১৪
মা, বাইরে কীসের একটা শব্দ শোনা যায়। সন্ধ্যার কানের কাছে বাবু ফিসফিস করে বলে।
সন্ধ্যা বলে, তুই ঘুমা, বারান্দায় লোকজন কথা বলে।
বাবু ফিসফিস করে বলল, আমার এখানে ঘুম আসে না মা।
সন্ধ্যা স্তব্ধ হয়ে থাকে। গ্রাসাচ্ছাদনের এই লড়াইতে বাবু আর তপুর কথা তাদের মনেই থাকে না। বাবুর কথাটা শুনে বুক যেন ফেটে যায় সন্ধ্যার।
আজ দশ মাসের বেশি হয়ে গেল বাবু স্কুল যায় না। সুধাময়ী আর সন্ধ্যার কাছে ঘরে কিছু কিছু পড়ে। তাও আবার মহিলা সমিতির দায়িত্ব নেওয়ার পর সন্ধ্যার সময় কমে গিয়েছে। বাবুর কথা শুনে সন্ধ্যারও মনে পড়ে নিজের সেই ঘরটার কথা।
বাবু তেমনই ফিসফিস করে বলল, মা, আমরা আর যাব না নিজেদের ঘরে?
বাবুর মাথায় হাত বোলায় সন্ধ্যা। স্কুলের এই ঘরের মধ্যেই তাদের পাঁচজনের থাকা। সুধাময়ী একটু দূরে একটা তোষকের উপর ঘুমান। তাঁর অনেক ভোরে ওঠার অভ্যাস ছিল। ভোরে উঠে তিনি দাঁত মেজে স্নান করে নিয়ে ঘরের মধ্যেই জপ ধ্যান করে তারপর বারান্দায় আসতেন।
সুধাময়ী এখানে এসে রুটিন পালটে ফেলেছেন। এই একটিমাত্র ঘরে তিনি ছেলে ছেলের বউ আর নাতি নাতনিদের সঙ্গে থাকেন অত্যন্ত সংকুচিত হয়ে। প্রভাস আজকাল মায়ের সামনে ফিরে যাওয়ার কথা উচ্চারণ করতে ভয় পায়।
বাবুর কথা ঠিক। বাইরে ফিসফাসটা যেন বাড়ছে। প্রভাস সুধাময়ী গভীর ঘুমে। সন্ধ্যা আর বাবু জেগে। সন্ধ্যা উঠল নিঃশব্দে। সে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে দরজায় কেউ ধাক্কা দিচ্ছে।
রমাপদের গলা, কুশ…কুশ…ঘুমাস?
সন্ধ্যা নিমেষে দরজা খুলে দেয়। রমাপদ সন্ধ্যাকে ইশারায় বাইরে আসতে বলে। বারান্দায় ততক্ষণে রমাপদর মা, বউ। একটা হ্যারিকেন রাখা।
সন্ধ্যা মুখ উপর নীচ করে জানতে চায় কী হয়েছে?
রমাপদ বলল, কুসুম এখনও ফেরেনি।
সন্ধ্যা বিস্মিত হল। সে বলল, ফেরেনি মানে?
রমাপদ মাথা নাড়ে। ফিসফিস করে বলে, কলকাতায় গেছিল আমার লগে। আগে আগে চইল্যা আইছে। আমার তো দেরি হয়। অর তো সাতটা আটটার মইধ্যে চইল্যা আসার কথা। আমি একটু আগে ফিরছি। ফিইব়্যা দেখি সে আসে নাই।
সন্ধ্যার বুক ছ্যাঁৎ করে উঠল।
সে ঘরে ঢুকে প্রভাসের কানের কাছে গিয়ে বলে, শুনছ…শুনছ…বাইরে আসো।
প্রভাস প্রথমে বোঝেনি। তারপর চোখের সামনে সন্ধ্যাকে দেখে উঠে পড়ল। খালি গা, পরনে একটা পাজামা। সন্ধ্যা মুখে আঙুল দিয়ে চুপ করে থাকতে ইশারা করল।
সন্ধ্যা বলল, কুসুম ফেরেনি।
প্রভাস বলল, কোথা থেকে?
রমাপদ বলল, কলকাতা থেকে।
প্রভাস আকাশ থেকে পড়ল, কলকাতা থেকে! কী বলো? সে তো আমার সঙ্গেই ফিরেছে। আমার সঙ্গে রানাঘাটে দেখা। একই বাসে এলাম।
প্রভাস ফের বলল, আমি ফকিরের বাড়ি গেলাম। সে এদিকেই চলে এল। তখন অবশ্য লাইট ছিল না।
রমাপদ তাকিয়ে আছে শূন্য দৃষ্টিতে। সে বউকে বলে, কুশ তো বলছে, সে কলোনিতে এসেছে! তারপর কী হইল?
প্রভাস ঘরে গিয়ে জামা গায়ে দিয়ে বেরিয়ে এল। বলল, এখানে বসে গুজগুজ করছিস কেন এতক্ষণ? বাইরে চল।
প্রভাস আর রমাপদ বেরিয়ে গেল।
কিন্তু এখন বেরিয়ে তারাই বা যাবে কোথায়? কার কাছে যাবে? এই কলোনির, স্কুলের কাছ অবধি সে এসেছিল। তারপর কোথায় গেল?
সারারাত খুঁজেও কুসুমকে পাওয়া গেল না। পাওয়া গেল ভোরের আলো ফুটলে।
বাঁশবাগানের পাশে যেখানে মহিলা সমিতির ঘর, তার পিছনে কুসুম পড়ে আছে। তার শরীরে কোনও বস্ত্র নেই। নিরাবরণ দেহের নানা জায়গায় চাকা চাকা দাগ। কোনও হিংস্র জন্তু তার শরীরের বিভিন্ন অংশে কামড় দিয়েছে।
নারীর মাংস খাওয়া প্রাণীর নাম কী? অবশ্যই মানুষ! একজন নাকি একাধিক? সেটা বোঝা যায় না। কুসুম কি মৃত? বোঝা যাচ্ছে না। কুসুম অচেতন।
ওই তো…কুসুমের শরীর একটু একটু করে কাঁপছে! তার মানে সে বেঁচে আছে। একটু দূরে দুটো চটের ব্যাগ ছড়ানো। সেখান থেকে বেরিয়ে এসেছে ফ্রক, শাড়ি, জামার পিস, মোমবাতির প্যাকেট।
ফকিরচাঁদ সবার আগে গিয়ে ব্যাগ থেকে টান মেরে একটা নতুন শাড়ি বের করে সেই শাড়ি চাপা দিল কুসুমের গায়ে। বিহ্বল কলোনিবাসী। রমাপদ মাটিতে বসে পড়েছে।
সন্ধ্যা এগিয়ে এল। তার পাশে এল অন্য মেয়েরা। তারা একটা শাড়ি নিয়ে আড়াল করে তৈরি করল কাপড় দিয়ে বর্গক্ষেত্র। তারপর সন্ধ্যা শাড়িটা ভালো করে জড়িয়ে দিল কুসুমের শরীরে।
কুসুমকে ভালো করে শাড়িতে জড়িয়ে দেওয়ার পর তাকে নিয়ে আসা হয়েছে সমিতির ঘরে।
ফকিরচাঁদ বলল, বোনেরে নিয়া যাইতে হইব স্বাস্থ্যকেন্দ্রে। ভর্তি করন লাগব। পুলিশ কেস!
বেশি দেরি হল না। দ্রুত মানুষ ভেঙে পড়েছে। কলোনির কত কষ্ট, রোগভোগ—এসব ছিল। কিন্তু মেয়েদের উপর অত্যাচার কখনও হয়নি। কলোনির মধ্যে বাইরের ছেলেপিলে মাঝেমধ্যে চলে আসে। মেয়েদের দিকে টোন টিটকিরি করে কিন্তু ওই পর্যন্তই।
কারা এ কাজ করল? রমাপদর মাথায় কিছু আসছে না। সুবিমলের কথা মাথায় আসছে। প্রভাস বারান্দায় বসে আছে। তার বুক পুড়ে যাচ্ছে। তাকে দেখে বোঝা যাবে না যে, কী হচ্ছে তার মধ্যে। কাল তার কথা শুনে কুসুম যদি কিছুক্ষণ অপেক্ষা করত।
পুলিশ জিপ এসেছে। একদল লোক চারজন উর্দিধারী পুলিশকে নিয়ে আসছে সমিতির টিনের ঘরের দিকে। তারা ফকিরচাঁদকে দেখে বলল, কী হয়েছে?
ফকিরচাঁদ বলল, এই মেয়ে আমাদের ঘরের। সে কাইল রাইত থিইক্যা আসেনি ঘরে। তারপর আমরা খুঁজলাম। পাই না। ভোরে এই ঘরের পিছনে দেখি পইড়্যা আছে। শরীলে বস্ত্র নাই।
রেপ! রেপ হয়েছে?
ফকিরচাঁদ বলল, রেপ কিনা সেইডা কার কওয়ার কথা? এই মেয়ের? এই মেয়ে কি কথা কইবার পারতেছে? আপনেরা পুলিশ। দেইখ্যা বোঝেন না কোনটা রেপ আর কোনটা আত্মঘাতী হওয়ার চেষ্টা?
বাসুদেব সমাদ্দার অ্যাসিস্ট্যান্ট সাব ইন্সপেক্টর। সে বলল, ক্যাট ক্যাট করে কথা বলবেন না। ত্যান্ডাই ম্যান্ডাই পছন্দ করি না। হাজতে পুরে দিয়ে চারটে ডান্ডা দিলে ঠান্ডা হয়ে যাবে।
ডান্ডা দেবেন! আপনের ড্যান্ডা রাইতের বেলা কই থাকে? ফকিরচাঁদের চোখ জ্বলছে, এইসব হুমকি গুন্ডাদের জইন্য নাই ক্যান! আমাগো এহেনে আপনেদের পাহারা ক্যান দেখি না! দারোগাসাহেব, আমার নাম ফকিরচাঁদ। আমিও ত্যান্ডাই ম্যান্ডাইয়ের ধার ধারি না।
আপনেরা কাইল রাতে কই ছিলেন? মহিলা কণ্ঠ।
গম্ভীর কণ্ঠ শুনে পুলিশ অফিসার বাসুদেব তাকিয়ে দেখে এক বয়স্ক মহিলা। তাঁর চোখ শান্ত।
সুধাময়ী আবার বললেন, কইলেন না তো দারোগাসাহেব! আপনেদের এইসব ড্যান্ডা রাইতের বেলা কলোনিতে দেখা যায় না ক্যান? তখন কী করে আপনের পুলিশ? রাইতে এই কলোনিতে রোজ লাইট চইল্যা যায় ক্যান? খোঁজ নিছেন? এহেন দিয়া টহল দেছেন কোনওদিন? গলা উঁচা কইব়্যা কথা কইয়েন না। আমরা পথ কইব়্যা দিমু। আপনেরে জবাব দিতে হবে যে, ক্যান এই ঘটনা ঘটল?
বাসুদেব সমাদ্দার ভয় পেয়ে গেলেন! সুড়সুড় করে সমিতির ঘরে ঢুকে গেলেন। কুসুমকে দেখে বললেন, যাক্, বেঁচে আছে। একে এখনই হাসপাতালে শিফট করো। যাও একে জিপে তোলার ব্যবস্থা করো। হেলথ সেন্টারে আগে যাও। আমি এদিকটা আগে দেখি।
বাসুদেব বেরিয়ে এসে সুধাময়ীর মুখোমুখি হলেন আপনি কে?
সুধাময়ী বললেন, কলোনির রিফিউজি।
সে তো বুঝলাম। কিন্তু আপনি আমাদের এভাবে অ্যাকিউজ করছেন কেন? কাল অন্ধকার রাতে কী হয়েছে এটা আমাদের পক্ষে কীভাবে জানা সম্ভব?
সুধাময়ী বললেন, এইটুকু একটা কলোনি। এখানে কারা কেমন, কে কী করতে পারে এইডা তাইলে কাদের জানার কথা? এইডা তো বোঝলেন যে, আপনাগো শয়তানেরা ভয় পায় না! তারা ভয় পাইলে কলোনির মইধ্যে ঢুইক্যা একটা মাইয়ারে এইভাবে…সে আমার গেরামের মাইয়া, আর দু-চারদিন পর চইল্যাই যাইত। সে যদি আমার গেরামের মাইয়া নাও হইত, তাও আমি কইতাম। আমার একটাই জিজ্ঞাসা, আপনেরা দোষীদের ধরতে পারবেন কিনা জানান।
বাসুদেব উত্তর না দিয়ে কনস্টেবলকে বলল, স্পটে চলো। ফকিরচাঁদকে বলল, আপনি আমাকে স্পট দেখান, কোথায় পাওয়া গেছে মেয়েটাকে!
ফকিরচাঁদ নিয়ে গেল। গোটা জায়গাটা বাসুদেব তীক্ষ্ণভাবে দেখল। তারপর ভিড়ের মধ্যে তাকিয়ে বলল, প্রত্যেক ফ্যামিলিকে রিলিফ অফিসে ডাকো তোমরা। দেখতে চাই কোন ঘরের কে কে এখন নেই।
সুধাময়ী বললেন, তার মানে? কলোনির ছেলেরাই কলোনির মাইয়ার এই সর্বনাশ করবে? এইডা কী কন?
বাসুদেব বলল, কেন করবে না? কলোনির ছেলে বলে কি ধোওয়া তুলসীপাতা? রোজ নতুন নতুন লোক আসছে এই কলোনিতে। আপনারা কে কাকে কতদিন ধরে চেনেন? একটা মেয়েকে একসঙ্গে তিন চারটে ছেলে অত্যাচার করে যদি, তারা বাইরের থেকেই এসেছে এটা আগাম ধরে নেব কেন? এই কলোনির কেউ না কেন?
সুধাময়ীর মুখে কথা সরল না। এটা তাঁর মাথায় আসেনি। যদি এটাই হয়, তার থেকে বড় লজ্জা আর ঘেন্নার ব্যাপার হতে পারে না।
বাসুদেব এক দৃষ্টিতে চেয়ে আছে সুধাময়ীর দিকে। তারপর আরও কাছে এসে বলল, শুনুন মাসিমা, এলাকার ক্রিমিনালদের আমরা চিনি। তাদের মোডাস অপারেন্ডি জানি। মুভমেন্ট জানি। তারা চুরি করে। তাদের রিসিভার কে সেটাও আমরা জানি। রিসিভার মানে জানেন তো? চুরি করা মাল যেখানে বিক্রি করতে হয়। কলোনির মেয়েকে নিয়ে টানাটানি করলে কলোনিতেই ধরা পড়ে গিয়ে পিটুনিতেই মরে যাওয়ার যে সম্ভাবনা সেটা ওই বাইরের ক্রিমিনালরা জানে। আমরা তাদের ধরে ফেলব সেটাও তারা জানে। তাই আমার ধারণা এই কলোনির লোক, আপনাদের আশেপাশের কেউ এই কাজ করেছে। তবে আমি শিওর না। মেয়েটির নাম যেন কী?
সুধাময়ী বললেন, কুসুম।
হ্যাঁ। কুসুম। তার স্টেটমেন্ট নিলেই জানা যাবে কিছুটা। আপাতত ওর পরিবারের কেউ আমার সঙ্গে আসুক। একটা ডায়েরি করতে হবে।
ফকিরচাঁদ রমাপদকে এসে বলল, রমা, তোমারে ডাকে পুলিশ!
রমাপদ এগোয়। আর প্রভাসের দিকে তাকিয়ে বলে, সুবিমলকে কী জবাব দেব কুশ? আমি তো শ্যাষ হইয়া গেলাম। বোনটারে এহেনে নিয়া আইস্যা এ কী হইল?
কুসুম হাসপাতালে শুশ্রূষার পরে কিছুটা ধাতস্থ হয়েছে। সে পুলিশকে বলেছে, সে দুটো ব্যাগ হাতে নিয়ে যখন মহিলা সমিতির পাশের রাস্তা ধরে যাচ্ছিল, তাকে একজন নাম ধরে ডেকেছিল। সমিতি থেকে কয়েকটা কাপড় নিয়ে যা। সন্ধ্যাদির হাতে দিবি।
কিন্তু কার গলা? কুসুম বোঝেনি। হঠাৎ পিছন থেকে কেউ তার মুখ চেপে ধরে। আর টানতে টানতে নিয়ে যায়।
কুসুম পারেনি আটকাতে। তারপর মুখের মধ্যে কাপড় গুঁজে দিয়ে কোনও ভেজা ভেজা ঘাস মাটির মধ্যে শুইয়ে দিয়ে তার জামাকাপড় খুলে…। কুসুম কাঁদে।
বাসুদেব সমাদ্দার বিজয়ীর হাসি হাসে। সে জানত, এই কাজ কলোনির ভিতরের কারও। কুসুমকে ডাকার ভাব থেকেই বোঝা যাচ্ছে যে কুসুমের কাছে যেটা স্বাভাবিক মনে হবে, সেভাবেই কেউ ডেকেছে। কে সে? কুসুম এটা বলতে পারছে না। বাসুদেব অবশ্য জানে যে বা যারা করেছে, ধরা পড়বেই।
পাঁচদিন পরে। রমাপদ খুব ভোরে এল প্রভাসের দরজায়। সন্ধ্যাকে ভোরেই উঠতে হয়। নিঃশব্দে সে উনুন ধরায় পিছনের কলতলায়। তেমনই গিয়েছিল। বারান্দার কাছে এসে সন্ধ্যা তাকিয়ে দেখল বাইরে বাক্স প্যাঁটরা। অবাক হল। রমাপদ সপরিবারে বারান্দায়। এখনও আলো তত ফোটেনি। কিন্তু রমাপদরা কোথায় যাচ্ছে?
সন্ধ্যা দ্রুত উঠে এসে প্রভাসকে জাগিয়ে দেয়। সুধাময়ী উঠে পড়েছেন। বাইরে প্রভাস আর সুধাময়ী আসতেই রমাপদ বলল, আমরা চলে যাচ্ছি!
প্রভাস বলল, চলে যাচ্ছি মানে?
রমাপদ বলল, ইন্ডিয়ায় আর থাকুম না।
প্রভাস আকাশ থেকে পড়ল। সন্ধ্যাও।
সন্ধ্যা বলল, কী হল রমা ঠাকুরপো? এভাবে…
রমাপদ বলল, যাদের তাড়া খাইয়া নদী পার হইয়া ট্রেনে কইরা বর্ডার পেরাইলাম, তারা আমাদের গায়ে হাত দ্যায় নাই। বহু মাইনষের জান মান গেছে। আমরা তো বাঁইচ্যা আইলাম। আর এহেনে? যেহেনে ভাবছিলাম সুখ নাই থাক, শান্তি পামু। ভয়ে ভয়ে থাকতে হইব না। সেহেনে নিজেদের লোক মেয়েটার জেবন ধ্বংস কইব়্যা দিল।
প্রভাস বলল, এখনও তো কুসুম হাসপাতালে।
রমাপদ বলে, তারে আর এহেনে আনুম না। তারে হাসপাতাল থিইক্যাই নিয়ে রওনা হমু। আর এই দ্যাশে মন চায় নারে কুশ। বোনডা বাঁইচ্যা আছে, এই আমার অনেক। অন্য দ্যাশে উদ্বাস্তু হওনের শখ মিইট্যা গেছে রে কুশ! যাই, নিজের দ্যাশেই না হয় মরি!
সন্ধ্যা, প্রভাস, সুধাময়ী স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে। রমাপদের পরিবার সিঁড়ি দিয়ে নেমে গেল।
একমাসের মধ্যেই রিলিফ অফিসে নোটিশ পড়ল। এই কলোনি ডিসম্যান্টল করা হবে। স্থায়ী ক্যাম্পে কিংবা কলোনিতে পাঠানো হবে সবাইকে। কারণ কী? যাদের জমি আর ঘর ইতিমধ্যেই দেওয়া হয়েছে, একমাত্র তারাই থাকবে। গত এক বছর ধরে যারা এসেছে, তাদের অন্যত্র চলে যেতে হবে। অথবা তারা ফিরে যাক পূর্ববঙ্গে। সেখানে ঝামেলা মিটে গিয়েছে অনেকদিন।
আসল কারণ অবশ্য অন্য। যে ঘটনা ঘটেছে কুসুমের সঙ্গে সেই খবর এর মধ্যেই সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছে। হইচই হচ্ছে রাজনীতিতে। আরও হাঙ্গামা বাড়বে। পার্লামেন্টেও কথা উঠতে পারে।
১৯৬৫ সালের মার্চ মাস। প্রভাসের পরিবারকে ট্রেনে করে শিয়ালদহ নিয়ে আসা হল। সেখানে থেকে কয়েকশো মানুষকে নিয়ে রওনা হল একটি মিলিটারি স্পেশাল ট্রেন। প্রভাসের পরিবারে ছিল পাঁচজন। এখন হয়েছে ছয়জন। ফকিরচাঁদও যোগ দিয়েছে তাদের সঙ্গে। সে বলেছে, আগে সে দেখে আসবে কোথায় রাখা হচ্ছে সুধাময়ীদের, তারপর ফিরবে।
প্রায় পনেরো ঘণ্টা পর ট্রেন এসে দাঁড়াল একটি হল্ট স্টেশনে। বাইরে আগে থেকেই অনেকগুলো ম্যাটাডোর দাঁড়ানো। সেখানে তোলা হল ব্যাচ করে করে।
প্রায় দেড় ঘণ্টা পর সেই ম্যাটাডোর এসে দাঁড়াল একটি বড় গেটের সামনে। ইট দিয়ে তৈরি গেট। প্লাস্টার নেই। ভিতরে বেশ কিছু তাঁবু। আর অদূরে সার দেওয়া টিনের ঘর।
প্রভাস মাথা বের করে দেখল, সাদা বোর্ডের উপর ইংরাজি আর বাংলায় কালো কালি দিয়ে লেখা, দণ্ডকারণ্য পুনর্বাসন প্রজেক্ট! মানা ক্যাম্প!
ফকিরচাঁদ সবার আগে লাফ দিয়ে নামল। চিৎকার করে বলল, মা জননী আপনেদের শ্যাষে এই জঙ্গলে এনে ফেলল! হায়রে। ছিলাম মানুষ, আনছে জন্তুর সাথে থাকার জইন্য! দণ্ডকারণ্য মানেই হল নির্বাসন! বাঘ ভাল্লুক সাপ হায়না আর শেয়াল। এ কী সব্বনাশ হইল!
সুধাময়ী শান্তকণ্ঠে মনে মনে বললেন, ‘আমি বহু বাসনায় প্রাণপণে চাই…বঞ্চিত করে বাঁচালে মোরে…। ’
