২
সৈয়দ আবদুল্লা বিজাপুর এসেই শুনতে পাচ্ছিলেন, আগ্রা শহরে শাহজাহান একটি স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করছেন। যা নাকি বিশ্বের কোনও দেশে নেই। সম্পূর্ণ শ্বেত পাথর দিয়ে তৈরি হচ্ছে। ঠিক পাশেই যমুনা নদী। কয়েক হাজার শ্রমিক কাজে যুক্ত। দিনরাত কাজ হচ্ছে।
হজরত মহম্মদের বংশধর হজরত সৈয়দ আবদুল্লা পবিত্র মদিনা শরিফ থেকে ভারতের হায়দরাবাদের কাছেই বিজাপুর পৌঁছেছেন কয়েকদিন আগে। শাহজাহান দিল্লির সম্রাট, কিন্তু বিজাপুরে এক স্থানীয় স্বাধীন সুলতান আছেন। মোগলদের আওতায় তারা আসেনি।
১৬৩৬ সাল। সৈয়দ আবদুল্লা সম্পূর্ণ শূন্য হাতে আসেননি। ক্রমেই জানা গেল, তাঁর সঙ্গে তিনটি পবিত্র স্মারক রয়েছে। মহানবী হজরত আলির পাগড়ি। হজরত আলির সবথেকে প্রিয় ঘোড়ার জিন। যাকে বলা হয়ে থাকে জুল জালাল। আর সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ এবং বিশুদ্ধ এক স্মারক হল স্বয়ং মহানবীর দাড়ির অংশবিশেষ। পরিভাষায় সম্বোধন করা হচ্ছে, মোই-ই-মুকদ্দস।
সৈয়দ আবদুল্লার দেহাবসানের পর তিনটি স্মারক এল তাঁর পুত্র সৈয়দ হামিদের কাছে। বছরের পর বছর কেটে গেল। তিনিই এই তিন পবিত্র স্মারকের মুতোয়ালি। আর তারপর থেকে রহস্য তৈরি হয়ে গেল এই স্মারককে ঘিরে। কিছু বছর পর জানা গেল, ওই মহান স্মারক নাকি সৈয়দ হামিদের কাছেও আর নেই। তাহলে গেল কোথায়?
পবিত্র দাড়ির অংশ এসে পৌঁছেছে এক কাশ্মীরি ব্যবসায়ীর কাছে। খাজা নূরউদ্দিন আশাওয়ারি। কিন্তু কোথায় বিজাপুর, আর কোথায় কাশ্মীর! এত দূরের এক মানুষের কাছে এই দাড়ি এল কীভাবে?
বহুশ্রুত একটি কাহিনি হল, কাশ্মীর থেকে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তেই যাতায়াত ছিল ব্যবসায়ী নূরউদ্দিনের। স্বাভাবিকভাবেই তিনি পণ্য বিক্রি অথবা ক্রয়ের কারণে আসা যাওয়া করতেন বিজাপুরে। হায়দরাবাদ যেহেতু সম্পদশালী এক নগরী, বিজাপুরেও বহু পরিচিত ক্রেতা আছে নূরউদ্দিনের। তাদের কাছে জানতে পারলেন সৈয়দ হামিদের কথা। দেখাও করলেন।
সৈয়দ হামিদ তাঁকে শোনালেন তাঁর আব্বা হুজৌরের অনেক উপদেশ। নূরউদ্দিন ফেরার সময় সসংকোচে একটি অনুরোধ করলেন। বললেন, পবিত্র ওই তিন স্মারকের মধ্যে অন্তত একটি যদি তাঁকে দান করেন সৈয়দ হামিদ, তাহলে, তিনি ধন্য হবেন। আর পবিত্র হবে কাশ্মীরও। কিন্তু প্রাথমিকভাবে রাজি হলেন না সৈয়দ হামিদ।
কিন্তু তারপর ঘটল এক আশ্চর্য পটবদল। ঘুমের মধ্যে হঠাৎ সৈয়দ হামিদের স্বপ্নে উপস্থিত হলেন স্বয়ং পয়গম্বর। তিনি আদেশ করলেন, ওই তিনটে স্মারকের মধ্যে একটি নূরউদ্দিনকে দেওয়া হোক।
সেই নির্দেশ পেয়েই সৈয়দ হামিদ ভাবতে বসলেন তিনটে স্মারকই তো তাঁর কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাহলে কোন স্মারক দেওয়া উচিত? যেহেতু স্বয়ং পয়গম্বরের আদেশ, অতএব দ্বিধা করা চলে না। সবথেকে যা পবিত্র সেই দাড়ির অংশটি দেওয়া সাব্যস্ত করলেন। নূরউদ্দিনকে আবার ডেকে পাঠিয়ে তাঁর হাতে সমর্পণ করলেন সেই দাড়ি। মোই-ই-মুকদ্দস।
এই কাহিনি আবার অনেকের কাছে বিশ্বাসযোগ্য নয়। অন্য একটি জনশ্রুতিও ইতিহাসে চর্চিত। প্রবল অর্থসঙ্কটে নাকি পড়েছিলেন সৈয়দ হামিদ। তাঁর পক্ষে আর পরিবার পরিজন সামলে এই তিন স্মারককে যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ করাও সম্ভব হচ্ছিল না। তাই তিনি বিক্রি করার সিদ্ধান্ত নিলেন অন্তত একটি স্মারক। আর কাশ্মীরের মতো ধনী এক রাজ্য থেকে আসা ব্যবসায়ীর কানে এই সংবাদ পৌঁছোতে দেরি হল না। অতএব তিনিই অনুরোধ করলেন সৈয়দ হামিদকে যে, আমাকেই দিন ওই স্মারক। যদিও এই স্মারক অমূল্য, তবু সামান্য প্রণামী হিসেবেই যেন অর্থ প্রদান করে স্মারক হাতে পেলেন নূরউদ্দিন।
কোন কাহিনি সত্যি এবং ইতিহাসাশ্রয়ী, সেই জল্পনা অন্তহীনভাবে চলেছে আজও। তবে পবিত্র স্মারক হস্তান্তর করার কাহিনি সমাপ্ত হয়নি। এরপর এই পবিত্র দাড়ির অংশের সফরও চলছে।
সম্রাট শাহজাহান দিল্লিশ্বর আর নন। এবার তাঁর পুত্রের হাতে রাজপাট। সম্রাট আওরঙ্গজেব। তাঁর কানে পৌঁছে গেল এই ঘটনা। তিনি মেনে নিতে পারছেন না যে, এভাবে একজন ব্যবসায়ীর কাছে কীভাবে ইসলাম জগতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ পবিত্র বস্তু থেকে যেতে পারে! সেই পবিত্র স্মারক তো থাকা উচিত কোনও এক পবিত্র ইসলামি ধর্মস্থানে! যেমন ভাবা যেমন কাজ।
আওরঙ্গজেব বন্দি করলেন নূরউদ্দিনকে। লাহোর দুর্গের অদূরের কারান্তরালে রাখা হল তাকে। আর ছিনিয়ে নেওয়া হল সেই পবিত্র স্মারক। আওরঙ্গজেব নির্দেশ দিলেন, এই স্মারক থাকবে খাজা মইনউদ্দিন চিস্তির দরগায়। তাই হল। বিনা দোষেই নূরউদ্দিনকে সাজা পেতে হল। তিনি বারংবার মিনতি করে বললেন, আমি চুরি করিনি। অত্যাচার করে আদায়ও করিনি এই পবিত্র স্মারক। আমি যা করেছি আল্লাহের ইচ্ছাতেই করেছি।
কিন্তু এসব কথা আওরঙ্গজেব শুনলেন না। স্মারক নিয়ে আওরঙ্গজেব গেলেন আজমীড়। খাজা মইনউদ্দিন চিস্তির পবিত্র দরগায়। সেখানেই স্থান পেল পয়গম্বরের দাড়ির অংশ। আওরঙ্গজেব নিশ্চিন্ত হয়ে ভাবলেন, অবশেষে সঠিক স্থানে জায়গা পেয়েছে এই স্মারক।
আবার এক অলৌকিক কাণ্ড! সম্রাট আওরঙ্গজেব স্বপ্নে পেলেন দৈব নির্দেশিকা। পয়গম্বর সম্রাটকে আদেশ দিলেন, খাজা নূরউদ্দিন আশওয়ারিকে মুক্তি দিতে হবে। শুধু তাই নয়, তাঁকেই আবার ফেরত দিতে হবে সেই পবিত্র স্মারক। কারণ, ওটা রাখা এবং প্রতিষ্ঠার জন্য তাঁকেই বাছাই করা হয়েছে।
আওরঙ্গজেব ছিলেন ইসলামের পালনকারী। সুতরাং আদেশ পেয়ে আওরঙ্গজেব এত্তেলা পাঠালেন লাহোর জেলে। সেই স্মারক আজমীড় শরিফ থেকে ফিরিয়ে খাজা নূরউদ্দিনকে দিতে নিজেই এলেন।
ইতিহাসের পরিহাস! খাজা নূরউদ্দিন মুক্তির স্বাদ পাওয়ার সংবাদ পেলেন না। তার আগেই বন্দিশালায় প্রাণ হারালেন।
১৭০০ সালে মোই-ই-মুকদ্দস কাশ্মীরের উদ্দেশে যাত্রা করল। আর সঙ্গে কাশ্মীরে এল খাজা নূরউদ্দিনের প্রাণহীন শরীর। পবিত্র সেই স্মারকের আগমনে কাশ্মীর যেন পরিণত হয়ে উঠল এক অন্য মদিনায়। খাজা নূরউদ্দিনের কন্যা ইনায়েত বেগম হলেন সেই স্মারকের নয়া রক্ষণকারী। তাঁর বিবাহসূত্রে যে পরিবারের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন হয়েছিল, সেই বান্দে পরিবার বংশানুক্রমে পেলেন পবিত্র স্মারকের রক্ষণাবেক্ষণকারীর অধিকার।
প্রথমে স্মারক রাখা হয়েছিল শ্রীনগরের খানকোয়াহি নকশাবান্দিয়ায়। সমস্যা হল, প্রথমে শুধুই কাশ্মীর থেকে, পরবর্তী সময়ে গোটা হিন্দুস্তান মুলুক থেকেই লক্ষ লক্ষ ধর্মপ্রাণ মানুষ এই নকশাবান্দিয়ায় আছড়ে পড়তে শুরু করলেন। এই ক্ষুদ্র পরিসরে এত মানুষকে কীভাবে স্থান দেওয়া সম্ভব? অথচ সাধারণ ধর্মীয় মানুষকে তো এই পবিত্র স্মারকের দর্শক হওয়া থেকে নিরস্ত করা যায় না? এত দূর দূর থেকে তারা আসছে! তাদের কি হতাশ করা চলে! পরবর্তী সময়ে স্মারক স্থানান্তরিত হল বাগ-ই-সঈফ খানে। সাদিক খানের বাংলো নামেই তা পরিচিত।
কে এই সাদিক খান? তিনি ছিলেন সম্রাট শাহজাহানের আমলের সুবেদার। ১৬২৩ সালে তিনি এক বিরাট বাংলো নির্মাণ করেছিলেন। সংলগ্ন জমিতে মনোরম বাগান। ইশরাত মহল। স্বয়ং সম্রাট শাহজাহানও এই ইশরাত মহলে এসেছিলেন ১৬৩৪ সালে। তিনিই সাদিক খানকে নির্দেশ দিলেন, এই মহলকে আর বিলাস বৈভবের স্থান হিসেবে ব্যবহার করা চলবে না। একে করা হোক মসজিদ।
তাই হল, ইশরাত মহল হয়ে গেল মসজিদ। অবশেষে এই মসজিদেই এনে রাখা হল পবিত্র স্মারক। এভাবেই পবিত্র এক ধর্মীয় স্থলের নাম হয়ে গেল হজরতবাল দরগা।
২৭ ডিসেম্বর ১৯৬৩। ভোর। হজরতবাল মসজিদের খাদিমের নাম খলিল। দরগায় থাকে। ঘুম থেকে উঠে ওজু করার পর নমাজ পড়ার জন্য গেলেন প্রধান কক্ষে। নমাজের প্রাকমুহূর্তে তাঁর চোখ সরাসরি গেল হুজুর এ খাসের দিকে। যে স্থানে সেই পবিত্র স্মারক মোই-ই-মুকদ্দস রাখা হয়েছে, সেই জায়গাটিই হল হুজুর এ খাস।
একি! খাদিম চমকে উঠল। হুজুর এ খাসের রুপো দিয়ে তৈরি দরজা খোলা। যা বন্ধ থাকার কথা। খোলাও ঠিক নয়। ভাঙা হয়েছে এই দরজা। যার ভিতরে থাকে একটি ক্ষুদ্র বাক্স। আসলে লকার। তিনটি চাবি দিয়ে খুলতে হয় সেই লকার। কাছে এসে খাদিমের বিস্ফারিত চোখ দেখতে পেল সেই লকারও ভাঙা। লকারের দিকে তাকিয়ে কোনও কাঠের বাক্স পাওয়া গেল না। যে কাঠের বাক্সের মধ্যেই রয়েছে এতকাল ধরে মোই-ই-মুকদ্দস। এ কাজ কার? এই পবিত্রতম বস্তু কোথায় গেল? কে চুরি করল? সর্বনাশ!
একটু একটু করে পিছিয়ে এসে তিনি সোজা দৌড়লেন হজরতবাল দরগার প্রধান ট্রাস্টির কাছে। আবদুর রহমান বান্দে। কাছেই বাড়ি। আবদুর রহমান বান্দের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। এতকাল ধরে এই পবিত্র স্মারক রয়েছে তাঁদের পরিবারের রক্ষণাবেক্ষণে। আজ এভাবে এই স্মারক উধাও হয়ে গেল? কীভাবে সম্ভব? এই স্মারকে হাত লাগানোর দুঃসাহস হয় কীভাবে? কার কাজ? দেশবিদেশে এই খবর ছড়ালে মহাসর্বনাশ! কয়ামৎ নেমে আসবে।
যা ভয় ছিল, ঠিক সেটাই ঘটল। এক ঘণ্টার মধ্যেই ছড়িয়ে পড়ল এই সংবাদ। দলে দলে মানুষ ছুটে আসছে। হাতে কালো পতাকা নিয়ে হাজির হচ্ছে এক দঙ্গল যুবা। তারা কালো পতাকা নিয়ে ছুটছে প্রশাসনিক ভবন আর পুলিশ হেডকোয়ার্টারের দিকে। সবথেকে দাপুটে এবং প্রভাবশালী রাজনীতির মানুষটিই তো নেই। শেখ আবদুল্লা। তিনি আপাতত জেলবন্দি।
বকশি গুলোম মহম্মদকে মুখ্যমন্ত্রী করা হয়েছিল বটে, কিন্তু সেই প্ল্যানও বদলে ফেলা হল। তাঁকে সরিয়ে নতুন মুখ্যমন্ত্রী হলেন খাজা সামসুদ্দিন। তাঁর পক্ষে এই সঙ্কটের একা মোকাবিলা করা অসম্ভব। অতএব সর্বাগ্রে যা করতে হয় সেই সিদ্ধান্তই নিতে হল, দিল্লিকে জানানো।
শরীর ভালো যাচ্ছে না প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর। কিছুদিন ধরে কন্যাকে বলেওছিলেন যে, কয়েকদিনের জন্য শ্রীনগর গেলে কেমন হয়! নেহরুর এই শরীর ভেঙে যাওয়ার সঙ্গে শুধুই বয়সোচিত অসুস্থতা যুক্ত আছে এমন নয়। এনার্জিতে ভরপুর কর্মঠ মানুষটির শক্তি যেন নিঃশেষিত হয়ে যাচ্ছে। অন্যতম প্রধান কারণ গত বছর চীনের কাছে ধাক্কা খাওয়া! সেই হিন্দি চীনি ভাই ভাই স্লোগানকে তিনি প্রাণ থেকেই বিশ্বাস করেছিলেন।
তিব্বত থেকে দলাই লামার ভারতে চলে আসার আগে থেকেই অবশ্যই চীনের বিরূপ মনোভব প্রকট হচ্ছিল। কিন্তু দলাই লামার ভারতে আশ্রয় পাওয়া এবং নেহরুর স্বাগত জানানো পিকিং সরকার কোনওভাবেই মেনে নেয়নি। তাই সব দ্বিধা ঝেড়ে ফেলে ১৯৬২ সালে চীনের আগ্রাসী আক্রমণ ভারতের ভূমি দখল করার। নেহরু জানতেন যে, মাত্র ১৫ বছর বয়সি একটি স্বাধীন দেশের পক্ষে বড়সড় যুদ্ধে যাওয়ার শক্তি সীমিত। কিন্তু তিনি আত্মসম্মান সম্পন্ন এক ব্যক্তিত্ব। উত্তর পূর্ব সীমান্তে যেভাবে চীন ক্রমেই লাগাতার জমি দখল করে নিচ্ছে, সেটা নীরবে সহ্য করা অসম্ভব। তাই তিনিই ইনটেলিজেন্স ব্যুরোর থেকে রিপোর্ট পেয়ে আর্মিকে বলেছিলেন যে, যারাই আমাদের সীমান্তে প্রবেশ করার স্পর্ধা দেখাবে তাদের উৎখাত করতে হবে। আমার পক্ষ থেকে খোলাখুলি ছাড় দেওয়া হল। সেই প্রত্যাঘাতের অপেক্ষায় ছিল চীন। অতএব শুরু হয়েছিল যুদ্ধ।
সেই যুদ্ধে যেভাবে ভারতকে পিছু হটতে হয়েছিল, সেটা আজও নেহরুর কাছে অসম্ভব এক যন্ত্রণা। হতে পারে কাকতালীয়, তবে তারপর থেকেই নেহরুর শরীর ও মন ভাঙতে শুরু করে। এমনকী স্বাধীনতার পর এই প্রথম ১৯৬৩ সালে তাঁর বিরুদ্ধে সংসদে অনাস্থা প্রস্তাব পর্যন্ত আনা হয়েছিল! কমিউনিস্ট অথবা জনসংঘের সদস্যরা যতই তাঁর বিরুদ্ধতা করুন, তাঁকে ব্যক্তিগতভাবে শ্রদ্ধা করেন এরকম একটা আত্মবিশ্বাস ছিল তাঁর। কিন্তু এই অনাস্থা প্রস্তাব সব উল্টে দিল। এ যেন তাঁর বিপক্ষেই অনাস্থা!
সুতরাং নেহরুর আজকাল আর যেন কিছুই ভালো লাগছে না। যাঁর সঙ্গে রাজনীতি ও স্বাধীনতা আন্দোলনে দীর্ঘকাল পথ হেঁটেছেন, সেই লালবাহাদুর শাস্ত্রীকে বেশ কিছু দায়িত্ব দিয়েছেন। তাছাড়া কন্যা ইন্দু আজকাল দল ও সরকারের অনেক দায়িত্বই সামলাচ্ছে।
এরকম এক সময়ে চরম দুঃসংবাদ এল কাশ্মীর থেকে। গুপ্তচর সংস্থা ইনটেলিজেন্স ব্যুরোর চিফ ভোলানাথ মল্লিক দীর্ঘকাল ধরে নেহরুর সঙ্গে রয়েছেন। দেশের গুপ্তচর ও তদন্ত সংক্রান্ত এজেন্সিগুলির সর্বেসর্বা হিসেবে প্রশাসনে তিনি বি এন মল্লিক হিসেবেই পরিচিত। মল্লিক ২৭ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রীকে জানালেন, হজরতবাল দরগা থেকে পবিত্র স্মারক চুরি হয়েছে। কাশ্মীরে চরম উত্তাপ। লোকাল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন সামলাতে পারবে বলে মনে হচ্ছে না। আমাদের হেল্প চাইছেন সিএম।
নেহরু চমকে উঠলেন। তিনি বি এন মল্লিককে বললেন, তুমি নিজেই যাও। অ্যাজ আর্লি অ্যাজ পসিবল সলভ করতেই হবে। না হলে পাকিস্তান আবার ইস্যু করবে।
নেহরুর আশঙ্কা সত্যি হল। দ্রুত পাকিস্তান হজরতবাল থেকে পয়গম্বরের পবিত্র দাড়ির অংশ চুরি যাওয়াকে ভারত সরকার এবং হিন্দুত্ববাদী ভারতের একটি চক্রান্ত হিসেবে প্রচার শুরু করে দিল। পাকিস্তান জুড়ে শুরু হল মিছিল মিটিং। শুরু হল প্রত্যাশিত প্রথম প্রতিক্রিয়া, হিন্দুদের উপর অত্যাচার।
৪ জানুয়ারি ১৯৬৪। ইনটেলিজেন্স ব্যুরোর প্রধান বি এন মল্লিক শ্রীনগরের উঁচু বিল্ডিংয়ের ছাদে দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁর হাতে একটি বাক্স। সামনে রাস্তায় অন্তহীন মানুষ। ভারত সরকারের বিরুদ্ধে স্লোগান দিচ্ছে। কালো পতাকাও রয়েছে। তারা আজই সকালে খবর পেয়েছে হঠাৎ করেই নাকি ফিরে এসেছে সেই হারিয়ে যাওয়া হজরতবাল। এ আবার কী? এভাবে হঠাৎ উধাও? আবার হঠাৎ শূন্য থেকেই ফিরে এল এই হজরতবাল দরগায় সযত্নে রক্ষিত সেই মহাপবিত্র স্মারক! এরকম হয় নাকি? সুতরাং প্রাথমিকাভাবে কেউই বিশ্বাস করছে না। কিন্তু সরকার থেকে জানিয়ে দেওয়া হল, মহল্লায় মহল্লায় যে, প্রমাণ প্রদর্শিত হবে আজ সকালে। কোনও সংশয় নেই।
এই আশ্বাস পেয়ে দলে দলে মানুষ আজ এসে হাজির। সকলেই তাকিয়ে আছে অধীর আগ্রহ নিয়ে বি এন মল্লিকের দিকে। তিনি কারও অপেক্ষা করছেন। টেনশন বাড়ছে। দশ মিনিট। তারপর এক ব্যক্তি হাজির হয়ে বি এন মল্লিকের হাতে দিল একটি বাক্স। ছোট কাঠের বাক্স। বি এন মল্লিক হাত দিয়ে সেটি তুলে ধরে মাইক্রোফোনে বললেন, আমরা খুঁজে আনতে সক্ষম হয়েছি এই পবিত্র বাক্স। এর মধ্যেই রয়েছে সেই পবিত্র স্মারক। এই হল সেই বাক্স। জনতা জয়ধ্বনি দিয়ে উঠল।
কিন্তু তার মধ্যেই একটি ভিড়ের অংশ থেকে কেউ ক্রুদ্ধ কণ্ঠে চিৎকার করে বলল, ইয়ে ডিব্বি বিলকুল নকলি হ্যায়। ইসমে সহিমে মোই-ই-মুকদ্দস হ্যায় ইসকা জামানত কেয়া হ্যায়?
হাঁ, হ্যা, জামানত কেয়া হ্যায়? আরও মানুষ কণ্ঠ মেলাচ্ছে।
বি এন মল্লিক অত্যন্ত দুঁদে অফিসার। তিনি স্বাধীনতার পর থেকে বহু ক্রাইসিস সামলেছেন। সুতরাং ঠান্ডা মাথায় তিনি জানিয়ে দিলেন, আপাতত এই বাক্স থাকবে সুরক্ষিত এক লকারে। তারপর আমরা এ ব্যাপারে ধর্মীয় বিশেষজ্ঞদের রায় নিয়েই সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেব যে, কীভাবে বাক্স খোলা সম্ভব! এভাবে তো এই পবিত্র স্মারককে খোলা-আকাশের নীচে খুলে দেখানো সম্ভব নয়। সেটা হবে পবিত্র ইসলামের চরম অসম্মান।
সুতরাং, স্থির হল, ৬ ফেব্রুয়ারি সাধারণ মানুষের জন্য প্রদর্শিত হবে আবার পূর্বের মতোই ওই স্মারক। তবে তার আগে ৪ ফেব্রুয়ারি মৌলানা, ধর্মপ্রাণ ফকির এবং বিশেষজ্ঞরা নিজেরাই একে চাক্ষুষ করবেন। তাঁরা যদি সন্তুষ্ট হয়ে বিশ্বাস করেন এবং আশ্বস্ত হন যে, হ্যাঁ, এটাই সেই হারিয়ে যাওয়া হজরতবাল স্মারক, তবেই তাকে রাখা হবে।
৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৪। দুপুর ৩টে। সেই বাক্স বের করা হল। আবদুল রহিম সেটি প্রথম খুললেন। ১৪ জনকে ডাকা হয়েছে। তারা একে একে সবাই দেখবেন। তাই হল। সবথেকে ধর্মপ্রাণ ও শ্রদ্ধেয় হলেন মীরাক শাহ। তাঁর মতামতের অপরিসীম তাৎপর্য। তিনি কী বলবেন?
মীরাক শা চেয়ে আছেন হজরতবাল স্মারকের বাক্সের ওপর।
এক একটি মুহূর্ত যেন একটি করে বছরের সমান। সকলে শ্বাসরুদ্ধ। মীরাক শাহর অভিব্যক্তি এবং মুখ নিঃসৃত শব্দের উপর অনেক কিছু নির্ভর করছে। শুধু ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের ক্ষোভ বিক্ষোভ নয়, ভারতের আন্তর্জাতিক সম্মানও ধুলিসাৎ হবে। তাই মীরাক শাহের মুখের দিকে সকলেই তাকিয়ে রয়েছেন।
মীরাক শাহ গভীর ও শান্ত দৃষ্টিতে সেদিকে তাকিয়ে থেকে একটি শ্বাস ফেলে বললেন, ‘হক’!
ব্যস! হলের মধ্যে যেন স্বস্তির বাতাস বয়ে গেল। হক অর্থাৎ হ্যাঁ, সত্য।
উপস্থিত মানুষগুলির মুখ থেকে বেরিয়ে এল, মুবারক…মুবারক…। ভারত সরকারের কাছেও তৎক্ষণাৎ খবর গেল। সকলেই নিশ্চিন্ত। দু’দিন পর ৬ ফেব্রুয়ারি অন্তত ৬০ হাজার মানুষের সামনে সেই কথা শোনালেন ভোলানাথ মল্লিক। সঙ্গে সেই ১৪ জন ধর্মীয় বিশেষজ্ঞ। জনতার মধ্যে আনন্দের গর্জন উঠল। যাক তাহলে, আবার ফিরে এসেছে সেই পবিত্র স্মারক! আকাশে বাতাসে ছড়িয়ে গেল সেই আনন্দময় জয়ধ্বনি…আল্লাহ আর রাহিম!
কাশ্মীর শান্ত হলেও, ততদিনে আগুন ছড়িয়ে পড়েছে শ্রীনগর থেকে অনেকটা দূরের এক বিদেশি মাটিতে। সে আগুনে দগ্ধ হয়ে চলেছে অসংখ্য প্রাণ, অসংখ্য পরিবার, অন্তহীন ভবিষ্যৎ! এমনিতেই ভারত নামক দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার পর থেকে এই বিশেষ ভূমিটি দুর্ভাগ্যতাড়িত। নিজেদের মাতৃভাষার জন্য লড়াই করতে হয়। শাসকের কাছে অবিরত অসম্মান পেতে হয়। গণতন্ত্র নামক বস্তুটি যে ঠিক কেমন সেই স্বাদও পায়নি তারা। হতভাগ্য সেই ভূমির নাম পূর্ব পাকিস্তান!
