রশ্ন করে তাঁকে, উত্তরে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকেন মনীষা। তাঁর ঠোঁট কাঁপে, কিন্তু মুখে উত্তর আসে না। তারপর আবার হেসে ফেলেন বোকার মতো । এডওয়ার্ডকে দেখলাম স্ত্রী-র দিকে বার দুয়েক বিরক্ত চোখে তাকাবার পর বারবারার সঙ্গে বাড়ির দলিল সংক্রান্ত আলোচনা চালাচ্ছেন।

হঠাৎ খচমচ শব্দে চমকে চোখ ফিরিয়ে দেখি, হল ঘরের একপ্রান্তের অন্ধকারে জ্বলজ্বলে চোখ। ছাগলের চোখ যে রাত্রে এরকম জ্বলে, কে জানত! লালুরাম ডাই করে রাখা প্যাকিং বাক্সের ভেতর ঘুরে বেড়াচ্ছে আর মাঝে মাঝে চিবিয়ে দেখছে স্বাদযোগ্য কিছু মেলে কি না। সারাঘরে ইতস্তত আলো-ছায়া, বাল্বের বিভা সেই পর্যন্ত যাচ্ছে না, স্তূপীকৃত বাক্স সেই অন্ধকারকে ঘনীভূত করেছে। তাদের ভেতর গুপ্তধন আবিষ্কারের আশায় ঘুরে বেড়াচ্ছে হেমন্তরাত্রির ছাগল জানালার পর্দা ধরে চিবোচ্ছে, পটি ফেলছে এখানে-ওখানে। দেখে আমার অস্বস্তি লাগছিল। ছাগলটা কি এখানেই থাকে? আজ বাক্সগুলো রাখা হয়েছে বলে নিজের জায়গা খুঁজে যাচ্ছে হয়তো! দিনের বরাদ্দ সিগারেট খাবার অছিলায় পেছনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে মাঠের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। এখানে রাত্রির রং বেগুনি। বেগুনি জলায় পড়ে থাকা চাঁদকে পা দিয়ে মাড়ালে ভেজা ঘাসের গন্ধ ধেয়ে আসে। ভেতরে টুকটাক গল্প করছে বাকিরা, কিন্তু সেগুলো দানা বাঁধছে না যেন। এই লোকগুলোকে চিনি না। এদের গল্পগুলোও আনইন্টারেস্টিং। এদিকে বারবারা ডেকে এনেছে যেহেতু, এখনই নিজের ঘরে ফিরে যাওয়া অভদ্রতা হবে। ভালো লাগছিল না, মাঠের দিকে এগিয়ে গেলাম কয়েক পা। তখন আমার কানের কাছে মৃদুস্বরে কেউ বলল, ‘আপনিও কি এখানে ভূত দেখার আশা করছেন নাকি?’

ঘাড় ঘুরিয়ে দেখি, অন্ধকারের ভেতর দাঁড়িয়ে সাতাশ-আটাশ বছরের এক তরুণ। লম্বা একহারা চেহারা। ব্যাকব্রাশ করা চুল, ছোটো কিন্তু তীক্ষ্ণ চোখ, মোটা নাক, পুরু ঠোঁট। চিবুকের ঘন ডৌল দেখে মনে হয়, গাঁট্টাগোট্টা হলে মুষ্টিযোদ্ধা হতে পারত। না-বললেও মনীষার সন্তান হিসেবে অ্যারনকে চিনে নেওয়া যায়। সে এককোনায় দাঁড়িয়ে সিগারেট খাচ্ছিল। তাকে আমি জিজ্ঞাসা করলাম এই হল ঘরটাই লালুরামের ঘর কিনা। অ্যারন বলল লালুরাম যেদিন যেখানে ইচ্ছে হয়, রান্নাঘর হোক বা হল ঘর অথবা বারবারার বিছানা, শুয়ে পড়ে। টুকটাক কথায় জানলাম সে দিল্লিতে এমবিএ পড়েছিল। আমি দিল্লিতে থাকি শুনে চোখ তুলল, তারপর প্রশ্ন করল, ‘নিশ্চয় এই কয়েক দিনে শুনে ফেলেছেন আমরা কার্সড? আমাদের এই বাড়ি?’

‘তাতে আমার কী! আমি তো কয়েক দিনের জন্য থাকতে এসেছি মাত্র।’

‘স্থানীয় মানুষদের অনেকেই আমাদের এড়িয়ে চলে। আমরাও অবশ্য মিশিনি কোনোদিন। অ্যাংলো রক্তের অহংকার বলতে পারেন।’ অ্যারন ফিকে হাসল। আমি তাকে জানালাম বারবারা আমাকে ক্রিসের গল্প বলবে বলেছে। অ্যারন ঘাড় নাড়ল, ‘শুনবেন না। নিজের হতাশা বাড়বে। মনে হবে এই তো সমাধান সামনেই, এদিকে করতে পারবেন না। পিসি অনেককেই বলেছে এই গল্প। কলেজে পড়ার সময় আমার বন্ধুদের মাঝে মাঝে রাঁচি থেকে এনে এখানে তুলতাম, যদিও বাবা পছন্দ করত না। লুকিয়ে আসতাম। কেউ কেউ উৎসাহ দেখিয়ে শার্লক হোমস সাজতে গিয়েছিল। দু-দিন বাদে তারা বুঝেছে হালের তুলনায় পানি অনেক গভীর। তারপর বিরক্ত হয়ে, নাহলে হতাশায়, আমার সঙ্গেই আর সম্পর্ক রাখেনি। বলেছে আমরা সবাই নাকি এত ডিপ্রেসিভ যে, সেটা ছোঁয়াচে রোগের মতো।’ কিন্তু, অ্যারনের স্বরে তিক্ততা ছিল না। স্মিতমুখে বলছিল।

‘আপনার ইচ্ছে হয়নি কখনো?’ অ্যারন উত্তরে জানাল সে এদের হাড়ে-মজ্জায় চেনে। বেশি চিনলে কি নৈর্ব্যক্তিক দৃষ্টি ব্যাহত হয়?

‘উঁহু। আমি মানুষের আত্মার কথা বলছি।’

‘আত্মা?’

“মিস ভট্টাচার্য, ওই একটা ঘটনা, যেটা আমাদের পরিবারকে তছনছ করে দিয়েছে বলে সবাই মনে করে, কেন করেছে? কারণ, তারা তছনছ হতে চেয়েছে। তারা এগোতে চায়নি, বরং চেয়েছে সেই রহস্যকে বুকে জড়িয়ে একজায়গায় গেঁড়ে থাকতে। আপনার কি মনে হয় এরা সত্যিই চাইবে এক মধুর সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠে ক্রিস ব্রাউনের অন্তর্ধান রহস্যের সমাধান হয়ে গেছে, সেটা দেখতে? তাহলে এদের জীবনে রহস্যের সার্থকতা কোথায়? এতটা বলে হিপফ্লাস্ক থেকে কিছুটা মদ গলায় ঢালল অ্যারন। ঠোঁট মুছে বলল, “আপনার ধারণা এরা অভিশপ্ত বাড়ি নিয়ে মরমে মরে আছে? বরং, এই ট্যাগলাইন আমার পিসির জীবনের সর্বস্ব। গর্বের মতো সেটাকে গলার লকেট করে ঘুরে বেড়ায়।’

.

‘তাহলে সবাইকে রহস্য সমাধানের জন্য পীড়াপীড়ি করে কেন?’ বিরক্ত লাগছিল অচেনা মানুষকে এতটা জ্ঞান দেওয়া। কে রে ভাই তুই, মানুষের জীবনরহস্য নিয়ে লেকচার মারছিস?

‘কারণ জানে, কেউ পারবে না। পারলে পুলিশ পেরে যেত। এই যে, কেউ পারবে না, এটা দেখানোতেই ওদের সুখ। মালিকানা বলে না? আত্মার মালিকানা হয়, তেমন গল্পেরও মালিকানা হয়।’

ভালো করে অ্যারনকে দেখলাম। চোখের নীচে একটা কাটা দাগ। মোটা ঠোঁটজোড়া একে অন্যের ওপর চেপে বসলে ভয়ংকর গম্ভীর লাগে। সে তাহলে এই আড্ডায় এসেছে কেন? বাবার হুকুম, নাকি, কিছু করার নেই বলে? অ্যারন মাথা নাড়ল, ‘আমি সব কিছুর সাক্ষী থাকতে চাই। সেটাই আমাদের একমাত্র কাজ। বেয়ারিং টেস্টিমনি।’

‘মানে, ক্যাথলিক সেন্সে?’

‘আমি ক্রিশ্চান নই ।

“তাহলে?” সে উত্তর দিল না, যেন অনেকটা বলার পর কথা ফুরিয়ে গেছে। বেয়াড়া ইচ্ছে হল আমার, অ্যারনের কানের গোড়ায় দুটো থাবড়া মারি। একে অচেনা লোকেদের মাঝে বসে থাকতে হচ্ছে যাদের কেউ কেউ হয়তো পাগল, বারবারা তো বটেই। তার ওপর আধসেদ্ধ দার্শনিক কথাবার্তা একটা বাচ্চাছেলের মুখে শুনে মেজাজ আরও খাট্টা লাগছে। আজকালকার দিনে কে হিপফ্লাস্ক থেকে মদ খায়? সবথেকে ভালো হত কলকাতা চলে গেলে। অ্যারন ফ্লাস্কে চুমুক দিয়ে ফোন দেখছিল। বেশিক্ষণ এখানে থাকলে ঠান্ডা লাগবে, তাই ঘরে এসে ঢুকলাম। আমার পেছন পেছন সে-ও। চোখে পড়ল, এডওয়ার্ড ভুরু কুঁচকে অ্যারনের দিকে তাকিয়ে। ভঙ্গিটা রাগত। কিন্তু, অ্যারন বাবার দিকে ফিরে তাকাল না ।

বাকিরা একঘেয়ে স্মৃতিচারণা করছিলেন। এই বাড়িতে কে কতবার এসেছেন, কী ঘটেছিল সেবারের ক্রিসমাস পার্টিতে ইত্যাদি। টমাস অ্যাক্টায়ার বারবারা স্কুলজীবনের বন্ধু। থাকেন কঙ্কায় একটা পুরোনো বাড়িতে। তাঁর স্ত্রী মেরিল আবার এডওয়ার্ডের ক্লাসমেট, যদিও তিনি আসেননি। টমাস লাতেহারে স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়ার ম্যানেজার ছিলেন। ছোটোখাটো চেহারা, আথ্রাইটিসের ব্যথায় মাঝে মাঝেই মুখ বিকৃত করে হাঁটুতে হাত বোলাচ্ছেন। সবাইকে ডিনারের নিমন্ত্রণ করলেন, মেরিলের নাকি ইচ্ছে। ভদ্রতাবশত আমাকেও। কেউ জানে না যে, আমি কালই চলে যেতে পারি ।

অবিনাশ যাদব গঞ্জ থানার প্রাক্তন ইনস্পেকটর, সাত বছর আগে অবসর নিয়েছেন। তারপর জমানো টাকা দিয়ে লাপড়াতে এক সাহেবের কটেজ কিনে উঠে এসেছেন। ভারী চেহারা, বয়েসের তুলনায় বেশি বৃদ্ধ লাগে। হাঁটাচলায় অসুবিধে, তবু লাঠি নেন না। সেই নিয়ে আজ বারবারা বকাবকি করছিল। সারামুখে অস্বাস্থ্যকর কালো ছোপ। মাথার চুল এখানে-ওখানে খাবলা খাবলা উঠে গেছে। হার্টের সমস্যা থাকতে পারে অথবা সিওপিডি। টয়লেট থেকে ফিরে বড়ো শ্বাস নিচ্ছিলেন, হাঁফাচ্ছিলেন হালকা। এক পেগ হুইস্কি খেয়ে মুখ লাল করে ফেলেছেন। আমার মনে হল, সেই রাত্রে জলাভূমির ধারে এঁকেই বারবারার সঙ্গে দেখেছি। পরিচয় হবার পর একদৃষ্টে তাকিয়ে ছিলেন। অবিনাশ আমার নাম জানেন। বারবারাকে আমার কথা তিনিই বলেছেন। কিন্তু, সে-প্রসঙ্গ এখানে না উঠলেই ভালো।

দলটার সম্ভবত প্রবীণতম মানুষ হলেন জেনিফার গর্ডন। দেখে মনে হল আশি। হুইলচেয়ারে বন্দি খিটখিটে বৃদ্ধা। বারাবারা জানিয়েছিল জেনিফারের মা স্কটিশ, বাবা ছাপড়া জেলার। আমি ঘরে ঢোকার পর থেকে তীক্ষ্ণ চোখে জরিপ শুরু করেছিলেন। আড্ডা শেষ হওয়া পর্যন্ত থামেনি। অবশেষে দমবন্ধ গলায় জিজ্ঞাসা করলাম, ‘আপনাকে কি আগে দেখেছি?’

.

‘নাহ্, কোথায় আর দেখবে!’ কাটা কাটা ইংরেজিতে জবাব দিলেন। ঠোঁটের প্রান্ত সবসময়ে বিদ্রূপে বেঁকে আছে বলে মনে হয়। হাতে পাকিয়ে সিগারেট খাচ্ছেন একটার পর একটা। শণের মতো চুল ঝাঁকিয়ে বললেন, “গত কুড়ি বছর গঞ্জ ছেড়ে বেরোইনি। এখানে সব ড্যাম আনকালচারড। না আছে সিনেমা হল, না ভালো বইয়ের দোকান। যা ছিল সেসবের পাট উঠেছে। কার সঙ্গে মিশব? আমাকে দেখার সম্ভাবনা কম।’

টমাস অ্যাক্টায়ার হাঁটুতে হাত বোলাচ্ছিলেন মুখ ভেটকে। জেনিফার আমাকে ঠেলা দিলেন, ‘দেখে মনে হয় ভাজা মাছ উলটে খেতে পারে না, তাই না?’

‘কে?’

‘কে আবার! ওই টমাস। অবশ্য বউটাও কম যায় না। মেরিল অল্প বয়েসে আর্মির এক ছোকরা সুবেদারের সঙ্গে প্রচুর লটরপটর করেছে। তারপর সময় বুঝে তাকে টা টা করে ঝুলে পড়েছে বেচারি টমাসের গলায়। বিয়ের পরেও কিন্তু সুবেদারের আনাগোনা ছিল ওদের বাড়িতে। এদিকে ভাব দেখবে, যেন বর বাদে কাউকে চেনে না! টমাসকেও ধোয়া তুলসিপাতা ভেবো না। ব্যাঙ্কের চাকরিটা একবার যেতে বসেছিল টাকাপয়সায় গণ্ডগোল করার জন্য। আসলে, রেসের নেশা। নিয়ম করে কলকাতা যায়।’ নীচুগলা হলেও শঙ্কিত চোখে টমাসের দিকে তাকালাম। আড্ডার প্রথমদিনেই তুমুল ঝগড়ার পার্টি হতে চাই না। কিন্তু, অবিনাশ শুনতে পেয়েছিলেন। আমাকে বাঁচাবার জন্য তড়িঘড়ি এমন একটা কথা বলে বসলেন যাতে আমি প্রমাদ গণলাম ।

‘আপনার লেখা কিন্তু আমি পড়েছি। এখানে অনেকেই জানে না, আপনি একজন ভালো ডিটেকটিভ। অনেক ক্রাইম সলভ করেছেন।’

‘এ কী, একদমই না! আমি ক্রাইম লিখতাম, ব্যস। কোনো রহস্যের সমাধান করিনি, সেটা আমার কাজও নয়।’ কিন্তু, অবিনাশ তখন অন্যদের দার্জিলিংএর ঘটনার ফিরিস্তি দিতে ব্যস্ত। এডওয়ার্ডকে দেখলাম তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে দেখছেন আমাকে। চোখাচোখি হতে দৃষ্টি ফেরালেন। মনীষা হাসিমুখে আমার দিকে ঝুঁকেছেন, ‘একদিন বসে সব গল্প শুনব, মিস ভট্টাচার্য! আমি ক্রাইম কাহিনির ফ্যান।’

“বাজে কথা বোলো না। তুমি গত দশ বছরে একটা বইয়ের পাতা উলটে দেখোনি।’ এডওয়ার্ড চাপাগলায় বললেন। মনীষার মুখ লাল হচ্ছে। কানের কাছ থেকে চুঁইয়ে নামা গরম আগুনকে চোয়ালে সইয়ে নিতে গিয়ে জিভ বোলালেন ঠোঁটে, ‘বইয়ের কথা তো বলিনি ! বলেছি? নেটফ্লিক্স দেখি না রোজ?’ বারবারার দিকে তাকালেন, ‘বলো না ওকে! তুমিই তো অ্যাকাউন্ট খুলে দিয়েছিলে।’ তাড়াতাড়ি গ্লাসে চুমুক দিয়ে অনেকটা ওয়াইন গিলে ফেললেন মনীষা। তখন চোখে পড়ল, অবিনাশ ফ্যালফ্যাল করে মনীষার দিকে তাকিয়ে। সে-তাকানো, যেন কাঙালের মতো, বোকার মতো তাকানো। বুঝলাম, অ্যারনেরও চোখে পড়েছে, মাথা নামাল। আমার অবিনাশের ওপর রাগ হচ্ছিল। এরকম দুমদাম সার্টিফিকেট দেবার বিপদ ভালোই বুঝি। সঙ্গেসঙ্গে লোকে তাদের জীবনের অমীমাংসিত রহস্যের ঝাঁপি খুলে বসবে। দুই ঘণ্টা ধরে আমাকে শুনে যেতে হবে কার মাসির আংটি হারিয়েছিল আজ থেকে কুড়ি বছর আগে, অথবা, কে নিয়ম করে প্রতি সপ্তাহে অজানা নম্বর থেকে তিনবার করে মিসড কল পায়।

‘আমার মেয়ে জার্নালিজম পড়তে চেয়েছিল। দিইনি।’ মুখ ভেটকে হাঁটুতে হাত বোলালেন টমাস। ‘অনেক ঝুঁকির কাজ। এই বয়েসে আমার এত টেনশন পোষাবে না। মেয়েদের ওসব পেশায় না যাওয়াই ভালো।’ সমর্থনের আশায় বারবারার দিকে মুখ ফেরালেন।

‘ছেলেদেরও যাওয়া উচিত না।’ বারবারা গ্লাসে চুমুক দিল।

.

‘তবে, এত কম বয়েসে এরকম নাম করা—’ অবিনাশ প্রশংসার ঘাড় নাড়লেন। বারবারা ফুট কাটল, ‘তাও আবার মেয়ে হয়ে।’

‘সে কপাল ভালো থাকলে লেগে যায়।’ যেন জেদ করেই বললেন টমাস। ‘তা বলে গুন্ডা মাফিয়াদের কাছাকাছি যাওয়া, উলটোপালটা লোকের ইন্টারভিউ নেওয়া, কে কখন মুখ চিনে রাখে বলা যায়? টিভিতে তো দেখি, এই তো আগের বছর পাটনার ওই ছেলেটাকে শুট করে দিল। একদম বাচ্চা। একটা অনলাইন পোর্টালের রিপোর্টার ছিল। আমি তো বলেই দিয়েছিলাম মেয়েকে স্কুল-কলেজে পড়াও, নাহলে আইটি-তে ঢোকো, নিদেনপক্ষে সরকারি জব। কিন্তু, রাতে ফিরল-কি-ফিরল না, কোথায় কোথায় চষে বেড়াচ্ছে, এদিকে আমাদের ঘুম নেই, ওসব হবে না।’ –

‘আসলে ব্যাপার হল,’ জেনিফার কার্পেটে ছাই ঝেড়ে হাতের লাঠি দিয়ে দ্রুত ঘষেও দিলেন, ‘আমরা ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজমকে গুরুত্ব দিই কারণ আমরা রহস্য রোমাঞ্চ ভালোবাসি। আমাদের জীবন বোরিং। সেই একঘেয়েমির ভেতর যদি দুপুর বেলা ঘুমোতে গিয়ে মামুলি ভয়ের স্বপ্নও দেখি, সেটাকেই বিরাট রহস্য বলে ভাবি আমরা। এদিকে হয়তো বেশি ডিম খেয়ে পেটগরম হয়েছিল সেদিন।”

‘ননসেন্স!’ বিরক্ত ভঙ্গিতে মাথা নাড়লেন অবিনাশ। ‘তাহলে শার্লক হোমস থেকে আগাথা ক্রিস্টি সবাইকে বাতিল করতে হয়।’

‘সেসব গল্পে ঘটে। বাস্তবে ক-টা খুন দেখেছ তুমি? আমাদের গঞ্জে স্ক্যান্ডাল বলতে তো এর বউ ওর বরের সঙ্গে পালাল আর শিরিন দুবের বিধবা মেয়েটা পেট বাধিয়ে বসল। হাউ পেটি! আসল ইন্টারেস্টিং ব্যাপার তো লুকিয়ে আছে পৃথিবীর ওপারে পরপারের যে জগৎ, তার ভেতর। তার সন্ধান করতে গেলে এক হাজার জীবনও যথেষ্ট নয়।’

‘আহ্, নাম নেবার দরকার কী!’ অবিনাশ বললেন।

“কেন নেব না শুনি? ভয়টা কাকে? আমি বলতে চাইছি, এসব ফালতু জিনিসকে ফুলিয়েফাঁপিয়ে রহস্যের আকার দাও তোমরা। নাহলে সবাই জানে শিরিনদের মেয়েটার লাভার কে।’

‘সবাই জানে, কারণ আপনিই জনে জনে বলে বেড়িয়েছেন।’ অ্যারন নীচুগলায় বলল। এডওয়ার্ড তার দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে তর্জনী তুললেন, কঠিন হল তাঁর মুখ, ‘ম্যানার্স।’ অ্যারন শান্তিরক্ষার ভঙ্গিতে দুই হাত ওপরে তুলল।

‘ড্যাম ইট! আমি না-বললে কেউ যেন জানত না! সবাই চোখ বুজে থাকে। এটাই আমার সঙ্গে তফাত তোমাদের। আমি সত্যিটা বলতে ভয় পাই না।’ জেনিফার উত্তেজিত ভঙ্গিতে হাত ঘোরালে আগুনের ফুলকিসুদ্ধ ছাই জানালার দিকে উড়ে গেল।

‘ধুর বুড়ি!’ বারবারা গাল দিল। জেনিফার রেগে-মেগে উত্তর দিতে গেলেন, কিন্তু সেইসময়ে একটা ঝোড়ো হাওয়া উঠল। ঝন ঝন শব্দে বাজল জানালার কাচ। বারবারা ক্রস আঁকল। আজ মনে হচ্ছে আবার বৃষ্টি পড়বে। রাত্রির সঙ্গে ঠান্ডা বাড়ছে দ্রুত। দূরের লাল আকাশে ঘন ঘন বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। রুম হিটার যথেষ্ট নয়। চাদরে পা ঢেকে চেয়ারে বাবু হয়ে বসলাম। ঘুরে দেখলাম লালুরাম জানালার কবাটে দুই পা তুলে ঝড় দেখছে।

তখন আধবোজা চোখে অবিনাশ যাদব বললেন ‘ক্রিস!’ এবং উপস্থিত অন্যেরা সচকিত হল। চোখ খুলে অবিনাশ আমার দিকে তাকিয়ে হাসলেন, ‘আপনি জানেন, কেন এখানে অপরিচিত মানুষদের মধ্যে বসে আছেন। কারণ, বারবারা ডেকে এনেছে আপনাকে। ওর ধারণা এই রহস্যের সমাধান আপনি পারবেন।’

‘সেরকম কিছুই আমি বলিনি। গল্পটা শুনতে রাজি হয়েছি, এটুকুই।’

‘গল্প, অথবা, অ্যাবসার্ড রহস্য। যা বলবেন। আমি ক্রিসের তদন্তের ইনভেস্টিগেটিং অফিসার ছিলাম। ক্রিস হারিয়ে গিয়েছিল এই ঘর থেকে।’

কয়েক মুহূর্ত সকলে চুপ থাকলাম। জলাভূমি থেকে হিমেল হাওয়া আসছে। সড়সড় শব্দ হচ্ছে বাইরে, নারকেল গাছের পাতার ভেতর ঢুকে পড়া বাতাসের কারুকার্য।

‘ক্রিসের ঘটনা পুরোনো হয়ে গেছে বার্বি, সবাইকে বার বার বলে কী আনন্দ পাও?’ বললেন জেনিফার। বারবারা তেজি ঘোড়ার মতো ঘাড় বাঁকিয়ে তাঁর দিকে তাকালেন। দেখলাম, মনীষা চোখ বুজে আছেন। গ্লাসের ওপর চেপে ধরা আঙুলের গাঁটগুলো ফুলে উঠেছে তাঁর।

ঝোড়ো বাতাস বইল ঘরে। কিচেনে ধড়াম আওয়াজ হল। একটা খোলা জানালা এদিকওদিক করছে। পুনম আড়মোড়া ভাঙল। দূর থেকে ওউউ আর্তনাদ করছে এক কুকুর। বারবারা উদ্বিগ্ন মুখ বাড়াল সোফার ওপর দিয়ে, ‘পুনম, মুরগির ঘরটা নজরে রাখ। তেমন হলে ভেতরে নিয়ে আয়। ঠান্ডায় জমে যাবে।’ ঠোঁটের ওপর তার হালকা গোঁফের রেখা, সময়ে অসময়ে সেখানে হাত বোলানো পুনমের মুদ্রাদোষ। এখনও হাত বুলিয়ে জানাল সে এর মধ্যে ঘরটাকে কার্নিশের তলায় এনেছে। চোখের ভুল হতে পারে, জানালার পাল্লা যখন হাওয়ায় খুলে গিয়েছিল, তখন দেখলাম বাগানের ওপাশে রাস্তার ওপর ছাতা মাথায় একটা ছায়ামুর্তি দাঁড়িয়ে। পাশে বসা চারপেয়ে একটা জীব। একপলক মাত্র, তারপর সশব্দে বন্ধ হল পাল্লা। সেই সময়টুকুতে মনে হল, সে যেন আমাদের বসার ঘরের দিকে তাকিয়ে আছে। বারবারা হাত তুলল জলাভূমির দিকে, ‘ক্রিস ওখানে লুকিয়ে থাকে। আমি ওকে দেখতাম। বিকেল হলে মাঝে মাঝে বেরোয়। বনের ধারে বসে আমাদের বাড়ির দিকে তাকিয়ে থাকে। কিন্তু প্রায় বছর দশেক হল ওকে দেখিনি।’

‘যেমন তোমার বাবাকে দেখতে? বা, হিল্ডাকে?’ হাসার চেষ্টা করলেন টমাস। এডওয়ার্ড মুখ দিয়ে বিরক্তির আওয়াজ করলেন। শুধু মনীষা একা চোখে তাকিয়ে থাকলেন বারবারার দিকে।

‘আমাদের গঞ্জে কিছু ঘটে না।’ জেনিফার বললেন। ‘সেই একবার ক্রিস ঘটেছে, সেটাকেই মানুষ মনে রেখেছে।

‘ঘটেনি এমন নয়। টুকটাক তো হয়েছেই। মায়াপুর জঙ্গলে সেই রহস্যময় আগুন? ১৯৫৮ সালে, মনে নেই?’ টমাস বললেন।

“তার সমাধানও হয়েছে, কিন্তু চেপে দিয়েছিল সরকার। ওরাওঁ মজুরদের দল কাজে আসতে একদিন লেট করেছিল বলে রেঞ্জারবাবু রেগে গিয়ে তাদের ঝুপড়িগুলো ভাঙার নির্দেশ দিয়েছিলেন। তার প্রতিশোধে রেঞ্জার বাংলোতে আগুন লাগায় মজুরেরা। তারপর বাগে আনতে পারেনি। অবশ্য, জঙ্গল পুড়ে সরকারের লাভই হয়েছিল। খাতায়-কলমে ফরেস্ট ল্যান্ড রেখে রাতারাতি জায়গাটাকে ফিক্সড ডিমান্ড হোলডিং-এর আওতায় এনে লোকালয় পত্তন করে দিয়েছিল।’ বললেন অবিনাশ।

‘আর, অ্যাগনেসের নিখোঁজ হয়ে যাওয়া?’ টমাস বললেন।

সকলে পরস্পরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করল। অ্যাগনেসের ছবির কথা সবাই জেনে গেছে এতক্ষণে। অবিনাশ মাথা নাড়লেন, ‘হ্যাঁ, আরেকটা অমীমাংসিত কেস। সেটারও ইনভেস্টিগেশন আমি করেছিলাম। যদিও ভৌতিক হতে পারে।’

‘হয়তো ভূত নয়। মানুষ হয়তো। অনেকে দেখেছে এখানে-ওখানে। বেথেল মিশনে, শপিং সেন্টারে—’ বারবারা বলল।

‘আমি দেখেছি অনেক বছর আগে।’ বললেন মনীষা। ‘বছর কুড়ি তো হবেই। বাবার কাছে এসেছিলাম রাঁচি থেকে কী-একটা কাজে। দূর থেকে দেখেছি, পাগলি অ্যাগনেস দুপুর বেলা ডাফরিনপাড়ার নিঃঝুম কবরখানায় বসে চুল আঁচড়াচ্ছিল।’

‘অ্যাগনেসের প্রেত প্রতি গুড ফ্রাইডেতে ফিরে আসে। অতৃপ্ত আত্মার অশান্তি তাকে জায়গাটার মায়া কাটাতে দেয় না।’ জেনিফার চোখ বুজে বললেন।

‘এসব কুসংস্কার আপনি রটাতেন, না?’ এডওয়ার্ড রাগতস্বরে বললেন। ‘অনেকে বিশ্বাসও করেছে। ভূত, প্রেত, এসব কী? অ্যাগনেস পালিয়ে গিয়েছিল সবাই জানে।’

“দেখো ছোকরা, তোমার নাক টিপলে দুধ বেরোয়। তুমি এসব বুঝবে না। সেদিনের বাচ্চা—’

‘আর, আপনি ওইসব রাবিশ তন্ত্রমন্ত্র অকাল্ট বুজরুকি করে জায়গাটাকে নোংরা করছেন না?’ এডওয়ার্ড তেড়ে উঠলে মনীষা তাঁর হাত চেপে ধরলেন।

‘হাউ ডেয়ার ইউ কল ইট রাবিশ—’ জেনিফার দাঁত চেপে টেবিলে ঘুসি মারলে সিগারেট ছিটকে গেল হাত থেকে।

‘আরে ধুর, আবার ঝগড়া শুরু করে এরা।’ অবিনাশ উঁচু গলায় ধমকালেন, ‘দু-জনেই ছেলেমানুষ হয়ে গেলে নাকি? এখানে অশান্তি কোরো না। আমার সিওপিডি, উত্তেজনা সহ্য হয় না।’

‘আরেকটা ঘটনা এখনও তাড়া করে।’ টমাস চিন্তিত মুখে বললেন। ‘২০০২ সালে সরস্বতী বিদ্যামন্দির স্কুলের হেডমাস্টার সহদেব তিওয়ারি আত্মহত্যা করেছিল। মনে আছে তোমাদের? সহদেব একা মানুষ। আমার বন্ধু ছিল। তাসের পার্টনার। তার ঝুলন্ত দেহ আবিষ্কার করেছিল বাড়িওয়ালা। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি, সে আত্মহত্যা করেনি। খুন হয়েছিল।’

‘একজন নিরীহ মাস্টারকে কে খুন করবে?’

‘সহদেব কিছু জেনে ফেলেছিল। শেষদিকে ভয়ে মনমরা থাকত। আমাকে একবার বলেছিল, অনেক কথা আছে, একদিন বাড়ি এসে বলবে। কী জেনেছিল জানি না। কিন্তু, এই দিকটা পুলিশ খতিয়ে দেখেনি।’

“আপনি পুলিশকে জানাননি?

‘বলেছিলাম। পাত্তা দেয়নি। তখন আপনি হাতিয়াতে পোস্টেড। এই কেস জানেন না। ‘

‘আমার মনে আছে,’ মনীষা বললেন। ‘আমার কাজিন আর্চি সহদেব স্যারের ছাত্র ছিল। ভালো চিনতাম ওঁকে। ইতিহাস পড়াতেন। কিন্তু তিনি তো—’ এডওয়ার্ডের দিকে তাকালেন । ‘হ্যাঁ, আমরা শুনেছিলাম পরকীয়া-জনিত ব্যাপার। বেতলার এক বিবাহিতা মহিলার সঙ্গে সম্পর্ক ছিল নাকি।’ এডওয়ার্ড সমর্থন করলেন স্ত্রী-কে।

‘আমি বিশ্বাস করিনি তাতে।’ বারবারা বলল। ‘প্রেম-টেম মাই ফুট! সেদিন সকালে এক কিলো মুরগির মাংস কিনে ফ্রিজে রেখে কেউ গলায় দড়ি দেবে না।’ ‘তুমি জানলে কী করে?’ বিস্ময়ে প্রশ্ন করলেন টমাস।

‘আরে ব্লাডি, কিনেছিল তো সবিতা মুন্ডার থেকে।

‘আর কিছু মনে হয় কখনো আমাদের শহরে ঘটেনি। খুবই ম্যাড়ম্যাড়ে জীবন আমাদের।’

“তাহলে আবার আমরা ফিরে এলাম সেই ক্রিসের আখ্যানেই, যেটাকে সবাই একবাক্যে রহস্য বলে স্বীকার করবে, যার সমাধান হয়নি।’ অবিনাশ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

‘ক্রিস।’ বলল বারবারা। কয়েক মুহূর্ত আবার সকলে চুপ। তারপর বাজ পড়ার আওয়াজ এল এবং অ্যারন বলল, ‘নো এগজিট।’

.

অনেকক্ষণ চুপ থাকলাম। গলা খাঁকড়ালেন সোমেন কর্মকার। অন্ধকার জাঁকালো হয়েছে। ঘ্যানঘ্যানে বৃষ্টি। উঠে দাঁড়ালাম, ‘ঘুরে আসছি। বদ্ধঘরে মাথা ধরছে।’

থানার গেটের ছাউনির নীচে দাঁড়িয়ে জোরে শ্বাস নিলাম। হুড়মুড়িয়ে স্মৃতির দল ভাংচুর হচ্ছিল তাসের ঘরের মতো— আমি কি মাথার ভেতর বার্লিন প্রাচীর ভেঙে পড়ার অনুভূতি পাচ্ছি? অন্ধকার রাস্তায় ছাতামাথা মানুষদের দেখে বাদুড় মনে হয়। সল্টলেক ধুয়ে যাচ্ছে এপ্রিলের অকালবর্ষণে। অক্ষয় মাহাতো আমার পাশে এসে দাঁড়ালেন। হাত বাড়িয়ে সিগারেট চাইলেন একটা।

‘আবার জিজ্ঞাসা করছি, আমাকে দিয়ে গল্পটা কেন বলাচ্ছেন?’

‘আপনি একা নন। আমি গঞ্জ থেকে আসছি। অন্যদের স্টেটমেন্টও নিয়েছি। তাঁরা নিজেদের মতো করে গল্প করেছেন।’

‘মানে, ক্রিস ব্রাউনের অন্তর্ধান রহস্যের সঙ্গে আজকের হত্যার যোগাযোগ আছে। তাহলে পুরোনো ফাইল ওপেন হবে।’

‘একটা কথা আপনি আমি দু-জনেই জানি। দেড় মাস আগে যে খুন হয়েছে সেটা সাধারণ হত্যাকাণ্ড নয়। সাধারণ হত্যায় অপরাধী তার ভিক্টিমকে এভাবে সাজিয়ে রাখে না। রাখে তখনই, যখন সে কোনো মেসেজ দিতে চায়। এরকম মেসেজ কি আপনার মাথায় আসছে?’ কী চায় লোকটা? বারে বারে আমাকে এভাবে টোপ দিচ্ছে কেন?

‘হত্যাকারী কে হতে পারে বলে আপনাদের মনে হয়? যদি কাউকে সন্দেহ করেন, তাহলে তাকেই জিজ্ঞাসা করতে পারেন তো। সমাধান পেয়ে যাবেন।’

‘আপনিও তাহলে সমাধানটুকুকেই পাখির চোখ করেছেন!’ অক্ষয় হাসলেন। তিনি পুলিশ, তাঁর কী এসে যায় সমাধান বাদে অন্য কিছু দিয়ে? ‘আমি আবেগি মানুষ নই, মিস ভট্টাচার্য। কেস থেকে দূরত্ব বজায় রাখার ট্রেনিং আমাদের দেওয়া হয়। কিন্তু—সবসময়ে

সেটা সবার পক্ষে সম্ভব হয় না, আমি জানি। আমরা অপরাধকে দেখি। কিন্তু একজন ডিটেকটিভের আত্মার কী ঘটে, তার হিসেব রাখে না কেউ।’

‘আপনি অবিনাশের মতো কথা বলছেন। কিন্তু যেটা বুঝছেন না, আমার কি এসে যায় কিছু? আমি তো গোয়েন্দা ছিলাম না, একটা রহস্যের সমাধান করতে পারিনি তো কী? সেটা আমার কাজও নয়। আমি ভুলতে শিখেছি। এবং, শিখিনি। তাই আজও মনীষার কথা ভাবলে, বারবারার কথা ভাবলে, এডওয়ার্ডের কথা ভাবলে, আমি ওদের জীবনে যা করেছি সেই চিন্তায় আমার গা হিম হয়। ওরা আমাকে দোষারোপ করেছিল সবাই। তাতে ভুল ছিল না কারণ ক্যান অফ ওয়ার্মস আমিই খুলেছিলাম আর ভুলে গিয়েছিলাম বন্ধ করতে। আমি সত্যিই ভালো গোয়েন্দা হতে পারব না মিস্টার মাহাতো!’

.

‘থাকুক বরং।” মনীষা ফিসফিস করলেন। তারপর চুমুক দিলেন গ্লাসে। বারবারা মাথা নাড়ল, ‘কী এসে যায় !”

বেখাপ্পা হেসে উঠলেন এডওয়ার্ড। হাহাকারের মতো লাগল। ‘একদম ঠিক। ক্রিসের অন্তর্ধান রহস্যের সমাধান আজও হয়নি। আর আপনার কেরিয়ারে,’ অবিনাশ যাদবের দিকে ফিরলেন, ‘সেটা বরাবরের ক্ষতচিহ্ন হিসেবে থেকে গেছে।’

অবিনাশ নিশ্বাস ফেললেন, ‘বছরের পর বছর এই একটা কেস তাড়া করেছে আমাকে । আমাকে ঘুমোতে দেয়নি। শাস্তিতে মদ খেতে দেয়নি। আমার মানসিক স্থৈর্যকে চুরমার করে দিয়েছে।’

‘আর, আজ আপনি এখানে বসে ওয়াইন খাচ্ছেন।’ মৃদুস্বরে মনীষা বললেন। চোখ নামালেন অবিনাশ ।

‘অন্য কথা হোক তাহলে।’ টমাস বললেন। ‘আবার খুঁচিয়ে তোলার কী দরকার?’

‘না, অন্য কথা কেন হবে?’ এডওয়ার্ড গোঁয়ার গলায় বললেন, ‘উঠল যখন, কথা এগোক। অনেকদিন ক্রিসকে নিয়ে কেউ কিছু বলেনি। সবাই ভুলেই গেছে ওকে। মানুষের স্মৃতি? টমাস? হ্যাঁ, সেটা তো থাকবে! মানুষ তো মনে রাখুক যে, ক্রিসকে খুঁজে পাওয়া যায়নি!’ মনীষা তাঁর হাত ধরলেন, কিন্তু এডওয়ার্ড ফিরে তাকালেন না।

‘কেন? কী লাভ?” বললেন টমাস।

‘হয়তো রিডেমশন। হয়তো কিছুই নয়। শুধু শুনে যাওয়া।’

‘এভাবে হয় না। মনীষাকে কষ্ট দিয়ে—’

‘না না, আমার সয়ে গেছে।’ দু-হাতে শক্ত করে ওয়াইনের গ্লাস চেপে ফ্যাকাশে হাসলেন মনীষা। ভয় হল গ্লাসটা ভেঙে যাবে।

‘কেউ বিশ্বাস করে না, ক্রিসকে আমি দেখতাম। মনীষাও না।’ বারবারা মাতাল হয়েছে এতক্ষণে।

‘আমি বিশ্বাস করতে চাই। যদি ওকে দেখতে পাই—যদি—’ মনীষা অ্যারনের দিকে তাকালেন। সে-দৃষ্টি ভিক্ষুকের মতো। কিন্তু, অ্যারনের চোখে মমতা ছিল না।

‘কী করবে দেখতে পেলে?’ ব্যঙ্গের স্বরে হাসলেন এডওয়ার্ড। ‘ফটোসেশন করবে?’

‘শাট আপ, ইউ বেবুন! ব্লাডি পুরুষেরা বড়ো হলে জানোয়ার হয়ে যায়।’ গরগর করল বারবারা। কিন্তু, মনীষা হাসলেন। সে-হাসিতে বিষণ্ণতা না, বরং খোলামেলা রোদের আভাস ছিল।

‘ওর কাছে চলে যাব। যেভাবে যায় মানুষ। ভালোবেসে।’ দেখলাম, অবিনাশের চোখ করুণ হল। একপ্রকার বিষণ্ণ হাসিতে তিনি তাকিয়ে আছেন মনীষার দিকে। কিন্তু, মনীষা ফিরে দেখছেন না। এডওয়ার্ড কিছু বলতে গিয়ে চুপ করে গেলেন।

হাত তুললেন অবিনাশ যাদব, ‘আমার মনে হয়, এডওয়ার্ড এবং মনীষার আপত্তি নাথাকলে মিস ভট্টাচার্য শুনতেই পারেন একবার। আপনি রহস্য সমাধানে দক্ষ। একবার চেষ্টা করে দেখবেন নাকি? ‘

‘রহস্যের সমাধান? যা কেউ করতে পারেনি সেটা মিস ভট্টাচার্য করবেন?’ হালকা বিদ্রূপের হাসি ছুঁয়ে গেল এডওয়ার্ডের ঠোঁট, ‘দেখুন! আমি তো এত বছর পরে লাভ-ক্ষতির ঊর্ধ্বে।

‘আমি চাই না। মিস্টার অ্যাক্টায়ার ঠিকই বলেছেন। একটা রহস্যকে মাটি খুঁড়ে তুললে সমাধান নয়, শুধু বেদনাই আসে।’ বললাম আমি।

‘তাহলে একটা গল্প হিসেবেই শুনে দেখুন নাহয়। অন্যদের আপত্তি যদি না থাকে।’ ‘যে গল্পে পুলিশ ব্যর্থ হয়েছিল?’ হাসলাম আমি। অবিনাশও হাসলেন।

‘হ্যাঁ, আপনার পাঠকদের জন্য আদর্শ সেট-আপ।’

‘আমি সামান্য সাংবাদিক।’

‘আপনাকে জড়াতে হবে না। তবু, আমি বলতে চাই। ধরে নিন আবার একবার কনফেশন দিচ্ছি অনেকের সামনে।’

‘আচ্ছা, শুনব। তবে, মতামত দেব না। আশা করি, আমার দিক থেকে কোনো ভূমিকার দাবি আপনাদের নেই।’ উপস্থিত অন্যেরা চোখ নামাল। জেনিফার বড়ো টান দিলেন সিগারেটে।

কুকুরের কান্না থামল। হাওয়া স্তব্ধ হল অবশেষে। অবিনাশ গ্লাসে হুইস্কি ঢাললেন। তারপর একটা সিগারেট ধরিয়ে গল্প শুরু করলেন।

.

.

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *