সন্ধিক্ষণ – সমৃদ্ধ দত্ত
সন্ধিক্ষণ – সমৃদ্ধ দত্ত
প্রথম প্রকাশ জানুয়ারি ২০২৪
.
SANDHIKKHAN
An Incisive Historical Novel on Refugees by Samriddha Dutta
.
ত্রিদিবকুমার চট্টোপাধ্যায়
শ্রদ্ধাভাজনেষু
.
শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ শরণম।।
জননী সারদাং দেবীং রামকৃষ্ণং জগদগুরুম
পাদপদ্মে তয়োঃ শ্রিত্বা প্রণমামি মুহুর্মুহু।।
.
দণ্ডকারণ্য জায়গাটা আশ্চর্য জানেন তো? ত্রিদিবদাকে বললাম।
ত্রিদিবদা আগ্রহ নিয়ে প্রশ্ন করলেন, কেন বলো তো?
পশ্চিমবঙ্গের আড়ালে ওখানে একটা বাঙালির রূপকথা তৈরি হয়েছে। সব হারানো ছিন্নমূল উদ্বাস্তু মানুষ দেশভাগ এবং তারও অনেক পরে বাধ্য হয়ে পূর্ব পাকিস্তান থেকে চলে এসেছিল ভারতে। তাঁদের পাঠানো শুরু হয়েছিল বহির্বঙ্গে, বিভিন্ন প্রদেশের প্রত্যন্ত এলাকায়। তার মধ্যে সবথেকে বড় প্রকল্প দণ্ডকারণ্য প্রজেক্ট।
এসব কথা সবাই জানে। কিন্তু আমি কাজের সূত্রে যতবার যাই দণ্ডকারণ্যের বিভিন্ন এলাকায়, দেখেছি এক অন্য চরিত্রের বাঙালিকে। শূন্য থেকে শুরু করে আবার এক শিকড় নির্মাণ কী কঠিন, অথচ সেটাই করে দেখিয়েছে তারা। যতবার যাই, আগ্রহ নিয়ে বিভিন্ন উদ্বাস্তু জনপদগুলি দেখি।
শ্রদ্ধেয় সাহিত্যিক প্রফুল্ল রায়ের বাড়ি থেকে ফিরছিলাম ত্রিদিবদার সঙ্গে। পত্রভারতী প্রকাশনীর কর্ণধার, পাবলিশার্স অ্যান্ড বুকসেলার্স গিল্ডের অন্যতম পরিচালক এবং সাহিত্যিক ত্রিদিব চট্টোপাধ্যায়। একটি বইয়ের ভূমিকা নিয়ে কথা বলতেই প্রফুল্লবাবুর বাড়িতে যাওয়া। প্রফুল্লবাবুর অভিজ্ঞতার ঝুলি যে বিস্ময়কর তার প্রমাণ বাংলা সাহিত্যেই পাওয়া যাবে। গোটা ভারত জুড়ে তিনি ভ্রমণ করেছেন শুধু নয়, বাইরে থেকেছেন মাসের পর মাস, বছরের পর বছর। আন্দামান থেকে নেফা, দণ্ডকারণ্য থেকে মুম্বই কিংবা বিহার। তাই তাঁকে কোনওদিন আর কাহিনি নির্মাণের জন্য পৃথকভাবে প্লট সন্ধান করতে হয় না। প্লট তাঁর অভিজ্ঞতা আর স্মৃতিতেই। প্রখর স্মৃতিধর প্রফুল্লবাবুর সামনে বসে তাঁর সেই অভিজ্ঞতার গল্প শোনাও এক অসামান্য সৌভাগ্য। সুতরাং দীর্ঘক্ষণ সেই স্মৃতির মণিমুক্তো শুনে ফেরার সময় ত্রিদিবদার সঙ্গে দণ্ডকারণ্যের প্রসঙ্গ নিয়ে কথা হচ্ছিল। যেহেতু প্রফুল্লবাবু নিজেই প্রত্যক্ষ করেছেন এই দণ্ডকারণ্য প্রকল্পের রূপায়ণ, তাই প্রসঙ্গটি ছিল জীবনের উষ্ণতায় ভরপুর।
কিছুক্ষণ কথার মধ্যেই ত্রিদিবদা বললেন, তুমি তো ওখানে অনেকবার গিয়েছ। একটা উপন্যাস লেখো। যখন দণ্ডকারণ্য প্রকল্প তৈরি হচ্ছিল, সেটা নিয়ে অনেক গল্প উপন্যাস হয়েছে। কিন্তু তারপর কী হল? সেসব নিয়ে কি কিছু লিখতে পারো?
এই উপন্যাসের বীজ বপন হয়েছিল সেইদিন। কিন্তু আমি লিখব উপন্যাস? সামান্য লেখালেখির অভ্যাসে আমি মূলত নন ফিকশনই লিখে থাকি। প্রবন্ধ, নিবন্ধ, ফিচার, ইতিহাস ইত্যাদি। কয়েকটি গল্প, উপন্যাসও অবশ্য লিখেছি। তবে এরকম বৃহৎ ক্যানভাসে নয়।
আস্ত একটা উপন্যাস, তাও আবার হিস্টরিক্যাল ইভেন্ট নিয়ে লেখা, কীভাবে সম্ভব হবে? সংশয় ছিল। কীভাবে শুরু করব? একটাই সুবিধা। দণ্ডকারণ্যে কর্মসূত্রে অনেকবার যাওয়ার অভিজ্ঞতা। আদিবাসী সমাজ কিংবা উদ্বাস্তু বাঙালিদের একদা ক্যাম্প, পরে কলোনি ও জনপদের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ, সম্পর্কস্থাপন। কিন্তু উপন্যাসে সেই অভিজ্ঞতাকে স্থান দেওয়া যায় কীভাবে?
গল্প এবং উপন্যাস নিয়ে একটি প্রশ্ন দীর্ঘদিন ধরেই আমাকে তাড়িত করে। সেটি হল, কোনটা কঠিন? কোনটা সহজ? আত্মজীবনীর অংশকেই উপন্যাসে প্রবিষ্ট করাই কি খুব স্বাভাবিক? পরিচিত মানুষের ধাঁচে চরিত্রদের নির্মাণ করা? দেখা অথবা শোনা পারিবারিক কিংবা সামাজিক ঘটনাকে সামান্য ভোল বদলে দিয়ে প্লট হিসেবে নির্মাণ করা? তারপর নিজের মতো করে উপকাহিনি, সাবপ্লট তৈরি করে কাহিনির বুনোন গঠন?
তাহলে কল্পনার স্থান ঠিক কোথায়? সাহিত্যের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ কি কল্পনা এবং মৌলিক ভাবনা হওয়াই উচিত নয়? যে কাহিনি পৃথিবীতে কখনও ঘটেইনি, যেরকম কোনও জীবন আখ্যান কোনওদিন লেখক শোনেননি, এরকম একটি কাল্পনিক ও মৌলিক গল্পের জন্ম দেওয়াই কি কঠিনতম নয়? তখনই তো প্রমাণিত হয় লেখকের কল্পনাশক্তি এবং মৌলিক ভাবনা কতটা তীব্র!
নাকি লেখকের জীবনটাই আসলে সাহিত্যের অঙ্গ? অর্থাৎ তিনি যা দেখছেন জীবনযাপনের সঙ্গে, তার প্রতিটি মুহূর্তই আসলে তাঁর সাহিত্যচর্চার অংশ হিসেবে হৃদয় ও মস্তিষ্কে প্রবেশ করছে, এবং তারপর স্থান পাচ্ছে রচনায়! কোনটা ঠিক?
এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়াই হয়তো লেখকদের আজীবনের সন্ধান। এই উপন্যাস রচনার প্রাক্কালেও ঠিক এই সংশয় প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়েছে। অভিজ্ঞতা এবং কল্পনার ভারসাম্য কেমন হওয়া উচিত? যা দেখেছি, যা প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতায় রয়েছে, সেই বিবরণই কাহিনির ধাঁচে লিখে চললে সেটি তো আদতে একটি সম্প্রসারিত রিপোর্টাজ হবে। উপন্যাস হবে কীভাবে? তবু একটি কাহিনির জন্ম হল। সে কি আদৌ পঠিতব্য হল? নাকি কিছু হয়নি? পাঠকের বিচারই শেষ কথা।
এই উপন্যাসের পটভূমি পূর্ব পাকিস্তান, পশ্চিমবঙ্গ এবং দণ্ডকারণ্য। একটি পরিবারের উদ্বাস্তু হয়ে যাযাবর জীবনযাপন এবং তার পরিণতির আখ্যান। পটভূমি এবং ইতিহাসে ঘটে যাওয়া কিছু বাস্তব ঘটনার মধ্যেই এই উপন্যাসের চরিত্রদের এগিয়ে চলা। কিন্তু একটি চরিত্রও বাস্তব নয়। প্রতিটি চরিত্র এবং তাদের জীবনে ঘটে যাওয়া কাহিনি কাল্পনিক, অথচ প্রবলভাবে বাস্তবধর্মী।
কারণ একটাই। যে প্রেক্ষাপটকে এই উপন্যাস ভরকেন্দ্র হিসেবে বেছে নিয়েছে, সেই পটভূমিতে ঠিক এরকম ঘটনা হয়তো অসংখ্য ঘটেছে।
দণ্ডকারণ্য স্থানটি অধুনা ছত্তিশগড়, মহারাষ্ট্র, ওড়িশায় বিস্তৃত। এই বিস্তীর্ণ অঞ্চলের বাংলাভাষীদের থেকে মূলস্রোতের বাঙালি আজও অনেকটাই বিচ্ছিন্ন। তাঁদের জীবন, পেশা, সমাজ, ভাবনা, আচার, ধর্ম কোনওটিই খুব বেশি চর্চিত নয়। সাংস্কৃতিক ও বিনোদন মাধ্যমেও সেভাবে উঠে আসতে দেখা যায় না এই বিপুল সংখ্যক বাঙালি জীবনযুদ্ধের জয় পরাজয়ের কথা। অথচ বাংলা সাহিত্যের প্রথিতযশা বহু লেখক অসামান্য মুনশিয়ানায় এই দণ্ডকারণ্য উদ্বাস্তুজীবনের কথা রচনা করে গিয়েছেন। বাংলা সাহিত্যের সম্পদ সেই রচনাগুলি।
সেই ঐতিহ্য অনুসরণের বিন্দুমাত্র যোগ্যতা আমার নেই। সেই মন, চেতনা, মানবিক অনুভব, জীবনবোধের কণামাত্রও আমি অর্জন করতে পারিনি। পারবও না। আবার একইভাবে দণ্ডকারণ্যের নয়নাভিরাম অথচ রহস্যময় প্রকৃতির বর্ণনাতেও অপারগ আমার মেধা।
তাই শেষ বিচারে এই উপন্যাস আমার প্রিয় ভৌগোলিক মানচিত্র দণ্ডকারণ্যের জীবন ও প্রকৃতির বুকে নিছক একটি ব্যক্তিগত স্বাক্ষর রেখে যাওয়ারই দুঃসাহসিক প্রয়াস।
সমৃদ্ধ দত্ত
ডিসেম্বর, ২০২৩



Leave a Reply