২০
কোনটা আসল সুন্দরপুর? চল্লিশ বছর অনেকটা সময়। মানুষ বদলেছে, জনপদের চরিত্র বদলেছে। তিরিশ বছরে সুন্দরপুরে অনেক বদল এসেছে। এখন স্টিল প্ল্যান্ট টাউনশিপ আর পুরোনো সুন্দরপুরের বাসিন্দাদের মধ্যে চাপা রেষারেষি আছে। যে কোনও শহরে যেমন আজকাল দেখা যায়! শহরের মধ্যে শহর। নিউ ভোপাল, ওল্ড ভোপাল। ওল্ড আমেদাবাদ, নিউ আমেদাবাদ। রায়পুর, নিউ রায়পুর।
এরকমই যেন কতকটা অঘোষিত তফাত নিউ সুন্দরপুর। পুরোনো আর নতুনদের মধ্যে মানসিক দূরত্ব রয়েই গিয়েছে। সুন্দরপুর বাংলা থেকে অনেক দূরে। ছত্তিশগড়ের বস্তার পেরিয়ে সুকমা এবং দান্তেওয়াড়া জেলার সীমান্তের একটি জনপদ। শহর বলা কি সঙ্গত? চকচকে মার্কেট, শপিং কমপ্লেক্স এসব তো নেই। সেসব আছে জগদলপুরে। এমনকী এখানে রোজ বাজার পর্যন্ত বসে না। সপ্তাহে তিনদিন যেটা বসে সেটাকে হাট বলা যেতে পারে।
তবে গ্রামও নয়। ছিমছাম জনপদ। সবথেকে মনোরম দৃশ্য হল, একপ্রান্তে বয়ে যাওয়া ঝিনুক নদী, আর দূরে ইন্দ্রাবতী। শাল পিয়াল অর্জুন, আকাশমণির জঙ্গল ছাড়াও পূর্বদিকে টিলাপাহাড়ের শ্রেণি। স্থানীয় আদিবাসীদের কাছে ওই পাহাড়ের নাম বুরুন্দা। পশ্চিমদিকে সাত নম্বর পাহাড়। তার পিছনে তুলুং গ্রাম। ওই পশ্চিমদিকেই বহু বছর আগে আসা উদ্বাস্তুদের গ্রাম। পাশের রাস্তা সোজা গিয়েছে পাহাড় পেরিয়ে ইন্দ্রাবতী নদীর দিকে। বুরুন্দা আর সাত নম্বর, এই দুই পাহাড় এঁদের জীবনের সঙ্গেই যেন ওতপ্রোতভাবে মিশে থাকে। সমতলভূমিতে ধান, তিসি, মাসকলাই, ভুট্টার চাষ হয়। আবার পাহাড়ের গায়ে হয় কালো কালো দেখতে একটা সবজি। আলুর মতো।
গরমকালে বিকেল থেকে ওই বুরুন্দার পাদদেশেই এই মানুষগুলোর সময় কাটে। আবার শীতের দুপুরে বড় বড় বোল্ডার আর পাথরগুলি হয় এক একটি সংসার। ছেলেমেয়েরা ছোটাছুটি করে। আদিবাসী মহিলারা রংবেরঙের সুতো নিয়ে এসে হাত-পা ছড়িয়ে বসে ছোট ছোট ঘণ্টায় বেঁধে মনোহারি গৃহসজ্জা তৈরি করে।
সেই সুতোর পুতুল, ব্লাউজের পিছনে লাগানোর রঙিন ফ্রিল, পর্দার সঙ্গে ঝোলানোর জন্য রূপালি সুতোর কারুকাজ, ড্রইংরুমে রাখার মুখোশ এরা হাটে বিক্রি করতে যায়। পুরুষেরা সেই সময়গুলোয় থাকে সাতমহল রেলস্টেশনে বস্তা লোডিং আনলোডিংয়ের কাজে অথবা স্টিল প্ল্যান্টের ডাউনস্ট্রিমে।
কেউ আবার যায় আর একটু দূরে কেমিক্যাল প্ল্যান্টে কনট্রাক্ট ওয়ার্কার হিসাবে। এই আদিবাসীদের সিংহভাগই গোন্দ আর হালবা উপজাতির। গোন্দি, হালবি আর হিন্দি। তবে আর একটি ভাষাও ওরা বেশ বুঝতে শিখে গিয়েছে। বাংলা। কারণ, এই বস্তার অঞ্চলের বহু লোকালয়ের মতোই এখানেও দীর্ঘকাল ধরে বাঙালি জনবসতি। তাদের মধ্যে একটি শ্রেণি এসেছে স্বাধীনতার অনেক বছর পর। উদ্বাস্তু হয়ে।
মানচিত্রের এক প্রান্তে থাকা সুন্দরপুর, সাতমহলা আর রূপধারিয়ায় ঘটে যাচ্ছিল অন্য সংমিশ্রণ। আদি বাসিন্দা হিসেবে আদিবাসীরা এখানে ছিলই। তারপর এল উদ্বাস্তু পরিবার। উদ্বাস্তুদের নিয়ে গড়ে উঠল গ্রাম। তাদের নিজস্ব জনপদ। অস্তিত্ব ছিল না। তখন ছিল মধ্যপ্রদেশ। সেই মধ্যপ্রদেশ ভেঙে কয়েকবছর হয়েছে নতুন রাজ্য ছত্তিশগড়।
এই দুয়ের পাশাপাশি আরেক অংশের বাঙালির আগমন ঘটল গত শতকের সাতের দশকের শেষ ভাগ থেকে। স্টিল প্ল্যান্টের হাত ধরে। তিন ক্ষুদ্র জনপদ রূপধারিয়া, সুন্দরপুর এবং সাতমহলের জনবসতির চরিত্রও তিনরকম। নিজেদের জায়গা সুন্দরপুর বললেও আদতে একটি গেট থেকেই শুরু হয় স্টিল প্ল্যান্টের নিজস্ব টাউনশিপ।
এই ক্ষুদ্র টাউনশিপের মধ্যে সবথেকে বেশি চোখে পড়বে স্টিল প্ল্যান্টের বাঙালি পরিবারদের। তারা প্ল্যান্টের নিজস্ব কলোনির মধ্যেই থাকে। বাইরে থাকে বাকি দুই নাগরিকশ্রেণি। বেশ কিছু দূরে আদিবাসী গ্রাম। এই কলোনির বাইরে ষাট পঁয়ষট্টি বছর আগে খুলনা, সাতক্ষীরা, নারায়ণগঞ্জ, ঢাকা, বিক্রমপুর, ফরিদপুর থেকে চলে আসা ছিন্নমূল মানুষের দল। সেইসব পরিবারকে দেখলে আজ বোঝা সম্ভব নয় যে, কী অমানুষিক লড়াই করতে হয়েছে। আজ তাদের সিংহভাগ বাড়িতে পাকা ছাদ। সচ্ছলতার ছাপ।
জনপদের একপ্রান্তে গির্জা। স্থানীয় কিছু মানুষ খ্রিস্টান খুব পুরোনো নয়। গির্জার বয়েস হয়তো তিরিশ। প্রবেশ পথেই সুউচ্চ স্তম্ভ, যেটায় প্রাচীন আমলের ঘড়ি লাগানো। সচরাচর এসব ঘড়ি চলে না। কিন্তু আশ্চর্য হল, এই নগরের এই ঘড়ি শুধু যে নিখুঁত সময় দেয়, তাই নয়, ঘণ্টাধ্বনিও শোনায় প্রতি ঘণ্টায়। গির্জার নিজস্ব একটি প্রার্থনাকালের ঘণ্টাধ্বনি তো আছেই।
রবিবার শোনা যায় চার্চ হিমস। সরাসরি এই জনপদের কোনও রেলস্টেশন নেই।
স্টেশনে দেড় ঘণ্টার গাড়ির জার্নি। দশ মিনিট মতো হাঁটলে হাইওয়েও আছে। হাইওয়েতে উঠলেই বাসস্ট্যান্ড। রেলস্টেশন হয়ে বাসও যাচ্ছে। সে-ও হাল আমলে। স্টেশনের নাম সাতমহল। এখানে রয়েছে দুটি মন্দিরও। বাঙালিদের পরিচালিত। বেশি প্রাচীন মন্দিরটির আয়তন, ঠাটবাট বেশি। সেখানেই হয় দুর্গাপুজো কিংবা রবীন্দ্রজয়ন্তী উৎসব পালন হয়। আশ্রমের মধ্যে আর একটি ছোট মন্দিরও রয়েছে। এখানে বলা হয় রাধাকৃষ্ণের যুগল আশ্রম।
বহু বছর হয়ে গেছে দেওঘর থেকে এক শুভ্রবসন মানুষ এসেছিলেন সুন্দরপুরে। যুগলপ্রসাদ ভরদ্বাজ। যখন এসেছিলেন সাদা কালো ছিল দাড়ি। এখন ধবধবে সাদা দাড়ি ও সাদা পোশাক। ধুতি আর ফতুয়া। মাথার চুলও ধবধবে সাদা। এখানে তিনি কেন এসেছিলেন কেউ জানে না। তবে এসেই তিনি প্রথমে আদিবাসীদের পাড়ায় পাড়ায় ঘুরতে শুরু করলেন। আদিবাসীরা সরল মানুষ। কেউ কিছু সন্দেহ করেনি।
অবশ্য সন্দেহ করার মতো কোনও কাজ তিনি করেননি। শুধু বাড়ি বাড়ি যেতেন আর বাচ্চাদের নিয়ে বসে গোন্দ আর হাবালি ভাষায় তাদের শেখাতেন ছোটখাটো কিছু পরিচ্ছন্নতা, বলতেন ধর্মের গল্প। কোনও বিশেষ ধর্ম নয়। সব ধর্মের। ছোট ছোট কাহিনির মাধ্যমে। যে গল্পে নীতিবোধ আছে, মানুষের প্রতি ভালোবাসার কথা রয়েছে, শুধু সেই গল্পই বলতেন। আদিবাসী পরিবারগুলির মহিলাদের তিনি শেখাতেন নানা সার তৈরি করতে। বাজারে কিনতে পাওয়া সার নয়। নানারকম কম্বিনেশনে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জমিতে ফসলের উপযোগী সার। মাঝেমধ্যে থেকেও যেতেন কোনও এক বাড়িতে।
সেই সময়টায় একবার ফাদার স্টুয়ার্ডের কানে খবরটা পৌঁছলে তিনি তাঁর প্রিয় কালো রঙের সাইকেল নিয়ে এসেছিলেন দেখা করতে। গরিব এবং কম শিক্ষিত মানুষের পাড়ায় কে আবার এল? এসে দেখলেন মানুষটা অদ্ভুত। হিন্দু ধর্মগুরু আর সন্ন্যাসী হলে তাঁরা নির্দিষ্ট আস্তানা খুঁজে নেন। সেখানেই ধর্মকথা, কথকতা এসব চলে। কিন্তু যুগলপ্রসাদ মানুষটি সেই অর্থে সন্ন্যাসী নন। মনেপ্রাণে হতে চেয়েছিলেন আদর্শ মানুষ তৈরির কারিগর। ঘুরে ঘুরে যেতেন মানুষের কাছে। ফাদার স্টুয়ার্ডের সঙ্গে তাঁর বেশ বন্ধুত্ব হয়ে গেল।
ফ্রান্স রডরিগজ ছিলেন স্টিল প্ল্যান্টের মেকানিক ডিপার্টমেন্টের সেকশন ইনচার্জ। তাঁর বড় মেয়েটি বিধবা হয়ে এসে ভরদুপুরে আত্মহত্যা করে বসল বাবার কোয়ার্টারেই সামনে। কেন তা জানা গেল না। সেই থেকে ফ্রান্স হয়ে গেলেন চুপচাপ। বেশি কথা বলতেন না।
অবসরের পর তিনি শহরের একপ্রান্তের বাড়িটির নীচের তলায় উঠে এলেন ভাড়াটে হিসাবে। বাড়িটি প্রণবেশ চক্রবর্তীর। তাঁদের পারিবারিক ব্যবসা বর্ধমানে। টুরিস্ট বাসের। মাঝেমধ্যেই বছরে কয়েকবার হয়তো আসেন প্রণবেশবাবু। তাঁর বাবা এই বাড়িটি তৈরি করেছিলেন। তিনি ছিলেন স্টিল প্ল্যান্টের কর্মী। মেয়ের বিয়ে হয়েছিল এই বাড়ি থেকেই। ছেলে প্রণবেশ অবশ্য এখানে রইলেন না।
সেই বাড়িই ভাড়া নিলেন ফ্রান্স। তাঁর ফেলে যাওয়া কোয়ার্টারকে সকলেই এড়িয়ে যাচ্ছিল। অ্যালটমেন্ট হলেও কেউ ওই কোয়ার্টার নিতে চায় না। তাদের কাছে অভিশপ্ত ওই কোয়ার্টার।
স্টিল প্ল্যান্টের আবাসন বিভাগের সঙ্গে কথা বলে ফাদার স্টুয়ার্ডই যুগলপ্রসাদকে ওই কোয়ার্টারে থাকতে বললেন। সেই থেকে যুগলপ্রসাদ ওখানেই থাকছেন। এখন ওটাই মানুষের মুখে মুখে যুগল আশ্রম।
বছরখানেকের মধ্যেই যুগলপ্রসাদ সেখানে ছোট্ট লাইব্রেরি করে ফেললেন। করলেন একটা টিউটোরিয়াল। ঘুরে ঘুরে কলেজের ছেলেমেয়েকে বলেন, তোমরা এখানে একদিন দু-দিন করে একটু পড়াও। ক্রমেই তারা হয়ে পড়েছিল যুগলপ্রসাদের অনুগামী। যুগলপ্রসাদকে দেখতে সাধুর মতো। তাঁর কাছে সম্ভবত বেশ কিছু টাকা জমা ছিল। সেই টাকায় নিজেই নিজের জিনিসপত্র কেনাকাটা করতেন। এই প্ল্যান্টের টাইপ টু কোয়ার্টারগুলোর বিল্ডিংয়ের পিছনে এক টুকরো জমি আছে। সেখানে নিজের হাতে কিচেন গার্ডেন বানিয়েছিলেন। ফুলকপি, বেগুন, পেঁপে, পুঁইশাক, লংকা হয় সেখানে। এখনও যুগলপ্রসাদ আদিবাসী গ্রামে যান নিয়ম করে।
একটু একটু করে জানা গেল যুগলপ্রসাদ আসলে একজন কৃষিবিজ্ঞানী। একসময় কল্যাণীর বিধানচন্দ্র কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়েও ছিলেন। তারপর চলে যান ওড়িশায়। ওড়িশার গ্রামে গ্রামে আদিবাসীদের তিনি শেখাতেন কীভাবে বীজ সংরক্ষণ করে রাখতে হয়। মুক্ত অর্থনীতির দরজা খুলে যাওয়ার পর ভারতে ঢুকে পড়েছিল সেইসব কর্পোরেট হাউস, যাদের প্রধান লক্ষ্য ছিল ভারতের সোনার মাটি, সোনার খেতখামার। ফুড ক্রপের পরিবর্তে ওরা ক্যাশ ক্রপ করানোর প্রলোভন দেখাচ্ছিল। একের পর এক শস্যের বীজের বৈচিত্র্য কমছিল। কৃষি বিশেষজ্ঞ হিসাবে ওড়িশা সরকার সাহায্য নিয়েছিল যুগলপ্রসাদের। সেই থেকে তিনি গ্রামে গ্রামে ঘুরতেন, বীজের নমুনা সংগ্রহ করতেন। গ্রামবাসীদের বীজ সংরক্ষণের প্রক্রিয়া শেখাতেন। কলিঙ্গনগরের গ্রামের পর গ্রাম জুড়ে যুগলপ্রসাদ হয়ে উঠেছিলেন খেতি মহারাজ। এক সময় একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা গঠন করলেন। কুড়ি জন যুবক-যুবতীর টিমকে তৈরি করে নিয়েছেন যুগলপ্রসাদ। তাদের মধ্যে কয়েকজন আবার তাঁর পুরোনো ছাত্রছাত্রী। যুগলপ্রসাদও তাঁদের পেয়ে নিশ্চিন্ত। তাঁর স্বভাব হল, কোনও এক মাটিতে শিকড় যেন না ছড়িয়ে যায়। তিনি শিকড়কে ভয় পান। তিনি গাছ হতে চাননি কখনও। নদী হতে চেয়েছেন। তিনি চান, আমি পলিমাটি এনে দেব। সেই মাটিতে অন্যরা ফসল ফলানোর দায়িত্ব নিক। সেই ফসল পৌঁছোক কৃষক মান্ডি হয়ে দূরবর্তী শহরের রান্নাঘরেও।
তারপর যেদিন তাঁর ছাত্রছাত্রীরা গ্রামে গ্রামে বীজ সংরক্ষণ, বেশি বেশি করে খাদ্যশস্য ফলন আর মার্কেটিংয়ের দায়িত্ব নিল, যুগলপ্রসাদ স্বস্তির শ্বাস ফেললেন। তিনি বুঝলেন, তাঁর কাজ শেষ। তাঁকে যেতে হবে অন্য কোথাও।
সেভাবেই একদিন যুগলপ্রসাদ দেওঘরে গিয়েছিলেন বন্ধু পবন কুশারীর সঙ্গে দেখা করতে। পবন তাঁর দীর্ঘকালের বন্ধু। তাঁরা দুজন একটা সময় রাষ্ট্রসংঘে পর্যন্ত গিয়েছিলেন একটা প্রজেক্ট নিয়ে। যুগলপ্রসাদ আর পবন কুশারী।
নেহরুজীর আমলে এগ্রিকালচার ডিরেক্টর ওঁদের পাঠালেন ইন্ডিয়ার ডেলিগেট করে দিয়ে ইউনাইটেড নেশনসে। যেসব দেশে সবুজ উদ্ভিদের চল খাদ্য হিসাবে বেশি নেই, সেরকম কয়েকটি দেশে টিম পাঠানো হয়েছিল। সকলেই কৃষিবিজ্ঞানী। সেই টিমেই ছিলেন যুগলপ্রসাদ আর পবন। প্রায় বছর দেড়েক ল্যাটিন আমেরিকার ওরকম কয়েকটি দেশে থেকে, আবার তাঁরা ফিরে আসেন।
পবন কুশারী খুব ভালো করেই জানেন বন্ধুটির কার্যকলাপ। একদিন সকালে যুগলপ্রসাদকে নিজের দেওঘরের বাড়ির দোরগোড়ায় দেখে বুঝেছিলেন আবার কোনও মতলব ভাঁজছে শ্রীমান। এত বয়স হলেও ওর পাগলামি রয়েই গেছে। পবনই যুগলপ্রসাদকে বলেছিলেন, এই সুন্দরপুরের কথা। তাঁর এক ছাত্রের ছেলে এই প্ল্যান্টে কাজ করে। আদিবাসীদের কথা শুনে আর জায়গাটার বর্ণনা শুনেই তাঁর মনে পড়েছিল যুগলের কথা। যুগলপ্রসাদ শুনেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন সুন্দরপুর তাঁকে টানছে। সেই থেকে এখানে। কেন্দ্রীয় সরকারের যথেষ্ট পেনশন। বই লেখার রয়্যালটিও পান। সুতরাং টাকা পয়সা নিয়ে তাঁর ভাবনা নেই।
এই সুন্দরপুরে তাঁর মনের মতো দুই বন্ধু হলেন ফাদার স্টুয়ার্ড আর ইতিহাসের অধ্যাপক ব্রহ্মেন্দ্র সান্যাল। মাঝমধ্যেই দেখা যায় এই তিনজন বিকেলে ক্রিকেট গ্রাউন্ড অথবা চার্চের মাঠে হাঁটছেন অথবা বেঞ্চিতে বসে গল্প করছেন। সুন্দরপুরের মানুষেরা এই তিনজনকেই খুব শ্রদ্ধা করে। আড়ালে ডাকে অমর আকবর অ্যান্টনি।
ফাদার স্টুয়ার্ডও অন্যরকম মানুষ। সাধারণত আদিবাসীদের টাকা-পয়সার প্রলোভন দেখিয়ে তাদের ধর্মান্তরণ করতেই পাদ্রীরা এইসব প্রত্যন্ত জায়গাগুলিকে টার্গেট করে। তবে ফাদার স্টুয়ার্ড কখনও ওভাবে প্রলোভন দেখাননি। তিনি আসার আগেই এই আদিবাসী পাড়ায় খ্রিস্টধর্মের প্রভাব ছিল।
তুলুং গ্রামের কাছে রয়েছে প্রাচীন চার্চ। ব্রিটিশ আমলে এই সুন্দরপুর আর রূপধারিয়ার একাংশ ছিল শিকারের জন্য আদর্শ। ধানবাদ, রাঁচি, সম্বলপুর, ভোপাল ইন্দোর থেকেও ব্রিটিশ প্রশাসনিক আধিকারিক ও আর্মি অফিসাররা এসে এখানে পাহাড়, নদী, জঙ্গলের সঙ্গমস্থলে নিজেদের মতো শিকার আর ছুটি কাটানোর স্থান হিসাবে গড়ে তোলে।
এখনও রূপধারিয়ার একটি অঞ্চলে সেই স্মৃতি রয়ে গিয়েছে। গলফ কোর্স, ক্রিকেট গ্রাউন্ড। তবে আজ আর গলফ খেলার মানুষ কোথায়? তবে ক্রিকেট গ্রাউন্ডে আজও খেলা হয়। আর হয় স্টিল প্ল্যান্টের বার্ষিক স্পোর্টস। এভাবেই সাহেবদের অনেকেই ছুটি কাটানোর পাশাপাশি স্থায়ীভাবে থাকতেও শুরু করে দিয়েছিল। বিশেষ করে অবসরের পর।
স্বাধীনতার পর তাদের চলে যেতে হল। বাঙালি বিহারি বাবুদের দলও এসে গেল। তার একটা কারণ অবশ্য আছে। কেমিক্যাল প্ল্যান্ট। ব্রিটিশ আমলেই সেটি গড়ে তোলা হয়েছিল। প্ল্যান্টকে ঘিরে রূপধারিয়া জনবসতির চেহারা নিচ্ছিল। সুন্দরপুরে প্ল্যান্ট ছিল না। ছিল সেটি এগারো কিলোমিটার দূরের রূপধারিয়ায়।
তবে সুন্দরপুরই প্ল্যান্টের কর্মীদের কাছে শহর হয়ে ওঠে। কর্মী, অফিসার, শ্রমিকরা সুন্দরপুরে থাকতেই পছন্দ করল। গড়ে উঠল স্কুল, কলেজ, গির্জাও। কর্মীদরদি এক অফিসার ছিলেন মেকানিক্যাল ম্যানেজার যোশেফ রোজারিও, কর্মরত অবস্থায় মারা যান। পরে কলেজের নাম হয় তাঁর নামে। রোজারিও মেমোরিয়াল কলেজ।
ধীরে ধীরে আদিবাসী পাড়া সিংহভাগও সুন্দরপুরেই চলে এসেছিল রূপধারিয়া থেকে। আগে এই মানুষ ও তাদের পূর্বপুরুষরা ওই রূপধারিয়ার বাসিন্দা ছিল। কিন্তু রূপধারিয়ায় ঘটে গেছিল অদ্ভুত ঘটনা। রূপধারিয়ায় নাকি একটানা পাঁচ দিন ধরে হয়েছিল শিলাবৃষ্টি।
কেমিক্যাল প্ল্যান্টের প্রধান যে বর্জ্য নিষ্কাশনী ব্যবস্থা সেটি ফেটে গেল। বোকারো থেকে বিশেষজ্ঞরা এসে মেরামতি করলেন বটে। কিন্তু একটা সাংঘাতিক ক্ষতি হল। কয়েক মাস পর দেখা গেল রূপধারিয়ার উর্বর জমিতে আর ফসল ফলছে না।
আদিবাসীদের কাছে মাটি, গাছ, পাহাড়, নদী এসব ঈশ্বরের মতো। তাই সেই মাটি যখন বন্ধ্যা হয়ে গেল তারা নিশ্চিত যে রূপধারিয়ার উপর ঈশ্বরের অভিশাপ নেমে এসেছে। সেই বিশ্বাস প্রবল হয়ে উঠল, দেখা গেল কেমিক্যাল প্ল্যান্টও ম্রিয়মাণ হয়ে পড়েছে।
অর্ডারও কমতে থাকল। প্ল্যান্টের অবস্থা খারাপ হতে থাকে। এসব কোনও অভিশাপ নয়। ব্রিটিশরা ভারত ছেড়ে চলে যাওয়া একটা কারণ। ১৯৪৬ থেকেই তোড়জোড় শুরু করে দিয়েছিল। ভাইসরয় লর্ড ওয়াভেল লন্ডনে বসে থাকা ব্রিটিশ সরকারকে বারংবার বার্তা পাঠাচ্ছেন, এখনই একটা এক্সিট প্ল্যান করা দরকার। চারদিকে দাঙ্গা চলছে। ইন্ডিয়ায় আমাদের বেশিদিন থাকা চলবে না। ব্রিটিশ সরকারেরও তেমন ইচ্ছা নেই।
কারণ ব্রিটিশ সাম্রাজ্য আর্থিকভাবে ডুবন্ত জাহাজ হয়ে যাচ্ছে। ভারতকে স্বাধীনতা দিতে চাপ আসছে খোদ ব্রিটেনের অভ্যন্তর থেকেই। সুতরাং এইরকম সময়ে প্রত্যন্ত স্থানে থাকা কেমিক্যাল প্ল্যান্টের লাভ লোকসান নিয়ে ব্রিটিশ ফার্মও মাথা ঘামাচ্ছিল ছিল না। কেমিক্যাল প্ল্যান্টটি বিবর্ণ, গুরুত্বহীন হতে শুরু করল।
তবে প্ল্যান্টটি পুরোপুরি বন্ধ হল না। কারণ, সুন্দরপুর আর রূপধারিয়া। জায়গাদুটিকে ভালোবেসে ফেলেছিল ব্রিটিশ অফিসার আর উপরতলার বাঙালি অফিসাররাও। তাই মোটামুটি কাজ চলতে থাকল প্ল্যান্টে।
তাছাড়া স্বাধীনতার পর ভারত ছেড়ে চলে গেলেও ব্রিটেনে ফিরে সমস্ত ফার্ম যে আবার লাভজনক হয়ে উঠতে পারবে সেটাও অনিশ্চিত। তবু তো এখানে একটা আয়ের পথ রয়েছে। ঠিকও হয়নি যে কবে ব্রিটিশ চলে যাবে। এমতাবস্থায় টিমটিম করে হলেও প্ল্যান্ট চলতে থাকল।
তবে আদিবাসীরা রইল না। রূপধারিয়া থেকে তাদের মন উঠে গিয়েছে। তারা চলে এল সুন্দরপুরের দিকে। সেই তখন থেকেই আদিবাসীদের একটি দুটি করে গ্রাম গড়ে উঠল সুন্দরপুরকে ঘিরে। জমজমাট হতে শুরু করল এই জনপদ। আদিবাসীরা মাটি, জঙ্গল ছাড়া থাকতে পারে না। তারা নিজেরাই সাত নম্বর কিংবা বুরুন্দা পাহাড়ের ডাইনে আর বাঁয়ে জমিগুলিতে বসতভিটা করে নিল। চাষবাসও অল্পবিস্তর হচ্ছে। রূপধারিয়ার কেমিক্যাল প্ল্যান্ট চলেছিল স্বাধীনতার পরও বেশ কিছু বছর। শেষ চেয়ারম্যান হপকিন্স সাহেবের জামাই ছিলেন বাঙালি।
তিনি নিজে বসতেন কলকাতার অফিসে। হপকিন্স সাহেবের স্ত্রী সুন্দরপুরকে ভালোবেসে ফেলেন। তিনি আর জামাই মিলেই লড়ে যাচ্ছিলেন ডুবন্ত প্ল্যান্টকে স্বাধীন ভারতে ফের উজ্জ্বল করে তুলতে।
কিন্তু শেষপর্যন্ত সব ওলটপালট হয়ে গেল। হপকিন্স সাহেব প্ল্যান্ট বেচে দিলেন রাজস্থানের মালিককে।
তারা এসেই সবার আগে পুরোনো লোকজন সরিয়ে দিয়েছিল। সেই কেমিক্যাল প্ল্যান্ট এখনও চলছে। তবে সেই রমরমা নেই। মাঝখানে কারখানা লিজ নিয়েছিল ভারত বিখ্যাত এক মদের কোম্পানি। এইসময়েই আবার রূপধারিয়া উজ্জ্বল হতে শুরু করে। নতুন করে কারখানা, রাস্তা, ভিতরের বাগান তৈরি করে ওই কোম্পানি। এমনকী অনেক রিক্রুটমেন্টও হল।
সুন্দরপুরের চরিত্রেও হঠাৎ এসে গেল বড়সড় বদল। দলে দলে নিরুপায় মানুষ চলে এল। বাসিন্দাদের পরিচয়, তারা রিফিউজি। গড়ে তুলল নিজেদের এক জনপদ। সুন্দরপুরের মধ্যে প্রবেশ করল দুটি সুন্দরপুর। বুরুন্দা পাহাড়ের দিকে গোন্দ উপজাতি গ্রাম। সাত নম্বর পাহাড়ের দিকে হালবা আদিবাসীদের জনপদ। আবার হালবা জনজাতির গ্রামের কাছে নতুন উদ্বাস্তুদের গ্রাম।
আটের দশকের শুরুতে ইন্দিরা গান্ধী ফের ফিরে এসেছিলেন ক্ষমতায়। তখনই সুন্দরপুর আর রূপধারিয়ার মধ্যবর্তী স্থানে হাইওয়ের উপরে কেন্দ্রীয় সরকার চালু করল এক স্টিল প্ল্যান্ট। সরকারি প্ল্যান্ট। অচিরেই সুন্দরপুরের সৌভাগ্য খুলে গেল। রূপধারিয়ার কেমিক্যাল প্ল্যান্টকে ছাপিয়ে বস্তারের বিস্তীর্ণ অংশে প্রধান কারখানা হল এই সুন্দরপুরে। হ্যাঁ, নিউ সুন্দরপুর। আরডিপি স্টিল প্ল্যান্টের নাম দেওয়া হয়েছিল রূপধারিয়ারই নামে। এভাবেই সুন্দরপুরে এল সম্পূর্ণ তিনটি আলাদা সমাজ। তিন রকম সুন্দরপুর। আদিবাসী। উদ্বাস্তু। প্ল্যান্টকলোনির অফিসার কর্মী।
সুন্দরপুরের প্রাণভোমরা স্টিলপ্ল্যান্ট। আটের দশকের শুরুতে তৈরি হয়েছিল ছোট আকারে। ক্রমেই আয়তন বাড়তে থাকে। স্টিল প্ল্যান্ট থাকলে ডাউনস্ট্রিম আর অ্যানসিলারি শিল্পও গড়ে ওঠে। এখানে হয়েছিল বটে। তবে খুব বড় মাত্রায় নয়। তাই দেশের বড় বড় স্টিল প্ল্যান্ট যে শহরগুলিতে গড়ে উঠেছে, সে তুলনায় সুন্দরপুর নির্জনই রয়ে গেল।
প্ল্যান্টের অফিসার, কর্মী আর গ্রুপ ডি স্টাফ ছাড়া, শ্রমিক গোছের যে কাজগুলো চুক্তির ভিত্তিতে রয়েছে তাদের জন্য দূরে এক আবাসন। ওটা কাঠিয়া কোয়ার্টার, প্ল্যান্টের অফিসারদের জন্য রয়েছে পৃথক কোয়ার্টার এলাকা। সেগুলি প্লট করে করে একটি করে একতলা দেড়তলা বাড়ি। তবে বহু পরিবারই এই জায়গাটাকে এত ভালোবেসে ফেলেছে যে, এখানেই জমি কিনে বাড়ি করে ফেলেছে। এভাবেই আজ সুন্দরপুর ছিমছাম জনপদ।
হাইওয়ে থেকে একটা রাস্তা নেমে এসেছে। সেই রাস্তাটির দু-পাশে ঘন জঙ্গল। কিছু কিছু বন্য প্রাণী থাকলেও বাঘ ভালুক কেউ দেখেনি। তবে শেয়াল, বনবেড়াল এসব আছে। আর রয়েছে প্রচুর ময়ূর। মাঠে-ময়দানে নীলগাই দেখতে পাওয়া যায়। জঙ্গল চিরে আসা রাস্তাটির এক দেড় কিলোমিটার পর থেকেই শুরু হয়ে গিয়েছে সুন্দরপুরের সীমানা।
প্রথম বিল্ডিংটাই প্রাইমারি হেলথ সেন্টার। এখানে দুজন ডাক্তার সপ্তাহে আসেন। আউটডোরের পাশাপাশি ইনডোর আছে বটে, তবে বড় অপারেশন অথবা রোগের চিকিৎসার জন্য সাতমহল যেতে হবে। এমনই ভূগোল আর যাপনকে সঙ্গে নিয়ে অত্যাধুনিক শহরগুলির থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েই সুন্দরপুর।
