সন্ধিক্ষণ – ২৩

২৩

কার কথায় তুমি দুঃখ পাবে, কার কথায় তুমি আঘাত পাবে, এটা তুমি ঠিক করবে। যে কেউ তোমাকে অপমান করল, আঘাত করল, খারাপ কথা বলল, আর তুমি দুঃখের সাগরে ভেসে গেলে, এরকম কোরো না।

নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করো। যে তোমাকে আঘাত করতে চাইছে, যে তোমাকে অপমান করতে চাইছে, সে সবচেয়ে বেশি খুশি হবে যদি তার লক্ষ্য পূরণ হয়। তাই না? তুমি যদি তার কথায় খুব কষ্ট পাও…তোমার যদি কান্না পায়…তাহলে এসবের জন্য যে দায়ী, তাকে তুমি জিতিয়ে দিলে। তা কখনও করবে না। কষ্ট আর বেদনায় তোমার বুক ভেঙে যায়, যাক। কিন্তু প্রকাশ্যে তুমি সবসময় হাসবে। কিংবা ঠাট্টা-ইয়ার্কি করবে। সে যত অপমান করছে, তত বেশি হাসবে। যে তোমাকে অসম্মান করতে চায়, যে তোমার কথা কখনও ভাবে না, নিজে সবসময় জিততে চায়, তাকে বুঝিয়ে দাও যে, তুমি তার কথাকেও মোটে গুরুত্ব দাও না।

ভেবে দেখো, এখন যদি সে একবার বুঝতে শুরু করে যে, তার আঘাতের কোনও রেশই লাগে না তোমার গায়ে। তুমি মনে রেখো না সে কী বলেছে! কিন্তু আমরা কী করি? আমরা মনে রেখে দিই অপমান, আঘাতগুলোকে। আর তাই সে খুব তৃপ্তি পায়, সে মনে করে তোমাকে ছিন্নভিন্ন করে দিতে পারছে। সে সফল।

তাই যে তোমাকে অপমান করবে, আঘাত করবে, তাকে পাত্তা দিও না।

মানুষের ভুল ধরবে না। অনেকে বলবে, আমার কোনও ভুল হলে বলবে। ধরিয়ে না দিলে শিখব কীভাবে? এসব হল কথার কথা। আসলে কিন্তু বেশিরভাগ মানুষই ভুল ধরা পছন্দ করে না। পরীক্ষা করে দেখবে তুমি কারও যত প্রশংসা করছ, সব প্রশংসাই সে খুশিমনে গ্রহণ করছে। হয়তো মাঝেমধ্যে বলছে, না না অতটা নয়। ওটা নিছক বলতে হয় বলে বলা। আসলে তার শুনতে ভালোই লাগছে। তার ভুল ধরিয়ে দাও একবার, দেখবে সে তোমাকে বোঝানোর চেষ্টা করবে যে, আসলে সেটা ভুল নয়, অন্যায় নয়। মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো রাখার শ্রেষ্ঠ উপায় হল, তাকে প্রশংসা করতে হবে। আজকের যুগে এই হল নিয়ম।

অন্যকে কথা বলতে দেবে। শোনো বেশি, বলো কম। যত বেশি শুনবে, ততই অন্যের ভিতরটা দেখতে পারবে, জানতে পারবে। নিজে বেশি কথা বলে ফেললে অন্যের মনের ভিতরে কী আছে, সেটা জানা হয় না। অন্যকে কথা বলতে দাও। সে যত বেশি কথা বলবে, দেখবে তার মনের অনেক আচরণ, অনেক দুর্বলতা, অনেক গোপন রাগ, সবই বেরিয়ে আসবে।

তোমার কি কথা বলতে বলতে কথা হারিয়ে যায়? এরপর কী বলবে সেই ভাষা খুঁজে পাও না? তার মানে কী? মানে হল, তোমার মাথায় শব্দের সিন্দুক ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে। শব্দ দিয়ে সিন্দুক ভরাও। কথা কম বলা মানে শব্দ জমিয়ে রাখা। শব্দ বেশি খরচ করবে না। দরকারের সময় সেইসব জমিয়ে রাখা শব্দ তোমায় সাহায্য করবে। তোমার কথা স্পষ্ট করে বলতে পারবে। সময় পেলে বই পড়ো। বই নেই? গীতবিতান পড়ো। সারাদিন গান পড়ো। কথা পড়ো। কথা জমাও। শব্দ জমাও। বুদ্ধি আর যুক্তি দিয়ে আবেগকে তুমি ব্যবহার করো যুদ্ধে জিততে।

পাঞ্চালির হাতে সুধাময়ীর খাতা। সুধাময়ী নাকি বাঙাল ভাষায় কথা বলতেন? পাঞ্চালিকে তো দাদা-দিদি, বাবা-মা, ফকিরজেঠা সেরকমই বলেছে। তাহলে সুধাময়ীর এই খাতার সব লেখা এরকম এপার বাংলার ভাষা হয় কীভাবে?

ফকিরচাঁদ বলেছে পাঞ্চালিকে, মা জননী কথা কইতেন আমাগো ভাষায়, আর ল্যাখার সময় কইলকাতার ভাষা। ক্যান জানো? মা জননীর তো গুরুদেব আছিলেন, দুই জনা। একজন তাঁর দীক্ষাগুরু, আর একজন রবীন্দ্রনাথ। সারাক্ষণ তার কাছে ওই রবীন্দ্রনাথের বই, আর এই খাতা। মা কইতেন, আমার মুখের ভাষা দেছে আমার বংশ আর মাটি। মনের ভাষা দিছেন গুরুদেব!

মায়ের পুরোনো ট্রাঙ্কে ছিল সুধাময়ীর দুটো খাতা। কত পুরোনো। ওই ফকিরচাঁদই একদিন সন্ধ্যাকে বলেছিল, শোন, মা জননীর খাতা, মা জননীর গীতবিতান, এই দুটা জিনিস বুলারে দিবা। বাবু আর তপু তাদের ঠাকমারে দেখছে। বুলা দ্যাখে নাই। তাই ও বড় হইলে অরই প্রাপ্য। অর ঠাকমারে যেন ও তার ল্যাখা থেকে জানতে পারে।

দশ বছর ধরে এই খাতাদুটো পাঞ্চালির ব্যক্তিগত সময়ের সঙ্গী। এই খাতার প্রতিটি পৃষ্ঠায় সে সুধাময়ীকে একটু একটু করে দেখতে পায়।

প্রতিটি পৃষ্ঠার প্রতিটি বাক্য থেকে পাঞ্চালি খুঁজে নেয় জীবনবোধ, জীবনের পাথেয়। সুধাময়ী নামক একটি নারীর সঙ্গে যে পাঞ্চালির জীবন অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে গিয়েছে, সেই ওজন বহনের মতো শক্তি আছে তো তার!

দুই দিকে দুটো কদমগাছ। মাঝখানে ছায়া। প্রতিদিন সকালে সেখানেই বসে থাকে দুটি মানুষ। একজনের আশি পেরিয়েছে। অন্যজন সত্তরের শেষ ধাপে।

ফকিরচাঁদ আর প্রভাস মুখোমুখি বসে। জুন মাসের শেষ সপ্তাহ। এই সপ্তাহ এলেই অস্থির লাগে এই পরিবারের। ২৫ জুন।

ফকিরচাঁদ বলল, মাইয়াডার কী হইব?

প্রভাস উদাসভাবে বলে, জানি না। সে কী ভাবছে, আমাকে বলবে? মাকেই বলে না।

ফকিরচাঁদ বলে, আইজ সে বাসায় আছে। তারে ডাকো। আমি কথা কই।

প্রভাস বলে, ছেড়ে দাও ফকিরদা। এ মেয়ে অন্য ধাঁচের।

ফকিরচাঁদের এই বয়সেও কণ্ঠস্বর চড়া। সে চিৎকার করে ওঠে, বুলা…এই বুলা…।

পাঞ্চালির ঘর দোতলায়। প্রভাসের বাড়ি এখন দোতলা। নীচের তলায় দুটি ঘরের একটিতে থাকে সন্ধ্যা প্রভাস। আর অন্যটি ফকিরের। দোতলায় তিনটে ঘর। তপুর বিয়ে হয়ে গিয়েছে। বাবু অর্থাৎ অমল আজ সিভিল ইঞ্জিনিয়ার। ভোপালে থাকে। বাবু বিয়ে করেছে আঙ্গাকে। ওরা ছুটিতে আসে। এখন বাড়িতে থাকে ফকিরচাঁদ, প্রভাস, সন্ধ্যা আর পাঞ্চালি।

প্রভাস আর ফকিরচাঁদ মিলে জামাকাপড়ের ছোট্ট দোকানটাকে করেছে সুধা গার্মেন্টস। ফকিরচাঁদ নিজেরও একটি স্টুডিও মতো করেছে বাড়ির পিছনের জমিতে। কাঠের নানারকম মূর্তি গড়ে পালিশ করে। জগদলপুরে আছে সার দেওয়া কাঠের মূর্তির দোকান। ক্ষিতিজ হোটেলের পাশের রাস্তায়। ওরাই এসে নিয়ে যায় কাঠের পুতুল মূর্তি।

ফকিরচাঁদের ডাক শুনে দোতলার বারান্দায় এসে দাঁড়ায় পাঞ্চালি। ফকিরচাঁদ হাতছানি দিয়ে ডাকে। নীচে নামার মুহূর্তে সিঁড়িতে তাকে ধরে সন্ধ্যা।

তুই নাকি বনপার্টির সঙ্গে ঝগড়া করেছিস? সন্ধ্যা বলল।

পাঞ্চালি অবাক হল। এই খবর মায়ের কাছেও এসে পৌঁছেছে! বলল, ঝগড়া করব কেন? আশ্রমের কাজে যাই। ওখানেই ওদের সঙ্গে দেখা হয়।

সন্ধ্যা বলল, লুকোস না। ভীমা বলেছে, ওদের এক নেতাকে তুই খুব নাকি ধমক টমক দিয়ে ঠান্ডা করে দিয়েছিস! তখন থেকে আমার বুক কাঁপছে। এসব কী হচ্ছে? বাড়িতে এসে হামলা করলে, তখন?

পাঞ্চালি হেসে বলল, তুমি বেশি বেশি ভাবছ!

সন্ধ্যা বলল, ঠাকুমার মতো স্বভাব হয়েছে। সব ব্যাপারে বিপ্লবী। সব কিছুতেই ঝাঁপিয়ে পড়া। একজন আদিবাসী মেয়ে তোর বউদি আঙ্গাকে দেখেছিস, কীভাবে নিজেকে পালটেছে! স্কুলে পড়াচ্ছে? ওর কথাবার্তা শুনলে কেউ বলবে যে, পাহাড়ের নীচের জঙ্গলের কাছে তুলুং গ্রাম থেকে ও উঠে এসেছে?

পাঞ্চালি শান্তকণ্ঠে বলল, বউদিকে জীবনদান করেছিল কে? তোমার সেই বিপ্লবী শাশুড়ি! তোমাদের কাছেই তো শুনেছি সেই ঘটনা।

সন্ধ্যা বলল, আমার শাশুড়ি হতে গেলে অনেক তপস্যা করতে হবে। আমি তাঁকে নকল করে রাস্তায় নেমে মানুষের উপকার করতে যাইনি। কারণ আমি জানি আমাকে দিয়ে হবে আর কী হবে না। তবে তোর উপর মনে হয় মা ভর করে মাঝেমধ্যে।

পাঞ্চালি হাসতে হাসতে বলে, মাঝেমধ্যে ভর করে কে বলল? আমার মধ্যে ঠাকুমা ঢুকে আছে।

তোর ঠাকুমা পুলিশের সঙ্গে আদিবাসীদের হয়ে লড়েছে। আর তুই আদিবাসীদের হয়ে বনপার্টির সঙ্গে লড়তে গেলি? ঠাকুমা বাঁচেনি। তোরও যদি ওরকম কিছু হয়? সন্ধ্যার গলা কেঁপে গেল।

পাঞ্চালি মাকে জড়িয়ে ধরে বলল, বনপার্টি আদিবাসীদের পার্টি নয়। আদিবাসীদের কোনও পার্টি নেই মা। তারা নিজেদের পেট চালাতেই নাজেহাল।

সন্ধ্যা বলল, যাই হোক, তুমি পরদিন যদি যাও, ওদের কাছে মাফ চেয়ে নেবে। ওদের রাগিয়ে দিয়ে আমরা রক্ষা পাব না। আমার বাবু আর তপুকে নিয়ে কোনওদিন এত ভাবনা ছিল না। তোকে নিয়েই চিন্তা সারাক্ষণ। আমি কিছুতেই বুঝি না, যে ঠাকুমাকে তু্ই চোখেই দেখিসনি, তুই নাকি হয়েছিস তার মতো! ফকিরদা সারাক্ষণ এসব বলে যাচ্ছে। সবথেকে বড় কথা…

জানি জানি! পাঞ্চালি হেসে বলে, সবথেকে বড় কথাটা আমি জানি। কেন বিয়ে করছি না, এই তো? আচ্ছা এই যে দোকানের সেল বাড়িয়ে দিচ্ছি, এসবের কী হবে আমি বিয়ে করে চলে গেলে? তাছাড়া—

সন্ধ্যা বাধা দিয়ে বলল, তাছাড়া আমরা তিনজন বুড়োবুড়ি এখানে একা একা কীভাবে থাকব? এই তো?

পাঞ্চালি সন্ধ্যাকে আরও বেশি জড়িয়ে ধরে হাসতে হাসতে বলল, এই তো! এই তো সুইট মা!

সন্ধ্যা নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে বলল, ছাড়! বাবা মা বুড়ি হয়েছে বলে, কেউ যেন বিয়ে করে না! সত্যি করে বল, তোর পছন্দের কেউ আছে?

পাঞ্চালি হেসে বলে, আমার পছন্দের কেউ থাকলে এতদিন বসে থাকতাম নাকি? কবে পালিয়ে যেতাম!

সন্ধ্যা বলল, পালিয়ে যেতে হবে কেন? আমরা কি বারণ করব?

তুমি বুঝতে পারছ না মা! তোমাদের মজুমদার বংশের একমাত্র প্রদীপ যে সেই দাদা আদিবাসী রক্তের অনুপ্রবেশ করিয়েছে বংশে। এরপর আমি যদি অবাঙালি কোনও ঠাকুর কিংবা রাজপুতকে বিয়ে করি, তাহলে তো দিদি ছাড়া আর কেউ তোমাদের বংশের শুদ্ধতা বজায় রাখবে না! একমাত্র ওই জেঠার বাড়িই যা আছে।

সন্ধ্যার মুখে মুহূর্তে ছায়া পড়ল।

পাঞ্চালি বুঝল সে ভুল করেছে। জেঠার কথা বলা ঠিক হয়নি। ছোটবেলায় একবার জেঠাকে এই বাড়িতে আসতে দেখেছিল। পরে ফকিরজেঠার কাছে শুনেছে যে, জেঠারা বহুকাল আগে ইন্ডিয়ায় এলেও উদ্বাস্তু হয়ে চলে আসা মা-ভাইয়ের সংবাদ নেয়নি। তারপর জেঠির বাপের বাড়ির সুবাদে নাকি সন্ধান পেয়ে এসেছিল। সম্পর্কটা অবশ্য আর আগের মতো হয়নি। জেঠার সবথেকে বড় ক্ষোভ সে নিজের মায়ের মুখাগ্নি করতে পারেনি! পাঞ্চালিকে ফকিরজেঠা বলেছে যে, কী অবস্থায় সুধাময়ীর মৃত্যু হয়েছিল। তখন কেউ জানতও না প্রদীপের ঠিকানা!

সন্ধ্যা বলল, আঙ্গা এখন তোমার থেকে বেশি বাঙালি হয়েছে। ভোপাল বেঙ্গলি ক্লাবে কী যেন এক সেক্রেটারি হয়েছে। রবীন্দ্রজয়ন্তী করবে। ফোন করেছিল।

পাঞ্চালি বলল, বাইরে চা পাঠাও। ডাক পড়েছে।

পাঞ্চালি দেখল ফকিরচাঁদ বসে আছে। আর বাবা ইজিচেয়ারে চোখ বুজে বসে।

ফকিরচাঁদ বলল, কী কইতাছিল দিদি?

পাঞ্চালি বলল, বিয়ে করতে।

ফকিরচাঁদ একগাল হেসে বলল, আমার আর কয়দিন আয়ু! তরে বউ সাজে মনে হয় আর দেখা হইব না। তুই এখন দশভুজা।

প্রভাস চোখ বন্ধ রেখে বলল, তোমার মা কী যেন বলছিল!

পাঞ্চালি বাবাকে সমীহ করে। বাবা কখনও উঁচু গলায় কথা বলেনি তার সঙ্গে। সে বলল, ঝগড়া করিনি। ভীমা বাচ্চা ছেলে। মা অযথা ভয় পেয়েছে। সুধীরকাকাকে জিজ্ঞাসা কোরো। আমি তেমন কিছুই করিনি।

প্রভাস বলল, সুধীরও একই কথা বলেছে। ওদের এক বড়সড় নেতা, হাতে বন্দুক। তার সঙ্গে নাকি তুমি উঁচু গলায় কথা বলেছ। সে তোমাকে হুমকি টুমকি দিয়েছে?

পাঞ্চালি বলল, বাবা, সেরকম কিছু হয়নি। আমরা ঠিক করেছি ট্রাইবালদের যে বস্তার আর্ট আছে সেটাকে যদি শাড়িতে নিয়ে আসা যায়। সেই নিয়ে কথা হচ্ছিল। বনপার্টির ওরা জানতে চাইছিল, আমরা কত দামে কিনব, কত দামে বিক্রি করব এসব। তাই ওদের বলছিলাম, আদিবাসীদের নিয়ে প্রফিট করার ইচ্ছা আমাদের নেই। সেই নিয়ে দু-চার কথা হয়েছে।

প্রভাস বলল, ওদের আঁকা কাপড়ে লাগালে, তারপর সেটা উঠে গেলে কাস্টমার কী বলবে? দোকান আর সমাজসেবাকে একসঙ্গে মিলিও না।

প্রভাস সারাজীবনই পাঞ্চালিকে তুমি তুমি করে ডেকে এসেছে কেন কে জানে! পাঞ্চালি ঠোঁট টিপে রইল কিছুক্ষণ। সমাজসেবা কথায় তার আপত্তি। ওর মধ্যে একটু ব্যঙ্গ আছে। অথচ বাবা আজ পর্যন্ত পাঞ্চালির কোনও ইচ্ছায় অমত করেননি।

আলোচনা সিরিয়াস দিকে চলে যাচ্ছে দেখে ফকিরচাঁদ বলেন, বুলা মা, তুই একখান আদিবাসী পোলারে বিয়া কইব়্যা ফেলা না! তবে তুই হালবা না, গোন্দি খোঁজ! তাইলে প্রভাসের ফ্যামিলির ষোলোকলা পূরণ হইব। তপুর বর এদেশি ঘটি। বাবুর বউ হালবা। তোর বর গোন্দ। আমরা বাঙাল। কী সাংঘাতিক!

পাঞ্চালি বলল, তাহলে পাত্র দেখব?

ফকিরচাঁদ বলল, অবশ্যই। আমি ঘটকালি করুম। বুরুন্দার দিকে যামু কাল। তয় তর বাবা আর মায় যাই কউক, এই যে তুই আদিবাসী গেরামগুলোয় কাম করতাছস, এইডা দেইখ্যা আমার মা জননী যে স্বর্গে বইস্যা কী সুখ পাইতাছে বুঝবি না। মা জননী…মা জননী…। ফকিরচাঁদের চোখে আচমকা জল আসে।

পাঞ্চালি মাঝে মাঝে ভাবে, তার বাবার চেয়েও সুধাময়ীর জন্য ফকিরজেঠা যেন বেশি আকুল। সুধাময়ীর প্রসঙ্গ উঠলে থামতে চায় না জেঠা। পাঞ্চালি সেই দিনের গল্পটা কতবার যে শুনেছে ফকিরচাঁদের কাছে। ১৯৭৫ সালের ২৫ জুন।

রায়পুরে সন্ধ্যাকে হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিল প্রভাস। প্রস্তুতি ছিল না। সময়ের আগেই সেদিনই প্রসব হয় সন্ধ্যার। জরুরি অবস্থা ঘোষণা হওয়ার জন্য সেদিন দুপুরের পর থেকেই সমস্ত যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। সম্ভবত কেউ জানত না জরুরি অবস্থা কথাটার মানে কী? কী হয় এটা হলে? পরদিন থেকে অবশ্য সব স্বাভাবিক।

বরং একটু বেশিই যেন সক্রিয় সবকিছু। সময়মতো বাস চলছে। অনিয়ম দেখলে পুলিশ চলে আসছে। প্রভাস পরদিনই সুন্দরপুর চলে গিয়েছিল। মাকে খবর দিতে। টাকাপয়সা আনতে। হাসপাতালে সন্ধ্যার কাছে ছিল সাধন কম্পাউন্ডারের মেয়ে সুফলা আর বাবু। বাবু তখন কাছেই আশ্রমের স্কুলে পড়ত। হস্টেলে বলে এসেছে যে তার মা অসুস্থ। হাসপাতালে ভর্তি। আশ্রম আর হস্টেল থেকে এক কেয়ারটেকার এসে হাসপাতালে দেখে গিয়েছে সন্ধ্যাকে। কিন্তু প্রভাস সুন্দরপুরে গিয়ে আর ফিরছে না কয়েকদিন হয়ে গেল। সদ্যোজাত সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়াতে পারছে না সন্ধ্যা। তার নিজেরই সেই সময় আশঙ্কাজনক অবস্থা। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হচ্ছে। সন্ধ্যার চিন্তায় ব্যাকুল বাবু, সুফলারা। প্রভাস ফিরে আসছে না। এলও না।

এসেছিল ফকিরচাঁদ। কাঁদতে কাঁদতে। কেন কাঁদছে ফকিরজেঠা? কারণটা বাবু জেনে কোনও কথা বলতে পারছিল না। কথা বলা কীভাবে সম্ভব? ঠাকুমা নেই? কথাটার মানে কী? বাবু অল্প বয়সে দাঙ্গা দেখেছে। চলে এসেছে নিজের শৈশব আর বাল্যের স্মৃতিগুলো ছেড়ে। কিন্তু নিজের পরিবারের কোনও মৃত্যু সে দেখেনি কখনও।

শুধু একটা কথাই বলতে পেরেছিল, ঠাকুমাকে আর দেখতে পাব না বাসায় গিয়ে?

ফকিরচাঁদ বলে পাঞ্চালিকে, এই যে আজ চাইরদিক্যা আদিবাসীদের লইয়া এত কিছু কথা শুনি, এইসব দেইখ্যা আমার হাসি পায়। ভোটের সময় নেতাদের মুখে শুনি আদিবাসীদের জইন্য তাদের প্রাণ কান্দে। বনপার্টি হইছে। তারাও বলে তারা নাকি আদিবাসীদের হকের জইন্যই পুলিশ আর গর্মেন্টের সঙ্গে লড়াই করে। মা জননী সেই কবে, একটা আদিবাসী বাচ্চা মেয়ের রাষ্ট্রযন্ত্রের অইত্যাচার থিইক্যা বাচাইছিলেন। কজন মনে রাখছে সেকথা! সেইদিন আঙ্গারে বাচাইবার লাইগ্যা মা জননী শহিদ হইছিলেন!

পাঞ্চালি লক্ষ্য করেছে, তারপর কী ঘটেছিল, সেটা ফকিরচাঁদ বলতে চায় না। তাকে জোর করলে আস্তে আস্তে বলে, সেদিন সুধাময়ী যখন মাটিতে পুলিশের লাঠির আঘাতে পড়ে যাচ্ছেন, সেই সময়ই উপস্থিত হয়েছিল ফকিরচাঁদ। কাঠের পুতুল আর সামগ্রী শহরের দোকানে সাপ্লাই করে ফিরছিল। ফেরার কথা ছিল অনেক রাতে। কিন্তু একটা দোকানে বসে কথা বলার মধ্যে সে আচমকা চোখের সামনে একটা দৃশ্য দেখল। সুধাময়ী মাটিতে পড়ে আছেন। তার মাথা থেকে রক্ত পড়ছে। ফকিরচাঁদের এই ক্ষমতাটি বহুকালের। এইরকম কিছু সে দেখলে সেটা সত্যিও হয়। সেদিনের কাজ অর্ধেক রেখেই ফকিরচাঁদ চলে আসে সুন্দরপুর। আর বাস থেকে নেমে পরিত্রাহি হেঁটে হেঁটে বাড়ির সামনে এসে দেখতে পায় অবিকল সেই দৃশ্য। সুধাময়ী মাটিতে পড়ে আছেন। তাকে মারছে এক পুলিশ।

ওই দৃশ্য দেখে ফকিরচাঁদের মাথায় আগুন জ্বলে উঠেছিল। এক পুলিশকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে তারই লাঠি নিয়ে মারতে শুরু করে দেন। নিরাপদরা জাপটে ধরে তাকে। তারা উদ্বাস্তু। তারা নিজেরাই এখানে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক। সেখানে ফকিরচাঁদ এসব কী করছে? পুলিশকে মারছে? রিডিউজি কলোনিকেই ধ্বংস করে দেবে পুলিশ!

ফকিরচাঁদ উন্মত্তের মতো মেরেছিল একজন পুলিশকে। বাকি পুলিশকর্মীরা ফকিরকে মেরে মেরে রক্তাক্ত করে দেয়। সেই অবস্থায় তাকে টেনে হিঁচড়ে তোলা হয় জিপে। সুধাময়ীকে ওভাবে নিষ্প্রাণ রেখে জিপ চলে যায়।

পুলিশকে আক্রমণ! অতএব জেল তো হলই, জামিনও হল না। মাসের পর মাস জেলে থাকা। অবশেষে এক বছর পরে মুক্তি পেয়েছিল ফকিরচাঁদ। প্রভাস কোনওমতে চার হাজার টাকা জোগাড় করে বন্ডে ছাড়িয়ে আনে।

তাহলে ফকিরচাঁদ কেন এই কাহিনি শোনাতে চায় না? কারণ, ফকিরচাঁদ এই ঘটনাকে ব্যর্থতা মনে করে। সুধাময়ীর হত্যাকারীকে সে কেন পালটা খুন করতে পারল না? অত লাঠির আঘাত খেয়েও সেই পুলিশ প্রাণে বেঁচে গেল কী করে? ফকিরচাঁদ আজ এই বয়সে এসেও রাগে গর্জায়।

প্রভাস বলল, পরশু দোকানে দুটো ছেলেমেয়ে এসেছিল। ছেলেটাকে চেনা চেনা লাগল। মেয়েটা অচেনা। তোমার খোঁজ করছিল। আমি বলেছিলাম তুমি রায়পুর গেছ। আবার আসবে বলেছে। আশ্রমে এর মধ্যে তোমার পড়ানো আছে?

পাঞ্চালি বিস্মিত। বলল, আমার খোঁজে?

প্রভাস বলল, হ্যাঁ। মেয়েটার হাতে সেলুলার ফোন ছিল। আমাকে জিজ্ঞাসা করছিল তোমার ফোন নম্বর। আমি বলেছি আমাদের তো সেলুলার ফোন নেই। দোকানে ফোন করে জেনে নিতে।

ফকিরচাঁদ বলল, কাইল তো আবার আশ্রমের ছেলেপিলের লগে তোমার পিকনিক?

পাঞ্চালি ফ্যাকাসে হেসে বলল, হ্যাঁ।

প্রভাস বলল, কাল?

ফকিরচাঁদ বলল, হ্যাঁ কাইল! তুমি এই দিনটারে মায়ের শোকদিবসই কইব়্যা রাখলে চিরডাকাল। আমার এই মায়ের সুখদিবসকে তোমরা দুঃখদিবস কইব়্যা রাখছ!

পাঞ্চালি বাধা দেয়। আহ্‌ জেঠা, এসব কী কথা?

ফকিরচাঁদ ফুঁসে ওঠে, তুই থাম! আমি কইলেও অ্যারা শোনে নাই। মা জননীর যেদিন চইল্যা গ্যালেন, সেইদিনই তর জন্ম। এতে তর কীসের দোষ? অ্যারা সারা দিনমান শোকে এক্কেরে কাতর! যে মইব়্যা গেছে তার লাইগ্যা, আর যে মেয়েটা জলজ্ব্যান্ত আছে, তার কষ্ট কেউ বোঝবে না! তর ছোটকালেও দেখছি এই একই ভাব। নমো নমো করে পায়েস কইব়্যা য্যান শ্যাষ হইয়া গ্যালো দায়িত্ব আর ভালোবাসা!

পাঞ্চালি তাড়াতাড়ি ফকিরের হাত ধরে চোখের ইশারায় অনুনয় করে।

ফকির তাকিয়ে দেখল প্রভাসের মুখ থমথম। সুধাময়ীর মৃত্যুদিনেই পাঞ্চালির জন্ম। প্রভাস কী ভাবছে? পাঞ্চালির প্রতি তাঁরা এতকাল অবিচার করেছে? ফকিরচাঁদ আগেও অনেকবার বলেছে। কিন্তু প্রভাস ওই দিনটার কথা ভুলতে পারে না।

প্রভাস পাঞ্চালির দিকে তাকাল। মনে মনে বলল, আমাকে ক্ষমা করে দিস মা! আমার নিজের কষ্ট দিয়ে তোর আনন্দকে এতকাল ঢেকে রাখলাম!

পাঞ্চালি কিছু কি বুঝতে পারল? বাবার শূন্য চোখের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ সে এগিয়ে আসে। হাত রাখে প্রভাসের কাঁধে! বলে, ফকিরজেঠার কথায় কিছু মনে কোরো না! আমি কিন্তু কখনও এসব ভাবিনি।

ফকিরচাঁদ এবার প্রভাসের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল, মা জননীর অভাব তোমার বুকটারে সারাক্ষণ খান খান করে রাখে, সে আমি বুঝি প্রভাস।

প্রভাস রুদ্ধস্বরে বলে, এতগুলো বছর হয়ে গেল, তবু ভুলতে পারি না মাকে। তোমারও কি এই একই কষ্ট হয় না ফকিরদা?

ফকিরচাঁদ বলেন, হয়, তবে কম কম হয়। ক্যান জানো? মা জননী যেদিন চইল্যা গেলেন, সেইদিনই কেডা আইল আমাগো ঘরে? এই বুলা! আমাগো সংসারের দুঃখের যজ্ঞ হইতে যার জন্ম! আমার নতুন মা জননী! তাইতো অর নাম দিছিলাম পাঞ্চালি!

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *