২৪
তোমার ভাগনে আমাদের এখানে এসে নিরুদ্দেশ হয়ে গেল, আমাদের তুমি কিছুই বললে না? যুগলপ্রসাদ জানতে চান।
ব্রহ্মেন্দ্র বললেন, আমি নিজেই জানতাম না। স্তুতি আসার আগেও কিছু জানায়নি। ভেবেছি বেড়াতে এসেছে। তারপর সব বলল। সে তো আমাদের এখানে আসেনি। আমি যা শুনলাম অবুঝমাড়ের দিকে গিয়েছিল সংবাদ সংগ্রহ করতে। কী করা যায় বলো তো?
আমি কীভাবে হেল্প করতে পারি? যুগলপ্রসাদ বললেন।
ব্রহ্মেন্দ্র বললেন, তোমার আশ্রম বিভিন্ন দিকে তো কাজ করে। মাওবাদীদের গ্রামেও যাতায়াত আছে তোমাদের। যদি কোনওভাবে ক্লু পাওয়া যায়।
যুগলপ্রসাদ বললেন, মাওবাদীদের কাছে হেল্প চাইব? আমরা তো মাওবাদীদের সঙ্গে কাজ করি না ব্রহ্মেন্দ্র। আমাদের কাজ সরাসরি আদিবাসীদের গ্রামে। তবে হ্যাঁ, সেসব গ্রামে অনেক সময়ই আমাদের ঢুকতে হয় মাওবাদীদের ইনডাইরেক্ট অ্যাপ্রুভালে।
ব্রহ্মেন্দ্র বললেন, কী হতে পারে বলো তো? ওর অফিস থেকে মিসিং ডায়েরি করেছে।
যুগলপ্রসাদ বললেন, ওদের সাংবাদিকদের দেখিনি ক্ষতি করতে। বরং সাংবাদিকদের মাঝেমধ্যেই নিজেদের জঙ্গলের ডেরায় নিয়ে যায়। পাঞ্চালিকে বলছি। ও এই শুক্রবার আবার যাবে। সেখানে আবার নাকি কোন মাওবাদী নেতাকে ধমকে এসেছে এই মেয়ে।
ব্রহ্মেন্দ্র চমকে গেলেন, ধমকে এসেছে? মাওবাদী নেতাকে? বলো কী?
যুগলপ্রসাদ হেসে বলেন, তবে আর বলছি কী?
ব্রহ্মেন্দ্র বললেন, তোমার আশ্রমটা এরকম সব আশ্চর্য আশ্চর্য লোকজন দিয়ে গড়ে তুললে কীভাবে বলো তো? পেয়েও যাও বটে।
যুগলপ্রসাদ বললেন, শোন, পাঞ্চালি আজ পড়াচ্ছে আশ্রমে। যাও, একবার দেখে এসো কী পড়াচ্ছে! তাহলেই বুঝবে কেন ওকে আমার দরকার?
ব্রহ্মেন্দ্র উঠে গিয়ে দাঁড়ালেন জানালার পাশে। ঘরে পনেরো কুড়ি জন আদিবাসী আর কলোনিতে কাজ করা পরিবারের ছেলেমেয়ে। সকলের বয়স চোদ্দো থেকে সাতেরো বছরের মধ্যে। এরা স্থানীয় সরকারি স্কুলে পড়াশোনা করে। আশ্রমে আসে স্কুলের সেই পড়া বুঝে নিতে। পাঞ্চালি পড়ায় ভূগোল, ইংরাজি। ব্রহ্মেন্দ্রও এখানে পড়ান এইট, নাইন, টেনের ছেলে-মেয়েদের।
পাঞ্চালি ওদের বলছে, অন্যকে কথা শেষ করতে দেবে। কেউ তোমার সঙ্গে কথা বলছে। আর তার কথার মাঝেই পুরো কথা না শুনে নিজের কথা বলা খুব খারাপ অভ্যাস। তাহলে কী হবে জানো তো? তোমার কথায় কেউ গুরুত্ব দেবে না। কেউ তোমাকে কিছু বললে, সেই কথার জবাব দিতেও ভুল হয়ে যাবে। তাই আগে অভ্যাস করবে অন্যের কথা শেষ করতে দেওয়ার।
আর একটা কথা মনে রাখো। মনে করো একজন কোনও একটা গল্প বলছে। এমন হতেই পারে যে, সেই গল্প তোমাদের কেউ আগেই শুনেছ। কিন্তু একসঙ্গে কয়েকজনকে যখন সেই গল্প বলা হচ্ছে, তখন কিছুটা শুরু হতেই বলে উঠবে না যে, তুমি গল্পটা জানো। বুঝতেও দেবে না। তাহলে যে বলছে, তার বলার আনন্দটা চলে যাবে। তোমার একটা পরীক্ষাও হবে না। সেই পরীক্ষায় তুমি ফেল করে গেলে। ভাবছ এটা আবার কী পরীক্ষা? এটাকে বলে সংযমের পরীক্ষা। মানে তুমি যে গল্প আগেই জানো, এটা যদি কাউকে বুঝতে না দিয়ে চুপ করে গোটা গল্পটা শুনে যেতে পারো, তাহলে বুঝবে তোমার মনের উপর সংযম আছে। নিয়ন্ত্রণ আছে। মনে রাখতে হবে মনের উপর নিয়ন্ত্রণ আর সংযম হল আসল কথা।
ব্রহ্মেন্দ্র অভিভূত। এটা কীসের ক্লাস হচ্ছে? তার মানে মেয়েটা ভূগোল ইংরাজির পাশাপাশি এই বাচ্চা বয়সেই ছেলেমেয়েদের জীবনের পরিশীলিত আচরণেরও পাঠ দিচ্ছে? কোনও নর্মাল স্কুলে এরকম হয়?
পুরোনো দিনের কথা মনে পড়ে গেল ব্রহ্মেন্দ্রর। সতীন্দ্রনাথ গুহ ছিলেন ব্রহ্মেন্দ্রর ইতিহাস স্যার। হাজারিবাগের সেন্ট কলম্বাস কলেজের শিক্ষক সতীন্দ্রনাথ থাকতেন ছাত্রদের হস্টেলের পাশের একটি কোয়ার্টারে। সতীন্দ্রস্যারের আশ্চর্য অভ্যাস ছিল, তাঁর কৌতূহল বলে বস্তু ছিল না। কোনও ছাত্রকে কাছে ডেকে তিনি বাড়ির খবর জানতে চাননি। সকলেই ধরে নিয়েছিল সতীন্দ্রস্যার বুঝি খুবই মায়াদয়াহীন।
ইতিহাস তিনি এমনভাবে পড়াতেন, যেন একটা গল্প বলছেন। বলতেন, তারপর শিবাজি নিজের তাঁবু থেকে বেরিয়ে দেখলেন এক মুসলিম যুবকের সঙ্গে আর একটি হিন্দু রাজপুত। পোশাক দেখে সেরকমই মনে হল। শিবাজি তবু একটু সতর্ক হয়ে গেলেন। বলা তো যায় না। কোমরে গোঁজা তরবারিতে হাতটা ছুঁইয়ে রাখলেন।…
এসব কাহিনি শুনতে শুনতে মনে হতো চোখের সামনে সবটা দেখা যাচ্ছে।
অনেকদিন পরে ব্রহ্মেন্দ্রর মনে হয়েছে, শিবাজি তাঁবু থেকে বেরিয়ে এসে দেখলেন, আওরঙ্গজেবের ছেলে এসেছে আশ্রয় নিতে, এই বিবরণ কোন ইতিহাস বইতে আছে? মানে ওই তাঁবু থেকে বেরিয়ে অংশটা কি তাহলে সতীন্দ্রস্যারের নিজস্ব? যাতে ছেলেদের মনে গেঁথে যায়?
সতীন্দ্রস্যার বলেছিলেন, যতক্ষণ না তোমাকে কেউ নিজের সম্পর্কে কিছু বলছে, ততক্ষণ তার কাছে কিছু জানতে চাইবে না নিজে থেকে। সেটা সৌজন্য নয়। ব্রিটিশদের দুটো ভালো জিনিসের কথা বলতেন সতীন্দ্রস্যার। প্রথমত, আন্ডারস্টেটমেন্ট। কম কম বলা। গালভরা কোনও প্রতিশ্রুতি কিংবা ঘোষণা করতে নেই। যতটুকু পারবে, তার থেকেও কম কম বলো। আর দ্বিতীয়ত কৌতূহল না থাকা।
এসব ভাবতে ভাবতে ব্রহ্মেন্দ্রর কানে এল, পাঞ্চালি বলছে, কেউ যদি তোমাকে গোপন কথা বলতে গিয়ে বলে, কাউকে কিন্তু বোলো না, সঙ্গে সঙ্গে তাকে বলবে, আমাকে বলতে হবে না। কারণ ওই একই কথা সে হয়তো আরও অনেককে বলেছে। এবার কার মাধ্যমে যে সেই কথা ফাঁস হয়ে যাবে কেউ জানে না। কিন্তু যেহেতু তুমিও শুনেছ, তাই তোমাকেও সে সন্দেহ করতে পারে। তাই শোনারই দরকার নেই। যে কথাটা না শুনে তোমাদের দিব্যি চলে যাচ্ছে, সেটা না শুনলেও চলে যাবে।
ব্রহ্মেন্দ্র চমৎকৃত হয়ে ভাবলেন, অবিকল সত্যেন্দ্রস্যারের মতোই কথা। কত বছরের তফাত। এই মেয়েটা কোন যুগের? নাকি সব যুগেই সতেন্দ্রবাবুরা ফিরে ফিরে আসেন? কোন ভাগ্যবান ছাত্রছাত্রীদের কাছে তিনি আসবেন কোন রূপে, সেকথা কেউ জানে না। এই সামান্য গরিব পরিবারের ছেলেমেয়েরা আজ পাঞ্চালির থেকে যে জীবনবোধের পাঠ পাচ্ছে, সেটা হয়তো বড়সড় স্কুলের পড়ুয়ারাও পাবে না।
ব্রহ্মেন্দ্র আজ স্তুতিকে আসতে বলেছেন এই আশ্রমে। স্তুতি যুগলপ্রসাদকে বলবে যে ঠিক কীভাবে তথাগত কোথায় গেল! ব্রহ্মেন্দ্রর একটিই বোন। স্তুতির মা। তাঁর নিজের সন্তানাদি নেই। এই ভাগনে-ভাগনি ব্রহ্মেন্দ্ররই ছেলেমেয়ে।
ব্রহ্মেন্দ্র নিয়তিবাদী। তিনি ধরেই নিয়েছেন জোর করে জীবনের গতিমুখ বদলানো যায় না। নিজের জীবনেও সেই চেষ্টা করেননি। অথচ স্নেহ নিম্নগামী। সব যুক্তি, সব নীতি, সব অবস্থান নিমেষে বদলে যায় স্নেহভাজনকে সুখী দেখার বাসনায়। এখন তাঁর মনে হচ্ছে, তথাগতকে যেভাবেই হোক খুঁজে বের করতেই হবে। কিন্তু কীভাবে? জানেন না তিনি।
যুগলপ্রসাদের কাছে এসে ব্রহ্মেন্দ্র বললেন, বড় হীনমন্যতা হয়।
যুগলপ্রসাদ বলেন, কেন? পাঞ্চালিকে দেখে?
ব্রহ্মেন্দ্র বলেন, পাঞ্চালিকে দেখে, তোমাকে দেখে। তোমাদের এই কয়েকটি ছেলেমেয়েকে দেখে। তোমরা জীবনে একটা কিছু করছ। নেহাৎ সকালে উঠে নিজের জীবনকে টেনে নিয়ে চলা নয়। অনেকের জীবনকে নিয়ে বেঁচে থাকা, এগিয়ে চলার মধ্যে একটা তৃপ্তি আছে।
যুগলপ্রসাদ বলল, ঈশ্বর তো সবাইকে কিছু না কিছু শক্তি দিয়ে পাঠায়। সমস্যা হল, আমাদের মধ্যে অনেকেই হয়তো শক্তিটা খুঁজে পাই না। অথবা চিনতে পারি না। নিজের শক্তিটা ঠিক কী, সেটা চিনতে হলে আগে নিজের সঙ্গে কথা বলা দরকার। সেই সময়টা দিই না। তাই মানুষ গোটা জীবন বয়ে চলে, অথচ নিজের মধ্যে থাকা শক্তিটাকে জানতে পারে না।
ব্রহ্মেন্দ্র বলেন, আমি তো ঈশ্বরবাদী নই। আমাকে তাই হয়তো শক্তি দেননি।
যুগলপ্রসাদ হেসে বললেন, এই দেখেছ! এই যে তুমি বললে, ঈশ্বর তোমাকে শক্তি দিয়ে পাঠাননি, সেটার অর্থই হল তুমি স্বীকার করে ফেললে যে, ঈশ্বর নামক কেউ আছেন। তাই তো?
ব্রহ্মেন্দ্র বলেন, হ্যাঁ এটাও তো বটে!
পিছন থেকে কেউ একজন বলে উঠলেন, নাস্তিকতা ব্যাপারটা ততক্ষণই ভালো, যতক্ষণ সেটা নিজের মধ্যে সীমাবদ্ধ।
ফাদার স্টুয়ার্ড। দীর্ঘদিনের একাত্মতার কারণে সুন্দরপুরের মানুষ এই তিনজনের নাম দিয়েছে অমর আকবর অ্যান্টনি।
ব্রহ্মেন্দ্র বললেন, ফাদার বোধহয় কথাটা আমাকেই বললেন। তবে আমি নাস্তিকতার সপক্ষে প্রচার করি না!
ফাদার হেসে বললেন, তোমার কথা বলিনি। তুমি বুদ্ধিমান নাস্তিক। আমি সেই নাস্তিকদের কথা বলছি, যারা যতক্ষণ না কাউকে বলতে পারে যে, সে নাস্তিক, ততক্ষণ স্বস্তি পায় না। তাই তারা নতুন মানুষদের কথার মাঝখানেই বলে ফেলতে চায়, আমি অবশ্য ভগবান টগবান মানি না। আমি ঘোর নাস্তিক। এই কথাটা বলার সময় তাদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস কাজ করে। নাস্তিকদের একাংশ আবার সূক্ষ্মভাবে মনে করে সে ঈশ্বরবাদীদের তুলনায় মানসিকভাবে বেশি শক্তিশালী। ঈশ্বরে যারা বিশ্বাস করে, তারা দুর্বল। অথচ এই মনোভাব নিজের মধ্যেই যে রেখে দেবে, এই শক্তি তাদের নেই। তাই বারবার বলতে হয় যে, আমি নাস্তিক।
যুগলপ্রসাদ প্রশ্ন করলেন, ফাদার, মানুষ সবথেকে বেশি পছন্দ করে কী?
ফাদার বলেন, একটা কিছু তো নয়। অসংখ্য তালিকা আছে।
যুগলপ্রসাদ বলেন, অসংখ্য!
ফাদার বললেন, হ্যাঁ। সবথেকে বেশি যে প্রবণতাগুলো দেখে আমরা বুঝতে পারব, সেটার তালিকা বলি। যেমন ধরুন মানুষ সবথেকে ভালোবাসে প্রশংসা শুনতে। স্বীকৃতি পেতে। মনোযোগ পেতে। নিজের মতের সমর্থন পেতে। আমার থেকে যদি কেউ কোনও খবর পায়, আর সেটা পেয়ে বলে, ও তাই? জানতাম না তো! এটা আমাদের খুশি করে। এসব আমাদের প্রত্যেকের মধ্যেই দেখা যায়। যা মানুষকে সবচেয়ে খুশি করে সেটা হল, ‘হ্যাঁ তুমি ঠিক বলেছ’ কথাটা শুনতে। সবার মধ্যে একজন করে স্বৈরাচারী আছে যুগল! সকলেই চায় তার কথা যেন সকলেই মেনে নেয়। বিরুদ্ধ মত শুনলে পালটা তর্ক করতে ইচ্ছা করে। আমি যা বিশ্বাস করি, আমি যা সমর্থন করি, সেটাই অন্যকে সমর্থন করতে হবে, এই ভাবনা প্রত্যেক মানুষের মধ্যে সুপ্ত অবস্থায় থাকে। সকলের মধ্যেই একজন ডিকটেটর বাস করে।
ব্রহ্মেন্দ্র বললেন, বাঃ! আপনি ঠিক বলেছেন ফাদার!
ফাদারের মুখে হাসি ফুটে উঠল। আর তিনজনেই একসঙ্গে হেসে উঠলেন।
কী ব্যাপার? কী হাসির কথা হচ্ছে? পাঞ্চালি এসে পড়েছে।
পাঞ্চালি যুগলপ্রসাদের আশ্রমের অন্যতম এক চালিকা শক্তি। সে নিজেদের দোকানে বসে। ক্রেতাদের সঙ্গে কথাবার্তা বলে। তাদের পছন্দ অপছন্দ চাহিদা জানতে চায়। এরপর চলে আসে আশ্রমে। সেলাই কিংবা হস্তশিল্পে মেয়েদের ট্রেনিং দেওয়া হয়। সেই প্রোডাক্ট পাঠানো হয় জগদলপুর, দান্তেওয়াড়া, এমনকী রায়পুরেও।
আজকাল গ্রামীণ আর্ট কিংবা আদিবাসীদের ডিজাইনের খুব ডিমান্ড হয়েছে। সেই কারণেই এবার গ্রামে গ্রামে ঘুরে পাঞ্চালি আদিবাসীদের থেকে তাদের পেন্টিং, ডোকরা, কাঠের কাজ আর আলপনা দেওয়া শাড়ি ইত্যাদি নেবে ঠিক করেছে।
ফকিরচাঁদ এসব দেখে অত্যন্ত বিস্মিত হয়ে মাঝেমধ্যেই বলে, অবিকল মা জননীর ছাঁদ। অবিকল মা জননীর মতো ভাবনা। সেই কুপার্স ক্যাম্প থিইক্যা এইসব করতেছিলেন মা। এই সুন্দরপুরের শুরুর দিনগুলোতেও মা জননী এইভাবেই গরিব রিফিউজি বাচ্চাগুলোনরে পড়াইতেন। মায়েদের কাজ করতে কইতেন।
পাঞ্চালি বিব্রত হয় কথাগুলো শুনলে। ঠাকুমা সুধাময়ী তার কাছে অনেক দূরের এক নক্ষত্র, এক রোলমডেল।
ব্রহ্মেন্দ্র হেসে বললেন, এটা কি ঠিক হল বুলা?
পাঞ্চালি ভুরু কুঁচকে বলে, কী কাকা?
তুমি যে একটু আগে ছেলেমেয়েদের শেখালে কৌতূহল ভালো না! তাহলে কেন প্রশ্ন করছ যে, কী কারণে আমরা হাসছি?
যুগলপ্রসাদ হো হো করে হেসে উঠলেন। বললেন, থ্যাঙ্ক ইউ থ্যাঙ্ক ইউ ব্রহ্ম। মোক্ষম বলেছ।
আস্তে আস্তে। পাঞ্চালি স্মিত মুখে বলল, ছেলেমেয়েদের কানে গেলে ওরা ভাববে আমি যা শেখাই, তা পালন করি না। এই তো শেষ কথা বলে এলাম, আপনি আচরি ধর্ম, পরেরে শেখাও!
আবার সবাই হেসে ওঠেন।
ফাদার বললেন, হ্যাঁ রে পাঞ্চালি, বাইবেলের গল্পগুলো কীভাবে বলছিস? আসল কথা হল অন্তর্নিহিত কথাগুলো বোঝা। ভক্তিশ্রদ্ধা করলাম, আসল কথা ধরতে পারলাম না, জীবনে প্রয়োগ করলাম না, এসব করে, জীবনধর্ম শেখানো যায় না। বিষ্ণুপুরাণ থেকে যেভাবে গল্প বলিস, সেরকমই বাইবেল বা যিশুর জীবনীটা গল্পের মতো করে বলবি। ধর্মগ্রন্থগুলো যে জীবন তৈরির কারিগর, সেগুলি থেকে রসদ নিয়ে কাজে লাগাতে হবে, এরকম একটা মেসেজ দিবি বাচ্চাদের।
পাঞ্চালি বলে, আমার তো একটা প্রশ্ন সামলাতেই হিমশিম খেতে হয়।
তিনজনই উৎসুক হয়ে তাকিয়ে রইলেন।
পাঞ্চালি বলল, এরা নিষ্পাপ চোখে যখন প্রশ্ন করে, দিদি, কোন ধর্মটা বেশি ভালো লাগে তোমার?
যুগলপ্রসাদ বলেন, বাহ! এটা তো দারুণ কোশ্চেন রে! তুই কী বলিস?
পাঞ্চালি হেসে বলে, ওদের তো গম্ভীর করে বলতে পারি না যে, সব ধর্মই সমান, সব ধর্মের প্রতিই সম্মান রাখতে হবে। এসব গালভরা বইয়ের কথায় এই বয়সিদের মনে ভরবে না। তাই কখনও বলি সব ধর্মের মধ্যে কিছু কিছু প্রোটিন, ভিটামিন, ফ্যাট আছে। শুধু সাদা ভাত কিংবা রুটি খেলে কি আমাদের চলে? কিছু একটা তরকারি, মাংস, ডিম, ডাল তো লাগে! সেরকমই সব ধর্মের মধ্যেই থাকা প্রোটিন ভিটামিন ফ্যাট মিনারেলসগুলোকে নিয়ে নিতে হয়।
আবার কখনও ওদের চাকরির লোভ দেখাই। ছেলেগুলোকে বলি, ধর্ম নিয়েই যদি বেশি মাতামাতি করিস আর বই পড়িস, তাহলে কিন্তু পুলিশ আর সরকারি বাবুদের চাকরি পাবি না। ছেলেগুলো আসলে বেশিরভাগ পুলিশ হতে চায়। ওদের বলি, চাকরির পরীক্ষায় যদি সব ধর্মের ব্যাপারে কিছু প্রশ্ন আসে, তোরা যদি একটা ধর্মের বিষয়ে জেনে পরীক্ষা দিতে যাস, তাহলে তো ফেল করবি। পুলিশ হওয়া হবে না তোদের। পুলিশকে হিন্দু, মুসলমান, খ্রিস্টান সব ক্রিমিনালকেই ধরতে হয়। তাই সবার ধর্ম জেনে সেইসব ক্রিমিনালদের শোধরানোর চেষ্টা হয় জেলে। এসব প্রচুর হাবিজাবি বলি!
ব্রহ্মেন্দ্রর মুগ্ধতা চোখেমুখে। হাত বাড়িয়ে পাঞ্চালিকে বললেন, মাথাটা দে তো, তোকে একটু আশীর্বাদ করি!
গুরুজি…গুরুজি…গুরুজি…!
ভীমা ছুটে আসছে। যুগলপ্রসাদকে সে বলে গুরুজি। তার চোখেমুখে উত্তেজনা। কী হয়েছে? যুগলপ্রসাদ অবশ্য কখনও কোনও বহিরঙ্গের উত্তেজনা প্রকাশ করে না। ভীমা কাছে এসে হাঁপাচ্ছে। চারজনই তাকিয়ে আছে তার দিকে।
ভীমা বলল, বাসে বোম ফেটেছে! বহু লোক মরেছে।
সকলেই চমকে উঠল। প্রত্যেকের মুখ থেকে বেরিয়ে এল একটাই শব্দ, কোথায়?
ভীমা বলল, কেশকালঘাটিতে! যাচ্ছিল সুকমার দিকে। পুলিশও ছিল।
পুলিশও ছিল? পাঞ্চালি বলল, টিভিটা চালাও তো মাস্টারমশাই।
যুগলপ্রসাদ, পাঞ্চালির কাছে মাস্টারমশাই। সকলেই আশ্রমের অফিসরুমে গেল। সেখানে আগে থেকেই অবশ্য টিভি চলছে। সুধাকর বসে আছে। সুধাকর আশ্রমের অফিস অ্যাসিস্ট্যান্ট। রাধাকৃষ্ণ মন্দিরের পুরোহিত বিষ্ণুপদও চলে এসেছে।
লোকাল চ্যানেল খোলো সুধাকর। যুগলপ্রসাদ বললেন, লোকাল চ্যানেলে ডিটেইলস থাকবে। ওরাই আগে ভিস্যুয়ালস পায়।
চ্যানেল ঘোরাতেই সকলে চমকে উঠল। বলছে, অন্তত সত্তর জনের মৃত্যু হয়েছে। বাসে ছিল সিআরপিএফ, ছিল সাধারণ মানুষও। তার মানে এই সি আর পি এফই মাওবাদীদের টার্গেট ছিল।
বাসের কিছুই প্রায় অবশিষ্ট নেই। সম্পূর্ণ দলা পাকানো এক ধাতব কাঠামো। চ্যানেলে বলছে, যেভাবে বিস্ফোরণ হয়েছে, কোনও বডি আইডেন্টিফাই করা শক্ত। ছিন্নভিন্ন হয়ে এদিক-ওদিক ছড়িয়ে আছে। রাস্তার উপর অসংখ্য মৃতদেহ অথবা দেহের অংশবিশেষ। অসহনীয় সেই দৃশ্য দেখা যাচ্ছে না!
মুহূর্তের মধ্যে পাঞ্চালির চোখের সামনে ভেসে উঠল ক্যাপ্টেনের মুখ! ওর চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। এই তাহলে বিপ্লব!
