১
সদর দরজায় জোরে জোরে শব্দ হচ্ছে। এত সকালে কে এল?
রাতে বারবার উঠতে হয়েছে সন্ধ্যাকে। সুধাময়ীর কাশি বেড়েছে। মকরধ্বজ বেটে আর বাসক পাতার রস করে রেখেছিল সন্ধ্যা। প্রচণ্ড শীতে সেটা ঠান্ডা হয়ে যায়। তাই বেশ কয়েকবার বাসক পাতার রস স্টোভ জ্বেলে গরম করে দিতে হয়েছে। সেই কারণেই আজ ভোরে সন্ধ্যার ঘুম ভাঙেনি। অন্যদিন হলে এতক্ষণে সে ঘুম থেকে উঠে যায়। মোটামুটি দশটার মধ্যেই বেরিয়ে যায় প্রভাস। যুগীগঞ্জের বকুলপুর থেকে সাইকেলে সদর বাজার অন্তত যেতে পঁচিশ মিনিট লাগে।
অনেকবার সন্ধ্যা বলেছে, বাসে করে যেতে। একটু হেঁটে গেলে নতুন রাস্তা। সেখান থেকে বাস যায় সদরে। সামান্য কয়েকটা স্টপেজ। আরাম করে যাওয়া যায়। অথচ প্রভাস সাইকেল ছাড়া যাবে না। সাইকেলে করে যাওয়াই প্রভাসের পছন্দের। তাই আর জোর করে না সন্ধ্যা। প্রভাস সাইকেলের যত্ন করে প্রতি শুক্রবার। সেদিন বাজার বন্ধ থাকে। আজ শুক্রবার। তবে ছেলের স্কুল আছে। সন্ধ্যাকে ছেলের জন্য উঠে এখন কিছু রান্না করতেই হবে।
কিন্তু এত সকালে এরকম জোরে জোরে দরজায় ধাক্কা দিয়ে ডাকছে কে? পাশের খাটে প্রভাস অকাতরে ঘুমাচ্ছে। এই শোয়ার ঘরটি বড়। একটি বড় খাট তো আছেই। আবার অন্যদিকে আরও একটি সিঙ্গল খাটও বেশ ধরে গিয়েছে। সেখানে প্রভাস একা শোয়। আর ছেলে মেয়েকে নিয়ে সন্ধ্যা বড় খাটে। এদের কারও কানে ওই দরজা ধাক্কা দেওয়ার শব্দ এখনও যায়নি। শীতের ভোরে লেপ মুড়ি দিয়ে সব ঘুমাচ্ছে।
সুধাময়ীর বয়সি অন্য কোনও মহিলা হলে এতক্ষণে চিৎকার করে বাড়ির মানুষদের ঘুম থেকে তুলে দিতেন। কিন্তু সন্ধ্যা জানে, বারান্দার বিপরীত প্রান্তে থাকা সুধাময়ী অপেক্ষা করছেন যে, কখন সন্ধ্যা উঠে দরজা খুলবে। তিনি জানেন, সন্ধ্যা দরজা খুলবে বেশভূষা ঠিক করে নিয়ে। সাধারণত বয়স হয়ে গেলে যে অধীরতা তৈরি হয় মানুষের মনে, সেটা আশ্চর্য রকমভাবে সুধাময়ীর নেই। তিনি অযথা চিৎকার চেঁচামেচি করেন না। বয়স একষট্টি বছর।
সুধাময়ী অনেক বেশি চুপচাপ হয়ে গিয়েছেন, তাঁর বড় ছেলে ইন্ডিয়ায় চলে যাওয়ার পর সেটা তাঁর কাছে একটা বড় ধাক্কা। বড় নাতির জন্য মন কাঁদে সবসময়। তারা বছরে একবার করে আসে। তবে ক্রমেই বোঝা যাচ্ছে যে টান যেন কমছে। এখন এলেও একটা অতিথি অতিথি ভাব। সুধাময়ী প্রথম প্রথম অতিরিক্ত আতিশয্য এবং আকুলতায় বড় ছেলে, নাতিকে বেশি বেশি আদর দিয়ে অস্থির করে তুলতেন। কিন্তু কয়েক বছর আগে তাঁর হঠাৎ বোধোদয় হয়েছিল যে, সন্ধ্যা ঠিক ওই সময়টায় কেমন যেন গুটিয়ে যায়। প্রভাসও একটু উদাসীন থাকে।
বারবার বলা সত্ত্বেও প্রভাস দাদার ফেলে যাওয়া ঘর দখল করেনি। ছেলেমেয়ে নিয়ে সে এখনও একটি ঘরেই থাকে। সুধাময়ীর বড় ছেলের ঘর তালা দেওয়া থাকে। ইন্ডিয়া থেকে যখন ওরা বেড়াতে আসে মাঝেমধ্যে, তার কয়েকদিন আগে খোলা হয় সেই ঘরের দরজা। যত্ন করে ঝাড়পোঁছ করে দেয় সন্ধ্যা। বড় ছেলে প্রদীপ আর তার স্ত্রী মনোরমা এসে খুশি হয়ে যায় ঘরের এই যত্ন দেখে।
কিন্তু তারপরই বড় ছেলে আর ছেলের বউ ইন্ডিয়াতে যে কতরকম সুবিধায় এবং তারা কত ভালো আছে, এটা বোঝানোর জন্য বেশি বেশি করে নানারকম গল্প করে। সুধাময়ী বুঝতে পারেন ছোট ছেলের কাছে এটা বেশ বেদনাদায়ক। প্রভাসের একটা জামাকাপড়ের দোকান। কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানে আর শান্তি এল না। মারদাঙ্গা, মিলিটারি রুল, চাকরি বাকরির অভাব, খাদ্যসঙ্কট।
সুধাময়ী বুঝেছেন, সারাবছর তাঁকে যথেষ্ট যত্ন করে রেখেছে প্রভাস আর সন্ধ্যা। সেখানে হঠাৎ বড় ছেলে এলেই সুধাময়ীর সব আদর যত্ন বাড়াবাড়ি পর্যায়ে চলে যাওয়া ঠিক নয়। তাই সুধাময়ী ক্রমেই গত কয়েক বছর ধরে সংযমী আর চুপচাপ হয়ে গেছেন। এখন প্রদীপ আর মনোরমা এলেও সুধাময়ী তেমন অতি আতিশয্য দেখান না।
দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে এসে সদর দরজা খুলে দিল সন্ধ্যা। সামনেই অমূল্য। হাঁপাচ্ছে। বেশ উস্কোখুস্কো চেহারা। মা-বাবার কি কিছু হল? সন্ধ্যার বুক কাঁপছে।
তুই? এখন? কী হয়েছে? সব ঠিক আছে?
অমূল্য ঢুকে এসে বলল, প্রভাসদা কই?
সন্ধ্যা বলল, এখনও ঘুমায়। কী ব্যাপার বল তো?
অমূল্য বলল, দিদি আমাদের ওখানে আবার ঝামেলা শুরু হয়েছে। বাড়িঘর মন্দির পুড়িয়ে দেওয়া চলছে। মারাও গিয়েছে অনেকে। মানুষজন পালাচ্ছে।
সন্ধ্যা আর্তস্বরে বলল, বলিস কী? মা-বাবা?
অমূল্য বলল, ওরা ঠিক আছে। তবে কতদিন? এক-আধটা জায়গায় না। খুলনা, দৌলতপুরের বহু গ্রাম জ্বলছে। মোল্লারা হিন্দুদের অ্যাটাক করছে।
সন্ধ্যা উদ্বিগ্ন, বলল, হঠাৎ কী হল? কবে থেকে? কী নিয়ে শুরু হল? তৈমুর, আকবরচাচা, সুলতানদাদারা?
অমূল্য বলল, ওরা ক্লাবেরো ছেলেদের বলেছে এলাকায় ঢোকা আর বেরোনোর পথ আটকে রাখতে। বাইরের কাউকে ঢুকতে দিচ্ছে না। আমাদের বলেওছে যে, কোনও ভয় নেই। আমরা যেন ঘর ছেড়ে না চলে যাই! ওরাই পুলিশ আর ইপিআর পাহারার ব্যবস্থা করছে। কিন্তু কালই আকবরচাচা বলছিল, এটা পলিটিক্স। লিগের সঙ্গে যাদের ঝামেলা, তারাই নাকি আয়ুব খানকে খুশি করতে এসব করছে।
সন্ধ্যার চোখেমুখে অসহায় প্রতিক্রিয়া। হঠাৎ চোদ্দো বছর আগের একটি ঘটনার দৃশ্য তার চোখের সামনে ভাসছে। মামাবাড়ি থেকে ফেরার পথে আচমকা তাদের নৌকার কাছে আর একটা নৌকার লোকজন হাতে লাঠি বল্লম নিয়ে চলে এসেছিল। আর জোর করে ধাক্কা দিতে দিতে বড় বড় লাঠি দিয়ে খুঁচিয়ে সন্ধ্যাদের সেই নৌকা উলটে দেয় মাঝনদীতে।
ছোট ছোট ছেলেমেয়ে, বয়স্ক মানুষদের প্রতি কোনও দরদ দেখায়নি তারা। বরং জলে পড়ে যাওয়া মানুষগুলিকে বল্লম আর লাঠির ভয় দেখিয়ে চারদিকে ঘুরপাক খাচ্ছে ওই দস্যুর দল। কাউকে শ্বাস নিতে দেবে না। সকলে ডুবে মরে যাক, এটাই যেন তাদের উদ্দেশ্য। ষোলো বছরের সন্ধ্যা সাঁতার জানে। সে দাঙ্গার কথা শুনেছে। কিন্তু চোখের সামনে দেখেনি। এটাই কি দাঙ্গা? থরথর করে কাঁপছে সে।
বাবা তার হাত শক্ত করে ধরে আছে। অথচ এরকম সময় তাকে ছেড়ে দেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। হাত ধরে রাখলে সে সাঁতার দেবে কীভাবে? ওই আধগলা জলে হাবুডুবু খেতে খেতে বাবার সেই বোধ হল না।
সন্ধ্যা চিৎকার করছে, বাবা হাত ছাড়ো…হাতডা ছাড়ো…। সজোরে হাত ছাড়িয়ে নিয়ে সন্ধ্যা অনেকটা ডুবসাঁতার দিল। তবে তার মধ্যেই একটা কোস্টাল পুলিশের লঞ্চ এসে পড়ায় ওই আক্রমণকারীরা পালায়। প্রায় সকলেই প্রাণে বেঁচে গেলেও দুজন নিখোঁজ ছিল। সকলকে লঞ্চে চাপিয়ে কোস্টাল পুলিশ আবার খুলনায় পৌঁছে দিয়েছিল। কিন্তু ঘটনার সেই অভিজ্ঞতা এখনও তাড়া করে বেড়ায় সন্ধ্যাকে।
১৯৫০ সালের সেই দাঙ্গায় বহু মানুষের জীবন ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। একটা দেশভাগ যে কত লক্ষ লক্ষ পরিবারের ভাগ্যকে চিরতরে বদলে দিল! ওই চরম আতঙ্ক নিয়ে বাড়ি ফেরার পর সেদিন মা বারবার বলেছিল, আর এখানে থাকা যাবে না। আর থাকার মানে নেই। আমাদের ইন্ডিয়া চলে যাওয়াই ভালো।
কিন্তু যাওয়া হয়নি। কারণ সেখানে গিয়ে কী করবে? কোথায় থাকবে? শোনা যায় ইন্ডিয়ায় রিফিউজিদের অবস্থা চরম দুর্দশাগ্রস্ত।
অমূল্য বলল, আকবরচাচা বাড়িতে এসে থাকছে রাতের বেলা। বলেছে করাচি ইউনিভার্সিটিতে নাকি কাশ্মীর দিবস পালন করা হয়েছে। সেখান থেকেই ডাক এসেছে এখানেও যেন আমাদের কচুকাটা করা হয়।
সন্ধ্যা! কেডা আইল?
সুধাময়ীর কণ্ঠস্বর। সন্ধ্যা ত্বরিৎ গতিতে উঠে গিয়ে বলল, অমূল্য এসেছে মা।
সন্ধ্যার পেছন পেছন এসে অমূল্য পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে বলল, কেমন আছেন জেঠিমা?
সুধাময়ী তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে লক্ষ করছেন অমূল্যকে। বললেন, তোমারে এমন আউলা লাগে ক্যান! কী হইছে!
অমূল্য ইতস্তত করছে। সে ঠিক বুঝতে পারছে না সুধাময়ীকে বলা ঠিক কিনা। কিন্তু এই মহিলা অত্যন্ত বুদ্ধিমতী। ১৯৪৬ সালের দাঙ্গায় তাঁর স্বামীর মৃত্যু হয়েছিল। এক উকিল বন্ধুর অনুরোধে তিনি নোয়াখালি গিয়েছিলেন মেয়ের বিয়ের পাত্র দেখতে। সুধাময়ী বারংবার বলেছিলেন না যেতে। কিন্তু হেসে উড়িয়ে দিয়েছিলেন তিনি। আর ফেরেননি।
তারপর থেকে দফায় দফায় দাঙ্গা হয়েছে পূর্ব পাকিস্তানে। সুধাময়ী দাঙ্গার কথা শুনলে ভয়ার্ত হয়ে ওঠেন। তাঁর একটাই নির্দেশ থাকে। কেউ বাড়ির বাইরে যেতে পারবে না। এমনকী অনেক দূরের কোথাও ঝামেলার সংবাদ এলেও সুধাময়ী প্রভাস অথবা নাতিনাতনিকে বাড়িতে আটকে রাখতে চান। বেরোতে দেন না। তাঁর কথা না শুনলে নীরবে কান্নাকাটি করেন। তাই তাঁকে অনেক সময় সব কথা বলা হয় না। এই পূর্ব পাকিস্তানের প্রতিটি পরিবার কমবেশি ধরে নিয়েছে, এভাবেই হয়তো কাটাতে হবে বাকি জীবন।
দিদি সন্ধ্যার দিকে তাকাল অমূল্য। অর্থাৎ সে কী উত্তর দেবে? সন্ধ্যার দিক থেকে কোনও ইশারা এল না। কারণ সে নিজেও জানে না কী বলা উচিত। তার বুক কাঁপছে।
ঠিক সেই সময় প্রভাস ঘর থেকে বেরিয়ে বলল, অমূল্য কখন এলে?
সুধাময়ীকে কিছু বলার দায় থেকে অমূল্য বেঁচে গেল। সে দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে প্রভাসকে বলল, এই তো একটু আগে। আপনি ঘুমাচ্ছিলেন। দোকান নেই আজ?
প্রভাস বলল, না। আজ তো বন্ধ। তারপর একবার সন্ধ্যা আর একবার অমূল্যের দিকে তাকিয়ে রইল জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে। অর্থাৎ সব ঠিক আছে তো? অমূল্য কেন এসেছে?
অমূল্য সেই চোখের ভাষা বুঝে সুধাময়ীর ঘর থেকে বাইরে এসে সামান্য নিচু স্বরে বলল, খুলনা দৌলতপুরে আগুন জ্বলছে।
মানে?
অমূল্য আবার বলল, কী কী ঘটছে।
প্রভাস সন্ধ্যার মতোই বিস্মিত হল। সে সন্ধ্যার সুরেই প্রশ্ন করল, কিন্তু কারণটা কী এবার?
অমূল্য বলল, আকবরচাচা বলছিল কাশ্মীরের কোন মসজিদ থেকে হজরত মহম্মদের চুল চুরি হয়ে গেছে। আর সেই খবর জানাজানি হতেই কাশ্মীর, করাচী, লাহোর সব জায়গায় মিছিল মারদাঙ্গা শুরু হয়ে যায়। ঢাকায় এসে আয়ুব খান বলে গেছে, এরপর এখানে যদি বিক্ষোভ আন্দোলন হয় তাহলে আমাদের কিছু করার নেই। ইন্ডিয়ার সরকার নাকি ইচ্ছে করে এসব করেছে! মুসলমানদের ধর্মের কোনও দাম নেই!
প্রভাস বলল, আয়ুব তো এসব বলছে নিজের পজিশন স্ট্রং করার জন্য। এমনিতেই তো তার অবস্থা খারাপ। তার মানে সে নিজেই বলে গেল যে তোমরা দাঙ্গা হাঙ্গামা করো।
অমূল্য বলল, হ্যাঁ। তারপরই তো হঠাৎ আমাদের এলাকায় সব মিছিল শুরু হয়ে গেল। মংলা পোর্টের কাছে শ্যাওলাবুনিয়া, কানাইনগর, মোকদ্দমপুরে কোনও বাড়ি বোধহয় আস্ত নেই। সব জ্বলেপুড়ে ছাই। আমার ঢাকার বন্ধু বলল, বাগেরহাটের রূপসা, নীলাপুর, সামন্তসেনা, খাজুরা, চুলকাঠি সব জায়গায় ছড়িয়েছে।
প্রভাস বলল, এই ঝামেলার মধ্যে তুমি কেন এলে?
অমূল্য বলল, ঢাকায় কাল আমার একটা ইন্টারভিউ আছে। তাই আসতেই হল। চাকরির অবস্থা তো জানেন।
প্রভাস বলল, কীসের ইন্টারভিউ?
অমূল্য বলল, হাসপাতালের কোঅর্ডিনেটরের। প্রাইভেট।
প্রভাস বলল, তা তুমি ঢাকায় চলে এলে ওদের কী হবে? ওরা কী করবে?
অমূল্য বলল, ওখানে পাড়া পাহারা চলছে। আমার উপায় ছিল না। চাকরিটা যদি হয়।
সুধাময়ীর কণ্ঠ কানে এল প্রভাসের, কুশ একবার ঘরে আয়!
দুই ছেলের ডাক নাম সুধাময়ী রেখেছিলেন লব আর কুশ। প্রভাস ঘরে ঢুকতেই সুধাময়ী বললেন, কোনও ঝামেলা হইছে? আমারে কেউ কিছু কয় না ক্যান! বিষয় কী?
প্রভাস বলল, অমূল্য চাকরির একটা ইন্টারভিউ দিতে ঢাকায় এসেছে। সেই কারণেই সকালে এসে দেখা করে গেল। আবার চলে যেতে হবে ওকে।
সুধাময়ী প্রভাসের দিকে তাকিয়ে থেকে আর কিছু বললেন না। একটা শ্বাস ফেলে বললেন, আজ তো তর বাইরোনো নাই। বাবুডারেও পাঠাস না ইশকুলে। হক্কলে ঘরে থাক।
প্রভাস বিরক্ত, আহ্ মা! আবার তোমার এসব পাগলামি শুরু হল। হঠাৎ কী হয়েছে যে বাইরে যাওয়া বন্ধ করে দেব?
সুধাময়ী বললেন, মনে আইলো। কইলাম। এবার তগো ব্যাপার! তরা শুনিস না শুনিস তদের বিবেচনা।
প্রভাস ফাঁপরে পড়ে এসব সময়ে। কারণ, সে দেখেছে, মায়ের চিন্তার মধ্যে যেন কিছু একটা অলৌকিক ব্যাপার আছে। কোনও বিপদের আভাস মা যেন আগে থেকেই পেয়ে যান। অথচ তিনি বাইরের জগতে পা রাখেন না। খুব বেশি হলে পুরোনো কালীবাড়ি আর সোনাপিসিদের বাড়ি, দুর্গাপুজোয় কয়েকদিন মণ্ডপে, আর অক্ষয় তৃতীয়ায় সদর বাজারে ছেলের দোকানের পুজোয় যায়। এই তো বাইরের গণ্ডি।
চিন্তিত মুখে প্রভাস বাইরে এসে দেখল সন্ধ্যার চা করা হয়ে গেছে। এখন উনুন ধরানোর তোড়জোড় চলছে। অমুল্য বসে আছে একটা পিঁড়িতে। প্রভাস তার পাশেই বসল। সন্ধ্যা চা দিয়ে গেল।
প্রভাস বলল, যদি ওখানে কিছু হয়, তুমি খবর পাবে কীভাবে? এভাবে চলে এলে?
অমূল্য বলল, জামাইবাবু, আপনার যুক্তি আমি মানছি। আমার কথাটাও একবার ভাবুন। এভাবেই তো বেঁচে থাকতে হবে।
প্রভাস বলল, আসলে কী জানো, এই যে এখানে আবার ঝামেলা শুরু হল, এই খবর ইন্ডিয়ায় যাবে। সেখানে আবার এসবের পালটা হবে। মার খাবে মুসলিমরা। এভাবে তাদেরও পালাতে হবে। আবার সেই খবর এখানে আসবে। তারপর এখানে আমাদের উপর টার্গেট হবে বেশি বেশি করে। এভাবেই চলছে সেই পার্টিশানের আগে থেকে। আমি তাও বলব, তুমি ঢাকায় ওই হাসপাতালের ম্যানেজারদের বলো যে, কী হয়েছে খুলনা দৌলতপুরে! তাদের বোঝাও যদি সম্ভব হয় আজই তোমার ইন্টারভিউ নিয়ে নিক। তাহলে বিকেল বিকেল বেরিয়ে পড়তে পারবে।
অমূল্য বলল, এটা ভালো বলেছেন।
সে উঠতে যাচ্ছিল। প্রভাস বলল, আরে স্নান টান করে খেয়ে যাও। এভাবে হুট করে যাবে কেন? খাওয়া সেরে, বাস ধরে সোজা চলে যাও।
সন্ধ্যা এলে তাকেও প্রভাস বলল ব্যাপারটা। সন্ধ্যা মাথা নেড়ে সায় দিল। প্রভাসের দিকে তাকিয়ে বলল, মা কী বলে?
প্রভাস বলছে, মায়ের আবার সেই রোগ এসেছে।
সন্ধ্যা বিস্মিত। বলল, মানে?
প্রভাস বলল, মা বলছে আজ কোথাও কারও বেরোনো নিষেধ। বাবুও স্কুলে যাবে না। বোঝো অবস্থা!
সন্ধ্যা চিন্তিত মুখে বলল, তাহলে কী করব?
প্রভাস বুঝতে পারছে না।
সন্ধ্যা বলল, বাবু বলছিল, স্কুলের জামা যেন ইস্তিরি করা থাকে। কে যেন আসবে আজ স্কুলে।
প্রভাস চমকে তাকাল। কে আসবে? ইন্সপেক্টর আসে অনেক সময়। সেই সময় বাবুদের স্কুলে একটু তটস্থ ব্যাপার থাকে। ইন্সপেক্টর দেখে বেড়ায় কোন স্কুলে কেমন পড়াশোনা হচ্ছে। তাই সব স্কুলই চায় তাদের ছেলেমেয়েরা যেন বেশ ভালো ব্যবহার আর পড়া শুনিয়ে ইন্সপেক্টরকে খুশি করতে পারে।
সাত বছরের বাবু, প্রভাস ও সন্ধ্যার ছেলে অমল পড়াশোনায় ভালো। প্রভাসকে হেড মাস্টারমশায় বলেছেন যে, বাবুকে যেন বাইরের বইটই কিনে দেওয়া হয়। সুতরাং আজ যদি ইন্সপেক্টর আসার কথা থাকে, তাহলে স্কুলে না পাঠানোর কোনও প্রশ্নই নেই।
প্রভাস উঠে ঘরে গেল। বাবুর গায়ে হাত দিয়ে প্রভাস চাপা স্বরে ডাকল, বাবু, এই বাবু!
বাবুর পাশে বোন তপু শুয়ে। তাপসী। এ মাসেই তার তিন বছর বয়স হবে।
বাবু ধড়ফড় করে উঠে দেখল বাবা সামনে দাঁড়িয়ে। সে অবাক। বাবা তাকে খুব একটা বিশেষ ঘুম থেকে ডাকে না।
প্রভাস বলল, উঠে পড়।
বাবু ত্বরিৎ গতিতে চলে এল বাইরে। দেখল, মামা বসে আছে।
অমূল্য বলল, আরে বাবু, কী খবর বল? রেজাল্ট কেমন হল?
বাবু সলজ্জ হাসল। সন্ধ্যা এগিয়ে এসে বলল, ফার্স্ট হয়েছে।
অমূল্য বাবুকে কাছে টেনে বলল, ফার্স্ট ক্লাস! কার ভাগনে দেখতে হবে তো!
সন্ধ্যা মুচকি হেসে বলল, তুই আবার কবে ফার্স্ট হতিস! তোর নামে যা নালিশ আসত বাবার কাছে।
অমূল্য বলল, আরে সবাই ফার্স্ট হলে ফার্স্টের সংখ্যা বেড়ে যাবে। একজন দুজনকে ফার্স্ট হওয়া মানায়। আমি ফার্স্ট হতে পারতাম, কিন্তু ইচ্ছে করেই হইনি, এটাও কি কম কথা? আজ আর বেশি কথা হবে না রে। তুই স্কুলে যা। আমায় আজ ঢাকায় যেতে হবে। স্নান করে আসি।
প্রভাস বলল, তোর আজ স্কুলে কী আছেরে বাবু?
বাবু বলল, প্রতিষ্ঠা দিবস। কারা যেন আসবে। বাড়ি থেকে ফুল নিয়ে যেতে বলেছে। আমাদের পুরস্কার দেবে।
প্রভাস চিন্তিত হল। ক্লাসের ফার্স্ট বয়কে তাহলে যেতেই হবে। অথচ মা…
সুধাময়ীর ঘরে গিয়ে প্রভাস ঢুকল। বলল, মা, আজ বাবুর স্কুলে ওকে পুরস্কার দেবে।
সুধাময়ী বললেন, অ! তাইলে তো যাইতেই হয়! দুগ্গা দুগ্গা!
কিছুক্ষণের ব্যবধানে বাবু আর অমূল্য বেরিয়ে গেল। বাবু আর আশেপাশের বাড়ির দুটি ছেলে একসঙ্গে স্কুলে যায়।
বাড়ির দরজা থেকে বেরিয়ে এগোতেই বাবু দেখতে পায়, আসলাম আগে থেকেই অপেক্ষা করছে। কিছুটা এগোতেই দুজনে দেখল বেরিয়ে আসছে রূপ। এই তিনজনেই একসঙ্গে স্কুলে যায়। পাড়াতেও তারা বন্ধু।
হঠাৎ একটা গর্জন। ওরা তিনজন প্রথমে বুঝতে পারল না কোনদিক থেকে আসছে আওয়াজটা। সুতাপাড়ার পুকুরপাড় ধরে স্কুলের দিকে মোড় নিতেই তারা দেখল, একটি মিছিল আসছে। খুব রেগে রেগে কিছু একটা চিৎকার করে বলা হচ্ছে সেই মিছিল থেকে। ওরা তিনজন একটু সরে গেল রাস্তার বাঁদিকে।
মিছিলের মধ্যে থেকে স্লোগান উঠছে, ইন্ডিয়া হায় হায়…মহানবীর অপমান ইসলামের অসম্মান…নেহরু মুর্দাবাদ…কাফের হঠাও…।
মিছিল থেকে তীব্র দৃষ্টিতে কয়েকজন তাকিয়ে রইল ওদের দিকে। যেন বোঝার চেষ্টা করছিল এই তিনজনের মধ্যে কে তাদের চোখে কাফের সন্তান? আসলাম হঠাৎ শক্ত হাতে দুই বন্ধুর দুটো হাত চেপে ধরল!
