সন্ধিক্ষণ – ২১

২১

একটা কথা বলি তোমায়। আমাদের প্রধান কাজ কিন্তু ওদের কাছে মিনিমাম সুযোগ সুবিধা পৌঁছে দেওয়া। সেটা সম্ভব নয়, যদি না বনপার্টি আমাদের বিশ্বাস করে। তাই মাঝিরা যখন আসবে, তখন তাদের সঙ্গে পার্টির কেউ থাকলে বুঝেশুনে কথা বলাই ভালো।

জানি তোমাকে এসব বলতে হবে না। তবু ভয় হয়। কারণ, তোমাকেই একমাত্র এইসব গরিব মানুষ ভরসা করে। পার্টির লোকেরা বিশ্বাস করে। যুগলপ্রসাদ থামলেন।

পাঞ্চালিও জানে একথা। তবু কেন যে বারবার যুগলপ্রসাদ বলেন, সেটা ও বুঝতে পারে। যুগলপ্রসাদের ভয় হওয়া স্বাভাবিক। পাঞ্চালির উপর বিশ্বাস চলে গেলে আর তাদের ওরা গ্রামে ঢুকতে দেবে না। দুঃখের কথা হল, তখন সবথেকে বেশি দুর্দশায় পড়বে ওই গরিব গ্রামগুলোই।

পাঞ্চালি কম কথা বলে। শরীরের রং যেন বাঁশপাতার মতো। আর তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই ছিপছিপে গড়ন। কারও সঙ্গে কথা বলতে বলতে পাঞ্চালি অন্য কথা ভাবে না। সামনের জনের কথা যতই অপ্রাসঙ্গিক হোক, পাঞ্চালি চোখে চোখ রেখে শোনে। কথা শেষ হওয়ার জন্য অপেক্ষা করে। উজ্জ্বল তার চোখ। পাতাগুলো বড় বড়। ভ্রু প্লাক করে না। চিবুকে একটা ক্ষুদ্র টোল।

পাঞ্চালির বৈশিষ্ট্য হল, তাকে কেউ কোনও প্রশ্ন না করলে কোনও বিষয়ে শত তর্কাতর্কির মধ্যেও সে মুখ খুলবে না। সে মনে করে, আগ বাড়িয়ে কথা বলায় মানুষের আত্মবিশ্বাসহীনতাই প্রমাণিত হয়। এসব কি তার সহজাত স্বভাব? কেউ তাকে শিখিয়েছে! যে শেখায়, সেই রহস্যময় মানুষকে পাঞ্চালি কোনওদিন দেখেনি। তাঁর ঠিক জন্মের দিন সেই মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। অথচ তিরিশ বছর ধরে সেই অদেখা মানুষই পাঞ্চালির চালিকাশক্তি। যুগলপ্রসাদ পাঞ্চালির মাথায় হাত রেখে বলেন, যাও বেরিয়ে যাও। দেরি কোরো না।

সুন্দরপুরের আশ্রম থেকে জিপ ছাড়ল। সামনে চালকের আসনের পাশে পাঞ্চালি। জিপে রয়েছে ওষুধ, ক্লোরিন ট্যাবলেট, হাওয়াই চটি। আর একগাদা বস্তা। ভিতরে চিনি, ডাল, লবণ। আর কিছু খাতা, পেন।

যুগলপ্রসাদের আশ্রমে এই পণ্যগুলো রেশন অফিস থেকেই দিয়ে যাওয়া হয়। পাঞ্চালির সঙ্গে পিছনে শুধু রয়েছে ভীমা নেতাম। একুশ বছরের যুবক। যুগলপ্রসাদের রাধাকৃষ্ণ আশ্রমে থাকে। চালক সুধীরকাকা। পাঞ্চালি বলল, কাকা আজ একটু জোরে চালিও। ফিরে এসে বাবাকে একবার ডাক্তার দেখাতে নিয়ে যাব।

সুধীর হাসেন। বলেন, ঝিলমঘাঁটির রাস্তায় জোরে চালাব? তোর মাথাটা গেছে?

পাঞ্চালিও এবার হেসে ফেলে। সত্যিই তো। একটু পরে যে রাস্তায় তারা ঢুকবে, সেই প্রধানমন্ত্রী গ্রামীণ সড়ক বোধহয় ভারতের সবথেকে খারাপ সরকারি প্রকল্পের রাস্তা। কারণ নামে সেটি প্রধানমন্ত্রী গ্রামীণ যোজনার অন্তর্ভুক্ত হলেও আদতে যেন জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে খানাখন্দে ভরা বেহাল পথ।

গীদম বাজার ছাড়িয়ে জিপ চলেছে ন্যাশনাল হাইওয়ে ধরে। কেন্দুপাতা বোঝাই একটা লরি সামনে। একেবারে মাঝখান দিয়ে যাচ্ছে। বাধ্য হয়ে জিপ পিছনে পিছনেই যাচ্ছে। এভাবে ওভারলোড করে যাচ্ছে, অথচ পুলিশ কিছু বলে না। পাঞ্চালি অন্যমনস্ক হয়ে কিছু ভাবছে।

যতবার সে জঙ্গল পেরিয়ে ওই পাহাড়ি উপত্যকার গ্রামে যায়, আর কয়েকজন নারী-পুরুষকে দেখতে পায়, ভিতরে একটা অস্থিরতা কাজ করে। যেন সে এক মানুষের চিড়িয়াখানায় এসেছে। যাকে বলা হয়, ওপেন এয়ার জু। সেখানে মানুষ থাকে। অদ্ভুত কিছু মানুষ। দেখে মনে হয় যে, তারা খোলা আকাশের নীচে, খোলা বাতাস পেয়েও এক বন্দি জীবন কাটাচ্ছে।

শাল, মহুয়া, মেহগিনি, গাছের ছায়া পড়েছে রাস্তায়। আস্তে গাড়ি চালাচ্ছেন সুধীর। আরও এগোতেই ব্রেক কষলেন অভ্যস্ত হাতে। সামনে গাছের গুঁড়ি।

সুধীর জিপ থেকে নামলেন। বিড়ি ধরিয়ে জল খেলেন। ভীমাও লাফ দিয়ে পিছন থেকে নামল। একমাত্র পাঞ্চালি জিপেই বসে। চারদিক নিস্তব্ধ। মাঝেমধ্যে সেই নৈঃশব্দ্যের মধ্যেই বুনো কদম, চাঁপা আর মহুয়ার গন্ধ যেন মনে হচ্ছে বড় বেশি তীব্র। গন্ধের শব্দ থাকে নাকি? পাঞ্চালি ভাবছিল।

দুটি খরগোশ সিঁদুর রঙের মাটিতে ঘুরছে। তীক্ষ্ণ একটা শব্দে বোঝা গেল আশেপাশেই আছে ময়ূর। ঠিক যেখানে গাছের গুঁড়ি, তার আশেপাশেই থাকতে হবে। এক পাও এদিক ওদিক জঙ্গলের মধ্যে যাওয়া যাবে না। এমনকী গাছের গুঁড়ি পেরিয়েও এগোনো যাবে না। যে-কোনও জায়গায় থাকতে পারে বুবি ট্র্যাপ। আর ল্যান্ডমাইন পা পড়লেই বিস্ফোরণ।

হঠাৎ খসখস করে শব্দ হল। দুজন বেরিয়ে আসছে। সামনেই সাম্পানি। পাঞ্চালিকে জিপে দেখেই এগিয়ে আসে। পিছনে আরও তিনজন। একটি মেয়ে খুবই কমবয়সি। পুরুষ দুজনকেও আগে দেখেনি। ওরাই ধরা ধরাধরি করে সরিয়ে দিল গাছের গুঁড়ি। বোঝাল রাস্তাটা মোটামুটি সাফ আছে। নিজেরাও জিপে উঠে বসল। সুধীর স্টার্ট দিয়ে কিছুক্ষণের মধ্যেই এসে দাঁড়ালেন একটি বিল্ডিংয়ের সামনে। এটা স্কুল বাড়ি।

জিপের শব্দে একটা কলরোল হল। তৎক্ষণাৎ সেই বাড়ি থেকে বেরিয়ে এল আরও কয়েকজন। তাদের মধ্যে চিনুক আর পালিকে পাঞ্চালি চেনে। পাঞ্চালির ইশারায় ভীমা জিপের পিছনে রাখা জিনিসগুলি নামাতে বলে ওদের। সব জিনিস নামানোর পর সাম্পানি একটা খাতা এগিয়ে দেয়। যেখানে লেখা হবে, কী কী আছে। জুঙ্গুনার গ্রামের একটি ছেলে এবং একটি মেয়ে হিন্দি পড়তে পারে। তাদের কাছে জমা দেওয়া হবে এই খাতা। এখানে লেখা আছে, কী কী দেওয়া হল আজ।

সাম্পানি বলল, দিদি আজ তুমি কী বলবে বলেছিলে?

পাঞ্চালি বলল, হ্যাঁ। ওদের সকলকে ডাক।

মালপত্র নামানোর পর স্কুলের বারান্দায় বসা হল। পাঞ্চালি হালবি আর হিন্দি মিশিয়ে বলল, তোমাদের আমরা সাদা কাপড় এনে দেব। সেখানে তোমরা যে রং দিয়ে ঘরে আলপনা দাও, সেটা দিয়ে নানারকম এঁকে দেবে।

সাম্পানি বলল, কী আঁকব দিদি?

পাঞ্চালি বলল, যা চোখের সামনে দেখছ। পাখি, গাছ, ময়ূর। তোমাদের আঁকা কাপড় আমরা নিয়ে যাব। আর কাপড় বিক্রি করে যে টাকা হয়, তার কিছুটা আমাদের কাছে রেখে বাকিটা তোমাদের দেব। ওই যে আঁকলে, তার জন্য টাকা।

চিনুক বলল, এঁকে কি টাকা পাওয়া যায়? কী বলো?

পাঞ্চালি বলল, শুধু আঁকার জন্য নয়, তোরা যে রঙে আঁকিস সেটা বাইরের কেউ তো পাবে না। ওই যে, পাতা, ফল, ফুল শুকিয়ে গুঁড়ো করে মাটির বাসনে রাখিস। এসব কেউ পারবে নাকি?

চিনুক বলল, তাহলে আর জঙ্গলে কাঠ কাটা, মহুয়া কুড়ানো, কেন্দু জোগাড় করতে হবে না? বলে হেসে উঠল। তার কথায় বাকি মেয়েরাও। হেসে গড়িয়ে পড়ল একে অন্যের গায়ে।

হাসল পাঞ্চালিও। বলল, ওসব কাজ তো করতেই হবে। কিন্তু এবার থেকে তোমাদের তৈরি কিছু কিছু জিনিস আমরা নেব। আমরাই সেগুলো বিক্রি করব। চাটনি, আচার, মশলাগুঁড়ো এসব করবে। রান্নার সময় তোমরা যেসব জিনিস খাও, সেই রাসা, খুর সাওজি, ঝুনকা, ওয়াদায় কী কী মেশাস? ওই মশলাগুলো আমাদের ওভাবেই দিবি।

আর আপনারা সেগুলো ট্রাইবাল কালচার অ্যান্ড কুইজিন নামে শহরের বাবুদের কাছে বিক্রি করে এদের কিছু মুষ্টিভিক্ষা দেবেন, তাই তো?

হঠাৎ পিছন থেকে ভারী কণ্ঠে কথাগুলো ভেসে আসে। সাম্পানি, চিনুকরা জড়োসড়ো হয়ে যায়। নিমেষে তাদের চোখে সমীহ ও ভয়।

নিঃশব্দে তিনজন যুবক এসে দাঁড়িয়েছে পিছনে। জংলা মিলিটারি ছাপা জামা আর প্যান্ট। তিনজনেরই কাঁধে একটি করে অ্যাসল্ট রাইফেল। তবে সামনে যে দাঁড়িয়ে তার অন্তত ৫ ফুট ১০ ইঞ্চি মতো হাইট। আপাতত তামাটে হয়ে গেলেও গায়ের রং হয়তো ফর্সাই ছিল। গালে অযত্নে বেড়ে ওঠা দাড়ি।

পাঞ্চালি এই নিয়ে দ্বিতীয় দিন দেখল এই যুবককে। এরাই হল বনপার্টি। সিপিআই মাওবাদীদের সাউথ দণ্ডকারণ্য জোনাল কমিটির সদস্য। লোকটা ঠিক কোন পদে আছে, পাঞ্চালি জানে না। তবে কম কথা বলে। যখন বলে, বেশ ধমকে আর কটাক্ষ করে বলে।

পাঞ্চালি পিছনে ফিরে দেখল, সুধীরকাকা ঠোঁটে হাত দিচ্ছে। অর্থাৎ পাঞ্চালি যেন কিছু না বলে। সুধীরকাকার চোখে মুখে ভয়ের ছাপ। পাঞ্চালি চোখ সরিয়ে দিল। সরাসরি যুবকের দিকে তাকিয়ে বলল, তার মানে?

যুবক বলল, মানে আপনি জানেন না?

পাঞ্চালির মাথা সহজে গরম হয় না। সে এই দণ্ডকারণ্যের মেয়ে। তার বাবা ঠাকুমারা আজ যা বাংলাদেশ, সেই পাকিস্তান থেকে এসেছে। তাদের চোখের সামনে তৈরি হয়েছে এই দণ্ডকারণ্যের জনপদ। একদিকে বনপার্টি আর অন্যদিকে পুলিশ আর কোবরা ফোর্সের চাপে গ্রামের পর গ্রামে অসংখ্য সাধারণ নিরীহ আদিবাসী মানুষের অবস্থা চিঁড়েচ্যাপ্টা সেটা সে জানে। এখানে আদিবাসীদের জন্য কাজ করতে হলে পুলিশকে ভয় পেতে হবে, মাওবাদীদেরও।

পাঞ্চালি ঠান্ডা গলায় বলল, মানে সেই পুরোনো কথাগুলো বলবেন তো? আদিবাসীদের বাইরে থেকে আসা ব্যবসায়ীর দল ঠকায়। এতকাল ধরে ঠকিয়ে এসেছে। এবার আর তাদের ঠকানো যাবে না। এবার এদের উপর কোনও অবিচার হলে তার শাস্তি পেতে হবে…ইত্যাদি ইত্যাদি, এইসব?

এই লোকটার পিছনে থাকা দুই যুবকের যেন বিশ্বাস হচ্ছে না যে একটি মেয়ে এভাবে তাদের সঙ্গে কথা বলতে পারে! বাইরে থেকে আসা সাংবাদিক, এনজিও, রেডক্রস, ডাক্তার, ব্যবসায়ীদের তারা এতদিন ধরে দেখেছে রীতিমতো সমঝে কথা বলে। সামান্য ধমকেই কেঁদে ফেলে। এই মেয়ের এত সাহস! মুহূর্তে তাদের একজনের হাত চলে গিয়েছে কাঁধে! অর্থাৎ বন্দুকে।

পাঞ্চালি তৎক্ষণাৎ হাত তুলে সেই যুবককে বলল, এই ভুল কখনও কোরো না। কতদিন জয়েন করেছ এই পার্টিতে? তোমাদের মতো অল্প বয়সিদের হাতে বন্দুক পেয়ে মেজাজ গরম হওয়া আমার দেখা আছে। ইনি তোমাদের লিডার, জানি! তাই আমি ওর সঙ্গেই কথা বলছি।

দলনেতা পিছনে তাকিয়েই বুঝতে পারল কী হয়েছে। হাত তুলে ছেলেদুটোকে বলল, পিছনে যা! পিছিয়ে দাঁড়া।

তারা সরে গেল! মাথা নিচু করে।

লোকটি বলল, আপনি যে কথাগুলো বললেন, সেগুলো কি সত্যি না? আদিবাসীদের ঠকানো হয় না?

পাঞ্চালি বলল, অবশ্যই হয়। আমার সামনেই তো হয়। আমরা সেই কারণে চেষ্টা করি যাতে এরা বাজারে গিয়ে ঠিকভাবে টাকা পয়সা গুনতে পারে। ওজন যাতে বুঝতে পারে। গীদম বাজারে এদের কাছ থেকে তেঁতুল কীভাবে কেনা হয় জানেন? এক এক জন এজেন্ট এদের মালগুলো দাড়িপাল্লায় তোলে আর বলে, এক…দো…চারে পাঁচ…বোয়া দশ…উলে ষোলা…। আজব আজব শব্দগুলো মাঝে জুড়ে দিয়ে এই সরল মানুষগুলোকে ওরা ওজনে ঠকিয়ে দেয়। আমরা সুযোগ পেলে সামনে গিয়ে ওজন করে ন্যায্য টাকা মেটাতে বাধ্য করাই।

 লোকটি বিস্মিত। বলল, আপনারা এসবও করেন? রাধাকৃষ্ণ আশ্রম তো মন্দির, কিছু আদিবাসীদের পড়ানোও হয়। আপনিও সেখানে পড়ান। আর আদিবাসী মেয়েদের ট্রেনিং দেন। সেলাই মেশিন আছে। তাই তো? প্রতি শনিবার একটা করে মিটিং হয় আপনাদের। হালবি আর গোন্দদের দুটো গ্রাম আপনাদের এলাকার দুদিকে। তাদের আসতে বলেন ওই মিটিংয়ে। আর শোনেন কী কী সমস্যা আছে, কী কী লাগবে। তাই তো?

পাঞ্চালি শক্ত মুখে বলে, আমাদের এখানে এই গ্রামগুলোয় ঢোকার জন্য আপনাদের যে পারমিশন লাগবে, সেটা সকলেই জানে। গুডসা আমাদের সেই পারমিশন দিয়েছে। তাই এখানে আসা। কিন্তু আমাদের মতো বাইরের একটা অর্গানাইজেশনকে এখানে ঢুকতে দিলে তার সম্পর্কে জেনে নেওয়া স্বাভাবিক। তাই আপনারা হোমওয়ার্ক করে নিয়েছেন। এর মধ্যে সারপ্রাইজের কী আছে?

যুবক প্রায় স্তম্ভিত। সে বলে, আমি যেটা বলতে চাই…

পাঞ্চালি তাকে থামিয়ে দেয় হাত তুলে। বলে, দাঁড়ান। আপনার একটু আগে বলা কথাগুলোর জবাব দিই আগে। গুডসাকে জিজ্ঞাসা করে নেবেন। আমাদের সম্পর্কে ভুল ধারণাটা মিটিয়ে দেবে। আমাদের সঙ্গে আপনাদের কোনও সম্পর্ক নেই। আমরা এখানে তিনটে গ্রামের মানুষকে এই মিনিমাম লাইভলিহুডের জিনিসপত্র দিয়ে একটু সামান্য স্বস্তি দেওয়ার চেষ্টা করি। সেটা পুলিশও জানে। বিডিও অফিস জানে। আপনারাও জানেন।

পাঞ্চালি বলে, আমাদের ইচ্ছা, এদের নিজেদের আর্ট আর যোগ্যতাকেও যাতে বাইরে নিয়ে যেতে পারি। এই কাজ সরকারও করতে চাইছে। কিন্তু আমরা সরকারের হয়ে আসিনি। আমরা জানি সরকার যুক্ত হলে আমাদের আপনারা এখানে অ্যালাউ করবেন না। আবার আমাদের এখানে ঢুকতে না দিলে সরকারও অ্যাকসেস পাবে না।

পাঞ্চালি বলল, কোন কোন গ্রাম বেসিক অ্যামিনিটিজের মধ্যে কভারড হয়েছে, সেটাও সরকার কাগজে কলমে দেখাতে পারবে না। অর্থাৎ আমাদের মাধ্যমে সরকার এখানে একটা সার্ভিস পৌঁছে দেবে। যেহেতু আমরা নন-গভর্নমেন্ট, এবং আপনারা আমাদের বিশ্বাস করেন। আমাদের আবার সতর্ক থাকতে হয়, যাতে আপনারা কিংবা সরকার, কোনও পক্ষই আমাদের ইউজ না করে। তাহলে দেখুন, আপনারা, সরকার এবং আমরা সকলেই চাই যাতে এইসব গ্রামগুলোয় অন্তত এরা স্বাভাবিক জীবনের রসদগুলো পায়।

ক্যাপ্টেন বলল, আপনার স্পষ্ট কথা শুনে ভালো লাগল।

পাঞ্চালি বলল, আমার আপনাদের ভয় পাওয়ার কথা নয়। ওই তো সাম্পানি, চিনুকরা আছে, ওরা যখন দেখবে আপনি আমাকে ধমকাচ্ছেন, আমাদের এই কাজটায় বাধা দিচ্ছেন, আর আমরা কোনও প্রতিবাদ না করে চলে যাচ্ছি, এদের জন্য কিছুই আনব না, সেটাই ওরা গ্রামের মাঝিকে বলবে। আপনাদের গ্রামবাসী ভয় পায় বটে। কিন্তু আপনারা বাধা দিলে ওরা এটাও বুঝে যাবে যে, আপনাদের জন্যই আমরা চলে গেলাম, আর আসব না। সেটা লং রানে আপনাদের জন্য ভালো হবে না।

এতক্ষণ হিন্দি আর হালবি ভাষায় কথা হচ্ছে। হঠাৎ ক্যাপ্টেন পরিষ্কার বাংলায় বলে উঠল, আপনার ফ্যামিলি কি ওপার বাংলা থেকে এসেছিল?

পাঞ্চালি এই প্রথম চমকে গেল। সে এক দৃষ্টিতে চেয়ে রইল লোকটির দিকে। যুবকটি বাঙালি?

এই দণ্ডকারণ্য জোনাল কমিটিতে বাঙালি মাওবাদী থাকায় অবশ্য বিস্ময়ের কিছু নেই। তবে পাঞ্চালি শুনেছে তাদের বেশিরভাগ নাকি ঝাড়খণ্ড ইউনিটে কাজ করে। এখানে আছে মূলত অন্ধ্রপ্রদেশের তেলেঙ্গানা বেল্টের মেম্বাররা। এদের যে নেতা সেই সুদর্শনও তো আদিলাবাদ থেকে উঠে এসেছে।

যুবক এক দৃষ্টিতে দেখছে পাঞ্চালিকে। পাঞ্চালি বলল, হ্যাঁ, আমার বাবা, মা, ঠাকুমারা এসেছিল ওপার থেকে।

যুবক বলল, তার মানে, আপনাদের ফ্যামিলি স্ট্রাগল কাকে বলে জানে। এই গোটা বস্তার রিজিওনে রিফিউজি আর আদিবাসী। এই দুটো ক্লাস শুধু স্ট্রাগল করেছে, এখনও করে। বাকি ইউ পি থেকে ঠাকুর, রাজপুত আর বানিয়ার দল এসেছে, হয় নিজেদের বিজনেস প্রফিট করার জন্য, কিংবা কর্পোরেটের হয়ে জমির দালালি করতে! সেটা তো আপনারও জানা আছে! আদিবাসীদের কাছে যে জমিই প্রাণ, জঙ্গলই মা বাবা, সেটা জানেন নিশ্চয়ই?

পাঞ্চালি বলল, জানি।

এখন যে এদের নিজেদের জায়গা থেকে সরিয়ে নিয়ে সেই জমি কর্পোরেটকে দিয়ে দেওয়ার প্ল্যান চলছে, সেটাও আশা করি জানেন।

পাঞ্চালি বলে, শুনেছি। তবে আমি একপক্ষের কথা শুনে কনক্লুশনে আসি না।

লোকটি একটু উত্তেজিত, একপক্ষের মানে? এই কথা মিথ্যা?

পাঞ্চালি স্থির চোখে তাকিয়ে বলল, সালওয়া জুড়ুম কী? সেটা আমরাও জানি। আদিবাসীদের দিয়েই আদিবাসীদের উপর অত্যাচার হচ্ছে। কিন্তু সালওয়া জুড়ুমে তো আদিবাসীরাই যোগ দিয়েছে! তারা কেন কাউন্টার অপারেশনে গেল? আপনার কথা শুনে মনে হচ্ছে দেয়ার আর গুড আদিবাসী ব্যাড আদিবাসী? যারা সালওয়া জুড়ুমে আছে, তারা ব্যাড। আর যারা নেই, তারা কি ভালো?

লোকটি শ্বাস ফেলে বলল, সম্ভবত আপনার পক্ষে বোঝা কঠিন হচ্ছে। আদিবাসীরা সব দিক থেকেই সাফারার! এইসব সালওয়া জুড়ুমে যোগ দেওয়া আদিবাসী ছেলেগুলোকে পাঁচ হাজার, দশ হাজার টাকা মাইনে দেওয়া হবে মাসে। এই লোভ দেখিয়ে সালওয়া জুড়ুমে যোগ দেওয়ানো চলছে। সেই লোভ তারা সামলাবে কীভাবে? মহুয়া, তেঁতুল, কাঠ, কেন্দু এসব সারাদিন ধরে জঙ্গলে সংগ্রহ করবে আর কেশকালের মহাজন, কাংকের গুদামে দিয়ে আসবে নামমাত্র পয়সায়, এই তো ওদের জীবন? এই বর্তমান আর ভবিষ্যতের থেকে ওই টাকা অন্তত বেটার। এই কারণেই তো সরকারের এই টোপে আদিবাসীরা যাচ্ছে। এভাবে আদিবাসীদের নিজেদের মধ্যে লড়িয়ে দিয়ে আদতে এক সিভিল ওয়ার করে দেওয়া শুরু হচ্ছে জঙ্গলে। আপনি জানেন যে, এই বস্তার, সুকমা, দান্তেওয়াড়া, বিজাপুর, নারায়ণপুর, গড়-চিরোলি, অবুঝমাড়ে ক্রমেই কমে যাচ্ছে আদিবাসীর সংখ্যা? সিস্টেমেটিক অ্যানাইহিলেশন!

পাঞ্চালি মাথা নেড়ে বলে, আপনার প্রতিটি কথা চেনা। প্রতিটি কথা বহুবার শোনা। আমি বলছি না কথাগুলো মিথ্যা। আবার পুরোপুরি সত্যও নয়। অনেক শেডস আছে সত্যের মধ্যে। আমি যা বুঝি না সেটা হল, কোনটা ঠিক? আপনাদের পথটা? নাকি সরকারের ডেভেলপমেন্ট প্ল্যান, কোনটা সত্যি?

লোকটি বলল, আমাদের পথ ছাড়া বিকল্প নেই।

পাঞ্চালি বলল, মাই ওয়ে ইজ দ্য হাই ওয়ে? এ তো স্বৈরাচারের নামান্তর। কমিউনিজম এবং ডিকটেটরশিপ দুই-ই একসঙ্গে? আশ্চর্য না?

ক্যাপ্টেন!

পিছন থেকে একজন চাপা স্বরে কিছু বলল।

ক্যাপ্টেন নামক সেই যুবক এবার যেন সম্বিৎ পেল। সে আবার হিন্দিতে বলল, যাক গে। এবার আমাদের যেতে হবে। তবে পরদিন আমি আসব। আপনি জানাবেন, আপনাদের প্ল্যানটা ঠিক কী! ওদের জিনিসপত্র আপনারা কোথায় বিক্রি করবেন? কত টাকা করে রেট সেখানে? আপনারা এদের কত করে দেবেন?

পাঞ্চালি বলল, কেন?

পাঞ্চালি এবং ক্যাপ্টেন নামক সেই যুবক পরস্পরের চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। যেন এক ডুয়েল চলছে। যুবক কিছুক্ষণ পরে বলল, কেন মানে?

পাঞ্চালি বলল, আপনাদের কেন বলব? সবার আগে আপনাদের বলতে হবে যে, আমাদের কাজ কিংবা আমরা আপনাদের সন্দেহের আওতায় রয়েছি কিনা! হলে বলে দিন! আপনাদের ছেলেদের সকলে ম্যাচিওরড না। যেকোনও সময়ে আমাদের শ্রেণিশত্রু ভেবে মেরে দিতে পারে।

যুবক বলল, আপনি কি ঠাট্টা করছেন?

পাঞ্চালি বলল, করছি। কারণ আপনাদের ইম্যাচিওরড কাজ দেখেছি। শুনুন, আমরা এই আদিবাসী মহিলাদের মধ্যে একটা সেন্স অফ ডিগনিটির সঞ্চার ঘটানোর চেষ্টা করছি। একদিকে আপনাদের ভয়, আর অন্যদিকে পুলিশ! এই দুয়ের মাঝেখানে পড়ে এই গ্রামের মহিলাদের ভবিষ্যৎ গভীর অন্ধকার।

আপনারা কোনও একটা গ্রামে দু-দিন কাটালে সেই গ্রামে হঠাৎ পুলিশ আসে। ভয়ে গ্রামের মানুষগুলো আপনাদের খাওয়া দাওয়া দিয়েছে, মুরগি দিয়েছে, চাল ডালও দিয়েছে। না দিলে আপনারা ওদের ধমক দেবেন, ভয় দেখাবেন, এমনকী মারধরও করেন। আবার আপনাদের আশ্রয় দিয়েছে সেই দোষে তাদের গ্রামে পুলিশ রেইড করে। গ্রামের লোকদের বলে, তোরা মাওবাদীদের হেল্প করিস। তোরাও মাওবাদী।

আর যখন রেইড করে, তখন হয় পুরুষগুলো পালায়, নয় জেলে নিয়ে যায়। আদিবাসী পুরুষদের টাকা আছে? কোথায় পাবে তারা জামিন করার উকিল? পায় না। তাহলে যতদিন না বিচারকের দয়া হবে ততদিন তারা জেলেই পচবে। এই সময়টায় সংসার সামলায় কে? এই মেয়েরা! শুধু জঙ্গলে ঘুরে জংলা জিনিস কুড়িয়ে বিক্রি করে সংসার সামলানো যায়? যায় না। তাই অর্ধেক দিন অনাহার। আপনাদের এসব বলছি কেন? আপনারা তো সব জানেন!

ক্যাপ্টেন বলল, তাই আপনি এদের স্বনির্ভর করতে চলেছেন? একা?

পাঞ্চালি এই প্রথম হাসে। সে বুঝেছে লোকটার আত্মবিশ্বাসে চিড় ধরেছে।

বলে, হ্যাঁ যদি বলি একাই। তাতে অসুবিধা কী? এই আদিবাসী মেয়েদের ইকনমিকালি কিছুটা সাহায্য করতে চাই! আপনার কিন্তু একটা দলের দরকার হচ্ছে। এইসব আর্মস কাঁধে ঝোলাতে হচ্ছে। ভয় দেখাতে হচ্ছে। এমনকী যাদের উপকার করছেন বলে মনে করেন, সেই আদিবাসীরাও আপনাদের ভয় পায়। তার থেকে আমার মডেলটা দেখুন। একা করা যায়। দু-তিনজন মিলে চেষ্টা করা যায়। এদের বিশ্বাস পাওয়া যায়।

ওই যে সাম্পানি, চিনুকদের দেখুন। আমাকে যখন দেখে, তখন ওদের চোখে ভয় নেই। অথচ আপনারা যখন এলেন, তখন ওদের চোখে ভয়। কেন? আমাদের কাজটা আমরা আমাদের মতো করে করব। আপনাদের কোনওরকম কৈফিয়ত দেব না। আপনাদের কাজ আপনারা নিজেদের মতো করুন। আমাদের কোনও মতামতও নেই। আমাদের মতামতে আপনাদের কিছুই অবশ্য যায় আসে না। অতএব আমাদের রাস্তা আলাদা। হয়তো উদ্দেশ্য এক।

ক্যাপ্টেন আবার বাংলায় বলল, আপনি খুব অন্যরকম মানুষ। আমি কাউকে আমাদের মুখের সামনে কথা বলতে শুনিনি। সবথেকে আশ্চর্য কথা হল, আপনি একবারও জানতে চাইলেন না যে, আমি কে? বাঙালি হয়ে কীভাবে এদের দলে এলাম?

পাঞ্চালি বলল, ঘটনাচক্রে আপনি বাঙালি। এই যুদ্ধক্ষেত্রে আপনার পরিচয় তো সেটা নয়। আপনি যেমন নিজের নামও চেঞ্জ করেছেন। আপনাদের কেউ আজাদ…কেউ গুডসা…কেউ গণেশ…কেউ মাস্টার…কেউ সব্যসাচী। আসল নাম লুকিয়ে রেখেছেন কিংবা বিসর্জন দিয়েছেন। তাই আপনি বাঙালি কিনা, সে নিয়ে আমার ইন্টারেস্ট নেই। আপনাদের নিশ্চয়ই সন্ন্যাসীদের মতো ব্যবস্থা? পূর্বাশ্রমের নাম পরিচয় ভুলে যেতে হয়। তাই না?

ক্যাপ্টেন সাম্পানি আর চিনুককে ইশারায় বলল, জিপ ছেড়ে আসতে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *