সন্ধিক্ষণ – ২২

২২

বৈশাখকে তার বাড়ির কেউই সেভাবে সিরিয়াসলি নেয় না। কারণ তার ভাবুক স্বভাব। আবার এমনও হতে পারে সবাই তাকে একটু সমীহও করে। সে কোনও সাংসারিক সাতে পাঁচে থাকে না। কোন বিবাহ অনুষ্ঠানে কাকে কী উপহার দেওয়া হবে সেসব নিয়ে তার মতামত চাওয়া হয় না। কিন্তু হঠাৎ করে কোনও বড়সড় পারিবারিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার আলোচনায় তার কানে কথাটা গেলে সে এক ঘর থেকে অন্য ঘরে যাওয়ার পথেই এমনই এক সরল সমাধান বলে দেয় যে, বাকিরা চমকে উঠে ভাবে, এরকম তো মাথায় আসেনি।

 সমস্যা হল, বৈশাখকে পাওয়া যায় না। তার প্রিয় শখ হল, এক এক সময় এক একরকম ভূত মাথায় চাপা। স্থায়ী চাকরিতে থাকতে চায় না। তাই তার নতুন চাকরির খবর পেলেই বাড়ির সকলেই ইষ্টনাম জপতে শুরু করে যে, এই চাকরিটায় যেন সে থিতু হয়।

বৈশাখ আপাতত সুন্দরপুরে। বাবাকে ব্যবসা সূত্রে সুন্দরপুরে যেতে হয় কালেভদ্রে। একবার গোটা পরিবারই গিয়েছিল। তবে গত বছর হঠাৎ সেখানে চলে গিয়ে বৈশাখ যখন কলকাতায় ফিরল, তখন এক অত্যাশ্চর্য ঘোষণা করল। সে বলল, আপাতত সে ওখানেই থাকবে। একটা মিশনারি স্কুলে চাকরি নিয়ে। বৈশাখের স্বভাবেই নেই অনেকদিন ধরে কোনও চাকরি করা।

তারপর হঠাৎ একদিন সে নিজে থেকে এসেই আচমকা ঘোষণা করে অনেকটা প্রমোশনের মতো করে রাতের ডিনার টেবলে। এবং চাকরিটা ছেড়ে দিলাম গোছের শব্দ না বলে সে বউদিকে বলে, এই মৌ, সরি বউদি, কাল থেকে আমাকে টিফিন দেবে না। তখনই সকলেই বুঝে যায়, বৈশাখের মাথার পোকাটা আবার নড়েছে।

যদিও তার পেশার ভবিষ্যৎ নিয়ে কেউ উদ্বেগ পোষণ করে না। কারণ সে ছাত্র হিসাবে ছিল দুর্দান্ত। এখনও তার কাছে সকাল বিকাল বহু ফার্ম আসে একটু অডিট করে দেওয়ার জন্য। দক্ষিণ কলকাতার এই এলাকা পুরোনো। যাদবপুর থানা, যোধপুর পার্ক, প্রিন্স আনোয়ার শাহ রোড সবই কাছাকাছি, এমন একটি পাড়ায় তিনতলা বাড়ি। প্রিয়ব্রত বসু ছিলেন স্টিক অ্যান্ড স্ট্যান্ড কোম্পানির জুনিয়র ম্যানেজার। সেই প্রিয়ব্রত বসুর তিন পুত্রের মধ্যে কনিষ্ঠ সন্তান বৈশাখ।

 বৈশাখ খাবারকে খুব শ্রদ্ধা করে। সাধারণভাবে বাসে ট্রেনে যাওয়ার সময় সাবধানী মানুষ বারংবার পকেটে হাত দিয়ে দেখে ওয়ালেট আছে কিনা। বৈশাখ দেখে টিফিনের বাক্সটা আছে কিনা। খাবারের সামনে বসে সে অত্যন্ত শ্রদ্ধা আর সমীহের চোখে ছুঁয়ে থাকে কিছুক্ষণ। ভাত, ডাল, মাছের ঝোল, সজনে ডাঁটা, শিম, কোনটা কী মাংস ইত্যাদি। দেখে নয়, স্পর্শ করে সে জানতে চায় প্রত্যেকটি খাবারকে। বৈশাখের জীবনে অন্তহীন এক পরীক্ষা হল, এভাবে স্পর্শ করে চিনে নেওয়া। মনে রাখা। সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্মতম করে তোলা তার সেই স্পর্শশক্তিকে। আপাতত সে এই পরীক্ষাটি শুরু করেছে খাবার দিয়ে। আগামীদিনে নিত্য ব্যবহার্য প্রতিটি বস্তুকেই চিনে নিতে হবে আঙুল দিয়ে।

কেন এই পরীক্ষা? কারণ, বৈশাখ প্রায় দেড় বছর ধরে একটা চোখে দেখতে পাচ্ছে। কলকাতায় ল্যান্সডাউনের ডাক্তার তাকে বলেছিল, চোখ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। এই যে সে একটা দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসার মধ্যে ঢুকবে, এটা বাড়িতে জানাজানি হলে শোরগোল পড়ে যাবে। বাড়িময় তো বটেই, আত্মীয় পরিজনদের মধ্যে এক সহানুভূতির বন্যা আসবে। ক্রমেই যা অসহ্য হয়ে উঠবে বৈশাখের কাছে।

তাই সে স্থির করেছিল দূরে কোথাও চাকরিটা নেবে। মাঝেমধ্যে কলকাতায় ফিরলে কাউকে বুঝতে দেবে না। বৈশাখ জানে, তাকে পরিবারের সকলে কী অসম্ভব ভালোবাসে। সেখানে তার চোখ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, এই আঘাতে তার নিজের থেকেও মা, বাবা, বউদি, দাদাদের জীবনে গভীর কষ্ট ঢুকে আসবে।

তাই সুন্দরপুরে চলে এসেছিল পড়াতে। বৈশাখের স্মৃতি তীক্ষ্ণ। ক্লাস করার সময় তার বইয়ের দরকার হয় না। শুধু সিলেবাসটা দেখে নেয়। এখনও পর্যন্ত সেরকম কোনও সমস্যা হয়নি। কেউ বোঝেওনি যে তার চোখের এই অবস্থা।

কিন্তু সুন্দরপুরে আসার পর ডান চোখও যে শক্তি হারাচ্ছে, সেটা বলেছেন ডক্টর চক্রবর্তী। আর ঠিক এই কারণেই বৈশাখ কলকাতার সঙ্গে ক্রমেই মানসিক দূরত্ব বাড়াচ্ছে। অন্ধ অবস্থায় কলকাতায় ফিরে যাওয়ার মানে হয় না। এমনিতেই কলকাতার সিংহভাগ মানুষ অন্ধ। সত্যিকারের অন্ধ মানুষের ভিড় বাড়ানোর মানেই হয় না। কলকাতা এক কংক্রিট ও ধোঁয়ার শহর। সবথেকে বড় কথা হল শব্দের শহর। কলকাতাকে অনেকেই বলে থাকে আনন্দনগরী। সিটি অফ জয়!

বৈশাখ জানে কথাটা বড়সড় মিথ্যা। আসল কথা হল, কলকাতা শব্দনগরী। সিটি অফ সাউন্ড। এরকম আত্মঘাতী শহর যেমন হয় না, তেমনই আত্মহত্যাকে অত্যন্ত উপভোগ করছে এই অসহ্য মানুষও দুনিয়ার কোথাও পাওয়া যাবে না। আবার সমস্যা হল, কিছুদিন দূরে গেলেই এই অসহ্য মানুষদের জন্যও মন কেমন করে।

এখন সকাল এগারোটা। একটি চোখ দিয়ে ডক্টর চক্রবর্তীকে লক্ষ করল বৈশাখ। আজকাল চেম্বারের দরজা ঠেলে তাকে ঢুকতে দেখলেই একটা গোপন শ্বাস ফেলেন ডক্টর চক্রবর্তী। সেই শ্বাসটি আফশোসের। মোটামুটি তাঁর কথায় স্পষ্ট যে, দ্বিতীয় কর্মক্ষম চোখটির আয়ুও ক্রমেই কমে আসছে। রেটিনার সমস্যা।

একেবারেই সারানো যাবে না? জানতে চেয়েছিল বৈশাখ!

ডক্টর চক্রবর্তী মাথা নেড়ে বলেছিলেন, না সারানো যাবে না। হয়তো একটা চেষ্টা করা যেত। কিন্তু আপনি বুঝতেই পারেননি যে চোখটা কাজ করছে না। আমার কাছে যখন এলেন, তখন নব্বই শতাংশই শেষ। তবে কোনও আইব্যাঙ্কের সঙ্গে যোগাযোগ করা যেতে পারে।

বৈশাখ বলেছে, তা হলে ডাক্তারবাবু এই যে ডান চোখ? এটায় তো আপনি আগে থেকেই হাল ধরেছেন!

ডক্টর চক্রবর্তী দীর্ঘশ্বাস ফেলে। বললেন, এটা ইনকিওরেবল। আমিও ভাবছি, কেন হল? আপনি একটা কাজ করতে পারেন। একবার আপনি অন্য কোনও আই স্পেশালিস্টকে দেখান। বিলাসপুর কিংবা কলকাতা অথবা দিল্লি চলে যান।

বৈশাখ রাজি হয়নি। কারণ ডক্টর চক্রবর্তীর লড়াইটাকে সে সম্মান করে। এটা দুজনের মিলিত লড়াই। প্রতি দু-সপ্তাহ পর আসে চেম্বারে। পাশাপাশি সে অন্ধ হওয়ার প্র্যাকটিসও চালিয়ে যাচ্ছে।

আজ ডক্টর চক্রবর্তীর সামনে বসে বৈশাখ বলল, আপনি সম্পূর্ণ অন্ধ মানুষের চোখ পরীক্ষা করেছেন কখনও?

চক্রবর্তী মাথা নাড়েন, একবার করেছিলাম। আদিবাসী এক কিশোর। কেন? জানতে চান ডাক্তার।

বৈশাখ বলে, অন্ধ কোনও মানুষের সঙ্গে আপনার পরিচয় আছে?

আহা, আপনি তো এখনও অন্ধ নন। আপনি ইয়ং ম্যান। হাল ছাড়ছেন কেন? অ্যাট লিস্ট একবার ক্যালকাটা যান!

বৈশাখ আগ্রহী হয়ে বলে, তার মানে আপনার মনে হচ্ছে, কলকাতায় বা দিল্লি বম্বে গেলে সেরে গেলেও যেতে পারে! মেডিকেলি একটা চান্স ফ্যাক্টর কি আছে?

চক্রবর্তী বলেন, আপনি অন্ধ মানুষ খুঁজছেন কেন?

কিছু ব্যাপার জানার আছে। অন্ধ হওয়ার প্রিপারেশন নেওয়া থাকলে একটু অ্যাডেড অ্যাডভান্টেজ পাওয়া যায়!

যেমন?

বৈশাখ বলল, অন্ধ মানুষ যখনই কোনও নাম শোনে, তখন তার মনে সেই নামটা সম্পর্কে কী মনে আসে? ধরুন আমরা যখন কারও মুখে শুনি সবুজ পাহাড়, নীল সমুদ্র, জবা গাছ, রেলইঞ্জিন কিংবা মোটরসাইকেল…তৎক্ষণাৎ সেইসব বস্তুর অবয়ব আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে। অন্ধদের ক্ষেত্রে এসব শব্দ কোনও দৃশ্য ফুটিয়ে তোলে না। তারা তো জানেই না এদের কেমন দেখতে।

চক্রবর্তী বলেন, জন্মান্ধদের ক্ষেত্রে কথাটা ঠিক। তারা কোনও পার্থিব বস্তুর অবয়ব দেখেনি।

বৈশাখ সোৎসাহে বলে, একজ্যাক্টলি। এই ব্যাপারটা খুব ইন্টারিস্টিং। দুরকম অন্ধ আছে। জন্মান্ধরা এই দুনিয়ার কিছুই দেখেনি। তার সবটাই কল্পনা। যতটুকু স্পর্শ করে বোঝা যায়, ততটা। যেমন লাল রং শুনলে সে মনে মনে ভিস্যুয়ালাইজ করতে পারে না যে লাল রং ব্যাপারটা কী? যেমন লাল রং হল আলতা, সিঁদুর, রক্ত। এসব তাকে বলে লাভ নেই। সে ওগুলো দেখেনি। তাই অন্ধদের কাছে লাল, সবুজ, হলুদ কোনও রঙেরই অস্তিত্ব নেই।

বৈশাখ উত্তেজিত হয়ে বলে চলে, আর যে-কোনও কারণে পরে অন্ধ হয়েছে, সে সবই দেখেছে এতকাল ধরে। কোনটা কেমন দেখতে সে জানে। সে এখন দেখতে পাচ্ছে না। তবে তার স্মৃতিতে স্পষ্ট, কেমন দেখতে সমুদ্র, নদী, নিজের মা, রাস্তা, বই, আকাশ, বটগাছ—এসব।

তাহলে জন্মান্ধ এবং পরবর্তী সময়ে অন্ধ হওয়া দুই মানুষের দৃষ্টিহীনতা এক নয়। তারা পরস্পরের সঙ্গে কথা বললে দুজনের মধ্যে দুরকমের ছবি ফুটে ওঠে। তাদের অন্তরদৃষ্টিও আলাদা। আমি যখন অন্ধ হব, তখন আমি জন্মান্ধদের থেকে অনেক বেশি ভাগ্যবান হব। কারণ আমার কাছে দৃশ্যের স্মৃতি আছে! বৈশাখ একটু ঝুঁকে পড়ে সে বলল, আচ্ছা ডক্টর চক্রবর্তী, জন্মান্ধ মানুষের কাছে স্মৃতি কেবল শোনা বিষয়। তার কাছে কোনও ফেলে আসা দৃশ্য জমা নেই।

ডক্টর চক্রবর্তী বললেন, অন্ধ হওয়ার জন্য আপনি অপেক্ষা করছেন নাকি? ভাই, আপনাকে বুঝতে পারছি না। একটা চোখ সম্ভবত আর ফেরানো যাবে না। দ্বিতীয় চোখের আশা আছে, একথা আমি বলছি না। কিন্তু আশা নেই, এই কথাটাও বলা যায় না। জেদ করবেন না। আজ আপনার কাছে যেটা ছেলেখেলা মনে হচ্ছে, অন্যের দয়ার উপর জীবন কাটানো অভিশাপের মতো মনে হবে। তাই কলকাতায় ফিরে যান। আত্মীয়পরিবারকে নিয়ে সাউথে দেখিয়ে আসুন চোখ।

বৈশাখ বলল, আপনি সঙ্গে যাবেন? তাহলে তো এখানকার মানুষগুলোরও অনেক উপকার হবে। কারণ আপনি যদি আমার সঙ্গে গিয়ে দেখতে পান চোখের আশা আছে। তাহলে কীভাবে সেটা হচ্ছে, এটা আপনি টেকনিকালি বুঝবেন। সেই বিদ্যাটা শিখে এলে আগামীদিনে যারা আপনার কাছে আসবে, তাদের অনেককেই আর সাউথে যেতে হবে না!

নবীন উঁকি দিল। ডক্টর চক্রবর্তী বুঝলেন, কেউ এসেছে। বৈশাখকে বললেন, একটা নতুন ড্রপ দিচ্ছি। এটা দুবার করে দিন। আর চেষ্টা করুন চোখের উপর কম প্রেশার দিতে। মানে পড়াটড়া একদম কম।

বৈশাখ বলল, ডক্টর চক্রবর্তী, গাছেদের কি চোখ আছে? গাছেদের কি সামনে পিছনে বলে কিছু ব্যাপার আছে? গাছ তো চারদিক থেকেই একইরকম। কিন্তু কেউ যদি গাছের পাতা ছিঁড়তে আসে, বা কুঠার দিয়ে কোপ মারতে যায়, সেটা গাছেরা কি দেখতে পায়?

চক্রবর্তী বললেন, ঠিক জানি না। হয়তো বোঝে। অনুভবও একধরনের দৃষ্টি!

বৈশাখের চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। বলল, বাহ্, চমৎকার বললেন। অনুভবও একটা দৃষ্টি!

ডক্টর চক্রবর্তীর চেম্বার থেকে বেরোতেই বৈশাখ দেখতে পায় বাইরের বারান্দায় বসে আছেন ব্রহ্মেন্দ্র সান্যাল। সঙ্গে একটি মেয়ে। সুন্দরপুরে এসে বৈশাখ একবার গিয়েছিল এই জনপদের মধ্যেই এক আশ্রমে। সেটা পনেরোই আগস্ট। অভিনব সভার আয়োজন হয়েছিল। স্টিল প্ল্যান্টের অফিসার, দশম শ্রেণির ছাত্র, একজন দোকানি, আদিবাসী মহিলা—এরকম সমাজের বিভিন্ন স্তরের কয়েকজনকে ডেকে বলা হয়েছিল দেশ সম্পর্কে তাদের ধারণা বলতে।

সেই সভায় প্রাক্তন এই অধ্যাপক সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে বলেছিলেন, একজন মানুষ নিজের জনপদের বাইরে কোনওদিন যায়নি। সে সংবাদপত্র পড়ে না। নিজের কাজ করে। সাংসারিক গ্রাসাচ্ছাদনে তাঁর সময় অতিবাহিত হয়। সে কারও সঙ্গে তর্ক করে না, প্রত্যেকের কথা মন দিয়ে শোনে। তার বসবাস যেখানে, তার বাইরের খবর সে রাখে না। এই মানুষটি কীভাবে বুঝবে দেশ উন্নত হচ্ছে কিনা।

আরও বলেছিলেন, উন্নয়নকে সে অনুভব করবে কীভাবে? সে এই রাষ্ট্রেরই মানুষ। তার ক্ষুদ্রভাবে টের পাওয়ার কথা যে, দেশের বর্তমান অবস্থা ঠিক কেমন! অথচ সে যদি তার চেনা চৌহদ্দির মধ্যে কোনও বদল, উন্নয়ন, পরিচ্ছন্নতা, শিক্ষার প্রসার, মানুষের কর্মসংস্থান কিছুই না দেখতে পায়, তাহলে কি দেশের উন্নতি হচ্ছে বলা যায়? তার মানে দেশের উন্নতি তখনই হচ্ছে ধরে নেওয়া যায়, যখন সেই উন্নতি মিডিয়া সরকারের প্রচার অথবা রাজনৈতিক দলগুলির দাবিকে ছাপিয়ে সাধারণ মানুষ তার নিজের চারদিকে টের পাবে।

বলেছিলেন, অনেক দূরের কোনও শহরে বড় বড় রাস্তা উড়ালপুল হয়েছে, মেট্রো রেল হয়েছে, এসব শুনে সেই লোকটি কী করবে? সে দেখবে তার বসবাস যেখানে, সেখানে কী হয়েছে! দেশ মানে আজও কোটি কোটি মানুষের কাছে সে যেখানে বসবাস করে, যেখানে কাজ করে, যেখানে সকাল ও সন্ধ্যা হয়, সেই অঞ্চল। সেই জায়গাটা যদি দশকের পর দশক ধরে একরকম রয়ে যায়, তাহলে সেই মানুষগুলির কাছে দেশ উন্নত হচ্ছে, এই ধারণা হওয়া অসম্ভব।

এই কথাগুলো বৈশাখের চমৎকার লেগেছিল। ব্রহ্মেন্দ্র সান্যালের সঙ্গে সেদিন বৈশাখ এগিয়ে এসে আলাপ করেছিল। বলেছিল, এভাবে সে কোনওদিন ভাবেনি।

কলকাতার জীবন ছেড়ে কেন বৈশাখ চলে এসেছে এই সুন্দরপুরের মতো এক জনপদে? ব্রহ্মেন্দ্র সান্যাল জানতে চেয়েছিলেন।

বৈশাখ বলেছিল, আজ বুঝলাম এসে ভুল করিনি। হয়তো কলকাতা বা দিল্লি থাকলে আমিও ঠিক ধরতে পারতাম না যে, দেশ কীভাবে বদলাচ্ছে কিংবা আদৌ বদলাচ্ছে কিনা। এখন থেকে বোঝার চেষ্টা করব।

ব্রহ্মেন্দ্র বলেছিলেন, আমরা এই আশ্রমে মাঝেমধ্যেই আসি। সকলের কথা শুনি। রাধাকৃষ্ণ আশ্রম নাম দেখে আবার ভেবো না যে, এটা নিছক হিন্দুদের মন্দির। তোমরা কলকাতার ইয়ং ছেলে। তোমাদের মনোভাব, তোমাদের সাহায্যও এই আশ্রমের লাগবে। মনে করো একদিন এসে তোমার যা সাবজেক্ট কিংবা কলকাতার কোনও অভিজ্ঞতা, সেটা ছেলেমেয়েদের বললে। তুমিও এদের কাছে একটা জানালা হয়ে যাবে। তোমার কথা শুনে ওরা জানবে এক টুকরো কলকাতা। এসো মাঝেমধ্যে।

বৈশাখ কয়েকবার আশ্রমে গিয়েছে। সাধারণত রবিবার। ব্রহ্মেন্দ্রর সঙ্গে দেখা হয়েছে। তবে যুগলপ্রসাদ এবং পাঞ্চালি নামক দুটি চরিত্র বৈশাখকে বেশ আকর্ষণ করেছে।

বৈশাখকে দেখেই ব্রহ্মেন্দ্র বললেন, আরে, তুমি এখানে? চোখে আবার কী হল?

বৈশাখ মুখে হাসি এনে বলল, কয়েকদিন চোখে জ্বালা করছে। তাই দেখাতে এসেছি। আপনি কেমন আছেন?

বৈশাখ লক্ষ করল সঙ্গের মেয়েটি এক দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে। বৈশাখ মেয়েটাকে আগে দেখেছে। কোথায়?

স্তুতি বলল, আপনার পরীক্ষা কেমন চলছে? গাছেদের উপর পরীক্ষা?

নিমেষে বৈশাখের মনে পড়ে গেল। কয়েকদিন আগেই মেয়েটির সঙ্গে জঙ্গলে দেখা হয়েছে। সে হেসে বলল, কেমন আছেন আপনি?

ব্রহ্মেন্দ্র বললেন, তুই ওকে চিনলি কীভাবে?

স্তুতি বলল, সেদিন নদীর দিকে গিয়ে দেখলাম উনি জঙ্গলে বসে কবিতা পড়ছেন। গাছের সঙ্গে কথা বলছেন।

ব্রহ্মেন্দ্র বিস্মিত হলেন। বললেন, তাই নাকি? জঙ্গলে বসে কবিতা পড়ার ব্যাপারটা বেশ ভালো আইডিয়া। এটা মাথায় আসেনি। অ্যাপ্লাই করতে হবে। তোর মামির টিকটিক থেকে রক্ষা পেতে। এবার ট্রাই করব। কিন্তু গাছের সঙ্গে কথা বলা কি কোনও পরীক্ষা?

স্তুতি হেসে বলল, কবিতার প্রভাব গাছেদের উপর পড়ে কিনা এটা উনি এক্সপেরিমেন্ট করছেন।

বৈশাখ একটু অপ্রতিভ। সে বলল, স্যার আপনার বাড়িতে টবের গাছ আছে?

ব্রহ্মেন্দ্র বিস্মিত। বলেন, হ্যাঁ আছে। কেন বলো তো?

আপনি প্রতিদিন সেগুলোর সামনে যান?

ব্রহ্মেন্দ্র বলেন, বারান্দায় রাখা আছে। হ্যাঁ, যাই।

আপনাকে দেখে ওদের ভাবগতিক চেঞ্জ হয়?

আমাকে দেখে? ব্রহ্মেন্দ্র ভ্রু কুঁচকে মনে করার চেষ্টা করেন।

স্তুতি বলল, মামা, ভেবেচিন্তে উত্তর দিও। আগে ভিতরে যাও। ডাক্তারবাবু চলে যাবেন যে?

ব্রহ্মেন্দ্রর সম্বিৎ ফেরে। ওহো! ডক্টর চক্রবর্তী ভিতরে বসে আছেন। তিনি বললেন, তোমার কোনও কাজ না থাকলে একটু বসে যাও। আমি আসছি চোখ দেখিয়ে। তোমার প্রশ্নের ব্যাপারটা খুব ইন্টারেস্টিং। বলতে বলতে ব্রহ্মেন্দ্র চেম্বারে ঢুকলেন।

স্তুতি বলল, আপনি কি এভাবেই মানুষকে চমকে দিতে পছন্দ করেন?

বৈশাখ বলল, আমি আপনার কথার উত্তর দিলেও আপনি মনোযোগ দিয়ে শুনবেন না।

মানে?

মানে হল, আপনি কথা বলার সময় অন্য কোনও ভাবনায় থাকেন। প্রশ্ন করেন বটে। উত্তর শোনার সময় সেই অন্য কিছুটা ভাবেন বেশি। তাই পুরো মনোযোগ দিতে পারেন না।

স্তুতি উত্তেজিত, আপনি বোধহয় ভাবেন নর্মাল কথা বললে, আপনাকে মানুষ খুব একটা বিশেষ চোখে দেখবে না। তাই নানারকম সারপ্রাইজ দেন!

বৈশাখ বলল, আপনি সেদিনও আমাকে এরকম একটি কথা বলেছিলেন। আজও বললেন। সমস্যা কী জানেন? এক পুরুষ যখন এক বুদ্ধিমতী মেয়ের সঙ্গে প্রাথমিক আলাপে ব্যতিক্রমী কিছু কথা বলে, তখন সেই মেয়ের প্রথম ধারণা হয়, ছেলেটি তাকে ইমপ্রেস করতে চায়। কেন ইমপ্রেস করতে চায়? কারণ সে আমার সঙ্গে প্রেম কিংবা ফ্লার্ট করতে চায়! আপনারও কি সেরকম কোনও ধারণা থেকেই এই মনোভাব?

স্তুতির চোখমুখ ঝাঁ ঝাঁ করতে শুরু করল। কথাটি সত্য। সেদিন সে ভাবতে শুরু করেছিল, ছেলেটি ওরকমভাবে কথা বলছে তাকে ইমপ্রেস করতে।

বৈশাখ স্তুতিকে সামলানোর সময় দিল। তারপর বলল, আপনার আগে ভাবা দরকার, আমি যে আপনাকে ইমপ্রেস করতে চাইব, কেন? আপনার মধ্যে বৈশিষ্ট্য কী কী আছে? আমার এত বয়সে আপনার মতো মেয়ের সন্ধান পাইনি? নাকি এভাবে প্রতিটি সুন্দরী মেয়েকে দেখলেই তাদের ইমপ্রেস করার চেষ্টা করি? এরকম ভাবেন নাকি? আপনার মন কি এখনও ম্যাচিওরড নয়?

স্ততি বলল, আপনি যা যা বললেন সব সত্যি। আমি ভেবেছি আপনি আমাকে ইমপ্রেস করার চেষ্টা করছেন। এমনকী আমার মামাকেও।

বৈশাখ বলল, এরকম ভাবছেন কেন, সেটা আপনার নিজের জন্য খুব গুরুতর প্রশ্ন।

স্তুতি চুপ করে মাথা নিচু করল। তারপর বলল, হ্যাঁ, সত্যি আমার মন বিক্ষিপ্ত।

বৈশাখ বলল, মন শান্ত করতেই কি আপনার এখানে আসা?

স্তুতি বলল, হয়তো তাই। তবে আমি এসেছি একজনকে খুঁজতে।

বৈশাখ কৌতূহলী চোখে চেয়ে রইল।

স্তুতি বলল, আমার দাদা! একজন সাংবাদিক। এখানে একটা নিউজ কভার করতে তিন মাস আগে এসেছিল। তার কোনও খবর নেই। যে ম্যাগাজিনে কাজ করে, তারাও কিছু জানে না। পুলিশে খবর দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এখনও সন্ধান মেলেনি।

বৈশাখ বলল, ওহ্‌! আই অ্যাম সরি! এখানে কোথায় এসেছিল?

স্তুতি বলল, বস্তারে।

বৈশাখ বলল, মাওবাদীদের নিয়ে নিউজ?

স্তুতি বলল, হ্যাঁ। সেরকমই বলেছিল।

বৈশাখ বলল, তাহলে তো মাওবাদীদের কাছে বন্দি হয়ে থাকতে পারে?

স্তুতি বলল, বন্দি করে রাখলে কোনও কমিউনিকেশন করবে না? ব়্যানসম চাওয়া কিংবা ওদের দলের কোনও বন্দিকে জেল থেকে ছেড়ে দিতে হবে, কিছু তো বলবে?

বৈশাখ চুপ করে থেকে বলল, আপনি একা এসেছেন এরকম কঠিন কাজে? কী করে করবেন?

স্তুতি বলল, জানি না। বাড়িতে মা ছাড়া আর কেউ নেই। কী করব? কোথা থেকে শুরু করতে হয়? কিছুই জানি না। পুলিশের কাছে গিয়েছি। তারা ছবি, ডেসক্রিপশন সব নিয়েছে। বলেছে, বিভিন্ন থানায় পাঠিয়ে দেবে। কিন্তু তাদের যে খুব ইচ্ছে আছে তাও না।

বৈশাখ বলল, আপনি একবার আশ্রমে যাবেন তো! যুগলপ্রসাদ স্যার আছে। একটা মেয়ে ওখানে পড়ায়। পাঞ্চালি নকশাল বেল্টে ওদের এনজিও। ওর সঙ্গেও কথা বলতে পারেন।

স্তুতির মুখ একটু উজ্জ্বল হল। বলল, হ্যাঁ মামাও আমাকে বলেছে। মেয়েটার সঙ্গে আমার দেখা হয়নি। রায়পুরে গিয়েছে। এলে দেখা করতে যাব।

বৈশাখ বলল, ওদের একটা দোকান আছে গির্জার মোড়ের পিছনে। সুধা নামের মেয়েটার বাবা কাউন্টারে বসেন। মেয়েটিও বসে, আশ্রমের কাজও করে।

স্তুতি বলল, সুধা? মানে কীসের দোকান?

বৈশাখ বলল, জামাকাপড়ের।

স্তুতি বলল, আমি এখানে…জায়গাটা কি কলোনির মধ্যেই?

বৈশাখ বলল, আপনাকে একা যেতে হবে কেন? ব্রহ্মবাবুস্যার ওই আশ্রমে যান। উনি মেয়েটিকে চিনতে পারেন।

স্তুতি ঠোঁট কামড়ে ভাবছে। বৈশাখ বুঝল। বলল, ঠিক আছে। আপনার সঙ্গে আমি যেতে পারি।

স্তুতির খুশি হল। বলল, তাহলে তো খুব ভালো হয়। মামার চোখটা ঠিক…মানে সন্ধ্যায় বেরোনো মামার পক্ষে মুশকিল। বোঝা যাচ্ছে না ক্যাটারাক্ট কিনা। কলকাতায় বাম চোখে অপারেশন হয়েছিল। ডান চোখে মনে হয় একই প্রবলেম হয়েছে।

বৈশাখ দুম করে বলল, আমি তো বলেছি, যাব। কিন্তু আপনি আমার চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলছেন না কেন?

স্তুতি হকচকিয়ে গেল। কথাটা তো সত্যি। ছেলেটা খুব স্পষ্টবাদী, ওর ভালো লাগছে।

হঠাৎ পাশের চেয়ার থেকে উঠে বাইরে গেল বৈশাখ। গনগনে রোদ। সকালে পেপারে দেখছিল ৪৪ ডিগ্রির লু চলছে। তবে হিউমিডিটি নেই। শুকনো গরম।

অবশ্য বাইরে বেরোলে মুখচোখ ঢেকে নিতে হয়। কারণ হিটস্ট্রোক হতে পারে। হাতও যেন পুড়ে যায়। সকলেরই তাই সাদা কাপড় কিংবা গামছা মতো মুখে বাঁধা। চোখে রোদচশমা।

ছেলেটা অন্যরকম। উঠে চলে গেল নাকি? বিশ্বাস নেই।

দরজায় ছায়া পড়ল। বৈশাখ এসে দাঁড়িয়েছে। হাতছানি দিয়ে তাকে ডাকছে। অবাক কাণ্ড।

স্তুতির কৌতূহল হল। অদ্ভুত এই ছেলেটি! স্তুতি উঠতে বিনা দ্বিধায় তার হাত ধরে নিয়ে এল পরপর দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকটি গাছের দিকে। একটা তুলসী গাছের কাছে গিয়ে ফিসফিস করে কিছু বলল।

স্তুতি দেখতে পেল, গাছটি যেন সামান্য দুলে উঠল। এরপর সাদা মুখ ঢাকার কাপড়টা দিয়ে বৈশাখ তুলসী গাছের সামনে সূর্যকে আড়াল করল। তুলসীর গায়ে আর রোদ পড়ছে না।

তখনই তুলসী গাছ আবার মৃদু কেঁপে উঠল। স্তুতি দেখল, একটি স্নিগ্ধ হাসি ফুটে উঠেছে বৈশাখের মুখে। তারপর ওকে নিয়ে ভিতরে চলে এল।

বৈশাখ বলল, দেখলেন?

কী দেখব?

বৈশাখ বলল, এই অসহনীয় রোদে আমরা পুড়ে যাচ্ছি। গাছেদেরও একই দশা। বিশেষ করে ছোট নরম গাছেরা এরকম গনগনে সূর্যকে কী করে সহ্য করবে?

স্তুতি চুপ করে শুনছে। বৈশাখের চোখমুখ ঠিক সেরকম স্বপ্নিল, যেমন লাগছিল আগের দিন জঙ্গলের মধ্যে। যেন এই চরাচরে সে একা।

বৈশাখ বলল, তাই আমি ওকে বললাম, তোমার কষ্ট হচ্ছে? ছায়া চাই? তখনই দেখলেন তুলসীগাছ কেমন দুলে উঠে রেসপন্স করল?

স্তুতি ঘাড় নাড়ে।

বৈশাখ বলল, তারপর যখন কাপড় দিয়ে আড়াল করলাম সূর্যকে, কয়েক মুহূর্তের জন্য স্বস্তি পেল যেন। তাই কৃতজ্ঞতার বার্তা দিল আবার দুলে উঠে। নিজের চোখেই তো দেখলেন?

স্তুতি হেসে বলল, কিন্তু আপনি কোন ভাষায় ওর সঙ্গে কথা বললেন? বাংলা? নাকি হালবি, গোন্দি, নাকি হিন্দি?

বৈশাখ স্বপ্নমেদুর চোখেই বলল, আপনি যে ভাষাতেই বলুন, গাছেরা আপনার কথা বুঝে যায়। কারণ ওরা আপনাকে স্পষ্ট দেখতে পায় আর বুঝতে পারে। মনের তরঙ্গ আছে। ওরা তরঙ্গের ভাষা পড়ে নেয়। আপনি একজন ভালো মনের মেয়ে।

আচম্বিতে তার কথা কেন? স্তুতি বুঝতে পারল না, তাকিয়ে রইল। ঝকঝকে ফর্সা গালে সোনালি দাড়িগোঁফ বৈশাখের। অস্ফুটে বলে উঠল, আপনাকে দেখেও তুলসী নিজেকে গুটিয়ে নিল না! তার মানে আপনি মানুষটা ভালো! আপনার সামনে মন খোলা যায়, বুঝেছে! আমি আর কারও সামনে গাছকে এভাবে রেসপন্ড করতে দেখিনি। আপনি গাছের জগতে ভালো সঙ্গী!

স্তুতি কেঁপে উঠল! কথার মানে কী? হঠাৎ যেন বাইরে আর কোনও রোদ্দুর নেই। দমকা বাতাস এল খোলা জানালা দিয়ে। পর্দা উড়ছে।

জানালা থেকে আসা বাতাসে স্তুতির কপালে এসে পড়া অলকচূর্ণ উড়ছে। সেদিকে তাকিয়ে বৈশাখ একটা শ্বাস ফেলল। তারপর হেসে ফিসফিস করে স্তুতিকে বলল, অথচ দেখুন…আমি…আমি…অন্ধ হয়ে যাচ্ছি। তবে অন্ধ হওয়ার আগে আমার শেষ কাজ হবে আপনার দাদাকে আপনার কাছে ফিরিয়ে দেওয়া।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *